Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

আশা ভোসলে ও তাঁর বাংলা গান

সঙ্গীতজগৎ তার এক জ্যোতিষ্ককে হারাল— আশা ভোসলে (৮ সেপ্টেম্বর ১৯৩৩—১২ এপ্রিল ২০২৬) প্রয়াত হলেন। সুদীর্ঘ আট দশক ধরে তিনি তাঁর সঙ্গীতের সুধায় ভরিয়ে দিয়েছেন কেবল ভারত বা এই উপমহাদেশকেই নয়, বিশ্বকে। পরিণত বয়সেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর, যেমন কয়েক বছর আগে হয়েছিল তাঁর স্বনামখ্যাত অগ্রজা লতা মঙ্গেশকরের (২৮ সেপ্টেম্বর ১৯২৯—৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২)।

আশা ভোসলে তাঁর সমগ্র জীবনে বারো হাজার গান গেয়ে গিনেস বুকে স্থান পেয়েছেন। একদিকে ধ্রুপদী সঙ্গীত, অন্যদিকে লঘু, পপ, এমনকী চটুল গানেও তাঁর সমকক্ষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। সমসাময়িক কিংবদন্তি শিল্পীদের মধ্যে এজন্য অনায়াসে স্থান করে নিয়েছিলেন তিনি।

আশাজি ছিলেন মহারাষ্ট্রের ভূমিকন্যা। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর মাতৃভাষা মারাঠি। প্রচুর গান করেছেন তিনি মারাঠি ভাষায়। যেমন তা ব্যাপ্ত ছিল মারাঠি চলচ্চিত্রে, তেমনই মহারাষ্ট্রের সন্তকবি তুকারামের অভঙ্গ পদও পরমনিষ্ঠায় তুলে নিয়েছিলেন তাঁর কণ্ঠে। প্রসঙ্গত, তুকারামের অভঙ্গের কিছু কিছু বাংলা অনুবাদ করেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।

আশা— আশ্চর্যের কথা, হিন্দি, বাংলা, ওড়িয়া, তেলুগু, আরবি, ফারসি, ইংরেজি, রুশ, ফরাসি প্রভৃতি কুড়িটি ভাষায় গান করেছেন। তাঁর অগ্রজা লতা মঙ্গেশকরের মতো তাঁরও ছিল বাংলা ভাষার প্রতি আকর্ষণ। তদুপরি তিনি রাহুল দেববর্মনের স্ত্রী হওয়ার সূত্রেও বাংলা ভাষা তথা বাংলা গানের প্রতি আগ্রহী হয়ে থাকবেন।

আশার বাংলা গানের কয়েকটি বিভাগ নির্ণয় সম্ভব। এক— প্রতিবছর শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে যে গানের রেকর্ড বেরোত, সেগুলো। বহু বিখ্যাত গান পাই এ-পর্যায়ে। যেমন, ‘ফুলে গন্ধ নেই, ভাবতেও পারি না’, ‘চেনা চেনা মুখখানি তোমার’, ‘যাব কি যাব না ভেবে ভেবে একা যাওয়া তো হল না’, ‘আকাশে সূর্য’ ইত্যাদি। দুই— বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য গাওয়া তাঁর গান। এ-পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গান হল— ‘আর কত রাত একা থাকব’, ‘মন বলছে কেউ আসবে’, ‘চোখে চোখে কথা বল’, ‘কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে’, ‘সন্ধ্যাবেলা তুমি আমি’ ইত্যাদি।

Advertisement

আশা বাংলা যে সিনেমায় প্লেব্যাকগুলি করেছেন, তাঁর সঙ্গীত পরিচালকেরা ছিলেন বিখ্যাত ও স্বনামধন্য। যেমন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে তিনি করেছিলেন ‘মহুয়ায় জমেছে আজ মৌ গো’। তেমনই তাঁর পরিবেশিত ‘কে গো তুমি ডাকিলে আমারে’ গানটির সুরকার নচিকেতা ঘোষ। তাঁর গাওয়া ‘গা ছমছম’ গানটিতে সুর দিয়েছিলেন সুধীন দাশগুপ্ত। আর রাহুল দেববর্মনের সুরে তিনি করেন ‘কথা দিয়ে এলে না’।

একটি কৌতূহলী ও ব্যতিক্রমী তথ্য পরিবেশন করা যাক এবার। বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তমকুমার কেবল যে গান জানতেন তা-ই নয়, ‘কাল, তুমি আলেয়া’ এবং ‘সব্যসাচী’— এই দুটি ছবির সঙ্গীত পরিচালকও ছিলেন তিনি। আর তাঁর সঙ্গীত-পরিচালনায় আশা এ-ছবিতে গান করেছিলেন। গানগুলো হল— ‘পাতা বেঁধে চুলগুলো কে’ এবং ‘মনের মানুষ ফিরল ঘরে’। গানগুলোর গীতিকার ছিলেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রসঙ্গত, এ-ছবিতে উত্তম তাঁর সুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে দিয়েও একটি গান গাইয়েছিলেন।

বাংলাদেশেও আশা অ্যালবামে অংশ নেন। ‘সংগীতা’-র কর্ণধার সেলিম খানের ‘দুটি মনে এক প্রাণ’ বেরোয় ২০০৪-এ। সেখানে আশা ভোসলে এবং বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী বেবি নাজনীনের ডুয়েট আছে। রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন প্রমুখ আশার স্নেহধন্য।

তিন— আশার রবীন্দ্রসঙ্গীত। ১৯৮৯-এ এইচএমভি থেকে আশার একটি রবীন্দ্রসঙ্গীতের অ্যালবাম বেরোয়। মূলত এর পরিচালনায় ছিলেন সন্তোষ সেনগুপ্ত। তবে সংঘমিত্রা গুপ্তই তাঁকে গানগুলো আশার কণ্ঠে নিয়ে আসতে সাহায্য করেছিলেন। তাছাড়া এইচএমভি পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় ও ভি বালসারাকেও নিযুক্ত করেন, যাতে আশার কণ্ঠে সাবলীল বাংলা উচ্চারিত হয়। আশার অ্যালবামটি অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল। গানগুলোর মধ্যে আছে— ‘বড় আশা করে’, ‘স্বপ্নে আমার মনে হল’, ‘তুমি কোন কাননের ফুল’, ‘এসো শ্যামল সুন্দর’ ইত্যাদি, মোট চোদ্দটি। লতা ও আশা দুজনেই এভাবে রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তবে লতার সঙ্গে হেমন্ত একাধিক রবীন্দ্রসঙ্গীত করলেও আশার সঙ্গে করেননি। সম্ভবত মান্না দে-র সঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ডুয়েট আছে আশার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × five =

Recent Posts

গৌতম চক্রবর্তী

দুই হুজুরের গপ্পো

১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই, আলবার্ট আইনস্টাইন বার্লিনের উপকণ্ঠে নিজের বাড়িতে স্বাগত জানান ভারতীয় কবি, দার্শনিক ও সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। তিনি ছিলেন প্রথম অ-ইউরোপীয় নোবেল বিজয়ী। তাঁদের এই সাক্ষাৎকারটি ইতিহাসের অন্যতম বুদ্ধিদীপ্ত ও মননশীল আলাপচারিতায় পরিণত হয়, যেখানে তাঁরা বিজ্ঞান ও ধর্মের চিরন্তন দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করেন। “সায়েন্স অ্যান্ড দ্য ইন্ডিয়ান ট্রাডিশন: হোয়েন আইনস্টাইন মেট টেগোর” গ্রন্থে এই ঐতিহাসিক সাক্ষাতের বিবরণ পাওয়া যায়। এই বইতে বিশ শতকের শুরুতে ভারতের বৌদ্ধিক পুনর্জাগরণ এবং ভারতীয় ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক চিন্তার মেলবন্ধন তুলে ধরা হয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আশা ভোসলে ও তাঁর বাংলা গান

সুদীর্ঘ আট দশক ধরে তিনি তাঁর সঙ্গীতের সুধায় ভরিয়ে দিয়েছেন কেবল ভারত বা এই উপমহাদেশকেই নয়, বিশ্বকে। পরিণত বয়সেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর, যেমন কয়েক বছর আগে হয়েছিল তাঁর স্বনামখ্যাত অগ্রজা লতা মঙ্গেশকরের। আশা ভোসলে তাঁর সমগ্র জীবনে বারো হাজার গান গেয়ে গিনেস বুকে স্থান পেয়েছেন। একদিকে ধ্রুপদী সঙ্গীত, অন্যদিকে লঘু, পপ, এমনকী চটুল গানেও তাঁর সমকক্ষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। সমসাময়িক কিংবদন্তি শিল্পীদের মধ্যে এজন্য অনায়াসে স্থান করে নিয়েছিলেন তিনি।

Read More »
গৌতম চক্রবর্তী

স্প্যানিশ ছোটগল্প: পুতুল রানি

সত্যিকারের আমিলামিয়া আবার আমার স্মৃতিতে ফিরে এসেছে, আর আমি আবার— সম্পূর্ণ সুখী না হলেও সুস্থ বোধ করছি: পার্ক, জীবন্ত সেই শিশুটি, আমার কৈশোরের পঠনকাল— সব মিলিয়ে এক অসুস্থ উপাসনার প্রেতচ্ছায়ার ওপর জয়লাভ করেছে। জীবনের ছবিটাই বেশি শক্তিশালী। আমি নিজেকে বলি, আমি চিরকাল আমার সত্যিকারের আমিলামিয়ার সঙ্গেই বাঁচব, যে মৃত্যুর বিকৃত অনুকরণের ওপর জয়ী হয়েছে। একদিন সাহস করে আবার সেই খাতাটার দিকে তাকাই— গ্রাফ কাগজের খাতা, যেখানে আমি সেই ভুয়ো মূল্যায়নের তথ্য লিখে রেখেছিলাম। আর তার পাতার ভেতর থেকে আবার পড়ে যায় আমিলামিয়ার কার্ডটি— তার ভয়ানক শিশুসুলভ আঁকাবাঁকা লেখা আর পার্ক থেকে তার বাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার মানচিত্র। আমি সেটা তুলে নিয়ে হাসি।

Read More »
যদুনাথ মুখোপাধ্যায়

বিজ্ঞানমনস্কতা কারে কয়?

শ্রদ্ধেয় বসুর বইতে হোমিওপ্যাথি সম্পর্কিত অধ্যায়টি তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্কদের, বিশেষ করে মুদ্রা-মূর্ছনায় মজে থাকা, বা রাজনীতিজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃতির দাবেদার-ঘনিষ্ঠ চিকিৎসকদের বিরক্তিকর বা অপ্রীতিকরই মনে হবার কথা। কেননা, উল্লিখিত দুটি বিষয় নিয়ে তাদের মনের গহীন কোণে প্রোথিত বিজ্ঞানবাদিতার শেকড় ওপড়ানোর সম্ভাবনা নেই বলেই মনে হয়। প্রশ্ন হল, তাঁর উপরিউক্ত বইটির কারণে তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্ক বন্ধুদের চোখে ব্রাত্য বলে চিহ্নিত হবেন না তো? হলে আমি অন্তত আশ্চর্যচকিত হব না। দাগিয়ে দেবার পুরনো অভ্যাস বা পেটেন্ট এই মহলের বাসিন্দাদের প্রধান অস্ত্র, তা ভুক্তভোগীরা হাড়ে হাড়ে জানেন।

Read More »
প্রসেনজিৎ চৌধুরী

অগ্নিবীর: বন্দুকের মুখে ঈশ্বর

১৯৫০ দশকে নেপালের রাজতন্ত্র ও রাজার মন্ত্রিগোষ্ঠী রানাশাহী শাসনের বিরুদ্ধে সফল সশস্ত্র বিদ্রোহ হয়েছিল। সেই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন অনেক ভারতীয়। তাঁদের মধ্যে অনেকে বাঙালি। নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সেই প্রথম সংঘর্ষ সে-দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত। ভারত ও চীনের মধ্যে একফালি দেশ নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম সশস্ত্র ও নিরস্ত্র দুই পথ ধরে চলেছিল। ডান-বাম-অতিবাম— ত্রিমুখী রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতের চূড়ান্ত সফলতা আসে ২০০৮ সালে রাজার শাসনের অবসানে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারী: এক দৈবী আখর

আমরা ৮-ই মার্চের আন্তর্জাতিক নারীদিবসে আবহমান নারীবিশ্বকে সামান্য একটু ছুঁয়ে যেতে চাইলাম মাত্র। হাজার হাজার বছর ধরেই তাঁদের ওপর কড়া অনুশাসন, জবরদস্ত পরওয়ানা আর পুরুষতন্ত্রের দাপট। সে-সবের ফল ভুগতে হয়েছে আন্তিগোনে থেকে সীতা, দ্রৌপদী; জোয়ান অফ আর্ক থেকে আনারকলি, হাইপেশিয়া; রানি লক্ষ্মীবাঈ থেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বেগম রোকেয়া; রোজা পার্কস থেকে মালালা ইউসুফজাই— তাঁদের মতো হাজারো নামহীন নারীকে।

Read More »