১৯৭০-এ মুক্তিপ্রাপ্ত বলিউডের ছবি ‘আন্দাজ’-এর বিখ্যাত গান ‘জিন্দেগি এক সফর হ্যায় সুহানা’, অর্থাৎ জীবন এক আনন্দময় সফর। মোহন রায়হান সম্পর্কে লিখতে গিয়ে এমন শিরোনামটি যে এসে গেল, তার কারণ একাধিক।
প্রথমত, পঞ্চাশ দশকের জাতক (তাঁর জন্মদিন ১ আগস্ট, ১৯৫৬) ও সাতের দশকের চিহ্নিত কবি তিনি। দুই দশকে ঘটে যাওয়া বাংলাদেশের দিকচিহ্নধারী ঘটনার মধ্যবর্তী সময়ে দেশের ভিসুভিয়াসের লাভাক্ষরণ তাঁর অনুভবের গভীরে, তবুও দুঃখে অনুদ্বিগ্ন তিনি, বিপদে দিশা হারান না। তবে কর্তব্য করে যান। নিতান্তই নাদান বয়সেই ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত তিনি শরিক হয়েছিলেন।
দ্বিতীয়ত, ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধেও বালক-বীরের বেশে দেখি মোহনকে। তাঁর জন্ম সিরাজগঞ্জে। সেখানেই আর-এক কবির কাব্য ‘অনলপ্রবাহ’-র যেন মূর্ত প্রতীক তিনি। অথচ তাঁর অন্য হাতে ‘বাঁকা বাঁশের বাঁশরি’!
তৃতীয়ত, অন্যায়কারী আর অন্যায়সহনকারী, এই দু’দলের বিরুদ্ধেই তিনি পরশুরামের বিকল্প হয়ে দেখা দেন। সমসময়ের যাবতীয় বেবন্দোবস্তে বিস্ফোরণ ঘটাতে তৎপর তিনি। নিজেকে ছাড়া কুর্নিশ করেননি, করেন না কাউকে।
চতুর্থত, মোহন এক কবি-আত্মা নিয়ে জন্মেছেন। তিনি আজানুলম্বিত একজন কবি, যিনি কবিতার কোষে কোষে রমণীয় কখনও, কখনও বা লবণাক্ত ক্লোরোফিল নিষিক্ত করেন, আর পাঠক আনন্দে সে-কাব্যসুধা নিরবধি পান করে।
মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। কর্নেল তাহের ও অনুপ চেটিয়াকে নিয়ে একা কুম্ভর মতো বুদির গড় রক্ষা করার তেজ দেখাতে পারেন তিনি। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
মোহনের মূল পরিচয় তো কবিরূপে। সাতের দশক বাংলাদেশ, তথা অ-সীমান্তিক বাংলা ভাষাকে কম কবি উপহার দেয়নি। পশ্চিমবঙ্গে যেমন নকশাল আন্দোলন, বামফ্রন্টের শাসন, জরুরি অবস্থা ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করেছে রাষ্ট্র ও সমাজকে, আর সেসবের পরিপ্রেক্ষিতে উঠে এসেছেন মৃদুল দাশগুপ্ত, মলয় রায়চৌধুরী, শ্যামলকান্তি দাশ, দেবাঞ্জলি মুখোপাধ্যায়, জয় গোস্বামী, সুব্রত সরকার প্রমুখ কবি, তেমনই ত্রিপুরায় নকুল রায়, কৃত্তিবাস চক্রবর্তী, রামেশ্বর ভট্টাচার্য, মীরা সরকার, স্বপন সেনগুপ্ত প্রমুখ, আসামের বরাক উপত্যকায় বিজিৎকুমার ভট্টাচার্য, শ্যামলেন্দু চক্রবর্তী, শক্তিপদ ব্রহ্মচারী, বদরুজ্জামান চৌধুরী, দীপ্তি দেবী, আভা সরকার প্রমুখের নাম করা যায়।
তেমনই বাংলাদেশে সিকদার আমিনুল হক, সাযযাদ কাদির, হাসান হাফিজ, ত্রিদিব দস্তিদার, নাসরিন জাহান, নাসির আহমেদ, আবিদ আজাদ, অঞ্জনা সাহা, অসীম সাহা, জাহানারা আরজু, হেলাল হাফিজ, শিশির দত্ত, ইকবাল আজিজ, ময়ূখ চৌধুরী, তুষার দাশ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ্, বিমল গুহ, মাহবুব হাসান ও আরও অনেকেই কবিরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে। মোহনের প্রথমতম কাব্যগ্রন্থ ‘জ্বলে ওঠে সাহসী মানুষ’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৯-এ। পঞ্চাশ ও ষাট দশকের কবিদের দুর্ধর্ষ মেধাতালিকার পাশে যখন তাঁকে ভাবতে যাই, মনে হয়, কবিতা-খননের আর কী-ই বা বাকি আছে, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, মুহম্মদ নুরুল হুদার বজ্রভেরির পর? আরও যে বাকি আছে কবিতাকায়ায় সলমা-চুমকি পরানোর, তার ঋজুরেখা দেখা দিল মোহন-সুরে, ‘অত্যাচার তোমাকে মানি না, দুরাচার, তুমি দূরে চলে যাও।’ নিথুয়া পাথারে কবির এই চিৎকৃত হাহাকার আমাদের মর্মে বেঁধে। কাব্যের বত্রিশটি কবিতা কোমলগান্ধারের মতো মিশ্র সুরের, দ্রোহে দীপিত ও দয়িতার প্রতি উন্মোচনে আর্দ্র। কলেজপড়ুয়া মোহন লিখছেন, ‘তোমাদের লোভাতুর জিভ টেনে ছিঁড়ে নেবো আমি, — ভূমিতে শিকড়হীন, যে বৃক্ষ বাড়ে নি তার মূলের মাটিতে/ সেই শিল্প তরু আজ আমাদের প্রয়োজন নেই’। কলেজপড়ুয়া এ-কারণেই বলা, ঢাকা কলেজের বাংলা সাহিত্যের ছাত্র ইতিমধ্যেই যে ছন্দ করায়ত্ত করে ফেলেছেন, তার পাথুরে প্রমাণ এ বইয়ের কবিতাকায়ায় সতত লভ্য।
মোহনের কবিতা সমসময়ের ইতিহাসের পাঠ হয়ে দেখা দেয়। তাই এ-যুগের চারণ তিনি। শহীদ মনিরুজ্জামান তারাকে নিয়ে কবিতায় ইতিহাসের দায় বহন করেছেন তিনি, ‘রক্তের প্লাবনে জন্ম দেবো নব ইতিহাস’! সূচনালগ্ন থেকেই তিনি মেধাবী বৈভব নিয়ে উত্তপ্ত অগ্নিশলাকা! ‘আমাদের ঐক্য আমাদের জয়’ (১৯৮০), ‘হলো না বাড়ি ফেরা’ (১৯৮৫) থেকে ‘ফিরে দাও সেই স্টেনগান’ (১৯৮৬) পর্যন্ত পর্বে কবি একের পর এক হার্ডল রেস জয় করছেন তাঁর নিজস্ব দাপট ও কারুবাসনায়।
‘ফিরে চাই ফিরে চাই সেই স্টেনগান/ রেসকোর্সের সরু গালিচায় বিরহকাতর/ প্রেমিকের মত জমা দিয়েছিলাম/ অজানা আশঙ্কায়/ প্রিয়তম সেই হাতিয়ার/ ফিরে চাই ফিরে চাই সেই স্টেনগান’! স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এমন উচ্চারণ কবির প্রতি আমাদের সমীহা আদায় করে।
মোহন রায়হান, প্রসঙ্গত উল্লেখ থাক, জীবন রঙ্গমঞ্চের এক ব্যস্ত সৈনিক। তাঁর ওপর ন্যস্ত জাতীয় কবিতা পরিষদের নেতৃত্বের দায়িত্ব, যা তিনি গোড়া থেকেই পালন করে আসছিলেন একজন নিবেদিত কর্মীরূপে। এক-ই সঙ্গে তিনি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সঙ্গেও গভীর যুক্ত। তাছাড়া ‘বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব’-এর সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্তি রয়েছে।
তিনি একটি জনহিতকর ও ব্যতিক্রমী চিকিৎসাব্যবস্থার মাধ্যমে বিনা ওষুধে হৃদরোগের চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করেছেন— ‘সাওল হার্ট সেন্টার’ (Science and Art of Living)। বিনা অস্ত্রোপচারে হৃদযন্ত্রের চিকিৎসা হয় এখানে। সিলেট ও চট্টগ্রামেও এর শাখা আছে। একজন কবি এই কাজে নিয়োজিত থেকে সামাজিক পরিষেবা দিয়ে যাচ্ছেন, মানবিকতার এমন আদর্শ সতত স্বাগত!
একদা সম্পাদনা করছেন পত্রিকার পর পত্রিকা। সেগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে নাম করতে হয় সূর্যসৈকত, স্ফুলিঙ্গ, সমকণ্ঠ, জনান্তিক, অরণি, সাহস ইত্যাদি। লেখালেখি করেছেন বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সব প্রতিনিধিত্বমূলক পত্রপত্রিকায়। দু-বাংলার বরিষ্ঠ কবিদের কাছ থেকে পেয়েছেন অকুণ্ঠ ভালবাসা ও সমর্থন, প্রশংসা আর প্রশ্রয়। দেখেছেন বঙ্গবন্ধুকে, তেমনই ১৯৮২-তে এরশাদের স্বৈরাচারী জমানা শুরু হলে রাতারাতি মধুর ক্যান্টিন থেকে গড়ে তুলেছেন প্রতিবাদ-মিছিল। কারাগারে গেছেন বহুবার।
আজীবনের দ্রোহ তাঁর রক্তে। পিতা ছিলেন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, একদা যিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্রের ‘আজাদ হিন্দ বাহিনী-তে ছিলেন। মৌলানা ভাসানীর কাগমারি সম্মেলনেও যান। এই পিতা মুসলিম লিগ করতেন বলে পিতার সঙ্গেও আদর্শগত কারণে বিরোধিতা ছিল। এদিকে পিতা বলে কথা! পিতা স্বর্গ! তাই প্রথম কাব্যগ্রন্থটি তিনি তাঁর পিতাকেই উৎসর্গ করে লিখলেন, ‘আমার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী পিতা ফরহাদ হোসেনকে’! পিতা পরে ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানে চলে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। মোহনের এক বড় ভাই-ও ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা।
‘আমি কখনো বানিয়ে কবিতা লিখি না’— এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন তিনি, ‘ভিউজ বাংলাদেশ’-কে। তাঁর নিজ জীবন ঘষে যে আগুন নির্মিত হয়েছিল, সেই আগুনের ডালপালাতেই তাঁর কবিতার বজ্রাগ্নি জ্বলে উঠেছে, নিরন্তর উঠছে। অনির্বাণ সে অরণি!
আমরা কবির কবিতার দিকে তাকাই আবার। তাঁর কবিতা যুগপৎ দ্রোহ আর প্রেমের দ্বৈতরাগে নির্মিত। এ যেন ‘এক হাতে ওর কৃপাণ আছে, আরেক হাতে হার’! যে-কবির হাত দিয়ে বেরোয় ‘তোমার হত্যার প্রতিশোধ আজও নিতে পারিনি চে— প্রতিদিন প্রতিশোধস্পৃহা জ্বলে ওঠে হৃদয়ে,/ প্রতিশোধ একদিন হবেই,/ কেউ না কেউ আসবেই’ (কবিতায় এই ‘কেউ’-এর সারিতে লেনিন, কাস্ত্রো, গোর্কি প্রমুখের আবাহন ছিল), সেই এক-ই কবি আনত হন নারীর সৌন্দর্য আর নন্দিত বিভায়, ‘তুমিই আমার ঈপ্সিত গন্তব্য/ কিন্তু আমার চলার পথে পথে/ পাহাড়সমান হিংস্র বাধা/ কতিপয় জল্লাদের/ অশরীরী মোহাম্মদী বেগের প্রেতাত্মা’! কবির লাজুক লিরিক চকমকি পাথরের মতো ছোঁয় নারীর নান্দনিক সুন্দরতা, ‘বাকরুদ্ধ কণ্ঠে টলমল কচুপাতা চোখ’। অন্য এক গান্ধর্ব কবিতায় নারী কী অধরা মাধুরী হয়ে দেখা দিচ্ছে দেখি একটু, ‘অম্লযান ও উদ্ যানের মতো একদা মিশেছিলাম আমরা/ অখণ্ড একপাত্র জলের মতন/ ক্ষুরের কাছ থেকে তার ধারকে পৃথক করা/ যেমন অসাধ্য মানুষের,/ ঠিক তেমনিই/ অসম্ভব ছিল একদা আমার কাছ থেকে তোমাকে বিচ্ছিন্ন করা’ (পারমাণবিক স্মৃতি)। কবি কালিদাসেও তো অনুরূপ সম্পর্কের কথা আছে, ‘কুমারসম্ভব’ কাব্যে। সেখানে পার্বতী ও পরমেশ্বর, অর্থাৎ দুর্গা ও শিবকে বর্ণনা করা হয়েছে ‘বাগর্থাবিবসম্পৃক্তৌ’, কি না বাক্য আর তার অর্থ যেমন অভেদ্য, তেমনই তারা দু’জন। একেই আবার ‘অর্ধনারীশ্বর’— এক দেহে পুরুষ ও নারী বলা হয়েছে। সিরাজগঞ্জে আর উজ্জয়িনীতে তা হলে সাযুজ্য আছে! কালিদাসের কাল অবিশ্যি সিরাজগঞ্জ-পাবনা বা ‘ভূতের দিয়ার’ নামের-ও ঢের, ঢের পূর্ববর্তী।
কিন্তু মোহন কালিদাসের যুগে জন্মাননি, জন্মেছেন এমন এক সময়ে ও দেশে, তাঁর পূর্বসূরি এক কবি, সুকান্ত যাঁর থেকে খুব বেশি দূরবর্তী নন, আর তাঁর উচ্চারিত ‘এদেশে জন্মে পদাঘাত-ই শুধু পেলাম’ ছিল মোহনের-ও বিধিলিপি! তিনি যুদ্ধ ও স্বাধীনতা, আর সেইসাথে প্রহরান্তের পাশফেরা দেখেছেন, দেখেছেন তাঁর দেশ অদ্ভুত উটের পিঠে সওয়ার, দেখেছেন দুঃশাসন ও তার দূর হটা। সত্তরের দশকের অন্য কবিদের মতোই তিনি রাষ্ট্র ও সমাজের নানান অপকর্ম ও বেবন্দোবস্ত দেখেছেন, আর সেসবে প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত না করে ছাড়েননি। তবে অন্তিমে তিনি আশাবাদী, মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ মনে করেন। প্রগতিশীল ও রাজনৈতিক চেতনার এই কবি যেমন বিষমুক্ত নিরাপদ খাদ্য আন্দোলন গড়ে তোলেন (এ-প্রসঙ্গে আমাদের মনে পড়ে, অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চনের ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের কথা), তেমনই তাঁর কারুবাসনা মানুষের শুশ্রূষা হয়ে দেখা দেয় এহেন উচ্চারণে, ‘আমি— রক্তে বারুদে নয়, মানবতায় রঞ্জিত,/ লাল সবুজ বাংলাদেশ/ অন্ধকার চিরকাল থাকে না।/ মানুষ জাগে-/ আর আলো আসেই’। এই আশাবাদ ও জীবনের প্রতি ইতিবাচকতা, সব ক্ষয়ক্ষতিশেষে মানুষ ও জীবনের জয়গান গাওয়াই মোহন-পদাবলির গূঢ়ৈষা।
মোহন জন্মেছেন বাংলাদেশের পরিপূর্ণ এক ঐতিহ্যিক অঞ্চলে, যেখানে যমুনা নদী বয়ে চলেছে হাজার হাজার বছর ধরে। তা ছাড়াও আছে করতোয়া, আত্রাই, হুরাসাগর, ফুলজোর, বড়াল ও ইছামতী। নদীবিধৌত জনপদ, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লোকশিল্প, গাথা, রূপকথা-পরণকথা, বাউল-জারি-সারি-মুর্শিদা-মারফতি-ভাণ্ডারি-পালাগান। নকশিকাঁথা, বাঁশ, বেত, তাঁতশিল্পের চিরায়ত ঐতিহ্য সেখানের হৃদকোষে। যে অঞ্চলের মেধাতালিকায় কান্তকবি রজনীকান্ত সেন, কবি ইসমাইল হোসেন সিরাজী, রাজনীতিবিদ মৌলানা ভাসানী, গণিতবিদ যাদবচন্দ্র চক্রবর্তী, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক আব্দুল্লাহ আল মুতী, মোহাম্মদ নজিবর রহমান (যিনি ১৯১৪-তে ‘আনোয়ারা’ উপন্যাসের মাধ্যমে তুমুল জনপ্রিয়তা পান। আজকের প্রজন্মের জানা উচিত, ১৯৬০ সাল পর্যন্ত উপন্যাসটির ৬০টি সংস্করণ বেরোয়), আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ প্রমুখ জন্মেছেন সিরাজগঞ্জে।
তাঁতের মতোই কবিতার একচ্ছত্র ও শোভন বুননে আধারিত মোহনের কবিতাকায়া। ইসমাইল হোসেন সিরাজীর মহাকাব্য ‘অনলপ্রবাহ’। এই শিরোনাম যেন মোহনের সর্বাঙ্গে। প্রতিবাদী চেতনার ঋত্বিক এই কবি কী দার্ঢ্য আর সাহসে আর অস্মিতায় আর সংক্ষোভে আর বিবমিষায় এহেন লাভা উদ্গীরণ করেন, ‘আমি সেই মানুষ, যাকে মানুষ চেনে রাগী, জেদী, ক্ষ্যাপা বলে। মারদাঙ্গার গুজবে আমাকে ঘিরে ধরে কুয়াশা। আমি চোখে চোখ রেখে কথা বলেছি— কারো ভয়ে চোখ নামাইনি কোনোদিন। ক্ষমতার কলার চেপে ধরেছি, লাঠি মেরেছি অন্যায়ের মাথায়, এমপি-মন্ত্রী-মাস্তান-সন্ত্রাসের মুখে নির্ভয়ে ছুড়ে দিয়েছি প্রতিবাদের মুষ্টি— আমার যুদ্ধ ধনতন্ত্রের লৌহদরজার সঙ্গে, পুঁজিবাদের শকুন— নখর রাষ্ট্রের সঙ্গে— মোসাহেবির কুকুরছানা নই আমি। —গণশত্রুর দিকে আমার কবিতা শাণিত তরবারির মতো ঝলসে ওঠে।’ এ তো নিছক কবিতা নয়, যেন নিজের সার্থক অনুবাদক হয়ে পাঠকের মর্মে মর্মে তিনি গেঁথে দিয়ে যান তার লাঞ্ছনচিহ্ন, মনুষ্যত্বের শ্বেতপতাকা!
সাতের দশকে কবিরা যে উত্তরাধিকার নিয়ে কাব্যজগতে আসেন, তা পাঁচের দশকের হাসান হাফিজুর রহমানের ‘বিমুখ প্রান্তর’ বা ‘আর্ত শব্দাবলী’-র খুব দূরবর্তী নয়। আজীজুল হকের ‘এখন সে জীবনের নাম/ স্বপ্ন আর রক্ত আর ঘাম’-এর প্রায় সন্নিকটবর্তী। অন্যদিকে, ছয়ের দশকের চিহ্নিত কবি রফিক আজাদের মাধবী, সাতের দশকে নাসির আহমেদের আশালতা, বা রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর সকাল, তেমনই মোহনের-ও রয়েছে, অনির্দিষ্ট নামে। প্রেমিকাকে নিয়ে তার-ও রয়েছে এমত মোহন পদাবলি, ‘আরেকটু পথ বসলে পাশে/ কী-ই বা এমন ক্ষতি হত/ বরং তুমি সারাজীবন রক্তঝরা/ ক্ষত না হয়ে কাব্যকুসুম/ ফুটে থাকতে এ হৃদয়ে।/ তোমার কাছে হয়তো সেটা/ চলার পথে ক্ষণিক দেখা/ আমার জন্যে দীর্ঘশ্বাসের গোটা জীবন’ (‘নীলবসনা নিহঙ্গিনী’)।
মোহন কেবল কবি তো নন, তিনি ঠিক যেন সিরাজগঞ্জের দু’শো বছরের রতনকান্দির হাট! তাই বহুতল পসরা তাঁর কবিতায়, এমনকি তাঁর প্রেমের কবিতাতেও বহুমাত্রিকতা লভ্য। তাই দেখি, মোহনের নিজস্ব দ্রাবিড়ার প্রতি শোলোক, ‘—অভিমান দুলে দুলে ওঠে/ দুঃসময় ছায়াহরিণীর কালো চোখ/ বারে বারে জেগে ওঠে বুকে/ —ফিরে এসে এই তোমাকেই ফিরে/ পাবো কি আমূল?’ (ছায়াহরিণী)।
প্রেম ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে পৌঁছয়, প্রসারিত হয় নিজবাসভূম ছেড়ে দূর ভূমায়, মাত্রই কতিপয়ের কবিতায়। মোহিত সেই কতিপয়ের সম্ভ্রান্ত একজন। পাঠ করা যাক ‘কালো মেয়ে লাল ভালোবাসা’,— ‘দশ সহস্র দিন তো প্রায় তিলতিল যন্ত্রণায় কালো মেয়ে/ হয়ে গেছে নীল।— / উইনি গো, সাতাশ বছর শুধু বসন্ত আসে নি তোমার বাগানে/ আসেনি কোকিলকালো ভ্রমর—/ তোমারই কালো ঠোঁট/ অপেক্ষার প্রহর গুনেছে নতুন ভোরের নববসন্তের’! নেলসন ম্যান্ডেলার দীর্ঘ সাতাশ বছরের কারাবাসে উইনির প্রতি মমত্বজাত এ কবিতাটি লেখার জন্য মোহন রায়হানকে স্বতন্ত্র একটি কুর্নিশ! প্রসঙ্গত, অন্য একটি অনুষঙ্গে অনুরূপভাবে লেনিন— স্ক্রুপস্কায়াকে তার ‘হুলিয়া’-তে এনেছিলেন কবি নির্মলেন্দু গুণ।
দেশ-বিদেশে গেছেন তিনি,— ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, চীন, ইরান, ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা। তাঁর পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে তাঁকে নিয়ে স্মারক গ্রন্থ বেরিয়েছিল। আসন্ন সত্তর বছর পূর্ণ করার মুহূর্তেও অগ্নিপথের এই কবির প্রতি সম্মানে বেরোবে।
শেষ পর্যন্ত, আখেরে তিনি তাঁদের-ই কবি, দুঃখে যাদের জীবন গড়া। আরও অন্তিমে, বাংলাভাষার। তাই তাঁর এহেন উচ্চারণ, ‘তোর লাগি মা জীবন বাজি/ তোর লাগি মা যুদ্ধে রাজি/ আমি তোর ভাষাপুত্র, পুত্রভাষা,/ বাংলাভাষার দ্রোহী কবি’। ডানা মেলা ময়ূরপেখম যেন তাঁর কাব্যকায়া, যখন তা নিঃশেষে ব্যয়িত হয় পরিত্রাণের শপথবাক্যরূপে, ‘আমি— রক্তেবারুদে নয়,/ মানবতায় রঞ্জিত/ লালসবুজ বাংলাদেশ।/ অন্ধকার চিরকাল থাকে না।/ মানুষ জাগে/ আর আলো আসেই’। ‘সাপ্তাহিক দিকচিহ্ন’ ও ‘সাওল সময়’-সম্পাদক, মাহমুদা খাতুন-ও ফরহাদ হোসেনের আত্মজ তিনি যেন তাই সারস্বতচর্চায় আর সিদ্ধিতে সিরাজগঞ্জের অন্য এক এভারেস্টবিজয়ী মুসা ইব্রাহিম! শতায়ু হোন তিনি।
চিত্র সৌজন্যে: মোহাম্মদ সাদউদ্দিন







