‘নদীকে জিজ্ঞাসা করিতাম “তুমি কোথা হইতে আসিতেছ?” নদী উত্তর করিত “মহাদেবের জটা হইতে।” আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর বিখ্যাত বিজ্ঞান-প্রবন্ধ সংকলন ‘অব্যক্ত’-র ‘ভাগীরথীর উৎস-সন্ধানে’ প্রবন্ধের এই উক্তি প্রায় প্রতিটি বাঙালির কাছেই পরিচিতি।
ভারতের প্রায় সমস্ত প্রাচীন নগর সভ্যতা বা প্রকৃতির সঙ্গে জুড়ে আছে কোনও না কোনও পৌরাণিক বা মহাকাব্যিক গল্প। ঠিক কোন কারণে এই সংযোগ তা আমার জানা না থাকলেও এটুকু বলতে পারি যে, এই সব জায়গাগুলি ঘুরতে ঘুরতে এই গল্পগুলির একাধিক বিন্যাস যেমন দেখা যায়, ঠিক তেমনই এই গল্পগুলিকে মাঝে মাঝে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। গোদাবরীর উৎসস্থলের গল্পে শুধু রামায়ণের মহাকাব্যিক ধারাই নয়— যুক্ত আছে বিভিন্ন লোককথা, যা পরবর্তী কালে বারংবার যুক্ত হয়েছে একাধিক পৌরাণিক কাহিনিতে।
কোনও এক কালে সমস্ত ভারতই ছিল সুজলা-সুফলা। প্রকৃতি তাকে আপন হাতে সাজিয়েছিল পাহাড়-পর্বত, নদী-সাগর সব কিছু দিয়ে। সে সব আমরা কতটা রাখতে পেরেছি বা আদৌ রাখতে পারব কি না সে বিষয় নিয়ে এই লেখা নয়। এই লেখা ‘দক্ষিণের গঙ্গা’ গোদাবরী নিয়ে। গঙ্গার সঙ্গে সাযুজ্য রাখতেই যেন দক্ষিণ ভারতের এই বিশাল নদীর উৎপত্তিস্থলকেও গোমুখ বলা হয়। বেশ কয়েক বছর আগে দক্ষিণের গঙ্গার উৎপত্তিস্থল দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। এই গল্প সেই উৎসের সন্ধানেই।
ব্রহ্মগিরি থেকে উৎপত্তি হয়েছে গোদাবরীর। একে দেখতে গেলে যেতে হবে মহারাষ্ট্রের নাসিক জেলার ত্রিম্বকেশ্বর। এই ত্রিম্বকেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির ভারতের দ্বাদশ শিবলিঙ্গের অন্যতম বলে পরিচিত। কলকাতা, দিল্লি বা ভারতের একাধিক বড় শহর থেকে নাসিক যাওয়ার জন্য একাধিক ট্রেন তো আছেই, এছাড়া বিমান বা নিজস্ব গাড়িতেও যাওয়া যায়। আমার যাত্রাপথ যদিও কিঞ্চিৎ উদ্ভট ছিল, কারণ গেছিলাম জয়পুর থেকে। জয়পুর থেকে নাসিক যাওয়ার জন্য ট্রেন ধরতে যেতে হয়েছিল দেশের রাজধানী দিল্লিতে। দিল্লিতে সাধারণত নাসিকের ট্রেনগুলি নিজামুদ্দিন রেলস্টেশন থেকে ছাড়ে।
দেশের যে প্রান্ত থেকেই নাসিক পৌঁছন না কেন, সেখান থেকে ত্রিম্বকেশ্বর যেতে গেলে ভাড়া গাড়ি বা অটোতে যাওয়াই ভাল, এতে সময় তুলনামূলক কম লাগে। এছাড়াও শেয়ার গাড়ি বা বাসের ব্যবস্থা আছে এক্ষেত্রে খরচ কিঞ্চিৎ কম হবে।
এই পথ অনিন্দ্যসুন্দর, দু’ধারে ত্রিম্বকেশ্বর রেঞ্জের অপূর্ব সমাহার পথের সব ক্লান্তি দূর করবে। পথে যেতে যেতে যদি মন ‘চা চা’ করে, তা হলেও চিন্তার কিছু নেই। বঙ্গ জাতির মতন মারাঠিরাও চা-প্রিয় জাত, তাই লাল চা, লেবু চা কিংবা দুধ চা— যা চাইবেন পেয়ে যাবেন পথের ধারের চায়ের দোকানে। যদিও বর্তমান ‘বিকাশের’ জেরে সেই সব ছোট ও আন্তরিক চায়ের দোকানগুলো আর আছে কি না জানা নেই।
থাকার জায়গা বলতে অনলাইনে আগে থেকেই মন্দিরের কাছের কোনও হোটেল বুক করে নেওয়া ভাল। মন্দিরের কাছে বেশ কিছু ভাল আধুনিক সজ্জার হোটেল আছে, এর অধিকাংশই খুব প্রাচীন নয়। হোটেলের জানলা দিয়ে দেখা যাবে ব্রহ্মগিরি রেঞ্জের পাহাড়গুলি। কখনও সবুজ, কখনও বা ধূসর এই পাহাড়গুলি দেখতে দেখতে কোন সময়ে যে তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাবেন বোঝা দায়। এই প্রাচীন পাহাড় আধুনিক হোটেলে বসা মানুষদের দেখে হয়তো হাসে।
অন্যান্য কর্পোরেট ধর্মস্থানের তুলনায় এখানে ভিড় কিঞ্চিৎ কম (অন্তত আমি যে সময় গেছিলাম)। সে সময় এখানে কোনও ভিআইপি লাইন যেমন ছিল না, তেমনই এখানে মন্দির চত্বরের মধ্যে মোবাইল ফোন নিয়ে গেলেও কোনও সমস্যা হয় না। এই মন্দিরের মূল বৈশিষ্ট্য এর স্থাপত্যে নয়, মন্দিরের আরাধ্য দেবতার আকারে। মূলত জ্যোতির্লিঙ্গগুলি আমাদের চিরচেনা শিবলিঙ্গের আকারেই দেখতে হলেও এটি কিঞ্চিৎ আলাদা। এটি ত্রিমূর্তি বা ত্রিদেব (ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের) একত্র প্রতীক। আসলে শিবলিঙ্গতে যে গৌরীপট্ট থাকে, এখানে সেই পট্টটি আছে মাঝখানে, কোনও লিঙ্গ নেই, তিন দিকে তিনটি মুখ মতন আছে। তিন ঈশ্বরের জায়গা বলেই সম্ভবত জায়গাটির নাম ত্রিম্বকেশ্বর।
এই শিবলিঙ্গের ওপরে সারা বছর একটি পঞ্চমুখী সালাঙ্করা মুকুট পরানো থাকে। লক্ষ্য করার মতন বিষয় এই যে, এক রাজস্থানের পুষ্কর ছাড়া সারা ভারতের অন্য কোথাও ব্রহ্মার মন্দির নেই বা পুজো হয় না। সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ত্রিম্বক। একক ভাবে না হলেও এটি ভারতের আর-একটি ব্রহ্মা মন্দিরও। সম্ভবত এই অঞ্চলে ভারতীয় প্রাচীন অনার্য সভ্যতা ও আর্য সভ্যতার এক মেলবন্ধনের প্রতীক হিসেবেই মন্দিরের এই রূপ।
আগেই বলেছি, ভারতের একাধিক জায়গার সঙ্গে জুড়ে আছে পুরাণ আর মহাকাব্যের অসংখ্য গল্প। ত্রিম্বকেশ্বরও তার থেকে আলাদা নয়। লোকগাথা অনুসারে, এই মন্দির নির্মাণ করেন পঞ্চপাণ্ডবরা। তবে ইতিহাসের পাতা বলে যে, এই মূল মন্দিরটি পেশোয়াদের সময়ে বালাজি বাজিরাও বানিয়েছিলেন। মূলত এই অঞ্চলের অনেক কিছুই পেশোয়া আমলে নির্মিত।
মন্দির আর মন্দিরের গল্পে একটু থেমে একবার ঘুরে আসা যাক ব্রহ্মগিরি ট্রেকের পথে। এই পথও অবশ্যই পুরাণ আর মহাকাব্যিক গল্পে মোড়া। মূল মন্দিরের পেছনে যে পাহাড়টি দেখা যায়, সেটিই ব্রহ্মগিরি, যা কিনা গোদাবরীর উৎসস্থল। মূল পাহাড়ে যাওয়ার জন্য পুরো রাস্তাটাই হাতে সময় থাকলে হেঁটে যাওয়া যায়। তবে আমার হাতে কিঞ্চিৎ সময় কম থাকায় পাহাড়ে যতদূর পর্যন্ত অটো যায়, সেটুকু পথ অটোতে করে গেছিলাম। তবে বাকি পথ সবটাই পঞ্চ ইন্দ্রিয় আর পায়ের ভরসায়।
পথের সাথি, যিনি আপনাকে পথের গল্পের সঙ্গে জীবনের গল্প শোনাবেন, মানে গাইড, তাকে পাবেন ঠিক এই জায়গা থেকেই। এই গাইডরা বেশিরভাগই সরকারের কাছ থেকে ট্রেনিং ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত— তাই চিন্তার কিছু নেই। এই পথে হাঁটার সময় নিজের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানীয়জল রাখা ভাল, যদিও পথের মধ্যে জল বা শরবতের দোকান আছে। তবে পাহাড়ে ওঠার আগে তেমন দোকানের সংখ্যা খুব কম, তাই হাল্কা খাবার আর পানীয়জল সঙ্গে রাখাই ভাল।
এই পথে হাঁটা শুরু আগেই প্রথমে দেখা পাবেন এক গোমুখের। আদতে একে গোদাবরী নদীর জলস্রোতের প্রথম ওপেন মুখ বলা যায়। গোমুখ ও ডান দিকে বেশ কিছুটা এগিয়ে আছে শিবমন্দির। কথিত আছে, এই শিবমন্দির দেবী অহল্যা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ঋষি গৌতম ও তাঁর স্ত্রী দেবী অহল্যাকে নিয়ে এখানে বেশ কিছু লোকগল্প প্রচলিত আছে।
এই শিবমন্দিরে একটি পাথরের টিলার নীচে (কিছুটা ছোট গুহার মতন) ভেতরে ছোটবড় বেশ কিছু শিবলিঙ্গ দেখা যায়। এই গুহার মধ্যে যদি প্রবেশ করতে পারেন, তবে তা ভাল করে দেখা যায়। কারণ গুহাটি আকারে বেশ ছোট, ভেতরে সোজা হয়ে দাঁড়ানো সম্ভব না। কথিত আছে, এই মন্দিরটি ঋষি গৌতমের স্ত্রী দেবী অহল্যা প্রতিষ্ঠিত। যদিও রামায়ণে বর্ণিত গল্প অনুসারে অহল্যার পাথর হয়ে যাওয়া ও রামের পাদস্পর্শে আবার নিজরূপ ফিরে পাওয়ার গল্পটি বেশি প্রচলিত। তবে গোদাবরীর উৎসস্থলে পৌরাণিক ঋষি গৌতম ও তাঁর স্ত্রী অহল্যার একাধিক অন্য গল্পও প্রচলিত আছে। ওই যে আগেই বলেছি, ভারতভ্রমণ মানে শুধু প্রকৃতি বা ইতিহাস নয়, পুরাণের গল্পগুলিকেও ছুঁয়ে দেখা যেন। কিছু কিছু জায়গা স্রেফ স্থানমাহাত্ম্যেই সম্ভবত সে সবকে যুক্তি দিয়ে বিচার না করে শুনে যাওয়াই শ্রেয়।
এই গোমুখকে ডানদিকে রেখে আমরা এগিয়ে যাব সোজা ব্রহ্মগিরির দিকে। এই পথে হাঁটার জন্য হাতে লাঠি রাখা ভাল, কারণ শুধু যে হাঁটার সুবিধা হবে তাই নয়, কিষ্কিন্ধ্যাকুমাররা থাকলে তারাও সহজে কোলে চেপে পড়তে পারবে না। এই পথে এগিয়ে যেতে যেতে দেখতে পাবেন ব্রহ্মগিরি পর্বতের অপার সৌন্দর্য। এক সময়ে এই পথে যে সুগভীর জঙ্গল ছিল, তা আজও স্পষ্ট। পথের মাঝে ইংরেজ আমলের তৈরি কিছু ভগ্নপ্রায় বিশ্রামাগার দেখা যাবে। বেশ কিছুটা পথ অতিক্রম করার পরে এই পথে প্রায় ৮০০টি মতন সিঁড়ি পার করতে হয়। কথিত আছে, পাথরের তৈরি এই সিঁড়িগুলি পেশোয়া আমলে তৈরি হয়েছিল। কিছু সিঁড়ির উচ্চতা বেশ বেশি আর কিছু সিঁড়ি মাঝারি।
ব্রহ্মগিরির প্রায় ২ ঘণ্টার এই ট্রেক-পথে এই সিঁড়ি বেয়ে উঠতে যত না কষ্ট হয়, নামার সময়ে কষ্ট বেশি হয়। কথিত আছে, এই সিঁড়ি দিয়ে পেশোয়ারা ঘোড়ায় চড়ে যেতেন। ঘোড়া যেত কি না জানি না, তবে আধুনিক মানুষের হাঁটুতে কিঞ্চিৎ ব্যথা হতে পারে এ বিষয়ে নিশ্চিত। কষ্ট না করলে কেষ্ট যেমন মেলে না, তেমনই এই সিঁড়ি অতিক্রম না করলে গোদাবরীর উৎসে যাওয়া সম্ভব নয়।
সিঁড়ি পেরিয়ে ওপরে গেলে বেশ কিছুটা অঞ্চল হাঁটতে কষ্ট হয় না, এখানেও বিশ্রামের জন্য বেশ কিছু ছোট দোকান ও জলসত্র আছে। এই পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে ছোট কিছু জলাধার দেখা যায়, এক সময়ে সেগুলি ব্যবহার করা হলেও এখন যে অব্যবহৃত। আরও বেশ কিছুটা পথ অতিক্রান্ত করে এবার ব্রহ্মগিরির ঢালু দিকে নামতে হয়। এই ঢালু পথে নেমে দুই এক্সট্রিম পয়েন্টে দু’টি মন্দির দেখা যায়, এই দুই মন্দিরই আসলে নদীর উৎসের দু’টি দিক। তবে এই দুই মন্দিরে প্রবেশের আগে এই পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত ত্রিম্বকেশ্বরের আর একটি ছোট মন্দির আছে, সেখানে যাওয়া যাক।
এই মন্দিরটিও নীচের মন্দিরের মতন বৈশিষ্ট্যযুক্ত, তবে এখানে শিবলিঙ্গে কোনও মুকুট পরিয়ে রাখা হয় না। এই মন্দিরে ভিড় প্রায় থাকে না তাই প্রাচীন এই মন্দির হাতে সময় নিয়ে ভাল করে দেখা যায়। এখানেও গোদাবরীর জল দৃশ্যমান। অনেক স্থানীয়ের মতে, এটিই আসল ত্রিম্বকেশ্বর মন্দির, নীচের মন্দিরটি অনেক পরে সবার সুবিধার জন্য নির্মিত।
এই শিবমন্দিরের ঠিক পেছনেই অবস্থিত গঙ্গামন্দির (যে দু’টি মন্দিরের কথা একটু আগেই বলা হয়েছে)। এই মন্দিরের সামনে কোনও জলাধার দেখতে পাওয়া না গেলেও যদি একটু খেয়াল করা যায় তবে দেখা যাবে, মন্দিরের কাছে কিছুটা নীচের দিকে পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত শীতল জলস্রোত। এই জায়গাটিকে গৌতম কুণ্ডও বলা হয়। কথিত আছে, এই অঞ্চলেই ঋষি গৌতমের আশ্রম ছিল।
স্থানীয় গল্প অনুসারে, ব্রহ্মগিরি পর্বতে সস্ত্রীক বাস করতেন ঋষি গৌতম। তাঁদের দানধ্যান, পূজা-অর্চনায় জায়গাটি সুন্দর ও পবিত্র হয়ে ওঠে। কিন্তু অন্য ঋষিরা তাঁর তপোবল ও নিষ্ঠায় ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন ও সেখানে অসুস্থ একটি গরুকে পাঠান। গরুটি সেখানে মারা গেলে বাকিরা পশুহত্যার পাপে ঋষি গৌতমকে অপরাধী সাব্যস্ত করলে তিনি মহাদেবকে স্মরণ করে তপস্যায় বসেন। তাঁর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে মহাদেব দেবী গঙ্গাকে (গোদাবরী) সেখানে অবতীর্ণ হতে বলেন।
এই কুণ্ড থেকে সোজা বেশ কিছুটা ডান দিক ধরে হেঁটে গেলে অপর মন্দিরটি মহাদেবের জটার মন্দির বলে পরিচিত। এখানে পাহাড়ের খাঁজে ক্ষীণ জলধারা দেখা যায়। পাহাড়ের এই খাঁজটি মহাদেবের জটার ঝাপটা থেকে তৈরি বলে স্থানীয় বিশ্বাস।
গোদাবরী নদীর উৎস ব্রহ্মগিরি পাহাড়ে হলেও নদীকে পূর্ণ মাত্রায় দেখা যায় নাসিকে। এই নাসিকের নামকরণের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে ভারতের মহাকাব্য ‘রামায়ণ’-এর গল্প।
গঙ্গার মর্ত্যে আগমন নিয়ে যেমন ভগীরথের গল্প, তেমনই গোদাবরীর উৎসস্থলে না এলে জানা যেত না, দক্ষিণের গঙ্গা নিয়েও আছে হাজার গল্প। যে গল্প জানাবে আজও এই অঞ্চলের মানুষ অনেক সময়েই কাছাকাছি আর কোনও পানীয়জল না পেয়ে কষ্ট করে হলেও এই উৎসস্থলে এসেই শীতল এই পানীয়জল নিয়ে যান নিজেদের কাজের জন্য। গঙ্গা বা অন্য নদী সে শুধু ধার্মিক আবেগের কারণে পবিত্র না, হাজার প্রাণীর ‘তৃষ্ণা’ মেটাবার জন্য সে হয়ে ওঠে ‘দেবী’ বা ‘পবিত্র’। সে পথে মিশে যায় হাজার গল্প-কষ্ট কিংবা দিনযাপনের চরম বাস্তবতা। তবু সুবিশাল এই প্রকৃতির সামনে আদতে মানবসমাজ যে কত অসহায়, সে কথা মানুষ বুঝেও বোঝে না।
ব্রহ্মগিরির গোমুখে গোদাবরীর উৎস দেখে বারংবার মনে হয়, এই রুক্ষ পাহাড়ের মধ্যে এমন শীতল জলধারা কেমন করে আসে? এখানে তো কোনও গ্লেসিয়ারও নেই। না আছে অন্য কোনও নদী। তবে? পাথরের বুক চিরে এমন ভাবে জলের স্রোত? প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের এ কোন মিশেল? মাঝে মাঝে মনে হয়, প্রকৃতিকে বাঁচানোর জন্যই কি একাধিক পৌরাণিক গল্পের রচনা? মহাকাব্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া, যাতে মানুষ ভয়ে ও ভক্তিতে এদের ক্ষতি না করে? তবু ভাবনা হয়, ভাবতে ভাবতে মনে হয় যে, প্রকৃতি আদতে প্রতি পদে মানুষের জন্য ভালবাসার ডালি উজাড় করে দিয়েছে। খাদ্য, পানীয়, দরকারি খনিজ— সব কিছু। অপ্রতুল সে সাম্রাজ্য পেয়ে মানুষ ধীরে ধীরে প্রকৃতি থেকেই দূরে চলে যাচ্ছে না তো?
চিত্র: লেখক




