সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে সুকুমারী ভট্টাচার্য
মী রা তু ন না হা র
সমগ্র বাঙালি সমাজে সুদুর্লভ প্রজ্ঞাবতী মানবী হিসেবে খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছিলেন সুকুমারী ভট্টাচার্য। ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের বুকে লালিত-পালিত হয়েও এই সাহসিনী খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের গ্রীক তার্কিক গোষ্ঠীর যে বক্তব্যকে যৌক্তিক ভিত্তি দিতে চেয়েছিলেন সেটি হল— ‘যে পৃথিবীটা সকলের পক্ষেই একই রকমের সেটি কোনো দেবতা বা মানুষ সৃষ্টি করেনি, সেটি বরাবরই ছিল, এখনও আছে এবং চিরকালই থাকবে।’ প্রশ্ন তোলা, বিশ্বাসের বিষয় সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করা স্ব-সমাজে কখনোই আদৃত হবে না, বরং সমূহ যন্ত্রণার হেতু হতে পারে জেনেও তিনি সুদৃঢ় আত্মপ্রত্যয় নিয়ে উচ্চারণ করেছিলেন— ‘প্রশ্ন, সংশয়, নিরীশ্বরবাদ, অজ্ঞেয়বাদ ও নাস্তিক্য সমাজ-বিধায়কদের উষ্মার উদ্রেক করেছে বরাবরই, সর্বত্রই। কেন? কারণ তাঁরা ভেবেচিন্তে যে-ব্যাখ্যা দিয়েছেন জীবনের, বিশ্ববিধানের, প্রকৃতির, মানবদেহের এবং মানুষের সম্ভাব্য বিপদ-আপদের থেকে মুক্তির জন্য যে-বিধান দিয়েছেন, প্রকৃতিকে নিজের অনুকূলে এনে সুস্থ, সুখী দীর্ঘজীবন লাভকরবার জন্য যে-পন্থার নির্দেশ দিয়েছেন মানুষের সংশয় স্পষ্ট উচ্চারিত হলে সে-বিধানের ভিত টলে যায়।’
তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, ‘যে-জাত যত বেশি, যত তীব্র, যত দুরূহ, গভীর ও ব্যাপক প্রশ্ন করেছে, নিতান্ত হতদরিদ্র না হলে সে-জাত তত বেশি এগোতে পেরেছে প্রশ্নোত্তরের কার্যকারণ পরম্পরা অবলম্বন করে।’ ‘আপ্তবাক্য মেনে নিয়ে স্তব্ধ নিস্তরঙ্গ সুখের বদ্ধ জলাশয়ে বাস করা’ তাঁর নিতান্তই না-পছন্দ ছিল। সেই প্রকার জীবনযাপনের প্রণালীকে তিনি মনুষ্যত্বের মর্যাদার পক্ষে অ-গৌরবের বলে গণ্য করেছিলেন। ‘প্রচলিত মত ও পথে’ চলতে তাঁর চিত্ত তৃপ্তি পায়নি। তিনি চেয়েছিলেন ‘ভূমা’ কেন না তিনি মেনেছিলেন, ‘নাল্পে সুখমস্তি’। ‘যুক্তিতর্কের সূত্রে নবতর সত্যের পথে ওই জাতিকে রওনা করে দিতে চেয়েছিলেন, তিন হাজার বছর আগের সংশয় ও নাস্তিক্য প্রকাশে অকুণ্ঠ, যে ভারতীয়রা তাঁদের সার্থক উত্তরসূরি হতে পেরেছেন এই প্রজ্ঞাবতী বাঙালি মানবী।
নাস্তিক্য ও সংশয়ের পক্ষে জোরালো সওয়ালকারী সুকুমারী ভট্টাচার্য সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে, তাই বলে, হেয় প্রতিপন্ন করতে উদ্যোগী হওয়াকে ‘সাহসিকতা’ বলে ভাবেননি কখনো। তিনি তাঁর যুক্তি-তরবারি আমৃত্যু উদ্যত রেখেছিলেন সরল ধর্মবিশ্বাসীদের ভাবনাকে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িকতার দ্বারা দূষিত করবার চেষ্টা করে যে মানব-গোষ্ঠী তাদের প্রতি। তিনি দেশবাসীকে বোঝাতে চেয়েছিলেন, ‘সাম্প্রদায়িকতার সংক্রমণ’ দ্বারা ধার্মিক মানুষদের ‘ধর্মবিশ্বাসের অর্ন্তনিহিত মানবিকতা’ দূষিত না হলে বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী মানুষরা তাদের ‘ধর্মবিশ্বাসের কারণেই শত্রুপক্ষ হয়ে ওঠে না’। ‘ধর্মবিশ্বাসকে সাম্প্রদায়িক করে তোলার উদগ্র প্রচেষ্টা’কে তিনি তীক্ষ্ম যুক্তি দ্বারা প্রতিহত করার চেষ্টা করেছেন এবং সেভাবে ‘সাম্প্রদায়িকতার সম্ভাব্য শক্তি’কে খর্ব করতে চেয়েছেন।
ধার্মিক মানুষদের ধর্মবিশ্বাসের দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি এক বৃদ্ধার উক্তিকে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরেন যিনি বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর সখেদে বলেছিলেন, ‘হায় রাম, তোমার শেষে এই দশা হল যে, অন্যের বাড়ি ভেঙে তোমায় বাস করতে হয়?’ এই প্রকার ধর্মবিশ্বাসকে তিনি ‘উদার’, ব্যক্তিগত বিশ্বাস হিসেবে ‘জীবনের অবলম্বন’ এবং ‘মারণের হাতিয়ার নয়’ বলে উপলব্ধি করেছিলেন। কিন্তু যারা এদের ‘কানে বিষ ঢেলে এদের সমস্ত চেতনাকে আচ্ছন্ন করে হিংসায় উদ্দীপিত’ করতে সচেষ্ট তাদের তিনি মানুষের শত্রুজ্ঞান করেছিলেন এবং তাদের হাত থেকে দেশবাসীদের রক্ষা করার উপায়াদি নির্দেশ করেছেন।
‘সাম্প্রদায়িকতা মানুষের তৈরি বিষ’ যা বহুকাল ধরে নানাভাবে মানবসমাজের ক্ষতিসাধন করে চলেছে। একথা বোঝাতে চেয়েছিলেন সুকুমারী ভট্টাচার্য, বেদবিশেষজ্ঞ সংস্কৃতজ্ঞ সুপণ্ডিত এক বাঙালি চিন্তাবিদ। সুস্থ জীবনযাত্রায় বিপর্যয় ঘটায় যে বিভেদাত্মক সাম্প্রদায়িক চেতনা সে সম্পর্কে তিনি স্পষ্ট উচ্চারণ করেন— ‘১. সাম্প্রদায়িক চেতনা ধর্মকে পুষ্ট করে না. ২. ধর্ম থেকে উদ্ভূতও নয়, ৩. মুখ্যত এর যোগ রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে এবং ৪. সেটি করায়ত্ত করার জনাই এ চেতনা দায়বদ্ধ।’ সেই দায়বদ্ধতা যে কতখানি ধ্বংসাত্মক তা তিনি নিজে সম্যক অনুধাবণ করে দেশবাসীকে বোঝাতে চেয়েছিলেন। রাষ্ট্রক্ষমতা দখল ও রক্ষা করার জন্য সাম্প্রদায়িকতা নামক বিষের ব্যবহার আজ আমাদের দেশে দেশবাসীর মনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে চলেছে। নিতাদিন বাড়ছে সেই উদ্বেগ-সংকট। সুকুমারী ভট্টাচার্যের সাম্প্রদায়িকতা সম্পর্কিত বিশ্লেষণমূলক ভাবনাচিন্তা সেক্ষেত্রে সমূহ সহায়তা দিতে পারে বিভ্রান্ত দেশবাসীকে।
হিন্দুত্ববাদী ভারতীয়ত্বের প্রচারক ও সাধকদের ভ্রান্তিসমূহ
সুকুমারী ভট্টাচার্য ঘোষণা করেছিলেন, ‘ভুলগুলোকে ভুল আর ঠিকগুলোকে ঠিক বলব।’ তিনি যথার্থই তা সম্ভব করেছিলেন। হিন্দুত্বের চশমা পরে যারা ভারতীয়ত্বের নতুন ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে দেশবাসীকে তা মেনে নিতে বাধ্য করতে চাইছেন তাদের ভ্রান্তি কোথায় তা চিনিয়ে দিয়েছেন এবং সেই সঙ্গে ভারতীয় সভ্যতার শ্রদ্ধা করার মতো বিষয়গুলিকেও স্পষ্ট ভাষায় চিহ্নিত করে দিয়েছেন। তিনি বললেন—
১. হিন্দু সভ্যতা শ্রেষ্ঠতম সভ্যতা নয় এবং প্রাচীনতম সভ্যতাও নয়। অথচ হিন্দুত্ববাদী ভারতীয়ত্বের দাবিদারগণ এটিকেই সত্য বলে বিপুল দাপটে ঘোষণা করে। এটি ভুল। ‘শ্রেষ্ঠ মানে ভালো, আরও ভালো, সবচেয়ে ভালো। একথা বলতে গেলে তাবৎ ধর্ম সম্বন্ধে জানতে হয়।’ একথা বলে তিনি যে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন সেটি হল, ‘ভারতবর্ষে কম লোকেরই, খুব কম ঐতিহাসিকেরই এ নিয়ে চর্চা করার, আপেক্ষিকতার বিচার করার ক্ষমতা আছে। তাঁদের আঙ্গুলে গোনা যায়।’ অতঃপর যারা এমন দাবি করে তারা প্রকৃতপক্ষে মিথ্যাভাষণ করে।
হিন্দু সভ্যতাকে প্রাচীনতম সভ্যতা বললে সেটিও মিথ্যাকথন। আর্যসভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতার মধ্যে কনিষ্ঠতম। বহু পুরনো সভ্যতা হল আসিরিয়া, ব্যাবলনীয়, মিশর, চীন, গ্রীস, রোম-এর সভ্যতা।
২. বেদকে প্রাচীনতম গ্রন্থ বলা হচ্ছে। এটিও ভুল। দ্বাদশ শতকের আগে বেদের কোনো চিহ্ন ছিল না। মিথ্যা হলেও এটি প্রচার করা হচ্ছে কেন না, ‘প্রাচীন’ বললে মানুষের মনে সম্ভ্রমবোধ জাগে এবং ‘প্রাচীনতম’ বললে তা আরও তীব্র হয়।
৩. সংস্কৃত ভাষাকে বলা হচ্ছে শ্রেষ্ঠ, প্রাচীনতম এবং ‘জীবিত ভাষা’। এই ভাষাকে সে কারণে সকলের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু সংস্কৃতকে জীবিত ভাষা বলা যায় না। জীবিত ভাষা হল সেই ভাষা যে ভাষায় মানুষ দৈনন্দিন কাজ চালায়, প্রয়োজন মেটায় প্রতিদিনের। সংস্কৃত সেই ভাষা নয়।
৪. সংস্কৃত ভাষা নাকি ধর্মের বাহন এমন দাবিও করা হচ্ছে। এই দাবি যথার্থ নয়। প্রথমত, সংস্কৃত ভাষায় নাস্তিকতাবিষয়ক গ্রন্থও রয়েছে। বৌদ্ধ, জৈন যারা বেদ মানে না তাদের অভিমতও এই ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ভারতীয় বহু ধর্মগ্রন্থ সংস্কৃত ভাষা ভিন্ন অন্য ভাষাতেও আছে এবং এখনও লেখা হচ্ছে। সেগুলির গুরুত্ব কিছুমাত্র কম নয়। তদুপরি, সংস্কৃত ভাষায় ধর্ম ছাড়াও অভিধান, বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য সবই লেখা হয়েছে। ফলে এই ভাষাকে ধর্মের বাহন মাত্র বললে ভাষাটির অমর্যাদা করা হয় এবং সেই সঙ্গে ধর্মেরও। এভাবে হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা অপচেষ্টা ভিন্ন কিছু নয়।
৫. যজ্ঞ প্রথা ফিরিয়ে আনার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এই দাবির মধ্যে রয়েছে স্পষ্ট স্ববিরোধিতা ও সত্য গোপন করা নামক অনৈতিকতা। যজ্ঞে তো গো-হত্যা করা হয় এবং শয়ে শয়ে গো-হত্যা করতে হবে! যজ্ঞের ফিরে আসা যারা চায় তারা তো গো-হত্যার বিরোধী! তাহলে? তাদের যজ্ঞে গো-হত্যা করার কথা অস্বীকার করতে হবে এবং তা করতে গেলে মিথ্যাচার করতে হয়! প্রকৃত সত্য হল, বেদের কালে ‘মানুষ গোরু ছাড়া কিছু খেতেই জানত না।
৬. বলা হচ্ছে, বেদচর্চা করতে হবে। প্রশ্ন হল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভিনব উন্নতির এই কালে বেদের চর্চা কতখানি বাঞ্ছনীয়? বেদে বলা হয়েছে, ক. পুরুষ খেয়ে নিয়ে এঁটো স্ত্রীকে দেবে। খ. ব্যবহারের অযোগ্য জামা, জুতো, ছাতা ভৃত্যদের দিতে হবে। গ. যে কোনো নারীর পক্ষে একজন পুরুষই যথেষ্ট আর একটি পুরুষের জন্য অন্তত দুজন নারীর প্রয়োজন। ঘ. ছুঁচো, পেঁচা, কালো সাপ, শকুন, নারী এবং শূদ্র একই রকমের অশুচি; এদের দেখলেও পাপ হয়। ৬. শিক্ষিত বা ধনবতী নারী পুরুষের সমান। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, আজকের সমাজ কি এসব ধ্যান-ধারণা মানবে? অসম্ভব সে কল্পনা!
অন্যদিকে, বেদে বহু ভাল কথাও বলা হয়েছে। যেমন, অথর্ববেদে বলা হয়েছে… “যে আমার প্রতি বিদ্বিষ্ট, যে বাইরের থেকে এসেছে, যে আমাকে গ্রহণ করে না তাকে গ্রহণ করে আমি যেন শোভনভাবে বাস করতে পারি।” প্রশ্ন হল, হিন্দুত্ববাদী ভারতীয়ত্বের দাবিদারগণ কি এই নির্দেশ মানবেন?
সুকুমারী ভট্টাচার্য বেদকে বাতিল করার কথা বলেননি, তাই বলে। তিনি বলেছেন, ‘খ্রিষ্টপূর্ব দ্বাদশ শতকের বড় সাহিত্য হল বেদ।… বেদেই প্রথম ভারতীয় ভাষায় সাহিত্য চিন্তাধারার বিকাশ। এক কথায় বেদ এক অপরিহার্য উত্তরাধিকার।… বেদের সাহিত্যমূল্য, সমাজ-বৈজ্ঞানিক মূল্য, ঐতিহাসিক, ভাষাতাত্ত্বিক ও নানা প্রকারের মূল্য একে একটি ঋদ্ধ সাহিত্যের স্থান দিয়েছে…।’
৭. রামকে নিয়ে কত গর্ব হিন্দুত্ববাদীদের! অথচ কেমন ছিল রামরাজ্য তা বর্ণনা করেছেন সুকুমারী ভট্টাচার্য। সাধ্বী সীতাকে তাঁর নিজের চরিত্রের শুচিতা প্রমাণ করার জন্য তিনবার পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। লঙ্কায়, নির্বাসনে এবং তৃতীয়বার আবারও যখন পরীক্ষা দিতে বলা হয় তখন তিনি অসম্মত হয়ে মায়ের কাছে ফিরে যান। দেখা যায়, রামরাজ্যে শুচি হলেও নারীকে বিশ্বাস করা হত না। খ. চণ্ডাল বন্ধুর গৃহে অন্নগ্রহণ করা যেত না। গ. নিম্নজাতের ছেলে তপস্যা করলে ব্রাহ্মণ বালকের মৃত্যু ঘটে এবং তার জন্য তপস্যারত ছেলেটির শিরচ্ছেদ করা হয়।
গুজরাতে গণহত্যা ও বামিয়ানে শিল্পহত্যার তীব্র নিন্দা
হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতা এবং মুসলমান-সাম্প্রদায়িকতা উভয়কেই তিনি যুক্তি ও তথ্যদ্বারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ধ্বংসাত্মক বলে বোঝাতে চেয়েছেন দেশবাসীকে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত দেশবাসীকে তিনি হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যদিও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ‘সাম্প্রদায়িকতার বিষ’ দেশবাসীর মন থেকে নিষ্কাশন করে দেশকে বিপন্মুক্ত করা। এই বিষ, তাঁর মতে, রাষ্ট্রক্ষমতালোভী হিন্দুত্ববাদী ভারতীয়ত্বে দীক্ষিত কিছু দেশনেতা দেশবাসীর মনে সংক্রামিত করতে চাইছেন বলে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্যটি নষ্ট করার দুর্বুদ্ধি ‘মহান ভারত’-কে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে ক্রমাগত। স্বদেশকে সেই বিপদ থেকে রক্ষা করার কর্তব্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি তাই ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করার পরিকল্পনারোধে জোরালো কলম হাতে নিয়েছিলেন। আবার গুজরাতের গণহত্যা এবং বামিয়ানে শিল্পহত্যা উভয় হত্যাকেই তিনি তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেছেন। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তিনি নিয়ত সরব থেকেছেন।
গুজরাতে সংঘটিত রোমহর্ষক গণহত্যাকে তিনি ‘কম খরচে বেশি লাভ’-এর রাজনৈতিক কারবারিদের নিখুঁত হিসেবি পরিকল্পনা বলে গণ্য করেছিলেন। ‘সুদূর বিলম্বিত ও সুপরিকল্পিত’ ছিল সেই আয়োজন ও ‘ধর্মকর্মের কর্মসূচি’। ‘হাজার হাজার মুসলমান মারা হবে’ বলে সেই মহান লক্ষ্য-সাধনের জন্য ‘স্বপক্ষের ৫৭ জনকে নিকেশ করে দেওয়া হিসেবের দিক থেকে কম খরচে বেশি লাভ।’ শুনলে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সংখ্যায় অল্প করসেবকদের হত্যার ‘ব্যবস্থা’ করে মুসলমান সম্প্রদায়কে সমূলে বিনাশ করার ধর্মকর্মটি সম্ভব করা হয়েছিল রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের লক্ষ্যকে দূরদৃষ্টিতে রেখেই। গুজরাতে শুরু হয়েছিল কর্মসূচি। ‘নির্বিরোধে গুজরাতের কাজ সমাধান হলে একে একে নানা অঞ্চলে নরমেধযজ্ঞ চলতে থাকবে, এই ছিল হিসেব। আছেও।’— অকপটে উচ্চারণ করেছিলেন সত্যনিষ্ঠ সুকুমারী ভট্টাচার্য।
হিন্দুত্ববাদী ভারতীয়ত্বের প্রচারক ও সাধকরা বলেছিল, ‘দাঙ্গা তো হয়নি, করসেবকদের হত্যা করেছে মুসলিমরা। সেই উত্তেজনায় ইতস্তত অশান্তি দেখা দিতে পুলিস শান্ত করতে গিয়ে দুজনকে মেরেছে এবং ১৪৭ জন পুলিস আহত হয়েছে।’ এই মিথ্যাবাক্য তারা শুনিয়েছিল বিশ্ববাসীকে কেবল এই লক্ষ্য সাধনের জন্য যে ‘দেশটাকে হিন্দুরাষ্ট্র করতে হবে।… দুই প্রধান বিধর্মী শত্রুকে (মুসলমান ও খ্রিস্টান) ক্রমে ক্রমে নিশ্চিহ্ন করতে পারলে, বাকিদের ঘুষ দিয়ে, ধর্মান্তরণ করে বা পায়ের তলায় পিষে হিন্দুরাষ্ট্র গড়া যাবে।’
গুজরাতে নির্মিত হয়েছিল কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। সে সম্পর্কে বড় আক্ষেপে তিনি লিখেছিলেন— ‘সারা পৃথিবীর মানুষ চেয়ে দেখছে হিন্দুত্বের এ ধর্মযুদ্ধ। হিন্দু নাকি পরমতসহিষ্ণু— এই তার নমুনা?… মুসলিম মানুষ নয়? এদের কাছে তার চেয়ে বড়ো হিন্দুরাষ্ট্র তাই অক্লেশে এতদিন ধরে এত নৃশংসভাবে মুসলিম বলি চলে।’ তারপরই তিনি একে ‘দানবলীলা’ বলে অভিহিত করে নিজ প্রত্যয় শুনিয়েছিলেন দেশবাসীকে— ‘পৃথিবীর ইতিহাসে’ মানবের সঙ্গে ‘দানবের সংগ্রামে দানব কোনোদিনই জেতেনি।’ সেই সংগ্রামের জন্য সমন্বিত হচ্ছে মানুষ।
একইভাবে দুঃখ পেয়েছিলেন এবং সখেদে নিন্দা করেছিলেন সুকুমারী ভটাচার্য গুজরাতের হিন্দুত্বপ্রেমীদের (!) মতো বামিয়ানে শিল্পহত্যাকারী তালিবানদের। তালিবানরা গণহত্যা করেনি। কিন্তু যে বিস্ময়কর শিল্পকর্ম তারা নির্মম হাতে ধ্বংস করেছিল এবং যেভাবে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ধর্মবোধে নিষ্ঠুর আঘাত হেনেছিল তা ছিল ক্ষমার অযোগ্য তো বটেই, বস্তুত অধর্ম-কর্ম! শিল্প ও ভাস্কর্যের গৌরবময় ইতিহাসকে মুছে দিয়েছিল তারা বুদ্ধের দুটি সুউচ্চ মূর্তিসমেত অন্যান্য আরও বহু শিল্পকীর্তি নষ্ট করে দিয়ে। ‘মূর্তিগুলি শালীনতার আদর্শে নিখুঁত নির্মাণ’ হওয়া সত্ত্বেও কোরাণের মানুষের মূর্তি রচনার নিষেধমূলক অনুশাসন মেনে এই ভাঙন ঘটাল কেন তালিবানরা আড়াই হাজার বছর পর? প্রশ্ন তুলে গভীর ক্ষোভপ্রকাশ করেছিলেন তিনি। তিনি হেতু খুঁজে পেয়েছিলেন প্রশ্নের উত্তর হিসেবে এবং লিখেছিলেন, ‘ওপরওয়ালার নির্দেশে এরা (‘সম্পূর্ণ অশিক্ষিত একটি গোষ্ঠী’) বৃহৎ ধ্বংসক্রিয়ায় নিজেদের শক্তি ও পৌরুষ জাহির করছে। যেমন করে বজরঙবলী, রণবীর সেনা, শিবসেনা এবং অন্য কোনো কোনো দল।’
সুকুমারী ভট্টাচার্যের ভাবনায় স্পষ্ট হয়েছিল যে সত্য তা ভয়ানক। ‘তালিবানরা রূঢ়, বর্বর, পরুষ, ঘোরতর অশিক্ষিত এবং পুরোপুরি ধর্মান্ধ, যারা ভাস্কর্য ধ্বংস করে কোরাণের নির্দেশমতো পুণ্য অর্জন করছে… তাদের কাজ যেমন গর্হিত তেমনই নিষ্ঠুর।’ তাদের কর্মকাণ্ড সমর্থন করার প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু সমস্যা সেটি নয়। ‘এদের পেছনে যাঁরা আছেন তাঁরা এদের ধর্মান্ধতার দীক্ষা দিয়ে বর্বরতায় উত্তীর্ণ করে দিয়েছেন।’ সমস্যার মূলে রয়েছে আসলে তারাই। বাবরি মসজিদ ধ্বংসকারী করসেবকরাও ছিল লেখাপড়া কম জানা এবং তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে ‘ধ্বংসশক্তিতে পটুত্ব অর্জন’ করতে শিখিয়েছিল যারা তারাই প্রকৃত দোষী। তালিবানদের ধ্বংস শক্তি যুগিয়েছে মৌলবিদের ধর্মান্ধতা এবং বাবরি মসজিদ ধ্বংস ও গুজরাতের গণহত্যাকারীদের প্রকৃতপক্ষে মদত দিয়েছে হিন্দু মৌলবাদীদের ধর্মান্ধতা। হাতে-পায়ে-অস্ত্র ধারণে যারা ধ্বংসলীলা সম্পন্ন করে তাদের প্রশিক্ষণদাতাদের পশ্চাদবর্তী ভূমিকা সম্পর্কে সুকুমারী ভট্টাচার্যের মূল্যায়ন সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ— ‘…অনেক গভীরে, গূঢ় অভিসন্ধিমূলক যে সব ধ্বংসের পরিকল্পনা হচ্ছে তার কোনোটা হিন্দু প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার জন্য, কোনোটা বা মুসলিম প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার জন্য, সে সব অন্তর্গূঢ় শক্তির খেলা চলে জনতার চোখের আড়ালে রাজনীতির প্ররোচনায়।’ তিনি এই প্রকার ধ্বংস-ক্রিয়ার পরিকল্পনাকারীদের ধিক্কার দেওয়ার ডাক দিয়েছিলেন দেশবাসী তথা বিশ্ববাসী সভ্যমানুষদের।
হিন্দুত্ববাদে বেদ-বাণীর বিরুদ্ধতা
বেদজ্ঞ সুকুমারী ভট্টাচার্য বলেন, ‘ঋগবেদের শেষ সূক্তে পড়ি, ‘প্রাচীনেরা যেমন ভোগ্যসমূহের সমবণ্টন করেছিলেন, আমরাও যেন তেমন করতে পারি। বাক্যে এবং চিত্তে আমরা যেন সমভাবাপন্ন হই। আমাদের মন্ত্র, আমাদের চলাফেরা যেন ঐক্যবোধযুক্ত হয়। আমাদের হৃদয় ও বুদ্ধি যেন এদের সঙ্গে ঐক্যে সংহত হয়। আমাদের কামনা, বাসনা, হৃদয় ও সত্তা যেন একীভূত হয়। আমরা যেন তোমাদের প্রতি সহিষ্ণুতায় সৌম্য হয়ে উঠতে পারি।’
তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, আজ সেই বেদ নির্দেশিত সহিষ্ণুতা বেদ-মানা হিন্দুত্ববাদীদের মধ্যে কোথায়? তিনি অকৃত্রিম প্রেমে ভারতবাসীকে বলেছেন, ‘সাধারণ ভারতীয় তো জানে ভারতের পূর্বসাধনা ভেদের মধ্যে সংহতির, ঐক্যের, মৈত্রীর: তারা কি আজকের দানবীয় ধ্বংসযজ্ঞের সামনে দাঁড়িয়ে বলবে না, স নো বুদ্ধ্যা শুভয়া সংযুনকু।’ শুভবুদ্ধির বিকাশে ও সহজ প্রকাশে এই ধ্বংসলীলাকে ঠেকাবেই সংহতিকামী ভারতবাসী।
উপসংহার
আমরা, ভারতীয় তথা বাঙালিরা, আজ বিবিধ সংকটাবর্তে পড়ে বিপর্যস্ত, দিশাহীন। এমন সময়ে সুকুমারী ভট্টাচার্যের মতো প্রজ্ঞাবতী আমাদের দিশা দেখান, চিন্তা-ভাবনাকে স্বচ্ছতা দেন এবং স্পষ্ট ভাষণে উদ্দীপ্ত করেন। আমরা বুঝি, কী কঠোর সাধনায় মিশ্র জনগোষ্ঠীর এই দেশ বিধর্মী বিদেশিদের আপন করে নিয়েছে। বিভিন্ন মতাবলম্বীদের ভেদবৈষম্য দূরে ঠেলে রেখে মিশিয়ে দিতে পেরেছে; একান্ত আত্মীয়তা তাদের কাছে টেনে নিতে পেরেছিল। ভারতের এই মহান ঐতিহ্য রক্ষার দায় প্রতিটি দেশবাসীর। সে দায় বহন করার আহ্বান জানিয়েছিলেন এই প্রজ্ঞাবতী মানবী। আমরাও আজ তাঁর সুরে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে চাই, দেশের বৃহৎ ঐক্যবদ্ধ কল্যাণবুদ্ধির কাছে ফুৎকারে নিভে যাবে অশুভশক্তির যাবতীয় আস্ফালন ও ধ্বংসকামিতা।
চিত্র: গুগল





