Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

প্রাক্ কথন

সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৫.০৮.১৯২৬—১৩.০৫.১৯৪৭) বাংলা সাহিত্য ও বিশেষ করে কবিতায় এক ক্ষণজন্মা প্রতিভা। বেঁচেছিলেন মাত্রই একুশ বছর, বা আরও নির্দিষ্ট করে বললে কুড়ি বছর আটমাস আঠাশ দিন। এই স্বল্পায়ু সত্ত্বেও, আশ্চর্যের বিষয়, আধুনিক বাংলা কবিতার জগতে অবধারিত যাঁরা,— মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম আর জীবনানন্দের সঙ্গে সুকান্তর নাম-ও উচ্চারিত হয়। বহু সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত জন্মজয়ন্তী একই সঙ্গে পালন করেন। তিনি কোন দশকের কবি, এ-হেন প্রশ্ন কদাপি উচ্চারিত হয় না। তাঁর স্বল্প জীবন ও মাত্র সাত-আট বছরের স্বল্পতর সারস্বত সাধনাই তাঁকে বাংলা ভাষার অপরিহার্য কবি করে তুলেছে।
বাংলা ভাষায় ক্ষণজন্মা প্রতিভা আরও ছিলেন। আমাদের মনে পড়বে ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় ঔপন্যাসিক ও কবি (Cambridge History of English Literature-এ আলোচনা আছে তাঁকে নিয়ে) তরু দত্ত (০৪.০৩.১৮৫৬—৩০.০৮.১৮৭৭), কালীপ্রসন্ন সিংহ (২৩.০২.১৮৪০—২৪.০৭.১৮৭০), সোমেন চন্দ (২৪.০৫.১৯২০—০৮.০৩.১৯৪২), হুমায়ুন কবির (২৫.১২.১৯৪৮—০৬.০৬.১৯৭২), আবুল হাসান (০৪.০৮.১৯৪৭—২৬.১১.১৯৭৫)-দের কথা। তবে সোমেন চন্দ বা হুমায়ুন কবির (‘কুসুমিত ইস্পাত’-খ্যাত) নিহত হন, স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি তাঁদের। হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওকেও (১৮.০৪.১৮০৯—১৬.১২.১৮৩১) ধরব আমরা, কেননা মনেপ্রাণে তিনি নিজেকে বাঙালি তথা ভারতীয় মনে না করলে ‘To lndià— My Native Land’ কবিতাটি কি লিখতেন তিনি?

সুকান্ত ভট্টাচার্য: এক বালক-বীর

আজ তাঁর জন্মশতবর্ষের মহান ক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা দেখতে পাই, মা সুনীতিদেবী ও বাবা নিবারণচন্দ্রের এই পুত্রটি, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘Prodigy’ বা বিস্ময়বালক। নইলে মাত্র সাত বছর বয়সেই হাতে লেখা পত্রিকা ‘সঞ্চয়’-তে গল্প লিখছেন, এগারো বছরে লিখছেন গীতিনাট্য ‘রাখাল ছেলে’, আর প্রায় এই বয়সেই বিজন গঙ্গোপাধ্যায়-সম্পাদিত ‘শিখা’-তে বেরোচ্ছে তাঁর জীবনে প্রথম মুদ্রিত লেখা, প্রবন্ধ, স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে! বাগবাজারের কমলা বিদ্যামন্দির পাঠশালায় পড়তে অভিনয়-ও করছেন ‘ধ্রুব’ নাটকে, আর সেভেনে পড়ার সময় সদ্য বন্ধুরূপে পেয়েছিলেন যাঁকে, আর আজীবন যার সঙ্গে অন্তর্লগ্ন হয়ে থাকবেন, তাঁর চেয়ে তিন বছরের বড় সেই অরুণাচল বসুর (১২.০৯.১৯২৩—২৪.০৭.১৯৭৫) সঙ্গে বের করলেন নিজস্ব হাতে লেখা পত্রিকা, ‘সপ্তমিকা’। সুকান্ত তখন বেলেঘাটা দেশবন্ধু বিদ্যালয়ের ছাত্র, থাকেন উত্তর কলকাতার ৩৪, হরমোহন ঘোষ লেনে।
তাঁর কবিপ্রতিভা উন্মেষের পেছনে মা সুনীতিদেবী ও জ্যেঠতুতো দিদি রাণীর অবদানকে অবশ্য অস্বীকার করা যাবে না। দুঃখের কথা, এই রাণীদি সম্পর্কে বিশদ কিছুই জানা যায় না। তবে তিনি ছিলেন আগ্রাসী গ্রন্থপ্রেমী, আর তাঁর ভাইটিকে তিনি তাঁর পড়া গল্প শোনাতেন, পড়ে শোনাতেন রবীন্দ্রনাথের ‘কথা ও কাহিনী’-সহ বহু কবিতা। আশ্চর্যের বিষয়, কিশোরী বয়সেই তিনি কবির নামটি রাখেন সে-সময়কার বিখ্যাত লেখক-ব্যারিস্টার মণীন্দ্রলাল বসুর ‘রমলা’ উপন্যাসের নায়ক সুকান্তর নামে! ‘প্রবাসী’-তে উপন্যাসটি ১৯২২-২৩ জুড়ে ধারাবাহিক বেরিয়েছিল। হায়, উপন্যাসে সুকান্তর মৃত্যু হয়েছিল যক্ষ্মায়! রাণীর সহসা মৃত্যু, সুকান্তর মাত্র পাঁচ বছর বয়সে। তবে ভিত তৈরি করে দিয়ে গেছেন রাণী, ধরিয়ে দিয়ে গেছেন একতারাতে একটি যে সুর, সেটিকে বাজাবার। অর্থাৎ সাহিত্যপ্রীতির।
দ্বিতীয় অবদান তাঁর মায়ের। মাত্র এগারো বছর বয়সে তিনি সুকান্তর পিতার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী হয়ে আসেন, নিবারণচন্দ্রের প্রথমা স্ত্রী মনোমোহিনীর অকালপ্রয়াণে। ছয় পুত্রের জননী হন তিনি, যাদের মধ্যে সুকান্ত প্রথম। অন্যরা হলেন সুশীল, প্রশান্ত, বিভাস, অশোক ও অমিয়। নিবারণের প্রথম পক্ষের ছেলে মনোমোহনের সঙ্গেও অসম্ভব হৃদ্যতা ছিল সুকান্তর। তাঁর স্ত্রী সরযূ সুকান্তকে অসম্ভব স্নেহ করতেন। তিনিই সুকান্তর হাতেখড়ি দেন। আর সুকান্তর একমাত্র যে ছবিটি আমরা আজ দেখতে পাই, সেটি স্টুডিও থেকে তুলে আনার পয়সাও দিয়েছিলেন তিনি-ই! বাড়ির যাবতীয় ব্যস্ততা সামলে সুকান্তকে মা রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি বলতেন, শোনাতেন রূপকথার গল্প। এইভাবে সুকান্তর মানসগঠনে ভূমিকা রাখেন সুনীতিদেবী।
তাছাড়া বাবা নিবারণচন্দ্রের ছিল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, ‘সারস্বত লাইব্রেরি’। এর একটা অনুকূল প্রভাব সুকান্তর ওপর অবশ্যই পড়েছিল। অল্প বয়স থেকেই রবীন্দ্রনাথে আগ্রহী হওয়া, অসম্ভব পুস্তকপ্রীতি, এমন ছন্দজ্ঞান ও গদ্যরচনার শৈলী, অতীব বিস্ময়কর!
রাণীদি মারা গেলেন, আর সুকান্তর মা-ও। ক্যান্সারে। তখন সুকান্ত বারো বছরের। মধুপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মাকে। তাই তার শেষদেখাটাও হতে পারেনি মায়ের সঙ্গে।
হ্যাঁ, বিস্ময়বালক-ই ছিলেন সুকান্ত। মাত্র ন’বছর বয়সে এমন নিপুণ অন্ত্যমিল দিয়ে নইলে কী করে লিখলেন এ-পর্যন্ত প্রাপ্ত তাঁর আদি কবিতাটি, ‘রমা রাণি দুই বোন পরির মতন,/ সবে বলে মেয়ে দুটি লক্ষ্মী কেমন।’ সে বয়সে লেখা আরও অধিক ও অনবদ্য ছন্দবোধ লক্ষ্য করি এই ছড়াটিতে, ‘বাড়ি কোন গায়,/ বাড়ি বনগায়।/ ছেলে কাহাদের/ ছেলে সাহাদের।/ চল আমরা/ পাড়ি আমড়া।’
এগারো বছর তখন সুকান্তর। এক দাদা সুকান্তর কবিতার খাতা সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে দিলে তা পাঠ করে বিস্ময়ের অন্ত থাকে না সুভাষের। তিনি দেখাতে নিয়ে যান তাঁদের সে সময়কার সাহিত্য-অভিভাবক বুদ্ধদেব বসুর কাছে। বুদ্ধদেব নিজেও অভিভূত সে-ই কবিতা পড়ে। সেসময় বুদ্ধদেব তাঁর ‘কবিতা’ পত্রিকা বের করছেন, ১৯৩৫ থেকে। সেখানে কবিতা প্রকাশিত হলে কবিরা জাতে উঠতেন বলে মনে করা হত। বুদ্ধদেব-সমসাময়িক কবিরা লিখতেন সেখানে, পরবর্তীরাও। সেখানে যে বালক-বীরের বেশে সুকান্তের-ও স্থানলাভ ঘটবে, এবং তা দু’বার, এই তথ্যটিই কি সুকান্ত-প্রতিভার দিকনির্দেশক নয়? আর এর আগেই যে তিনি, মাত্র ন’বছরে আকাশবাণী কলকাতা থেকে (তখনও আকাশবাণী নামকরণ হয়নি) ‘গল্পদাদুর আসর’-এ রবীন্দ্র-কবিতা আবৃত্তি করছেন। অর্থাৎ আবৃত্তিকার-ও ছিলেন তিনি! রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের দিনটিতে নিজের লেখা কবিতা পড়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন বিশ্বকবিকে (উল্লেখ্য, সেদিন কাজী নজরুল ইসলাম-ও কলকাতা বেতারে কবিতা ও গানে শ্রদ্ধা জানান রবীন্দ্রনাথকে। কৌতূহল হয় জানতে, দু’জনের মোলাকাত হয়েছিল কখনও? সুকান্তর কবিতা নজরুল পড়েছেন কখনও? সুকান্ত নজরুলের কবিতা পড়েছেন, আর তাঁর প্রবন্ধে নজরুলের নাম উল্লেখ করেছেন, যথাস্থানে তা আমরা দেখাব)। কিশোর সুকান্তর লেখা গান পর্যন্ত কলকাতা বেতার থেকে সেসময় প্রচারিত হয়েছে। সে-গানে সুর দিয়েছেন পঙ্কজকুমার মল্লিকের মতো বিখ্যাত গায়ক-সুরকার। হ্যাঁ, কিশোর বয়স থেকেই সুকান্ত গীতিকার। তাঁর সঙ্গীতপ্রীতির বর্ণনা দিয়েছেন সুকান্তের অনুজ অধ্যাপক অশোক ভট্টাচার্য, সুকান্তর ওপর কলকাতা দূরদর্শন যে তথ্যচিত্র নির্মাণ করে, সেখানে। অশোক জানিয়েছেন (সেটা বুদ্ধদেব বসুও লিখেছেন), সুকান্ত এক কানে কম শুনতেন। রেডিওতে কান লাগিয়ে গভীর মনোযোগে দিনের পর দিন গান শুনতে দেখেছেন তিনি তাঁর অগ্রজকে।
তাছাড়া এই বিস্ময়বালক মাত্র এগারো বছর বয়সেই গীতিনাট্য পর্যন্ত লিখে ফেলেছেন! তুমুল বার্তাবহ সে গীতিনাট্যটির নাম ‘রাখাল ছেলে।’ রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল-ও লিখেছেন, তবে এ-বয়সে কিন্তু নয়। আর সে গীতিনাট্য যে নিতান্ত হেলাফেলার, তা কিন্তু নয়। কেননা আজকের দিনেও মঞ্চে, দূরদর্শনে তা প্রচারিত হয়। এটির সঙ্গে জসীম উদ্দীনের ‘রাখালছেলে’ কবিতাটি গুলিয়ে ফেললে চলবে না, যে বিখ্যাত কবিতাটি শুরু হয়েছে ‘রাখাল ছেলে, রাখাল ছেলে, বারেক ফিরে চাও/ বাঁকা গায়ের পথটি বেয়ে কোথায় চলে যাও?’
সুকান্তর এই ক্ষুদ্র গীতিনাট্যটিতে দু’টি বৈশিষ্ট্য বিবেচনাযোগ্য। এক, প্রাচীন ভারতে বিষ্ণুশর্মার শিশু-কিশোরপাঠ্য লেখা ‘পঞ্চতন্ত্র’-তে যেরকম মানুষ ও পশুপাখিকে চরিত্ররূপে পাই, এখানেও ঠিক তেমনই। এখানেও রাখালের সঙ্গে দোয়েল পাখি, হরিণ-ও চরিত্র। সুকান্তদের বাড়ি সংস্কৃতচর্চার জন্য খ্যাত ছিল। তাঁর পিতা, জ্যাঠামশাই ও পূর্বপুরুষ এসব চর্চা করতেন। এর প্রভাবেই হয়তো এমন লেখা সম্ভব হয়েছে সুকান্তর। তাঁর লেখায় তৎসম শব্দের আশ্চর্যসুন্দর ব্যবহার-ও এ কথার সাক্ষ্য দেবে। তাছাড়া এই গীতিনাট্যের গঠনে মৈমনসিংহগীতিকার আশ্চর্য সাযুজ্য রয়েছে। এ কি শৈশবে মায়ের কাছ থেকে শোনা রূপকথা-পুরাণকথার প্রভাবজাত? সম্ভবত তাই।

সুকান্ত: এক অনন্য, শাশ্বত কবিপ্রতিভা

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল। চিঠিপত্র, আমরা জানি, কখনও কখনও সাহিত্যের অনুপম আধার হয়ে দেখা দেয়। দিয়েছিল টলস্টয়, জন কিটস, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, কাফকার বিপুল পত্রাচারে। তাঁদের চিঠি লেখার বিপুলতার পাশে এ-পর্যায়ে প্রাপ্ত সুকান্তর লেখা ৪৯টি চিঠির সিংহভাগ-ই সেই অমরতা ও মাধুর্যের দাবিদার।
‘চিরদিনের’ কবিতায় বুনে দিচ্ছেন আবহমান বাংলাকে, ‘এ গ্রামের পাশে মজা নদী বারো মাস/ বর্ষায় আজ বিদ্রোহ বুঝি করে,/ গোয়ালে পাঠায় ইশারা সবুজ ঘাস/ এ গ্রাম নতুন সবুজ ঘাগরা পরে।’ কী অপূর্ব চিত্রকল্প! আর জল আনবার পথে ঘোমটা খুলে কৃষকবধূর থমকে দাঁড়িয়ে ‘ঘোমটা খুলে সে দেখে নেয় কোনওমতে/ সবুজ ফসলে সুবর্ণ যুগ আসে, ‘অনবদ্য!’ ‘বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত’, এহেন আর্ষবাক্যের সামনে এসে দাঁড়ালে বাংলাদেশের ইতিহাসে বাহান্নো আর একাত্তরকে অন্য মাত্রায় পাঠ করা যায়। প্রসঙ্গত, সুকান্তর পূর্বপুরুষ কিন্তু বাংলাদেশের ফরিদপুর, অধুনা গোপালগঞ্জ জেলার ঊনশিয়া গ্রামের।
বাংলার দুর্ভিক্ষে আহত কবি লেখেন, ‘আমার সোনার দেশে অবশেষে মন্বন্তর নামে,/ জমে ভিড় ভ্রষ্ট নীড় নগরে ও গ্রামে,/ দুর্ভিক্ষের জীবন্ত মিছিল,/ প্রত্যেক নিরন্ন গ্রামে বয়ে আনে অনিবার্য মিল।’ কবি তার পরেও আশাবাদী, ‘এদেশে ভাণ্ডার ভরে দেবে জানি নতুন ইউক্রেন’। উল্লেখ করা যায়, তখন, আর বর্তমানেও যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন শস্য উৎপাদনের প্রাচুর্যে বিশ্বে ‘রুটির ঝুড়ি’ নামে খ্যাত। এই স্তেপভূমির কৃষ্ণমৃত্তিকা (CHERMOZEM) যব, ভুট্টা, সূর্যমুখী তেল উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধ। দেশপ্রেম নিবিড়ভাবে ধরা পড়েছে তাঁর ‘মণিপুর’ কবিতায়, ‘এ আকাশ, এ দিগন্ত, এই মাঠ, স্বপ্নের সবূজ ছোঁয়া মাটি,/ সহস্র বছর ধরে একে আমি জানি পরিপাটি,/ জানি এ আমার দেশ অজস্র ঐতিহ্য দিয়ে ঘেরা,/ এখানে আমার রক্তে বেঁচে আছে পূর্বপুরুষেরা’। কবিতাটির সময়কাল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যখন স্বাধীন মণিপুর একদিকে ব্রিটিশ ও অন্য দিকে জাপান ও নেতাজির আজাদ হিন্দ বাহিনীর লড়াইয়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে। মণিপুর ছিল ব্রিটিশের করদ রাজ্য। ১৯৪৯-এ তা ভারতের অন্তর্গত হয়।

আশাবাদ।। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, সুকান্ত তাঁর কবিতা বেদনার অতল থেকে শুরু করে অন্তিমে তাকে পরিণত করেন আশাবাদে। ‘রানার’ কবিতায় তাই দেখি, একের পর এক বিধুরতার ছবি, ‘অনেক দুঃখে, বহু বেদনায়, অভিমানে, অনুরাগে,/ ঘরে তার প্রিয়া একা শয্যায় বিনিদ্র রাত জাগে’। তার ‘ঘরেতে অভাব, পৃথিবীটা তাই মনে হয় কালো ধোঁয়া’, অথবা ‘এর কথা ঢাকা পড়ে থাকবেই কালো রাত্রির খামে’। কিন্তু এই নৈরাশ্যের মধ্যেই শেষ হয়নি কবিতাটি, আর সীমিত হয়ে থাকেনি কেবল রানারেই। এর ব্যাপ্তি ও আশাবাদ পেয়েছে আরও বৃহৎ আয়তন: ‘রানার! রানার! সময় হয়েছে নতুন খবর আনার’।
‘অনুভব’ কবিতাটির দু’টি ভাগ। ‘১৯৪০’, আর ‘১৯৪৬’। প্রথম ভাগে আছে কেবল বেদনার বাণীরূপ, ‘আমরা যে পরাধীন’, ‘দেখি এই দেশে অন্ন নেইকো কারো’, ‘দেখি এই দেশে মৃত্যুরই কারবার’। কিন্তু পরবর্তীতে সুর পালটে গেল,— ‘বিদ্রোহ আজ, বিদ্রোহ চারিদিকে’, ‘প্রত্যহ যারা ঘৃণিত ও পদানত,/ দ্যাখো আজ তারা সবেগে সমুদ্যত’। সুকান্ত সূর্যাস্ত দেখে সূর্যোদয়কে আহ্বান জানাতে ভোলেন না।

প্রকৃতিপ্রেম।। তাঁর কবিতায় সলমা-চুমকির মতো প্রকৃতির কারুকাজ। কলকাতায় জন্ম ও গোটা জীবন কেটেছে তাঁর। খুব যে প্রকৃতির সান্নিধ্য পেয়েছেন, তা নয়। তবু বারবার প্রকৃতির সৌন্দর্যে অবগাহন তাঁর। ‘রৌদ্রের গান’ কবিতার সূচনাতেই দেখি প্রকৃতির অপরূপ তাকে কী নান্দনিকভাবে ধরা হয়েছে, ‘এখানে সূর্য ছড়ায় অকৃপণ/ দুহাতে তীব্র সোনার মতন মদ,/ যে সোনার মদ পান করে ধানক্ষেত/ দিকে দিকে তার গড়ে তোলে জনপদ’। ‘চিরদিনের’ কবিতায় পাই চিরায়ত প্রকৃতির চিত্র, ‘রাত্রি এখানে স্বাগত শাখে/ কিষাণকে ঘরে পাঠায় যে আলপথ’ বা ‘এখানে সকাল ঘোষিত পাখির গানে/ কামার, কুমোর, তাঁতি তার কাজে জোটে’। ‘দিনের নীলাভ শেষ আলো/ জানালো আসন্ন রাত্রি দুর্লক্ষ্য সঙ্কেতে’ (‘দিক্ প্রান্তে’)। ‘কাশ্মীর’ কবিতায় কী অপরূপ কালিদাসীয় চিত্রকল্প, ‘রোদকে ডেকেছে নন্দনবন পৃথিবীর’। এই কবিতাতেই কাশ্মীরে তুষারপাত কবির চোখে দেখা দিচ্ছে, ‘গলে গলে পড়ছে জীবনের স্পন্দন’-এর মতো! প্রকৃতির অনুভব কখনও বা অভিমানীও করে তোলে তাকে, ‘কে আর মনে রাখে নবান্নের দিনে কাটা ধানের গুচ্ছকে?’
প্রকৃতির অনন্যতার মধ্যে তিনি যখন রূপকের অভিনবতায় বিপ্লবের আবাহনী নিয়ে আসেন, তখন তাঁর কবিত্বকে বাহবা জানাতেই হয়, ‘হঠাৎ নিরীহ মাটিতে কখন/ জন্ম নিয়েছে সচেতনতার ধান’!

সমসাময়িকতা।। তাঁর কবিতা সময়কে নিপুণভাবে ধরেছে। আধুনিকতার প্রাক্ শর্ত এটি। বারবার দেশের অরন্তুদ বেদনার কথা ঠাঁই পেয়েছে যেমন, তেমনই যুদ্ধপীড়িত পৃথিবীর কথা। সোমেন চন্দ আততায়ীর হাতে নিহত হলে তিনি যেমন ‘ছুরি’ লিখে দায়বদ্ধতা পালন করেন, তেমনই গান্ধী, লেনিন (‘বিপ্লবস্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন’), মার্শাল টিটো তাঁর কবিতায় উপস্থিত। তেমনই পয়লা মে, রোম ১৯৪৩, চট্টগ্রাম, ল্যাংস্টন হিউজ স্মরণেও কবিতা আছে। জীবনকে সামগ্রিক পরিসরে অবলোকন, ওইটুকু বয়সে, ভাবা যায়!

আন্তর্জাতিকতা।। কলকাতার এক নিতান্ত নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মে অনুবাদ করেছেন ভি. বিয়াঙ্কির শিশুসাহিত্য পাঠ ও তা থেকে অনুবাদ, (‘লেজের কাহিনী’), বা তার সময়কার বিশ্বের যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নিজ করপুটে রাখা, কবিতায় সেসবের প্রতিফলন ঘটানো, তাঁর কবিতায় বিদেশের অহরহ অনুষঙ্গ প্রমাণ করে, তিনি আন্তর্জাতিক তাকে কী প্রখরভাবে হৃদ্গত করে নিয়েছিলেন। অনুবাদ করেন ল্যাংস্টন হিউজের কবিতাও, ‘মজুরদের ঝড়’ নাম দিয়ে।

হাস্যরস।। সুকান্তের লেখায় হাস্যরসের স্থানও রয়েছে, বিশেষ করে তাঁর শিশুতোষ রচনায়, যা তাঁর ‘মিঠেকড়া’ বইয়ে লভ্য। ‘ভেজাল’ কবিতায় পাই, ‘খাঁটি জিনিস এই কথাটি রেখো না আর চিত্তে,/ ‘ভেজাল’ নামটা খাঁটি কেবল, আর সকলি মিথ্যে’। ‘মেয়েদের পদবি’ কবিতাটি হাস্যরসের আর এক উদাহরণ, ‘নাগ যদি ‘নাগা’ হয়, ‘সেন’ হয় ‘সেনা’,/ বড়ই কঠিন হবে মেয়েদের চেনা।’
বন্ধু অরুণাচল বসুকে লেখা চিঠির বহুস্থানে সুকান্তর রসিকতাবোধ ঝলসে ওঠে। চিঠিতে কখনও তাঁকে সম্বোধন করছেন ‘সবুরে মেওয়াফল দাতাষু’ বলে, কখনও আবার ‘প্রভূতআনন্দদায়কেষু’, বা ‘আশানুরূপেষু’, ‘শ্রী শ্রী ১০৮ অর্ণব স্বামী, ‘প্রিয় বয়স্য’। রসিকতাবোধ ছিল সুকান্তর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

গান, গীতিনাট্য, গল্প, প্রবন্ধ, চিঠির সুকান্ত

সুকান্ত তাঁর স্বল্পপরিসর জীবনে কিছু গানও লিখে গেছেন। এ গান তাঁর নিভৃত প্রাণের দেবতা। শ্রাবণে জাত কবির একটি গান, ‘এই নিবিড় বাদল দিনে/ কে নেবে আমায় চিনে/ জানিনে তা।/ এ নব ঘন ঘোরে/ কে ডেকে নেবে মোরে/ কে দেবে হৃদয় কিনে/ উদাসচেতা’। অন্যত্র ‘কোন অভিশাপ নিয়ে এল এই/ বিরহ-বিধুর আষাঢ়/ এখানে বুঝি বা শেষ হয়ে গেছে/ উচ্ছল ভালোবাসার’। বেদনার সাথি পরের গানটি, ‘ফুল ঝরে যায় যৌবন চলে যায়/ বারবার তারা ‘ভালোবাসো’ বলে যায়/ তারপর কাটে বিরহে/ শূন্য শাখায় কী রহে/ সে কথা শুধায় কোন মন—’। সূচনা হয়েছিল গীতিকারের, কিন্তু পূর্ণতা পেল না! এমন করেই তো বেরিয়েছিল তবু, ‘গানের সাগর পাড়ি দিলাম/ সুরের তরঙ্গে,/ প্রাণ ছুটেছে নিরুদ্দেশে/ ভাবের তুরঙ্গে’।
একাধিক গীতিনাট্য লিখে গেছেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের পরে তিনি-ই এই ধারাটিকে ধরে রাখায় যত্ন নেন। তাঁর ‘সূর্যপ্রণাম’ তো রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা গীতিনাট্য। কবিকে নিয়ে চারটি কবিতা আছে সুকান্তর, তাঁর লেখার বহুস্থলে রবীন্দ্র-উদ্ধৃতি রয়েছে। তাঁর হাতের লেখাটিও রবীন্দ্রনাথকে মকশো করে রাবীন্দ্রিক হয়ে উঠেছিল।
তাঁর অন্য গীতিনাট্যের নাম ‘অভিযান’। গীতিনাট্যদু’টি এখনও বহু জায়গায় মঞ্চায়িত হয়। ‘রাখালছেলে’-র কথা তো আগেই বলা হয়েছে। তাছাড়াও আছে তাঁর গল্প ‘দেবতাদের ভয়’, যেটি কলকাতা দূরদর্শনে গীতিনাট্য আকারে পরিবেশিত হয়েছিল।
সুকান্ত কোনও প্রেমের কবিতা লেখেননি। যদিও তাঁর জীবনে দু’জন নারী এসেছিলেন, যাঁদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক কোনও অজ্ঞাত কারণে পরিপূর্ণতা পায়নি। ‘প্রেমে পড়ে কবিতা লেখা আমার কাছে ন্যক্কারজনক বলে মনে হয়’, অরুণাচল বসুকে লেখা চিঠিতে লিখেছেন তিনি, যখন তাঁর বয়স মাত্র-ই পনেরো!

সুকান্তর প্রবন্ধ।। মাত্র একটিই প্রবন্ধ পেয়েছি তাঁর, ‘ছন্দ ও আবৃত্তি’। এটি বেরিয়েছিল সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার-সম্পাদিত ‘অরণি’-তে, ২৫.০২.১৯৪৪-এ। সেই বয়সেই এমন প্রবন্ধ লেখার যোগ্যতা তাঁর ছন্দজ্ঞান ও আবৃত্তিশিল্প নিয়ে পরিপক্বতার পরিচয়বাহী। এখানে তিনি বিহারীলাল, রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, কাজী নজরুল ইসলাম থেকে প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, অমিয় চক্রবর্তী, বিমলচন্দ্র ঘোষ, অন্নদাশঙ্কর, সুধীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বসুর ছন্দ নিয়ে আলোকপাত করেছেন। এ-বয়সেই তাঁর কবিতাপাঠ যে কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, এতেই তা প্রমাণিত। তাঁর আশাবাদ, ‘একথা যেন ভাবতে না হয় রবীন্দ্রনাথের পরে কারও কাছে আর কিছু আশা করবার নেই’।
আর আবৃত্তি? এ নিয়ে রবীন্দ্রনাথকেও তো স্বতন্ত্র প্রবন্ধ লিখতে দেখি না! সুকান্ত কি এক্ষেত্রে অগ্রদূত? কান তৈরির জন্য তিনি রবীন্দ্রনাথ ও সুকুমার রায়ের ছড়া আবৃত্তি করতে উপদেশ দিচ্ছেন। আবৃত্তি নিয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ কথা পাই এখানে, ‘সিনেমায় যদি নায়ক-নায়িকা বিশেষ মুহূর্তে দু’চার লাইন রবীন্দ্রনাথের বা নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করে তাহলে কি রসভঙ্গ হবে?’ সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’-এ অপুর মুখে রবীন্দ্রকবিতা শোনা গিয়েছে।
কিটস, চেকভ, কাফকা, এমিলি ব্রন্টি থেকে মধ্যযুগে ফ্রান্সের রাজা নবম চার্লস ও ইংরেজরাজ সপ্তম হেনরির মতোই যক্ষ্মায় মৃত্যু হল সুকান্তর।
তবুও তিনি অমর, জীবিতকালেই রুশ থেকে অনুবাদ করেন যাকে কামাক্ষীপ্রসাদ, পরে অরুণ সোম। ইংরেজিতে অধ্যাপক অমিতেন্দু ভট্টাচার্য, কিরীটী সেনগুপ্ত, রাহাদ আবীর, রিনি ভট্টাচার্য, ক্ষিতীশ রায়, অপর্ণা গঙ্গোপাধ্যায়, বন্ধু অরুণাচল।
১৯৬০-এ ঢাকাতে ‘সুকান্ত একাডেমি’ গড়ে উঠেছিল, লেখক ও বুদ্ধিজীবী সদ্যপ্রয়াত আবুল কাসেম ফজলুল হক ও অন্যান্যদের দ্বারা। ত্রিপুরাতেও তাঁর নামে মিলনায়তন ও প্রেক্ষাগৃহ আছে। অতএব এদেশে জন্মে কেবল পদাঘাত-ই তিনি পাননি, পেয়েছেন ও পাবেন আরও বহু কিছু। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজপুত্রের নাম রাখেন সুকান্ত, তাঁকে নিয়ে কবিতা লেখেন, ‘আমরা চাঁদা তুলে মারবো কীট,/ কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা!’ বুদ্ধদেব বসু তাঁর মৃত্যুতে ‘কবিতা’ পত্রিকায় ছ’পৃষ্ঠা শোকবার্তা লেখেন। লেখেন, ‘গরকির মতো, তার চেহারাই যেন চিরাচরিতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।… হাসিটি মধুর, ঠোঁট দুটি সরল।… কবি হবার জন্যই জন্মেছিলো সুকান্ত, কবি হতে পারার আগেই তার মৃত্যু হল।’ না, কবি হয়েই মৃত্যু হয়েছে সুকান্তর।
অতি সামান্য সময়ের সাহিত্যসাধনায় তিনি অর্জন করেছিলেন সম্পূর্ণ নিজস্ব একটি কাব্যভাষা। রবীন্দ্রনাথকে শিরোধার্য করেও তিনি তাঁর কবিতায় রবীন্দ্রানুসারী নন। তিনি যে সময়ে বসে কাব্যচর্চা করছেন, তখন দিগন্তপ্রসারী ছিল নজরুলের কাব্যকৃতি আর জনপ্রিয়তা। তিরিশের দশক যাঁদের কবিতায় দীপ্ত, সেই প্রেমেন্দ্র-বুদ্ধদেব-সুধীন্দ্রনাথের কাব্যভাষা থেকে তিনি স্বতন্ত্র। জীবনানন্দ, না, সে-প্রভাব-ও নেই তাঁর কবিতায়। মাত্র ষোলো বছর বয়সেই তিনি লেখেন ‘আঠারো বছর বয়স’, যা আমাদের চেতনায় ঘা দেয় আজ-ও। সুকান্তর ‘ছাড়পত্র’ কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় সুভাষ মুখোপাধ্যায় যে ভূমিকা লিখেছেন, তা আমাদের বিস্মিত না করে পারে না, ‘ইস্কুলের ছাত্র অবস্থায় দেশজোড়া এত বিরাট খ্যাতি বাংলার আর কোনও কবির ভাগ্যেই বোধ হয় জোটেনি। এই বয়সেই বিদেশে সুকান্তর একাধিক কবিতার অনুবাদ অনুবাদ হয়েছে, তাঁর কবিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’ তবু দুর্ভাগ্য, সুকান্ত কমরেড মুজফফর আহমদকে উৎসর্গ করা তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘ছাড়পত্র’ জীবিতাবস্থায় দেখে যেতে পারেননি! বইটি প্রকাশিত হওয়ার মাত্র কয়েকদিন আগে তিনি মারা যান।
একজন সাহিত্যিকের রচনার পরিমাপ করা চলে তাঁর লেখায় উদ্ধৃতিযোগ্যতা নিয়ে। কালিদাস, শেকসপিয়র, রবীন্দ্রনাথ তার উদাহরণ। চর্যাপদে ‘আপনা মাঙসে হরিণা বৈরী’ লিখে ভুসুখু অমর হয়ে আছেন। তেমিই বিদ্যাপতি অমর ‘এ ভরা বাদর মাহ ভাদর’-এর দৌলতে, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’ অমরতা দিয়েছে চণ্ডীদাসকে। বা ভারতচন্দ্রকে ‘নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়’, ‘সে কহে বিস্তর মিছা, যে কহে বিস্তর’-এর দরুন।
সুকান্তর লেখায় এহেন উদ্ধৃতিযোগ্য বহু স্থানে আছে। তার-ই কতিপয়:
১.ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়,/ পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।
২. বড়লোকের ঢাক তৈরি গরীব লোকের চামড়ায়।
৩. কে আর মনে রাখে নবান্নের দিনে কাটা ধানের গুচ্ছকে।
৪. বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন।
৫. রাত্রির গভীর বৃন্তে থেকে ছিঁড়ে আনো ফুটন্ত সকাল।
৬. দস্যুর ভয়, তারো চেয়ে ভয়, কখন সূর্য ওঠে।
৭. বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত।
৮. এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে।
এরকম আরও বহু আছে। তাঁর গদ্য, বিশেষ করে চিঠির মধ্যেও ছড়িয়ে আছে সুভাষিতাবলি। সামান্য একটু উদাহরণ:
১. ‘একাকী মানুষ যা চিন্তা করে সেটাই তার নিজের চিন্তা’ (চৈত্র সংক্রান্তি ১৩৩৮-এ লেখা, বন্ধু অরুণাচলকে)।
২. কোনো কিছুর আসাটাই স্বপ্ন— আর যাওয়াটা কঠিন বাস্তব। খুব কম জিনিসই কাছে আসে, কিন্তু যায় তার সব কিছুই’ (অরুণাচলকে, রাঁচী বেড়াতে গিয়ে। তারিখহীন।)।
তাছাড়া তাঁর চিঠিতে আছে আত্মোপলব্ধির কথা। ২৮-এ জ্যৈষ্ঠ ১৩৫৩-তে অরুণাচলকে লিখছেন, ‘আমার লেখকসত্তা অভিমান করতে চায়, কর্মীসত্তা চায় আবার উঠে দাঁড়াতে। দুই সত্তার দ্বন্দ্বে কর্মীসত্তাই জয়ী হতে চলেছে; কিন্তু কি করে ভুলি, দেহ আর মনে আমি দুর্বল, একান্ত অসহায় আমি— একখানাও জামা নেই—’। কী নিদারুণতা! আরেক বন্ধু ভূপেনকে লিখছেন, ১২.০৯.১৯৪৬-এ, তখন তিনি হাসপাতালে, ‘বিছানায় শুয়ে সকালের ঝকমকে রোদ্দুরে দুপুরে দেবদারু গাছের পাতাকে খেলা করতে দেখি। ঝিরঝির করে হাওয়া বয় সারাদিন। রাত্তিরে চাঁদের আলো এসে লুটিয়ে পড়ে বিছানায়, ডালহাউসি স্কোয়ারের অফিসে বসে কোনও দিনই অনুভব করতে পারবি না এই আশ্চর্য নিস্তব্ধতা।’ তাঁকেই লিখছেন ৩০.১০.১৯৪৬-এ, ‘সকালের আশ্চর্য অদ্ভুত রোদ্দুর কোনও কোনও দিন সারাদিন ধরে কেবলই মন্ত্রণা দেয় বেরিয়ে পড়তে; শহর বন্দর ছাড়িয়ে অনেক দূরের গ্রামাঞ্চলের সবুজে মুখ লুকোতে দেয় অযাচিত পরামর্শ।’ সেই ডাকেই তো সাড়া দিয়ে সুকান্ত শহর, গ্রাম ছাড়িয়ে পাড়ি দেন মহাপ্রস্থানের পথে! তবে বড়ই অকালে!

সুকান্ত ভট্টাচার্য; ঝড়ের পাখি

রবীন্দ্রনাথকে আমরা কবি-সার্বভৌম বলে জানি। জীবনের সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনা হাহাকার, নীল মৃত্যু ও নারীর হরিৎ বিভা, সূর্যোদয়ের ভোর ও তিমির দুয়ার, সব-ই তিনি স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন। তাঁর নিজের কথায়, ‘—যেথা তার যত উঠে ধ্বনি,/ আমার বাঁশির সুরে সাড়া তার জাগিবে তখনি’।
তবু নিজ অসম্পূর্ণতা কিন্তু তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি বলেই বলেছেন, ‘আমার কবিতা, জানি আমি,/ গেলেও বিচিত্র পথে, হয় নাই সে সর্বত্রগামী’। কেন? কারণ, কৃষকের জীবনের শরিক হতে পারেননি তিনি, কর্মেও কথায় তাঁদের সঙ্গে আত্মীয়তা জন্মায়নি কবির। আর তাই, ‘যে আছে মাটির কাছাকাছি,/ সে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি’।
কবির কানপাতা সফল হয়েছিল ‘তীর-খাওয়া বুক, ঋণে বাধা শির’, বাংলার কৃষকদের নিয়ে লেখা নজরুলের এমন কবিতায়। নজরুল তো ‘লাঙল’ পত্রিকা সম্পাদনা করে মাটির কাছাকাছি মানুষদের আত্মীয় হতেও চেয়েছেন! ‘আমি কবি যতো কামারের আর কাসারির আর ছুতোরের/ মুটে মজুরের,/ আমি কবি যতো ইতরের’ (প্রেমেন্দ্র মিত্র), বা ফের নজরুলের ‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা, ক্ষুধায় আসে না নিদ’-এর দ্বারস্থ হতে পারি আমরা, পারি সমর সেন, বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, দিনেশ দাসের কবিতার। তবে সবচেয়ে বেশি পারি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কাব্যমালায়।
মাত্র একুশ বছরের জীবনে, মাত্র সাত-আট বছরের লেখালেখি তাঁর, তবু এই স্বল্প সময়ের মধ্যে কী সোনার ফসল-ই না ফলিয়ে গেছেন সুকান্ত! জীবিতকালে নিজের কোনও গ্রন্থ ছাপার অক্ষরে দেখে যেতে পারেননি তিনি। তাঁর অভিভাবকপ্রতিম সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাই আক্ষেপ করে লেখেন সুকান্তর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘ছাড়পত্র’-র ভূমিকায়, ‘সুকান্ত তার নিজের বই দেখে যেতে পারল না— চিরদিন আমাদের এই আক্ষেপ থেকে যাবে’।
তাঁর প্রকাশিত বইয়ের তালিকা শীর্ণ, তবে সেসব রচনার আগ্নেয়তা সুদূরবিস্তারী। ‘ছাড়পত্র’ বেরোয় জুন ১৯৪৭-এ, সত্যজিৎ রায়ের প্রচ্ছদে। সুকান্তর চেয়ে পাঁচ বছরের বড়, ১৯৪৭-এ ‘Calcutta Film Society’-র প্রতিষ্ঠাতা সত্যজিৎ তখন কেবল শিল্পী, পরিচালক হবেন আরও ঢের পরে। ১৯৫০-এ বেরোল ‘ঘুম নেই’, প্রচ্ছদ দেবব্রত মুখোপাধ্যায়-কৃত। এরপর বেরোয় ‘পূর্বাভাস’, জ্যৈষ্ঠ ১৩৫৭-য়, ‘মিঠেকড়া’ শ্রাবণ ১৩৫৮-তে। ‘গীতিগুচ্ছ’-র প্রকাশকাল ১৩৭২, আর ‘অভিযান’ জ্যৈষ্ঠ ১৩৬০। ১৩৬৯-এ প্রকাশিত হয় ‘হরতাল’। এটি সুকান্তর লেখা গল্প ও নাটিকার সঙ্কলন। প্রথম গ্রন্থটি ছাড়া বাকি সবগুলি গ্রন্থের প্রকাশক সুকান্তর পারিবারিক প্রকাশনা সংস্থা ‘সারস্বত’। এছাড়া ‘সারস্বত’ ও ঢাকার বিভিন্ন প্রকাশক, বিশেষ করে ‘ঐতিহ্য’ ‘সুকান্তসমগ্র’ বের করেছে। সেসব প্রকাশনায় কবির কিছু অপ্রকাশিত কবিতা স্থান পেয়েছে, আর পেয়েছে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জনকে লেখা তাঁর ৪৯টি চিঠি, যা আগে কোথাও ইতিপূর্বে প্রকাশিত হয়নি। সুকান্তর মনোজগৎ বুঝতে এই চিঠিগুলোর ভূমিকা অশেষ।
সুকান্তর যাবতীয় লেখার মূল সুর প্রতিবাদ ও সুন্দরের প্রতি তাঁর আকাঙ্ক্ষা। তাই তাঁর রচনাকে একরৈখিক বলা যাবে না। জীবনে দু’বার প্রেম এসেছিল, যা তাঁর বন্ধু অরুণাচল বসুকে লেখা চিঠি থেকে জানতে পারি। তাঁদের একজন উপক্রমণিকা, ছদ্মনাম অবশ্যই। তাঁর প্রতি ভালবাসায় ‘আমার মনের অন্ধকারে ফুটে উঠেছিল একটি রৌদ্রময় ফুল। তার সৌরভ আজও আমায় চঞ্চল করে তুলছে থেকে থেকে’। ১৯৪১-এ লেখা চিঠি, সুকান্তর বয়স মাত্র পনেরো। সেসময়ে লেখা তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি কবিতায় ‘আমার বসন্ত কাটে খাদ্যের সারিতে প্রতীক্ষায়’-এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে এক নারীর ‘রৌদ্রময় ফুল’-কে, আর মেলাতে হবে কেন তিনি কলকাতায় জাপানি বোমা পড়ার সময়ও শহর ছাড়ছেন না, তার গূঢ়ার্থকে। আর মেলাতে হবে সেসময় লেখা ‘প্রস্তুত’ কবিতার এই বাক্যটি, ‘পৃথিবী জটিল, জটিল মনের সম্ভাষণ’। তা হলেই সুকান্তর মানসলোককে ছুঁতে পারব আমরা।
একথা ভাবলে শিহরিত হতে হয় যে, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ আর সুকান্ত, এই চার কবি-মহারথী এক-ই সময় কলকাতা শহরে বসে শ্বাস নিচ্ছেন, কবিতা লিখছেন! সে এক ঐতিহাসিক মহালগন-ই বটে। আমরা এঁদের কাউকেই কোনও দশকের গণ্ডিতে ফেলার ধৃষ্টতা দেখাতে পারিনি। সকলেই কবি এঁরা, নিজ নিজ মুদ্রাগুণে আলাদা। রবীন্দ্রনাথের জীবিতকালে সুকান্ত কবিতা লিখছেন, বিন্দুমার প্রভাবিত না হয়ে। কেননা সুকান্ত, রবীন্দ্রনাথে আকণ্ঠ নিমজ্জিত সুকান্ত তো নিজ ঘোষণা-মোতাবেক কমিউনিস্ট! বৌদিকে চিঠিতে লিখছেন (‘এবারকার বসন্তের প্রথম দিন, মঙ্গলবার, ১৩৫১/১৯৪৪’), ‘কবির চেয়ে বড় কথা আমি কমিউনিস্ট।’ অতএব তাঁর দায়বদ্ধতা জনতার কাছে।
এই দায়বদ্ধতা তাঁকে কবিতা লিখিয়েছে, অক্লান্তভাবে পার্টির কাজ করিয়েছে, কমিউনিস্টদের দৈনিক পত্রিকা ‘স্বাধীনতা’-র ‘কিশোরবাহিনী’-র সঙ্গে যুক্ত রেখেছে, পার্টির কাজে অর্থ সংগ্রহে ব্যস্ত রেখেছে, লেনিন, মার্শাল টিটো, মে দিবস নিয়ে কবিতা লিখিয়েছে, ও পরিশেষে মারণরোগ যক্ষ্মা উপহার দিয়েছে।
বিনিময়ে তিনি দিয়ে গেছেন চিরায়ত কিছু কবিতার অঞ্জলি, যা আমাদের রক্তে মিশে গেছে। তাঁর ‘রানার’ অথবা ‘প্রিয়তমাসু’, ‘একটি মোরগের কাহিনী’ আর ‘আঠারো বছর বয়স’ কালের ভেলায় শাশ্বত। স্যাফো আর ওমর খৈয়াম, কিটস, হ্যেল্ডারলিন বা সিলভিয়া প্লাথ বহুপ্রজ না হয়েও যেমন মর্যাদার সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত, সুকান্ত— তেমনই। মাত্র একুশ বছরের কবি দেশে-বিদেশে অনূদিত হন, তাঁকে নিয়ে প্রবন্ধ লেখা হয়, আর মৃত্যুর পর স্ব-সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় বুদ্ধদেব বসু ছ’পৃষ্ঠা শোককথা লেখেন, মৃত্যুর পর তার নামে কত যে স্কুল-কলেজ আর রাস্তার নামকরণ, পাঠ্যসূচিতে তাঁর অবধারিত অবস্থিতি, এহেন বিস্ময়-প্রতিভার নাম সুকান্ত।
প্রেম এসেছিল জীবনে তাঁর, একাধিক, চলেও গেছে। তবু বাঙালি কবিকুলের মধ্যে ব্যতিক্রমী তিনি, জীবনে কখনও নারীপ্রেম নিয়ে কবিতা লেখেননি। বন্ধু অরুণাচল বসুকে পনেরো বছরের সুকান্ত লিখছেন, (পত্রের তারিখ ২৪-এ পৌষ, ১৩৪৮, অর্থাৎ জানুয়ারি ১৯৪১), ‘প্রেমে পড়ে কবিতা লেখা আমার কাছে ন্যক্কারজনক বলে মনে হয়’। চিঠির অন্তিমে সম্প্রতি পড়া তাঁর পুস্তকতালিকাটি দেখে আশ্চর্য না হয়ে পারি না আমরা, ‘ধাত্রীদেবতা’ (তারাশঙ্কর), ‘কলরব’ (প্রবোধকুমার সান্যাল), ‘বনশ্রী’ (বুদ্ধদেব-অচিন্ত্য-প্রেমেন্দ্র। এই তিনজনের লেখা যৌথ উপন্যাস?), ‘রক্তকমল’ (মণীন্দ্রলাল বসু)। (‘প্রিয়তমাসু’ নামীয় কবিতায় বিভ্রান্তি ঘটলেও কবিতাটি পড়ে টের পাই, এটা তাঁর নিপাট স্বদেশপ্রেমের কবিতা। ‘হে রাজকন্যে/ তোমার জন্যে/ এ জনারণ্যে/ নেইকো ঠাঁই/ জানাই তাই’!
ফিরে যাই প্রথম দিকের কথায়। ‘কর্মে ও কথায়’ আত্মীয়তা অর্জন না করাকে রবীন্দ্রনাথ শৌখিন মজদুরি মনে করতেন। এমন মজদুরি তাঁকে করতেও হয়েছিল, ১৯৩৭-এ যখন ইতালির আবিসিনিয়া আক্রমণের সময় অমিয় চক্রবর্তী কবিকে আফ্রিকা নিয়ে কবিতা লিখতে বলেন। কবি লিখেছিলেন, আর তা সার্থক কবিতাও। তবুও কবি অমিয় চক্রবর্তীকে ভবিষ্যতে এমন অনুরোধ করতে নিষেধ-ও করেছিলেন। কেননা কবিতাটি সার্থক হলেও কবি বুঝেছিলেন, এর সঙ্গে আবিসিনিয়ার বেদনাটির যথার্থ ‘আত্মীয়তা’ জন্মায়নি।
অথচ আত্মীয়তা টের পাই সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের একটি কবিতায়, ‘মেজাজ’, যেখানে আসন্নপ্রসবা এক নারী চাইছে, তার সন্তানটি যেন তার মতো কালো হয়। মা তার নাম রাখবে আফ্রিকা। আর কবির-ও সায় তাতে, ‘কালো মানুষরা কী কাণ্ডই না করছে সেখানে!’
সুকান্ত তাঁর সময়ের চারণকবি। তিনি যে লিখেছেন, ‘আমি এক দুর্ভিক্ষের কবি’, তা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। ‘আমার প্রহর কাটে খাদ্যের সারিতে প্রতীক্ষায়,/ আমার বিনিদ্র রাতে সতর্ক সাইরেন ডেকে যায়’, এ কোনও বিরচিত কাব্যবিলাস নয়, ঘোর বাস্তব। ২৮-এ ডিসেম্বর ১৯৪২-এ বন্ধু অরুণাচল বসুকে লেখা চিঠিতে কলকাতায় জাপানি বোমার মধ্যে তাঁর রুদ্ধশ্বাস জীবনযাপনের যে বর্ণনা, তা পড়লেই তাঁর কবিজীবন ও প্রত্যহের বিভীষিকা উপলব্ধি হবে, ‘কাল রাত্রিতেও আক্রমণ হয়ে গেল,— প্রথম দিন খিদিরপুরে, দ্বিতীয় দিনও খিদিরপুরে, তৃতীয় দিন হাতিবাগান ইত্যাদি বহু অঞ্চলে— (এইদিনে তিন ঘণ্টা আক্রমণ চলে, নাগরিকদের সবচেয়ে ভীতি উৎপাদন করে, পরদিন কলকাতা প্রায় জনশূন্য হয়ে যায়), আর পঞ্চম দিনে অর্থাৎ গতকালও আক্রমণ হয়।— চতুর্থ দিন সদ্য স্থানান্তরিত দাদা-বৌদির সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটের বাড়িতে কেটেছে সবচেয়ে ভয়ানকভাবে’। এ যেন পৃথিবীর আর এক প্রান্তে আর এক চারণিক, আনে ফ্রাঙ্ক, (Anne Frank) যিনি ১২.০৬.১৯৪২ থেকে ০১.০৮.১৯৪৪ পর্যন্ত দু’বছর দু’মাস ধরে বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত যুদ্ধের মোকাবিলা করে যাচ্ছিলেন, তার-ই সমান্তরালে অবস্থিত। উল্লেখ্য, আনে মারা যান সুকান্তর একমাস পর, মাত্রই ১৫ বছর বয়সে। সুকান্ত টিবি-তে, আনে টাইফাসে! আর পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে দু’জনেই কী আশাবাদী! আনে ফ্রাঙ্ক তাঁর ডায়েরিতে লিখছেন, ‘In the long run, the sharpest weapon of all is a kind and gentle spirit’. । অন্যদিকে সুকান্ত, ‘পৃথিবীকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি’!
সুকান্তের কবিতা থেকে কবিতায় পর্যটনে মিলবে এমন-ই অন্তরঙ্গ আর নিবিড় ও আশ্চর্য ধমনীতে বয়ে চলা অবিরাম রক্তস্রোত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 3 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »
সালমিন রহমান

বেলুচিস্তান সংকট মোকাবিলা কতটা সহজ

বেলুচিস্তানের সংকটকে কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদ কিংবা কেবল নিরাপত্তা সমস্যার দৃষ্টিতে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি বোঝা যায় না। এখানে ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, প্রাকৃতিক সম্পদ, উন্নয়ন বৈষম্য, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা— সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্বাধীন বেলুচিস্তান গঠিত হলে বহু মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে পারে। একই সঙ্গে একটি নতুন রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াবে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা। অন্যদিকে, পাকিস্তান, চীন, ভারত এবং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও দুই বিখ্যাত বাঙালি

কী অসাধারণ শিক্ষাই না আমরা পেতে পারি, উৎসাহিত হয়ে পারি খেলোয়াড়দের থেকে! একটি উদাহরণ: প্রথম বিশ্বকাপে সোনাজয়ী উরুগুয়ে দলে ছিলেন হেক্টর কাস্ত্রো। তেরো বছর বয়সে মেশিনে তাঁর ডানহাত কাটা পড়েছিল। অদম্য উৎসাহে তিনি ফুটবল খেলেছেন, জাতীয় দলে স্থান করে নিয়েছেন, আর ফাইনালে জয়সূচক গোলটিও তাঁর-ই করা! তাঁর স্বদেশবাসী তাঁকে ডাকতেন— ‘এল ডিভিনো মানকো’, অর্থাৎ একহাত-বিশিষ্ট ঈশ্বর।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আমেরিকার স্বাধীনতা: আড়াইশো বছর

১৬০৭ থেকে ১৭৮৩ পর্যন্ত সময়কাল আমেরিকায় ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক রাজত্ব। আজকের দিনে যে আমেরিকা, তা কিন্তু পুরোটা ব্রিটিশদের দখলে ছিল না। ছিল ভার্জিনিয়া, ম্যাসাচুসেটস, নিউ ইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া-সহ ১৩টি রাজ্য। আর কানাডার বেশ কিছু অঞ্চল। আমেরিকার অন্যান্য স্থানে ফরাসি, ডাচ, নরওয়েজিয়, সুইডিস উপনিবেশ-ও ছিল। তাছাড়া রাশিয়া আমেরিকার আলাস্কা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত দখল করে। পরে সে আলাস্কা আমেরিকার কাছে বিক্রিও করে দেয়।

Read More »