
কেন লালন ও গান্ধীজি আজও প্রাসঙ্গিক
‘আমি বিশ্বের সকল মহান ধর্মে বিশ্বাসী। যতক্ষণ না আমরা পরধর্মকে শুধু সহ্য করতেই নয়, বরং নিজের ধর্মের মতো সম্মান করতে শিখব, পৃথিবীতে ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো

‘আমি বিশ্বের সকল মহান ধর্মে বিশ্বাসী। যতক্ষণ না আমরা পরধর্মকে শুধু সহ্য করতেই নয়, বরং নিজের ধর্মের মতো সম্মান করতে শিখব, পৃথিবীতে ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো

এমন লোকপ্রিয় বিষয় বাংলা সাহিত্যে আর দ্বিতীয়টি নেই। বাংলা ভাষা, সঙ্গীত ও সাহিত্যে কবিগান ও কবিয়ালদের অবদানের কথা চিন্তা করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কবিগান সংগ্রহ এবং এ বিষয় পাঠ্যতালিকাভুক্ত করেছে। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, রাষ্ট্রীয়ভাবে কবিয়ালদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান কিংবা কবিগানকে সংরক্ষণে কোনও উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। আলোচ্য গ্রন্থের লেখক এ গানকে সংরক্ষণ করার সুপারিশ করেছেন। কারণ তিনি মনে করেন, এই গানের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে লোকায়ত বাংলার সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা দিক যার অধিকাংশই অনালোচিত ও অনালোকিত রয়েছে অদ্যাবধি।

যুবা-তরুণ-বৃদ্ধ, বাঙালি, এশিয়ান, আফ্রিকান যারাই তাঁর কবিতা পড়েছেন, তারাই মুগ্ধ হয়েছে। তাঁর কবিতা কেবল ফিলিস্তিনি তথা আরব জাহানে জনপ্রিয় নয়, সারা বিশ্বের ভাবুক-রসিকদের তৃপ্ত করেছে তাঁর কবিতা। তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক পঠিত নন্দিত কবিদের একজন।

ভালভাষা উৎসব সংখ্যা ২০২৩। কেন পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা ভিটেমাটি, জমিজিরাত, গোরু-বাছুর ফেলে গণপ্রব্রাজনের মিছিলে সামিলে হলেন? ম্যালেরিয়া-কলেরা-মহামারী-রাষ্ট্রীয় রোষানলের শিকার কী শুধু পূর্ববঙ্গের হিন্দুরাই হয়েছিলেন? পূর্ব পাকিস্তানগামী মুসলমানরাও কী নিপীড়নের শিকার হননি? এসব বিষয় নিয়ে উল্লেখ করার মতো সাহিত্য বা চলচ্চিত্র নির্মিত হয়নি। ফলে মুসমানদের উদ্বাস্তু জীবনের কাহিনিটা একেবারেই অজানা রয়ে গেছে। লিখেছেন আবদুল্লাহ আল আমিন।

India’s First Bengali Daily Journal. কবিয়াল ভোলা ময়রা, এন্টনি ফিরিঙ্গি যে-অর্থে সেলিব্রিটি ছিলেন, সেই একই অর্থে পাগলা কানাইও তাঁর সমকালে সেলিব্রিটি গায়ক ছিলেন। তিনি তাঁর সমকালে এত জনপ্রিয় ব্যক্তি ছিলেন যে, এক পর্যায়ে কিংবদন্তিতুল্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। লালনও তাঁর সমকালে সঙ্গীত রচয়িতা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন, তবে জনপ্রিয়তার নিরিখে পাগলা কানাইয়ের সমতুল্য ছিলেন না। বাংলাগানের শ্রোতা-সাধারণের রুচির ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, পাগলা কানাইয়ের গানের প্রতিতুলনায় লালন ফকিরের গানের বিনোদনমূল্য ও সমাদর বেশ কম ছিল।

India’s First Bengali Daily Journal. তিনিও লালনের মতো গৃহত্যাগ করেন, তবে চিরদিনের জন্য নয়। বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করে তিনি মেহেরপুরে ফিরে এসেছিলেন। তবে জমিদারতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষিত-নিয়ন্ত্রিত ভদ্রসমাজে নয়। তিনি ফিরে আসেন ভিন্ন সাজ-পোশাকে, ভিন্ন রূপে-চেহারায়। উচ্চধর্ম ও উচ্চবর্ণের বিরুদ্ধে গড়ে তোলেন বলরামি সম্প্রদায়। সনাতন ধর্মের পরিমণ্ডলের বাইরে ভৈরবের তীরে গড়েন ভিন্নধারার মন্দির। বাউলদের মতো বলরামের অনুসারীরাও শাস্ত্রের প্রাণহীন নিরসতত্ত্ব মেনে নেননি।

India’s First Bengali Daily Journal. আমাদের জাতি ও সমাজকে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করার জন্য তাঁকে জীবনের নানাপর্বে নানা ভূমিকা পালন করতে হয়েছে। কখনও কবি, পত্রিকা-সম্পাদক, কখনও অভিনেতা, চলচ্চিত্রকার কিংবা সমাজ সংস্কারক হিসেবে। তবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক, মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ মহত্তম বাঙালি কবি; যিনি বাঙালির সামগ্রিকতা, সম্প্রীতি ভাবনা, সমন্বয়বাদী ধর্মচিন্তা ধারণ করতে পেরেছিলেন। আজ চারদিকে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে পড়েছে। এই অন্ধ অপশক্তিকে প্রতিহত করতে কাজী নজরুল ইসলাম হতে পারেন প্রধান সহায়ক ও সারথি।

India’s First Bengali Daily Journal. মৃত্যুর পর এত বছর পার হয়েছে, কিন্তু বাঙালির স্মৃতিপট থেকে মুছে যাননি কাদম্বরী দেবী, বরং ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন। দিন যতই যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যেমন আমাদের আগ্রহ বাড়ছে, তেমনই কৌতূহল বাড়ছে রবীন্দ্রনাথ-কাদম্বরীর সম্পর্ক নিয়ে। তাঁদের দু’জনের সম্পর্ক নিয়ে ইতিমধ্যে বাঙালিদের মধ্যে একটা মিথ তৈরি হয়ে গেছে। কবির বিয়ের মাত্র চারমাসের মধ্যে কাদম্বরী আত্মহত্যা করেছিলেন! এই প্রশ্নটা আজও সবার মধ্যে ঘুরপাক খায়, কেন তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন?

India’s First Bengali Daily Journal. তিনি স্বপ্নের মানবিক সমাজ বিনির্মাণের জন্য ‘হাজার বছর’ লড়াই করতেও প্রস্তুত ছিলেন। খরা, বন্যা, মারি মড়ক, ফসলহানিতেও একজন কৃষক ধৈর্য্যচ্যুত হন না, তেমনই সরদার স্যারও জীবনযুদ্ধে ধৈর্যহারা হননি। ‘কৃষকের পোলা’ হিসেবে ‘শুধু বাপের ঋণ শোধ করতে’ লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত ছিলেন সারাজীবন। তিনি সবাইকে পূর্বপুরুষের ঋণ শোধে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে তাগাদা দিয়ে গেছেন বারবার। কালিতে-কলমে, বর্ণে-বর্ণনায়, সভায়-সেমিনারে। মানুষের অমিত শক্তি ও সম্ভাবনার জয়গান গেয়েছেন।

India’s First Bengali Daily Journal. কেন পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা যাবে না? কেন মঙ্গল শোভাযাত্রার সমাগমে শরিক হওয়া যাবে না? এসব লোকায়ত উৎসবের সঙ্গে ইসলাম ধর্মের কি কোনও বিরোধ আছে? বর্ষবরণ উৎসবের নামে আমরা কি জনমনে কোনও বিভেদ-বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে চলেছি? তাহলে কেন পহেলা বৈশাখকে ইসলামবিরোধী কৃত্য আখ্যা দিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে? দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি, এসব উৎসব ইসলামের মূল স্পিরিটের পরিপন্থী তো নয়ই, বরং সহগামী।

India’s First Bengali Daily Journal. নব্বইতে পা রাখলেন সনজীদা খাতুন। এ বয়সেও তিনি প্রাণৈশ্বর্যে ভরপুর এক তরুণী, সত্যভাষণে অকপট ও ঋজু। জীবনের প্রভাতবেলায় বাঙালি সংস্কৃতির বৃক্ষছায়ায় দাঁড়িয়ে ‘রবীন্দ্রনাথের হাতে হাত রেখে’ যে প্রতিজ্ঞামন্ত্র তিনি উচ্চারণ করেছিলেন, সেই প্রতিজ্ঞামন্ত্র জীবনের অপরাহ্ন বেলাতেও ভুলে যাননি তিনি। সংস্কৃতিকে বেছে নিয়েছেন জীবনের পাথেয় হিসেবে, সত্য-সুন্দর-প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শাণিত হাতিয়ার হিসেবে। নবতিপর জন্মদিবসে বাঙালি সংস্কৃতির অভিভাবক সনজীদা খাতুনের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

India’s First Bengali Daily Journal. লালনের অনেক গানেই বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। দারিদ্র্যপীড়িত নির্জন-নিভৃত পল্লিতে বসবাস করেও তিনি এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন যেখানে ধর্মের নামে ভেদাভেদ ও শোষণ বঞ্চণার কোনও জায়গা নেই। সমতা ও ন্যায়বিচারের কথা তিনি গানে গানেই ব্যক্ত করতে চেয়েছেন। গানের হাতিয়ার দিয়েই তিনি সাম্প্রদায়িক প্রজাপীড়ক রাজন্যবর্গকে বিনাশ করতে চেয়েছেন।

India’s First Bengali Daily Journal. হয়তো একদিন সাহেবধনী সম্প্রদায়ের কথা মানুষ ভুলে যাবে, কিন্তু কুবির গোসাঁই-এর বিশাল গানের জগৎ বেঁচে থাকবে। তিনি কেবল সাহেবধনী সম্প্রদায়ের জন্য গান রচনা করেননি, বাংলার লোকগানের ভাণ্ডারকেও সমৃদ্ধ করেছেন। শ্যামাসঙ্গীত বা শাক্ত গানে রামপ্রসাদ, বাউল গানে লালন শাহ, কবিগানে ভোলা ময়রা, কীর্তনে মধুকান, মারফতি গানে হাসন রাজা, ফকিরি গানে পাঞ্জুশাহ, কঠিন দেহতত্ত্বের গানে হাউড়ে গোসাঁই, কর্তাভজাদের গানে লালশশী এককভাবে ভাবুক-রসিকদের অনুমোদন পেয়েছেন যেভাবে, ওই একইভাবে সাহেবধনীদের গানে অবশ্য উচ্চার্য নাম কুবির গোসাঁই।

India’s First Bengali Daily Journal. নবান্ন মূলত ভূমি-নির্ভর বাংলার একটি লোকায়ত উৎসব, ধর্মের সঙ্গে এর কোনও বিরোধও নেই, সম্পর্কও নেই। এর সবটাই বাঙালির চিরায়ত জীবন-জীবিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ উপলক্ষে ঘরে ঘরে উপাদেয় খানাপিনার আয়োজন করা হয়। লেখক দীনেন্দ্রকুমার রায় তাঁর ‘পল্লী বৈচিত্র্য’ (১৯০৫) গ্রন্থে লিখেছেন, ‘বঙ্গের অধিকাংশ পল্লীতেই নবান্ন অগ্রহায়ণ মাসের একটি আনন্দপূর্ণ প্রয়োজনীয় গার্হস্থ্য উৎসব। পল্লীবাসীগণের মধ্যে হিন্দু মাত্রেই পিতৃপুরুষ ও দেবগণের উদ্দেশ্যে নূতন চাউল উৎসর্গ না করিয়া স্বয়ং তাহা গ্রহণ করেন না।’

India’s First Bengali Daily Journal. হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ ও নবায়ন করা দরকার। সারা বিশ্বের মুসলমান সম্প্রদায়কে একপ্রাণ, একজাতি ভাবা যেমন ইতিহাসসম্মত নয়; তেমনই এক জল-হাওয়ায় পরিপুষ্ট, একই গাত্রবর্ণের হিন্দু-মুসলমানকে আলাদা ভাবাটাও অনৈতিহাসিক। ইতিহাস, ঐতিহ্য, রাজনীতি, নৃতাত্ত্বিক গঠনের নিরিখে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক বিবেচনা করা দরকার।

India’s First Bengali Daily Magazine. প্রতিকৃতিটি দেখে নিজেকে যেন চিনতেই পারেন না লালন। কিন্তু জ্যোতিরিন্দ্রনাথের চোখেমুখে ফুটে ওঠে এক অপার্থিব আনন্দ। তিনি জীবনে অনেক প্রতিকৃতি ও ছবি এঁকেছেন, কিন্তু এমন প্রাণময়-জীবন্ত ছবি সম্ভবত একটিও আঁকতে পারেননি। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, তিনি ও লালন চিরকাল বেঁচে থাকবেন না, কিন্তু ছবিটি বেঁচে থাকবে। আগামী দিনে এই ছবি দেখে মানুষ লালনকে চিনবে এবং জানবে। এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কীই বা হতে পারে!

India’s First Bengali Daily Magazine. হালফিলে দেশে দেশে গান্ধীজির ভাস্কর্য ভাঙার আন্দোলন চলছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় লালনের ভাস্কর্যও ভাঙা হয়েছে। বিগত শতাব্দীর সত্তরের বিদ্যাসাগরের ভাস্কর্যও ভাঙা হয়েছিল। যারা বিদ্যাসাগরের ভাস্কর্য ভেঙেছিল তাদের ক’জনকে আমরা মনে রেখেছি? বরং বিদ্যাসাগর মহাশয় স্বমহিমায় বিদ্যমান। তবে হ্যাঁ, লালন-গান্ধী কোনও ত্রুটিহীন অ-বিতর্কিত মানুষ ছিলেন না। তাঁদের চিন্তা-দর্শন ও জীবনাচরণের মধ্যে ফাঁকফোকর, বিচ্যুতি থাকতে পারে। তাঁদের ভাবনাচিন্তা সেকেলে-অবাস্তব, কোনও কোনও ক্ষেত্রে প্রগতিবিরোধীও মনে হতে পারে, কিন্তু তাঁদের উপেক্ষা করা যায় না।

India’s First Bengali Daily Magazine. নানা কারণে বাঙালি সমাজ তথা ভারতবর্ষের মানুষ প্রিন্স দ্বারকানাথের কাছে ঋণী। ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রবর্তন, সংবাদপত্রের উন্নতি সাধন, শিক্ষা-সংস্কৃতি বিকাশে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে রেলপথের রূপকল্প প্রণয়ন— এসব কিছুর সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর। জমিদার হিসেবেও ছিলেন দক্ষ ও প্রবল প্রতাপশালী। সাহাজাদপুর ও বিরাহিমপুর পরগনায় নিয়োগ করেন ইউরোপীয় ম্যানেজার। রায়ত-প্রজা, নায়েব-গোমস্তাদের কাছে দোর্দণ্ড দাপুটে জমিদার হলেও দান-দক্ষিণায়, ভদ্রতা-শিষ্টাচারে ছিলেন অতুলনীয়। ছিলেন উদার মনোভাবাপন্ন যুক্তিবাদী মানুষ।

India’s First Bengali Daily Magazine. সমকালে ফিকিরচাঁদের গানের কাছে ফকির লালনের গান পাত্তাই পায়নি। লালনের গান হয়তো-বা কালের গর্ভে হারিয়ে যেত যদি না রবীন্দ্রনাথ এগুলি সংগ্রহ করে ছাপতেন। তবে লালন ও কাঙাল হরিনাথ ছিলেন পরস্পর অকৃত্রিম বন্ধু ও সুখ-দুঃখের সাথি। দুজনই ছিলেন পরাধীন দেশের মানুষের ব্যথায় ব্যথিতজন ও দুখি মানুষের দুঃখে ঝলসে-ওঠা অগ্নিপুরুষ— যাঁরা কালের অগ্নি ও উত্তাপকে মনের গহন গভীরে ধারণ করতে পেরেছিলেন। দুজনেই একাধারে মরমি ও মানবদরদি।

India’s First Bengali Daily Magazine. তিনি মনে করেন, মৃত্যু যেমন অনিবার্য, তেমনই জীবনও তুচ্ছ নয়। মৃত্যু যেমন সত্য, তেমনই জীবনও সত্য। জীবনকে অস্বীকার করার অপর নাম পলায়ণবৃত্তি। মৃত্যুর অবশ্যম্ভাবিতা মেনে নিয়েই জীবনকে সুন্দর করার জন্য এগিয়ে যেতে হয়। হাহাকার আর হতাশা ছড়িয়ে লাভ নেই। ব্যর্থতা-হতাশা ছড়িয়ে বেড়ানো কিংবা সন্ন্যাসজীবন বেছে নেয়াকে তিনি কাজের কাজ মনে করতেন না। তাই তাঁর গানে প্রস্ফূটিত হয়েছে স্বচ্ছ জীবনবেদ, প্রতিবাদ আর প্রশ্ন-জিজ্ঞাসা।

১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই, আলবার্ট আইনস্টাইন বার্লিনের উপকণ্ঠে নিজের বাড়িতে স্বাগত জানান ভারতীয় কবি, দার্শনিক ও সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। তিনি ছিলেন প্রথম অ-ইউরোপীয় নোবেল বিজয়ী। তাঁদের এই সাক্ষাৎকারটি ইতিহাসের অন্যতম বুদ্ধিদীপ্ত ও মননশীল আলাপচারিতায় পরিণত হয়, যেখানে তাঁরা বিজ্ঞান ও ধর্মের চিরন্তন দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করেন। “সায়েন্স অ্যান্ড দ্য ইন্ডিয়ান ট্রাডিশন: হোয়েন আইনস্টাইন মেট টেগোর” গ্রন্থে এই ঐতিহাসিক সাক্ষাতের বিবরণ পাওয়া যায়। এই বইতে বিশ শতকের শুরুতে ভারতের বৌদ্ধিক পুনর্জাগরণ এবং ভারতীয় ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক চিন্তার মেলবন্ধন তুলে ধরা হয়েছে।

সুদীর্ঘ আট দশক ধরে তিনি তাঁর সঙ্গীতের সুধায় ভরিয়ে দিয়েছেন কেবল ভারত বা এই উপমহাদেশকেই নয়, বিশ্বকে। পরিণত বয়সেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর, যেমন কয়েক বছর আগে হয়েছিল তাঁর স্বনামখ্যাত অগ্রজা লতা মঙ্গেশকরের। আশা ভোসলে তাঁর সমগ্র জীবনে বারো হাজার গান গেয়ে গিনেস বুকে স্থান পেয়েছেন। একদিকে ধ্রুপদী সঙ্গীত, অন্যদিকে লঘু, পপ, এমনকী চটুল গানেও তাঁর সমকক্ষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। সমসাময়িক কিংবদন্তি শিল্পীদের মধ্যে এজন্য অনায়াসে স্থান করে নিয়েছিলেন তিনি।

সত্যিকারের আমিলামিয়া আবার আমার স্মৃতিতে ফিরে এসেছে, আর আমি আবার— সম্পূর্ণ সুখী না হলেও সুস্থ বোধ করছি: পার্ক, জীবন্ত সেই শিশুটি, আমার কৈশোরের পঠনকাল— সব মিলিয়ে এক অসুস্থ উপাসনার প্রেতচ্ছায়ার ওপর জয়লাভ করেছে। জীবনের ছবিটাই বেশি শক্তিশালী। আমি নিজেকে বলি, আমি চিরকাল আমার সত্যিকারের আমিলামিয়ার সঙ্গেই বাঁচব, যে মৃত্যুর বিকৃত অনুকরণের ওপর জয়ী হয়েছে। একদিন সাহস করে আবার সেই খাতাটার দিকে তাকাই— গ্রাফ কাগজের খাতা, যেখানে আমি সেই ভুয়ো মূল্যায়নের তথ্য লিখে রেখেছিলাম। আর তার পাতার ভেতর থেকে আবার পড়ে যায় আমিলামিয়ার কার্ডটি— তার ভয়ানক শিশুসুলভ আঁকাবাঁকা লেখা আর পার্ক থেকে তার বাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার মানচিত্র। আমি সেটা তুলে নিয়ে হাসি।

শ্রদ্ধেয় বসুর বইতে হোমিওপ্যাথি সম্পর্কিত অধ্যায়টি তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্কদের, বিশেষ করে মুদ্রা-মূর্ছনায় মজে থাকা, বা রাজনীতিজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃতির দাবেদার-ঘনিষ্ঠ চিকিৎসকদের বিরক্তিকর বা অপ্রীতিকরই মনে হবার কথা। কেননা, উল্লিখিত দুটি বিষয় নিয়ে তাদের মনের গহীন কোণে প্রোথিত বিজ্ঞানবাদিতার শেকড় ওপড়ানোর সম্ভাবনা নেই বলেই মনে হয়। প্রশ্ন হল, তাঁর উপরিউক্ত বইটির কারণে তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্ক বন্ধুদের চোখে ব্রাত্য বলে চিহ্নিত হবেন না তো? হলে আমি অন্তত আশ্চর্যচকিত হব না। দাগিয়ে দেবার পুরনো অভ্যাস বা পেটেন্ট এই মহলের বাসিন্দাদের প্রধান অস্ত্র, তা ভুক্তভোগীরা হাড়ে হাড়ে জানেন।

১৯৫০ দশকে নেপালের রাজতন্ত্র ও রাজার মন্ত্রিগোষ্ঠী রানাশাহী শাসনের বিরুদ্ধে সফল সশস্ত্র বিদ্রোহ হয়েছিল। সেই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন অনেক ভারতীয়। তাঁদের মধ্যে অনেকে বাঙালি। নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সেই প্রথম সংঘর্ষ সে-দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত। ভারত ও চীনের মধ্যে একফালি দেশ নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম সশস্ত্র ও নিরস্ত্র দুই পথ ধরে চলেছিল। ডান-বাম-অতিবাম— ত্রিমুখী রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতের চূড়ান্ত সফলতা আসে ২০০৮ সালে রাজার শাসনের অবসানে।

আমরা ৮-ই মার্চের আন্তর্জাতিক নারীদিবসে আবহমান নারীবিশ্বকে সামান্য একটু ছুঁয়ে যেতে চাইলাম মাত্র। হাজার হাজার বছর ধরেই তাঁদের ওপর কড়া অনুশাসন, জবরদস্ত পরওয়ানা আর পুরুষতন্ত্রের দাপট। সে-সবের ফল ভুগতে হয়েছে আন্তিগোনে থেকে সীতা, দ্রৌপদী; জোয়ান অফ আর্ক থেকে আনারকলি, হাইপেশিয়া; রানি লক্ষ্মীবাঈ থেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বেগম রোকেয়া; রোজা পার্কস থেকে মালালা ইউসুফজাই— তাঁদের মতো হাজারো নামহীন নারীকে।