Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

সুজিত বসুর চারটি কবিতা

সেতুর উপর গালিয়া

মস্কো নদীর সেতুর উপর হঠাৎ হল সাক্ষাৎকার
নদী তখন সূর্য-তেজে গলন্ত এক দীপ্ত ধাতু
ফাল্গুন না চৈত্র মাস ঠিক মনে নেই এখন আমার
উরালদেশি আধো আধো মিষ্টি রুশি উচ্চারণে
মনের ভিতর কুয়াশানীল, চোখেও কী আশ্চর্য জাদু
গলার রুমাল ঘোমটা হল, কপালে টিপ কী বিভ্রমে
হঠাৎ সিঁদুর, বেলাশেষের ক্লান্ত আলো এক ঝলকে
স্নিগ্ধ শিথিল জ্যোৎস্না যেন রূপান্তরে অকারণে
পার্কে তুমি ভ্রূক্ষেপও তো করলে না কী বলল লোকে
আমার যত দর্শনকে অনায়াসে বিনাশ্রমে
বন্ধ করে ধরলে তুলে উন্মুখ ঠোঁট পদ্মকলি
অতীত কাল ভবিষ্যৎ আর বর্তমানকে জলাঞ্জলি
সঙ্গে সঙ্গে দিয়েছিলাম, জীবন থেকে চারখানি দিন
হারিয়ে গেল, যেমন হারায় মোহনাতে খরস্রোতা
নদী এবং আমিও যদি পালিয়ে যেতাম সন্ধানী তিন
চোখগুলোকে ফাঁকি দিয়ে, তবে কি আর যন্ত্রদানব
অপহরণ করে তাকে, নিয়ে পালায় সেই গালিয়া
‘সর্বস্ব গেল গেল’ বলে তবে বিলাপ সরব
করি না আর, অশ্রু মুছে বলি না দাসভিদানিয়া
সেই তো আমার ভাগ্য, তবু, সেই তো আমার বিষণ্ণতা।

*

স্বর্ণবৃত্তে শায়ক

অন্ধকারে বসে থাকি নিরালায় স্থাণু হয়ে ভাঙা এক চারপায়া চেয়ারে
আবছায়া আঁধারিতে মুঠো মুঠো বাতাসেরা কত যে স্বপ্নের গান গায়
দুর্বোধ্য ভাষায় কিন্তু, তাই তা না শুনে আমি মনোযোগ দিয়ে দেখি কে হারে
অসম দ্বৈরথ যুদ্ধে, অস্বচ্ছ জলের মতো যেটি চলে গোলঘরে ছায়ায় ছায়ায়

উৎসেরও অবনতি! আঙিনায় মেলে দেওয়া আলোগুলি পরী হয়ে যেন উড়ে যায়
রাস্তার বিদ্যুৎবাতি শুধুই বিদ্রূপ করে উপহাসে, ক্রোধে ক্ষিপ্ত হয়ে ভাবি মনে
বাহিরে রুপোর থালা চাঁদ আছে, ব্যর্থ তাই ক্রুর ফাঁদ, মুখ শুধু রাখি ঝরোকায়
জলপাই পাতা দিয়ে আলপনা এঁকে দেওয়া বাতায়ন বন্ধ হয় হাওয়ার গর্জনে

ব‍্যাকুল এখন হই এবং ভয়ও পাই, কপাল গালের থেকে ঝরে পড়ে বিন্দু বিন্দু স্বেদ
কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক
করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক
ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ
আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ
আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

*

বিজ্ঞাপন

টিভি খুললেই বিনোদনে ছেদ ঘটায় বিজ্ঞাপন
কত রকমের সাবান রয়েছে ফিরিস্তি শোনা তার
নিকুচি করেছে এবার আমিও দৃঢ়তায় করি পণ
নানা পণ্যের বিবিধ গুণের ছাপাব ইস্তাহার

কফিতে সুখের অমৃতধারা, ফ্রিজে দুঃখের জ্বালা
জুড়োবে, সাবান ঘোচাবে মনের কলঙ্ক নাগপাশ
কিছু না কিনেও চাইলে পাবেন শান্তির ফুলমালা
না হলে থাকুন বিজ্ঞাপনের চিরকাল ক্রীতদাস।

*

কলঙ্ক

বাসন জুড়ে কলঙ্ক ছাপ কালো
সাবান গুঁড়ো ঢেলেও পরিষ্কার
হয় না দেখে মানুষ করে সাবান আরো ভাল
কলঙ্ক নিশ্চিহ্ন করার জন‍্য আবিষ্কার

মনের মধ্যে কলঙ্ক যা কোন সাবানে তার
শুদ্ধি হবে, এই জীবনে শোনা
হয়নি, শুধুই গালের কালো তিলে প্রতিমার
কলঙ্ককে সবাই করে প্রণাম আরাধনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 − 15 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
পবিত্র সরকার

পবিত্র সরকারের বিশেষ রচনা

বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষদের রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে একটু বেশি দুর্বলতা আছে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে যত কিছু, তাঁদের কাছেও তত কিছু তো বটেই, কিন্তু তারও চেয়ে অনেকটা বেশি। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেনাপতি। বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় থেকে, আয়ুব শাহি ফরমানে রেডিয়োতে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষেধ আর রবীন্দ্র-শতবার্ষিকীর ওপর ফতোয়া জারি থেকে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক মহাশক্তিধর যোদ্ধা, তাঁর সম্বন্ধে এঁরা তাই এত স্পর্শকাতর।

Read More »
মীরাতুন নাহার

মীরাতুন নাহারের প্রবন্ধ

হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতা এবং মুসলমান-সাম্প্রদায়িকতা উভয়কেই তিনি যুক্তি ও তথ্যদ্বারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ধ্বংসাত্মক বলে বোঝাতে চেয়েছেন দেশবাসীকে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত দেশবাসীকে তিনি হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যদিও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ‘সাম্প্রদায়িকতার বিষ’ দেশবাসীর মন থেকে নিষ্কাশন করে দেশকে বিপন্মুক্ত করা।

Read More »
গৌতম ঘোষ

গৌতম ঘোষের প্রবন্ধ

চলচ্চিত্রের ধর্ম হল সময়কে ধরে রাখা, সময়ের স্মৃতিমালাকে ধরে রাখা। সেই পদ্ধতি, সেই প্রক্রিয়া কিন্তু চলতেই থাকবে। এখন আমাদের আরও মানবিক হতে হবে। চলচ্চিত্র যারা তৈরি করবেন তারা শুধুমাত্র সস্তার বিনোদন সরিয়ে রেখে একটু মানবিক ছবি করবেন। যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক, মানুষ ও সমাজের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক থাকবে। যা আমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক সব সিনেমায় দেখেছি, সেই ভাবনায় ভাবতে হবে।

Read More »
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ নিবন্ধ

বস্তুত সুকান্ত কবিতার চাইতে বড়। তিনি এক প্রতীকচিহ্ন। সারা ভারতে যখন কবিকে ভাবা হয়েছে জনতার একজন প্রতিনিধি হিসেবে, তখন সুকান্তকেই ভাবা হয়েছে। তামিল বা হিন্দি সিনেমাতেও হয়েছে। যেমন রাজেশ খান্নার ‘অনুরোধ’ নামের ছবিটিতে যে কবিটি রাজেশের বন্ধু ছিলেন তার নাম সুকান্ত। অথবা অতদূরে কেন যাই, বাংলায় উত্তম-তনুজার ‘দেনা পাওনা’ ছবিতে উত্তম যে বন্ধুর চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন, তার নামও তো সুকান্ত। তিনিও তো ফুসফুসের রোগী।

Read More »