Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ব্রাত্য লালন ও কবিয়াল কুবির গোঁসাই: লোকধর্মের ভাব-ভাবুকতা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত-লাগোয়া ইছাখালি গ্রাম মেহেরপুর জেলার আর পাঁচটা গ্রামের মতোই অতি সাধারণ একটি গ্রাম। গ্রামটি এবং এর সংলগ্ন এলাকাটি বাউল-ফকিরদের শক্ত ঘাঁটি। সুগায়ক, অধ্যাত্মসাধক, গীতরচয়িতা আরজান শাহ (১৮৮৫-১৯৫৮)-র জন্ম-মৃত্যু এ ইছাখালিতেই, দেহত্যাগের পর এখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। আরজান শাহের মাজার ঘিরে প্রতিবছর দোলপূর্ণিমায় মেলা বসে, মরমী সাধকদের মচ্ছব হয়। দু’বাংলার মরমী সাধকদের অনেকেই সেখানে হাজির হবার জন্য সারা বছর অপেক্ষা করেন। ২০১২ সালের মার্চে ধুলো উড়িয়ে, ফসলের মাঠ ভেঙে ইছাখালি-নফরচন্দ্রপুরে আরজান শাহের মাজার প্রাঙ্গণে যখন পৌঁছালাম, তখন ফাল্গুন মাসের সূর্য মধ্যগগনে। চারদিকে প্রচণ্ড দাবদাহ, কিন্তু মনের ভিতর বসন্তের উদ্ভ্রান্ত বাতাস। হাজার হাজার মানুষের উদ্বেল উপস্থিতিতে মাজার প্রাঙ্গণ জনারণ্যে পরিণত হয়েছে। মেলাপ্রাঙ্গণে উপস্থিত এক বাউল সাধককে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার নিবাস কোথায়?’ তিনি বললেন, ‘করিমপুর, নদীয়া জেলায়।’ আর-একজন বললেন, মুর্শিদাবাদ জেলার বেলডাঙা থানার গোপীনাথপুর। বিএসএফের বদান্যতায় এঁদের অনেকেই এসেছেন পশ্চিম বাংলার নদীয়া-বর্ধমান-মুর্শিদাবাদের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে। বৃহত্তর পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর জেলার দূর পাড়াগাঁ থেকেও অনেকে এসেছেন। ১৯৪৭ সালে গ্রামটি বিভক্ত হয়ে যায়, বিভক্ত হয় আরজান ফকিরের মাজারটিও। ইছাখালি-নফরচন্দ্রপুর গ্রামের পূর্বাংশ ইছাখালির অবস্থান বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানায়, আর নফরচন্দ্রপুর অংশটি পড়েছে পশ্চিমবঙ্গে। স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে মরমি সাধক আরজান শাহের জন্ম-মৃত্যু ও মাজার এবং অবিভক্ত বঙ্গদেশের নিয়তি বোধহয় একই ট্র্যাজিক সরলরেখার অনুগামী। তারপরও বিভেদ-বিভাজনের মধ্যেও রয়েছে মিলনের আর্তি-আকুলতা। মানচিত্রে খণ্ডিত হলেও বাংলা ভাষা, বাঙালির নস্টালজিয়া, সাহিত্য-সংস্কৃতির ভূগোল সম্পূর্ণরূপে বিভক্ত হয়ে যায়নি। আরজান শাহের পুণ্য স্মৃতিবিজড়িত সীমান্তবর্তী ইছাখালি-নফরচন্দ্রপুর মাজারটিও সহজিয়া মরমীদের সহজ মিলনের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। প্রতিবছর দোলপূর্ণিমা উপলক্ষে আরজান শাহের মাজার প্রাঙ্গণে বসে দু’বাংলার সাধক-দরবেশদের মিলনোৎসব। ২৪ ফাল্গুন ১৪১৮ আরজান স্মরণ দিবস উপলক্ষে মাজার প্রাঙ্গণে পশ্চিমবঙ্গের এক নিভৃতচারী গায়ক গাইছেন:

‘সাঁই সাহেবের মসজিদ খানা/ মাধবপুরে তাঁর ঠিকানা/ রহিমশাহ করিম শাহ দুজনা/ আলাবেড়ের পতিতপাবন/ ভিটেপাড়ায় মদন শাহ’র আসন/ ডোমপুকুরে বিশ্বাসে বদন/ ঘোষপাড়ায় সতীমার আসন/ হুদোপাড়ায় পাল চরণ/ কেরামত উল্লাহ হুজুর মিয়া/ শরিয়তে দুজনা দিয়া/ পাঞ্জু খোন্দকার ময়নুদ্দি শাহ/ এঁদের দিয়ে হয় পঞ্চজন/ যাদুবিন্দু এঁরাই দুজনা/ পাচলাখি গাঁয় তাঁর ঠিকানা/ ঘোলদড়িয়ায় পাঁচু শাহ’র আসন/ কুবির গোসাঁই নারায়ণ চেতন/ উদয় চাঁদ কোদাই শাহ দু’জন/ আনন্দ মোহিনী আর মদন/ কামারপাড়ায় ভোলাই শাহ রয় ছেঁউড়িয়াতে দরবেশ লালন।।’

গ্রামীণ সাধকের রচিত এই গানের কথা একেবারেই সহজ-সরল ও সাদামাটা। কিন্তু এর ভিতরে রয়েছে ঔদার্য, বিনয়, ভক্তি ও মানবিকতা। অত্যন্ত সচেতনভাবেই তিনি তাঁর এ গানে অবিভক্ত নদীয়া-বর্ধমান-যশোরের অগণিত গ্রামের অসংখ্য সাধু-দরবেশদের নাম-ঠিকানা দিয়ে মালা গেঁথেছেন। তাঁর গানের কথায় রাজনৈতিক ভূগোলের পরিসীমা নেই, জাতিধর্মের বেড়ি নেই, স্থানগত বিভাজন কিংবা সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি নেই। লোকধর্মের দিগন্তবিস্তৃত প্রাঙ্গণে ধর্মের নামে ভেদাভেদ থাকে না, থাকে না কাঁটাতারের বেড়া। কারণ তাঁরা কেবল মানুষের ভজনা করেন, মানুষ-ই তাঁদের আরাধ্য। তাঁদের কাছে শাস্ত্র-কিতাব আলাদা কোনও মূল্য নেই। সংস্কৃত মন্ত্র কিংবা গঙ্গাজলের পবিত্রতায় বিশ্বাস করেন না। তাঁরা কাছে টানেন মানুষকে, যে মানুষ ভাবের মানুষ এবং রসের মানুষ। সম্প্রদায়গতভাবে তাঁরা হয়তো হিন্দু কিংবা মুসলমান, কিন্তু তাঁরা মসজিদ-মন্দিরের চার দেয়ালের বাইরে গান গেয়ে সাঁই নিরঞ্জন বা পরমারাধ্যের তালাস করেন। মন-মননে, চিন্তায় কর্মে, জীবনচর্যায় তাঁরা সর্বতোভাবে অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী। আখড়া, আশ্রম, সাধুসঙ্গ, মেলায় গান গাওয়ার সময় তাঁরা মূলত মানুষ ও মানবতার জয় ঘোষণা করেন। এঁদের গানে মুগ্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,

‘…এই গানের ভাষা ও সুর অশিক্ষিত মাধুর্যে সরস। এই গানের ভাষায় ও সুরে হিন্দু-মুসলমান মিশেছে, কোরান-পুরানে ঝগড়া বাঁধেনি।’ (মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন: হারামণি, ১ম খণ্ড। আশীর্বাদ, রবীন্দ্রনাথ।)

লোকধর্ম তার স্বাভাবিক উদারতা দিয়ে জগতের সকল মানবিক চেতনাকে অনায়াসে ধারণ করতে পারে। সেজন্যই লোকধর্মের এক অজ্ঞাত সাধক এই উঁচুমানের গানটি বাঁধতে পেরেছেন। উদ্ধৃত গানের কথায় যেমন করে ‘ঘোষপাড়ার সতীমা, বৃত্তিহুদার চরণ পাল, চুয়াডাঙ্গার ঘোলদাঁড়িয়ার পাঁচু শাহ, পাঁচলাখির যাদুবিন্দু, চাপড়ার কুবির গোসাঁই, ছেঁউড়িয়ার লালন ফকিরের প্রসঙ্গ এসেছে, তেমনই মাধবপুরের মসজিদ এবং শরিয়তপন্থী কেরামতউল্লাহ ও হুজুর মিয়ার নামও বাদ যায়নি। এমন উদারতা, এমন প্রসারিত মনের পরিচয় সম্ভবত লোকধর্মের বিস্তৃত প্রাঙ্গণেই পাওয়া যায়, যদিও তাঁরা তত্ত্বগতভাবে শরিয়তবিরোধী, প্রথা ও শাস্ত্র-বিরোধী।

আঠারো ও ঊনিশ শতকে অবিভক্ত বাংলার নদীয়া, যশোর, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমানের বিস্তৃত জনপদের বিভিন্ন অখ্যাত অজপাড়াগ্রামে যে সব উদার ও প্রথাবিরোধী মানবধর্মের উদ্ভব ঘটে তাদের মধ্যে সাহেবধনী ও ফকিরি ধর্ম অন্যতম। অর্থনেতিকভাবে বিপন্ন ও প্রান্তিক মানুষ যারা বড় ধর্মে আশ্রয় পায়নি, তারাই বাউল ও সাহেবধনীর মত লৌকিক গৌণধর্মে আশ্রয় গ্রহণ করে। সাহেবধনী সম্প্রদায়ের উদ্ভব নদীয়া জেলার শালিগ্রাম অঞ্চলের আঠারো শতকের গোড়ার দিকে চরণ পাল (জন্ম: ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দ) নামের এক সাধকের নেতৃত্বে। শাস্ত্র-মূর্তি-মন্ত্র ও বর্ণাশ্রম প্রথার বিরুদ্ধে দ্রোহী ধর্ম হিসেবে সাহেবধনী সম্প্রদায়ের আবির্ভাব। এ সম্প্রদায় এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। সাহেবধনীদের অস্তিত্ব ও উপস্থিতি জনসমাজে নেই বললেই চলে। তবে এদের গান বেঁচে আছে, আজও এ গান সাধু-দরবেশরা ভুলে যাননি। এ সম্প্রদায়ের অধিকাংশ গান বেঁধেছেন কুবির গোসাঁই। তিনিই এ সম্প্রদায়ের প্রধান ভাষ্যকার, বিশ্লেষক ও গীতিকার। হয়তো একদিন সাহেবধনী সম্প্রদায়ের কথা মানুষ ভুলে যাবে, কিন্তু কুবির গোসাঁই-এর বিশাল গানের জগৎ বেঁচে থাকবে। তিনি কেবল সাহেবধনী সম্প্রদায়ের জন্য গান রচনা করেননি, বাংলার লোকগানের ভাণ্ডারকেও সমৃদ্ধ করেছেন। শ্যামাসঙ্গীত বা শাক্ত গানে রামপ্রসাদ, বাউল গানে লালন শাহ, কবিগানে ভোলা ময়রা, কীর্তনে মধুকান, মারফতি গানে হাসন রাজা, ফকিরি গানে পাঞ্জুশাহ, কঠিন দেহতত্ত্বের গানে হাউড়ে গোসাঁই, কর্তাভজাদের গানে লালশশী এককভাবে ভাবুক-রসিকদের অনুমোদন পেয়েছেন যেভাবে, ওই একইভাবে সাহেবধনীদের গানে অবশ্য উচ্চার্য নাম কুবির গোসাঁই।

কুবির গোসাঁইয়ের সমসাময়িক বাউল লালন ফকিরের বাণী, গান, সাধনা, দর্শন এখন এত জনপ্রিয় যে, তা গ্রামীণ জনজীবনের গণ্ডি পেরিয়ে পশ্চিমা দুনিয়াতেও ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি তাঁর জীবৎকালেই বাংলার বিদ্বান সমাজের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর জীবৎকালে লালনগীতি ছাপার হরফে মুদ্রিত হয়েছিল। একালেও তাঁর বর্ণিল জীবন ও সঙ্গীতসাধনা নিয়ে দু’বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজে রয়েছে দারুণ কৌতূহল। তাঁকে নিয়ে নাটক, যাত্রাপালা রচিত হয়েছে, ফিচার, ফিল্ম ও ডকুমেন্টারিও নির্মিত হয়েছে। চৈত্রের দোলপূর্ণিমায় তাঁর সমাধি প্রাঙ্গণে নামে লাখো মানুষের ঢল। তিনি আর ব্রাত্য লালন নন, তিনি এখন সেরা কুড়ি বাঙালির একজন। রবীন্দ্রনাথ ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় (আশ্বিন-মাঘ ১৩২২ সংখ্যায়) ‘হারামণি’ বিভাগে কুড়িটি গান ছাপিয়ে যে লালনকে ভদ্রসমাজে পরিচয় করিয়ে দেন, তিনি দেশের গণ্ডি ছাপিয়ে বিশ্বের নানা দেশে পরিচিতি ও খ্যাতি অর্জন করেছেন। কিন্তু তাঁর সমসাময়িক অনেক সাধক-গীতিকার সেই পরিচিতি পাননি। যেমন, কুবির গোসাঁইকেও সেইভাবে আমরা চিনি না। এই সাধক ছিলেন একাধারে পদরচায়িতা, গায়ক, আধ্যাত্মিক সাধক এবং সাহেবধনী সম্প্রদায়ের ভাবাদর্শের বিশ্লেষক ও ভাষ্যকার। তাঁর শিষ্য যাদুবিন্দু (১৮২১-১৯১৯) পদকর্তা হিসেবে প্রসিদ্ধ ও পরিচিত। কুবির অনন্য প্রতিভার অধিকারী এক বিরলপ্রজ সাধক-কবি, তার পরও মরমীদের ভুবনে তিনি তেমন পরিচিত নন। তাঁর গানও তেমন গীত হয় না। কুবিরের গানের বাণী বেশ তত্ত্বভারাক্রান্ত, জটিল ও দুর্বোধ্য। তাঁর সাধনক্ষেত্র ও বসবাস ছিল দুর্গম পল্লি অঞ্চলে। সম্ভবত এসব কারণে উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের মতো সংগ্রাহকও কুবিরের গান সংগ্রহ করতে কোনও রকম কৌতূহল দেখাননি। যদিও তিনি তাঁর সুবৃহৎ গীতি সংকলনে কুবিরের ভণিতাযুক্ত যাদুবিন্দুর চারখানি গান সংগ্রহ করেছেন। এভাবেই ফোকলোরবিদ ও সংগ্রাহকদের উপেক্ষার কারণে কুবির লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গেছেন। লালনকে হয়তো ওই একই ভাগ্য বরণ করতে হত, যদি না রবীন্দ্রনাথ জমিদারি পরিচালনা করতে কুষ্টিয়া অঞ্চলে যেতেন। কুবিরের গানের সঙ্গে দু’বাংলার বিদ্বৎ সমাজের পরিচয় না থাকলেও সহজিয়া সাধকদের তাঁর গানের সাথে বেশ ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। অনেক সাধক বাউলই তাঁর নাম জানেন এবং তাঁর গানের মর্ম বোঝেন।

কুবির গোসাঁই বাসস্থান ও জন্মস্থান নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। চুয়াডাঙ্গার সাহেবধনী সম্প্রদায়ের সাধক শচীন্দ্রনাথ অধিকারী (১৯৩৮-২০০৫)-র মতে, তিনি চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গার জামজামি ইউনিয়নের মধুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করে। তাঁর আসল নাম কুবের সরকার। তাঁর পিতা-মাতার নাম জানা যায়নি। প্রথম-যৌবনে চরণ পালের নামডাক শুনে তিনি চাপড়া থানার বৃত্তিহুদা গ্রামে চলে আসেন এবং সেখানেই বসতি স্থাপন করেন। কুবিরের ভিটে ও সমাধি বৃত্তিহুদা গ্রামে রয়েছে। কুবিরের অন্যতম প্রধান শিষ্য বৃত্তিহুদা গ্রামের রামলাল ঘোষের খাতা থেকে জানা যায়, ‘কুবিরের জন্ম ১১৯৪ বঙ্গাব্দে ফাল্গুন পূর্ণিমায়, মৃত্যু ১২৮৬ বঙ্গাব্দের ১১ আষাঢ় মঙ্গলবার রাত চারদণ্ডের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীতিথির মধ্যে।’ (সুধীর চক্রবর্তী, ‘সাহেবধনী সম্প্রদায় তাদের গান’, রচনা সমগ্র। কলকাতা ২০১০, পৃ: ২৪)।

রামলাল ঘোষের খাতা থেকে কুবিরের জন্ম-মৃত্যু সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেলেও তাঁর জন্মস্থান কিংবা পৈতৃক নিবাস সম্পর্কে হদিস মেলে না। রামলালের খাতা থেকে আরও জানা যায়, কুবিরের স্ত্রীর নাম ছিল ভগবতী (মৃত্যু: ১২৯৭) এবং সাধনসঙ্গিনীর নাম কৃষ্ণমোহিনী (মৃত্যু: ১২৯৮)। বৃত্তিহদার পালবাড়ির খুব কাছে কুবিরের সমাধিমন্দিরের পাশেই তাঁর স্ত্রী ও সাধনসঙ্গিনীকে সমাহিত করা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, চরণ পালের জন্ম ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে, কুবিরের জন্ম ১৭৮৭ আর মৃত্যু ১৮৭৯, দুলাল চাঁদের জন্ম ১৭৮৭ আর মৃত্যু ১৮৩৩, সতীমার মৃত্যু ১৮৪৩ খ্রি. এবং ফকির লালন সাঁইয়ের জন্ম ১৭৭৪ আর মৃত্যু ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, কর্তাভজা, সাহেবধনী ও বাউল এই তিন লৌকিক সম্প্রদায়ের অভ্যুদয় আঠারো শতকের শেষপাদে এবং তিনটি ধর্মের প্রসার ক্ষেত্র অবিভক্ত নদীয়া জুড়ে। এছাড়াও বলরামী সম্প্রদায়ের প্রবর্তক বলরাম হাঁড়ির জন্ম ১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দ এবং মৃত্যু ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দ।

এখন প্রশ্ন হল যে, আঠারো শতকের শেষ দিকে নদীয়া জেলার বিস্তৃত জনপদে এতগুলো লৌকিক ধর্মমত উদ্ভবের কারণ কী? আর কেনই-বা কালের আবর্তে অধিকাংশ লৌকিক ধর্ম বিলুপ্ত হয়ে গেল? প্রশ্ন জাগে, এক সময় একদল বিদ্রোহী মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বিরুদ্ধে নির্মাণ করেছিলেন নিজেদের ধর্মবিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান, আবার কেনই-বা তাঁদের উত্তরপুরুষরা মাথা নত করল রাষ্ট্র সমর্থিত প্রথাগত ধর্মের প্রবল প্রতাপের কাছে?

আজকাল ছেঁউড়িয়ায় লালনকে নিয়ে বেশ মাতামাতি হচ্ছে, অন্যদিকে লালন অনুসারীরা গ্রামেগঞ্জে ক্রমশ প্রান্তিক অবস্থানে চলে যাচ্ছেন। কুষ্টিয়া, যশোর, পাবনার বিস্তৃত জনপদে এক সময় গড়ে উঠেছিল অসংখ্য আখড়া-আশ্রম যেগুলি অধিকাংশই নিষ্প্রভ অথবা বন্ধ হতে চলেছে। পরাক্রান্ত সমাজের প্রতিকূলতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে লালন একদিন ভোগবাদ আর সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের যে চেতনাসঞ্চার করতে চেয়েছিলেন সেই চেতনা আমরা ধরে রাখতে পারিনি। তাঁর দর্শনের নিগূঢ়তা আর জীবনপ্রত্যয়ের বলিষ্ঠতা বাউল সমাজ কিংবা বাঙালি সমাজ ও রাষ্ট্র খুব সামান্যই গ্রহণ করেছে। তাহলে এই লুম্পেন সমাজ, দুর্বৃত্ত কবলিত বাংলাদেশ কোন লালনকে নিয়ে মাতামাতি করছে? আর কেনই বা করছে? এই মাতামাতি কি কেবলই ভাঁড়ামি? কেবলই পুঁজিবাদী সমাজের কর্পোরেট স্বার্থরক্ষার জন্য? সত্যিই, লালন নানাভাবেই আমাদের শিক্ষিত নাগরিক সমাজের কাছে ব্রাত্য হয়েছিলেন। আজকাল যে লালনকে নিয়ে মাতামাতি করা হচ্ছে তিনি আসলে তথাকথিত গবেষক ও ধর্মব্যবসায়ীদের বানানো নকল লালন। এই বানানো নকল লালনের আধিপত্যে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে কুবির গোসাঁইয়ের মতো অনেক সাধকের নাম। লালনের সমসাময়িক এই সাধক তাঁর প্রয়াণের শতবর্ষ পার হতে না হতেই বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছেন। এই মহান সাধক বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেল কার দোষে? যার দোষেই হোক, লালনকে জানতে হলে কুবির গোসাঁইকেও জানতে হবে। কারণ তিনিও ছিলেন লালনের মতো যুগন্ধর সাধক ও মানবতাবাদী। তিনিও বলেছেন:

‘মানুষ হয়ে মানুষ মানো/ মানুষ হয়ে মানুষ জানো/ মানুষ হয়ে মানুষ চেনো/ মানুষ রতন ধন/ করো সেই মানুষের অন্বেষণ’।

বেদ-ব্রাহ্মণ, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বিরোধী সহজিয়া ও লৌকিক ধর্মের এই সাধক আরও বলেন:

‘হরিষষ্ঠী মনসা মাখাল/ মিছে কাঠের ছবি মাটির ঢিবি সাক্ষীগোপাল/ বস্তুহীন পাষাণে কেন মাথা কুটে মরো?/ মানুষে করো না ভেদাভেদ/ করো ধর্মযাজন মানুষ ভজন/ ছেড়ে দাও রে বেদ/ মানুষ সত্যতত্ত্ব জেনে/ মানুষের উদ্দেশ্যে ফের।’ অর্থাৎ, মানুষে মানুষে ভেদ নেই, মানুষ অমৃতের সন্তান। মাটির ঢিবি, মূর্তির মধ্যে ঈশ্বর নেই। বৈদিক শাস্ত্র পরিত্যাগ করতে হবে। হরিষষ্ঠী মনসা-মাখাল নয়, মানুষকে ঈশ্বরজ্ঞান করতে হবে।

লালনও একই কথা বলেছেন তাঁর এক গানে:

‘মানুষ তত্ত্ব সত্য হয় যার মনে
সেকি অন্য তত্ত্ব মানে?

লালনও ‘মাটির ঢিবি কাঠের ছবি’, দেবদেবতার পূজা-অর্চনার বিরোধিতা করেছেন। তিনি মানুষকেই সবার উপরে স্থান দিয়েছেন। লালন ও কুবিরের জীবনদর্শনের মধ্যে বেশ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। অনেকে অনুমান করেন, ‘লালনের সাধনভূমি কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া থেকে কুবিরের বৃত্তিহুদা সোজা স্থলপথেই যুক্ত ছিল। কাজেই লালনের গান যে বাউলদের সংলগ্ন থেকে কুবিরের কাছে একেবারে আসা অসম্ভব তা তো নয়।’ (সুধীর চক্রবর্তী, রচনাসমগ্র-১০২)

আসলে, লালন ও কবির দুজনেই ছিলেন অসাম্প্রদায়িক মানতাবাদের একনিষ্ঠ অনুগামী। ধর্মের লোকচারকে প্রত্যাখ্যান করে লালন বলিষ্ঠভাবে বলেছেন:

‘ফকিরি করবি ক্ষ্যাপা কোন রাগে
হিন্দু-মুসলমান দুইজন দুই ভাগে।
আছে বেহেস্তের আশায় মোমিনগণ
হিন্দু দিগের স্বর্গেতে মন।’

মরমীরা মানবতাবাদী হলেও কোনওভাবেই তাঁরা নিরীশ্বরবাদী নন। উদার সমন্বয়বাদী চিন্তা আয়ত্ত করে আত্মিক মুক্তি ও জগতের রহস্য খুঁজতে চেয়েছেন তাঁরা। লালন ও কুবির দুইজনই ছিলেন একই পথের যাত্রী। চমকে দেওয়ার মত অনুভূতি প্রকাশ করেছেন কুবির এক চমকপ্রদ অনুভবে:

‘একের সৃষ্টি সব পারি না পাকড়াতে।
আল্লা আলজিহ্বায় থাকেন আপন সুখে
কৃষ্ণ থাকেন টাকরাতে।’

লালন ও কুবির দুজনেই তাঁদের গানে ও জীবনচর্যায় হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি, ধর্মসমন্বয়ের কথা বলে গেছেন। ষোড়শ শতকে নদীয়ার পথে পথে চৈতন্যদেব যে মহামিলনের গান গেয়েছিলেন, লালন ও কুবির সেই ভাবনা আরও জনপ্রিয়, আরও বিস্তৃত করেন। তাঁরা দুজনেই মুক্তকণ্ঠে চৈতন্যদেবের প্রচারিত মতবাদকে উদারচিত্তে স্বীকার করে জাতপাত, জপতপ, তুলসীমালা প্রত্যাখ্যান করেন। চৈতন্য যেমন বেদ-পুরাণ অগ্রাহ্য করেছিলেন, লালন-কুবির একই পথ অনুসরণ করেন। লালন বলেন:

‘এনেছে এক নবীন আইন নদীয়াতে
বেদ পুরাণ সব দিচ্ছে দুষে
সেই আইনের বিচার মতে।’

লালন মনে করেন, সনাতন ধর্মমতে যে চারযুগের কথা বলা হয়েছে তার মাঝখানে চৈতন্যদেব এক নতুন যুগের প্রবর্তন করেন। এ যুগেই জাতগোত্রহীন মানবসমাজের উত্থান শুরু হয়। আর কুবির গোসাঁই তাঁর সমন্বয়বাদী ধর্মচেতনা ও দার্শনিক ভাবনা দিয়ে চৈতন্য ও যিশুখ্রিস্টকে একাকার করে এক আসনে বসিয়েছেন। লালন ও কুবিরের গানের ভাব, প্রকরণ, প্রতীক, প্রতিমা বিশ্লেষণ করলে বিস্ময়কর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। পলাশী যুদ্ধোত্তর অবক্ষয় ও বিপর্যয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে দুজনের বলিষ্ঠ ও সুস্থ জীবনপ্রত্যয় আমাদের বিস্মিত করে এবং বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে দুজনের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। কারণ দুজনেই একই কালসীমায় ও ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে জন্মগ্রহণ করেন।

অবশ্য লালন ছিলেন বাউল মতাবলম্বী এবং কুবির সহজিয়া সাহেবধনী। কিন্তু কোথায় যেন দুজনের ভাবুকতা ও দর্শনে সাধনা ও জীবনচর্যায় আশ্চর্য রকম মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এই দুই জীবনরসিক সাধক দুঃখ-সমুদ্র মন্থন করে আমাদের অমৃত দান করে গেছেন দুঃখ জাগানিয়া গান গেয়ে। লালন বলেছেন:

‘কারে বলব আমার মনের বেদনা
এমন ব্যথায় ব্যথিত মেলে না।’

আর কুবির বলেছেন:

‘দুঃখের দুখী পেলাম কই
দুটো মনের কথা কই।’

দুঃখজনক হলে সত্য যে, গবেষক ও পণ্ডিতমহলে কুবির গোসাঁই তেমন পরিচিত নন। রবীন্দ্রনাথ, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য, কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের মতো মানুষরা তাঁর গানের খোঁজ পাননি। অথচ এই সাধকের গান, বহু বর্ণিল জীবন নিয়ে গবেষণা হতে পারত কিংবা উপন্যাস রচনা করা যেত। বিখ্যাতদের মধ্যে কেবল রামকৃষ্ণদেবের নিকট কুবিরের ‘ডুবডুব রূপসাগরে আমার মন’ গানটি পৌঁছেছিল এবং শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতে এটি পাওয়া যায়।

লালনের মতো ১১৬ বছরের সুদীর্ঘ জীবন না পেলেও কুবির বেঁচেছিলেন দীর্ঘ ৯২ বছর। এই সুদীর্ঘ জীবনে জীবিকার তাগিদে নানা কাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছেন। প্রথম জীবনে যুগী এবং পরবর্তীতে কবিয়াল হিসেবে আসরে আসরে গান গেয়ে বেড়াতেন। ভোলা ময়রা, অ্যাটনি ফিরিঙ্গির মতো পেশাদার কবিয়াল হিসেবেও তাঁর খ্যাতি ছিল। তিনি একটি গানে বলেছেন:

‘আমার নাম কুবির কবিদার।
এই দেশে দেশে বেড়াচ্ছি করে রোজগার।’

বৃত্তিহুদার চরণ পালের কাছে দীক্ষাগ্রহণের পর তাঁকে কবিগান করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়েছে। কিন্তু এই ‘সন্ন্যাসী উদাসীন’ কবিয়াল সংসারে বসবাস করেও সংসারী হতে পারেননি। জাত-কুল ত্যাগ করে ‘সাধুর দ্বারে পাতড়া চাটা’ হয়ে থেকে গুরুর প্রতি নিষ্ঠা রেখে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। কুবির উচ্চ বংশজাত, প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত এলেমদার কেউ ছিলেন না। কিন্তু নানা ধর্ম বিশেষ করে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞান ছিল। মুসলমানদের সঙ্গে মেলামেশাও ছিল। সাহেবধনী ধর্মের নিগূঢ় তত্ত্ব জানতে গিয়ে ইসলামি তত্ত্ব ভালভাবে জেনেছিলেন। এসব কারণে স্বসমাজ কর্তৃক শূদ্র হিসেবে নিগৃহীত হন। গভীর ক্ষোভ নিয়ে তিনি একটি গানে বলেছেন:

‘মরি হায়রে আমি বুদ্ধিবিদ্যেহীন/ তাই ভেবে মরি রাত্রিদিন/ এই মুসলমানদের শাস্ত্র জেনে/ আমি শূদ্র হইলাম কী কারণে।’

এই জীবনরসিক মানুষটি বাস করতেন স্ত্রী ভগবতী আর সাধনসঙ্গিনী কৃষ্ণমোহিনীকে নিয়ে। মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন বহুদর্শী, নানা বিষয়ে অভিজ্ঞ, জীবনরসিক, স্বকালের বিশ্লেষক ও রূপকার। জাতে যুগী, পেশায় তাঁতি, জীবিকায় কবিয়াল আর ধর্মে সাহেবধনী দীক্ষিত কুবির ছিলেন অসাধারণ সৃষ্টিশীল প্রতিভার অধিকারী গীতিকার। তিনি যেমন পুরাণ প্রসঙ্গ নিয়ে গান বেঁধেছেন, তেমনি দেশকাল, সমাজ, শাসন-শোষণ নিয়েও গান রচনা করেছেন। গ্রামীণ অর্থনীতি, অভাব অনটন, দুঃখ-দারিদ্রের বাস্তব চিত্র তাঁর গানে প্রতিফলিত হয়েছে। সমাজতাত্ত্বিক কিংবা পণ্ডিতদের প্রশংসা কুড়ানোর জন্য নয়, চারপাশের পরিচিত জীবনকে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরার জন্য গান বাঁধতে ও গাইতে হয়েছে তাঁকে। আলকাপ-গম্ভীরাতে সমকালীন জীবনবাস্তবতার ছবি যেমন ধরা থাকে, কুবিরের গানেও এমন অনেক কিছু পাওয়া যায়। মরমী সাধক লালনও জীবৎকালে অনেক বিতর্কিত প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন গানে গানে। ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে’, গানটির মাধ্যমে লালন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কুবির সাহেবধনী মতবাদের বলিষ্ঠ অনুগামী ও ভাষ্যকার ছিলেন। কিন্তু এই মতবাদ তাঁকে উগ্র সাম্প্রদায়িক করে তোলেনি, বরং করেছে সমন্বয়বাদী। বাউলরা প্রতিবাদী হলেও তিনি ছিলেন সমন্বয়বাদী। লালন ও দুদ্দু শাহ ছিলেন প্রতিবাদী আর কুবির ছিলেন ভিক্ষাজীবী দরিদ্র নিঃসঙ্গ সাহেবধনী। কিন্তু মননে-উপলব্ধিতে এবং জীবনচর্যায় তাঁরা সবাই ছিলেন মানবিক অধ্যাত্মবাদে বিশ্বাসী ‘মানুষ সত্যের উপাসক’। প্রবৃত্তিসম্পন্ন পশুজীবনের চেয়ে মানবজীবন যে মহৎ, তা কুবির বারবার বলেছেন। তিনি গেয়েছেন: ‘মানুষ বৈ আর কিছু নাই’।

গীতিকার হিসেবে কুবির গোসাঁই ছিলেন অনন্য প্রতিভার অধিকারী এবং মানুষ হিসেবে বহুদর্শী ও অভিজ্ঞ। লালন সাঁই, পাঞ্জু শাহ, দুদ্দু শাহ, হাউড়ে গোসাঁই প্রমুখ সাধক গীতিকবিদের গানে বৈচিত্র্য কম। কিন্তু কুবিরের গানে তাঁত বোনা, চাষ করা, নৌকা বানানো, গ্রামীণ অর্থনীতি, আখ মাড়াই, গুড় তৈরি প্রভৃতির বিবরণ রয়েছে নানা রূপকে। তাঁর গান বিশ্লেষণ করলে সাধক কুবিরের যে মূর্তি প্রবলভাবে ফুটে ওঠে তা মানবিক। বিশেষ এক লোকধর্মের অনুসারী হয়েও তিনি ছিলেন সমকাললগ্ন ও যুগন্ধর পুরুষ। এজন্য বাংলা লৌকিক গানের ইতিহাস থেকে তাঁর নামটি মুছে ফেলা যাবে না। বিরানব্বই বছরের সুদীর্ঘ জীবন সংকীর্ণ গ্রামীণ পটভূমিতেই কেটেছে। সম্মান, খ্যাতি, সাধনাসিদ্ধি ও গান রচনা, সবদিক থেকেই সফল ছিলেন কুবির। মধ্যযুগে এক নিস্তরঙ্গ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেও কুবির যে অসামান্য প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তা রীতিমত বিস্ময়কর। রামমোহন, দেবেন্দ্রনাথ, কেশব সেনদের মতো মানুষের সান্নিধ্য না পেয়েও এই গ্রামীণ সাধক ছিলেন একজন সত্যিকারের স্বনির্মিত মানুষ। তাঁর গানের ভেতর আমরা যত প্রবেশ করি, ততই বিস্মিত হই মানুষটির সৃজননৈপুণ্য দেখে।

কালের বিবর্তনে সাহেবধনী সম্প্রদায়ের ভক্ত ও দীক্ষিতের সংখ্যা একেবারেই কমে গেছে। এরা অনেকেই খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছেন। একদিন হয়তো বিলীন হয়ে যাবে সাহেবধনী সম্প্রদায়। মাটিতে মিশে যাবে কুবির গোঁসাইয়ের সমাধিমন্দির। কিন্তু তাঁর গান বেঁচে থাকবে নদীয়া, যশোর, বর্ধমান, পাবনা অঞ্চলের অজপাড়াগ্রামের সাধক ও গায়কদের কণ্ঠে। কারণ, কুবিরের গানের বাণী ও সুরে লুকিয়ে আছে বাংলার সামাজিক ইতিহাসের একটি কালপর্ব এবং অবহেলিত-অবমানিত, মানহীন জনসম্প্রদায়ের সাধন-ভজন, আনন্দ-বেদনা, কান্না-হাসির মর্মকথা।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়
4.3 3 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »