আধুনিক পৃথিবীর ইতিহাসে আমেরিকার স্বাধীনতা এক অত্যন্ত তাৎপর্যবাহী ঘটনা। ১৭৭৬ সালের ৪ঠা জুলাই মূলত টমাস জেফারসনের ‘Declaration of Independence’-এর ওপর ভিত্তি করে আমেরিকার স্বাধীনতার দর্শন গড়ে ওঠে। জেফারসন ও অন্যান্য সমসাময়িক স্বাধীনতা-আন্দোলনকারীরা ইয়োরোপের ‘Enlightenment’-এর মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন, যে মতাদর্শের অন্যতম প্রবক্তা ইংরেজ দার্শনিক জন লক। তাঁর ‘Two Treatises of Government’-এর মতে, প্রত্যেক মানুষ-ই জন্মগতভাবে স্বাধীন। তাই তার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার কারও নেই।
আমেরিকা ব্রিটিশের উপনিবেশে পরিণত হয় রানি এলিজাবেথের আমলে। তবে তা নিতান্তই প্রাথমিক পর্যায়, যখন স্যার ওয়াল্টার রেলে ১৫৮৫ সালে আমেরিকায় যান ও রানোকে দ্বীপ দখল করে তার নাম রাখেন তৎকালীন রানি প্রথম এলিজাবেথের নামে,– ভার্জিনিয়া। এলিজাবেথ চিরকুমারী, তাই ভার্জিনিয়া।
কিন্তু এই অভিযান শেষপর্যন্ত সফল হয়নি। ১৬০৭ থেকে ১৭৮৩ পর্যন্ত সময়কাল আমেরিকায় ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক রাজত্ব। আজকের দিনে যে আমেরিকা, তা কিন্তু পুরোটা ব্রিটিশদের দখলে ছিল না। ছিল ভার্জিনিয়া, ম্যাসাচুসেটস, নিউ ইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া-সহ ১৩টি রাজ্য। আর কানাডার বেশ কিছু অঞ্চল। আমেরিকার অন্যান্য স্থানে ফরাসি, ডাচ, নরওয়েজিয়, সুইডিস উপনিবেশ-ও ছিল। তাছাড়া রাশিয়া আমেরিকার আলাস্কা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত দখল করে। পরে সে আলাস্কা আমেরিকার কাছে বিক্রিও করে দেয়।
উপনিবেশের বিরুদ্ধে আমেরিকানদের প্রতিবাদের কারণ মূলত আমেরিকানদের ওপর ক্রমাগত কর বৃদ্ধি। পাল্টা দাবি তাদের, ‘No taxation without representation’। জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে এই কারণেই ব্রিটিশের বিরুদ্ধে শুরু হল লড়াই।
এর পশ্চাৎপটে অবশ্য আমেরিকার বুধজনদের অনুপ্রেরণা কম ভূমিকা রাখেনি। টমাস পেইন-রচিত ‘Common Sense’ এক যুগান্তকারী রচনা, যা আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলনকে গতিজাড্য দেয়। অনুরূপভাবে আইনজীবী এডামস-ও তাঁর অবদান রাখেন নিঃসন্দেহে। স্বাধীনতার প্রশ্নের সঙ্গে সংবিধানের যোগ সুনিবিড়। এক্ষেত্রে হ্যামিল্টনের ‘The Federalist Papers’ গুরুত্বপূর্ণ লেখা। তাছাড়া ছিলেন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, আইনজীবী ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এডামস, সংবিধানের অন্যতম স্থপতি জেমস ম্যাডিসন, যিনি দেখিয়েছিলেন, ক্ষমতার ভারসাম্য, ‘Checks and Balance’ ঠিক কীভাবে কাজ করে। এদের বলা হয় স্বাধীনতার অগ্রদূত, ‘Founding Father’s of United Sfates’।
স্বাধীনতার ঘোষণা হয়েছিল ৪ঠা জুলাই, ১৭৭৬-এ। কিন্তু আমেরিকা সে স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করে, ১৭৮৩-তে। জর্জ ওয়াশিংটনের দেশপ্রেম ও সৈন্যাধ্যক্ষ হিশেবে তাঁর সাফল্যই আমেরিকার স্বাধীনতা-অর্জনে কার্যকরী ভূমিকা নেয়। সে স্বাধীনতার ধারাবাহিকতায় ফরাসি বিপ্লব বিরাট অনুপ্রেরণা লাভ করে। রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণে কেবল ফ্রান্স নয়, ইয়োরোপের অন্যান্য দেশ-ও আদর্শগতভাবে প্রবুদ্ধ হয়েছিল এই স্বাধীনতা অর্জনের দ্বারা।
আজ আমেরিকা বিশ্বের উন্নত এক দেশ। তার পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে পৃথিবী বহুলাংশে চালিত। তার একথা অতএব মনে রাখা দরকার, যা আমেরিকার অন্য এক মহান রাষ্ট্রপতি তথা মনীষী আব্রাহাম লিঙ্কন সেদেশের দাসব্যবস্থা তুলতে গিয়ে বলেছিলেন, As l would not be a slave, so l would not be a master.






