Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

সুজিত বসুর তিনটি কবিতা

আরম্ভ করেছ খেলা

শুরু হবে, শুরু হবে, শুরু হয়ে যাবে খেলা, তবে জাদুকর
আরম্ভ করেছ খেলা আশ্চর্য তাঁবুর মধ্যে, আলোর তূণীর
বাসের গহন থেকে ছুটে যায় অন্যখানে, ঝিমঝিম ভার
অলস তন্দ্রার মেঘ ছুঁয়ে ছুঁয়ে জমে যায় এবং টুপির
গভীর অন্তর থেকে ভেসে ওঠে ফিতে চুড়ি রঙিন রুমাল
দেশলাই চৌখুপি থেকে তুহিন তুষারময় রক্ত গাঢ় লাল।

দিন হয় রাত হয় রাত থেকে দিন হয় রাতদিন দিন
জলপাই গাছের ঘন পাতাগুলি স্থির হয়ে ঘন বনস্থলী
ঝিরঝির ঝরে যাওয়া বৃষ্টির ফোঁটার মতো আলোর পিদ্দিম
নিথর জ্বালাও তুমি জাদুকর, আর আমি চলে যাই, চলি
সঘন ধূমের গন্ধে চোখ জলে ভরে আসি, দেখে নিই ক্ষীণ
মুখরিত নগরীর রাজপথে মৃত্যুমুখী এক চাঁপাকলি।

*

ঝিমলির বনলতা

সারাদিন টিভি দেখছি আমি আর ছোট ঝিমলি সোনা
স্টার আর জি টিভির সিরিয়াল জানে অনজানে
তারা আর কমান্ডার নিয়ে হল কত আলোচনা
মাঝে মাঝে প্রেম দৃশ্য, বাচ্চাকে বোঝাতে হবে মানে ।

ছোট পর্দা জুড়ে খালি বাজিকর শাহরুখ খান
শিল্পা শেঠি কাজলের লাস্যময় পপ ডিসকো নাচ
এছাড়া বাগানে বনে ছুটোছুটি, জুহু বিচে স্নান
একের শরীর থেকে আরেক শরীর নিচ্ছে আঁচ।

আজকাল বাচ্চারাও বুঝে যাচ্ছে কাকে বলে কিস
সেকসি কাকে বলে তাও দেখিয়েছে কারিশমা কাপুর
একটু একটু করে গলা জ্বলে যায়, মুখে শঙ্খবিষ
নজরুল রবীন্দ্রনাথ থেকে আমরা আছি বহুদূর।

মাঝে মাঝে বোর করছে দাঙ্গাটাঙ্গা, খুচরো কিছু খুন
একটা দুটো ভূমিকম্প, রেল আর প্লেন দুর্ঘটনা
নব ঘোরালেই সব সাফসুফ, কেউ বলছে আপনারা হাসুন
গুজবে দেবেন না কান, শত্রু কোন দেশ দিচ্ছে মিথ্যে প্ররোচনা।

এ পর্যন্ত সব ঠিক, শুধু ভাবছি হয়তো ঝিমলি সোনা
একদিন ভোরে উঠে প্রশ্ন করবে, মা গো কে ছিলেন
পাখির নীড়ের মতো চোখ তাঁর, বনলতা সেন?
আপনারা জানেন আমি সত্যি বলছি আশ্চর্য হব না।

*

সন্দেহ

কাল রাত্তিরে কোথায় যে তুমি ছিলে
নিশ্চয় কোনও দেহব্যবসায়িনীর
ঘরে? উত্তর শোনার আগেই সমাজপতিরা মিলে
আশ্রয়চ্যুত করে অভাগাকে, ভাঙে শান্তির নীড়

হয়তো সে ছিল নির্জন দ্বীপে স্বপ্নের কারখানা
গড়ায় ব্যস্ত, কিংবা হয়তো চেয়েছিল শান্তির
পথনির্দেশ, কিন্তু অচেনা রাস্তায় চলা মানা
এখানে, চলতে চাইলেই বেঁধে বুকে সন্দেহতির।

চিত্রণ: মনিকা সাহা

One Response

  1. কি অসাধারণ তিনটি লেখা, তেমনই অনন্য অলংকরণ। কবি, মনে হলো ঠিক এ সময়েই রয়েছেন, লেখাতে তেমনই আশা আশঙ্কা মিশে আছে; একেবারে এখনকার দৈনন্দিন সময় যেন ধরা আছে বেশ কিছু পংক্তিতে।
    “দিন হয় রাত হয় রাত থেকে দিন হয় রাতদিন দিন
    জলপাই গাছের ঘন পাতাগুলি স্থির হয়ে ঘন বনস্থলী
    ঝিরঝির ঝরে যাওয়া বৃষ্টির ফোঁটার মতো আলোর পিদ্দিম।”
    ছন্দ সব সময়েই কবি সুজিত বসুর কলমে ঝর্নার মতো সাবলীল। একসময় যাঁরা মনে করেছেন কবি বড়ো আত্মগত, প্রায়ই ফিরে দেখেন ফেলে আসা সময়, তাঁদের এখন কবি নিয়তই তাঁর লেখায় স্পস্ট দেখান চারপাশ; এখন যেমন সময়, সে সময়ের দ্বিধাদ্বন্দ্ব চিনিয়ে দিচ্ছেন অনায়াসে।
    “একদিন ভোরে উঠে প্রশ্ন করবে, মা গো কে ছিলেন
    পাখির নীড়ের মতো চোখ তাঁর, বনলতা সেন?
    আপনারা জানেন আমি সত্যি বলছি আশ্চর্য হব না।”
    ভালভাষাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, প্রিয় কবির এমন তিনটি অসামান্য কবিতা উপহার দিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × 1 =

Recent Posts

গৌতম চক্রবর্তী

ব্রিটিশ ছোটগল্প

আমি আগে থেকেই আমেরিকার পাখি বইটি সম্পর্কে জানতাম, কিন্তু কখনও বইটির সঙ্গে তেমনভাবে সময় কাটাইনি। ঠিক যেভাবে কেউ নদীর ধারে বসে সময় কাটায়। বাবার হাসপাতালের শয্যার পাশে বসে থাকতে থাকতে আমি যেন ধৈর্যের অর্থ শিখে নিয়েছিলাম। অপেক্ষা করতে শিখেছিলাম। এডি ঠিকই বলেছিল— আমিও মাছ ধরতে যেতে চাইছিলাম। জলের ধারে বসে থাকতে চাইছিলাম। কিন্তু বাবাকে দেখতে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও কাজে বাড়ি থেকে বেরোনো সম্ভব হয়নি। তাই আমি অডুবন-এর সরোবরসম বইয়ে আমার জাল ফেললাম।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের বিস্ফোরণ: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক নীরব পূর্বাভাস

পণ্যের এই ভয়াবহ সঞ্চালন সংকটে পড়ে পুঁজিপতিরা এখন আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তাই অবিক্রীত পণ্য গছিয়ে দেওয়ার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞাপনের প্রচার চালানো হচ্ছে। এই সুযোগেই বিশ্বজুড়ে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েশন’ বা আধেয় নির্মাণের এক নজিরবিহীন বিস্ফোরণ ঘটেছে। যখন বিশ্বের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ দু’বেলা অন্নসংস্থানে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ইন্টারনেটে ছোটখাটো ভিডিও প্রচার করে ক্রিয়েটররা বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন। এটি আসলে জমে যাওয়া শ্রম ও পণ্যের এক অস্বাভাবিক বণ্টন প্রক্রিয়া। যে পণ্যের রিভিউ করে একজন ক্রিয়েটর লাখ লাখ টাকা আয় করছেন, সেই পণ্যের প্রকৃত উৎপাদনকারী শ্রমিক হয়তো আজ কর্মহীন কিংবা নিম্নতম মজুরিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চন্দ্রাবতী: বঙ্গের প্রথম পদকর্ত্রী

চন্দ্রাবতীর জীবনের যেটি শ্রদ্ধেয় দিক, তা হল গরলকে অমৃতে পরিণত করা। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোককে কাটিয়ে উঠে একাগ্রতা নিয়ে পঠনপাঠন‌ ও সৃষ্টিকর্মে মন দেন। পিতাকে সহায়তা করেন কাব্যরচনায়। ১৫৭৫ নাগাদ, যখন চন্দ্রাবতীর বয়স মাত্র পঁচিশ, সেসময় তিনি পিতার লেখা মনসার ভাসান-এ সহযোগিতা করেছিলেন। তারপর একের পর এক নিজস্ব রচনায় ভাস্বর হয়ে থাকে তাঁর কারুবাসনা।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইসলাম

হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি ‌বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের‌ সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়‌ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।

Read More »
তপোমন ঘোষ

কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে…

হঠাৎ চোখ পড়ে বুথের এক্সিট দরজাটার দিকে… একটা ছোট্ট ছায়া ঘোরাফেরা করছে! চমকে উঠে সে দেখে, সেই বাচ্চাটা না! মায়ের কোলে চড়ে এসেছিল… মজা করে পোলিং অফিসার তার ছোট্ট আঙুলে লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভোটের কালি। হুড়োহুড়িতে মা ছিটকে গেছে কোথাও— নাকি আরও খারাপ কিছু! বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে তার। শুনশান বুথে পোলিং আর সেক্টর অফিসার গলা যথাসম্ভব নিচুতে রেখে ডাকতে থাকেন বাচ্চাটাকে। একটা মৃদু ফোঁপানি… একটা হালকা ‘মা মা’ ডাক— বাচ্চাটা এইসব অচেনা ডাকে ভ্রূক্ষেপও করে না, এলোমেলো পায়ে ঘুরতে থাকে।

Read More »