Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

বঙ্গের প্রথম নারীকবি চন্দ্রাবতী

প্রাক্-কথন

পৃথিবীতে নারীবিশ্ব যুগে যুগে, দেশে দেশে আক্রান্ত। ‌অর্ধেক আকাশ‌ হলেও হাজার হাজার বছর ধরে অবহেলিত, দাসানুদাস করে রাখা হয়েছে নারীকে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র টুঁটি চেপে ধরে তাঁর দুয়ার রুদ্ধ করে রেখেছে, সে যাতে বিকশিত হতে না পারে। তাই প্রতিভা থাকলেও নারীর পক্ষে সম্ভব হয়নি নিজেকে বিকশিত করার। আলেকজান্দ্রিয়ার বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও জ্যোতির্বিদ হাইপেশিয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। উপমহাদেশের স্মৃতিকারগণ,— মনু পরাশর যাজ্ঞবল্ক্য কৌটিল্য রঘুনন্দন‌ প্রমুখ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নারীকে প্রায় নরকবাস করিয়ে ছেড়েছিলেন। ‌সতীদাহ, বহুবিবাহ, বৈধব্য আর হাজার‌ শৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত ছিল নারীর জীবন। এ বাবদে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে‌ বিশেষ‌ ভেদ‌ নেই।‌ এরিস্টটল বিধান দিয়েছেন, জাহাজ যদি সমুদ্রে‌ ডোবে, তা হলে আগে উদ্ধার করতে হবে ঘোড়া, অতঃপর‌ নারী! অন্যদিকে, পৃথিবীতে প্রথম বিধিবদ্ধ আইন প্রণয়ন করে নমস্য হয়ে আছেন যিনি, মেসোপটেমিয়ার সেই হামুরাবি তার ল কোড বা আইনসংহিতায় জানাচ্ছেন, ব্যভিচারে লিপ্ত হলে নারীকে জলে ডুবিয়ে হত্যা করতে হবে।‌ আর যে পুরুষ নারীর সঙ্গে ব্যভিচার করবে? না, তাঁর জন্য কোনও শাস্তি নেই!

নারীকে এসব প্রতিকূলতা, বৈষম্য আর অন্যায়-অত্যাচার মেনে নিয়ে যুগে যুগে আপন ভাগ্য জয় করার অধিকার আদায় করে নিতে হয়েছে। কেউ তাকে নামাতে চেয়েছে পঙ্কে, কেউ তার প্রতিভা, কৃতি ও অর্জনকে চেয়েছে ধামাচাপা দিতে। উনিশ শতকে যে বাংলার নবজাগরণ, সেখানে বাঙালি নারীর ভূমিকা কি স্থান পেয়েছে আদৌ? রাজা রামমোহন রায়ের কথা আমরা জানি। কিন্তু জানি কি, তাঁর সমসাময়িক হটু বিদ্যালঙ্কার হটী বিদ্যালঙ্কারের কথা? বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গ্রাজুয়েট। তাঁর স্নাতক হ‌ওয়ার কয়েক বছরের মধ্যে কেবল‌ স্নাতক নন, ভারতে প্রথম ডাক্তার হন এক বাঙালি নারী, কাদম্বিনী গাঙ্গুলি। ঠাকুরবাড়ির বধূ জ্ঞানদানন্দিনী দেবী সেই আমলে দুই শিশু পুত্র ও কন্যা, সুরেন্দ্রনাথ ও ইন্দিরাকে নিয়ে জাহাজে চড়ে বিলেত যান। আমরা বিদেশি শিক্ষাগুরুদের নাম জানি,— উইলিয়াম কেরি, ডিরোজিও, ডেভিড হেয়ার, ড্রিঙ্ক‌ওয়াটার‌ বিটন (বেথুন)। কিন্তু ক’জন হ্যানা ক্যাথেরিন‌ মুলেন্স আর ভগিনী নিবেদিতার নাম উচ্চারণ করি? বা শিক্ষাপ্রসারে নবাব ফয়জুন্নিসা, লেডি অবলা বসু, বেগম রোকেয়ার নাম? ১৯৭২ সালে বঙ্কিমচন্দ্র ‘বঙ্গ
দর্শন’ বের করার কাছাকাছি সময়ে, তাঁর আগেই, মোক্ষদায়িনী মুখোপাধ্যায় ১৮৭০ সালে সম্পাদনা করেছেন ‘বঙ্গমহিলা’! খবর আছে এ-সবের? বঙ্গদর্শন ছিল মাসিক পত্রিকা, অন‌্যদিকে বঙ্গমহিলা পাক্ষিক।
এইসব মাথায় রেখেই আমরা বাংলার প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতী সম্পর্কে আলোচনা করব।

চন্দ্রাবতী: জীবনকথা

চন্দ্রাবতী জন্মেছেন বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার‌ কিশোরগঞ্জে, যেটি বর্তমানে বাংলাদেশের একটি স্বতন্ত্র জেলা। তাঁর ‌জন্ম ১৫৫০-এ। মায়ের‌ নাম সুলোচনা এবং পিতা দ্বিজ বংশীদাস। তাঁর পিতামহী অঞ্জনা, পিতামহ যাদবানন্দ। ফুলেশ্বরী নদী-সন্নিকটস্থ পাতোয়াইর তাঁর জন্মের গ্রাম, যেটি এখন মাইজথাপন ইউনিয়নের অন্তর্গত।
ময়মনসিংহ এবং কিশোরগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরেই ঐতিহ্য, ইতিহাস আর সারস্বত সাধনার‌ জায়গা।‌ এদেশ যেমন নদী-হাওর-ঐতিহাসিক স্থাপনার‌ ও পাহাড়ের দেশ, তেমনই এখানকার মানুষের মেধাতালিকাও সুবিশাল। বারো ভুঁইয়ার একজন, ঈশা খাঁ ছিলেন কিশোরগঞ্জের। তিনি চন্দ্রাবতীর সমসাময়িক-ও বটেন। ময়মনসিংহ গীতিকা বাংলা সাহিত্যের এক চিরায়ত বিস্ময়, যেখানে কবির পর কবি যুগের পর যুগ ধরে মানুষের বিচিত্র সুখদুঃখবেদনা, প্রেম ও বিরহের আখ‌্যান‌ লিখে রেখে গেছেন।‌ কেবল বাংলা সাহিত্যের নয়, পৃথিবীর বহু ভাষায় অনূদিত ও চর্চিত হয়ে‌ এখন তা বিশ্বসাহিত্যের চিরায়ত সম্পদরূপে গণ্য।

চন্দ্রাবতীর বাবা ছিলেন‌ একজন কবি।‌ তাঁর খ্যাতি মূলত মনসামঙ্গল রচনার জন্য। মনসামঙ্গলের অন্য এক কবি বরিশালের বিজয়গুপ্ত ‌ছিলেন এক-ই সময়ের লোক। দু’জনের কাব্য‌ই সমাদৃত, এবং সুধীমহলে আজ-ও চর্চিত হয়ে থাকে। দ্বিজ‌ বংশীদাস মনসার ভাসান গাইতেন। তাতে যে অর্থ পেতেন, কায়ক্লেশে দিন চলে যেত। নিতান্তই দারিদ্র্যপীড়িত ছিল তাঁদের সংসার। লোকশ্রুতি বলে, মনসার আরাধনা করতেন বলেই নাকি লক্ষ্মীদেবী তাঁর ওপর বিরূপা!

এহেন পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন চন্দ্রাবতী। পিতা তাঁকে কিছু পড়াশোনাও শিখিয়েছিলেন। ‌সে-যুগে নারীশিক্ষার কোনও ব্যবস্থা ছিল না।‌ দৈবাৎ দু-একজনের ভাগ্যে শিক্ষালাভের সুযোগ ঘটে যেত।

চন্দ্রাবতী ছাড়া আর মাত্র যে দু’জন নারীকবির‌ নাম জানি আমরা, তাঁদের মধ্যে একজনের নাম মাধবী। তিনি ছিলেন শ্রীচৈতন্যের কৃপাপাত্রী। পুরীর জগন্নাথ বল্লভ উদ্যানের সেবিকা শিখী মাহাতীর বোন এই মাধবীর পাণ্ডিত্যের খ্যাতি ছিল। ড. সুকুমার সেনের মতে তিনি ছিলেন বাঙালি। যদিও সকল‌ সাহিত্য-ঐতিহাসিক এতে একমত নন। তাঁর বেশ‌ কিছু বৈষ্ণবপদ পাওয়া গিয়েছে। তাছাড়া বৈষ্ণবপদকর্তা চণ্ডীদাসের সাধনসঙ্গিনী রামী বা রামাবতীর-ও কিছু পদ পাওয়া গিয়েছে। এঁদের বাইরে সমগ্র মধ্যযুগে নারী-কবির অস্তিত্ব জানা যায় না।
চন্দ্রাবতী দেবপূজা ও জ্ঞানচর্চা নিয়ে থাকতেন।‌ তাঁর জীবনকাহিনি ময়মনসিংহ গীতিকার-ই একটি পালায়‌ পাই আমরা। লেখকের‌ নাম নয়নচাঁদ ঘোষ। এটি যে সার্বিকভাবে সত্য ঘটনাশ্রিত, তা হয়তো নয়। তবে কাহিনির বয়ান সম্ভবত উপেক্ষা করার‌ মতো নয়। শৈশবে তাঁর বাল্যসখা ছিলেন জয়ানন্দ। ‌দু’জনে ‘ভোরের বেলা ফুল তুলেছি, দুলেছি দোলায়/ বাজিয়ে বাঁশি গান গেয়েছি বকুলের তলায়’! দু’জনে কাব্যচর্চাও নাকি করতেন, বেড়াতেন‌ ফুলেশ্বরী নদীপারে। এই করে উভয়ের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রণয় জন্মায়। এখানে এসে যেন‌ বঙ্কিমচন্দ্রের ‘চন্দ্রশেখর’ পাঠ করি আমরা এভাবে, লেখকের‌ একটি মহাবাক্যকে মাথা থেকে ‌মুছে ফেলে, ‘বাল্যকালের ভালোবাসায় বুঝি কিছু অভিসম্পাত আছে।’

চন্দ্রাবতীর পিতাও উভয়ের বিয়ে চেয়েছিলেন। দিনক্ষণ ঠিক হল। কিন্তু নাটকীয়ভাবে বিয়ের আসরে পাত্র গরহাজির। জানা গেল, জয়ানন্দ আসমানি বলে এক মুসলমান মেয়ের প্রেমে পড়েছেন নাকি, এবং সেই রাতেই ইসলাম গ্রহণ করে বিয়ে করেছেন আসমানিকে। জয়ানন্দ এখন জয়নাল। আসমানির পিতা একজন কাজি।

এমন শোকাবহ ঘটনায়ও চূড়ান্ত ভেঙে পড়েন‌নি চন্দ্রাবতী। তিনি তাঁর আরাধ্য শিবের পূজা আর সারস্বত জীবন কাটানোর সঙ্কল্প নেন। কথিত আছে, ফুলেশ্বরী নদীতীরে তাঁর সেই শিবমন্দিরটি আজ-ও নাকি কালের বাধা উপেক্ষা করে বর্তমান।

চন্দ্রাবতীর জীবনের যেটি শ্রদ্ধেয় দিক, তা হল গরলকে অমৃতে পরিণত করা। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোককে কাটিয়ে উঠে একাগ্রতা নিয়ে পঠনপাঠন‌ ও সৃষ্টিকর্মে মন দেন। পিতাকে সহায়তা করেন কাব্যরচনায়। ১৫৭৫ নাগাদ, যখন চন্দ্রাবতীর বয়স মাত্র পঁচিশ, সেসময় তিনি পিতার লেখা মনসার ভাসান-এ সহযোগিতা করেছিলেন। তারপর একের পর এক নিজস্ব রচনায় ভাস্বর হয়ে থাকে তাঁর কারুবাসনা।
কিন্তু আমরা সে-প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে তাঁর জীবনের বাকি ঘটনাগুলো বলে নিতে চাই।
জয়ানন্দ, এখন যিনি জয়নাল, আসমানিকে বিয়ে করে সুখী হতে পারেননি। অনুতাপে দগ্ধ জয়নাল চন্দ্রাবতীর কাছে আসেন তাঁর কাছে ক্ষমা চাইতে। ‌দুয়ার রুদ্ধ, দরজায় করাঘাত করলেও দরজা খোলেন‌নি অভিমানাহত চন্দ্রাবতী। জয়নাল এমনকি তাঁকে বিয়ে পর্যন্ত করতে চান। চন্দ্রাবতী উত্তরহীন। অবশেষে জয়নাল মাধবী ফুলের নির্যাস দিয়ে চিঠি লেখেন তাঁর কৈশোর-প্রেমিকাকে, যা অনুশোচনা আর প্রায়শ্চিত্তপ্রয়াসের যুগলবন্দী যেন, ‘অমৃত ভাবিয়া আমি খাইয়াছি গরল।/ কণ্ঠেতে লাগিয়া ব‌ইছে কাল‌ হলাহল।।/ পাপিষ্ঠ জানিয়া মোরে না হ‌ইলা সম্মত।/ বিদায় মাগি চন্দ্রাবতী জনমের মতো।’

হ্যাঁ, আক্ষরিক অর্থেই ‘জনমের মতো’। এর পর তিনি ক্ষমাপ্রার্থনা করে লেখেন, ‘শৈশবকালের সঙ্গী তুমি যৈবনকালের‌ সাথী।/ অপরাধ‌ ক্ষমা করো তুমি চন্দ্রাবতী।।’ এ লেখা লিখে তিনি চলে গেলেন ফুলেশ্বরীর পাড়ে। নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করলেন। শোনা যায়, এ খবর শুনে নদীতীরে এসে চন্দ্রাবতী তার একদা-প্রেমিক জয়ানন্দকে মৃত দেখতে পান। এবং তিনিও মারা যান। হয় নদীতে ডুবে, নয়তো অতিরিক্ত শোকে। আত্মহত্যা ও কাহিনির মিল বাদ দিয়েও কেন যেন এখানে রাধাকৃষ্ণের প্রেম ও বিচ্ছেদের সুর পাই। পাই মীর মশাররফ হোসেনের জীবনে আজিজ-উন-নেসার আগমনে মীরের বেদনায় দগ্ধ হ‌ওয়ার সমরৈখিকতা।

চন্দ্রাবতীর জীবনী আলোচিত হয়েছে প্রচুর । তাঁকে ‌নিয়ে প্রবন্ধ রচনা, গবেষণা হয়েছে দুই বঙ্গ মিলিয়ে খুব কম নয়। নয়নচাঁদ ঘোষ তো সে যুগেই তাঁকে ‌নিয়ে পালা লিখেছেন, যার ভিত্তিতে এ-যুগে রাশেদ চৌধুরী ‘চন্দ্রাবতীকথা’ নামে চলচ্চিত্র তৈরি করেন ২০১৫-তে। দীনেশচন্দ্র সেন ও ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক, দু’জনের সম্পাদিত ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’-তেই নয়নচাঁদের পালা স্থান পেয়েছে। এ যুগে পাই বিজয়কান্তি দাশ-বিরচিত চন্দ্রাবতীর পালা। প্রখ্যাত পালাকার ব্রজেন দে-রও তাঁকে ‌নিয়ে যাত্রাপালা রয়েছে। ইতিহাসবিদ চন্দ্রকুমার দে ১৯১৩ সালে চন্দ্রাবতীকে নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছিলেন কেদারনাথ মজুমদার সম্পাদিত ‘সৌরভ’ পত্রিকায়।‌ এর ফলে বিদ্বজ্জনদের মধ্যে চন্দ্রাবতীর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তাঁকে ‌নিয়ে অন্যান্য আলোচকদের মধ্যে রয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক সুস্মিতা চক্রবর্তী। কবি-ঔপন্যাসিক-গবেষক নবনীতা দেবসেন-ও চন্দ্রাবতীকে নিয়ে সারবান লেখা লিখেছেন। তাঁকে ‌নিয়ে রচিত হয়েছে একাধিক নাটক। সব মিলিয়ে আজকের অনুসন্ধিৎসু পাঠক তাঁর সম্পর্কে আশানুরূপ জ্ঞানলাভে সমর্থ।

তাঁকে ‌নিয়ে কুষ্টিয়ার ‘বোধন’ গোষ্ঠীর নাটক বাংলাদেশের জেলায় জেলায় অভিনীত হয়েছে। ‌আরও বহু নাট্যদল তাঁর জীবনী-অবলম্বনে নাটক লিখে তা অভিনয়ের মাধ্যমে দলকে ও যুগপৎ কবিকে খ্যাতি এনে দিয়েছেন। পৃথিবীর একুশটির মতো‌ ভাষায় অনূদিত হয়েছেন তিনি। তাইতেই চন্দ্রাবতীর মনীষার পরিচয় কিছুটা পাওয়া যেতে পারে।

আছে তাঁর নামে মন্দির, নিজ গ্রামে। অষ্টকোণাকৃতি সে মন্দির এগারো মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট। আট কোণের প্রতিটির বাহু ১.৭ মিটার করে। দেশ-বিদেশের বহু পর্যটক সেই মন্দির দেখতে যান কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য।

চিত্র: চন্দ্রাবতী মন্দির

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twelve + nine =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বঙ্গের প্রথম নারীকবি চন্দ্রাবতী

চন্দ্রাবতীর জীবনের যেটি শ্রদ্ধেয় দিক, তা হল গরলকে অমৃতে পরিণত করা। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোককে কাটিয়ে উঠে একাগ্রতা নিয়ে পঠনপাঠন‌ ও সৃষ্টিকর্মে মন দেন। পিতাকে সহায়তা করেন কাব্যরচনায়। ১৫৭৫ নাগাদ, যখন চন্দ্রাবতীর বয়স মাত্র পঁচিশ, সেসময় তিনি পিতার লেখা মনসার ভাসান-এ সহযোগিতা করেছিলেন। তারপর একের পর এক নিজস্ব রচনায় ভাস্বর হয়ে থাকে তাঁর কারুবাসনা।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইসলাম

হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি ‌বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের‌ সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়‌ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।

Read More »
তপোমন ঘোষ

কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে…

হঠাৎ চোখ পড়ে বুথের এক্সিট দরজাটার দিকে… একটা ছোট্ট ছায়া ঘোরাফেরা করছে! চমকে উঠে সে দেখে, সেই বাচ্চাটা না! মায়ের কোলে চড়ে এসেছিল… মজা করে পোলিং অফিসার তার ছোট্ট আঙুলে লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভোটের কালি। হুড়োহুড়িতে মা ছিটকে গেছে কোথাও— নাকি আরও খারাপ কিছু! বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে তার। শুনশান বুথে পোলিং আর সেক্টর অফিসার গলা যথাসম্ভব নিচুতে রেখে ডাকতে থাকেন বাচ্চাটাকে। একটা মৃদু ফোঁপানি… একটা হালকা ‘মা মা’ ডাক— বাচ্চাটা এইসব অচেনা ডাকে ভ্রূক্ষেপও করে না, এলোমেলো পায়ে ঘুরতে থাকে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধ: অন্ধকারে আলোর দিশারী

তিনি বলেন গেছেন, হিংসা দিয়ে হিংসাকে জয় করা যায় না, তাকে জয় করতে প্রেম ও ভালবাসা দিয়ে। মৈত্রী ও করুণা— এই দুটি ছিল তাঁর আয়ুধ, মানুষের প্রতি ভালবাসার, সহযোগিতার, বিশ্বপ্রেমের। তাই তো তাঁর অহিংসার আহ্বান ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে,— চীন, জাপান, মায়ানমার, তিব্বত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটানে। এই বাংলায় যে পালযুগ, তা চিহ্নিত হয়ে আছে বৌদ্ধযুগ-রূপে। সুদীর্ঘ পাঁচ শতাব্দী ধরে সমগ্র বাংলা বুদ্ধ-অনুশাসিত ছিল। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ বৌদ্ধ কবিদের দ্বারাই রচিত হয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

স্যার রোনাল্ড রস, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য

রোনাল্ড রসকে তাঁর গবেষণার সহায়তাকারী এক বিস্মৃত বাঙালি বিজ্ঞানীর নাম কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৭-১৯২৯)। তাঁর অবদান কিন্তু খুব কম নয়। তিনি ছিলেন রস-এর অধীনে সহ-গবেষক। রস নোবেল পেলে উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর নেতৃত্বে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, শিবনাথ শাস্ত্রী, আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ কিশোরীনাথের ভূমিকার বিষয়টি বড়লাট লর্ড কার্জনকে জানান। কার্জন এ-বিষয়টি ব্রিটিশ সরকারের গোচরে আনেন। এর ফলে ১৯০৩ সালে যখন দিল্লিতে দরবার বসে, তখন ডিউক অফ কনট-এর মাধ্যমে কিশোরীনাথকে ব্রিটিশরাজ সপ্তম এড‌ওয়ার্ড-এর তরফ থেকে স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। পরে কলকাতা
র সেনেট হলে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সভাপতি ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ।

Read More »