Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে…

‘আমাদের হাতে পায়ে মাঠঘাটের কাদা, মুখে মঞ্চের আলো, আঙুলে ভোটের কালি। দূর থেকে দেখি, আমাদের ধর্ম আর রাজনীতি অধর্মের পা ধরে আছে।’ [উপন্যাস ‘ত্রিস্তর’ (২০০৮)/ রাজর্ষি দাশভৌমিক]
ওই যে তরুণ, শুয়ে আছে বিডিও অফিসের সরু বেঞ্চে, যার ব্যান্ডেজবাঁধা মাথা সদ্যবাঁধা বোমার মতো— ও টেবিলে টেবিলে চা দেওয়ার অর্ডারটা পেয়েছিল… ওই যে মাস্টারমশাই, প্রিসাইডিং অফিসার যাঁর নাম, ভোটের ডিউটিতে বেরোনোর আগে আট বছরের মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বারবার সেলফি নিতে থাকেন; কিংবা ওই যে মুখে গামছা জড়ানো মাঝবয়সি, নিরাসক্ত ভঙ্গিতে খইনি ডলতে ডলতে যিনি বলেন— ‘বলে দিয়েছে, ইশারা করলে ভিড়ের দিকে আটটা ফায়ার করতে হবে। দু’নম্বরি মুঙ্গেরি তামাঞ্চা… তিন রাউন্ডের পর এমন গরম হয়ে যায়, হাতে ধরে রাখা যায় না। ফেটে গেলে আমিও মরতে পারি— কী করে বলব কার গায়ে লাগবে? এর জন্য পাঁচ হাজার দিবে— ছেলেটার কিডনির অসুখ, রাজি না হয়ে উপায় কী?’ এরা সবাই সেই বিয়োগান্তক নাটকের কুশীলব, যার সুতো ধরা আছে রাষ্ট্রের হাতে।
ইংরাজিতে ‘এক্সলটেশন অফ এন্ডস ওভার মিনস’ বলে একটা কথা আছে— এখানে সবাই এক বিরাট চক্রের অংশ হিসাবে সেই শেষটা দেখার অপেক্ষাই করে চলেছে, তার পদ্ধতিটা নিয়ে কেউ ভাবিত নয়। এই না-ভাবনার জগতে হারিয়ে যাওয়াটুকুই আমাদের সঙ্গী থেকে যায়।
তিনটে পোলিং বুথ একই স্কুল ক্যাম্পাসের মধ্যে। বোমাটা ফাটানো হয়েছিল মাঝখানের ফাঁকা মাঠে। কাউকে আঘাত করা নয়, ভিড় কাটিয়ে দেওয়াই ছিল প্রধান লক্ষ্য। অন্যান্য ভোটকর্মীর সঙ্গে সেও দরজার আড়ালে আশ্রয় নিয়েছিল। সঙ্গে থাকা দিশেহারা নিরাপত্তারক্ষীটি ততক্ষণে প্রায় শাসানির সুরে পরিষ্কার বলে দিয়েছে, ‘স্যর, নিজেরা নিজেরা ম্যানেজ করবেন। কোনও ঝামেলায় আমায় ডাকবেন না।’ সে বোঝে, কিছু কিছু ক্রোধ ভয় আর অসহায়তা থেকেই আসে। তার ফোন ঘনঘন বেজে চলে— সে অসহায়ভাবে নিজের অক্ষমতাটুকু জানিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছু করতে পারে না। ফুল, ফল, নৈবেদ্যর সামনে পাথরের মূর্তি যেমন অসহায়— সে জানে তার পুজো হবে; কিন্তু শোকতাপটুকু শুনে যাওয়া ছাড়া সে আর কিচ্ছুটি তার হাতে নেই! সে গালভরা নামের সেক্টর অফিসার— সে নৈবেদ্যর ওপরের দুর্গামণ্ডা— কোনও কাজে লাগে না, তবু তাকে রাখা হয়; তাকেও অবহেলার ফুল ছুড়ে দেওয়া হয়।
হঠাৎ চোখ পড়ে বুথের এক্সিট দরজাটার দিকে… একটা ছোট্ট ছায়া ঘোরাফেরা করছে! চমকে উঠে সে দেখে, সেই বাচ্চাটা না! মায়ের কোলে চড়ে এসেছিল… মজা করে পোলিং অফিসার তার ছোট্ট আঙুলে লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভোটের কালি। হুড়োহুড়িতে মা ছিটকে গেছে কোথাও— নাকি আরও খারাপ কিছু! বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে তার। শুনশান বুথে পোলিং আর সেক্টর অফিসার গলা যথাসম্ভব নিচুতে রেখে ডাকতে থাকেন বাচ্চাটাকে। একটা মৃদু ফোঁপানি… একটা হালকা ‘মা মা’ ডাক— বাচ্চাটা এইসব অচেনা ডাকে ভ্রূক্ষেপও করে না, এলোমেলো পায়ে ঘুরতে থাকে।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁর ‘কলকাতার যিশু’ কবিতায় কলকাতার ব্যস্ত ট্র্যাফিককে স্তব্ধ করে রেখে একটি উলঙ্গ শিশুর রাস্তা পার হওয়াকে বাংলা সাহিত্যে অমর করে রেখেছেন। সেখানে সদ্য হাঁটতে শেখার আনন্দে সমগ্র বিশ্বকে হাতের মুঠোয় পাওয়ার বিশ্বাসটুকু নিহিত ছিল। আর এই মেঘচাপা শ্রাবণের দুপুরে, বুথের ‘বাহির’ লেখা দরজা দিয়ে শিশুটির একাকী বেরিয়ে আসা… এ তো আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়ানো, তবে তাতে বুকের মাঝে কোন বিশ্বলোকের সাড়া নেই। সরকার আর দল যখন এক হয়ে যায়, তখন সিস্টেমের নির্লজ্জ নিষ্ঠুরতা আর প্রতিকারহীন স্বার্থপরতা গণতন্ত্রকে,স্বাধীন মত প্রকাশের ন্যূনতম অধিকারকে এভাবেই দরজা দেখিয়ে দেয়।
ছোট মানুষ সিল্যুয়েটে দীর্ঘ ছায়া ফেলে গুটিগুটি পায়ে দরজা পার হয়ে বারান্দার দিকে এগোতে থাকে— বাইরে পলায়নরত পায়ের শব্দকে ঢেকে দেয় সেন্ট্রাল ফোর্সের ভারি বুটের আওয়াজ। মারামারি, বুথ জ্যাম, ছাপ্পা, রক্তপাত আর হিংসার ছবিতে তার মেমোরি উপচীয়মান— এতক্ষণে একটা মনমতো ফ্রেম তার সামনে পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনার মতো হাজির হয়! সন্তর্পণে মোবাইল বের করে ক্যামেরা তাক করে সে…

চিত্র: লেখক

Advertisement

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thirteen + 13 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »
সালমিন রহমান

বেলুচিস্তান সংকট মোকাবিলা কতটা সহজ

বেলুচিস্তানের সংকটকে কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদ কিংবা কেবল নিরাপত্তা সমস্যার দৃষ্টিতে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি বোঝা যায় না। এখানে ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, প্রাকৃতিক সম্পদ, উন্নয়ন বৈষম্য, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা— সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্বাধীন বেলুচিস্তান গঠিত হলে বহু মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে পারে। একই সঙ্গে একটি নতুন রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াবে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা। অন্যদিকে, পাকিস্তান, চীন, ভারত এবং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও দুই বিখ্যাত বাঙালি

কী অসাধারণ শিক্ষাই না আমরা পেতে পারি, উৎসাহিত হয়ে পারি খেলোয়াড়দের থেকে! একটি উদাহরণ: প্রথম বিশ্বকাপে সোনাজয়ী উরুগুয়ে দলে ছিলেন হেক্টর কাস্ত্রো। তেরো বছর বয়সে মেশিনে তাঁর ডানহাত কাটা পড়েছিল। অদম্য উৎসাহে তিনি ফুটবল খেলেছেন, জাতীয় দলে স্থান করে নিয়েছেন, আর ফাইনালে জয়সূচক গোলটিও তাঁর-ই করা! তাঁর স্বদেশবাসী তাঁকে ডাকতেন— ‘এল ডিভিনো মানকো’, অর্থাৎ একহাত-বিশিষ্ট ঈশ্বর।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আমেরিকার স্বাধীনতা: আড়াইশো বছর

১৬০৭ থেকে ১৭৮৩ পর্যন্ত সময়কাল আমেরিকায় ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক রাজত্ব। আজকের দিনে যে আমেরিকা, তা কিন্তু পুরোটা ব্রিটিশদের দখলে ছিল না। ছিল ভার্জিনিয়া, ম্যাসাচুসেটস, নিউ ইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া-সহ ১৩টি রাজ্য। আর কানাডার বেশ কিছু অঞ্চল। আমেরিকার অন্যান্য স্থানে ফরাসি, ডাচ, নরওয়েজিয়, সুইডিস উপনিবেশ-ও ছিল। তাছাড়া রাশিয়া আমেরিকার আলাস্কা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত দখল করে। পরে সে আলাস্কা আমেরিকার কাছে বিক্রিও করে দেয়।

Read More »
অপরাজিতা মৈত্র

গোদাবরীর গোমুখে

গঙ্গার মর্ত্যে আগমন নিয়ে যেমন ভগীরথের গল্প, তেমনই গোদাবরীর উৎসস্থলে না এলে জানা যেত না, দক্ষিণের গঙ্গা নিয়েও আছে হাজার গল্প। যে গল্প জানাবে আজও এই অঞ্চলের মানুষ অনেক সময়েই কাছাকাছি আর কোনও পানীয়জল না পেয়ে কষ্ট করে হলেও এই উৎসস্থলে এসেই শীতল এই পানীয়জল নিয়ে যান নিজেদের কাজের জন্য। গঙ্গা বা অন্য নদী সে শুধু ধার্মিক আবেগের কারণে পবিত্র না, হাজার প্রাণীর ‘তৃষ্ণা’ মেটাবার জন্য সে হয়ে ওঠে ‘দেবী’ বা ‘পবিত্র’। সে পথে মিশে যায় হাজার গল্প-কষ্ট কিংবা দিনযাপনের চরম বাস্তবতা।

Read More »