Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ নিবন্ধ

সুকান্ত সরণি

স ঞ্জ য়  মু খো পা ধ্যা য়

সময়ের কী আশ্চর্য গতি! একদিন যিনি কবি কিশোর ছিলেন, আজ তিনি শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে। আজ আমরা সুকান্ত ভট্টাচার্যকে স্মরণ করব, হয়তো আধুনিক প্রজন্মকে মনে করিয়ে দিতে হবে এই অকালপ্রয়াত কবির কথা। আবার ভাবি, হয়তো এইটাই সময়। এই যে যন্তর মন্তরে হঠাৎ একদল তরুণতরুণীর সমাগম হল, তাঁরা বর্ষার ভেজা দিনে আমাদের চোখেমুখে আগুনের তাপ ছড়ালেন। এও তো সুকান্তের শতবর্ষ ঘোষণা। তিনিই তো লিখেছিলেন—
বেজে উঠল কি সময়ের ঘড়ি?
এসো তবে আজ বিদ্রোহ করি,
আমরা সবাই যে যার প্রহরী
উঠুক ডাক।

উঠুক তুফান মাটিতে পাহাড়ে
জ্বলুক আগুন গরিবের হাড়ে
কোটি করাঘাত পৌঁছোক দ্বারে;
ভীরুরা থাক।

সুকান্ত যখন এই ঘোষণা লিখেছিলেন, তখন ৪০ দশক। তাঁর বয়স কুড়িও পার হয়নি। অথচ কী আশ্চর্য দর্পে তিনি পৃথিবীর যাবতীয় মানুষকে ২০ বছরের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেন। কী অবিশ্বাস্য স্পর্ধায় তিনি লিখেছিলেন—
মজুর দেখ নি তুমি? হে কলম, দেখ নি বেকার?
বিদ্রোহ দেখ নি তুমি? রক্তে কিছু পাও নি শেখার?
কত না শতাব্দী, যুগ থেকে তুমি আজো আছ দাস,
প্রত্যেক লেখায় শুনি কেবল তোমার দীর্ঘশ্বাস!

আজকে লজ্জা লাগে। আজকের বাংলা সাহিত্য কুসুমে কুসুমে আন্দোলিত হয়, কত শব্দের পেলব আলপনা আঁকা হয়, কপট দার্শনিকতার আড়ালে মুখ লুকিয়ে রাখেন আজকের কবি। অথচ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরে তিনি কী অনায়াস স্বীকারোক্তি লিখেছিলেন—
আমার বসন্ত কাটে খাদ্যের সারিতে প্রতীক্ষায়,
আমার বিনিদ্র রাত্রে সতর্ক সাইরেন ডেকে যায়,
আমার রোমাঞ্চ লাগে অযথা নিষ্ঠুর রক্তপাতে
আমার বিস্ময় জাগে নিষ্ঠুর শৃঙ্খল দুই হাতে।

তবু আজ অনেক মহলেরই সন্দেহ, সুকান্ত তো রাজনীতি করেছিলেন, কতটা কবিতা লিখেছিলেন। আমার প্রশ্ন, পৃথিবীর যাবতীয় কবিতা তো লেখা হয় মানুষের অশ্রু, ঘাম আর উল্লাসের দিকে তাকিয়ে। যাঁরা শারদীয় পত্রপত্রিকায় আলো করে থাকেন, তাঁরা গরিবের ভাতের গন্ধ কী করে পাবেন!

বস্তুত সুকান্ত কবিতার চাইতে বড়। তিনি এক প্রতীকচিহ্ন। সারা ভারতে যখন কবিকে ভাবা হয়েছে জনতার একজন প্রতিনিধি হিসেবে, তখন সুকান্তকেই ভাবা হয়েছে। তামিল বা হিন্দি সিনেমাতেও হয়েছে। যেমন রাজেশ খান্নার ‘অনুরোধ’ নামের ছবিটিতে যে কবিটি রাজেশের বন্ধু ছিলেন তার নাম সুকান্ত। ঠিক এই নামকরণ যে আকস্মিক নয়, তা বোঝা যায় কবির খোঁচা খোঁচা দাড়ি এবং যক্ষ্মা রোগে পাণ্ডুর মুখ দেখে। অথবা অতদূরে কেন যাই, বাংলায় উত্তম-তনুজার ‘দেনা পাওনা’ ছবিতে উত্তম যে বন্ধুর চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন, তার নামও তো সুকান্ত। তিনিও তো ফুসফুসের রোগী। শেষ গানটি যখন উত্তমের ঠোঁটে শ্যামল মিত্র হাজির করেন, ‘গানে ভুবন ভরিয়ে দেবে ভেবেছিল একটি পাখি’, সেও তো সুকান্ত-স্মরণই মনে হয়। আসলে, পণ্ডিতেরা যাই ভাবুন, সুকান্ত জনমানসে একজন স্বপ্নাতুর কবি হিসেবে স্থায়ী ভাবে বেঁচে আছেন।

তিনি জনসাধারণের কবি। হয়তো চারণকবি, কিন্তু তাঁর স্থান লোককবিদেরই মতো। আধুনিক কালে তাঁকে তুলনা করা যায় শুধু মুকুন্দদাস ও নজরুল ইসলামের সঙ্গে। নজরুল যেমন বলেন, ‘পরোয়া করিনা, বাঁচি বা না-বাঁচি যুগের হুজুক কেটে গেলে’, তেমন ভাবে সুকান্ত লেখেন–
ইতিহাস! নেই অমরত্বের লোভ,
আজ রেখে যাই আজকের বিক্ষোভ॥

কী ভীষণ মায়াবি তাঁর ওই উজ্জ্বল ও নির্মেঘ চাহনি। আমার কৈশোরে ছিল ৬৬-র খাদ্য আন্দোলন। আর তখনি হরতাল… শহিদবেদি… বসুমতীর আগুনঝরা সম্পাদকীয়… সব কিছুকে ছাপিয়ে ভালবেসে ফেললাম সুকান্ত ভট্টাচার্যকে। সেই প্রেম পোয়েটিকসের খবর রাখে না। নিতান্তই সমর্পণ। তাতে সরলতা ছিল। সারল্য এবং বয়ঃসন্ধির অভিমান এবং প্রথম চুম্বনের পর বালিকার আরক্ত কপোল। সুকান্ত কতখানি কবি? এই জিজ্ঞাসার উত্তরে আমার আজও ঠোঁটে হাসি খেলে যায়। যিনি লেখেন, ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়ঃ/ পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল‍্সানো রুটি॥’ এই অসাধারণ উপমাই তো কবিত্ব। যিনি লেখেন, ‘মিছিলে আমরা নিমগ্ন তাই দোলে মিছিল।’ পাঠক দেখুন, তিনি মিছিলের চলন বিষয়ে একটি দোলা আরোপ করছেন। অর্থাৎ, তিনি মিছিলকে একটি বহমান নদীর মতো দেখতে চাইছেন। কবির আর কী করণীয় কাজ থাকতে পারে।

আমি কি সুকান্ত থেকে উদ্ধৃতি দেব? হাস্যকর। রবীন্দ্রনাথের পর, বাংলা অক্ষর যাঁরা চেনেন, তাঁরা যদি একটি কবিতাও পড়ে থাকেন, তবে সেই কবিতার লেখক তিনি। অখ্যাত, অবজ্ঞাত মফসসলের লাইব্রেরিতেও খুঁজে পাওয়া যাবে বহুব্যবহারে জীর্ণ একটি ‘ছাড়পত্র’। অথবা ‘ঘুম নেই’। আরও আশ্চর্য যে, তাঁর জীবৎকালে সুকান্তর কোনও কবিতার বই ছাপা হয়নি। সবই মৃত্যুর পরে। তাও, বজবজ বা জগদ্দলের পাটকলের সামনে যদি কোনও কবিতার পঙক্তি উচ্চারিত হয়, তবে তা সুকান্তর। বেঁচে থাকতে থাকতেই পাঠ্য হয়েছিলেন পাটনা ও গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যাট্রিকের পাঠক্রমে।

পাঠক অবাক হবেন, সেই ঔপনিবেশিক যুগে সুকান্ত নিজেই তখন ম্যাট্রিকের ছাত্র। শুনেছিলেন জোসেফ স্তালিনের শাসনাধীন সোবিয়েত ইউনিয়নে ‘কমসমলস্কায়া প্রাভদা’ বা ‘ওয়ার্ল্ড ইয়ুথ’-এ ছাপা হয়েছে তাঁকে নিয়ে আলোচনা। স্বয়ং লুই আরাগঁ ফরাসিতে তাঁর কবিতার অনুবাদক। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কোনও ভারতীয় কবি এই দুর্লভ কৃতিত্ব অর্জন করতে পারেননি। এমনকী রবীন্দ্রনাথ ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও তাঁর মতো বিদ্যুৎগতি খ্যাতি পাননি। লর্ড বায়রন হয়তো ইংল্যান্ডে ঘুম থেকে উঠেই বিখ্যাত হয়েছিলেন, কিন্তু সুকান্ত এক পরাধীন ও ঘুমন্ত জাতির নিদ্রা কেড়ে নিতে পেরেছিলেন। সাহিত্যের নির্বাচিত অধ্যাপকেরা যতই চুলচেরা বিচারে সুকান্ত কতটা কবিত্বের কষ্টিপাথরে উত্তীর্ণ হলেন ভেবে যান, বাংলাদেশের চিরদিনের তারুণ্য কণ্ঠস্থ করে নেবে তাঁর রৌদ্ররস।

বস্তুত, জনসাধারণের ভাষা আয়ত্ত করেছিলেন তিনি। আর যে ভাষায় তিনি জনসাধারণের সঙ্গে কথোপকথন করতেন, আজ হয়তো সেই যুগ আবার ফিরে এসেছে। আজ আবার আমাদের মনে হয়—
আকাশে আকাশে ধ্রুবতারায়
কারা বিদ্রোহে পথ মাড়ায়
ভরে দিগন্ত দ্রুত সাড়ায়,
জানে না কেউ।

উদ্যমহীন মূঢ় কারায়
পুরনো বুলির মাছি তাড়ায়
যারা, তারা নিয়ে ঘোরে পাড়ায়
স্মৃতির ফেউ॥

সত্যি, এখন খবরের কাগজ পড়লে মনে হয়, উত্তাল জনসমুদ্র যে ভাষায় কথা বলে, তা এই প্রবীণ ও পক্ক বুদ্ধিজীবীরা জানেন না। কিন্তু কুড়ি বছরের সুকান্ত ভট্টাচার্য জেনে গিয়েছিলেন।
তাঁকে প্রণাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × 4 =

Recent Posts

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ নিবন্ধ

বস্তুত সুকান্ত কবিতার চাইতে বড়। তিনি এক প্রতীকচিহ্ন। সারা ভারতে যখন কবিকে ভাবা হয়েছে জনতার একজন প্রতিনিধি হিসেবে, তখন সুকান্তকেই ভাবা হয়েছে। তামিল বা হিন্দি সিনেমাতেও হয়েছে। যেমন রাজেশ খান্নার ‘অনুরোধ’ নামের ছবিটিতে যে কবিটি রাজেশের বন্ধু ছিলেন তার নাম সুকান্ত। অথবা অতদূরে কেন যাই, বাংলায় উত্তম-তনুজার ‘দেনা পাওনা’ ছবিতে উত্তম যে বন্ধুর চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন, তার নামও তো সুকান্ত। তিনিও তো ফুসফুসের রোগী।

Read More »
কালীকৃষ্ণ গুহ

কালীকৃষ্ণ গুহর কবিতা

একটি রাত্রি কা লী কৃ ষ্ণ  গু হ প্রতিটি রাত্রিকেই নতুন মনে হয়— অচেনা লাগে। আজকের রাত্রিটা যেন চির-অচেনা যেন কিছু ঘটার ছিল যা ঘটেনি

Read More »
অভিজিৎ সিরাজ

অভিজিৎ সিরাজের ছোটগল্প

ফরেস্ট বাংলো অ ভি জি ৎ  সি রা জ শঙ্কর দত্তকে আমি শেষ দেখি আনন্দপুরে মাদুরদহের একটা স্কুল বাড়িতে। অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল সেদিন। বাড়ির

Read More »
বিভাস রায়চৌধুরী

বিভাস রায়চৌধুরীর কবিতা

বি ভা স  রা য় চৌ ধু রী চালুন্দিয়া শ্যামলেশকে একটা কবিতা পাঠাতে হবে ভাবতেই মনে পড়ে শ্যামলেশের কবিতা আমাকে প্রথম দেয় একটি বিষণ্ণ ধ্বনি—

Read More »
সাত্যকি হালদার

সাত্যকি হালদারের ছোটগল্প

প্রহ্লাদ পাত্রর কাহিনি সা ত্য কি  হা ল দা র তাকে প্রথম যখন দেখি, তখন তার খানিকটা বয়স হয়ে গেছে। আউটডোরে নিয়মিত হাজিরা দেওয়ার কিছু

Read More »