শ্রাবণ বর্ষণের মাস, ধারাসার নেমে আসবার লগ্ন। একদিকে বৃষ্টিস্নাত প্রকৃতি ঝিলমিলিয়ে ওঠে, অন্য দিকে ফসলের অভ্যুদয়ে ভরে ওঠে দিগন্ত।
কিন্তু এই শ্রাবণের কাছে বাঙালি নতজানু, কুণ্ঠিত ও আকুল হয় বিধাতার নিষ্ঠুর প্রকল্পে। কেন, না এই শ্রাবণ কেড়ে নিয়েছে কত না বাঙালি মনীষাকে! তালিকায় আছেন শ্রীরামকৃষ্ণ, বাংলায় সর্বপ্রথম কোরানশরীফ-অনুবাদক ভাই গিরিশচন্দ্র সেন, কাজী নজরুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, উত্তমকুমার প্রমুখ। বিদেশি বেশ কিছু প্রতিভার অন্তিম দেখেছে শ্রাবণ তথা আগস্ট,— ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল (মৃত্যু ১৩.০৮.১৯১০), হেরমান হেসে (০৯.০৮.১৯৬২), চন্দ্রাভিযাত্রী নীল আর্মস্ট্রং (২৬.০৮.২০১২.)। তা ছাড়া ০৬.০৮.১৯৪৫ ও ০৯.০৮.১৯৪৫ তো চিরস্থায়ীভাবে চিহ্নিত হয়ে আছে হিরোশিমা-নাগাসাকির মহামৃত্যুর বেদনার্ততায়। আর ১৯৪৭-এ কান্নাহাসির দোলদোলানো উপমহাদেশের স্বাধীনতা ও দেশভাগ! সে তো এ যুগের এক সুখদুঃখের মহাকাব্য, যা অধ্যায়ের পর করুণ মর্শিয়ার অধ্যায় লেখা হয়ে চলছে অদ্যাপি। সবশেষে আগস্টের পাঁচ! ইতিহাসে এক নবজাতক এল বাংলাদেশের, জুলাই বিপ্লব যার ডাকনাম।
তবে শ্রাবণ বাঙালিকে আকুল, আপ্লুত, আবেগতাড়িত, বিধুর ও বেদনার্ত করে এক বিশ্বখ্যাত বাঙালির মহাপরিনির্বাণের কারণে,— কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ। মহাপরিনির্বাণ, এই বিশেষ শব্দটি বুদ্ধদেবের মহাপ্রয়াণকে বোঝাতেই যে একমাত্র ব্যবহৃত হয় তা নয়, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু যিনি দেশের স্বাধীনতা আনয়নের জন্য বিদেশে পাড়ি দিয়ে আর ফেরেননি, সেটি বোঝাতেও ব্যবহৃত হতে দেখি। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও শব্দটি ব্যবহার করায় অসুবিধে নেই। রবীন্দ্রনাথ, প্রসঙ্গত, জন্মেছিলেন শাক্যমুনির জন্মমাস বৈশাখেই।
কবির মৃত্যু হয় বাংলা ১৩৪৮ সনের ২২-এ শ্রাবণ। খ্রিস্টাব্দ ১৯৪১, ৭ আগস্ট, বৃহস্পতিবার। নিঃসন্দেহে বাঙালি তথা ভারতীয় তথা সমগ্র বিশ্বের কাছেই দিনটি শোক ও পরম বেদনার। তবে সান্ত্বনা এই যে, তাঁর মৃত্যু পরিপূর্ণ বয়সেই হয়েছিল।
আমরা রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদিবস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখি, তাঁর সুদীর্ঘ আশি বছরের জীবনে তাঁকে কী বিপুল মৃত্যুশোক সহ্য করতে হয়েছিল, মৃত্যুকে তিনি ঠিক কোন দৃষ্টিতে দেখতেন, আর নিজে কতবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলেন।
চোদ্দো বছর বয়সে মাতৃহারা হন তিনি। তারপর একে একে তাঁকে দেখতে হয়েছে কত না আত্মীয়বিয়োগ! মেজমেয়ে রেণুকার মৃত্যু হয় বারো বছর বয়সে, ছেলে শমীর তেরোতে। আর-এক মেয়ে বেলার মৃত্যু একত্রিশ বছর বয়সে। স্ত্রী মৃণালিনী মারা যান মাত্র উনত্রিশ বছরে। বৌদি কাদম্বিনীর মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল মাত্রই ছাব্বিশ।
‘মরণ রে, তুহু মম শ্যাম সমান’, সত্যিই তাই। নইলে বালক শমীর মৃত্যুও কবিকে বিচলিত করেনি, ভাবা যায়? কাদম্বিনী দত্তকে এক চিঠিতে কবি লেখেন, ‘ঈশ্বর আমাকে বেদনা দিয়াছেন, কিন্তু তিনি তো আমাকে পরিত্যাগ করেন নাই—, তিনি হরণ-ও করিয়াছেন, পূরণ-ও করিবেন। আমি শোক করিব না।’
ঈশ্বর কেবল তাঁর পুত্রকন্যাকে হরণ করেই ক্ষান্ত হননি, আগ্রাসী হাত বাড়িয়েছেন ভ্রাতুষ্পুত্র নীতীন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ ও সুরেন্দ্রনাথেও! ‘আরো আঘাত সইবে আমার’ লেখেন যিনি, সেই কবির দৌহিত্র, কন্যা মীরার জার্মান-প্রবাসী আঠারো বছর বয়সি ছেলে নীতীন্দ্রনাথকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে পরীক্ষা করতে চাইলেন ঈশ্বর (আগে যে নীতীন্দ্রনাথের কথা বলা হয়েছে, তিনি কবির জ্যেষ্ঠাগ্রজ দ্বিজেন্দ্রনাথের পুত্র)। আরও এক পৌত্র, দিনেন্দ্রনাথের মৃত্যুও দেখতে হয়েছিল তাঁকে। এইভাবে মৃত্যুর মহামিছিলের পথ ধরেই যেন নিজ মৃত্যুর সম্ভাব্যতাকে ধীরে ধীরে হৃদ্গত করে নিচ্ছিলেন তিনি।
কেবল কি আত্মীয়ের মৃত্যু? কত পরিজন আর স্নেহাস্পদের অকালমৃত্যুই না দেখতে হয়েছে তাঁকে! নিজের শোককে সংহত করে মৃত্যুশয্যায় পাশে যেতে হয়েছে সুকুমার রায়, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, রজনীকান্ত সেনের! জেনেছেন অনুজ ও অকালপ্রয়াত সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অজিত চক্রবর্তী, দীনবন্ধু এন্ড্রুজ, পিয়ারসন, বিবেকানন্দ, নিবেদিতা প্রমুখের প্রয়াণ!
‘দুঃখের আঁধার রাত্রি বারেবারে/ এসেছে আমার দ্বারে;/ একমাত্র অস্ত্র তার দেখেছিনু/ কষ্টের বিকৃত ভান, ত্রাসের বিকট ভঙ্গী যত।’ এ কবিতা তাঁর বিদায় নেবার সামান্য ক’দিন আগের লেখা। শান্তিনিকেতন থেকে বিদায় নিয়ে আসার সময় দেখেন, নতুন লাইটপোস্ট বসছে সেখানে। তাই দেখে কবির বেদনার্ত উক্তি, ‘এখন বুঝি পুরনো আলো নিভে গিয়ে নতুন আলো আসবে?’ অনুভব করতে পারছেন, এটা তাঁর চিরবিদায়, আর ফিরবেন না তাঁর ‘সব হতে আপন’ আশ্রমে। অশ্রুপাত ঢাকতে চোখে পরে নিয়েছেন সানগ্লাস। অন্যান্যদের সঙ্গে আশ্রমের ডাক্তার শচীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় দাঁড়িয়েছিলেন কবিকে শেষ বিদায় জানাতে। কবি তাঁর হাত ধরে বললেন, ‘আমার আশ্রম রইলো, আর আমার আশ্রমবাসীরা রইলেন। তাদের তুমি দেখো।’
কবির শেষ ক’দিনের ইতিবৃত্ত লিখে রেখে গেছেন তার পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী ‘নির্বাণ’ গ্রন্থে। আর লিখেছেন নির্মলকুমারী মহলানবীশ, ‘বাইশে শ্রাবণ’-এ। আর তার বিস্তারিত বিবরণ আছে আনন্দবাজার পত্রিকার সে সময়কার প্রতিদিনের পাতায়।
তাঁর মৃত্যু কিন্তু হতে পারত অনতিচল্লিশে, জলে ডুবে। সে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা ‘ছিন্নপত্রাবলী’-র একটি চিঠিতে আছে। তিনি তখন গোরাই-বক্ষে। বোটের পাল তোলা, ঝড়ের জন্য। হঠাৎ মাস্তুল আটকে গেল গোরাইয়ের ব্রিজে। প্রবল নদী স্রোত নৌকোকে ধাক্কা মারছিল। অন্য দিকে ব্রিজে আটকানো মাস্তুল টেনে ধরে রেখেছে তাকে। মাস্তুল ফেলছে। এ অবস্থায় কবি নদীতে পড়ে গেলেন। ভেসেই যেতেন প্রবল স্রোতে। কিন্তু দৈব অনুকূল, তাই দূর থেকে দ্রুত ছুটে আসা এক নৌকো এসে তাঁকে উদ্ধার করে। না হলে তাঁর প্রিয় কবি শেলির মতোই সলিলসমাধি হত তাঁর-ও।
উল্লেখ্য, অন্য এক ইংরেজ লেখক ভার্জিনিয়া উলফ নদীতে ডুবে মারা গিয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর বছরেই। তবে এটি ছিল আত্মহত্যা।
রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’
আরও একবার মৃত্যু হাতছানি দিয়ে গিয়েছিল তাঁকে। কবির বয়স তখন ছিয়াত্তর। হঠাৎ এরিসিপেলেস-এ (Erysipelas) ত্বকের উপরিভাগে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ। এখন এ রোগ অ্যান্টিবায়োটিকে সহজেই সারে। তখন তার প্রতিষেধক পেনিসিলিন আবিষ্কৃত হয়নি) আক্রান্ত হয়ে প্রায় পঞ্চাশ ঘণ্টা অজ্ঞান অবস্থায় কাটাতে হয়েছিল। কবি তখন শান্তিনিকেতনে। কলকাতা থেকে দ্রুত ছুটে এলেন ডাক্তার নীলরতন সরকার, সঙ্গে আরও চার ডাক্তার। মুহুর্মুহু টেলিগ্রাফ আসছে দেশ-বিদেশের নানা প্রান্ত থেকে, কবি কেমন আছেন এই উৎকণ্ঠিত প্রশ্ন নিয়ে। গান্ধী উদ্বিগ্ন, নেহরুও। দিনরাত সেবা, ডাক্তারদের রাত জেগে পরিচর্যায় অবশেষে জ্ঞান ফিরে পেলেন কবি। সুস্থ হয়ে ফের লেখালেখি। বেরোল ‘সেঁজুতি’, উৎসর্গ করলেন প্রাণদাতা ডা. নীলরতনকে। সেই সময়েই শুনতে হল তাঁর এক সখার মৃত্যুবার্তা,— আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু।
সেবার ফাড়া কাটল তো ১৯৪০-এ ফের! এবার কালিম্পংয়ে। সেবারেও রক্ষাকর্তা নীলরতন। কিন্তু নীলরতন পারেননি ১৯৪১-এ। তীব্র আপত্তি ছিল তাঁর কবির শরীরকে শল্যবিদ্ধ করতে। কিন্তু ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় বললেন, নান্যঃ পন্থা। হল অস্ত্রোপচার। প্রাথমিকভাবে সামলে উঠলেও পরিস্থিতি প্রতিকূল হতে শুরু করল। অবশেষে এল বাইশে শ্রাবণ।
সেদিন বৃষ্টি ধুয়ে দিয়েছিল শহর কলকাতাকে।
বাইশে শ্রাবণ প্রতিবছর ফিরে ফিরে আসে, আর শ্রাবণের ধারার মতো অশ্রুসিক্ত করে তোলে বাঙালির মন। রোদনভরা এই শ্রাবণ আমাদের মনের ভেতর যেন বিদ্যাপতির কাব্যের হাহাকার তোলে,— ‘এ ভরা বাদর,—শূন্য মন্দির মোর’! বাঙালির চিরসখা, তার দুঃখসুখের সাথি, কবিগুরুর প্রয়াণ এই তারিখটিতেই যে!
‘তুমি শুধু পঁচিশে বৈশাখ, আর বাইশে শ্রাবণ?’— প্রশ্ন ছিল কবি বিষ্ণু দে-র। আজ আমরা জানি, না, তিনি প্রতিদিনের, চিরদিনের পরম ধন। আশি বছরের পরমায়ু আর হাজার বছরের কর্মযজ্ঞ দিয়ে তিনি কেবল বাঙালিকেই নয়, বিশ্বসভ্যতাকেই সমৃদ্ধ করে গেছেন। যতদিন মানবসভ্যতা থাকবে, থাকবেন তিনিও। আর বাঙালির কাছে তার মূল্য? মানুষ অক্সিজেন ছাড়া বাঁচতে পারে না। বাঙালির লাগে, অনন্তকাল ধরেই বাঁচার জন্য লাগবেও, অক্সিজেন ছাড়াও, রবীন্দ্রনাথ।
বাংলা ১৩৪৮ সন বা খ্রিস্টাব্দ ১৯৪১ দেশি-বিদেশি কম মনীষীর প্রয়াণ দেখেনি। সে বছরেই মারা গেছেন ব্রতচারী আন্দোলনের রূপকার ও যশস্বী লেখক-প্রশাসক গুরুসদয় দত্ত (১০.০৫.১৮৮২- ২৫.০৬.১৯৪১), অভিনেত্রী-কবি বিনোদিনী দাসী (১৮৬২- ১২.০২.১৯৪১), কবির জন্ম ও মৃত্যু, এ দুই-ই দেখেছেন যিনি, সেই তাঁর মেজবৌঠান জ্ঞানদানন্দিনী দেবী (২৬.০৬.১৮৫০-০১.১০.১৯৪১), বর্ধমান রাজ বিজয়চাঁদ মহতাব (১৯.১০.১৮৮১-১৮.১০.১৯৪১), বিখ্যাত চিত্রশিল্পী অমৃতা শেরগিল, প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের চিত্রপ্রদর্শনী দেখে যিনি মন্তব্য করেছিলেন, এসব ছবিতে শিল্পবার্তা রয়েছে (৩০.০১.১৯১৩- ডিসেম্বর ১৯৪১), ফরাসি দার্শনিক, কবির পরিচিত অরি বের্গসন (১৮.১০.১৮৫৯-০১.০৪.১৯৪১), ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক ভার্জিনিয়া উলফ (২৫.০১.১৮৮২-২৮.০৩.১৯৪১, স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি তাঁর, আত্মহত্যা করেন তিনি)। তবু, এঁদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুকেই ‘মহাগুরুনিপাত’ বলে মানতে হবে।
জোড়াসাঁকোয় জন্মেছিলেন কবি। আশি বছর তিনমাসের জীবন মন্থন-শেষে ফের সম্-এ এসে সেই ছ’নম্বর জোড়াসাঁকোর বাড়িটিতেই অন্তিম নিশ্বাসটি নিলেন। এক সুচারু কাব্যের পরিসমাপ্তি যেন, বা সঙ্গীতের স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও আভোগ-এর নৈষ্ঠিক পরিণাম। তাঁর শেষযাত্রা বেতারে (lndian Broadcastng Corporation) প্রচারিত হচ্ছে, নলিনীকান্ত সরকার প্রতি পনেরো মিনিট অন্তর ফোনে খবর পাঠান, আর বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র বেতারে তা প্রচার করেন, ‘ওপারে দূরের ওই নীলাকাশের অস্তগামী সূর্য শেষ বিদায়ের ক্ষণে পশ্চিম দিগন্তে ছড়িয়ে দিল রক্তিম আভা, আর এপারে—’, না, তার আগে এপারের ক্লান্ত যাত্রা শেষ করে কবির ওপারে যাওয়ার বেশবাস নিয়ে বলি। নন্দলাল বসুর নকশায় তৈরি কাঠের পালঙ্কে সোনালি বুটিদার চাদরে শোয়ানো হয় কবির নশ্বর দেহ। পুত্রবধূ প্রতিমা কবির পায়ে নিবেদন করেন চাঁপা ফুল। এর আগে রানী চন্দ, কবির ‘ছোট রানী’, শেষবেলায় কবি নিজের হাতে লিখতে অসমর্থ হওয়ায় অনুলিখন করতেন যিনি, তাঁকে পরিয়ে দিয়েছেন সাদা বেনারসির জোড়-কোচানো ধুতি, গরদের পাঞ্জাবি। গলার নীচ থেকে পা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে ঝোলানো পাটকরা চাদর। গলায় গোড়ে মালা আর চন্দনচর্চিত কপাল। কবির পালঙ্কের দু’পাশে সাদা পদ্মের অভিজাত সম্ভার। আহা পদ্ম! এই ফুলটি-ই যে ছিল তাঁর কবিতা ও গানে সবচেয়ে বেশিবার ব্যবহৃত ফুল, বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে যেমন বীণা। সে কি তিনি বাস্তবিক আর ব্যঞ্জিত, উভয়ার্থেই সারদাতনয় বলে? বুকের ওপরেও কি তাই রেখে দেওয়া হয়েছে একটি পদ্মকোরক? ‘রাজবেশে রাজা ঘুমোচ্ছেন রাজশয্যায়’, এহেন উপলব্ধি রানী চন্দের।
আর এসময় কবির ‘বড় রানী’, অর্থাৎ নির্মলকুমারী মহলানবীশ কী করছিলেন? কবির জীবনের শেষ দিনগুলোর কথা আছে কবি যাঁকে সবচেয়ে বেশি চিঠি লিখেছিলেন, পাঁচশোর ওপর, আর উৎসর্গ করেন ‘পথে ও পথের প্রান্তে’ ও ‘শ্যামলী’, সেই নির্মলকুমারীর ‘বাইশে শ্রাবণ’ বইতে। মৃত্যুর বেশ কিছুদিন আগে থেকেই তিনি কবির পরিচর্যায়। কবি ঠাট্টা করে তাঁকে ‘হেডনার্স’ বলে ডাকতেন। তিনি একটি বেদনাদায়ক কথা লিখে গেছেন। মৃত কবিকে শেষবারের জন্য স্নান করানো হচ্ছে, সেসময় স্নানঘরের দরজা ভেঙে জনতার উৎপাত! ঐতিহাসিক তপন রায়চৌধুরী কবির অন্ত্যেষ্টি সৎকারের যাবতীয় নোংরামো দেখে সাধে কি আর মন্তব্য করেছিলেন, দিনটা ছিল জাতীয় লজ্জার? অবস্থা বিপাকে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ পিতার মুখাগ্নি পর্যন্ত করতে পারেননি। কবি চেয়েছিলেন তাঁর শেষশয্যা হবে শান্তিনিকেতনে। বেদনার কথা, তা হয়নি।
‘প্রতিটা সাহিত্যিকের একই দিনে পিতৃবিয়োগ ঘটলো’, বাইশে শ্রাবণ নিয়ে প্রতিভা বসুর উপলব্ধি। বুদ্ধদেব বসু একবার কলেজে যান (তখন রিপন কলেজে পড়াতেন), ফের জোড়াসাঁকোয়। লীলা মজুমদার চকিতের মধ্যে এসে দেখে যান যখন, কবিকে দেখে মনে হচ্ছে, ‘মুখের দিকে আশ্চর্য হয়ে চেয়ে রইলাম। কি সুন্দর, কি শান্ত— তিনি চলে গেছেন!’
সেদিন কবিকে নিয়ে অসভ্যতার চূড়ান্ত করা হয়েছিল, যা প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় আছে। জোড়াসাঁকো থেকে নিমতলা শ্মশানঘাট— এই মাত্র দু’কিলোমিটার পথ অগণন উচ্ছৃঙ্খল মানুষের কাঁধে চেপে পাড়ি দিতে হয়েছিল কবিকে। সত্যজিৎ রায়ের তথ্যচিত্র সেসব বীভৎসতা এড়িয়ে গেছে। অন্য দিকে মৃণাল সেন, যিনি সেদিন শ্মশানঘাটে ছিলেন, অন্য এক মর্মান্তিক দৃশ্যের সাক্ষী। সেদিন এক মৃত শিশুপুত্রের বাবা শিশুকোলে শ্মশানে ঢুকছিলেন। জনতার ভিড় তাঁকে তো ঢুকতে দেয়ইনি, তাঁর ক্রোড়চ্যুত মৃত শিশুটি মানুষের পদপিষ্ট হয়ে হয়ে কিমায় পরিণত হয়ে গিয়েছিল!
বাইশে শ্রাবণ তাই নানান বিধুরতার কোলাজ। দিনটি আবার নাটকীয়ভাবেই কবির প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্র অবনীন্দ্রনাথের জন্মদিন। বৈশাখ যেমন কবির জন্মমাস, ও যুগপৎ তাঁর প্রিয় নতুন বৌঠান কাদম্বরীদেবীর মৃত্যুমাস আবার! অবনীন্দ্রনাথের কি মনে পড়ছিল, সেদিনটিও ছিল এমনি রাখীপূর্ণিমা তিথি, বঙ্গভঙ্গের ক্রান্তিকালে খালি-পায়ে রাস্তায় নেমে নাখোদা মসজিদে গিয়ে মুসলমানদের হাতে সম্প্রীতির রাখী পরানো হয়েছিল সেইদিন? আর তার আগে গঙ্গায় স্নান। আজ রবিকা ছাই হয়ে সেই গঙ্গায় মিশবেন! (যদিও কবির চিতাভস্ম শান্তিনিকেতনে নিয়ে ছাতিমতলায় রাখা হয়)।
প্রত্যক্ষদর্শীদের অন্যতম বিভূতিভূষণ, যাঁর ‘পথের পাঁচালী’-কে কবি ‘পরিচয়’ পত্রিকায় সমালোচনা করে উচ্চমূল্য দিয়ে গেছেন। ছিলেন একদা রবীন্দ্র-বিদ্বেষী ও পরে তাঁর অনুরাগী সজনীকান্ত দাস, কবির অপারেশন-পরবর্তী সময় থেকে, যেমন জীবনানন্দ-দ্বেষী তিনিই আবার জীবনানন্দের দুর্ঘটনা-পরবর্তীতে আমৃত্যু তাঁর শুশ্রূষায় ছিলেন। বিভূতিভূষণ, সেসময় কলকাতায় স্কুলশিক্ষক, সেনেট হলের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে শবযাত্রা দেখেন, ‘পরলোকগত মহামানবের মুখখানি একবার মাত্র দেখবার সুযোগ পেলুম সেনেটের সামনে। তারপর ট্রেনে চলে এলুম বনগাঁ।’ একটি পদ্মফুল কুড়িয়ে নেন। তারপর চলে যান নিজগৃহ বনগাঁ, আর সেই ফুলটি স্ত্রী রমাকে দেন স্মৃতিরূপে রেখে দিতে। ডায়েরিতে এসব লিখে রেখেছিলেন তিনি।
ডায়েরি না, চাক্ষুষ দেখার অভিজ্ঞতাও ছিল না তাঁদের, তবু নানান স্মৃতিচারণায় শঙ্খ ঘোষ, শামসুর রাহমান, অলোকরঞ্জন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দিনটি নিয়ে লিখেছেন। নজরুল রাতারাতি গান লিখে, সুর দিয়ে, কলকাতা বেতারে প্রচার করলেন, ‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত কবিরে, জাগায়ো না জাগায়ো না/ সারা জীবন যে আলো দিল ডেকে তাঁর ঘুম ভাঙায়ো না!’ আর লেখেন কবিতা, ‘রবিহারা’। পনেরো বছরের সুকান্ত-ও সেদিন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কবিতা পড়েছিলেন।
কবির শেষ কদিনের ইতিবৃত্ত,— ২৫ জুলাই শেষবারের মতো শান্তিনিকেতন ছেড়ে জোড়াসাঁকোয় এলেন। তিরিশে জুলাই অপারেশন হল তাঁর। অবস্থা স্থিতিশীলতা থেকে দুরূহ হয়ে দাঁড়ালে সাতই আগস্ট অক্সিজেন দিতে হয় সকাল নয়টায়। দুপুর বারোটা দশ মিনিটে প্রয়াত হলেন কবি। দুপুর তিনটেয় কবির মরদেহ যাত্রা করল অন্তিমক্রিয়ার জন্য। সন্ধ্যায় জাহাজ শেষ, আর এখন ‘সমুখে শান্তিপারাবার, ভাসাও তরণী হে কর্ণধার!’
‘মৃত্যু না থাকলে জীবনের কোনও মানে নেই— এই জীবন-মরণের খেলা দিয়েই জীবন সত্য হয়ে উঠেছে’, লিখেছিলেন তিনি। সদ্য পুত্রহারা কবির কন্যা মীরাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজ পুত্রের মৃত্যুজনোচিত অনুভূতি তিনি ব্যক্ত করছেন এভাবে, ‘শমী যে রাত্রে গেল তার পরের রাত্রে রেলে আসতে আসতে দেখলাম জ্যোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্ছে, কোথাও কিছু কম পড়েছে বলে তার লক্ষণ নেই। মন বললে কম পড়েনি— সমস্তের মধ্যে সব-ই রয়ে গেছে, আমিও তারই মধ্যে।’
ঠাকুরবাড়িতে কৃতী বুধজনের অভাব নেই। কিন্তু সবার ওপরে তিনি। তেমনই নিমতলা ঘাটে শেষকৃত্য হয়েছে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শঙ্খ ঘোষ, এমনকী বিদ্যাসাগরের-ও। কিন্তু না, পাবক রবীন্দ্রনাথের চেয়ে আর কোনও বড়ো প্রতিভাকে অগ্নিস্নাত করতে পারেনি! ‘—লেলিহান অগ্নিশিখায় পঞ্চভূতে বিলীন হল এক মহাপ্রাণের পূত-পবিত্র শরীর, রবি গেল অস্তাচলে’, বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কণ্ঠ সেদিন এভাবেই ইথারে ভেসে এসেছিল।
অঝোর বৃষ্টিস্নাত দিন ছিল সেদিন।








One Response
কী গভীর বেদনার এই যাওয়া! কখনো কি ভোলা যাবে রবীন্দ্রনাথকে? স্মৃতিতাড়িত বাঙালির হৃদয়ে তিনি থেকে যাবেন। বিগ্রহটি সেই একই রকম চন্দনচর্চিত, কমলশোভিত। বীণা কেবল বেজে চলেছে অসীমে। 🙏 লেখাটি মনে থাকবে।