ফরেস্ট বাংলো
অ ভি জি ৎ সি রা জ
শঙ্কর দত্তকে আমি শেষ দেখি আনন্দপুরে মাদুরদহের একটা স্কুল বাড়িতে।
অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল সেদিন। বাড়ির খোলা ছাদে বসে গান শুনছিলাম আমরা। দ্বাদশী চাঁদের আলোয় শঙ্করের স্ত্রী গাইছিল, তুমি কোন কাননের ফুল/তুমি কোন গগনের তারা।…
শঙ্করকে কতকটা আনমনা লাগছিল। তার দৃষ্টি ছিল দূরে, নোনাডাঙার খালে। সেখানে পাড় বরাবর আলো আঁধারির খেলা। ভাড়া গাড়ি আর বাইকের সারি। কাজ সেরে ঘরে ফিরছে সবাই।
শঙ্কর হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, রুমু অনেক রাত হয়ে গেছে। আর দেরি করিও না। চলুন অভিজিৎদা, আপনাদের এগিয়ে দিই।…
কাহিনির শুরুতেই শঙ্করের সঙ্গে শেষ দেখার কথা কেন বলেছি, তা জানতে হলে আদি পর্বের কিছু আলগা বৃত্তান্ত উল্লেখ করা দরকার।
শঙ্কর আমার সহকর্মী, সেই সূত্রে কিঞ্চিৎ ঘনিষ্ঠতা আগেই ছিল। তারপর যখন সে হালতুর বাসস্থান ছেড়ে আনন্দপুরে আমাদের পড়শি হয়ে উঠলো, তখন পারিবারিক বন্ধু হয়ে উঠতে দেরি হয়নি তার। ছুটির দিনে সন্ধেটা ভালোই কাটতো শঙ্করের ডেরায়। কারণ মাদুরদহ রোডের ধারঘেঁষা ওই এলাকাটা এখনও উন্নয়নের মুখ দেখেনি, এবং সবুজের চিহ্ন টিকে আছে প্রচুর। সেখানকার মানুষজন প্রান্তিক শ্রেণির, বেশ ঘরোয়া ও মিশুকে। বেড়া দেওয়া গেটের ভেতরে মাটির তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালানো হাসিমুখ বধূ, এমন দৃশ্য আজও বিরল নয়। গোধূলি বেলায় দূরের কোনও মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনিও কানে আসতো। স্বভাবতই আমাদের মতো একদা গ্রামবাসী মানুষের কাছে শঙ্করের পাড়াটা বেশ আকর্ষণীয় মনে হতো।
নগর সংস্কৃতির যাবতীয় শৈলীকে আত্মস্থ করে আমরা একটি আবাসনের বাসিন্দা হয়েছি বেশ কিছুকাল আগে। চত্বরে সুরক্ষা মজবুত, সাজানো গাছের সারিও অক্সিজেন ছড়ায়। কিন্তু কোথাও যেন জীবনের স্পন্দন-হীনতা নিরন্তর টের পাই। উৎসব পালনেও যান্ত্রিকতার ছাপ স্পষ্ট। সেই দিক থেকে শঙ্কর দত্তের স্কুল বাড়িটি আমাদের কাছে একরকম মরূদ্যান হয়ে উঠেছিল।
পূর্ব কলকাতা সংরক্ষিত জলাভূমি অঞ্চল নামে একটি গালভরা শব্দবন্ধের সঙ্গে আমরা দীর্ঘকাল পরিচিত। কসবার ঘিঞ্জি সুইনহো লেন ছেড়ে আমরা যখন বাইপাস-লগ্ন আনন্দপুরে এসে থিতু হলাম, তখন ‘জলাভূমি’ কাকে বলে বুঝলাম। আসলে মাছ চাষের কিছু বিস্তীর্ণ ভেড়ি ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট ছিল না তখন। তার আশপাশে সবুজ গাছপালা, সংকীর্ণ গলির মতো পথঘাট, দু’পাশে গঞ্জের মতো কিছু দোকানপাট আর ইঁটের খাঁচার মতো ঘরবাড়ি।
শঙ্করের বাড়ি যাওয়ার পথে ‘গারোদিয়া ওয়ার্কশপ’ নামে একটা মোটরগাড়ি মেরামতি কেন্দ্র চোখে পড়তো। হঠাৎ গজিয়ে ওঠা এক টুকরো নগর সভ্যতার প্রতীক যেন। কারণ ওটা পেরোলেই শুরু হয়ে যেতো ল্যাম্পপোস্ট বিহীন গ্রামীণ জনপথ। আগেই বলেছি, আমরা শঙ্কর ও তার স্ত্রী রমলা ওরফে রুমুর আতিথ্য নিতে যেতাম রাতের দিকেই। অন্ধকারে গারোদিয়ার পেল্লাই ফাটকটিকে বেশ রহস্যময় মনে হতো।
শঙ্করের প্রাক-বিবাহ পর্ব সম্পর্কে কোনও ধারণা ছিল না আমার। রমলার সঙ্গে তার সংযোগের সূত্র কী বা কোথায়, তাও জানা ছিল না। তাদের কথাবার্তায় শুধু এটুকু আঁচ করতাম, বিয়ের পর রমলা আর গৃহবধূ থাকতে চায়নি। তার এক আত্মীয়ের সুপারিশে এনজিও পরিচালিত একটি স্কুলে পড়ানোর দায়িত্ব পায় সে। স্কুল বাড়িতে থাকার বন্দোবস্তও ছিল। বিকেলের পর গোটা বাড়িটাই শঙ্কর-রমলার অধীনে চলে আসে। কারণ রক্ষী হিসেবে নিযুক্ত লোকটিও বাড়ি চলে যায়। চাবির গোছা হাতে শঙ্করের গেরস্থালি মেজাজ আমরাও লক্ষ করেছি।
এভাবেই বেশ কাটছিলো দিন। এর মধ্যে আচমকা অতিমারী হামলায় বিপর্যস্ত হতে হলো আমাদের। সেইসব সামলানোর পর কর্মজীবনে আর এক ধাক্কা এসে পড়লো, যার নাম কর্মী সংকোচন। ছাঁটাই তালিকায় নাম উঠে গেল আমাদের শঙ্কর দত্তেরও। কাজ হারানো শঙ্করের সেই বিহ্বল দশা আজও ভুলতে পারি না। ভর সন্ধেয় চিঠি হাতে প্রায় নিঃশব্দে অফিস ত্যাগ করলো সে।
পরদিন বারবার ফোনে যোগাযোগ করেও শঙ্কর বা রমলা কারও সাড়া না পেয়ে আমি একা ছুটে গেলাম তাদের স্কুল বাড়িতে। গেটের সামনে উল্টোদিকে একটা মুদিখানার দোকানে সিঁড়িতে একা বসেছিল রমলা। আমাকে দেখে উঠে এলো। তার চোখেমুখে তেমন উদ্বেগের ছাপ না দেখে বিস্মিত হলাম। বললাম, শঙ্কর কোথায়?
কেন বলেনি আপনাকে? রমলার পাল্টা প্রশ্নে বিরক্ত হচ্ছিলাম। তবু সংযত হয়ে জবাব দিলাম, ফোন ধরছে না বলেই তো জিজ্ঞেস করছি তোমাকে।
আপনার ভাই সকালে দেশের বাড়িতে দাদার কাছে চলে গেছে। ওখানে কিছুদিন থাকবে। জানেন তো, রানাঘাটে, দাদার ফরেস্ট বাংলোতে?…
রমলার কথা শুনে মনে পড়ে গেল, শঙ্করদের আদি বাড়ি রানাঘাটে। শঙ্করের বাবা সীমান্ত পেরিয়ে রানাঘাটে এসে আশ্রয় নেন। তারপর কোনও এক রেল কর্তার দয়ায় চাকরি পান বন বিভাগে। জঙ্গলের মধ্যে থাকার জায়গাও জুটেছিল। যদিও শঙ্করের মতে, জঙ্গলটা নকল। পোড়ো জমিতে শাল সেগুন আর সাধারণ কিছু গাছগাছালি লাগিয়ে বানানো হয়েছিল। রেল লাইনের স্লিপার বানানোর জন্য কাঠের দরকার হতো তখন। আশপাশে শেয়াল ও বুনো শুয়োরের উপদ্রব ছিল। আদিবাসীদের একটা গ্রাম ছিল কাছেই। চাঁদনি রাতে তাদের নাচগান হুল্লোড়ের শব্দ শোনা যেত।
রমলার কথায় রানাঘাটের বৃত্তান্তটা মনে পড়ল।আমি শুধু বললাম, শঙ্করের দাদার নাম ঠিকানাটা লিখে দাও।
রমলাকে বিদায় জানিয়ে ফিরে আসার পর থেকে শুরু হয় আমার কাহিনির শেষ পর্ব। রাতে স্ত্রীকে সংক্ষেপে শঙ্করের অন্তর্ধান রহস্যের কথা বলে, এবং অফিসে দিন কয়েক না আসার বার্তা পাঠিয়ে আমি তৈরি হচ্ছিলাম রানাঘাটের অজানা ঠিকানায় পৌঁছনোর জন্য।
সকালে কখন ট্রেন জানি না। রেলের টিকিট কাটা, ভিড়ভাট্টা নিয়েও ভয় ছিল। তাই গাড়ি নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম। বারাসাত থেকে বড় জাগুলিয়া পর্যন্ত বিরক্তিকর পথটুকু পেরনো পর্যন্ত শঙ্করকে নিয়ে ভাবার সময় পাইনি। তারপর বিরহী, আমডাঙা পৌঁছে দু’পাশে সবুজ ধানখেত আর খালবিল দেখে মনটা বিষাদে ভরে গেল। অন্য সময় এইসব মনোরম দৃশ্য কতো উপভোগ্য লাগে, পথে ঝুপড়ি দোকান দেখলে নেমে পড়ে চায়ের খোঁজ করি, ছবি তুলি। কিন্তু আপাতত গন্তব্যে দ্রুত পৌঁছে যেতে চাই।
চাকদহ, শিমুরালি ছাড়িয়ে এগোলে পথের ধারে বেশ কিছু গির্জা পড়ে। তারপর সেখান থেকে বেগোরিয়া মোড়ে এসে ডান দিকে ঘুরলে কুপার্স ক্যাম্প। শঙ্করের দাদা সেখানেই থাকেন। জায়গাটা রেললাইনের কাছে শুনেছিলাম। অবশেষে সব বাধা পেরিয়ে একটা অতি সংকীর্ণ রাস্তায় ঢুকে যখন দিশেহারা দশা, তখন এক তরুণী বধূ সহায় হলেন। তাঁকে অনুসরণ করে পৌঁছে গেলাম শঙ্করের দাদা শিবনাথ দত্তের ডেরায়।
বাড়ি কোথায়, মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখছিলাম, সত্যিই যেন ছবিতে দেখা এক ফরেস্ট বাংলো!
ইঁটের ওপর হাল্কা প্লাস্টার করা কচি কলাপাতা রঙের একতলা বাড়ি। গোটা চারেক সিঁড়ির ধাপ পেরিয়ে বারান্দা, কাঠের রেলিং দিয়ে ঘেরা। ভেতরে কয়েকটা চেয়ার পাতা। দোতালায় ছাদের ওপরে প্রচুর ফুলের টব। কার্নিশ থেকে ঝুলছে নানা রঙের লতাপাতা। শরতের কমলা রোদে ভেসে যাচ্ছে তাদের প্রস্ফুটিত বর্ণালী। নিচেও কেয়ারি করা ফুলের বাগান। আমি দাঁড়িয়ে আছি এমনই এক সাহেবি বাগানবাড়ির দোরগোড়ায়।
শঙ্কর বারান্দায় বসে কাগজ পড়ছিল। আমি চেঁচিয়ে ডাকতেই তড়িঘড়ি ছুটে এসে গেট খুলে দিয়ে বললো, গাড়ি বাইরেই থাক। কিছু হবে না, আপনি চলে আসুন। আমি জানতাম আসবেন, রুমু সকালেই বলেছে। বৌদিকে আনলে পারতেন।
আমি বাগানের রঙিন ফুল আর লতাপাতা দেখছিলাম। কানে ভেসে আসছিলো পাখির ডাক। শঙ্কর আমাকে বারান্দায় এনে বসালো। তারপর বললো, জানি চা খাবেন আগে। চান করতে পারেন, বাথরুমটা খারাপ নয়। আপনার জন্য মাছের ঝোল ভাত নিজে হাতে রেঁধেছি।
আমি চেয়ারে বসে শান্ত স্বরে বললাম, নিশ্চয় খাবো। তবে তার আগে বলো, হঠাৎ ওভাবে চলে এলে কেন?
কী হবে শুনে? ভালো লাগবে না আপনার। দাদাকেও বলিনি। অবশ্য দাদা-বৌদির আমাকে নিয়ে মাথাব্যথা নেই। ওরা আর এখানে থাকে না। শহরের দিকে বাড়ি করে উঠে গেছে। বাবার এই ভিটেটুকু আগলে আছি আমি। আপনি আজ থেকে যান অভিজিৎদা। রাতে গল্প হবে অনেক।… শঙ্কর কথা বলতে বলতে উঠে চলে যায়, হয়তো হেঁসেলের দিকে।
কাহিনির পরিসর না বাড়িয়ে সংক্ষেপে বলি, সে-রাতে শঙ্কর নৈশ আহার পর্বের শেষে টেবিলে এনে রেখেছিল একটি দিশি মদের বোতল। তীব্র অনীহা সত্ত্বেও আমিও তাতে চুমুক দিয়ে ফেলি, এবং ভাগিদার হতে থাকি এক আশ্চর্য আখ্যানের। যেখানে আমাদের মামূলি প্রেম প্রীতি প্রণয় কিংবা দাম্পত্যের কোনও রসায়ন খুঁজে পাওয়া মুশকিল।
আমি ছাড়াও রুমুর আর এক প্রেমিক ছিলো। রুমু তার প্রেম ভাগ করে নিতে বলেছিলো আমাকে। এর বেশি কিছু জানতে চাইবেন না অভিজিৎদা।…
তরলে গলা ভেজানো শঙ্করের কথা শুনে চেয়ারে সিধে হয়ে বসি।
তার মাতাল কন্ঠে ঘড়ঘড়ে ভাব জাগছিল। সে বিড়বিড় করে আরও কিছু বলে যাচ্ছিলো। তারপর হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে হাতের বোতলটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নাটকীয় ভাবে হেসে উঠলো। তারপর কাছে এসে আমার কাঁধ খামচে ধরে চড়া গলায় বললো, আমাদের এই সাধের বাগানবাড়ি… আমাদের এই ফরেস্ট বাংলো রুমু বিক্রি করে দিতে চায়।…
চাঁদনি রাতে আমাদের স্কুল বাড়ির ছাদে আরও অনেক খেলা হতো অভিজিৎদা। নাগিন সিনেমার মতো জলে ভেজা সাপিনী হতো রুমু। সামনে কাপড় খুলে দুই সাপুড়ে!…
রাত বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে শঙ্করের মাতলামিও ক্রমশ বাড়ছিলো। আমি আর সহ্য করতে না পেরে বারান্দা থেকে একরকম ছুটে নিচে নেমে এলাম। অন্ধকারে কাঁটা ঝোপ মাড়িয়ে গেট বরাবর হেঁটে গেলাম। কপাল ভালো, গেটে তালা ছিলো না। বাইরে এসে পকেট থেকে গাড়ির চাবি বের করলাম। তারপর দ্রুত গাড়িতে উঠে বসলাম। ঘড়িতে দেখলাম, প্রায় তিনটে বাজে।
আমার কাহিনি এখানেই শেষ। তবে সব গল্পের মতো, একটা উপসংহার থেকেই যায়। বহুদিন পর কৌতূহল বশত এক বিকেলে মাদুরদহে স্কুল বাড়িটির খোঁজ নিতে গিয়ে দেখি, সেখানে পুরনো দালান ভেঙে নতুন একটি বেসরকারি ব্যবসায়িক স্কুল তৈরি হচ্ছে। আশপাশেও বেশ কিছু বহুতল তৈরির আগাম সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। খালপাড়ের রাস্তা দুই লেন করার কাজ চলছে। পাশেই নাজিরগঞ্জে গড়ে উঠেছে চল্লিশ তলা আবাসনের চারটি পেল্লাই টাওয়ার।
বুঝলাম, শঙ্কর দত্তের আর কোনও ঠাঁই নেই মহানগরের বুকে। তবে ধন্দ কাটেনি আজও, আমি তাকে শেষ দেখেছি কোথায়। মাদুরদহে স্কুল বাড়ির ছাদে, দ্বাদশী চাঁদের আলোয়? নাকি রানাঘাটে কুপার্স ক্যাম্পের ফরেস্ট বাংলোতে। কোনটা আসল শঙ্কর, মেলাতে পারি না।
°°°
চিত্রণ: সৌজন্য চক্রবর্তী





