Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

অজানা বিভূতিভূষণ

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১২.০৯.১৮৯৪—০১.১১.১৯৫০) বিশ শতকের এক অন্যতম প্রধান ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্প লেখক। মাত্র ছাপ্পান্ন বছরের জীবনে তিনি বাংলা সাহিত্যে চিরায়ত অবদান রেখে গিয়েছেন। রবীন্দ্র যুগের দ্বিতীয়ার্ধে জন্মেছেন তিনি, শরৎচন্দ্রের থেকে আঠারো বছর পর। বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যু যে বছর, বিভূতিভূষণের জন্ম সেই বছরে। এই তিন সাহিত্য মহারথীর উপন্যাস ও ছোটগল্প (বঙ্কিমের যুগে ছোটগল্পের যাত্রা সবে শুরু হয়েছে। তাঁর অগ্রজ পূর্ণচন্দ্রের নাম ঐতিহাসিকভাবে প্রথম বাংলা ছোটগল্পকাররূপে খ্যাত হয়ে আছে) বাংলা গদ্যের স্থায়ী সম্পদ। বিভূতিভূষণের ক্ষেত্রেও তাই। আমাদের গ্রন্থপ্রিয়তার তালিকায় যেমন আছে ‘দুর্গেশনন্দিনী’, ‘রাজসিংহ’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, বা ‘গোরা’, ‘শেষের কবিতা’, তেমনই ‘শ্রীকান্ত’ আর ‘গৃহদাহ’, ‘পল্লীসমাজ’ বা ‘পথের দাবী’, তেমনই থাকবে ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’, ‘ইছামতী’, ‘আরণ্যক’, ‘চাঁদের পাহাড়’।
বিভূতিভূষণের নাম মূলত গল্পকার ও ঔপন্যাসিক রূপেই। বড়দের জন্যই নয়, তিনি ছোটদের জন্য-ও বেশ কিছু অসামান্য গল্প ও উপন্যাস লিখে গেছেন। শিশুসাহিত্যিক রূপে তাঁর আলাদা মূল্যায়ন এখনও হয়নি। আমরা কি তাঁর গোয়েন্দাকাহিনি ‘মিসমিদের কবচ’ খুব একটা পড়ি, অথবা ‘মরণের ডঙ্কা বাজে’? এছাড়াও অন্য একাধিক বিভূতিভূষণ আছেন। আজ তাঁর জন্মদিনে সেই অজানা বিভূতিভূষণকে নিয়ে কিছু লেখা যাক।
তিনি যেমন ছিলেন শিশুসাহিত্যিক, তেমনি বিদ্যালয়শিক্ষক। জীবনের নানা পর্বে বিভিন্ন জেলায় শিক্ষকতার সূত্রে কাটাতে হয়েছিল তাঁকে। মৃত্যুকালে তিনি ছিলেন বনগাঁর গোপালনগর হরিপদ ইনস্টিটিউশনের শিক্ষক। তাঁর সহসা মৃত্যু হয় ১৯৫০ (বাংলা ১৩৫৭-র) পূজাবকাশে। মৃত্যু না হলে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেবার কথা ছিল তাঁর।
যাই হোক, তাঁর শিক্ষকতা সূত্রে তিনি একটি ছাত্রপাঠ্য বাংলা ব্যাকরণ বই-ও লেখেন। ১৯৪০-এ প্রকাশিত বইটির নাম ‘অভিনব বাংলা ব্যাকরণ’। বইটির হদিশ বহুদিন ধরে পাওয়া যায়নি। সৌভাগ্যের কথা, অতি সম্প্রতি এটির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে, আর কলকাতার প্রকাশনা ‘পত্রভারতী’ ব্যাকরণ বইটি ছেপেও বের করেছে। সমসাময়িক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ‘সংক্ষিপ্ত ভাষা-প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ’ আর জগদীশচন্দ্র ঘোষের ‘আধুনিক বাংলা ব্যাকরণ’-এর সঙ্গে তাই বিভূতিভূষণের বইটির প্রতিতুলনা সম্ভব হচ্ছে। জানা যাচ্ছে, ওই দুই বইয়ের সঙ্গে তাঁর গ্রন্থের মিল-অমিল।
আমরা জানি, বিভূতিভূষণের কাহিনি নিয়ে ‘পথের পাঁচালী’ ছবি করেন (পরে আরও একাধিক) সত্যজিৎ। বস্তুত বিভূতিভূষণের গল্প-উপন্যাসের কাহিনি চলচ্চিত্র ও নাটকের বহমান উৎস। বাংলা ও হিন্দি মিলিয়ে কম করে তাঁর কাহিনি নিয়ে অন্তত দশটি ছবি হয়েছে। এই লেখক নিজে যে চিত্রনাট্য-ও লিখেছেন তাঁর লেখা ‘অনুবর্তন’ উপন্যাসের, এ তথ্য সুবিদিত নয়। আরও কৌতূহলের বিষয়, তিনি কিছুকাল ‘চিত্রলেখা’ নামে একটি চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ১৯৩০ সালে এটি প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য, তিনি নিজে সিনেমার ভক্ত ছিলেন খুব। তাঁর ডায়েরিতে সিনেমা দেখতে যাওয়ার অনেক বর্ণনা আছে। তখনকার বহু অভিনেতা-অভিনেত্রীর সঙ্গে তাঁর আলাপ-ও ছিল। আপেক্ষিকতা তত্ত্বের ওপর যে একটি অসাধারণ গল্প আছে তাঁর, ‘আইনস্টাইন ও ইন্দুবালা’, সেখানকার ইন্দু বাংলার এক নামী অভিনেত্রী। গল্পে তিনি দেখিয়েছেন, সিনেমার গ্ল্যামারের কাছে যুগস্রষ্টা বিজ্ঞানীর গুরুত্ব কীরকম আপেক্ষিক।
হেমন্তকুমার গুপ্ত ও তিনি ‘দীপক’ নামেও একটি পত্রিকা সমসাময়িক কালে সম্পাদনা করেছিলেন।

বিভূতিভূষণ প্রচুর ডায়েরি লিখেছেন আজীবন। আর তা তাঁর জীবদ্দশায় অনেকটাই প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলা সাহিত্যিকদের মধ্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ী ডায়েরি লিখতেন। তবে বিভূতিভূষণের মতো এমন ধারাবাহিকভাবে নয়। আশ্চর্যের কথা, তাঁর মৃত্যুর তিন দশক পর বনগাঁর চালকি বারাকপুরে তিনি যেখানে থাকতেন, তার কাছেই একটি মুদি দোকান থেকে বিভূতিভূষণের প্রচুর ডায়েরি আকস্মিকভাবে উদ্ধার করেন বিভূতি-গবেষক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুনীল চট্টোপাধ্যায়।
তাঁর ডায়েরি এক অজানা বিভূতিভূষণের সন্ধান দেয়, যিনি অরণ্যে মাইলের পর মাইল ঘোড়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, দূরবিন দিয়ে গ্রহতারা দেখছেন, ভাগলপুরের জঙ্গলে বসে কলকাতার ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরি থেকে (এখন তার নাম ন্যাশনাল লাইব্রেরি) ডাকযোগে বই আনিয়ে পড়ছেন। গিবন আর মমসেনের লেখা ইতিহাস বই, মহাকাশ বিজ্ঞানের বই, বিশ্বের বিখ্যাত সব মনীষীদের জীবনী। আর তাঁর দিনলিপি তো প্রকৃতিবর্ণনার বিপুল খনি! আর আছে কল্পনার ভিতর দিয়ে সুদূর ভবিষ্যতের কথা বলা, বারংবার। ‘স্মৃতির রেখা’-য় তিনি লিখছেন, ‘আজ বসে বসে অনাগত দূর ভবিষ্যতের ছেলেমেয়েদের কথা মনে পড়ছে— আমার সেইসব অগণিত শিশু প্রপৌত্র, বৃদ্ধ প্রপৌত্র, ও অতিবৃদ্ধ প্রপৌত্রদের জন্যে কি রেখে যাব তা ভাবছি।’ উল্লেখ্য, তাঁর পিতা মহানন্দ-ও ডায়েরি লিখতেন। তিনি যে পিতার ডায়েরি সর্বদা নিজের কাছে রাখতেন, বিভূতিভূষণের ডায়েরিতে এ-কথাও আছে।
নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।
অনুবাদক-ও ছিলেন তিনি। আমাদের ঠিক সেভাবে জানা নেই, তিনি স্যার ওয়াল্টার স্কটের সুবিখ্যাত আর বিশাল উপন্যাস ‘আইভান হো’ অনুবাদ করেছিলেন। তাছাড়াও তাঁর অনুবাদে পাই স্যার টমাস বাটার আত্মজীবনী ‘How l began’-এর। অনুবাদগ্রন্থটির ভূমিকা লেখেন আর এক উদ্যোগী, বিজ্ঞানী ও বিভূতিভূষণের হিতাকাঙ্ক্ষী ও শুভানুধ্যায়ী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। এই টমাস বাটা বিখ্যাত জুতোর ব্যবসায়ী, যিনি আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত। ১৯৩২-এর ১২-ই জুলাই বিমান দুর্ঘটনায় নিহত বাটার জুতোর ব্যবসা শুরু হয়েছিল ১৮৯৪-তে, অর্থাৎ বিভূতিভূষণের-ই জন্মের বছরে! দু’বার তিনি ভারতে আসেন। প্রথমে কোন্নগরে, ও পরে নুঙ্গিতে (পরবর্তীকালে জায়গাটির নাম হয় বাটানগর) তাঁর জীবিতকালেই ১৯২৫-এ ভারতে বাটা কোম্পানি স্থাপিত হয়েছিল।
অনুবাদটি অত্যন্ত সুখপাঠ্য। সময় ও সুযোগ পেলে তিনি আরও কিছু অনুবাদ হয়তো আমাদের উপহার দিতে পারতেন।

এত প্রকৃতির প্রতি ভালবাসা তাঁর যে, আফ্রিকা যেতে হয়নি, স্রেফ ঘরে বসে বইপত্র ঘেঁটে লিখে ফেলেছিলেন ‘চাঁদের পাহাড়’। এই মানসভ্রমণের সমাপ্তি কিন্তু এখানেই নয়। সেই টেলিভিশনহীন, ইন্টারনেবর্জিত যুগে গোটা বিশ্বের ভূগোল যে কতটা নখদর্পণে ছিল বিভূতিভূষণের, তার প্রমাণ কেবল ডায়েরিতেই নয়, রয়েছে তাঁর লেখা অবিস্মরণীয় একটি বইয়ে। ‘বিপুলা এ পৃথিবী’। এটি বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও সাময়িকীতে নানা সময় ধরে বেরিয়েছিল। বিশ্বের নানা প্রান্তের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক বিবরণ, নানা দেশের। আশ্চর্যকর বর্ণনায় সমৃদ্ধ। মূলত কিশোরপাঠ্য হলেও বয়স্কদের পক্ষেও যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বইটির। এর সূচিপত্রটির দিকে তাকালেই বইটির অসামান্য গুরুত্ব উপলব্ধি করা যাবে। আছে প্যালেস্টাইন, মাঞ্চুরিয়া, বলিভিয়া ও ফিজি-সামোয়ার কথা। মনে পড়বে আমাদের, ‘অপরাজিত’ শেষ হয়েছিল অপূর্বর চাকরি নিয়ে ফিজি যাওয়ার মধ্য দিয়ে। আছে পৃথিবীর বিশালতম অরণ্যের কথা, কিলিম্যাঞ্জারো— দক্ষিণ আমেরিকার অজ্ঞাত পর্বতের কথা, রোমের পল্লীপ্রকৃতির কবি হোরেস-এর কথাও। আমরা জানি, নীলনদ মিশরে। কিন্তু এ নদী যে একাধিক দেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তা জানা যাবে ‘নীলনদীবক্ষে ইজিপ্ট হইতে সুদান’ পড়লে। আছে গ্যালাপাগোস দ্বীপের কথা, ১৮৩৫ সালে চার্লস ডারউইন যে দ্বীপে যান, ও নিজ অনুসন্ধিৎসা চরিতার্থ করতে গিয়ে জগদ্বিখ্যাত বিবর্তনবাদ তত্ত্বের সূচনা করেন। এসব তথ্য তখনকার সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ছিল সম্পূর্ণ অভিনব। ‘প্যারিস হইতে স্থলপথে কাশ্মীর’, লেখাটি পেলে আমরা এখন-ও কি গোগ্রাসে গিলতে প্রস্তুত নই? অথবা ‘উড়োজাহাজে পৃথিবীভ্রমণ’, সেই আমলে? তৎসহ ‘কেপ্রি দ্বীপের পাখিদের আড্ডা’ আর ‘অরিজোনা পর্বতগাত্রের প্রাচীন ছবি’? আমরা এই বিভূতিভূষণের কথা এখনও জানিনি। অবকাশ রয়ে গেছে জানার, আর তার সঙ্গে আরও একটি বই, ‘বিচিত্র জগৎ’ পাঠের।
মানুষ ও প্রকৃতি, এই নিয়ে মূলত বিভূতিভূষণের বিশ্ব। প্রকৃতি নিয়ে বলতে গিয়ে ‘তৃণাঙ্কুর’ (ডায়েরি)-এর এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘প্রকৃতি তাই আমার বড়ো বিশল্যকরণী,— মৃত, মূর্ছিত চেতনাকে জাগ্রত করতে কতো বড় ঔষধ আর নাই।’
এই প্রকৃতিকে তিনি তাঁর জীবদ্দশায় মানুষের লোভের কাছে পর্যুদস্ত হতে দেখেছেন, যার বর্ণনা আছে ‘আরণ্যক’-এ। আর এ নিয়ে তাঁর আক্ষেপটিও বড় সত্য হয়ে উঠেছে আজ, ‘এমন সময় হয়তো আসিবে দেশে, যখন মানুষে অরণ্য দেখিতে পাইবে না!’ কী ভয়ঙ্কর ভবিষ্যদ্বাণী!

Advertisement

বিভূতিভূষণের জীবনে কি নারী এসেছিল? প্রেমে পড়েছিলেন তিনি কখনও? এটি নিয়েও কিন্তু অদ্যাবধি একেবারেই আলোচিত হয়নি বিশেষ। আমরা জানি, তিনি কলেজে পড়াকালীন ১৯১৭-তে গৌরীদেবীকে বিয়ে করেন। বিয়ের আঠারো মাসের মাথায় গৌরীর মৃত্যু হয়। দীর্ঘ বাইশ বছর পর, তাঁর বয়স যখন ছেচল্লিশ, তখন তিনি রমাদেবীকে (ভাল নাম কল্যাণী) বিয়ে করেছিলেন, ১৯৪০-এর ৩-রা ডিসেম্বর। রমা তখন ১৭। দু’জনের বয়সের ব্যবধান ছিল ২৯ বছরের। রমার আগ্রহাতিশয্যেই এ বিয়ে হয়েছিল। রমার একান্ত প্রেম ছিল এটা, তাঁর প্রিয় লেখকের প্রতি।
কিন্তু বিভূতিভূষণের প্রেম? এসেছিল, আর তা এক-ই সময়ে, দু’জনের সঙ্গে। কোনও গুজব বা অনুমান নয়, কেন না, তিনি নিজেই তাঁর ‘উৎকর্ণ’ নামক ডায়েরিতে এই দু’জনের কথা নিবিড় অনুপুঙ্খতায় লিখে গেছেন, অথচ আমরা তার বিশেষ খবর রাখি না। ডায়েরিটা তাঁর জীবদ্দশাতেই বেরোয়। তাই এখানে জাল-জালিয়াতির কোনও প্রশ্ন নেই।
এদের একজনের নাম সুপ্রভা দত্ত। সিলেটের সুনামগঞ্জের মেয়ে, পড়াশোনায় মেধাবী। ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স। দু’জনের সম্পর্ক এতদূর গড়িয়েছিল যে, বিভূতিভূষণ সুপ্রভার ভাইকে চিঠি লিখেছিলেন, ‘Asking for your sister’s hand in marriage’। কিন্তু ভাই রাজি হননি, কারণ তখনকার দিনের জাতপাত! সুপ্রভা কবিতা লিখতেন, ‘নির্ঝর’ বলে একটি পত্রিকা সম্পাদনার সূত্রে বিভূতিভূষণের সঙ্গে তাঁর আলাপ। শিলং কলেজে পড়তেন সুপ্রভা, বিভূতি দেখা করতে যেতেন কলকাতা থেকে সেই সুদূরে। পরে যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন সুপ্রভা, হস্টেলে গেছেন, সুপ্রভাকে নিয়ে একসঙ্গে সিনেমা দেখেছেন। সুপ্রভা তাঁকে রুমাল ও বালিশের ঢাকনায় কারুকাজ করে উপহার দিলে তা ব্যবহার করেননি বিভূতি, পাছে তা মলিন হয়। আর ছিল দু’জন দু’জনকে লেখা চিঠি, যার বেশ কিছু প্রকাশিত হয়েছে, স্বভাবত-ই বাদসাদ দিয়ে। কেননা সুপ্রভার বিয়ে ও সামাজিক মর্যাদাবোধ। পরে কলকাতার একটি কলেজের অধ্যক্ষা হন তিনি।
একদিকে সুপ্রভা, অন্য দিকে খুকু। ভাল নাম প্রীতিলতা। বিভূতিভূষণের গ্রাম বারাকপুরের-ই মেয়ে, আর খুকুর বাবা যুগল বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন বিভূতিভূষণের স্কুলশিক্ষক। এগারো বছরের খুকু বিভূতির কাছে পড়তে আসত। ক্রমে খুকুর ১৪/১৫ বছর বয়স থেকে দু’জনের মধ্যে একটা আশ্চর্য ও ব্যতিক্রমী প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিভূতিভূষণ তখন চল্লিশোর্ধ। ভাবা যেতে পারে, নিছক বাৎসল্য এটা। কিন্তু আমাদের তা ভাবার যে অবকাশ দেননি ডায়েরি-লেখক বিভূতি! সেটা যে নিপাট প্রেমের সম্পর্ক, তা ডায়েরির একাধিক জায়গায় নিজে লিখে গেছেন বিভূতি। এমনকী তিনি এক জায়গায় খুকুকে বলছেন, তাকে বিয়ে না করার কারণ, খুকুর পদবিও বন্দ্যোপাধ্যায়। খুকুও যে বিভূতিভূষণকে ভালবাসেন, সে স্বীকারোক্তিও রয়েছে ডায়েরিতে। সুপ্রভার বিয়ের পর তাঁর সঙ্গে বিভূতির যোগাযোগ ছিল কি না তা জানা যায় না, তবে খুকুর সঙ্গে ছিল। তিনি খুকুর শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার কথাও ডায়েরিতে লিখেছেন। একদিকে বাধা পেলেন সুপ্রভা কায়স্থ বলে, অন্য দিকে তিনি সরে এলেন দু’জনের এক পদবি বলে! হায় ভীরু প্রেম, হায় রে!
অথচ খুকুকে কলকাতা দেখাতে নিয়ে যাচ্ছেন, তারপর দু’জনে বন্ধু নীরদের কাছে উঠলে এমন অসম প্রেমকে তিরস্কার করতেও যে ছাড়েননি নীরদ, ডায়েরিতে সেটাও লিখেছেন বিভূতি। সর্বোপরি, বিশ শতকের সেই গ্রামীণ আবহে, রাতে পঞ্চদশী খুকু আর তিনি এক বিছানায় রাত কাটিয়েছেন, এই তথ্যটিও নির্দ্বিধায়, অকপটে ডায়েরিতে লিখে রেখেছেন তিনি। ‘দুঃসাহসী প্রেম বহন করুক আমাদের অজানার পথে’, হতে পারত, সূচনা হলেও পুরোপুরি হয়নি।
তারপর সামান্য কয়েক মাসের ব্যবধানে একে একে বিয়ে হয় খুকু, সুপ্রভা, আর হ্যাঁ, বিভূতি-কল্যাণীর। এ যেন অলীক নাটক! সুপ্রভাকে তিনি উৎসর্গ করেছিলেন ‘জীবন ও মৃত্যু’ ছোটগল্পের বইটি। খুকুকে ‘চাঁদের পাহাড়’। স্ত্রী কল্যাণীকে (রমা) ‘ইছামতী’ আর প্রথমা স্ত্রী গৌরীকে ‘আরণ্যক’।
প্রেম, নিখাদ প্রেম না থাকলে কি আর অভিমান করে রমা লিখতেন, ‘তোমার তো খুকু আছে, সুপ্রভা আছে, আমার তুমি ছাড়া আর কে আছে?’ আর কি কিছু অবহিত হতে বাকি থাকে এর পরেও?

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × 1 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর চারটি কবিতা

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »