Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

বুদ্ধ: অন্ধকারে আলোর দিশারী

‘শান্ত হে, মুক্ত হে, হে অনন্তপুণ্য,/ করুণাঘন, ধরণীতল কর কলঙ্কশূন্য।’— রবীন্দ্রনাথের এই আর্তি আজ একুশ শতকের দ্বিতীয় পাদে এসে আরও তীব্রতর অনুরণন তুলছে। একদিকে জলে স্থলে অন্তরীক্ষে মানুষের অভাবিত সাফল্য, মহাকাশ জয় থেকে শুরু করে একের পর এক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মাধ্যমে সভ্যতার উচ্চতর শিখরের পর শিখরে পৌঁছচ্ছে সে— আবার তার মারণাস্ত্র, যুদ্ধ, হানাহানি, প্রকৃতি-বিরুদ্ধতা, রাজনীতির নামে দেশে দেশে মানব-বৈরিতা— এ কোন ভবিষ্যৎ গড়তে চলেছে সে? আমাদের ভাষার এক কবি, চণ্ডীদাস, আজ থেকে কত শতাব্দী আগেই তো বলে গিয়েছেন, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’— আর আজ তাঁর সেই বাণীকে আমরা পদদলিত করে চলেছি ইরান‌ আর সুদানে, ফিলিস্তিনে, ক্রোয়েশিয়ায়,‌ আরও কত জায়গায়! এসময়ে মহাপ্রাণ বুদ্ধের জীবন ও বাণী আমাদের কাছে পরম ঔষধি হয়ে দেখা দিতে পারে।
আজ থেকে আড়াই হাজার বছরেরও আগে জন্মেছিলেন এই মহামানব, যিনি তাঁর অহিংসা আর মৈত্রীর উপদেশ দিয়ে মানুষকে দীক্ষা দিয়ে গেছেন‌ শাশ্বত মনুষ্যত্বলাভ এবং মৈত্রীর বিশ্ব গড়বার। তিনি বলেন গেছেন, হিংসা দিয়ে হিংসাকে জয় করা যায় না, তাকে জয় করতে প্রেম ও ভালবাসা দিয়ে। মৈত্রী ও করুণা— এই দুটি ছিল তাঁর আয়ুধ, মানুষের প্রতি ভালবাসার, সহযোগিতার, বিশ্বপ্রেমের। তাই তো তাঁর অহিংসার আহ্বান ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে,— চীন, জাপান, মায়ানমার, তিব্বত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটানে। এই বাংলায় যে পালযুগ, তা চিহ্নিত হয়ে আছে বৌদ্ধযুগ-রূপে। সুদীর্ঘ পাঁচ শতাব্দী ধরে সমগ্র বাংলা বুদ্ধ-অনুশাসিত ছিল। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ বৌদ্ধ কবিদের দ্বারাই রচিত হয়েছে।
বুদ্ধ সম্পর্কে বাংলার কবি জয়দেব তাঁর ‘গীতগোবিন্দম্’-এ একটি তাৎপর্যপূর্ণ উক্তি করেছেন, ‘নিন্দসি যজ্ঞ’— তিনি যজ্ঞকে নিন্দা করতেন, অপছন্দ করতেন। কেন? তার কারণ হল, বৈদিক ব্রাহ্মণ্যশাসিত ভারতবর্ষে যাগযজ্ঞের মাধ্যমে, গোদান ও পশুবলির মাধ্যমে চলত জীব-হিংসার প্রাবল্য, এবং সেইসঙ্গে অযথা অর্থব্যয়। গোদানের‌ গতানুগতিকতা ও করুণ দিকটি কঠোপনিষদে, যা ব্রাহ্মণ্যযুগেই রচিত, নচিকেতার একটি উক্তির‌ মধ্যে ব্যক্ত হয়েছে দেখতে পাই। নচিকেতার পিতা বাজশ্রবা ‘বিশ্বজিৎ’ যজ্ঞ করছেন। নচিকেতা এই যজ্ঞের আচারসর্বস্বতা দেখে ব্যথিত হয়ে বলছেন, ‘পীতোদকা জগ্ধতৃণা দুগ্ধদোহা নিরিন্দ্রিযাঃ।/ অনন্দা নাম তে লোকাস্তান্ স গচ্ছতি তা দদৎ।।’ অর্থাৎ, যে-সব গোরু জন্মের মতো জলপান করেছে, তৃণভক্ষণ করেছে, দুধ দিয়েছে এবং ইন্দ্রিয়রহিত হয়েছে, যে লোক এরকম গোরু দান করে, সে অনন্দলোক, অর্থাৎ দুঃখলোকে গমন করে।

বুদ্ধদেব তাই মানবমৈত্রীতে আস্থাবান। তাঁর মহাপরিনির্বাণের দুশো‌ বছর পর যাঁর জন্ম, তিনি চণ্ডাশোক থেকে পরিণত হন ধর্মাশোকে।‌ বুদ্ধের বাণী তিনি ছড়িয়ে দিলেন মিশর, সিলোন, সিরিয়া, ম্যাসিডোনিয়া, লিবিয়া, থাইল্যান্ডে। এই ‘ধর্মযাত্রা’ অশোককে অনন্যতা‌ দিয়েছে। তাঁর শিলালিপিতে তিনি বলেছেন, ‘সবে‌ মনিসে‌ পজা মম’ অর্থাৎ সমস্ত মানুষ-ই আমার সন্তান। ‌তৃতীয় বৌদ্ধ সঙ্গীতির আয়োজন‌ করে তিনি বুদ্ধবাণীর সম্প্রসারণ ও বিশুদ্ধতার বাহক হয়ে ওঠেন। বুদ্ধ গৃহীত, ব্যাপ্ত‌ ও‌ সম্প্রসারিত হলেন অশোকের মাধ্যমে।
প্রখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পালি ভাষার প্রাক্তন প্রধান ডা. বেণীমাধব বড়ুয়া বুদ্ধের দর্শনকে বলেছেন ‘Philosophy of Progress’। বিখ্যাত বৌদ্ধ-গবেষক রিজ ডেভিস (Thomas William Rhys Davids) তাঁর ‘Wayfarer’s Words’ গ্রন্থে বুদ্ধকে ‘অন্ধকারে আলোর দিশারী’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর স্ত্রী Carolina Augustus Foley Rhys Davids-ও ছিলেন একজন বুদ্ধ-বিশেষজ্ঞ ও পালিভাষা থেকে বেশ কিছু গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদক। স্বামী-স্ত্রী মিলে তাঁরা অধ্যাপনা ও গ্রন্থনার মাধ্যমে বুদ্ধদেবকে পাশ্চাত্যে পরিচিত করিয়েছেন।

আর রবীন্দ্রনাথ-বিবেকানন্দ, উভয়েই ছিলেন বুদ্ধদেবের প্রতি অনন্ত শ্রদ্ধাশীল। রবীন্দ্রনাথের বহু রচনা বৌদ্ধ জাতক ও অন্যান্য কাহিনিকে ভিত্তি করে লেখা। ‘শ্যামা’ গীতিনাট্যের কথা এ-প্রসঙ্গে মনে পড়বে। তাছাড়া সারাজীবন তিনি বুদ্ধদেবকে নিয়ে যা লিখে গেছেন, ব‌ই আকারে আলাদাভাবে তা বেরিয়েছে। রবীন্দ্রনাথের মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর বুদ্ধদেবের জীবন ও বাণী নিয়ে ব‌ই লিখেছেন। নবীনচন্দ্র সেন লিখেছেন মহাকাব্য, ‘অমিতাভ’। ঈশানচন্দ্র ঘোষ দীর্ঘ ছ’খণ্ডে মূল পালি থেকে ‘জাতক’ অনুবাদ করেছেন। আর ম্যাক্সমুলার ত্রিপিটকের বহুলাংশেরই অনুবাদ করেছেন তাঁর সম্পাদিত ‘The Sacred Books of the East’-এ।

বুদ্ধদেব নিয়ে দেশে-বিদেশে প্রতিনিয়ত চর্চা হয়ে চলেছে। এই উপমহাদেশে তক্ষশিলা, নালন্দা, সোমপুরী, বিক্রমশীলা, মোগলমারী ইত্যাদি বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছে হাজার হাজার বছর ধরে। শান্তি রক্ষিত, কমল শীল, অতীশ দীপঙ্কর প্রমুখ অজস্র বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে তিব্বত যান সেদেশে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে।
পৃথিবীতে ৫২ কোটির মতো বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের বাস।‌ খ্রিস্টান, মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের পরেই তাঁদের স্থান। চীন, মায়ানমার, কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, লাওস, নেপাল ও ভুটানে, জাপান ও ভারতে সবচেয়ে বেশি বৌদ্ধদের বাস। বাংলাদেশেও ২০১১-র আদমশুমারি অনুযায়ী, দশ লক্ষাধিক বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বসবাস। সারা ইওরোপ-আমেরিকাতেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন তাঁরা। ইংল্যান্ড, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, হাঙ্গেরি, স্পেন ইত্যাদি দেশে মূলত তাঁদের বসবাস‌। উল্লেখ্য, ২০১০-২০২০ কাল পর্বে ইওরোপে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা শতকরা ছাব্বিশ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে।
শান্তির বিশ্ব গড়ে তোলার জন্য বুদ্ধদেবকে অনুসরণ করা জরুরি। তাঁর বাণী যেন আমাদের পথ দেখায়।

চিত্র: আফগানিস্তানের বামিয়ান উপত্যকায় ৬ শতকের বিশাল বুদ্ধমূর্তি, ২০০১ সালে তালিবানরা ধ্বংস করার আগে পর্যন্ত দাঁড়িয়ে ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty + 7 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »
সালমিন রহমান

বেলুচিস্তান সংকট মোকাবিলা কতটা সহজ

বেলুচিস্তানের সংকটকে কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদ কিংবা কেবল নিরাপত্তা সমস্যার দৃষ্টিতে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি বোঝা যায় না। এখানে ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, প্রাকৃতিক সম্পদ, উন্নয়ন বৈষম্য, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা— সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্বাধীন বেলুচিস্তান গঠিত হলে বহু মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে পারে। একই সঙ্গে একটি নতুন রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াবে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা। অন্যদিকে, পাকিস্তান, চীন, ভারত এবং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও দুই বিখ্যাত বাঙালি

কী অসাধারণ শিক্ষাই না আমরা পেতে পারি, উৎসাহিত হয়ে পারি খেলোয়াড়দের থেকে! একটি উদাহরণ: প্রথম বিশ্বকাপে সোনাজয়ী উরুগুয়ে দলে ছিলেন হেক্টর কাস্ত্রো। তেরো বছর বয়সে মেশিনে তাঁর ডানহাত কাটা পড়েছিল। অদম্য উৎসাহে তিনি ফুটবল খেলেছেন, জাতীয় দলে স্থান করে নিয়েছেন, আর ফাইনালে জয়সূচক গোলটিও তাঁর-ই করা! তাঁর স্বদেশবাসী তাঁকে ডাকতেন— ‘এল ডিভিনো মানকো’, অর্থাৎ একহাত-বিশিষ্ট ঈশ্বর।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আমেরিকার স্বাধীনতা: আড়াইশো বছর

১৬০৭ থেকে ১৭৮৩ পর্যন্ত সময়কাল আমেরিকায় ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক রাজত্ব। আজকের দিনে যে আমেরিকা, তা কিন্তু পুরোটা ব্রিটিশদের দখলে ছিল না। ছিল ভার্জিনিয়া, ম্যাসাচুসেটস, নিউ ইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া-সহ ১৩টি রাজ্য। আর কানাডার বেশ কিছু অঞ্চল। আমেরিকার অন্যান্য স্থানে ফরাসি, ডাচ, নরওয়েজিয়, সুইডিস উপনিবেশ-ও ছিল। তাছাড়া রাশিয়া আমেরিকার আলাস্কা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত দখল করে। পরে সে আলাস্কা আমেরিকার কাছে বিক্রিও করে দেয়।

Read More »
অপরাজিতা মৈত্র

গোদাবরীর গোমুখে

গঙ্গার মর্ত্যে আগমন নিয়ে যেমন ভগীরথের গল্প, তেমনই গোদাবরীর উৎসস্থলে না এলে জানা যেত না, দক্ষিণের গঙ্গা নিয়েও আছে হাজার গল্প। যে গল্প জানাবে আজও এই অঞ্চলের মানুষ অনেক সময়েই কাছাকাছি আর কোনও পানীয়জল না পেয়ে কষ্ট করে হলেও এই উৎসস্থলে এসেই শীতল এই পানীয়জল নিয়ে যান নিজেদের কাজের জন্য। গঙ্গা বা অন্য নদী সে শুধু ধার্মিক আবেগের কারণে পবিত্র না, হাজার প্রাণীর ‘তৃষ্ণা’ মেটাবার জন্য সে হয়ে ওঠে ‘দেবী’ বা ‘পবিত্র’। সে পথে মিশে যায় হাজার গল্প-কষ্ট কিংবা দিনযাপনের চরম বাস্তবতা।

Read More »