রচনা: মুনশী প্রেমচাঁদ
ভাষান্তর: কাজী তানভীর হোসেন
> মুজদা-এ-দিল কি মসীহা নফসে মী আয়দ;
> কি জে আনফাস খুশশ বু-এ কসে মী আয়দ।
হে হৃদয়, তুমি আনন্দিত হও, কারণ সেই ত্রাণকর্তা আজ সমাসন্ন; দেখছ না যে মানুষের নিঃশ্বাসে আজ তাহারই পবিত্র সুবাস পাওয়া যাচ্ছে!
সামন্ততান্ত্রিক যুগে শক্তিশালী বাহু আর নির্ভীক কলিজা ছিল জীবনের প্রধান প্রয়োজন। এরপর এল সাম্রাজ্যবাদ, যেখানে বুদ্ধি, বাগ্মিতা আর অন্ধ আনুগত্যই হয়ে উঠল সফলতার চাবিকাঠি। তবে সেই দুটি ব্যবস্থার হাজারো দোষ থাকলেও কিছু মানবিক গুণ তখনও অবশিষ্ট ছিল। মানুষের মহৎ বোধগুলো একেবারে হারিয়ে যায়নি। একজন সামন্তপ্রভু শত্রুর রক্তে নিজের তৃষ্ণা মেটালেও বন্ধু বা উপকারীর জন্য নিজের প্রাণ বাজি রাখতে জানতেন। সম্রাট তাঁর আদেশকেই আইন মনে করলেও প্রজাপালনে তিনি ছিলেন ন্যায়নিষ্ঠ। আগেকার দিনে যুদ্ধ হত অপমানের প্রতিশোধ নিতে, বীরত্ব দেখাতে কিংবা রাজ্য বিস্তারের উচ্চাকাঙ্ক্ষায়। কিন্তু বিজয়ী রাজার উদ্দেশ্য কখনওই সাধারণ মানুষের রক্ত শোষণ করা ছিল না। রাজারা প্রজাদের কেবল নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি বা সম্পদ শোষণের জ্বালানি মনে করতেন না; বরং তাদের সুখে-দুখে অংশ নিতেন এবং গুণের কদর করতেন।
কিন্তু বর্তমানের এই মহাজনী সভ্যতায় সব কাজের একমাত্র লক্ষ্য হল কেবল টাকা। আজ কোনও দেশ শাসন করা হয় কেবল মহাজন আর পুঁজিপতিদের মুনাফা বাড়ানোর জন্য। এই দিক থেকে দেখলে মনে হয়, আজ দুনিয়াতে কেবল মহাজনদেরই রাজত্ব চলছে। মানবসমাজ আজ দুই ভাগে বিভক্ত— বড় অংশটি খেটেখাওয়া ও ধুঁকে ধুঁকে মরা মানুষদের, আর অতি ক্ষুদ্র অংশটি সেই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যারা পুরো সমাজকে নিজেদের মুঠোয় পুরে রেখেছে। এই শোষক শ্রেণির মনে সাধারণ মানুষের জন্য কোনও সহানুভূতি নেই। তাদের চোখে সাধারণ মানুষের অস্তিত্ব কেবল মালিকের জন্য ঘাম ঝরানো, রক্ত দেওয়া আর একদিন নিঃশব্দে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হল, শোষক শ্রেণির এই চিন্তাধারা আজ শোষিতদের ভেতরেও ঢুকে গেছে। আজ প্রতিটি মানুষ নিজেকে শিকারী ভাবছে আর সমাজকে ভাবছে তার শিকার। মানুষ আজ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেবল এটাই ভাবছে যে, কোন কৌশলে সমাজকে বোকা বানিয়ে নিজের আখের গুছিয়ে নেওয়া যায়।
অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়। টাকা মানুষের মগজ এমনভাবে দখল করেছে যে, দয়া, মায়া, সত্য আর সৌজন্যের প্রতিমূর্তি মানুষটি আজ কেবল একটি প্রাণহীন যান্ত্রিক পুতুলে পরিণত হয়েছে।
এই মহাজনী সভ্যতা এক নতুন নীতি শিখিয়েছে— সময়ই সম্পদ। আগে সময় মানে ছিল জীবন, যার শ্রেষ্ঠ ব্যবহার হত বিদ্যা অর্জন বা আর্তমানবতার সেবায়। এখন সময়ের শ্রেষ্ঠ ব্যবহার হল টাকা কামানো। ডাক্তার যখন রোগীর নাড়ি দেখেন, তখন তার চোখ থাকে ঘড়ির কাঁটায়। রোগীর যন্ত্রণার কথা শোনার আগ্রহ তার নেই, কারণ তার কাছে প্রতিটি মিনিট মানেই কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। মাস্টারের কাছে ছাত্রের শেখার চেয়ে এক ঘণ্টার সময়সীমা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই অর্থলিপ্সা বন্ধুত্ব আর আত্মীয়তাকে বিলীন করে দিয়েছে। স্বামী তার স্ত্রী-সন্তানকে সময় দিতে পারে না, কারণ সেই সময়ে সে কিছু বাড়তি আয় করতে পারে। এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে মানুষ কেবল তখনই মানুষের খোঁজ নেয়, যখন তার কোনও স্বার্থ থাকে। আজ কেউ যদি নিজের শহরে খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন, তবে সেখানে সহজে আপনার প্রবেশাধিকার মিলবে না। তিনি এখন টাকার পূজারী, বন্ধুত্বের খাতিরে সময় নষ্ট করার দিন তার শেষ।
এমনকী আপনার বন্ধু যদি উকিল হয়, তবে বিপদে পড়লে তার কাছে সাহায্যের আশা বৃথা। সে হয়তো বন্ধুত্বের খাতিরে টাকা চাইবে না, কিন্তু আপনার মামলার দিকেও মনোযোগ দেবে না। তার চেয়ে বরং কোনও অপরিচিত পেশাদারকে টাকা দিয়ে নিয়োগ করাই ভাল। আজ যদি কেউ কোনও বিষয়ে পারদর্শী হয়ে ওঠে, তবে তার ভেতর থেকে মানবিকতা উধাও হয়ে যায়, কারণ তার প্রতিটি মিনিট তখন দামি। এর অর্থ এই নয় যে গালগল্পে সময় নষ্ট করতে হবে, কিন্তু অর্থলিপ্সা যেন এমন পর্যায়ে না যায় যা মানুষের হৃদয় থেকে প্রেম, স্নেহ আর সহানুভূতিকে বের করে দেয়। তবে আপনি সেই টাকার গোলামকে দোষ দিতে পারেন না। দুনিয়া যে স্রোতে ভাসছে, সেও সেই স্রোতেই গা ভাসিয়েছে। মানুষ বরাবরই মান-সম্মান চায়। যখন বিদ্যা ও শিল্প সম্মানের মাপকাঠি ছিল, তখন মানুষ তাই অর্জন করত। এখন যেহেতু টাকাই একমাত্র মানদণ্ড, তাই মানুষ বাধ্য হয়ে টাকার উপাসনা করছে। সে দেখছে যে সমাজ বিত্তহীনদের কোনও মর্যাদা দেয় না, তাই অবজ্ঞা থেকে বাঁচতে সে বন্ধুত্বের মায়া ত্যাগ করে লক্ষ্মীর আরাধনায় মগ্ন হয়।
আজ মানুষের মন এমন হয়ে গেছে যে, টাকা উপার্জন ছাড়া অন্য কিছুতে সে আনন্দ পায় না। সে দেখছে যে টাকা ছাড়া তার আর কেউ নেই। এমনকী আত্মীয়-স্বজনরাও তার টাকারই কদর করে। সে জানে, যদি সে কপর্দকশূন্য হয়, তবে আজকের এই বন্ধুদের কাউকেই পাশে পাওয়া যাবে না। তাকে বার্ধক্যের জন্য সঞ্চয় করতে হয়, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হয়। এই সহানুভূতিহীন দুনিয়ার রূঢ় অভিজ্ঞতা তার আছে। তাই জীবনের চাকা সচল রাখতে সে ব্যবসার নীতি মেনে চলতে বাধ্য হয়।
এই সভ্যতার দ্বিতীয় মূলমন্ত্র হলো— ‘ব্যবসা মানে ব্যবসাই’ (Business is Business)। এখানে আবেগের কোনও স্থান নেই। লেনদেনের বেলায় কোনও বন্ধুত্ব বা মানবিকতা খাটে না। কেউ যদি বিপদে পড়ে কোনও মহাজন বন্ধুর কাছে গিয়ে সুদের হার কমানোর বা সাহায্যের মিনতি করে, তবে তাকে স্রেফ ওই এক বাক্যেই থামিয়ে দেওয়া হয়। এই ব্যবসায়িক নীতি আজ স্বামী-স্ত্রী, বাবা-ছেলে এবং গুরু-শিষ্যের পবিত্র সম্পর্ককেও বিষাক্ত করে দিয়েছে। এই সভ্যতার মূল আত্মাই হল চরম ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা। কিন্তু এখানেও কাউকে এককভাবে দোষ দেওয়া যায় না। ভবিষ্যতের চিন্তা আর সামাজিক প্রদর্শনী বা লোকদেখানো আভিজাত্যের বোঝা সবার ঘাড়ে সওয়ার হয়ে আছে। এই নিয়ম না মানলে তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
এতদিন এই ব্যবস্থার সামনে মাথা নত করা ছাড়া উপায় ছিল না। কিন্তু আজ সুদূর পশ্চিমে এক নতুন সভ্যতার সূর্য উদিত হচ্ছে, যা এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার গোড়া কেটে দিচ্ছে। এর মূল নীতি হল— যিনি শারীরিক বা মানসিক পরিশ্রম করবেন, তিনিই সমাজের সম্মানিত সদস্য। আর যারা অন্যের শ্রমে বা পূর্বপুরুষের সম্পদে আয়েশ করেন, তারা নাগরিক অধিকারের যোগ্য নন। পুঁজিপতিরা এই নতুন ব্যবস্থাকে ভয় পাচ্ছে এবং একে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও ধর্মের পরিপন্থী বলে অপপ্রচার চালাচ্ছে। কিন্তু সত্য এই যে, এই নতুন সভ্যতা কেবল সেই স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চায় যার মাধ্যমে একজন পুঁজিপতি লাখো মজুরের রক্ত চুষে বড় হয় বা মুনাফার জন্য যুদ্ধ বাধায়। ধর্ম ও স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ যদি হয় লোকসেবা, সহনশীলতা আর ত্যাগের মহিমা, তবে এই নতুন ব্যবস্থাই তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
যেখানে সম্পদের পাহাড় আছে, সেখানে হিংসা, জবরদস্তি, চুরি আর ব্যভিচার অনিবার্য। মহাজনী সভ্যতা এই পাপগুলোকে লালন করে এবং চায় যে নিপীড়িত মানুষ যেন একে ‘ঈশ্বরের বিধান’ মেনে নিয়ে শান্ত থাকে। কিন্তু এই টাকা-পূজার মানসিকতা মিটিয়ে দিলে সব মন্দ আপনাআপনি দূর হয়ে যাবে। এই নতুন সভ্যতা আভিজাত্যকে বিষবৎ মনে করে। সেখানে বিলাসী জীবনযাপন করা সম্মানের নয়, বরং ঘৃণার বিষয়। সরকারি পদ পাওয়া সেখানে সেবা করার সুযোগ, ক্ষমতা দেখানোর উপায় নয়। মহাজনী সভ্যতার প্রেমিকরা কেন এই ব্যবস্থাকে পছন্দ করবে, যেখানে সোনা-রুপোর পাহাড় জমানোর সুযোগ নেই? পুঁজিপতিরা এই সভ্যতার নাম শুনলে কাঁপে, তা বোঝা যায়; কিন্তু যারা না বুঝে তাদের সুর মেলায়, তাদের দাস-মনোবৃত্তি দেখে হাসি পায়।
ধন্য সেই সভ্যতা, যা ব্যক্তিগত সম্পত্তির অহংকার শেষ করে দিচ্ছে। আজ হোক বা কাল, পৃথিবী এই পথেই হাঁটবে। কোনও বিশেষ দেশের ধর্ম বা পরিবেশের সাথে এটি মিলবে না— এই যুক্তি অর্থহীন। মানব-স্বভাব সারা বিশ্বে এক। যা এক দেশের জন্য কল্যাণকর, তা অন্য দেশের জন্যও হিতকর হবে। মহাজনী সভ্যতার দালালেরা এর বিরুদ্ধে যত বিভ্রান্তিই ছড়াক না কেন, সত্যের জয় একদিন হবেই।
[কথাশিল্পী মুনশী প্রেমচাঁদের কালজয়ী প্রবন্ধ ‘মহাজনী সভ্যতা’ দীর্ঘকাল ধরে বাঙালি পাঠকদের কাছে এক প্রকার অজানাই রয়ে গেছে। এই রচনার গভীর তাৎপর্য অনুধাবন করে এটি বাংলায় অনুবাদ করার তাগিদ প্রায় এক দশক ধরে অনুভব করেছি। হিন্দিতে দক্ষ অনেকের সহযোগিতা চেয়েও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে নিজের সীমিত ভাষাজ্ঞান নিয়েই এই দুঃসাহসী ভাবানুবাদের কাজে হাত দিয়েছি। আশা করি, পুঁজিবাদ-বিরোধী এই শক্তিশালী সাহিত্যকর্মটি বাঙালি পাঠকদের চিন্তার খোরাক জোগাবে এবং তাঁদের সমৃদ্ধ করবে।— অনুবাদক]
লেখক পরিচিতি
মুনশী প্রেমচাঁদ (ধনপত রায় শ্রীবাস্তব, ৩১ জুলাই ১৮৮০ – ৮ অক্টোবর ১৯৩৬) ভারতের একজন বিখ্যাত ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার ও সমাজসংস্কারক। তাঁকে আধুনিক হিন্দি-উর্দু সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ বলা হয়। তিনি বারাণসীর কাছে লমহি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর লেখায় দারিদ্র, জাতিভেদ, গ্রামীণ জীবন ও সমাজের অন্যায়-অবিচারের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। স্বাধীনতা আন্দোলন ও গান্ধীজির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ১৯২১ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সম্পূর্ণভাবে সাহিত্যচর্চায় মন দেন। তাঁর বিখ্যাত রচনার মধ্যে গোদান, বাজার-ই-হুসন, কর্মভূমি, শতরঞ্জ কে খিলাড়ি, গবন, মানসরোবর, ইদগাহ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামকে গভীর মানবিকতার সঙ্গে তুলে ধরার জন্য অনেক গবেষক তাঁর সাহিত্যকে লিও তলস্তয় ও চার্লস ডিকেন্স-এর রচনার সঙ্গে তুলনা করেন।






