Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

গৌতম ঘোষের প্রবন্ধ

বিকৃত রুচির সিনেমা সমাজের অনেক ক্ষতি করেছে

গৌ ত ম  ঘো ষ

আমি দীর্ঘদিন চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত এবং অনেক পরিবর্তন দেখেছি। প্রযুক্তির পরিবর্তন-সহ সমগ্র বিশ্ব জুড়ে যে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন এবং দেশে-বিদেশে ও আমার নিজের ছবিতেও কীভাবে তার প্রতিফলন ঘটেছে— সেগুলি সম্বন্ধে আমি যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, আজ বিশ্বের মানুষ যে অবস্থায় বাস করছে তা ত্রাস ও আতঙ্কের অবস্থা। কী হবে, কোথায় যাব, কীভাবে বাঁচব, কেউ ঠিক আছে, কেউ নেই, কারও অন্ন আছে কারও নেই— সব মিলিয়ে একটা অভূতপূর্ব সংকট।

মনে আছে, আমার তখন অল্পবয়স। ১৯৭৪ সালে একটা দুর্ভিক্ষের মতো অবস্থা হয়েছিল আমাদের এখানে। বিভিন্ন অঞ্চলে লঙ্গরখানা খোলা হয়েছিল। সেখানে জলের মতো খিচুড়ি দিচ্ছে, লোকে তাই নিয়ে যাচ্ছে পাগলের মতো। সেই মানুষগুলো শহরে এসে ভাত চাইছে, ফ্যান চাইছে। অথচ গুদামে প্রচুর জিনিস জমা হয়ে পড়ে রয়েছে। তখন ‘Hungry Autumn’ নামে ছবিটা করেছিলাম। শরৎকাল হচ্ছে আমাদের উৎসবের সময়। সেই শারদোৎসবের কালে সমগ্র গ্রামবাংলা এবং শহরবাসীর একাংশ একেবারে দুর্বিষহ অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছে। ট্রামলাইনের ধারে কাতারে কাতারে লোক শুয়ে রয়েছে তাঁবু খাটিয়ে, অস্থায়ী আস্তানা বানিয়ে। গ্রাম থেকে আসা মানুষ শহরের রাস্তায়, গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যদি কিছু পাওয়া যায়, যদি কিছু ভিক্ষে মেলে, সেই আশায়। এরা কেউই কিন্তু আদতে ভিক্ষাজীবী নয়। এরা সব গ্রামীণ সমাজের মানুষ। সময় তাদের খেয়েপরে বেঁচে থাকার আশা শেষ করে দিয়েছিল, সর্বস্বান্ত করে দিয়েছিল। সেই সময় একটা ছোট্ট Paillard-Bolex ক্যামেরা, ১৬ মিলিমিটার ফিল্মের হ্যান্ড-ওয়াইন্ড চাবি ক্যামেরা নিয়ে আমি ও আমার কয়েকজন বন্ধু বেরিয়ে পড়লাম। ঠিক করলাম, এই অবস্থার একটা ডকুমেন্টেশন হওয়া দরকার। তার সঙ্গে কারণগুলোকেও আমরা বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করব যে, এর পেছনে কতরকমের স্বার্থ জড়িত এবং চূড়ান্ত মানবিকতার অভাব দেখা দিয়েছে সমাজ জুড়ে। তা নিয়েই Hungry Autumn ছবিটি।

প্রথমবার World Food Conference অনুষ্ঠিত হচ্ছে সে বছর, রোমে। তখন আমেরিকান বুরোক্র্যাট Earl Butz বলছেন, “Food is a weapon. It is now one of the principal tools in our negotiating kit”। ভুখা পৃথিবীর কাছে এটা একটা নির্মম বিবৃতি। মানে, খাদ্যটা হচ্ছে এখন আমাদের কাছে যুদ্ধাস্ত্র, এটা দিয়ে আমাদের বহু দেশকে বশ করতে হবে। আমরা কিছু কিছু খাবার দেব, কিন্তু তাদের আমাদের কথা শুনে চলতে হবে। আমাদের জন্য বাজার খুলে দিতে হবে। এটা একটা বিরাট চক্র বলে মনে হয়েছিল, যখন আমরা Hungry Autumn ছবিটা করেছিলাম। এখন যা পরিস্থিতি, বোধহয় আবার বেরিয়ে পড়তে হবে একটা ‘Hungry summer’ করতে। কারণ আগামী দিনগুলো ভয়াবহ অবস্থার দিকে যাচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, সারা পৃথিবী জুড়ে আমরা মানুষেরা এত এত যুদ্ধাস্ত্র বানিয়েছি, পরমাণু অস্ত্র বানিয়েছি, তার পিছনে কোটি কোটি ডলার ইনভেস্ট করেছি।

আমি কয়েকটা ক্লাসিক ছবি দেখলাম নতুন করে। বেশ কিছু চলচ্চিত্র রয়েছে যেখানে ফিল্মমেকাররা প্রায় ভবিষ্যদ্‌বাণীর মতো বলেছিলেন যে, মানবসভ্যতায় একটা ভয়ঙ্কর সময় আসতে চলেছে। সত্যজিৎ রায় এবং আকিরা কুরোসাওয়ার শেষের দিকের অনেক ছবির মধ্যে এর ইঙ্গিত আছে। কারণ, মানুষ অত্যন্ত বাড়াবাড়ি করেছে। মানুষ প্রকৃতিকে ছারখার করে ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছে। আমরা উন্নয়নের নামে জঙ্গল নষ্ট করেছি, নদীকে নষ্ট করেছি, সব কিছুকে ধ্বংস করেছি। প্রকৃতি অনেকবার কিন্তু আমাদের ওয়ার্নিং দিয়েছে। ফিসফিস করে বলেছে, একটু শোনো, একটু সংযত হও। আমরা শুনিনি। আগামী পৃথিবীর ভবিষ্যৎ কী হবে আমরা জানি না।

একইভাবে, আমাদের সিনেমার কী ভবিষ্যৎ, আমরা জানি না। আমরা তো সিনেমা মূলত একটা বড়পর্দার জন্য করি। অন্তত আমি তাই করি এবং সেটা বলতেও ভালবাসি। আমি Raahgir নামে একটি ছবি করেছি। সাধারণ মানুষের মানবিকতার ওপরে নির্মিত এই ছবিটির রিলিজ আটকে রয়েছে। তারপরে ইন্দো-ইতালিয়ান কো-প্রোডাকশনে একটা নতুন ছবি শুরু করলাম। মাল্টিলিঙ্গুয়াল ছবি। ছবির প্রেক্ষাপট প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতা নিয়েই। একজন খুবই সংবেদনশীল ইতালিয়ান ডকুমেন্টরি মেকার ও লেখক ভারতে এসেছেন। সদ্য মাতৃহারা ছেলেকে রেখে এসেছেন ইতালিতে। আগেও তিনি এসেছিলেন। আবার এসেছেন নতুন করে ভারতবর্ষকে খুঁজতে, জানতে। এসে দেখছেন ২৫ বছর আগের ভারত পাল্টে গিয়েছে সর্বার্থে। গল্পটার মধ্যে তাই তিনটে ল্যাঙ্গুয়েজ— ইতালিয়ান, ইংরেজি ও হিন্দি। আমাদের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির অবস্থাও এত অদ্ভুত ও জটিল হয়ে রয়েছে যে, কী হবে জানা নেই।

এই প্রসঙ্গে আমার একটা প্রবন্ধের কথা খুব মনে পড়ছে। লিখেছিলেন বিখ্যাত আমেরিকান ফিল্মমেকার David Wark Griffith, যাঁকে মার্কিন সিনেমার অন্যতম পথিকৃৎ বলা হয়। The Birth of a Nation (১৯১৫), Intolerance (১৯১৬) প্রভৃতি অসংখ্য অসাধারণ সব ছবি করেছেন তিনি। আমেরিকার মতো দেশে বিখ্যাত সব ছবি নির্মাণের মাধ্যমে সিনেমার ভাষা তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর একটা বিরাট ভূমিকা ছিল। তিনি ১৯২৪ সালে ‘The Movies 100 Years from Now’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। শতবর্ষী সেই প্রবন্ধেই তিনি বলেছিলেন, সিনেমায় প্রযুক্তির বিরাট পরিবর্তন হবে। হয়তো সাদা-কালো ছবি রঙিন হয়ে যাবে, হয়তো একদিন শব্দ আসবে। তিনি শুধু একজন সৃষ্টিশীল মানুষই নন, তিনি একজন স্বপ্নদর্শী। তাই এই পরিবর্তনের বাইরে বেরিয়ে ভেবেছিলেন, সিনেমা মানুষের মঙ্গলও করবে। গ্রিফিথ লিখেছিলেন, সিনেমার এমন একটা আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা আছে যে এই সিনেমার মাধ্যমে পৃথিবীর মানুষ একদিন একে অপরকে চিনতে পারবে। ভাল করে যদি চিনতে পারে তাহলে মানুষ বুঝবে পারবে পৃথিবীর সব মানুষই আসলে এক। ভেদাভেদ চলে যাবে এবং যুদ্ধ বন্ধ হবে। এটাই ছিল ওঁর স্বপ্ন এবং লেখাটির মধ্যে সেই আশার কথা প্রকাশ করে গ্রিফিথ লিখেছিলেন, সিনেমা এমন একটা জিনিস করবে যে জাপানের লোক লাতিন আমেরিকার লোককে জানতে পারবেন, লাতিন আমেরিকার লোক ভারতের লোককে জানতে পারবেন। এইরকম একটা আন্তর্জাতিক ভাষা ও অদ্ভুত পরিমণ্ডল তৈরি হবে যেখানে আর যুদ্ধ করবে না মানুষ, বুঝতে পারবে আমরা সবাই ভাই-ভাই।

কিন্তু তা তো হল না। ১৯২৪-এর পর আমরা দেখলাম অসংখ্য যুদ্ধ। সারা পৃথিবী জুড়ে ভয়ঙ্কর খাদ্যাভাব, অর্থনৈতিক মন্দা, বিধ্বংসী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। জাপানের হিরোসিমা-নাগাসাকিতে অ্যাটম বোমার ধ্বংসলীলার মধ্য দিয়ে বিশ্বযুদ্ধ শেষ হল বটে, তারপরেও কিন্তু যুদ্ধ বন্ধ হয়নি। কোরিয়ায় যুদ্ধ, ইন্দোনেশিয়ায় যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, লাতিন আমেরিকায় অসংখ্য ছায়াযুদ্ধ, ইওরোপে পরবর্তীকালে গৃহযুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ, সিরিয়ায় যুদ্ধ, শ্রীলঙ্কায় যুদ্ধ— যুদ্ধ যুদ্ধ আর যুদ্ধ। সর্বত্র যুদ্ধ। গ্রিফিথের যে স্বপ্ন, তার একেবারে উল্টো খাতে বইতে থাকল সভ্যতা। তিনি আশার কথা শুনিয়েছিলেন কিন্তু মানুষ পরিবর্তিত হয়নি। সিনেমা মানুষকে পাল্টাতে পারেনি। বরং বাজারকে ধরে ফেলল আমেরিকান সিনেমা। হলিউড সমস্ত পৃথিবীতে রাজত্ব করতে আরম্ভ করল। হলিউডের রাজত্ব এখনও রয়েছে। হয়তো আর একচ্ছত্র নেই কিন্তু তার দাপট সবচেয়ে বেশি। সেই সিনেমা বাজার তৈরি করল কিন্তু এই যে ভ্রাতৃত্ববোধ, এই যে একটা সমবেদনা, সেটা সিনেমা তৈরি করতে পারল না।
সিনেমা সামাজিক পরিবর্তন আনতে পারেনি। বরং বিকৃত রুচির সিনেমা সমাজের অনেক ক্ষতি করেছে। সামাজিক মূল্যবোধকে নষ্ট করে দিয়েছে। ভারতে আমাদের যে অসাধারণ লোকসংস্কৃতি ছিল সেটাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে বলিউড। কারণ এখানে লোকসংস্কৃতি ছোট ছোট পকেটে বেঁচে আছে। কিন্তু এইরকম একটা বিরাট দেশে যেখানে নানা ধরনের সংস্কৃতি— সিনেমা সেটাকে তছনছ করে দিয়েছে। তাকেই স্পনসর করেছে টেলিভিশন এবং সরকারি ব্যবস্থা। ফলে এটা একটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার যে, সিনেমা ভাল না করলেও ক্ষতি করেছে অনেক। কিন্তু তাও আমি বলব, সিনেমা যেটা করতে পেরেছে সেটা হল মানুষের এই যে বিবর্তন, সামাজিক বিবর্তন, তার একটা স্মৃতিমালা রেখে যেতে পেরেছে। সিনেমা আসলে রেকর্ড করেছে বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন মুহূর্ত। সেটাও একটা বড় সম্পদ আমাদের কাছে। এই যে অডিয়ো-ভিস্যুয়াল ডকুমেন্টেশন, সেটা সিনেমা করতে পেরেছে।

এখন ফিল্ম (সেলুলয়েড) উঠে গিয়েছে প্রায়। ফিল্মের ল্যাবরেটরি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আমি বহুদিন— ‘মনের মানুষ’ পর্যন্ত— ফিল্মে বা সেলুলয়েডে কাজ করেছি। আমরা যারা সিনেমা শুরু করেছিলাম ফিল্মে, আমাদেরও এখন ডিজিটালে কাজ করতে হচ্ছে। প্রযুক্তি প্রতিমুহূর্তে বদলাচ্ছে। নতুন নতুন প্রযুক্তি আসছে। চিরকালই সিনেমা প্রযুক্তির বদলের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে বদলেছে। তার ভাষা বদলেছে, দর্শকের দেখাটাও বদলেছে। একটা সময় নির্বাক ছবি ছিল, প্রযুক্তিবিদরা তাতে শব্দ সংযোজনের কৌশল বের করলেন। সবাক ছবি হয়ে গেল। কিন্তু নির্বাক ছবির যে অপূর্ব ভাষা তৈরি করেছিলেন শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকার, কলাকুশলীরা, সেটা একদম বিসর্জনে গেল। জলাঞ্জলি গেল সব। একবারে মুখ থুবড়ে পড়ল। ভাষা নষ্ট হয়ে গেল তার। আবার প্রায় থিয়েটারে ফিরে গেল সিনেমা। সংলাপ আর সংলাপ। কিন্তু তবুও নতুন করে আবার সৃষ্টিশীল মানুষরা সাউন্ড ফিল্মের নতুন একটা ভাষা তৈরি করলেন। এই সাউন্ড ফিল্মের ভাষার সঙ্গে এল রং। প্রথমটায় ছিল রং দেখানোর প্রকট চেষ্টা। পরবর্তীকালে রঙের যে সৃষ্টিশীল ব্যবহার, সেটা শুরু হল। এভাবেই পরিবর্তন হচ্ছে।

আমার চলচ্চিত্রজীবনে আমি ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটে কাজ করেছি, অ্যানালগে কাজ করেছি, অপটিকাল সাউন্ডে কাজ করেছি, পরে ম্যাগনেটিক সাউন্ডে কাজ করেছি। তারপরে অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল হল। ডিজিটাল মাধ্যমেও কাজ করেছি। একটা বিরাট পরিবর্তন দেখলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চলচ্চিত্রের ভাষাও খানিকটা বদলে গিয়েছে। এখন আমার আশা, হয়তো বড় স্কেলের কিছু সিনেমা টিকে থাকবে। আমাদের নতুন প্রজন্ম যারা হাতে ডিজিটাল পেয়েছে, তারা অনেক ব্যক্তিগত সিনেমা তৈরি করবে।

একসময় ফরাসি চলচ্চিত্র সমালোচক alexandre astruc লিখেছিলেন, সিনেমা তখনই মুক্ত হবে যখন ফিল্ম ও ক্যামেরা কাগজ-কলমের মতো সস্তা হয়ে যাবে। আস্তে আস্তে সেটাই হচ্ছে। কারণ এখন একটা ভাল মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় আপনি সুন্দর মুভিং ইমেজ তুলতে পারেন। ফলে এর ভাষা বদলাবে, অনেক ব্যক্তিগত ছবি তৈরি হবে এবং হচ্ছেও নানা দিকে। তার অভিব্যক্তি বদলে যাবে। ফলে এটা একটা ক্রমপরিবর্তনশীল ব্যাপার এবং এটা চলতে থাকবে নানাভাবে। যেমন একসময় অপেরা হাউসগুলোর যে জনপ্রিয়তা ছিল তা আর আগের মতো থাকেনি। কিন্তু অপেরা হাউস তো টিকে রয়েছে এখনও। তার টিকিটের দাম হয়তো অনেক বেশি। এখানে সিনেমার ক্ষেত্রেও তাই হবে হয়তো। বড়পর্দার টিকিটের দাম হবে প্রচুর, ফ্যান্সি প্রাইস হবে, কিন্তু ঘরে ঘরে মানুষ ছবি দেখতে পারবে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছেও সিনেমা নিয়ে বিস্তর পরীক্ষানিরীক্ষার সুযোগ রয়েছে। সিনেমা এখন খানিকটা টেলিভিশনে, খানিকটা ডিজিটাল মাধ্যমে লোকে দেখছে।

চলচ্চিত্রের ধর্ম হল সময়কে ধরে রাখা, সময়ের স্মৃতিমালাকে ধরে রাখা। সেই পদ্ধতি, সেই প্রক্রিয়া কিন্তু চলতেই থাকবে। এখন আমাদের আরও মানবিক হতে হবে। চলচ্চিত্র যারা তৈরি করবেন তারা শুধুমাত্র সস্তার বিনোদন সরিয়ে রেখে একটু মানবিক ছবি করবেন। যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক, মানুষ ও সমাজের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক থাকবে। যা আমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক সব সিনেমায় দেখেছি, সেই ভাবনায় ভাবতে হবে। ইঁদুরদৌড়ে দৌড়নো বন্ধ করতে হবে আর মানুষকে নির্লোভ হতে হবে। কারণ লোভের পরিণাম আমরা তো দেখলাম। চলচ্চিত্রকারদেরও নির্লোভ হতে হবে এবং তিনটে শব্দ ডিকশনারি থেকে তুলে দিতে হবে। ভিআইপি, সেলিব্রিটি এবং স্টার। এই তিনটে শব্দ হচ্ছে মারণাস্ত্র। মানুষের সঙ্গে মানুষের একটা বৈষম্য তৈরি করে। কারণ এই তিনটি শব্দ নিয়ে মানুষের যে ব্যবহার আমি দেখেছি এবং সবসময় দেখছি, তাতে বোধহয় পৃথিবী থেকে ভিআইপি, সেলিব্রিটি এবং স্টার নামক শব্দগুলি বাদ দিতে হবে। তবেই আমরা অনেক সুস্থভাবে প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে বাঁচতে পারব এবং নতুন ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারব।

চিত্রণ: সৌজন্য চক্রবর্তী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

11 − 2 =

Recent Posts

পবিত্র সরকার

পবিত্র সরকারের বিশেষ রচনা

বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষদের রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে একটু বেশি দুর্বলতা আছে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে যত কিছু, তাঁদের কাছেও তত কিছু তো বটেই, কিন্তু তারও চেয়ে অনেকটা বেশি। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেনাপতি। বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় থেকে, আয়ুব শাহি ফরমানে রেডিয়োতে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষেধ আর রবীন্দ্র-শতবার্ষিকীর ওপর ফতোয়া জারি থেকে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক মহাশক্তিধর যোদ্ধা, তাঁর সম্বন্ধে এঁরা তাই এত স্পর্শকাতর।

Read More »
মীরাতুন নাহার

মীরাতুন নাহারের প্রবন্ধ

হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতা এবং মুসলমান-সাম্প্রদায়িকতা উভয়কেই তিনি যুক্তি ও তথ্যদ্বারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ধ্বংসাত্মক বলে বোঝাতে চেয়েছেন দেশবাসীকে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত দেশবাসীকে তিনি হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যদিও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ‘সাম্প্রদায়িকতার বিষ’ দেশবাসীর মন থেকে নিষ্কাশন করে দেশকে বিপন্মুক্ত করা।

Read More »
গৌতম ঘোষ

গৌতম ঘোষের প্রবন্ধ

চলচ্চিত্রের ধর্ম হল সময়কে ধরে রাখা, সময়ের স্মৃতিমালাকে ধরে রাখা। সেই পদ্ধতি, সেই প্রক্রিয়া কিন্তু চলতেই থাকবে। এখন আমাদের আরও মানবিক হতে হবে। চলচ্চিত্র যারা তৈরি করবেন তারা শুধুমাত্র সস্তার বিনোদন সরিয়ে রেখে একটু মানবিক ছবি করবেন। যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক, মানুষ ও সমাজের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক থাকবে। যা আমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক সব সিনেমায় দেখেছি, সেই ভাবনায় ভাবতে হবে।

Read More »
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ নিবন্ধ

বস্তুত সুকান্ত কবিতার চাইতে বড়। তিনি এক প্রতীকচিহ্ন। সারা ভারতে যখন কবিকে ভাবা হয়েছে জনতার একজন প্রতিনিধি হিসেবে, তখন সুকান্তকেই ভাবা হয়েছে। তামিল বা হিন্দি সিনেমাতেও হয়েছে। যেমন রাজেশ খান্নার ‘অনুরোধ’ নামের ছবিটিতে যে কবিটি রাজেশের বন্ধু ছিলেন তার নাম সুকান্ত। অথবা অতদূরে কেন যাই, বাংলায় উত্তম-তনুজার ‘দেনা পাওনা’ ছবিতে উত্তম যে বন্ধুর চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন, তার নামও তো সুকান্ত। তিনিও তো ফুসফুসের রোগী।

Read More »
কালীকৃষ্ণ গুহ

কালীকৃষ্ণ গুহর কবিতা

একটি রাত্রি কা লী কৃ ষ্ণ  গু হ প্রতিটি রাত্রিকেই নতুন মনে হয়— অচেনা লাগে। আজকের রাত্রিটা যেন চির-অচেনা যেন কিছু ঘটার ছিল যা ঘটেনি

Read More »
অভিজিৎ সিরাজ

অভিজিৎ সিরাজের ছোটগল্প

ফরেস্ট বাংলো অ ভি জি ৎ  সি রা জ শঙ্কর দত্তকে আমি শেষ দেখি আনন্দপুরে মাদুরদহের একটা স্কুল বাড়িতে। অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল সেদিন। বাড়ির

Read More »