Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

লেখার শুরুতেই আমরা এযাবৎ প্রচারিত দু’টি ভুল সংশোধন করে নিতে চাই। বহুবছর ধরে আমরা লিখে আসছি, জেনেও আসছি, বাঙালির সেরা উৎসব দুর্গাপূজা। কিন্তু বাঙালির মধ্যে যেহেতু মুসলমানরা হিন্দুদের চেয়ে জনগণনায় বেশি, তাই দুর্গারাধনাকে এই গৌরব দেওয়া যাবে না। ঈদকে এই স্থানে বসাতে হবে। আরও একটি ভুল নিয়ে আমরা চলি, দুর্গাপুজোকে ‘শারদোৎসব’ বলি।

শরৎকালীন উৎসবকেই শারদোৎসব বলা উচিত। আমরা জানি, ভাদ্র ও আশ্বিন, এই দু’মাস শরৎকাল। কিন্তু ভারতীয় পঞ্জিকার বিন্যাসে দেখা যায়, দুর্গাপুজো যে বছর আশ্বিন মাসে হয়, পরের বছর অবধারিত ভাবে তা হয় কার্তিক মাসে। অর্থাৎ হেমন্ত ঋতুতে। তাই দুর্গাপুজো সর্বাঙ্গীণভাবে ও যথার্থত শারদীয় উৎসব নয়। তবে শারদোৎসব নামেই লোকমুখে ও সাহিত্যে তা স্থায়ী আসন পেয়ে গেছে। ষোড়শ শতাব্দীর মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তাঁর ‘চণ্ডীমঙ্গল’ (প্রকৃত নাম ‘অভয়ামঙ্গল’) কাব্যে যেমন লিখেছেন, ‘আশ্বিনে অম্বিকা পূজা করে জনে জনে/ ছাগল মহিষ মেষ দিয়া বলিদানে’, তেমনই এ-যুগে রবীন্দ্রনাথ-ও, ‘আশ্বিনের মাঝামাঝি উঠিলো বাজনা বাজি’ লিখে গেছেন। এখন তাই দুর্গাপুজো শরতের না হেমন্তের, সে সূক্ষ্মবিচারের অবকাশ নেই।

সনাতনপন্থীদের বহু দেবতা,– কালী, লক্ষ্মী, সরস্বতী, শিব, কৃষ্ণ, গণেশ, কার্তিকেয় (বাঙালির কাছে ‘কার্তিক’-এ পরিণত), আরও। আছেন বিশ্বকর্মা, শীতলা, মনসা থেকে শুরু করে মা ষষ্ঠী, দক্ষিণরায় (বাঘের দেবতা), সন্তোষী মা, ছট, কামাখ্যা। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নানা ভাষাভাষী ও জাতিগোষ্ঠীর বাস। সেই সেই অঞ্চলেও তাদের নিজস্ব দেবপূজার ঐতিহ্য রয়েছে। তামিলভাষীদের আছেন মুরুগান (যুদ্ধ ও সৌন্দর্যের দেবতা, কার্তিকেয়র তামিল সংস্করণ), পেরুমল (তামিলদের বিষ্ণু), মীনাক্ষী= পার্বতী, অর্থাৎ দুর্গা)। অন্ধ্রবাসীদের তেমনি ভেঙ্কটেশ্বর, ভ্রমরাম্বা। উড়িষ্যায় জগন্নাথ, বলভদ্র, সুভদ্রা। রাজস্থানে গোগোজি (সর্পদেবতা), পাবুজজি (উট ও গরুর দেবতা), পাঞ্জাবে (পাঞ্জাবিদের মধ্যে সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী, গুরু নানকের শিষ্য, অর্থাৎ শিখ, আর মুসলমান, এই তিন ধর্মের পালনকারী আছেন) সূর্যদেব, বাবা বালকনাথ। এখানকার যাযাবর সম্প্রদায় সাঝিমাতার পুজো করেন। রাজবংশিরা করেন মাসাইয়ের আরাধনা।

আসলে, বহুদেবতাবাদ মনুষ্য সভ্যতার একটি অঙ্গ, যা প্রাচীন মিশর, গ্রিস-সহ বহু দেশেই একদা বিদ্যমান ছিল। এমনকী প্রাক্-ইসলামি আরবের মক্কা-উপাসনালয়ে (কাবা) হুবাল (হাবাল-ও লেখা হয়। চন্দ্রদেবতা), আল লাত, মানাত, নাসর-সহ ৩৬০ জন দেবতার মূর্তি ছিল। ভারতীয় ইতিহাসের বৈদিক পর্বে একদেবতাবাদ পরে বহুদেবতাবাদে পরিণত হয়। অন্য দিকে, ইসলামের ইতিহাসে দেখি, ইসলাম ধর্ম প্রবর্তিত হওয়ার আগে সেখানে বহু দেবতাকে মান্য করা হত। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক রসুলুল্লাহ্ এর পরিবর্তে একমাত্র আল্লাহকেই উপাস্য প্রচার করায় ইসলাম একদেবতাবাদী হয়ে ওঠে।

দুর্গাপুজোর অনুষ্ঠান ষষ্ঠী থেকে দশমী, এই পাঁচদিনের। আবার পঞ্চমীকেও ধরা হয়, কেন না ওইদিন মণ্ডপে প্রতিমা আনা হয়, ও তার সঙ্গে পুষ্পপ্রদীপ-সহযোগে স্কন্দমাতার (স্কন্দ, অর্থাৎ কার্তিকেয়) পুজো করা হয়ে থাকে। তিথির ব্যাপ্তি অনুযায়ী কখনও তা চারদিন, কখনও ছ’দিন। এবছর (২০২৬) সপ্তমী তিথি দু’দিন প্রলম্বিত হওয়ায় উৎসব হবে ছ’দিনের (পঞ্চমীকে হিসেবে আনলে সাতদিন)।

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই। দেশ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, প্রবীণদের সঙ্গে প্রতিবছর পুজোয় একজন নবীন লেখকের উপন্যাস ছাপবেন। সেজন্যই আমরা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব গুহের মতো ঔপন্যাসিকের দেখা পেয়েছি।

বাণিজ্যিক পত্রপত্রিকার চেয়ে বহু, বহুগুণ বেশি বেরোয় অ-বাণিজ্যিক পত্রিকা, বিষয়বৈচিত্র্যে তাক লাগিয়ে দিয়ে। কেউ বের করে মূকাভিনয় নিয়ে আস্ত একটি পত্রিকা, কেউ আবার নদী, রেড ইন্ডিয়ান সাহিত্য, বিখ্যাত কোনও মনীষী, বা শ্মশান, সুন্দরবন কিংবা শতবর্ষীদের নিয়ে।

ঐতিহাসিকদের মতে, ১৮৯২-তে (বাংলা ১২৯৯) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সাধনা’-ই সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ শারদীয় সংখ্যার দাবিদার। পত্রিকাটির তৎকালীন সম্পাদক ছিলেন কবির ভ্রাতুষ্পুত্র সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের ‘স্বর্ণমৃগ’ গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল। পরে ১৯১৩ সালে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকাটি প্রথম পুজোর সময় বিশেষভাবে সজ্জিত হয়ে প্রকাশিত হয়। সেই থেকে একশো বছরের ওপর হয়ে গেল, কত যে পত্রিকা বেরিয়েছে মহামূল্যবান গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধাদি নিয়ে, তা নিয়ে এক ডজন গবেষণা হতে পারে।

এর কিছু বিষণ্ণতার দিক-ও আছে। একদা বেশ কিছু অসাধারণ পত্রিকা বেরোত এ সময়, যেমন ‘এক্ষণ’, ‘বিভাব’, ‘প্রতিক্ষণ’, ‘বারোমাস’, ‘প্রমা’, ‘বর্তিকা’ ও আরও। পাঠকরা অধীর অপেক্ষায় থাকতেন, কবে পত্রিকাটি বেরোবে। ‘এক্ষণ’ প্রতিবছর সত্যজিৎ রায়ের চিত্রনাট্য ছাপত বলে পত্রিকাটির প্রতি আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। কী আশ্চর্য সমাপতন! ‘আগন্তুক’-এর চিত্রনাট্য বেরোনোর কিছুদিন বাদে সত্যজিৎ প্রয়াত হলেন, আর সে-চিত্রনাট্য ছাপা হয়ে বাজারে আসার আগে মারা গেলেন সম্পাদক নির্মাল্য আচার্য (গোড়ায় এ-পত্রিকাটির সঙ্গে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়-ও যুক্ত ছিলেন। পরে নির্মাল্য একা-ই চালাতেন)।

দুর্গাপুজোয় ফিরে আসা যাক অতঃপর। উপমহাদেশে দুর্গার কথা প্রথম মেলে কেনোপনিষদে, যেখানে তিনি উমা, আর জগতের চালিকাশক্তি। এই দেবী-ই যুগে যুগে বিবর্তিত হয়েছেন। বনদুর্গারূপে পূজিত হতেন তিনি প্রাচীন কালে। সহজেই অনুমেয়, প্রাচীন আরণ্যক সমাজজীবনে বনদেবীর তাৎপর্য। শিলিগুড়ি (ভারতের পশ্চিমবঙ্গে) বৈকুণ্ঠপুর জঙ্গলে আজ-ও পৌষ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে বনদেবীর পুজো হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা ‘দেবী চৌধুরাণী’-তে ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরাণীর গোপন আস্তানা ও আরাধনার স্থান ছিল এটি।

দেবী শাকম্ভরীও দুর্গার আর এক রূপ। মার্কণ্ডেয় পুরাণে পাই, দুর্গমাসুর ১০০ বছর ধরে পৃথিবীতে অত্যাচার চালায়। ফলে অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষে ছেয়ে যায় পৃথিবী। দেবী পার্বতী শাকম্ভরীর রূপ ধরে নিজ শরীর থেকে ফলমূল উৎপন্ন করেন, ও পৃথিবীবাসীর ক্ষুধা নিবৃত্ত করেন। আর তাঁর হাতেই নিহত হয় দুর্গমাসুর, ও সেজন্য দেবীর নাম হয় ‘দুর্গা’। এই দেবীও পৌষ-পূর্ণিমায় পূজিতা হন। বিশেষ করে রাজস্থানের সম্বরপীঠ, ও উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুরের শক্তিপীঠে পূজিতা হন তিনি।

দুর্গাপূজার অন্যতম অঙ্গ নবপত্রিকা, অর্থাৎ ন’টি গাছ। এক-একটি গাছকে দুর্গার বিভিন্ন নামের এক-এক প্রতীকরূপে বিবেচনা করা হয়। যেমন, কলা বা কদলী (ব্রহ্মাণী), কচু (কালিকা), হলুদ (উমা), বেল (শিবা), ডালিম (রক্তদন্তিকা), অশোক (শোকরহিতা), মান কচু (চামুণ্ডা) ও ধান (লক্ষ্মী)। কৌতূহলের বিষয় হল, নবপত্রিকার সঙ্গে একটু যেন জোর করেই বিভিন্ন দেবীর নাম যুক্ত করা হয়েছে। এই পুজো যে প্রাথমিকভাবে কৃষিভিত্তিক ছিল, ছিল শস্যদেবতার আরাধনা, নবপত্রিকা তার-ই সাক্ষ্য দেয়। পণ্ডিত শশিভূষণ দাশগুপ্তের মতে, ‘এই শস্যবধূকেই দেবীর প্রতীক করিয়া প্রথমে পূজা করিতে হয়। তাহার কারণ শারদীয়া পূজা মূলে বোধ হয় এই শস্যদেবীর-ই পূজা। পরবর্তীকালের বিভিন্ন দুর্গাপূজার বিধিতে এই নবপত্রিকার বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হইয়াছে।’ অবাক লাগে, ধান ও লক্ষ্মী পরস্পর-সংলগ্ন ঠিক-ই, কিন্তু তিনি তো দুর্গার মেয়ে! স্বয়ং দুর্গা হন কীভাবে?

নবপত্রিকাকে একত্র করে, দু’টি বেলকে দেবীর স্তনযুগল কল্পনায় একত্র বেঁধে, একটি কলাগাছে শ্বেত অপরাজিতায় সুন্নত করে দেবী দুর্গার ডানপাশে স্থাপন করতে হয়। তার আগে পুরোহিত-বাহিত হয়ে নবপত্রিকাকে নদী বা পুকুরে স্নান করিয়ে আনতে হয়। নবপত্রিকার আরাধনা দিয়েই দুর্গাপূজার সূচনা হয়।

সন্ধিপূজা।। দুর্গোৎসবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব এটি। অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিকালে (অষ্টমী তিথির শেষ চব্বিশ মিনিট, ও নবমীর প্রথম চব্বিশ মিনিট, এই মোট আটচল্লিশ মিনিট) এই সন্ধিপূজার স্থিতিকাল।

সন্ধিপূজা কী? এর প্রকৃত তাৎপর্য-ই বা কোথায়? দৈত্যরাজ শুম্ভ-নিশুম্ভের সেনাপতি চণ্ড ও মুণ্ড নামে দুই অসুরভ্রাতা। দুর্গা যখন মহিষাসুরের সঙ্গে যুদ্ধরত, তখন তারা পেছন থেকে দুর্গাকে আক্রমণ করলে দেবী দুর্গা নিজের তৃতীয় নেত্রের উজ্জীবন ঘটিয়ে চামুণ্ডার রূপ ধরে দু’জনকে হত্যা করেন। কিন্তু যুদ্ধে দেবীর শরীরের একশো আটটি জায়গায় আঘাত লেগে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এজন্য দুর্গার স্বামী মহাদেব দেবীকে পরামর্শ দেন দেবীদহে স্নান করতে। সেখানকার একশো সাতটি পদ্ম দুর্গার ক্ষতস্থান ঢেকে দেয়। বাকি ক্ষততে মহাদেব স্বয়ং অশ্রুবারি দিয়ে নিরাময় আনেন, ও সেখানেও একটি পদ্মের জন্ম হয়। মহাদেব নিজ চোখের জল দিয়ে অবশিষ্ট একটি ক্ষতস্থান ঢেকে দেন। পরে সেখানেও একটি পদ্ম ফুটে ওঠে। এজন্যই সন্ধিপূজা, চণ্ডমুণ্ড বধের জন্য। তাই এদিন দেবীর পুজোয় একশো আটটি পদ্মফুল লাগে। তাছাড়া দরকার জবাফুল। আর ওইদিন চামুণ্ডাদেবীও পূজিতা হন।

রামায়ণেও দেখি, রাবণবধের জন্য রাম দুর্গার কাছে থেকে আশীর্বাদলাভের জন্য তাঁর পুজো করছেন রামের দুর্গাপূজায় একশো আটটি পদ্মফুলের প্রয়োজন হলে হনুমান তা এনে দেয়। রামকে পরীক্ষা করার জন্য দুর্গা একটি ফুল লুকিয়ে রাখলে রাম ধনুর্বাণ নিয়ে নিজের চোখ উপড়ে দেবীকে অর্ঘ্য দিতে চান, কেননা লোকশ্রুতি আছে, রাম পদ্মপলাশলোচন। দেবী রামের ভক্তিতে তুষ্ট হন, ও চোখ উপড়ানোয় বাধা দিয়ে লুকানো পদ্মটি ফেরত দেন। রামের-ও এই পুজোটি ছিল সন্ধিপুজো। এসব কারণেই সন্ধিপূজার গুরুত্ব।

কুমারী পূজা।। দুর্গাপূজার অন্য এক আচারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কুমারী পুজো। এটি একটি তন্ত্র-সমর্থিত অনুষ্ঠান। যোগিনীতন্ত্র, যামলতন্ত্র, কুলার্ণবতন্ত্রে এর বর্ণনা ছাড়াও সপ্তদশ শতাব্দীতে নদীয়ার বিখ্যাত পণ্ডিত কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের ‘তন্ত্রসার’ গ্রন্থে এর বর্ণনা আছে। নারীর মধ্যে পরমার্থ দর্শন-ই কুমারীপূজার মূল ভিত্তি।

এখানে ‘কুমারী’ শব্দটির তাৎপর্য হল, আরাধ্যা নারীকে প্রাক্-ঋতুমতীর হতে হবে। এক থেকে ষোলো বছর বয়স পর্যন্ত কুমারীরাই পূজার্হা। বয়সভেদে কুমারীদের নাম-ও শাস্ত্রনির্দিষ্ট,– সন্ধ্যা, সরস্বতী, ত্রিধামূর্তি, কালিকা, সুভগা, উমা, মালিনী, কুব্জিকা, কালসন্দর্ভা, অপরাজিতা, রুদ্রাণী, ভৈরবী, মহালক্ষ্মী, পীঠনায়িকা, ক্ষেত্রজ্ঞা ও অন্নদা বা অম্বিকা। মহাষ্টমীর দিন কুমারীপূজা অনুষ্ঠেয়।

প্রথাটি যে প্রাচীন, তাঁর প্রমাণ, বাংলায় ‘কুমারীপূজাপ্রয়োগ’ নামে একটি পাণ্ডুলিপি পাওয়া গিয়েছে, যা বাংলা একাডেমি ঢাকায় সংরক্ষিত (নম্বর ১৫৯)। বর্তমানে বিশ্বের নানা স্থানে রামকৃষ্ণ মিশন-কৃত দুর্গাপুজোয় কুমারীকে মাতৃজ্ঞানে আরাধনা করা হয়। এর উদ্যোক্তা স্বামী বিবেকানন্দ। ১৮৯৮-তে তিনি কাশ্মীরে, দুঃসাহসিক মনে হবে আমাদের, এক মুসলমান মেয়েকে কুমারী পূজা করেছিলেন। পরবর্তীতে বেলুড়ে ১৯০১-এ যখন দুর্গাপুজো শুরু হয়, তখন কুমারীকে পুজো করা হয়, যাদের মধ্যে চারজনকে স্বামীজি নিজে পুজো করেছিলেন। সেই থেকে বেলুড়ে বরাবর দুর্গাপুজোর সময় কুমারী পুজো হয়ে আসছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশন-পরিচালিত কেন্দ্রে কুমারী পুজো হয়, বিশেষ করে ঢাকা, হবিগঞ্জ ও দিনাজপুর মিশনে। এই কুমারীও অসুর বধকারিণী। পুরাণে আছে, বানাসুরকে বধ করেছিলেন তিনি।

কৌতূহলের বিষয়, নেপালেও কুমারীপুজো হয়। দুর্গোৎসবের সময়, বা অন্য সময়েও। তবে সেখানে কুমারীর বয়স দশের বেশি হলে চলবে না। আর এই কুমারীরা সরকারি পেনশন পর্যন্ত পান।

নেপালে কেবল হিন্দুরা নন, বৌদ্ধরাও কুমারী পুজো করেন। কুমারী কে তারা ‘তালেজু ভবানী’ বা দুর্গা/কালীর জীবন্ত রূপ বলে মানেন। চতুর্দশ শতাব্দীতে ভক্তপুরে রাজা ত্রৈলোক্যমল্ল ও হরি সিং দেবের সময় থেকে এই কুমারী পুজোর প্রচলন। শাক্যবা বজ্রাচার্য পরিবার থেকে কুমারী কন্যা নির্বাচিত হয়। বাংলায় কিন্তু জাতিধর্ম নির্বিশেষে কুমারী নির্বাচিতরা হতে পারে। তবে মুখ্যত বাস্তবে ব্রাহ্মণ কুমারীরাই বিবেচিত হয়ে থাকে।

উল্লেখ্য, নেপালে সজনী শাক্য নামে যাকে কুমারী পুজো করা হয়েছিল, তাকে নিয়ে ব্রিটিশ চিত্রপরিচালক অ্যালান ইরেইরা ‘The Living Goddess’ নামে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন।

দুর্গাপূজার কাহিনি ও এর অনুসঙ্গ এককথায় অফুরান। আমরা মোটামুটি এর বৈচিত্র ও ব্যাপ্তি দেখাতে চেষ্টা করলাম। প্যান্ডেল, দেবী দুর্গা ও তাঁর সহযোগীদের মূর্তির নান্দনিকতা, পুজোর ভোগ, অঞ্জলি ও ভূরিভোজ, ঢাকের বাদ্য, দলবল নিয়ে পুজো দেখতে বেরোনো, পুজোয় তরুণতরুণীর প্রেম, তাদের নতুন পোশাকের সাজগোজ, সবশেষে বিসর্জনের আগে বিবাহিতাদের দেবীবরণ, সিঁদুরখেলা, আর প্রতীক্ষা, একবছর বাদে দেবীর পুনরাগমনের।

বাংলাদেশের দুর্গাপূজা

বাংলাদেশে বহুবার আসার সূত্রে এখানকার নদী সমুদ্র অরণ্য ও প্রত্নস্থান যেমন, তেমনই বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উৎসবানুষ্ঠান, যেমন ঈদ, বুদ্ধপূর্ণিমা, জগন্নাথ হলকে ঘিরে এত এত সরস্বতীপুজো, এসব দেখার সুযোগ হয়েছে। বেশ কয়েকবার দেখেছি বাংলাদেশের দুর্গোৎসব। একবার তো বরিশালকেন্দ্রিক বিভিন্ন দুর্গাপুজোর মূর্তি, আলো, পরিবেশ ইত্যাদির অন্যতম বিচারকের ভূমিকাতেও ছিলাম। দেখেছি বেশ কিছু বনেদি বাড়ির পুজো, যেমন কাশীপুরের মুখার্জিবাড়ির পুজো। এসব নিয়েই কিছু লিখব আজ।

একথা আমরা জানি, বঙ্গদেশে প্রথম দুর্গাপুজো করেছিলেন তাহেরপুরের (রাজশাহি) জমিদার কংসনারায়ণ। ১৪৮০ সালে প্রায় ন’লাখ টাকা ব্যয়ে অনুষ্ঠিত হয় এই পূজানুষ্ঠান। সোনা ও নানান মণিমুক্তা দিয়ে দেবীর অলঙ্কার নির্মিত হয়েছিল। সমসাময়িক কালে রামায়ণ-রচয়িতা কবি কৃত্তিবাসে (১৩৮১-১৪৬১) দুর্গাপুজোর কথা পাই। পাই মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে, যেখানে তিনি লিখছেন, ‘আশ্বিনে অম্বিকা পূজা করে জনে জনে।/ ছাগ মহিষ মেষ দিয়া বলিদানে।।’ জনে জনে করত? ছাগ-মহিষ-মেষ বলি দিয়ে? একটু খটকা লাগে, কেননা সেসময় তো রাজা-মহারাজ-জমিদাররাই এ-পুজো করতেন বলে আমরা জানি। যেমন কলকাতার সাবর্ণ রায়চৌধুরীরা ১৬১০ সাল থেকে দুর্গাপুজো করে আসছেন। এরকম আরও।

অনেক ঐতিহাসিকের মতে, ঢাকার যে ঢাকেশ্বরী মন্দির, তা সেন আমলের। কথিত আছে, সেন রাজা বল্লালসেন মাটির নীচ থেকে দুর্গামূর্তি পান, ও ঢাকেশ্বরী মন্দির তৈরি করে সেই দেবীমূর্তি সেখানে স্থাপন করেন। তা হলে তো বাংলাদেশে দুর্গাপুজোর ঐতিহ্য আরও প্রাচীন হয়ে পড়ে!

সে যা-ই হোক, ঢাকার ভাওয়াল রাজবাড়ি, বিক্রমপুর জমিদারবাড়ি, বরিশালের লাখুটিয়ার জমিদার, সিলেটের পাঁচগাঁওয়ের পুজো ঐতিহ্যমণ্ডিত। এর মধ্যে পাঁচগাঁওয়ের মূর্তি তান্ত্রিক মতানুযায়ী রক্তবর্ণা। উপমহাদেশের আর কোথাও এমন রক্তবর্ণা দুর্গার মূর্তি নেই। আঠারো শতকে সাতক্ষীরার কলারোয়ায় ও ১৭৫৯-এ মঠবেরিয়ার নবরত্ন মন্দিরে দুর্গোৎসবের তথ্য মেলে। আর্মানিটোলার জমিদার শ্রীনাথ রায়ের বাড়ির পুজোটিও ছিল জাঁকজমকপূর্ণ। তবে সবচেয়ে জৌলুস ছিল সূত্রাপুরের ব্যবসায়ী নন্দলাল বাবুর মৈসুণ্ডির বাড়ির পুজো। ব্যয়ের দিক থেকে আজ-ও স্মরণীয় হয়ে আছে। অর্থনীতিবিদ ভবতোষ দত্ত তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, নন্দলালবাবুর দুর্গামূর্তি ছিল দোতলার সমান উচ্চতাবিশিষ্ট।

বাংলাদেশের দুর্গাপূজা: বৈশিষ্ট্যসমূহ

এতক্ষণ তো গেল ইতিহাসের দিক। এবার দেখা যাক, বাংলাদেশের আজকের দুর্গাপুজোর অনবদ্য দিকগুলি।

প্রথমত, সাধারণভাবে বেশিরভাগ প্রতিমা মণ্ডপেই তৈরি হয়। মূর্তিকররা এক-দেড় মাসের জন্য মণ্ডপে বা স্থানীয় কোনও বাড়িতে থেকে মূর্তি তৈরি করেন। তাই বলে ঢাকা বা বাংলাদেশের অন্যত্র যে পোটোপাড়া নেই, তা কিন্তু নয়। পুরনো ঢাকার শাঁখারিবাজার, তাঁতিবাজার ও অন্যত্র বেশ কয়েক ঘর পালেদের বাস, যারা বংশানুক্রমে দেবদেবীর মূর্তি তৈরি করেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মূর্তি তৈরির সব জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ায় এ বছর প্রতিমার দাম বেড়েছে। ষাট-সত্তর হাজার টাকার প্রতিমার দাম এবার আশি থেকে নব্বই হাজার, এমনকী একলাখ টাকা।

ঢাকার বাইরেও ঐতিহ্যপূর্ণ পালপাড়া বা পোটোপাড়া রয়েছে। কুমিল্লার নানুয়া দিঘির পাড়, সিলেটের গোয়াইলঘাট, বরিশালের মাধবপাশা, সিরাজগঞ্জের ভদ্রঘাট, গোপালগঞ্জের সিকদারপাড়া, নোয়াখালির চৌমুহনিতে। ঢাকার অদূরে ধামরাইয়ের কথা এখানে না বললেই নয়। শ্যামল পাল, বাসুদেব পাল, এখানকার নতুন বন্দর, শিমুলিয়ার বিখ্যাত শিল্পী। সুকান্ত বণিক একজন মৃৎশিল্পী ও ভাস্কর। তিনি ৫২০ কেজির একটি দুর্গামূর্তি গড়েছেন, অষ্টধাতুর। এই মূর্তি তাঁর-ই গৃহে পূজিতা হন। দূরদূরান্তের থেকে দর্শনার্থী-সমাগম হয় এই প্রতিমা দেখতে। বলা বাহুল্য, এ মূর্তি জলে বিসর্জিত হয় না।

এখানে একটি অনবদ্য তথ্য দিই। যে দুর্গাপুজো হিন্দুদের, তার মূর্তিনির্মাণে কিন্তু মুসলিমরাও যোগ দেন। মোহাম্মদ আকাশ এরকম-ই একটি নাম। আছেন নূর মোহাম্মদ। তাছাড়া দেবীর কেশনির্মাণে মুসলিম শিল্পীরা হাত লাগান। এজন্য পাট সিদ্ধ, রং করায় তাঁরা সিদ্ধহস্ত। এখানে গাইবান্ধার ববিতা রাণী বিশ্বাস, অঞ্জলি মণ্ডল (গোপালগঞ্জ), সুমিতার (দুপুর) মতো মহিলা মৃৎশিল্পীও আছেন। হয়তো তাঁদের নাম কলকাতার কুমারটুলির বিখ্যাত মহিলা মৃৎশিল্পী মালা পালের মতো বিদেশেও ছড়িয়ে পড়বে, যিনি অস্ট্রেলিয়া, কানাডাতে তাঁর তৈরি দুর্গাপ্রতিমা পাঠিয়ে থাকেন।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে দেখেছি, দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল ও আলোকসজ্জা খুব জাঁকালো হয় না। উৎকট উগ্রতা নেই বলে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে যায়। কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য জেলায় আলো আর শব্দের বাড়াবাড়ি। এর ফলে পূজার আবহ ব্যাহত হয়।

তৃতীয়ত, দেবদেবীর মূর্তির মধ্যে, বিশেষ করে মুখাবয়বে, একটা শ্রদ্ধা-উদ্রেককারী মহনীয়তা থাকে। প্রতিমার গড়ন হয় সাবেক, আর পোশাক রুচিশীল ও স্নিগ্ধ। মূর্তি দেখলেই ভক্তের মনে একটা অপার শ্রদ্ধার ভাব আসে।

চতুর্থত, এখানকার মূর্তি সাধারণত একচালায় হয়। দুর্গা ছাড়াও লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ। তা বাদে মহিষ ও মহিষাসুর। সব মূর্তিগুলোকে একটিমাত্র চালায় নির্মাণ করে তাঁদের সমানুপাতিক রাখা কিন্তু বেশ আয়াসসাধ্য। এ ব্যাপারে এখানকার শিল্পীরা দারুণ দক্ষ। তবে আলাদা আলাদা মূর্তি ও নির্মিত হচ্ছে সম্প্রতি, আর তার পরিমাণ-ও ক্রমশ বাড়ছে।

তাছাড়া মাটির বদলে ব্যতিক্রমী জিনিস দিয়েও আজকাল মূর্তি তৈরি হচ্ছে। সাতক্ষীরার আশাশুনিতে বরদল সর্বজনীন কালীমন্দিরে মুগডালের প্রতিমা নির্মিত হয়েছে। প্রতিমা সেখানে মৃন্ময়ী নয়। নাটোরেও। কুমিল্লার জগৎপুর গৌরনিতাই সেবাশ্রম এবছর সোনালি ধানের শীষ দিয়ে প্রতিমা করেছে। সঞ্জয় পাল ও তাঁর দলের কারুকৃতি এটি। অন্য দিকে, নোয়াখালির চৌমুহনিতে এবার একাত্তর ফুটের দুর্গামূর্তি তৈরি হয়েছে। তাঁর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ৪৫ ফুটের লক্ষ্মী, ৪০ ফুটের সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ ৩০ ফুটের।

পঞ্চমত, এখানে একটি নিয়ম দেখে আশ্চর্য ও আনন্দিত না হয়ে পারিনি। পুজোয় চাঁদা আদায়ের কোনও জুলুম নেই। বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা চাওয়া হয় যেমন, তেমনই প্রায় প্রতিটি মণ্ডপে টেবিল পেতে বসেন উদ্যোক্তাদের লোকজন। পাড়ার লোকজন স্বেচ্ছায় এসে যথাসাধ্য চাঁদা দিয়ে যান। এমনকী পুজো চলাকালীন দিনগুলিতেও দেখেছি, কর্তব্য বিধায় চাঁদা দিয়ে যেতে। কেবল যে হিন্দুরাই দেন তা কিন্তু নয়। যে পাড়ায় পুজো হয়, সে পাড়ার মুসলমান ও অন্য ধর্মের লোকজনকেও চাঁদা দিতে দেখেছি। একবার চারজন স্কুলছাত্রী মণ্ডপে এসে চাঁদা দিল। কৌতূহলী হয়ে তাঁদের নাম জানতে চাইলাম। চারজনেই মুসলিম। এই যে বন্ধুরা মিলে প্রতিমা দেখতে বেরোনো, ভাল লেগেছে বলে চাঁদা দেওয়া, এটাই আমার কাছে বাংলাদেশকে শ্রদ্ধেয় করে তুলেছে।

ষষ্ঠত, প্রতিবছর বাংলাদেশের পুজোর সংখ্যা বাড়ছে। এটা প্রমাণ করে, বারোয়ারি পুজোর মতো ব্যয়বহুল পূজানুষ্ঠানে অর্থব্যয়ের ক্ষমতা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে সনাতন সম্প্রদায়ের, বাড়ছে। গত ২০২১-এ এখানে ৩২,১২২টি পুজো হয়েছিল। গতবছর হয়েছে ৩২,৪৬১টি। আর এবছর হবে ৩৩,৮৫১টি।

সপ্তমত, প্রতিবছর পুজো উপলক্ষে প্রত্যেক উদ্যোক্তাকে সরকারের থেকে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। আগের বছরে তার পরিমাণ ছিল দু’কোটি টাকা। এবছর তা বেড়ে হয়েছে পাঁচ কোটি টাকা। তাছাড়া অন্যান্য বছর পুজোয় একদিন সরকারি ছুটি থাকত। এবছর তাকে দু’দিনে উন্নীত করা হয়েছে।

প্রতিবছর আশ্বিন বা কার্তিক মাসে দেবী দুর্গার যে আরাধনা, তা মূলত বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসব। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা সনাতনধর্মীয়রা আড়ম্বরের সঙ্গে এই পুজো উদযাপন করেন। তাই চেন্নাই থেকে চেক প্রজাতন্ত্র, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে কারাকাস, পেরু থেকে পোল্যান্ড, সর্বত্র।

আজ প্রবাসীদের দুর্গাপুজো পালন নিয়েও কিছু জানা যাক। সেইসঙ্গে জানব, দেবী দুর্গার সঙ্গে আবিশ্বের দুর্গাসন্নিভ দেবীদের কথাও। দুর্গার অনুরূপ, প্রায় অনুরূপ-ই বলা ভাল, বিশ্বের বিভিন্ন পুরাণে কীভাবে এই নারীশক্তির প্রতি আনত হত মানুষ।

প্রথমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই উৎসব কীভাবে ও কদিন পালিত হয়, তা জানব। সাধারণভাবে সারা পৃথিবীর সব দেশেই দুর্গার আরাধনা হয়ে থাকে। আইসল্যান্ড থেকে আলাস্কায়।

সৌদিতে দুর্গোৎসব

এমনকী সৌদিতেও দুর্গাপুজো হয়, যদিও সেখানে দুর্গামূর্তি তৈরি বা আনয়ন নিষিদ্ধ। মরুভূমি, খনিজ তেল আর মাথায় পরিহিত শেমাগ, (Shemagh/Keffiyeh), এই তিন নিয়ে সৌদি আরব। সেখানকার জেদ্দা থেকে একশো কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে কউস্ট (KAUST), ‘King Abdullah University of Science and Technology’। অন্যান্য দেশ ও প্রদেশের মতো এখানেও সাতচল্লিশজন বাঙালির বসবাস। মূর্তিপূজা নিষেধ। তাই বলে কি নতুন পোশাক পরবেন না কেউ? মনে মনে অঞ্জলি দেবেন না? চর্ব্যচোষ্য আহার বাদ যাবে কারও? না, না, এবং না। তাই এসব কিছুই হয়, সঙ্গে গানবাজনা। ভূরিভোজে থাকে বাঙালির প্রিয়তম মাছ ইলিশ, থাকে খাসি। এ এক আলাদা মাধুর্য, দূর প্রবাসে থেকে শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি বেদনার মালা গাঁথা, আর প্রতিকূলতার মধ্যেও অনুকূলতা নিয়ে এসে বৎসরান্তিক উৎসবে মেতে ওঠা। ঢাক বাজে না, উলুধ্বনি নেই, নেই সিঁদুরখেলা। তবু নিজ ঐতিহ্যের প্রতি ভালবাসা তো আছে!

সংযুক্ত আরব আমিরাতে কিন্তু দুর্গামূর্তি নিষিদ্ধ নয়। এখানকার সাতটি স্থানেই,– আবু ধাবি, শারজাহ্, দুবাই, আজমান, উম্ম আল-কোয়াইন, ফুজিরাহ্ ও রাম আল খাইমাহে, সব বাঙালি মিলেমিশে পুজো করেন, পুজোর যাবতীয় আয়োজন আর শাস্ত্রীয়তা সমেত। মূলত ভারতীয় বঙ্গীয় পরিষদ এর আয়োজক। কুমোরটুলি থেকে মাটির অথবা ফাইবার গ্লাসের মূর্তি যায়, কখনও কখনও কলকাতা থেকে পুরোহিত-ও যান। মহালয়াও সোৎসাহে নাচ-গান-স্তোত্রপাঠের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। প্রবাস তাঁদের ঐতিহ্যচ্যুত, ইতিহাসবিস্মৃত ও শিকড়হীন করতে পারেনি।

কৌতূহলের বিষয়, আবুধাবিতে যেমন দুর্গাপুজো হয়, তেমনই এই ২০২৬ সালে দুর্গাপুরের (পশ্চিমবঙ্গ) মার্কির্নি দক্ষিণ পল্লীর থিম আবুধাবির (BAPS) হিন্দু মন্দিরের আদলে মণ্ডপ। মণ্ডপের মূল ভাবনায় মলয় ও শুভময়। আর ক্যানভাস আর্টের দায়িত্বে আছেন গোপাল পোদ্দার। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ১০৮ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট মন্দিরটির সাতটি চূড়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাতটি রাজ্যের প্রতীকরূপে।

আফ্রিকাও দুর্গাপুজোয় পিছিয়ে নেই। কেপটাউন ও জোহানেসবার্গ, এ দু’টি শহরে রীতিমতো জাঁকজমকের সঙ্গেই এ পুজো অনুষ্ঠিত হয়। এখানে কাশফুলের প্রতিনিধিত্ব করে বেগুনি বর্ণের জাকারান্ডা। তবে ভারত-বাংলাদেশের বাইরে বহু দেশেই কিন্তু কাশফুল ফোটে,– মিশর, ইথিওপিয়া, ক্যামেরুন, পাপুয়া নিউগিনি, তাহিতি, এমনকী আমেরিকার ফ্লোরিডা, কিউবা ও ইওরোপের গ্রিসেও। জোহানেসবার্গের পুজোয় দু’বাংলার মানুষ যোগ দেন, ডাকের সাজের প্রতিমা আসে কুমোরটুলি থেকে। কলকাতা থেকে পুরোহিত এসে দুর্গা, লক্ষ্মী ও কালীপুজো সম্পন্ন করে বিদায় নেন।

লাল আর সোনালিতে মেশানো টোন, আর্কিটেকচারাল সিমেট্রি হল কেপটাউনের দুর্গাপ্রতিমার বৈশিষ্ট্য। এখানকার প্রতিমাও আসে কুমারটুলি থেকে, আর তা একচালা।

পুজোয় নারী পুরোহিতের চল হয়েছে কয়েক বছর ধরে। কলকাতায় নন্দিনী ভৌমিকের প্রতিষ্ঠান ‘শুভমস্তু’ এর ভগীরথ। এখন বেশ কয়েক স্থানের পুজোয় পুরোহিতরূপে নারীদের দেখি। এটাই তো স্বাভাবিক, কেননা দেবী দুর্গা নারী বিধায় তাঁর আরাধনায় নারীর অধিকার সর্বাগ্রে। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীকে এতকাল পৌরোহিত্য থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। যাই হোক, বিদেশেও কিন্তু পুরোহিত হিসেবে নারীদের পাচ্ছি এখন। আমেরিকার সাউথ ক্যারোলিনার ‘আলাপন’ ক্লাব, আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন বা জার্মানির কয়েকটি পুজো নারী-পুরোহিতরাই করছেন। শ্রেয়াঞ্জনা মুখোপাধ্যায় ও সুকন্যা সান্যাল ডাবলিনে পৌরোহিত্য করবেন। মৌমিতা চক্রবর্তী সাউথ ক্যারোলিনায়, সঙ্গে সৌরদীপ চক্রবর্তী। দক্ষিণ জার্মানির স্টুডগার্টের ‘মৈত্রী ক্লাব’-এর পুজো সামলাবেন পারমিতা চক্রবর্তী।

১৯৬০ সাল থেকে লন্ডনে প্রথম দুর্গাপুজোকে বিদেশে প্রথম বলে গণ্য করা হয়। আর সত্তরের দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় এর সূচনা। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই দুর্গাপুজো হচ্ছে। কেবল যুক্তরাজ্যেই হয় পঞ্চাশটি, যুক্তরাজ্যে দেড়শোটি।

পুজোয় বিদেশের নানা জায়গা থেকে শারদ পত্রপত্রিকা বেরোয়। টেক্সাসের হাউস্টন দুর্গা বাড়ি সমিতি থেকে বেরোয় ‘শারদ অর্ঘ্য’, দীর্ঘদিন ধরে মিনাসোটা থেকে বেরোচ্ছে ‘সন্নিকট’। কানাডার ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ-ও বের করে, করে কোলন, জার্মানির ‘ভারত সমিতি পুজো ম্যাগাজিন’। সুইজারল্যান্ড-ও বাদ যায় না। তাদের পত্রিকা ‘প্রাঙ্গণ পুজো স্মরণিকা’। আছে লন্ডনের ‘এশিয়ান ভয়েস’।

এবার দেখব পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতায় দেবী দুর্গার অনুরূপ দেবীর অস্তিত্ব। আমরা জানি, পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মানুষ খ্রিস্টধর্মানুসারী। কিন্তু খ্রিস্টধর্মের আগে সেখানে, বিশেষ করে গ্রিস ও রোমে বহুদেবতাবাদের যুগ ছিল। তাছাড়া প্রাচীন অন্য এক সভ্যতার দেশ মিশরের মানুষ-ও অগণিত দেবদেবীর আরাধনা করত। চীন ও জাপানের মানুষ-ও। আফ্রিকান জনজাতির ছিল নিজস্ব দেবদেবী, যেমন নানা বুলুকু, ইয়েমায়া, মাউ, আশা, ওশুন, ওয়া ইত্যাদি। পৃথিবীর সব নৃতাত্ত্বিক আদিবাসীদের-ও ছিল ও আছে। বহুদেবতাবাদের একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল, নারীশক্তির আধাররূপে কোনও না কোনও দেবীকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসানো হয়েছে। সাঁওতালদের যেমন জাহের এরা। মারাঙ বুরু পুরুষ, জাহের এরা নারী।

গ্রিসে এথেনা বা আথেনা নারীদেবীরূপে সবচেয়ে গুরুত্ব পেতেন। দেবরাজ জিউসের মাথা/কপাল থেকে এথেনার জন্ম, আর জন্মমাত্রই তিনি আফ্রোদিতির মতোই পূর্ণবয়স্কা। এথেনার হাতে ঢাল, তলোয়ার। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো বলেছেন, এথেনা নামটির সঙ্গে ঐশ্বরিক প্রজ্ঞা যুক্ত হয়ে আছে। প্যানাথেনাইয়া উৎসব এথেনীয় বর্ষপঞ্জীর সবচেয়ে বড় উৎসব, আমাদের দুর্গাপুজোর মতো। এথেনার নাম থেকেই এথেন্স নামের উদ্ভব। তবে অনেক ঐতিহাসিক আবার উল্টো মত-ও পোষণ করেন।

দুর্গাকে নিয়ে যেমন শুম্ভ-নিশুম্ভের দ্বন্দ্ব, তেমনি গ্রিসের যে ট্রয়যুদ্ধ, তার পেছনে এথেনা। তবে সঙ্গে আফ্রোদিতি ও হেরা-ও আছেন। যুদ্ধের দেবী রূপেই তিনি সমধিক প্রসিদ্ধ। এথেন্সের পার্থেনন মন্দিরটি এথেনার নামে। রোমানদের কাছে তিনি মিনার্ভা নামে পরিচিত।

দুর্গা সিংহবাহিনী, এথেনার বাহন পেঁচা, যা ভারতীয় পুরাণ-মোতাবেক লক্ষ্মীর বাহন। সাপ তাঁর সঙ্গী, যেমন মনসার।

নারীর আত্মরক্ষা ও শক্তির প্রতীক গ্রিক দেবী আর্টেমিস। তিনি শিকার, অরণ্য ও বন্যপ্রাণীর-ও দেবী। দুর্গাও আদিতে বনদুর্গারূপে পূজিতা হতেন। আর বাণাসুরের অত্যাচারে একবার পৃথিবীতে দুর্ভিক্ষ লাগলে দুর্গা নিজ অঙ্গে শস্য ফলিয়ে পৃথিবীবাসীকে রক্ষা করেন। তাই তাঁর নাম হয় ‘শাকম্ভরী’। আর্টেমিস বাঘ ও সিংহের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখেন। দুর্গা হিমালয়কন্যা, আর্টেমিস অলিম্পিয়াড পাহাড়ের কন্যা। দুর্গা বিবাহিতা, আর্টেমিস কুমারী।

গ্রিক দেবী সাইবেলি (Cybele) আবার সিংহবাহিনী। রোমানরা ও অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে এই দেবীর পুজো করত। দেবী কখনও আবার দুই সিংহে টানা রথারূঢ়া।

মিশর। এই নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে পরপর মনে পড়ে পিরামিড, মমি ও ক্লিওপেট্রার কথা। ক্লিওপেট্রা মিশরের রাণী ও সেইসঙ্গে দেবীরূপেও পূজিতা। সে প্রসঙ্গে পরে আসব। মিশরীয় দেবতা সেখমেত সূর্যদেবতা রা-এর কন্যা, মেমফিসে যিনি বিশেষভাবে পূজিতা। সেই দেবী সেখমেতের সাথে দুর্গার মিল রয়েছে। সিংহের মাথা ও নারীর শরীর নিয়ে তিনি আবির্ভূতা। প্রেম ও মাতৃত্বের দেবী তিনি,আবার সৃষ্টি ও ধ্বংসের। মানবজাতি রা-এর অবাধ্য হলে রা তাঁকে সৃষ্টি করেন।

এখানে গ্রিস, মিশর ও ভারতের সিংহ সম্পর্কে দু-চার কথা বলা যাক। গ্রিসে যে একদা সিংহ ছিল, সেকথা হেরোডাটাসের লেখায় পাই। আছে এরিস্টটলের বর্ণনাতেও। শিকার, ও বিশেষ করে গ্ল্যাডিয়েটরদের সঙ্গে যুদ্ধের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হতে থাকায় খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীর পর থেকে তারা লুপ্ত হয়ে পড়ে। মনে রাখা দরকার, গ্রিসেও রোমের অনুরূপ গ্ল্যাডিয়েটরদের সঙ্গে সিংহের লড়াই একটা জনপ্রিয় ও নিষ্ঠুর খেলা ছিল। রোমান সাম্রাজ্য যখন গ্রিসের কোনও কোনও অঞ্চল দখল করে, (ম্যাসিডোনীয় যুদ্ধসমূহ, খ্রিস্টপূর্ব ২১৪-১৪৮) তারপর থেকে এ-খেলার সূচনা।

করিন্থ, এপিডেউরাস ইত্যাদি স্থানে এ-খেলা প্রচলিত ছিল। মিশরেও অনুরূপভাবে তারা নির্মূল হয়। ভারতেও একমাত্র গুজরাটের গির অরণ্য ছাড়া অন্য কোথাও সিংহ নেই। ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার তাঁর ‘Exotic Aliens: The Lion and the Cheetah in India’-তে লিখেছেন, সিংহ ভারতে ছিল না কখনও, বাইরের ভূখণ্ড থেকে এসেছে। তবে অনেকেই তাঁর সঙ্গে একমত নন। তবে, হিমালয়ের ব্যাপ্ত প্রসারে হয়তো ছিল, যা কালিদাসের ‘কুমারসম্ভব’ কাব্যে পাওয়া যায়। সিংহ হাতি শিকার করছে, আর বরফে সেই নিহত হাতির ছড়িয়ে পড়া রক্ত, যা ধুয়ে যাচ্ছে হিমপ্রপাতে, এই অসামান্য বর্ণনা কেবল কাল্পনিক বলে মনে হয় না। কালিদাস এ-ও লিখেছেন, রক্তচিহ্ন মুছলেও সিংহশিকারীরা তার গুহা চিনে নেয়। কীভাবে? পশুরাজ হাতিকে আক্রমণ করলে হাতির মাথার চূর্ণ গজমুক্তা সিংহের নখে লেগে থাকে, আর সেটা সিংহের যাত্রাপথে উজ্জ্বল হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। সেটা অনুসরণ করেই শিকারীরা গুহার স্থান চিনে নেয়। উল্লেখ্য, উত্তর ভারতের বহু স্থানে দুর্গা কিন্তু বাঘের ওপরে আসীনা। উত্তর ও মধ্য ভারতে, এমনকী পশ্চিমবঙ্গে দিনহাটার (কুচবিহার) মুস্তাফিবাড়ির পুজোয় দুর্গা ব্যাঘ্রারূঢ়া।

পরাশক্তির আধার রূপে দেবীপূজার যে প্রচলন, তাতে রক্তমাংসের নারীও দেবীতে পরিণত হন। যেমন ক্লিওপেট্রা। তাঁর মাহাত্ম্য প্রজাদের কাছে এমন ছিল যে, তারা তাঁকে ‘জীবন্ত দেবী’ মনে করত। দেবী আইসিসের অবতার মনে করা হত তাঁকে। আইসিসের পোশাক পরে তিনি সাধারণের কাছে আসতেন। মৃত্যুর পাঁচশো বছর পরেও মিশরের ফিলাই (Philae) দ্বীপের মন্দিরে দেবীরূপে পূজিতা হতেন তিনি।

জ্ঞান ও শিল্পকলার দেবী মিনার্ভা, গ্রিক এথেনার রোমীয় রূপ, পরে দুর্গার মতোই উগ্রতা ও সুরক্ষার প্রতীকে পরিণত হন।

জাপানে দেবী আমাতেরাসু ওমিকামির সঙ্গেও দুর্গার সাযুজ্য আছে। ইনি সৃষ্টিকর্তা ইজানাগির কন্যা। পবিত্র আয়না তাঁর প্রতীক। শিন্টো ধর্মে এই দেবীর উৎস। তবে জুনতেই ক্যানন (Juntei Kannon)-এর মধ্যেই দুর্গার প্রতিফলন ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। মহাযান বৌদ্ধধর্মের ১৮টি মহাগুণ তাঁর মধ্যে সমন্বিত। তাই এই দেবী অষ্টাদশভুজা।

এইভাবে তুলনামূলক মূর্তিতত্ত্বে দেবী দুর্গা বিশ্বে স্থান করে নিয়েছেন। ‘পাচামামা’-রূপে তিনি ইনকাদের দ্বারা পূজিতা হন, যিনি শাকম্ভরীর সগোত্র। অন্যত্র জিপসিদের মধ্যেও দেবী দুর্গার অনুরূপ ‘সারা লা কালী’ বা Black Kali-র পূজা প্রচলিত। একদা জিপসিরা ভারত থেকে অভিবাসী হয়ে পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়ে। দুর্গার অন্য নাম ‘সারা’, চণ্ডীতে আছে। খ্রিস্টধর্ম ও হিন্দুধর্মের মিশ্রণজাত এই দেবী। ফ্রান্সের মেদিলিনি নদীর জল ছিটানো হয় তাঁর গায়ে। নৃতাত্ত্বিক ও জেনেটিক গবেষণায় দেখা গেছে, দেড় হাজার বছর আগে পাঞ্জাব ও রাজস্থান থেকে পরিযায়ী হতে হতে জিপসিরা ইওরোপে পৌঁছয়। তাদের যে ‘সেইনট সারা’, তা হিন্দু-খ্রিস্টান সমন্বয়ে গঠিত।

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 1 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
পবিত্র সরকার

পবিত্র সরকারের বিশেষ রচনা

বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষদের রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে একটু বেশি দুর্বলতা আছে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে যত কিছু, তাঁদের কাছেও তত কিছু তো বটেই, কিন্তু তারও চেয়ে অনেকটা বেশি। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেনাপতি। বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় থেকে, আয়ুব শাহি ফরমানে রেডিয়োতে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষেধ আর রবীন্দ্র-শতবার্ষিকীর ওপর ফতোয়া জারি থেকে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক মহাশক্তিধর যোদ্ধা, তাঁর সম্বন্ধে এঁরা তাই এত স্পর্শকাতর।

Read More »
মীরাতুন নাহার

মীরাতুন নাহারের প্রবন্ধ

হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতা এবং মুসলমান-সাম্প্রদায়িকতা উভয়কেই তিনি যুক্তি ও তথ্যদ্বারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ধ্বংসাত্মক বলে বোঝাতে চেয়েছেন দেশবাসীকে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত দেশবাসীকে তিনি হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যদিও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ‘সাম্প্রদায়িকতার বিষ’ দেশবাসীর মন থেকে নিষ্কাশন করে দেশকে বিপন্মুক্ত করা।

Read More »
গৌতম ঘোষ

গৌতম ঘোষের প্রবন্ধ

চলচ্চিত্রের ধর্ম হল সময়কে ধরে রাখা, সময়ের স্মৃতিমালাকে ধরে রাখা। সেই পদ্ধতি, সেই প্রক্রিয়া কিন্তু চলতেই থাকবে। এখন আমাদের আরও মানবিক হতে হবে। চলচ্চিত্র যারা তৈরি করবেন তারা শুধুমাত্র সস্তার বিনোদন সরিয়ে রেখে একটু মানবিক ছবি করবেন। যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক, মানুষ ও সমাজের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক থাকবে। যা আমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক সব সিনেমায় দেখেছি, সেই ভাবনায় ভাবতে হবে।

Read More »
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ নিবন্ধ

বস্তুত সুকান্ত কবিতার চাইতে বড়। তিনি এক প্রতীকচিহ্ন। সারা ভারতে যখন কবিকে ভাবা হয়েছে জনতার একজন প্রতিনিধি হিসেবে, তখন সুকান্তকেই ভাবা হয়েছে। তামিল বা হিন্দি সিনেমাতেও হয়েছে। যেমন রাজেশ খান্নার ‘অনুরোধ’ নামের ছবিটিতে যে কবিটি রাজেশের বন্ধু ছিলেন তার নাম সুকান্ত। অথবা অতদূরে কেন যাই, বাংলায় উত্তম-তনুজার ‘দেনা পাওনা’ ছবিতে উত্তম যে বন্ধুর চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন, তার নামও তো সুকান্ত। তিনিও তো ফুসফুসের রোগী।

Read More »
কালীকৃষ্ণ গুহ

কালীকৃষ্ণ গুহর কবিতা

একটি রাত্রি কা লী কৃ ষ্ণ  গু হ প্রতিটি রাত্রিকেই নতুন মনে হয়— অচেনা লাগে। আজকের রাত্রিটা যেন চির-অচেনা যেন কিছু ঘটার ছিল যা ঘটেনি

Read More »