Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

চন্দ্রাবতী: বঙ্গের প্রথম পদকর্ত্রী

প্রাক্-কথন

পৃথিবীতে নারীবিশ্ব যুগে যুগে, দেশে দেশে আক্রান্ত। ‌অর্ধেক আকাশ‌ হলেও হাজার হাজার বছর ধরে অবহেলিত, দাসানুদাস করে রাখা হয়েছে নারীকে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র টুঁটি চেপে ধরে তাঁর দুয়ার রুদ্ধ করে রেখেছে, সে যাতে বিকশিত হতে না পারে। তাই প্রতিভা থাকলেও নারীর পক্ষে সম্ভব হয়নি নিজেকে বিকশিত করার। আলেকজান্দ্রিয়ার বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও জ্যোতির্বিদ হাইপেশিয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। উপমহাদেশের স্মৃতিকারগণ,— মনু পরাশর যাজ্ঞবল্ক্য কৌটিল্য রঘুনন্দন‌ প্রমুখ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নারীকে প্রায় নরকবাস করিয়ে ছেড়েছিলেন। ‌সতীদাহ, বহুবিবাহ, বৈধব্য আর হাজার‌ শৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত ছিল নারীর জীবন। এ বাবদে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে‌ বিশেষ‌ ভেদ‌ নেই।‌ এরিস্টটল বিধান দিয়েছেন, জাহাজ যদি সমুদ্রে‌ ডোবে, তা হলে আগে উদ্ধার করতে হবে ঘোড়া, অতঃপর‌ নারী! অন্যদিকে, পৃথিবীতে প্রথম বিধিবদ্ধ আইন প্রণয়ন করে নমস্য হয়ে আছেন যিনি, মেসোপটেমিয়ার সেই হামুরাবি তার ল কোড বা আইনসংহিতায় জানাচ্ছেন, ব্যভিচারে লিপ্ত হলে নারীকে জলে ডুবিয়ে হত্যা করতে হবে।‌ আর যে পুরুষ নারীর সঙ্গে ব্যভিচার করবে? না, তাঁর জন্য কোনও শাস্তি নেই!

নারীকে এসব প্রতিকূলতা, বৈষম্য আর অন্যায়-অত্যাচার মেনে নিয়ে যুগে যুগে আপন ভাগ্য জয় করার অধিকার আদায় করে নিতে হয়েছে। কেউ তাকে নামাতে চেয়েছে পঙ্কে, কেউ তার প্রতিভা, কৃতি ও অর্জনকে চেয়েছে ধামাচাপা দিতে। উনিশ শতকে যে বাংলার নবজাগরণ, সেখানে বাঙালি নারীর ভূমিকা কি স্থান পেয়েছে আদৌ? রাজা রামমোহন রায়ের কথা আমরা জানি। কিন্তু জানি কি, তাঁর সমসাময়িক হটু বিদ্যালঙ্কার হটী বিদ্যালঙ্কারের কথা? বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গ্রাজুয়েট। তাঁর স্নাতক হ‌ওয়ার কয়েক বছরের মধ্যে কেবল‌ স্নাতক নন, ভারতে প্রথম ডাক্তার হন এক বাঙালি নারী, কাদম্বিনী গাঙ্গুলি। ঠাকুরবাড়ির বধূ জ্ঞানদানন্দিনী দেবী সেই আমলে দুই শিশু পুত্র ও কন্যা, সুরেন্দ্রনাথ ও ইন্দিরাকে নিয়ে জাহাজে চড়ে বিলেত যান। আমরা বিদেশি শিক্ষাগুরুদের নাম জানি,— উইলিয়াম কেরি, ডিরোজিও, ডেভিড হেয়ার, ড্রিঙ্ক‌ওয়াটার‌ বিটন (বেথুন)। কিন্তু ক’জন হ্যানা ক্যাথেরিন‌ মুলেন্স আর ভগিনী নিবেদিতার নাম উচ্চারণ করি? বা শিক্ষাপ্রসারে নবাব ফয়জুন্নিসা, লেডি অবলা বসু, বেগম রোকেয়ার নাম? ১৯৭২ সালে বঙ্কিমচন্দ্র ‘বঙ্গদর্শন’ বের করার কাছাকাছি সময়ে, তাঁর আগেই, মোক্ষদায়িনী মুখোপাধ্যায় ১৮৭০ সালে সম্পাদনা করেছেন ‘বঙ্গমহিলা’! খবর আছে এ-সবের? বঙ্গদর্শন ছিল মাসিক পত্রিকা, অন‌্যদিকে বঙ্গমহিলা পাক্ষিক।
এইসব মাথায় রেখেই আমরা বাংলার প্রথম পদকর্ত্রী বা মহিলা কবি চন্দ্রাবতী সম্পর্কে আলোচনা করব।

চন্দ্রাবতী: জীবনকথা

চন্দ্রাবতী জন্মেছেন বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার‌ কিশোরগঞ্জে, যেটি বর্তমানে বাংলাদেশের একটি স্বতন্ত্র জেলা। তাঁর ‌জন্ম ১৫৫০-এ। মায়ের‌ নাম সুলোচনা এবং পিতা দ্বিজ বংশীদাস। তাঁর পিতামহী অঞ্জনা, পিতামহ যাদবানন্দ। ফুলেশ্বরী নদী-সন্নিকটস্থ পাতোয়াইর তাঁর জন্মের গ্রাম, যেটি এখন মাইজথাপন ইউনিয়নের অন্তর্গত।
ময়মনসিংহ এবং কিশোরগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরেই ঐতিহ্য, ইতিহাস আর সারস্বত সাধনার‌ জায়গা।‌ এদেশ যেমন নদী-হাওর-ঐতিহাসিক স্থাপনার‌ ও পাহাড়ের দেশ, তেমনই এখানকার মানুষের মেধাতালিকাও সুবিশাল। বারো ভুঁইয়ার একজন, ঈশা খাঁ ছিলেন কিশোরগঞ্জের। তিনি চন্দ্রাবতীর সমসাময়িক-ও বটেন। ময়মনসিংহ গীতিকা বাংলা সাহিত্যের এক চিরায়ত বিস্ময়, যেখানে কবির পর কবি যুগের পর যুগ ধরে মানুষের বিচিত্র সুখদুঃখবেদনা, প্রেম ও বিরহের আখ‌্যান‌ লিখে রেখে গেছেন।‌ কেবল বাংলা সাহিত্যের নয়, পৃথিবীর বহু ভাষায় অনূদিত ও চর্চিত হয়ে‌ এখন তা বিশ্বসাহিত্যের চিরায়ত সম্পদরূপে গণ্য।

চন্দ্রাবতীর বাবা ছিলেন‌ একজন কবি।‌ তাঁর খ্যাতি মূলত মনসামঙ্গল রচনার জন্য। মনসামঙ্গলের অন্য এক কবি বরিশালের বিজয়গুপ্ত ‌ছিলেন এক-ই সময়ের লোক। দু’জনের কাব্য‌ই সমাদৃত, এবং সুধীমহলে আজ-ও চর্চিত হয়ে থাকে। দ্বিজ‌ বংশীদাস মনসার ভাসান গাইতেন। তাতে যে অর্থ পেতেন, কায়ক্লেশে দিন চলে যেত। নিতান্তই দারিদ্র্যপীড়িত ছিল তাঁদের সংসার। লোকশ্রুতি বলে, মনসার আরাধনা করতেন বলেই নাকি লক্ষ্মীদেবী তাঁর ওপর বিরূপা!

এহেন পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন চন্দ্রাবতী। পিতা তাঁকে কিছু পড়াশোনাও শিখিয়েছিলেন। ‌সে-যুগে নারীশিক্ষার কোনও ব্যবস্থা ছিল না।‌ দৈবাৎ দু-একজনের ভাগ্যে শিক্ষালাভের সুযোগ ঘটে যেত।

চন্দ্রাবতী ছাড়া আর মাত্র যে দু’জন নারীকবির‌ নাম জানি আমরা, তাঁদের মধ্যে একজনের নাম মাধবী। তিনি ছিলেন শ্রীচৈতন্যের কৃপাপাত্রী। পুরীর জগন্নাথ বল্লভ উদ্যানের সেবিকা শিখী মাহাতীর বোন এই মাধবীর পাণ্ডিত্যের খ্যাতি ছিল। ড. সুকুমার সেনের মতে তিনি ছিলেন বাঙালি। যদিও সকল‌ সাহিত্য-ঐতিহাসিক এতে একমত নন। তাঁর বেশ‌ কিছু বৈষ্ণবপদ পাওয়া গিয়েছে। তাছাড়া বৈষ্ণবপদকর্তা চণ্ডীদাসের সাধনসঙ্গিনী রামী বা রামাবতীর-ও কিছু পদ পাওয়া গিয়েছে। এঁদের বাইরে সমগ্র মধ্যযুগে নারী-কবির অস্তিত্ব জানা যায় না।
চন্দ্রাবতী দেবপূজা ও জ্ঞানচর্চা নিয়ে থাকতেন।‌ তাঁর জীবনকাহিনি ময়মনসিংহ গীতিকার-ই একটি পালায়‌ পাই আমরা। লেখকের‌ নাম নয়নচাঁদ ঘোষ। এটি যে সার্বিকভাবে সত্য ঘটনাশ্রিত, তা হয়তো নয়। তবে কাহিনির বয়ান সম্ভবত উপেক্ষা করার‌ মতো নয়। শৈশবে তাঁর বাল্যসখা ছিলেন জয়ানন্দ। ‌দু’জনে ‘ভোরের বেলা ফুল তুলেছি, দুলেছি দোলায়/ বাজিয়ে বাঁশি গান গেয়েছি বকুলের তলায়’! দু’জনে কাব্যচর্চাও নাকি করতেন, বেড়াতেন‌ ফুলেশ্বরী নদীপারে। এই করে উভয়ের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রণয় জন্মায়। এখানে এসে যেন‌ বঙ্কিমচন্দ্রের ‘চন্দ্রশেখর’ পাঠ করি আমরা এভাবে, লেখকের‌ একটি মহাবাক্যকে মাথা থেকে ‌মুছে ফেলে, ‘বাল্যকালের ভালোবাসায় বুঝি কিছু অভিসম্পাত আছে।’

চন্দ্রাবতীর পিতাও উভয়ের বিয়ে চেয়েছিলেন। দিনক্ষণ ঠিক হল। কিন্তু নাটকীয়ভাবে বিয়ের আসরে পাত্র গরহাজির। জানা গেল, জয়ানন্দ আসমানি বলে এক মুসলমান মেয়ের প্রেমে পড়েছেন নাকি, এবং সেই রাতেই ইসলাম গ্রহণ করে বিয়ে করেছেন আসমানিকে। জয়ানন্দ এখন জয়নাল। আসমানির পিতা একজন কাজি।

এমন শোকাবহ ঘটনায়ও চূড়ান্ত ভেঙে পড়েন‌নি চন্দ্রাবতী। তিনি তাঁর আরাধ্য শিবের পূজা আর সারস্বত জীবন কাটানোর সঙ্কল্প নেন। কথিত আছে, ফুলেশ্বরী নদীতীরে তাঁর সেই শিবমন্দিরটি আজ-ও নাকি কালের বাধা উপেক্ষা করে বর্তমান।

চন্দ্রাবতীর জীবনের যেটি শ্রদ্ধেয় দিক, তা হল গরলকে অমৃতে পরিণত করা। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোককে কাটিয়ে উঠে একাগ্রতা নিয়ে পঠনপাঠন‌ ও সৃষ্টিকর্মে মন দেন। পিতাকে সহায়তা করেন কাব্যরচনায়। ১৫৭৫ নাগাদ, যখন চন্দ্রাবতীর বয়স মাত্র পঁচিশ, সেসময় তিনি পিতার লেখা মনসার ভাসান-এ সহযোগিতা করেছিলেন। তারপর একের পর এক নিজস্ব রচনায় ভাস্বর হয়ে থাকে তাঁর কারুবাসনা।
কিন্তু আমরা সে-প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে তাঁর জীবনের বাকি ঘটনাগুলো বলে নিতে চাই।
জয়ানন্দ, এখন যিনি জয়নাল, আসমানিকে বিয়ে করে সুখী হতে পারেননি। অনুতাপে দগ্ধ জয়নাল চন্দ্রাবতীর কাছে আসেন তাঁর কাছে ক্ষমা চাইতে। ‌দুয়ার রুদ্ধ, দরজায় করাঘাত করলেও দরজা খোলেন‌নি অভিমানাহত চন্দ্রাবতী। জয়নাল এমনকি তাঁকে বিয়ে পর্যন্ত করতে চান। চন্দ্রাবতী উত্তরহীন। অবশেষে জয়নাল মাধবী ফুলের নির্যাস দিয়ে চিঠি লেখেন তাঁর কৈশোর-প্রেমিকাকে, যা অনুশোচনা আর প্রায়শ্চিত্তপ্রয়াসের যুগলবন্দী যেন, ‘অমৃত ভাবিয়া আমি খাইয়াছি গরল।/ কণ্ঠেতে লাগিয়া ব‌ইছে কাল‌ হলাহল।।/ পাপিষ্ঠ জানিয়া মোরে না হ‌ইলা সম্মত।/ বিদায় মাগি চন্দ্রাবতী জনমের মতো।’

হ্যাঁ, আক্ষরিক অর্থেই ‘জনমের মতো’। এর পর তিনি ক্ষমাপ্রার্থনা করে লেখেন, ‘শৈশবকালের সঙ্গী তুমি যৈবনকালের‌ সাথী।/ অপরাধ‌ ক্ষমা করো তুমি চন্দ্রাবতী।।’ এ লেখা লিখে তিনি চলে গেলেন ফুলেশ্বরীর পাড়ে। নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করলেন। শোনা যায়, এ খবর শুনে নদীতীরে এসে চন্দ্রাবতী তার একদা-প্রেমিক জয়ানন্দকে মৃত দেখতে পান। এবং তিনিও মারা যান। হয় নদীতে ডুবে, নয়তো অতিরিক্ত শোকে। আত্মহত্যা ও কাহিনির মিল বাদ দিয়েও কেন যেন এখানে রাধাকৃষ্ণের প্রেম ও বিচ্ছেদের সুর পাই। পাই মীর মশাররফ হোসেনের জীবনে আজিজ-উন-নেসার আগমনে মীরের বেদনায় দগ্ধ হ‌ওয়ার সমরৈখিকতা।

চন্দ্রাবতীর জীবনী আলোচিত হয়েছে প্রচুর । তাঁকে ‌নিয়ে প্রবন্ধ রচনা, গবেষণা হয়েছে দুই বঙ্গ মিলিয়ে খুব কম নয়। নয়নচাঁদ ঘোষ তো সে যুগেই তাঁকে ‌নিয়ে পালা লিখেছেন, যার ভিত্তিতে এ-যুগে রাশেদ চৌধুরী ‘চন্দ্রাবতীকথা’ নামে চলচ্চিত্র তৈরি করেন ২০১৫-তে। দীনেশচন্দ্র সেন ও ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক, দু’জনের সম্পাদিত ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’-তেই নয়নচাঁদের পালা স্থান পেয়েছে। এ যুগে পাই বিজয়কান্তি দাশ-বিরচিত চন্দ্রাবতীর পালা। প্রখ্যাত পালাকার ব্রজেন দে-রও তাঁকে ‌নিয়ে যাত্রাপালা রয়েছে। ইতিহাসবিদ চন্দ্রকুমার দে ১৯১৩ সালে চন্দ্রাবতীকে নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছিলেন কেদারনাথ মজুমদার সম্পাদিত ‘সৌরভ’ পত্রিকায়।‌ এর ফলে বিদ্বজ্জনদের মধ্যে চন্দ্রাবতীর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তাঁকে ‌নিয়ে অন্যান্য আলোচকদের মধ্যে রয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক সুস্মিতা চক্রবর্তী। কবি-ঔপন্যাসিক-গবেষক নবনীতা দেবসেন-ও চন্দ্রাবতীকে নিয়ে সারবান লেখা লিখেছেন। তাঁকে ‌নিয়ে রচিত হয়েছে একাধিক নাটক। সব মিলিয়ে আজকের অনুসন্ধিৎসু পাঠক তাঁর সম্পর্কে আশানুরূপ জ্ঞানলাভে সমর্থ।

তাঁকে ‌নিয়ে কুষ্টিয়ার ‘বোধন’ গোষ্ঠীর নাটক বাংলাদেশের জেলায় জেলায় অভিনীত হয়েছে। ‌আরও বহু নাট্যদল তাঁর জীবনী-অবলম্বনে নাটক লিখে তা অভিনয়ের মাধ্যমে দলকে ও যুগপৎ কবিকে খ্যাতি এনে দিয়েছেন। পৃথিবীর একুশটির মতো‌ ভাষায় অনূদিত হয়েছেন তিনি। তাইতেই চন্দ্রাবতীর মনীষার পরিচয় কিছুটা পাওয়া যেতে পারে।

আছে তাঁর নামে মন্দির, নিজ গ্রামে। অষ্টকোণাকৃতি সে মন্দির এগারো মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট। আট কোণের প্রতিটির বাহু ১.৭ মিটার করে। দেশ-বিদেশের বহু পর্যটক সেই মন্দির দেখতে যান কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য।

চিত্র: চন্দ্রাবতী মন্দির

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

sixteen − ten =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »
সালমিন রহমান

বেলুচিস্তান সংকট মোকাবিলা কতটা সহজ

বেলুচিস্তানের সংকটকে কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদ কিংবা কেবল নিরাপত্তা সমস্যার দৃষ্টিতে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি বোঝা যায় না। এখানে ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, প্রাকৃতিক সম্পদ, উন্নয়ন বৈষম্য, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা— সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্বাধীন বেলুচিস্তান গঠিত হলে বহু মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে পারে। একই সঙ্গে একটি নতুন রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াবে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা। অন্যদিকে, পাকিস্তান, চীন, ভারত এবং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও দুই বিখ্যাত বাঙালি

কী অসাধারণ শিক্ষাই না আমরা পেতে পারি, উৎসাহিত হয়ে পারি খেলোয়াড়দের থেকে! একটি উদাহরণ: প্রথম বিশ্বকাপে সোনাজয়ী উরুগুয়ে দলে ছিলেন হেক্টর কাস্ত্রো। তেরো বছর বয়সে মেশিনে তাঁর ডানহাত কাটা পড়েছিল। অদম্য উৎসাহে তিনি ফুটবল খেলেছেন, জাতীয় দলে স্থান করে নিয়েছেন, আর ফাইনালে জয়সূচক গোলটিও তাঁর-ই করা! তাঁর স্বদেশবাসী তাঁকে ডাকতেন— ‘এল ডিভিনো মানকো’, অর্থাৎ একহাত-বিশিষ্ট ঈশ্বর।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আমেরিকার স্বাধীনতা: আড়াইশো বছর

১৬০৭ থেকে ১৭৮৩ পর্যন্ত সময়কাল আমেরিকায় ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক রাজত্ব। আজকের দিনে যে আমেরিকা, তা কিন্তু পুরোটা ব্রিটিশদের দখলে ছিল না। ছিল ভার্জিনিয়া, ম্যাসাচুসেটস, নিউ ইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া-সহ ১৩টি রাজ্য। আর কানাডার বেশ কিছু অঞ্চল। আমেরিকার অন্যান্য স্থানে ফরাসি, ডাচ, নরওয়েজিয়, সুইডিস উপনিবেশ-ও ছিল। তাছাড়া রাশিয়া আমেরিকার আলাস্কা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত দখল করে। পরে সে আলাস্কা আমেরিকার কাছে বিক্রিও করে দেয়।

Read More »
অপরাজিতা মৈত্র

গোদাবরীর গোমুখে

গঙ্গার মর্ত্যে আগমন নিয়ে যেমন ভগীরথের গল্প, তেমনই গোদাবরীর উৎসস্থলে না এলে জানা যেত না, দক্ষিণের গঙ্গা নিয়েও আছে হাজার গল্প। যে গল্প জানাবে আজও এই অঞ্চলের মানুষ অনেক সময়েই কাছাকাছি আর কোনও পানীয়জল না পেয়ে কষ্ট করে হলেও এই উৎসস্থলে এসেই শীতল এই পানীয়জল নিয়ে যান নিজেদের কাজের জন্য। গঙ্গা বা অন্য নদী সে শুধু ধার্মিক আবেগের কারণে পবিত্র না, হাজার প্রাণীর ‘তৃষ্ণা’ মেটাবার জন্য সে হয়ে ওঠে ‘দেবী’ বা ‘পবিত্র’। সে পথে মিশে যায় হাজার গল্প-কষ্ট কিংবা দিনযাপনের চরম বাস্তবতা।

Read More »