রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে একমাত্র মহাবাহু মহীরুহের তুলনাই সম্ভব। শিল্প-সাহিত্য, আন্তর্জাতিকতা, রাজনীতি-ইতিহাস-অর্থনীতি, কোনও কিছুতেই তাঁর অভিনিবেশের অভাব ছিল না, ছিল না শ্রেষ্ঠত্বের আসন। তিনি যেমন বিশ্ববিদ্যালয় গড়েন, তেমনি ‘নটীর পূজা’-র চলচ্চিত্রায়ন-ও করেন। চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল পাশ্চাত্য শিল্পসমালোচকদের, যাঁরা কবির আঁকা ছবিতে দেখেছেন আধুনিকতা আর অদ্ভুতুড়েপনার (Grotesque) দ্বৈত রূপ। প্রখ্যাত শিল্প-ইতিহাসবিদ স্টেলা ক্রামরিশ রবীন্দ্রনাথের ছবি বিশ্লেষণান্তে দেখান, সেখানে পাশ্চাত্য সংমিশ্রণ কী দক্ষতার সঙ্গে মিশে আছে।
রবীন্দ্রনাথের কথায়, ‘যেথা তার যত উঠে ধ্বনি/ আমার বাঁশির সুরে সাড়া তার জাগিবে তখনি—’। তাঁর বাঁশির সুর যেমন জেগেছিল চীনকে আফিম খাইয়ে ব্রিটিশরা যখন কব্জা করতে চাইল, বা আফ্রিকায় বুয়ার যুদ্ধে, জাপানের চীন আগ্রাসনে, অথবা জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডে। হিন্দু-মুসলমান প্রসঙ্গেও, বারবার, বারবার। আজ তাঁর ১৬৫তম জন্মদিন। আমাদের আজকের আলোচনা তাঁর দৃষ্টিতে মুসলমান, এই নিয়ে।
আশৈশব তিনি মুসলমানের সান্নিধ্য পেয়েছেন। কৈশোরে তাঁর কুস্তির শিক্ষক কানা পালোয়ান-ই হোক, আর হিন্দুমেলায় মুসলমান বয়াতির কণ্ঠে গান শোনার মধ্য দিয়েই হোক। বাড়িতে ছিল মুসলমান বাবুর্চি, পিতা ফার্সি কবিতা আওড়াতেন। কবিও যে ফার্সি প্রণয়কাব্য ‘গোলেবকাওলি’ পাঠ করেছেন, তার উল্লেখ আছে তাঁর লেখায়। এহেন ঐতিহ্য নিয়ে তাঁর বেড়ে ওঠা।
ঔপনিবেশিক ভারতে শাসনক্ষমতা বজায় রাখতে ব্রিটিশদের যে কূটকৌশল, আশ্চর্য হলেও সত্যি, তাকে চূর্ণ করতে আজীবন প্রয়াসী ছিলেন কোনও রাজনীতিবিদ নন, কবি রবীন্দ্রনাথ। কেননা তিনি জানতেন, সুপ্রাচীন ভারতীয় সভ্যতায় ‘শক-হুন-দল পাঠান মোগল/ এক দেহে হল লীন।’ তিনি এই উপমহাদেশের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যকে দেখতে পেয়েছিলেন। এবং আক্ষেপ জানিয়েছেন, যারা দেখতে পান না, তাদের প্রতি। ‘আমাদের সভ্যতাটা বীণার মত, কিন্তু আমরা ঠিকমত বাজাতে শিখিনি। তাই বলে সেটি কি বীণার দোষ?’
বারবার হিন্দু-মুসলমান প্রশ্নে তিনি সোচ্চার, যুক্তিবাদী, অসহিষ্ণু, দৃঢ় মতাবলম্বী এবং বেপরোয়া। হ্যাঁ, বেপরোয়া। নইলে তিনি বলেন কী করে, ব্রিটিশ আমলে হিন্দু শ্রেণির উন্নতি ও মুসলমানদের দুর্গতি দেখে, ‘যে রাজপ্রাসাদ এতদিন আমরা ভোগ করিয়া আসিয়াছি, আজ প্রচুর পরিমাণে তাহা মুসলমানদের ভাগে পড়ুক, ইহা আমরা যেন সম্পূর্ণ প্রসন্নমনে প্রার্থনা করি’ (সভাপতির অভিভাষণ, ‘সমূহ’, রবীন্দ্র রচনাবলী, ১০ম খণ্ড)। উল্লেখ্য, পরবর্তীকালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মুসলমানদের চাকরিবাকরির ক্ষেত্রে এই দাবি তুলেছিলেন, যা ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ নামে পরিচিত। আপাতত তা আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়।
তাঁকে সোচ্চার হতে দেখি ছাত্রপাঠ্য বইয়ে মুসলিম-অনুষঙ্গ না থাকায়। তখনকার বইপত্র বিকট ভাবেই ছিল একপেশে। কবিকে তা বেদনা দেয়। তাই তিনি লেখেন, ১৯০০-র ‘ভারতী’-তে, ‘বাংলা বিদ্যালয়ে হিন্দু ছেলের পাঠ্যপুস্তকে তাহার স্বদেশীয় নিকটতম প্রতিবেশী মুসলমানদের কোনো কথা না থাকা অন্যায় এবং অসংগত।’
জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যখন শিলাইদায় এলেন, তখন তাঁর পণ ছিল সাহাদের হাত থেকে শেখদের বাঁচাবেন তিনি। অর্থাৎ তাঁর জমিদারির আওতায় যেসব মুসলমান চাষি আজীবন নিপীড়িত হচ্ছিললেন হিন্দু সুদখোর মহাজনদের দ্বারা, তার নিরসন তিনি ঘটাবেন। অনেকাংশেই সফল হয়েছিল তাঁর সঙ্কল্প। নোবেলের টাকা দিয়ে তিনি কৃষি ব্যাঙ্কের মাধ্যমে অল্প সুদে কৃষকদের ঋণদানের মাধ্যমে প্রজাদের মহা উপকার করেছিলেন।
জমিদারির দায়িত্ব নিয়ে যখন প্রথম তিনি শিলাইদহ যান, পুণ্যাহ উপলক্ষ্যে হিন্দু-মুসলমানদের প্রতি আচরণের বৈষম্য তাঁকে ব্যথিত করে। সমবেত প্রজাদের মধ্যে হিন্দুদের বসতে দেওয়া হত জাজিমের ওপর, আর মুসলমান প্রজাদের বসানো হয় জাজিম উলটে দিয়ে। জমিদার রবীন্দ্রনাথ এই প্রথার উচ্ছেদ করতে চাইলে কোনও এক কর্মচারী বাধা দিয়ে বলেন, এরকম-ই হয়ে আসছে। তার এই ঔদ্ধত্বের জন্য তিনি তাকে বরখাস্ত-ই করে ছাড়ে নি, সেই থেকে তাঁর জমিদারিতে কেবল হিন্দু-মুসলমান নয়, তাঁর জন্য-ও এক আসন নির্দিষ্ট হয়ে গেল।
রবীন্দ্রনাথের ‘কালান্তর’ গ্রন্থটি আমাদের নিয়ত পাঠ্য হওয়া উচিত। সেখানে দেশ-বিদেশের নানা রাজনৈতিক ঘটনার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আছে তাঁর, ও সেইসাথে আছে হিন্দু-মুসলমান প্রসঙ্গ। তিনি ভারতের বিভিন্ন স্থানে বছরের পর বছর দাঙ্গা দেখে প্রশ্ন তুলেছিলেন, দেশীয় রাজ্যগুলোতে তো কখনওই দাঙ্গা হয় না! প্রসঙ্গত, ব্রিটিশ আমলে সমগ্র ভারতবর্ষে পাঁচশোর ওপর দেশীয় রাজ্য ছিল। হায়দরাবাদের মতো মুসলমান নিজাম-শাসিত রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের ওপর কোনও উপদ্রব হয়নি। তেমনই কাশ্মীরেও, যেখানে মুসলমানদের সংখ্যা বেশি, আর শাসক হিন্দু। তবে কেন বারবার ঔপনিবেশিক ভারতে এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে রেষারেষি ও রক্তপাত? তিনি জানালেন, এই উভয়ের মধ্যে শনিরূপ ইংরেজ শাসক ঢুকেই এহেন কদর্যতার আবহ তৈরি হয়েছে।
এজন্য কিন্তু তিনি শনি, তথা শাসকশ্রেণির ওপর দোষারোপ করেই ক্ষান্ত হননি। তিনি সমালোচনা করেছেন ভারতীয় হিন্দু ও মুসলমানদের। কারণ তাঁর যুক্তি, শনি তো কোনও ছিদ্র না পেলে ঢুকতে পারে না! হিন্দু-মুসলমানের পরস্পরের প্রতি বৈরিতা, অসহিষ্ণুতা, অশ্রদ্ধা-ই সেই শনি, মত ছিল রবীন্দ্রনাথের।
সে-দিনের ঘটনাবলি অবনীন্দ্রনাথের লেখা থেকে পাঠ করা যাক, ‘ঠিক হল সকালবেলা সবাই গঙ্গায় স্নান করে সবার হাতে রাখী পরাব। এই সামনেই জগন্নাথ ঘাট, সেখানে যাব— রবিকাকা বললেন, সবাই হেঁটে যাব, গাড়িঘোড়া নয়। … রওনা হলুম সবাই গঙ্গাস্নানের উদ্দেশ্যে, রাস্তার দুধারে বাড়ির ছাদ থেকে আরম্ভ করে ফুটপাথ অবধি লোক দাঁড়িয়ে গেছে—মেয়েরা খৈ ছড়াচ্ছে, শাঁক বাজাচ্ছে, মহা ধুমধাম— যেন একটা শোভাযাত্রা। দিনুও [রবীন্দ্রনাথের বড়দা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৌত্র] ছিল সঙ্গে, গান গাইতে গাইতে রাস্তা দিয়ে মিছিল চলল— বাংলার মাটি, বাংলার জল,/ বাংলার বায়ু, বাংলার ফল—/ পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।’ (ঘরোয়া)
রবীন্দ্রনাথ সেদিন মুসলিম সহিসদের রাখী পরান। হ্যাঁ, জমিদার রবীন্দ্রনাথ, সহিসদের। সেদিন এমনকী বাদ যায়নি রাস্তায় পাহারানিযুক্ত সরকারি পুলিশরাও।
তাঁর মুসলমানপ্রীতি নিয়ে বহু কথা-ই বলা যায়। বিশ্বভারতীতে সৈয়দ মুজতবা আলীকে পড়ার সুযোগ দেওয়ার মধ্য দিয়েই নয়, সেই কিশোরকে তিনি বিশ্বভারতী সম্মিলনীতে প্রবন্ধপাঠেও উৎসাহিত করেছিলেন। এবং মুজতবা সেখানে ‘ঈদ’ নিয়ে বলেন। সভাপতি রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানিয়েছিলেন সেদিন। এইভাবে উৎসাহিত হয়ে পরে মুজতবা আলী চেকভকে নিয়েও প্রবন্ধ পাঠ করেন।
আবদুল আহাদ আর একজন স্বনামধন্য মানুষ, সঙ্গীতজগতে খ্যাতিমান, বিশ্বভারতীর রবীন্দ্র-স্নেহধন্য ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বহু নামী শিল্পীকে রেকর্ড বের করার সময় ট্রেনিং দিয়েছেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁদের অন্যতম।
জসীমউদ্দীনকে তিনি কার্যক্ষেত্রে উৎসাহিত করেন, বন্দে আলী মিয়াকে কাহিনির প্লট বলে দেন, লালনকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেন, আর কাজী নজরুলকে উৎসর্গ করেন ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য। নিজাম বক্তৃতা
দিতে যেমন তিনি আহ্বান জানান ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ কাজী আবদুল ওদুদকে, তেমনই উস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে শান্তিনিকেতনে যন্ত্রসঙ্গীত শিখিয়ে যান।
রবীন্দ্রনাথ ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মুহাম্মদ রসুলুল্লাহর প্রতি যে কতখানি শ্রদ্ধা
শীল ছিলেন তার প্রমাণ, ১৯৩৪-এর নবি দিবসে স্যার আবদুল্লাহ সোহরাওয়ার্দীকে পাঠানো এক বাণীতে তিনি ইসলামের মহত্ত্ব এবং মহানবির প্রতি সশ্রদ্ধ বার্তা দেন।
হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।
১৯৩২-এর ১৬-ই এপ্রিল কবি তাঁর পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীকে নিয়ে চতুর্দশ শতকের ইরানি কবি হাফেজ-এর মাজারে যান। চোখ বুজে আবৃত্তি করেন হাফেজের কবিতা। তিনি তাঁকে নিয়ে কবিতাও লিখেছিলেন। হাফেজ ছাড়া শেখ সাদীর কবরেও যান তিনি।
রবীন্দ্রনাথ মহামানব। মহামানবতা তাঁর বিপুল রচনায় যেমন লভ্য, তেমনই আন্তর্জাতিক ধ্যানধারণায়, শান্তিনিকেতন নামক বিশ্ববিদ্যাসম্প্রসারে, জমিদারির কাজে একের পর এক প্রজাহিতৈষী কর্মানুষ্ঠানের মাধ্যমে। বিশ্বের যেসব শ্রেষ্ঠ মনীষীদের সঙ্গে তাঁর ভাববিনিময় হয়, তাঁদের মধ্যে আইনস্টাইন, রোমা রোলা, জর্জ বার্নার্ড শ, সিগমুন্ড ফ্রয়েড, ওকাকুরা প্রমুখ অন্যতম। তাঁর সুদীর্ঘ জীবনের গোড়ায় তিনি যেমন সান্নিধ্য পেয়েছেন বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ, আচার্য জগদীশচন্দ্র, মহাত্মা গান্ধী, বালগঙ্গাধর তিলকের, তেমনই জীবনের মধ্যপর্বে কাজী নজরুল ইসলাম, সুভাষচন্দ্র বসু, জসীমউদ্দীন, বেগম সুফিয়া কামাল বা তারাশঙ্করের, এবং অন্তিমপর্বে বুদ্ধদেব বসু, বনফুল, মহাশ্বেতা দেবী, এমনকী সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গেও।
তাঁর জন্ম কলকাতার এমন এক পরিবারে, যেখানে উনিশ শতকের নবজাগরণের ঢেউ তাঁকে গড়ে তুলেছিল। শিল্প-সাহিত্যে যেমন, তেমনই ধর্মের দিক থেকেও এক নতুনতর চেতনা,— ব্রাহ্মধর্ম, রাজা রামমোহন রায়-বাহিত হয়ে তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মাধ্যমে বাংলা তথা বহির্বঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ মনেপ্রাণে ব্রাহ্ম-ই ছিলেন না কেবল, এর সাংগঠনিক দায়িত্ব-ও বেশ কিছু সময়ের জন্য নিতে হয়েছিল তাঁকে। তিনি বেশ কিছুদিন আদি ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক ছিলেন।
ধর্মের দিক থেকে তিনি কিন্তু ছিলেন যৎপরোনাস্তি উদার। একেশ্বরবাদী ব্রাহ্ম হলেও তিনি সনাতন হিন্দু ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তাঁর লেখায় আমরা অজস্র হিন্দু দেবদেবীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন দেখি।
অনুরূপভাবে তিনি বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং ইসলাম ধর্মের প্রতিও অন্তরের অন্তস্তল থেকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে গিয়েছেন। আমাদের আলোচ্য লেখায় রবীন্দ্রনাথের ইসলামের প্রতি এই অপার শ্রদ্ধা সম্পর্কে আরও কিছু আলোকপাত করব।
রবীন্দ্রনাথ বরাবর ছিলেন সাম্প্রদায়িকতা ও জাতপাতের ঊর্ধ্বে। তাই দেখি, ছোটবেলায় যে কানা পালোয়ানের কাছে তিনি কুস্তি শিখতেন, যিনি ছিলেন একজন মুসলমান, পিতার নির্দেশমতো তিনি তাঁকে প্রণাম করতেন। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে রান্না করতেন মুসলমান বাবুর্চি। বাড়িতে গফুর নামে রাঁধুনির রান্না প্রিয় ছিল বালক রবীন্দ্রনাথের।
রবীন্দ্রনাথের উপনয়নের পর পিতা দেবেন্দ্রনাথ তাঁকে নিয়ে প্রথমে যান পাঞ্জাবের অমৃতসর, পরে ডালহৌসি পাহাড়ে। এই দুই স্থানে শিখধর্ম ও ইসলামের সঙ্গে পরিচয়লাভ ঘটে বালক কবির। ফার্সিতে ব্যুৎপন্ন দেবেন্দ্রনাথ পুত্রকে হাফেজ-এর কবিতা পাঠ করে শোনাতেন। রবীন্দ্রনাথের সুফি-প্রীতি গড়ে ওঠার অবকাশ এভাবেই তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীকালে যা আরও গভীর ও ব্যাপক হয়ে উঠেছিল। তাঁর পোশাকটিতেই তো এক সন্ত সুফিসাধকের বৈভব!
তিনি যখন বোলপুরে শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচারী আশ্রম স্থাপন করলেন, সেখানে ধর্ম সম্প্রদায়-নির্বিশেষে ছাত্রছাত্রীরা পড়তে আসত। সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো পরবর্তীকালে খ্যাতিমান লেখক তাঁদের অন্যতম। বিখ্যাত রাজনৈতিক বক্তিত্ব, ‘খোদা ই খিদমতাগার’ ও ‘সীমান্ত গান্ধী’ নামে পরিচিত খান আবদুল গফফার খানের পুত্র আবদুল গনি খান, পশতু ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, ছিলেন শান্তিনিকেতনে কলাভবনের ছাত্র।
রবীন্দ্রনাথের ইসলাম-প্রীতি কিন্তু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেকেই জানি না আমরা, তিনি শান্তিনিকেতনের ছাত্র-ছাত্রীদের উপযোগী করে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত রসুলুল্লাহর জীবনীও লিখিয়েছিলেন। তাঁর আদেশক্রমে এই জীবনী লেখেন সন্তোষচন্দ্র মজুমদার। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সুহৃদ, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও সাহিত্যিক-সম্পাদক শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের পুত্র ও শান্তিনিকেতনের প্রথমবর্ষের ছাত্র, কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথের বন্ধু ও সহপাঠী। রবীন্দ্রনাথ নিজ পুত্রের সঙ্গে তাঁকেও আমেরিকায় পাঠিয়েছিলেন কৃষিবিদ্যা অধ্যয়নের জন্য। ফিরে এসে বারো বছর তিনি শ্রীনিকেতনে যুক্ত ছিলেন। ১৯২৬-এ তাঁর অকালমৃত্যু হয়।
রবীন্দ্রনাথ তাঁকে দিয়ে যে গ্রন্থটি লেখান, সেটি ‘বসুমতী সাহিত্য মন্দির’ থেকে ১৯২৬-এ প্রকাশিত হয়েছিল। অতি সরল ভাষায় আর তথ্যানুগভাবে গ্রন্থটি সন্তোষচন্দ্র রচনা করেছিলেন। বইটির পুনর্মুদ্রণ কাম্য। এছাড়াও সন্তোষচন্দ্র বোলপুর ও তার আশপাশের সাঁওতালপল্লিতে গিয়ে সাঁওতালদের গান সংগ্রহ করে তার অনুবাদ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি সাঁওতালি ভাষা জানতেন।
পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথের জমিদারি যে যে জায়গায় ছিল, সেখানে মুসলমানরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। যুগটা ছিল ব্রিটিশদের ‘Divide and Rule’-এর মাধ্যমে ঔপনিবেশিক স্বার্থরক্ষার যুগ। কিন্তু তাঁর জমিদারির কোথাও হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি ক্ষুণ্ণ হতে দেননি তিনি। এমনকী তাঁর জমিদারি-চৌহদ্দিতে ইদে যেন কোরবানি না দেওয়া হয়, হিন্দু প্রজারা এমন আর্জি নিয়ে এলে তিনি মুসলমানদের ধর্মীয় এই অনুষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেননি, তিনি এতটাই নির্ভীক ও উদারমনা ছিলেন।
শান্তিনিকেতনে তিনি বক্তৃতা দিতে আমন্ত্রণ জানান মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে, কাজী আবদুল ওদুদ, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, সোহরাওয়ার্দী প্রমুখকে। তিনি পত্র লিখেছেন আবুল ফজল, বেগম সুফিয়া কামাল, আবুল হোসেন, শেরে বাংলা ফজলুল হক, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, গোলাম মোস্তফা, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, সৈয়দ মুজতবা আলীকে। এমনকী স্বরূপকাঠি, পিরোজপুরের মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী আমিনাতুন্নেসা যখন চিঠি দিয়েছিল তাঁকে, তিনি সে চিঠির উত্তর পর্যন্ত দিয়েছিলেন। এটা তাঁর মুসলিমপ্রীতি ছাড়িয়ে বৃহত্তর মানবপ্রীতির নিদর্শন।
তিনি ইসলামধর্মের প্রবর্তক হজরত মুহাম্মদ রসুলুল্লাহর প্রতি যে কতখানি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, তার প্রমাণ রসুলুল্লাহকে নিয়ে তাঁর এমন উক্তি, ‘যিনি বিশ্বের মহত্তমদের অন্যতম, সেই পবিত্র পয়গম্বর হজরত মহম্মদের উদ্দেশে আমার অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি। তিনি মানুষের ইতিহাসে এক নতুন সম্ভাবনাময় জীবনীশক্তির সঞ্চার করেছিলেন নিখাদ শুদ্ধ ধর্মাচরণের আদর্শ।’ কবি তাঁর উদার ধর্মাবলম্বিতায় হিন্দু-মুসলমান, এই উভয়কেই সমদৃষ্টিতে দেখতে পেরেছিলেন বলেই ১৩১২ বঙ্গাব্দের বিজয়া সম্মিলনীর ভাষণ দিতে গিয়ে বলতে পেরেছিলেন, ‘শঙ্খমুখরিত দেবালয়ের যে পূজারী আগত হইয়াছে, তাহাকে সম্ভাষণ
করো, অস্তসূর্যের দিকে মুখ ফিরাইয়া যে মুসলমান নামাজ পড়িয়া উঠিয়াছে, তাহাকে সম্ভাষণ করো।’
রাজা রামমোহন রায়, শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ, মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্ত, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর মধ্যে ইসলাম তথা মুসলমানদের প্রতি যে শ্রদ্ধা, তা রবীন্দ্রনাথের মধ্যেও ভাস্বর এবং স্বতঃস্ফূর্ত। হিন্দু-মুসলমানের দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত বড় বেদনার মতোই বাজত তাঁর বুকে, যেমন বাজত তাঁর অনুজাত ও প্রীতিধন্য কবি নজরুলেরও। সেই বেদনাই ঝরে পড়েছে সৈয়দ মুজতবা আলীর সঙ্গে কবির কথোপকথনে, বার্লিনে, ১৯৩০-এ:
‘বলতে পারিস, সেই মহাপুরুষ কবে আসছেন, কাঁচি হাতে করে?’
মহাপুরুষ তো আসেন ভগবানের বাণী নিয়ে, অথবা শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম নিয়ে। কাঁচি কীসের?
তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, কাঁচি নিয়ে। সেই কাঁচি দিয়ে সামনের দাড়ি ছেঁটে দেবেন, পেছনের টিকিট কেটে দেবেন। হিন্দু মুসলমান আর কতদিন এরকম আলাদা হয়ে থাকবে?’
অন্তিমে তাই রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনটিতে পঁচিশে বৈশাখের কাছে আমাদের-ও আর্ত জিজ্ঞাসা, আর কতদিন!
আমরা এ-প্রসঙ্গ শেষ করব তাঁর ‘গোরা’ উপন্যাসের কথা বলে। তিনি গোরা চরিত্রের মধ্যে হজরত রসুলুল্লাহর বৈশিষ্ট্য যে প্রয়োজনে কঠোর হওয়া, এই বার্তাটি প্রচার করেছেন। উপন্যাসটির এক পর্যায়ে গোরা বলছে, ‘ভালোমানুষী ধর্ম নয়, তাতে দুষ্ট মানুষকে বাড়িয়ে তোলে। তোমাদের মহম্মদ সেকথা জানতেন, তাই তিনি ভালোমানুষ সেজে ধর্মপ্রচার করেন নি’। কী নিপুণ বিশ্লেষণ!
তেমনই ‘মুসলমানীর গল্প’-তে তিনি হবির খাঁর মধ্য দিয়ে যথার্থ একজন মুসলমানের সংজ্ঞা দেখান। গল্পের নায়িকা ডাকাতের হাতে পড়লে হিন্দুসমাজ তাকে ঘরে নেয় না। তাকে উদ্ধার করে হবির খাঁ। তাঁর গৃহে মেয়েটিকে আশ্রয় দিতে চাইলে মেয়েটি দ্বিধায় পড়ে। হবির খাঁ তাকে বলে, ‘যারা যথার্থ মুসলমান, তারা ধর্মনিষ্ঠ ব্রাহ্মণকে সম্মান করে। আমার ঘরে তুমি হিন্দুবাড়ির মেয়ের মতই থাকবে।’
এই হলেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের মুসলমান-প্রীতি আমাদের চোখ খুলে দিক। আর নজরুলের বাণীর সফলতা নিয়ে আসুক, ‘আমরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম, হিন্দু মুসলমান’!
চিত্র: গুগল







