পূর্বকথা।।
শেষের ঘণ্টা বাজতে চলেছে প্রায় শতবর্ষী ২০২৬-এর বিশ্ব ফুটবল প্রতিযোগিতার। এ বছর মেক্সিকো, কানাডা ও আমেরিকা— এই তিন দেশে ব্যাপ্ত প্রতিযোগিতায় পৃথিবীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ, অর্থাৎ ৪৮টি দেশ যোগ দিয়েছিল। খ্রিস্টজন্মের দু’হাজার বছর আগে উদ্ভূত খেলাটি, যে খেলার ইতিহাসে আজটেকদের নাম প্রথম উঠে আসে। লাল বলটিকে তারা সূর্যের প্রতীক মনে করত। চীনে খেলাটি খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী থেকেই পরিচিত। চীনের কাছে এ খেলার নাম ‘কু জু’। ফিফা ফুটবলের এই চীনা ঐতিহ্যকে মান্যতা দেয়।
এ যুগে ইংল্যান্ডেই এ খেলার সূত্রপাত। ফিফা ১৯০৪-এ প্রতিষ্ঠিত। ১৯৩০ থেকে তারা এ খেলাটি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে, যে বছর প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপ খেলা অনুষ্ঠিত হয় উরুগুয়েতে। মোট তেরোটি দল খেলে সেবার। উরুগুয়ে খেলার সর্বপ্রথম চাম্পিয়ান।
তা এই বিশ্বকাপের সঙ্গে, বা এ খেলায় দুই বিখ্যাত প্রতিযোগী ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সঙ্গে বাঙালির যোগ কোথায়? তারা তো এ খেলার ত্রিসীমানায় এখনও পৌঁছতে পারেনি, তা হলে? পৌঁছতে পারেনি, তবে অতীব পরিতাপের বিষয়, খেলাটি নিয়ে বাঙালির উত্তেজনা তুঙ্গে। পরিতাপ এজন্যই, উগ্রতা তৈরি হয়েছে এতটাই যে, বাংলাদেশে দশ-বারোজনের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটেছে এজন্য। দুর্ঘটনায় মৃত্যু, হত্যা, আত্মহত্যা। কুমিল্লা, ঢাকা, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম ও অন্যত্র। এটা বাঞ্ছিত ছিল না। পৃথিবীর অন্য দেশেও যে হয়নি এমন নয়। হয়েছে। সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে মিশর হারায় শাকিয়া ও আলেকজান্দ্রিয়ায় হৃদরোগে মৃত্যু হয় দু’জনের। মারা গেছে স্পেন, মেক্সিকো, আমেরিকাতেও। আরও দুঃখজনক ঘটনা, এবারের খেলায় দক্ষিণ আফ্রিকার মিডফিল্ডার পঁচিশ বছরের জেইডেন এডামস গ্রুপ পর্বে তিনটে ম্যাচ খেলে হেরে গিয়ে দলের সঙ্গে দেশে ফেরার পর কেপটাউনে স্ট্রোকে মারা যান!
খেলা দেখা, কোনও দেশকে সমর্থন করার সঙ্গে সঙ্গে খেলোয়াড়-জনোচিত মনোভাব গড়ে না উঠলেই এমন দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
অথচ কী অসাধারণ শিক্ষাই না আমরা পেতে পারি, উৎসাহিত হয়ে পারি খেলোয়াড়দের থেকে! একটি উদাহরণ: প্রথম বিশ্বকাপে সোনাজয়ী উরুগুয়ে দলে ছিলেন হেক্টর কাস্ত্রো। তেরো বছর বয়সে মেশিনে তাঁর ডানহাত কাটা পড়েছিল। অদম্য উৎসাহে তিনি ফুটবল খেলেছেন, জাতীয় দলে স্থান করে নিয়েছেন, আর ফাইনালে জয়সূচক গোলটিও তাঁর-ই করা! তাঁর স্বদেশবাসী তাঁকে ডাকতেন— ‘এল ডিভিনো মানকো’, অর্থাৎ একহাত-বিশিষ্ট ঈশ্বর।
মধ্যকথন।।
এবার আসি আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও ও দুই বাঙালি প্রসঙ্গে। দুই বাঙালির সঙ্গেই ওই দুই দেশের যোগ ছিল। সমাপতন আবার, দু’জনেই জন্মেছিলেন এক-ই বছরে,—১৮৬১। আর দু’জনের প্রথম বিদেশ ভ্রমণ-ও ঘটনাচক্রে একই বছরে, ১৮৭৮-এ, তাঁদের সতেরো বছর বয়সে।
১৮৬১ শুনেই পাঠক ধরে ফেললেন তো, একজনের নাম রবীন্দ্রনাথ! হ্যাঁ, তিনি। অন্যজন সুরেশ বিশ্বাস। তিনি অতটা পরিচিত নন, তাই তাঁকে দিয়েই শুরু করি।
বাঙালি কোথায় না গেছে? রাজা রামমোহন রায়, তাঁর আগে মির্জা ইতিসামুদ্দীন বিলেত যান, চট্টগ্রামের বাঙালি জামোর (ক্রীতদাস। তাঁর বাঙালি নাম জানা যায় না) ফরাসি বিপ্লবে (১৭৮৯) রাজার বিরুদ্ধে যোগ দেন। সুরেশ বিশ্বাস তাঁদের-ই উত্তরসূরি। নদীয়ায় জন্ম, কলকাতার লন্ডন মিশনারি স্কুলে পড়াশোনা, সহসা জাহাজে চড়ে রেঙ্গুন, পরে চেন্নাই। অবশেষে ১৮৭৮-এ বিলেত। সার্কাসে কাজ, মদ, নারী ও জুয়ায় সর্বস্বান্ত। ফলে মুটেগিরি। বিলেতের গ্রামে গ্রামে ফেরিওয়ালা। এরপর জার্মানি। জার্মান মেয়ের সঙ্গে প্রেম। মেয়ের আত্মীয়রা চটিতং। ফলে সোজা আমেরিকায় পলায়ন। নাটককে হার মানায় তাঁর জীবন, তবে সত্য, গল্প নয় মোটেই। ব্রাজিল গিয়েছিলেন কখন? ধীরে।

আগে মেক্সিকো। সেখান থেকেই ব্রাজিল। বিলেতে কিছু পড়াশোনাও শেখেন। তাই দর্শন, গণিত, রসায়ন নিয়ে বক্তৃতা। আর সার্কাস। তিনি সিংহমামাকে পোষ মানাতে শেখেন জার্মানিতে, বিশ্বখ্যাত জামবাখের কাছে। চাকরি নিলেন ব্রাজিলের পশুশালায়।
কিন্তু এখানেই তিনি ফুরিয়ে গেলে বনফুল তাঁর উপন্যাস ‘বিশ্বাস মশাই’-তে কর্নেল সুরেশ বিশ্বাসকে আনতেন না, বা সত্যজিৎ রায় ‘ছিন্নমস্তার অভিশাপ’-এ। হ্যাঁ, ব্রাজিলে তিনি কর্নেল হন। আর তা হন ব্রাজিলিয়ান স্ত্রীর ইচ্ছেপূরণ করতে, কেননা স্ত্রী বলেছিলেন, সৈনিক বেশে মানাবে তাঁকে।
যোগ দিলেন সেনাবাহিনীতে। আর সেসময় ব্রাজিলের গৃহযুদ্ধে যোগ দিয়ে সাফল্যলাভ করলেন, হলেন কর্পোরাল থেকে কর্নেল। সেখানেই বাকি জীবন কাটে, মৃত্যুও সেখানেই। আজকের ব্রাজিল-সমর্থক ক’জন বাঙালি জানেন তাঁর সম্পর্কে? বাঙালির কি তাকে জানা উচিত নয়?
এখন আসি রবীন্দ্রনাথে। কবির সঙ্গে, কবিদের সঙ্গে যে ফুটবলের যোগ আছে, তার প্রমাণ কেবল রবিকবিতেই নয়, পাব এমনকী শেকসপিয়রেও! কৈশোরে পাড়ায় তিনি Mob football (ফুটবলের গ্রাম্য রূপ) খেলেছেন। কিং লিয়ার নাটকে (১/৪) কেন্ট অসওয়াল্ডকে ‘base football player বলে অপমান করেন। আবার ‘দি কমেডি অফ এররস’-এ ড্রোলিও বলের মতো লাঠি খাওয়ার রূপক ব্যবহার করেন এভাবে— ‘Am l so round of you as you with me/ That like a football you do—’।
রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে গড়লেন ‘বিশ্বভারতী একাদশ’, তুখোড় ফুটবল খেলত ছাত্রদল। কেবল কি তাই? সেখানকার ছাত্র সূর্য চক্রবর্তীকে ১৯২৪-এ ইস্টবেঙ্গলে ঢুকিয়ে দিলেন।
না, কবির আর্জেন্টিনা ভ্রমণের সঙ্গে ফুটবলের যোগ নেই, আছে ফিটনেসলেস-এর যোগ। পেরু যেতে গিয়ে অসুস্থতার ফেরে পড়ে তাঁকে নামতে হয় আর্জেন্টিনায়। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর আতিথ্যে সান ইসিদ্রোর হোটেল প্লাজায় তিনমাসের মতো অবস্থান কবির। প্লাতা (অর্থ: রূপা) নদীতীরে। কবি যেখানে, নদী তো থাকবেই! ওকাম্পোর সঙ্গে গভীর প্রণয়, যা ধরা আছে শঙ্খ ঘোষ, কেতকী কুশারী ডাইসনের লেখায়। কবি ৬৩, ওকাম্পো ৩৪।

ওকাম্পো কবির সঙ্গে পরিচয়ের আগেই তাঁর লেখা পড়েন। ইংরেজি, ফরাসি ও স্প্যানিশে। আন্দ্রে জিদের ফরাসি অনুবাদ তাঁকে অধিক মুগ্ধ করে। এখানে রবীন্দ্রনাথ ওকাম্পোর উৎসাহে ছবি আঁকার দিকে ঝোঁকেন। ১৯৩০-এ প্যারিসে কবির যে চিত্রপ্রদর্শনী হয়, তা মূলত ওকাম্পোর উদ্যোগেই।
গহনা বন্ধক রেখে তিনি কবির জন্য বাসা ভাড়া নেন। ফেরার সময় কবির সঙ্গে পাঠিয়ে দেন সোফাটি, যেটায় কবি বসতেন। কবি তাঁকে নাম দেন বিজয়া। উৎসর্গ করেন ‘পূরবী’ কাব্য।
আর ব্রাজিলেও গেছেন তিনি, যাত্রাপথে মাত্র একদিনের জন্য, রিও ডি জেনিরোতে। আর তার প্রভাব? বিশাল। তাঁর স্মরণে তাঁর জন্মশতবর্ষে ব্রাজিল ডাকটিকিট বের করেছিল। ডাকটিকিট আর্জেন্টিনাও প্রকাশ করে, কবির একশো বছর পূর্তিতে। আর ১৯৬৩-তে ‘এসকোলা মিউনিসিপ্যাল টেগোর’ নামে ব্রাজিলে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কবির ভাবনা অনুসারে সেখানে পাঠদান করা হয়। সাও পাওলোতে কবির নামে Rua Rabindranath Tagore নামে একটি রাস্তাও আছে। আর আর্জেন্টিনার বুয়েন্স এয়ারসেও আছে।
আমরা কি অতঃপর এই বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার মুহূর্তে খানিক সময় করে কর্নেল সুরেশ বিশ্বাস ও কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে একবার স্মরণ করতে পারি? আর সেইসঙ্গে চূড়ান্ত খেলার তিনদিন আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজ তথা বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার সদ্যপ্রয়াত স্যার গ্যারফিল্ড সোবার্সের জন্য শোক ও শ্রদ্ধা প্রকাশ? ব্রাজিলের বিখ্যাত পর্তুগিজ মহিলা-কবি কাসাসান্তা রবীন্দ্রনাথের কবিতা পর্তুগিজ ভাষায় অনুবাদ করেন। মেইরেলিস, আরেক কবি, যাঁর নাম দু’বার নোবেলের তালিকায় উঠেছিল, কবির সাহচর্যে আসেন। ১৯৫০-এ ভারতেও আসেন তিনি। উল্লেখ্য, ১৯৬১-তে রবীন্দ্রশতবার্ষিকীতে ওকাম্পোকে ভারতে আসতে আমন্ত্রণ জানায় বিশ্বভারতী। ওকাম্পো আসেননি, কেননা শান্তিনিকেতনকে তিনি ‘ধ্যানের ধন’ করেই রাখতে চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথকে নিয়মিত চিঠি লিখেছেন ওকাম্পো, ১৯৪০ সাল পর্যন্ত। সব চিঠিতেও শ্রদ্ধাবশত কবিকে তিনি সম্বোধন করে গিয়েছেন ‘গুরুদেব’ বলে।
আমাদের কথাটি ফুরোবার আগে একটি কৌতূহলী তথ্য জানাই। এবারের ফিফা বিশ্বকাপের চূড়ান্ত লড়াই হবে আর্জেন্টিনা আর স্পেনের বিরুদ্ধে। সেই স্পেন, যে দেশ আর্জেন্টিনাকে ১৫৩০ থেকে ১৮১৬— এই ২৮৬ বছর পর্যন্ত ঔপনিবেশিকতার আওতায় রেখেছিল। এ মাসেই, জুলাইয়ের নয় তারিখ আর্জেন্টিনার স্বাধীনতা তথা বিজয় দিবস গেল। সে কি পারবে আগামী ১৯-এ জুলাই তার অতীত ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে বিজয়ী হতে?
শেষকথা।।
যে জেতে জিতুক, আমরা যেন খেলোয়াড়ি মনোভাব বজায় রাখি। আর ২০৩০-এ ফিফা বিশ্বকাপের শতবর্ষ দেখার সুস্থ প্রতীক্ষায় থাকি।





