Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

অগ্নিবীর: বন্দুকের মুখে ঈশ্বর

[গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অহিংস গান্ধীবাদীদের সশস্ত্র বিপ্লব]

বিশ্বাস ভেঙে পড়লে বিদ্রোহ জন্মায়
বিদ্রোহ জন্ম দেয় ইতিহাস

কিছু বিপ্লব আছে যেগুলো শুধু রাজনীতি নয়, মানুষের বিশ্বাসকেও কাঁপিয়ে দেয়। এই কাহিনি তেমনই এক প্রায় অশ্রুত সশস্ত্র সংগ্রামের। সেই বিদ্রোহে বন্দুকের নলের মুখে দাঁড়়িয়ে কাঁপছিল ঈশ্বরের অস্তিত্ব।

দক্ষিণ এশিয়ার পাহাড়ঘেরা ছোট্ট দেশ নেপাল। রাজতন্ত্রের কঠোর শাসনের অধীনে থাকা গণতন্ত্র তখন শুধু স্বপ্ন। কাগজে লেখা কিছু শব্দ মাত্র। সেই স্বপ্ন সফলের মুক্তিযুদ্ধে কেউ ভগবান-আল্লাহ বিশ্বাসী, কেউ সন্দেহপ্রবণ, কেউ ঈশ্বরের অস্তিত্বে প্রশ্ন তুলেছিলেন। পারস্পরিক এই দ্বন্দ্ব থাকলেও সবারই লক্ষ্য এক— মুক্তি।

এই গণসংগ্রামে অদ্ভুত দ্বন্দ্ব দেখা গেছিল— অহিংস গান্ধীবাদী তত্ত্বনির্ভর দল নেপালি কংগ্রেসের সমর্থক তরুণ-তরুণীরা অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। সশস্ত্র নেপালি গান্ধীবাদীরা রাজতন্ত্রের প্রাচীর নড়িয়েছিলেন। কখনও কখনও ইতিহাস এমন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, যার উত্তর শুধু প্রার্থনায় নয়, লড়াইয়েও খুঁজতে হয়। এই দ্বন্দ্ব বিশ্বাস এই কাহিনির মূল সুর। এই কাহিনি বিশ্বাস, দ্বন্দ্ব, সাহসের মধ্যে অভূতপূর্ব বিজয় কথা। প্রতিটি চরিত্র একেকটি প্রশ্ন। আর প্রতিটি প্রশ্নই ইতিহাসের দরজায় কড়া নাড়ে।

নবযুগ

চারপাশে চাক চাক মশা। সীমান্তঘেঁষা জনপদে যত রাত বাড়ে ততই মশার ঝাঁক, কেরোসিনের গন্ধ, আর রাজনৈতিক গুজবের গুঞ্জন বাড়ে। আকাশ ঘন মেঘে ঢেকে। গুমোট গরম। পাতা পর্যন্ত নড়ছে না। ঝড়ের আগে এমন হয়। আজ যেন প্রকৃতি নিজেও অপেক্ষায় আছে একটা বিস্ফোরণের, একটা নতুন ভোরের।

পুরনো কাঠের ঘরের ভিতরে কড়া পাহারায় এক গোপন বৈঠক বসেছে। কেরোসিন লণ্ঠনের চারপাশে বসে আছেন নেপালি কংগ্রেসের কয়েকজন তরুণ নেতা আর তাদের ভারতীয় বন্ধু— সোশ্যালিস্ট পার্টির কয়েকজন। সবার মুখে ঘামের চিকচিক, চোখে জেদ, আর কথায় ষড়যন্ত্রের রেশ। বাইরে কয়েকজন বন্দুকধারী পাহারা দিচ্ছেন।

সীমান্তের ওপার থেকে খবর এসেছে, রাজা ত্রিভুবন ভারতে পালাবেন। তার মন্ত্রী রানাশাহীর অনুগত সেনা যখন তখন বীরগঞ্জে গুলি চালাবে।

ঘরের ভেতরে একজন তরুণের কণ্ঠ শোনা গেল— আর কতদিন এই রাজাদের শাসন সহ্য করব? স্বাধীনতা চাই, গণতন্ত্র চাই, মানুষ যেন মানুষ হয়!

সেই তরুণের বয়স মাত্র পঁচিশ। মুখে অল্প দাড়ি, চোখে দগ্ধ দৃষ্টি। তার নাম মাধব প্রধান। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি নেপালি কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন। লক্ষ্য, নিজের দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। কিন্তু তার অন্তরে লুকিয়ে আছে আরেক জ্বালা— ঈশ্বর নিয়ে প্রশ্ন, বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের অন্তর্দ্বন্দ্ব।

মাধব হঠাৎ বলেন— সবাই বলে রাজা দেবতার প্রতিমূর্তি, তা হলে কেন দেবতার পায়ে আমরা দাসের মতো নত হই? যদি ঈশ্বর থাকেন, তবে কেন তিনি আমাদের দাসত্বে বেঁধে রেখেছেন?

ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে আসে। বিদ্রোহের সহযোগী ভারতীয় সমাজতন্ত্রী নেতাদের মুখেও দ্বন্দ্বের ছায়া। দলটির নেতা জয়প্রকাশও এই একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছেন। তিনি দেখলেন মাধবের অস্থির আঙুলগুলো রিভলভারের ওপর ঘোরাফেরা করছে। চোখ জ্বলছে।

প্রবীণ নেপালি কংগ্রেস নেতা পুষ্কররাম ধীরে ধীরে পান চিবিয়ে বলেন— মাধব, বিশ্বাস না থাকলে মানুষের সাহস টেকে না। ঈশ্বর নেই বললে, ন্যায়বিচারেরও কোনও মানে থাকে না।

মাধবের কণ্ঠ গম্ভীর— আমি ছোটবেলায় মন্দিরে গিয়েছিলাম, দেখেছি সেখানে সোনার থালা, গরিবের জন্য মাটির পাত্র। যদি ঈশ্বর থাকেন, তবে তিনি ন্যায়বিচার কেন করেন না? আর যদি না করেন, তবে তিনি ঈশ্বর নন, একজন নীরব দর্শক মাত্র।

মাধবের এসব কথায় কেঁপে গেলেন ইকবাল। শব্দগুলো সরাসরি এসে আঘাত করল তার বুকের ভেতর। তার বিশ্বাসের প্রাচীর দুলে উঠল। আজ, এই ঘরের অন্ধকারে, কেরোসিনের গন্ধে, আর বৃষ্টির আগের ভারী নীরবতায় তিনি বুঝতে পারলেন ঈমান শুধু শব্দ নয়, এক অন্তর্দহনও। মাধবের যুক্তিগুলো তার মস্তিষ্কে ঘুরতে লাগল— যদি সত্যিই ন্যায়বিচার না আসে, যদি আল্লাহ নীরব থাকেন, তবে তিনি কাকে ডাকেন? কাকে প্রার্থনা করেন?

ইকবালের বুকের ভেতর দুটো কণ্ঠ লড়াই করছে। এক কণ্ঠ বলছে— মাধব বিভ্রান্ত, ইমান হারিয়ো না। আরেক কণ্ঠ ফিসফিস করছে— যদি মাধব ঠিক হয়? তিনি অনুভব করলেন, তার ভেতরে যেন এক অন্ধকার নদী বইছে বিশ্বাসের তলদেশে সন্দেহের স্রোত। তার আঙুল অজান্তে বুকের পকেট ছুঁয়ে ফেলল— সেখানে ছোট্ট তসবিহ্। এখন তার মনে হল, তসবিহের দানাগুলো যেন ভারী পাথরের মতো। প্রতিটি দানা একেকটা প্রশ্ন।
মাধবের বাক্য যেন ছুরির মতো ফিরে এসে তাকে বিদ্ধ করছিল। ইকবালের কপালে ঘাম জমছে। চোখ বন্ধ করে তিনি দোয়া পড়তে চাইলেন, কিন্তু শব্দগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে। তার ঠোঁট কাঁপছিল— হে আল্লাহ, আমাকে হেদায়ত দান করো। আমি যেন বুঝতে পারি, আমরা কীসের জন্য লড়ছি— তোমার আদেশে, না মানুষের কষ্টে।

যুক্তির পরপর ছুরিকাঘাতে ইকবালের মনে বসে থাকা আল্লাহর অবস্থান টলমল করে উঠেছে। শৈশবে তীক্ষ্ণ শলাকায় অঙ্গচ্ছেদনের প্রবল যন্ত্রণায় অর্জিত ধর্মবিশ্বাসের প্রাচীর ভেঙে পড়তে চাইছে। ইকবাল ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললেন। তার মনে তখন বিশ্বাস ও যুক্তির সংঘর্ষ চলছে।

সোশ্যালিস্ট পার্টির গোপন সংগঠক ইকবাল আহমেদ বিহার ও উত্তর ভারত জুড়ে সাংগঠনিক কর্মক্ষেত্র দেখার দায়িত্বে আছেন। হাইকমান্ডের নির্দেশে তিনি বেশ কিছু বন্দুক নিয়ে গোপনে নেপালে ঢুকেছেন। গোপন বৈঠকে লণ্ঠনের আলোয় বন্দুকের নলগুলো চকচক করছে।

মাধবের মুখে ভয়াল হাসি। তিনি রিভলভারে হাত রেখে বললেন, ‘ন্যায়বিচার যদি ঈশ্বরের ওপর নির্ভর করে, তা হলে আমরা এখানে কী করছি? আমরা কি ঈশ্বরের অনুমতি নিয়ে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়ছি? রাজা ত্রিভুবনকে সরিয়ে দেব, ঠিক আছে, কিন্তু তারপর? নতুন রাজা, নতুন ঈশ্বর, নতুন দাসত্ব? আমাদের লড়াই কি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে, নাকি মানুষের নিজের অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে?’

বৃদ্ধ নেতা পুষ্কররাম কাশ্যপ গম্ভীর কণ্ঠে বলেন, তোমার কথা বিপজ্জনক, মাধব। ধর্ম ছাড়া মানুষের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। বিশ্বাসই মানুষকে স্থিতি দেয়।

মাধব সঙ্গে সঙ্গে বললেন, বিশ্বাস? বিশ্বাসই তো আমাদের বন্দি করে রেখেছে। আমরা রাজাকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে মানি। আর তাই তাকে প্রশ্ন করি না।

যুক্তির ধাক্কায় পুষ্কররাম চুপ করে যান। লণ্ঠনের আলোয় তার মুখের ভাঁজগুলো আরও গাঢ় দেখাচ্ছে। বাইরে দূর থেকে কুকুরের ঘেউ ঘেউ শোনা গেল— যেন সতর্কবার্তা।

ঘরের এক কোণে বসে আছেন কমলা দেবী। গোপন বৈঠকের একমাত্র নারী সদস্য। তিনি নরম গলায় বলে ওঠেন, বিশ্বাস আর অবিশ্বাস দুটোই মানুষের তৈরি। আমি শুধু জানি, আমাদের জীবনে অন্যায় আছে, দারিদ্র্য আছে, শোষণ আছে। ঈশ্বর থাকলে তিনিই দেখবেন, না থাকলে আমরাই দেখব। কিন্তু কিছু একটা বদলাতেই হবে।

তখনই প্রবল শব্দ— কড়াৎ! বাজ ফেটে পড়ল কোথাও। ঝড়ের সঙ্গে বৃষ্টি নামল।

আজকের বৈঠকের উদ্দেশ্য স্পষ্ট। বীরগঞ্জ থেকে কাঠমান্ডু পর্যন্ত রাজতন্ত্র-বিরোধী প্রচার শুরু আর গোপনে অস্ত্র পাঠানো হবে। মাধব মানচিত্রের উপর আঙুল রেখে বলেন, এই পথে বীরগঞ্জ থেকে বের হতে হবে। কিন্তু সর্বত্র রাজা ত্রিভুবনের গুপ্তচররা ঘোরাফেরা করছে। আমাদের পরিকল্পনা ফাঁস হলে, সব শেষ।

বৃদ্ধ পুষ্কররাম গম্ভীর স্বরে বলেন, মাধব, বিপ্লব মানেই ঝুঁকি। কিন্তু আমাদের এই লড়াই রাজাকে সরানোর জন্য।

Advertisement

মাধব নিচু গলায় বলেন, কিন্তু ঈশ্বরের দাসত্ব থেকে কে মুক্ত করবে?

পুষ্কররাম পান ফেলে বলে ওঠেন, তুমি কিন্তু ঈশ্বরকে অস্বীকার করলে বিপ্লবও অর্থহীন হয়ে পড়ে। কারণ মানুষের ন্যায়বোধ, ত্যাগ, আদর্শ সবই ঈশ্বরের ছায়া থেকে এসেছে।

মাধব তর্কে পিছিয়ে যান না। তিনি বলেন, আর যদি সেই ছায়া শুধু মানুষের মনের ভয় থেকে জন্ম নেয়? একজন কৃষক আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, বৃষ্টি দাও, প্রভু। বৃষ্টি এলে সে ভাবে— ঈশ্বর দয়ালু। না এলে বলে— ঈশ্বর রাগ করেছেন। কিন্তু বৃষ্টি আসে মেঘে, আর মেঘ আসে প্রকৃতিতে। যাকে ঈশ্বর বলা হয়, তা কি শুধু প্রকৃতিরই নাম নয়?

রক্তচক্ষু পুষ্কররাম টেবিল চাপড়ে ওঠেন, তুমি সাহেবদের বই পড়ে নাস্তিক হয়েছ, আমি জানি। কিন্তু মনে রেখো, ঈশ্বরকে অস্বীকার করে কেউ শান্তি পায়নি।

শান্তি চাই না— মাধব বলেন, আমি সত্য চাই। আর যদি সত্যের শেষে ঈশ্বর না থাকেন, তবু সত্যই আমার ধর্ম।

বাইরে তখন প্রবল ঝড়বৃষ্টি। ঘরের লন্ঠনের আলো মৃদু কাঁপছে। কমলা দেবী দেখছেন মাধবের জ্বলতে থাকা চোখ।

পুষ্কররাম কঠিন গলায় প্রশ্ন করলেন, তুমি ঈশ্বরকে মানো না, কিন্তু তবু দেখো, যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তুমি দাঁড়িয়েছ, তা তো ধর্মেরও মূল কথা। তুমি যদি সত্য খোঁজো, তবে তুমিই তো ঈশ্বরের কাজ করছ।

মাধবের ঠোঁটে মৃদু হাসি— তা হলে ঈশ্বর আমাদের মতোই বিভ্রান্ত। তিনি আছেন আবার নেই, ন্যায়বান আবার নীরব। আমি তাকে মানি না, কারণ তিনি নীরবতার রাজা আমরা তার চেয়ে ভাল শাসক চাই।

এই প্রশ্নের কেউ উত্তর দেন না। মানচিত্রে আঙুল রেখে পুষ্কররাম বলে ওঠেন, আমাদের কাজ রাজাকে সরানো। ঈশ্বরের বিচার পরে হবে। মাধব চুপ করে যান, কিন্তু তার চোখে ঝড় জমছে। তার মনে প্রশ্ন— ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টি করেছেন, না মানুষ ঈশ্বর সৃষ্টি করেছে? এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো বিপ্লব।

একটু পর, বৈঠক শেষ হয়। সবাই ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে যান। রাত তখন আরও গভীর। বৃষ্টি ধরে এসেছে। মাধব একা ঘরের ভেতরে। তার সামনে গীতা ও পুঁজি— দুটো বই পাশাপাশি রাখা— যেন দুই পৃথিবী। একটির বাণী— যুদ্ধ করো ধর্মের জন্য। আর অন্যটার বিশ্লেষণ— মানুষই নিজের মুক্তির কারিগর। মাধব দীর্ঘক্ষণ চেয়ে থাকেন বইদুটির দিকে।

মাধবের মনে প্রশ্নের পর প্রশ্নের আসতে শুরু করেছে— রাজা ত্রিভুবন বলেছেন, তিনি ঈশ্বরের বরপুত্র। এই বিশ্বাসই নেপালের রাজতন্ত্রের মেরুদণ্ড। যদি দেবতা না থাকেন, তবে এই রাজতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তিও ভেঙে পড়বে। তা হলে কি তার নাস্তিকতা-ই এক নতুন বিপ্লবের বীজ?

বাইরে হঠাৎ পায়ের শব্দ শুনে মাধব দরজার দিকে তাকান। এক তরুণ পাহারাদার ঢুকলেন। মুখে উৎকণ্ঠা। আগন্তুক বললেন— আজ রাতেই অভিযান শুরু করতে হবে।

যুক্তির জাল কেটে গেল। দ্রুত রিভলভারটা হাতে নিয়ে মাধব বেরিয়ে এলেন। বাইরে সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেউ বন্দুক পরিষ্কার করছেন, কেউ গামছায় মুড়িয়ে বোমার খোলস রাখছেন। কেউ কেউ প্রার্থনা করছেন।

মাধব দাঁড়িয়ে সবার দিকে তাকিয়ে বলেন— বন্ধুরা, আজ আমরা শুধু রাজাকে নয়, ভয়কে আঘাত করতে যাচ্ছি। ঈশ্বর থাকলে আমাদের সাথ দেবেন, না থাকলে ইতিহাস দেবে। কারণ মানুষই ইতিহাস রচনা করে।
হ্যারিকেনের আলোয় মাধবের মুখে অর্ধেক ছায়া, অর্ধেক আগুন।

কেউ চিৎকার করে ওঠেন— জয় গণতন্ত্র!

আরও কয়েকজন সাড়া দেন— জয় নেপাল!

সে রাতের বীরগঞ্জ— বিদ্রোহের আগ্নেয়গিরি।

নেপালি কংগ্রেসের সশস্ত্র দলটি অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। রাতের শেষে, যখন প্রথম ভোরের পাখি ডাকছে— তখন বীরগঞ্জ শহরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেল। শুরু হল গুলিবৃষ্টি। বীরগঞ্জবাসী দাঁড়ালেন ইতিহাসের মুখে।

সকালে কয়েকজন দেখলেন— ভেজা ধান জমির ধারে জল কাদার মধ্যে এক ছেঁড়া পাতা পড়ে আছে। তাতে লেখা— ঈশ্বর থাকলে তিনিই দেখবেন, না থাকলে আমরাই লিখব ইতিহাস।

নেপালি কংগ্রেস নেত্রী কমলা দেবী বলেছিলেন— ওটা মাধবের হাতের লেখা।

মাধবের খোঁজ মেলেনি।

কৈফিয়ত

১৯৫০ দশকে নেপালের রাজতন্ত্র ও রাজার মন্ত্রিগোষ্ঠী রানাশাহী শাসনের বিরুদ্ধে সফল সশস্ত্র বিদ্রোহ হয়েছিল। সেই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন অনেক ভারতীয়। তাঁদের মধ্যে অনেকে বাঙালি। নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সেই প্রথম সংঘর্ষ সে-দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত।

ভারত ও চীনের মধ্যে একফালি দেশ নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম সশস্ত্র ও নিরস্ত্র দুই পথ ধরে চলেছিল। ডান-বাম-অতিবাম— ত্রিমুখী রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতের চূড়ান্ত সফলতা আসে ২০০৮ সালে রাজার শাসনের অবসানে। নেপালে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়। সেই মহান মুক্তিযুদ্ধ দেশটিকে গণতন্ত্র উপহার দিলেও রাষ্ট্র পরিচালন ক্ষমতা দখলের জন্য রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকায় ক্ষোভের আগুন ধিকিধিকি করে জ্বলছিল। সেই আগুন ২০২৫ সালে আগ্মেয়গিরির লাভার মতো বেরিয়ে এসে দেশটির গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করেছে। এরপর হল নির্বাচন। দেখা গেল মূলধারার ঐতিহ্যবাহী ডান-বাম যে সব রাজনৈতিক দল এতদিন বারবার ক্ষমতা দখল করে আসছিল— তাদের অস্তিত্বকেই প্রায় নিশ্চিহ্ন করেছেন নেপালিরা। নতুন রাজনৈতিক দলের প্রতি তাদের সমর্থন।

এই রাজনৈতিক নবযুগের পরবর্তী সময় বিশেষ লক্ষণীয়। এই প্রেক্ষিতে আমরা ফিরে দেখলাম নেপালের প্রথম গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই। সবক’টি নাম বাস্তবের সঙ্গে মিলে গেলে— তা হবে নিতান্তই কাকতালীয়।

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × 3 =

Recent Posts

গৌতম চক্রবর্তী

ব্রিটিশ ছোটগল্প

আমি আগে থেকেই আমেরিকার পাখি বইটি সম্পর্কে জানতাম, কিন্তু কখনও বইটির সঙ্গে তেমনভাবে সময় কাটাইনি। ঠিক যেভাবে কেউ নদীর ধারে বসে সময় কাটায়। বাবার হাসপাতালের শয্যার পাশে বসে থাকতে থাকতে আমি যেন ধৈর্যের অর্থ শিখে নিয়েছিলাম। অপেক্ষা করতে শিখেছিলাম। এডি ঠিকই বলেছিল— আমিও মাছ ধরতে যেতে চাইছিলাম। জলের ধারে বসে থাকতে চাইছিলাম। কিন্তু বাবাকে দেখতে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও কাজে বাড়ি থেকে বেরোনো সম্ভব হয়নি। তাই আমি অডুবন-এর সরোবরসম বইয়ে আমার জাল ফেললাম।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের বিস্ফোরণ: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক নীরব পূর্বাভাস

পণ্যের এই ভয়াবহ সঞ্চালন সংকটে পড়ে পুঁজিপতিরা এখন আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তাই অবিক্রীত পণ্য গছিয়ে দেওয়ার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞাপনের প্রচার চালানো হচ্ছে। এই সুযোগেই বিশ্বজুড়ে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েশন’ বা আধেয় নির্মাণের এক নজিরবিহীন বিস্ফোরণ ঘটেছে। যখন বিশ্বের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ দু’বেলা অন্নসংস্থানে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ইন্টারনেটে ছোটখাটো ভিডিও প্রচার করে ক্রিয়েটররা বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন। এটি আসলে জমে যাওয়া শ্রম ও পণ্যের এক অস্বাভাবিক বণ্টন প্রক্রিয়া। যে পণ্যের রিভিউ করে একজন ক্রিয়েটর লাখ লাখ টাকা আয় করছেন, সেই পণ্যের প্রকৃত উৎপাদনকারী শ্রমিক হয়তো আজ কর্মহীন কিংবা নিম্নতম মজুরিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চন্দ্রাবতী: বঙ্গের প্রথম পদকর্ত্রী

চন্দ্রাবতীর জীবনের যেটি শ্রদ্ধেয় দিক, তা হল গরলকে অমৃতে পরিণত করা। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোককে কাটিয়ে উঠে একাগ্রতা নিয়ে পঠনপাঠন‌ ও সৃষ্টিকর্মে মন দেন। পিতাকে সহায়তা করেন কাব্যরচনায়। ১৫৭৫ নাগাদ, যখন চন্দ্রাবতীর বয়স মাত্র পঁচিশ, সেসময় তিনি পিতার লেখা মনসার ভাসান-এ সহযোগিতা করেছিলেন। তারপর একের পর এক নিজস্ব রচনায় ভাস্বর হয়ে থাকে তাঁর কারুবাসনা।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইসলাম

হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি ‌বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের‌ সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়‌ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।

Read More »
তপোমন ঘোষ

কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে…

হঠাৎ চোখ পড়ে বুথের এক্সিট দরজাটার দিকে… একটা ছোট্ট ছায়া ঘোরাফেরা করছে! চমকে উঠে সে দেখে, সেই বাচ্চাটা না! মায়ের কোলে চড়ে এসেছিল… মজা করে পোলিং অফিসার তার ছোট্ট আঙুলে লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভোটের কালি। হুড়োহুড়িতে মা ছিটকে গেছে কোথাও— নাকি আরও খারাপ কিছু! বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে তার। শুনশান বুথে পোলিং আর সেক্টর অফিসার গলা যথাসম্ভব নিচুতে রেখে ডাকতে থাকেন বাচ্চাটাকে। একটা মৃদু ফোঁপানি… একটা হালকা ‘মা মা’ ডাক— বাচ্চাটা এইসব অচেনা ডাকে ভ্রূক্ষেপও করে না, এলোমেলো পায়ে ঘুরতে থাকে।

Read More »