Search
Generic filters
Search
Generic filters

বেলুচিস্তান সংকট মোকাবিলা কতটা সহজ

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এমন কিছু অঞ্চল আছে, যেগুলো খুব কমই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে আসে, কিন্তু ভূরাজনীতির মানচিত্রে তাদের গুরুত্ব অপরিসীম। পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেলুচিস্তান তেমনই একটি অঞ্চল। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ, কিন্তু উন্নয়নে পিছিয়ে থাকা এই প্রদেশে বহু দশক ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদ, সামরিক অভিযান, রাজনৈতিক অসন্তোষ ও সহিংসতা চলমান। সাম্প্রতিক সময়ে আবারও বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার দাবিকে ঘিরে আলোচনা বেড়েছে।
বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার দাবি, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির এক জটিল বাস্তবতা। প্রাকৃতিক গ্যাস, স্বর্ণ, তামা, কয়লা এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গওয়াদর সমুদ্রবন্দর— সবই রয়েছে বেলুচিস্তানে। অথচ পাকিস্তানের এই বৃহত্তম প্রদেশটি দীর্ঘদিন ধরেই দারিদ্র্য, উন্নয়ন বৈষম্য, নিরাপত্তা সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে লড়াই করছে। এই বৈপরীত্যই বেলুচিস্তানকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করেছে।

বেলুচিস্তানের অর্থনৈতিক বাস্তবতা

আয়তনের দিক থেকে পাকিস্তানের প্রায় ৪৪ শতাংশ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত বেলুচিস্তান, কিন্তু জনসংখ্যা তুলনামূলক কম। এখানেই রয়েছে সুই গ্যাসক্ষেত্র, রেকো ডিকের বিশাল তামা ও স্বর্ণখনি এবং আরব সাগরের উপকূলে অবস্থিত গওয়াদর বন্দর। তবে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP)-র বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, মানব উন্নয়ন সূচকে (HDI) বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা প্রদেশগুলোর একটি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপদ পানীয়জল, বিদ্যুৎ এবং কর্মসংস্থানে এখানকার মানুষ এখনও উল্লেখযোগ্য বৈষম্যের মুখোমুখি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও পাকিস্তানি গবেষণায় দেখা গেছে, বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হারও বেলুচিস্তানে দেশের অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় বেশি।
বেলুচ জাতীয়তাবাদী নেতাদের অভিযোগ, প্রদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে বিপুল রাজস্ব অর্জিত হলেও তার ন্যায্য অংশ স্থানীয় জনগণের উন্নয়নে ব্যয় হয় না। অন্যদিকে, পাকিস্তান সরকার দাবি করে, তারা সড়ক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ এবং CPEC-এর মাধ্যমে বেলুচিস্তানে ব্যাপক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে এবং উন্নয়নের সুফল ধীরে ধীরে মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে— বেলুচ জনগণ আসলে কী চায়? বেলুচিস্তান স্বাধীন হলে কী হতে পারে? পাকিস্তান, ভারত, চীন এবং পুরো অঞ্চলের জন্য এর প্রভাব কী হবে?
সহজ উত্তর নেই। কারণ এই সংকটের প্রতিটি দিকেরই একাধিক ব্যাখ্যা আছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক, বেলুচরা কী চান? সব বেলুচ একই মতের নন। এটি শুরুতেই পরিষ্কার করা জরুরি। একটি অংশ পাকিস্তানের মধ্যেই অধিক স্বায়ত্তশাসন, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর স্থানীয় অধিকার, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করতে চায়। অন্য অংশ সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র ‘বেলুচিস্তান’ প্রতিষ্ঠার দাবি জানায়। তাদের অভিযোগ, প্রাকৃতিক গ্যাস, সোনা, তামা ও অন্যান্য সম্পদ থেকে যে বিপুল আয় হয়, তার সুবিধা স্থানীয় জনগণ পায় না। পাশাপাশি তারা দীর্ঘদিন ধরে জোরপূর্বক গুম, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান এবং রাজনৈতিক দমনের অভিযোগ তোলে। অন্যদিকে, পাকিস্তান সরকার বলছে, বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য নিরাপত্তা অভিযান প্রয়োজন। অর্থাৎ, এখানে একদিকে রাজনৈতিক দাবি, অন্যদিকে নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, কেন বেলুচিস্তান এত গুরুত্বপূর্ণ? বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ। আয়তনের প্রায় ৪৪ শতাংশ হলেও জনসংখ্যা তুলনামূলক কম। এই অঞ্চলে রয়েছে— বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত, রেকো ডিক অঞ্চলের তামা ও স্বর্ণখনি, গওয়াদর সমুদ্রবন্দর, আরব সাগরের উপকূল এবং মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়াকে যুক্ত করার সম্ভাব্য করিডর। এই কারণেই বেলুচিস্তান শুধু পাকিস্তানের জন্য নয়, চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র-সহ বহু দেশের কৌশলগত আগ্রহের কেন্দ্র।
যেহেতু স্বাধীনতার আন্দোলন হচ্ছে তবে স্বাধীন হলে সম্ভাব্য লাভ কী? স্বাধীনতার সমর্থকদের মতে— প্রথমত, স্থানীয় জনগণ নিজেদের সম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পাবে। দ্বিতীয়ত, প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে অর্জিত অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানে ব্যয় করা সম্ভব হবে। তৃতীয়ত, নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয় আরও শক্তিশালী হবে। চতুর্থত, জনগণ মনে করে তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাইরের নয়, নিজেদের হাতেই থাকবে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে অর্জন করা সহজ হবে— এমন নিশ্চয়তা নেই।
স্বাধীন হলে লাভ তো আছে, তবে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জও কম নয়, স্বাধীনতা মানেই স্থিতিশীলতা নয়। একটি নতুন রাষ্ট্র গঠনের জন্য দরকার— শক্তিশালী প্রশাসন, কার্যকর বিচারব্যবস্থা, সেনাবাহিনী, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, বৈদেশিক সম্পর্ক। এসব গড়ে তুলতে দীর্ঘ সময় ও বিপুল অর্থের প্রয়োজন। এ ছাড়া স্বাধীনতার প্রক্রিয়া যদি সংঘাতের মাধ্যমে হয়, তা হলে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগ কমে যেতে পারে, উন্নয়ন প্রকল্প থেমে যেতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

পাকিস্তানের জন্য প্রভাব

বেলুচিস্তান স্বাধীন হলে পাকিস্তানের জন্য এটি হবে সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক ধাক্কাগুলোর একটি। কারণ— দেশের বৃহত্তম প্রদেশ হারানোর ঝুঁকি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ হারানো,
গওয়াদর বন্দরের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হওয়া, বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা অন্য এলাকায়ও উৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কা, জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে বড় চাপ। এই কারণেই পাকিস্তান সরকার বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার দাবি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে। চীনের লাভ-ক্ষতিও কিন্তু এখানে জড়িত, চীনের জন্য বেলুচিস্তান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখানেই রয়েছে গওয়াদর বন্দর, যা চীনের বৃহৎ অবকাঠামো উদ্যোগ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর অংশ এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (CPEC)-এর কেন্দ্র।
যদি বেলুচিস্তান স্বাধীন হয় এবং নতুন সরকার চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখে, তা হলে চীনের খুব বেশি ক্ষতি নাও হতে পারে। কিন্তু যদি রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয় বা নতুন সরকার চীনা প্রকল্প পুনর্বিবেচনা করে, তা হলে চীনের শত শত কোটি ডলারের বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ভারতের লাভ-ক্ষতিও এখানে বিরাট ভূমিকা রাখে। এটা জেনে রাখা জরুরি, ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে স্বীকৃতি দেয় এবং প্রকাশ্যে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে না। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যদি পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ সংকটে পড়ে, তা হলে ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থানে কিছু সুবিধা আসতে পারে। অন্যদিকে ঝুঁকিও রয়েছে। যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তা হলে পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বাড়বে, সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সহযোগিতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অর্থাৎ ভারতের জন্য বিষয়টি শুধু লাভের নয়; সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকিও রয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থান

বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ বেলুচিস্তানকে পাকিস্তানের অংশ হিসেবেই স্বীকৃতি দেয়। কোনও নতুন রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া অত্যন্ত কঠিন প্রক্রিয়া। শুধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেই একটি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। জাতিসংঘের সদস্যপদ, কূটনৈতিক স্বীকৃতি, অর্থনৈতিক সম্পর্ক— সবই দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে।

মানবাধিকার বনাম নিরাপত্তা

বেলুচিস্তান ইস্যুতে সবচেয়ে বড় বিতর্ক এখানেই। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বহু বছর ধরে জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, পাকিস্তান বলছে, তারা সশস্ত্র বিদ্রোহ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করছে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের দায়িত্ব। দুই পক্ষের বক্তব্য একেবারে ভিন্ন হওয়ায় বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়নে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের গুরুত্ব রয়েছে। তা হলে বেলুচবাসীর ভবিষ্যৎ কী? বেলুচিস্তানের ভবিষ্যৎ শুধু স্বাধীনতা বা স্বাধীনতা না পাওয়ার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। মূল প্রশ্ন হল— সেখানে কি রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়বে? স্থানীয় জনগণ কি সম্পদের ন্যায্য অংশ পাবে? মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি হবে? নাকি সহিংসতার চক্র আরও দীর্ঘ হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী কয়েক দশকে বেলুচিস্তানের ভবিষ্যৎ।
সর্বোপরি বেলুচিস্তানের সংকটকে কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদ কিংবা কেবল নিরাপত্তা সমস্যার দৃষ্টিতে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি বোঝা যায় না। এখানে ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, প্রাকৃতিক সম্পদ, উন্নয়ন বৈষম্য, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা— সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্বাধীন বেলুচিস্তান গঠিত হলে বহু মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে পারে। একই সঙ্গে একটি নতুন রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াবে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা। অন্যদিকে, পাকিস্তান, চীন, ভারত এবং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
তাই বেলুচিস্তান প্রশ্নে একপক্ষের বিজয় বা অন্যপক্ষের পরাজয়ের সরল ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। এটি এমন একটি ইস্যু, যেখানে সম্ভাব্য লাভ ও ক্ষতি— দুটিই গভীর এবং বহুস্তরীয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, যে কোনও সমাধানে বেলুচিস্তানের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার এবং মর্যাদাকে কেন্দ্রস্থলে রাখা। বেলুচবাসী স্বাধীন হলে পাকিস্তান হারাবে তার বিরাট ভূখণ্ড, চীনের সিপ্যাক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে বেলুচিস্তানের অংশগ্রহণের ফলশ্রুতিতে দলে দলে বেলুচরা আফগানিস্তানে আশ্রয় গ্রহণ করলে, সেখানে দেখা দিতে পারে চরম খাদ্যসংকট, যা সামাল দিতে অপারগ আফগানিস্তান।
সুতরাং বেলুচবাসীর সংকট মোকাবিলা এত সহজ হবে না বিশ্ব রাজনৈতিক মাঠে। কৌশলগত সুবিধার জন্য শুধু চীন বা ভারত নয়, ওত পেতে আছে গোটা দক্ষিণ এশিয়া। অন্যদিকে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যা করার পাকিস্তানকে খুব সাধারণ চোখে দেখার কোনও সুযোগ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × four =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »