১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই, আলবার্ট আইনস্টাইন (১৪ মার্চ ১৮৭৯—১৮ এপ্রিল ১৯৫৫) বার্লিনের উপকণ্ঠে নিজের বাড়িতে স্বাগত জানান ভারতীয় কবি, দার্শনিক ও সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে (৭ মে ১৮৬১—৭ আগস্ট ১৯৪১)। তিনি ছিলেন প্রথম অ-ইউরোপীয় নোবেল বিজয়ী। তাঁদের এই সাক্ষাৎকারটি ইতিহাসের অন্যতম বুদ্ধিদীপ্ত ও মননশীল আলাপচারিতায় পরিণত হয়, যেখানে তাঁরা বিজ্ঞান ও ধর্মের চিরন্তন দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করেন। “সায়েন্স অ্যান্ড দ্য ইন্ডিয়ান ট্রাডিশন: হোয়েন আইনস্টাইন মেট টেগোর” গ্রন্থে এই ঐতিহাসিক সাক্ষাতের বিবরণ পাওয়া যায়। এই বইতে বিশ শতকের শুরুতে ভারতের বৌদ্ধিক পুনর্জাগরণ এবং ভারতীয় ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক চিন্তার মেলবন্ধন তুলে ধরা হয়েছে।
নিচের অংশটি আইনস্টাইন ও রবিঠাকুরের কথোপকথনের একটি নির্বাচিত অংশ। এখানে বিজ্ঞান, সৌন্দর্য, চেতনা ও দর্শনের সংজ্ঞা নিয়ে মানব অস্তিত্বের মৌলিক প্রশ্নগুলির গভীর বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
আইনস্টাইন: আপনি কি এমন এক ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন, যিনি পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন?
রবীন্দ্রনাথ: না, বিচ্ছিন্ন নন। মানুষের অসীম সত্তা সমগ্র বিশ্বকে ধারণ করে। এমন কিছু নেই যা মানবসত্তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নয়— এ থেকেই প্রমাণিত হয় যে মহাবিশ্বের সত্য আসলে মানবসত্য।
আমি একটি বৈজ্ঞানিক উদাহরণ দিই— পদার্থ প্রোটন ও ইলেকট্রন দিয়ে গঠিত, তার মধ্যে ফাঁক থাকে; তবুও আমরা তাকে কঠিন মনে করি। তেমনই মানবসমাজ বহু ব্যক্তির সমষ্টি হলেও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক এক সজীব ঐক্য সৃষ্টি করে। একইভাবে মহাবিশ্বও আমাদের সঙ্গে যুক্ত— এটি এক মানবিক মহাবিশ্ব। আমি এই ধারণাটি শিল্প, সাহিত্য ও ধর্মীয় চেতনার মাধ্যমে অনুসরণ করেছি।
আইনস্টাইন: মহাবিশ্বের প্রকৃতি সম্পর্কে দুটি ধারণা আছে: (১) মানবতানির্ভর এক ঐক্যবদ্ধ বিশ্ব, (২) মনুষ্য-নিরপেক্ষ বাস্তব বিশ্ব।
রবীন্দ্রনাথ: যখন আমাদের মহাবিশ্ব মানুষের সঙ্গে এক সুরে বাঁধা থাকে, তখন আমরা তাকে সত্য হিসেবে জানি এবং সৌন্দর্য হিসেবে অনুভব করি।
আইনস্টাইন: মহাবিশ্ব সম্পর্কে এটি সম্পূর্ণ মানবিক ধারণা।
রবীন্দ্রনাথ: অন্য কোনও ধারণা থাকতে পারে না। এই বিশ্ব মানবিক— বিশ্ব সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিও বিজ্ঞানীর দৃষ্টিভঙ্গি। যুক্তি ও উপভোগের একটি মানদণ্ড আছে, যা সত্যকে নির্ধারণ করে— এটি সেই চিরন্তন মানুষের মানদণ্ড, যার অভিজ্ঞতা আমাদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই আসে।
আইনস্টাইন: এটি মানুষের সত্তার উপলব্ধি।
রবীন্দ্রনাথ: হ্যাঁ, এক চিরন্তন সত্তা। আবেগ ও কর্মের মাধ্যমে তাকে উপলব্ধি করতে হয়। বিজ্ঞান ব্যক্তিগত সীমা ছাড়িয়ে সত্যের নৈর্ব্যক্তিক মানবিক বিশ্ব নিয়ে ভাবিত। ধর্ম এই সত্যকে উপলব্ধি করে, আমাদের গভীর প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করে। আমাদের ব্যক্তিগত সত্যচেতনা সর্বজনীন তাৎপর্য অর্জন করে। ধর্ম সত্যের ওপর মূল্যবোধ আরোপ করে। আর আমরা আমাদের নিজস্ব সমন্বয়ের মাধ্যমে সেই সত্যকে কল্যাণ হিসাবে অনুভব করি।
আইনস্টাইন: তা হলে সত্য বা সৌন্দর্য কি মনুষ্য-নিরপেক্ষ নয়?
রবীন্দ্রনাথ: না।
আইনস্টাইন: যদি মানুষ না থাকে, তবে “অ্যাপোলো অব বেলভেদেয়ার” আর সুন্দর থাকবে না।
রবীন্দ্রনাথ: ঠিক তাই।
আইনস্টাইন: সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে আমি একমত, কিন্তু সত্যের ক্ষেত্রে নয়।
রবীন্দ্রনাথ: কেন? সত্য তো মানুষের মাধ্যমেই উপলব্ধ হয়।
আইনস্টাইন: আমার প্রমাণ করার ক্ষমতা নেই, কিন্তু এটাই আমার বিশ্বাস।
রবীন্দ্রনাথ: সৌন্দর্য নিহিত আছে সেই পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যের আদর্শে, যা সর্বজনীন সত্তার মধ্যে বিদ্যমান; সত্য হল সর্বজনীন মনের পূর্ণাঙ্গ উপলব্ধি। আমরা ব্যক্তি হিসেবে আমাদের নিজস্ব ভুলভ্রান্তির মধ্য দিয়ে, সঞ্চিত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এবং প্রদীপ্ত চেতনার সাহায্যে সত্যের কাছে পৌঁছই— নইলে আর কীভাবে আমরা সত্যকে জানতে পারি?
আইনস্টাইন: আমি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করতে পারি না যে, সত্যকে এমন এক সত্য হিসেবে ভাবতে হবে যা মনুষ্য-নিরপেক্ষভাবে বৈধ; কিন্তু এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। উদাহরণস্বরূপ, আমি বিশ্বাস করি যে জ্যামিতিতে পিথাগোরাসের উপপাদ্য এমন কিছু বলে যা মানুষের অস্তিত্বের উপর নির্ভর না করেও প্রায় সত্য। যাই হোক, যদি মানুষের স্বাধীনভাবে কোনও বাস্তবতা থাকে, তবে সেই বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সত্যও থাকবে; এবং একইভাবে, প্রথমটিকে অস্বীকার করলে দ্বিতীয়টির অস্তিত্বকেও অস্বীকার করা হয়।
রবীন্দ্রনাথ: সত্য, যা সর্বজনীন সত্তার সঙ্গে একাত্ম, তা অবশ্যই মানবিক হতে হবে; নচেৎ আমরা ব্যক্তি হিসেবে যা সত্য বলে উপলব্ধি করি, তাকে কখনওই সত্য বলা যাবে না— অন্তত সেই সত্যকে নয়, যা বৈজ্ঞানিক বলে বর্ণিত এবং যা কেবল যুক্তির প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, অর্থাৎ মানুষের চিন্তার অঙ্গের মাধ্যমে অর্জন করা যায়। ভারতীয় দর্শন অনুযায়ী, ব্রহ্ম আছে একথা পরম সত্য। ব্যক্তিগত মনের বিচ্ছিন্ন অবস্থায় তা কল্পনা করা যায় না বা শব্দে বর্ণনা করা যায় না। কেবল তখনই উপলব্ধি করা যায় যখন ব্যক্তি সম্পূর্ণভাবে তার অসীমতার মধ্যে বিলীন হয়। কিন্তু এমন একটি সত্য বিজ্ঞানের অন্তর্গত হতে পারে না। আমরা যে সত্য নিয়ে আলোচনা করছি, তার প্রকৃতি এক ধরনের আবির্ভাব— অর্থাৎ যা মানব মনের কাছে সত্য বলে প্রতীয়মান হয়, এবং সেই কারণে মানবিক; একে মায়া বা ভ্রম বলা যেতে পারে।
আইনস্টাইন: তা হলে আপনার ধারণা অনুযায়ী, যা হয়তো নিছকই ভারতীয় ধারণা, এটি ব্যক্তির ভ্রম নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির ভ্রম।
রবীন্দ্রনাথ: মানবজাতি আসলে একটি বৃহত্তর ঐক্যের অংশ— মানবতা। তাই সমস্ত মানুষের সম্মিলিত চেতনায় সত্য উপলব্ধ হয়। ভারতীয় বা ইউরোপীয়— সব মানুষের মন এক জায়গায় এসে সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে।
আইনস্টাইন: জার্মান ভাষায় “প্রজাতি” বলতে শুধু মানুষ নয়, প্রাণীদেরও বোঝাতে পারে— যেমন বানর বা ব্যাঙও এর মধ্যে পড়ে।
রবীন্দ্রনাথ: বিজ্ঞানে আমরা এমন এক শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে যাই, যেখানে আমাদের ব্যক্তিমনের সীমাবদ্ধতাগুলোকে দূর করার চেষ্টা করা হয়। ফলত আমরা এমন এক সত্যে পৌঁছই, যা সর্বজনীন মানবমনে বিদ্যমান।
আইনস্টাইন: সমস্যা শুরু হয় এই নিয়ে যে সত্য কি চেতনা-নিরপেক্ষ।
রবীন্দ্রনাথ: আমরা যাকে সত্য বলি, তা হল বাস্তবতার ব্যক্তিগত ও বস্তুগত দিকের মধ্যে যুক্তিসঙ্গত সামঞ্জস্য। উভয়ই অতিব্যক্তিগত মানুষের অধিকারে।
আইনস্টাইন: আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও আমরা বাধ্য হই ব্যবহৃত বস্তু মনুষ্য-নিরপেক্ষ বলে ভাবতে। আমরা এভাবে ভাবি, যাতে আমাদের ইন্দ্রিয়ের অভিজ্ঞতাগুলোকে যুক্তিসঙ্গতভাবে সংযুক্ত করা যায়। যেমন এই ঘরে কেউ না থাকলে ওই টেবিলটি আপন জায়গাতেই থাকে।
রবীন্দ্রনাথ: হ্যাঁ, তা ব্যক্তিগত মন থেকে বাইরে থাকতে পারে, কিন্তু সার্বজনীন চেতনার বাইরে নয়। আমি যে টেবিলটি উপলব্ধি করি, সেটি আমার নিজের মতো করে একই ধরনের চেতনার দ্বারাই উপলব্ধিযোগ্য।
আইনস্টাইন: বাড়িতে যদি কেউ না-ও থাকে, তবুও টেবিলটি একই থাকবে— কিন্তু আপনার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ইতিমধ্যেই গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ আমরা ব্যাখ্যা করতে পারি না মনুষ্য-নিরপেক্ষভাবে টেবিলটির অস্তিত্ব থাকার অর্থ কী।
মানবতা-নিরপেক্ষভাবে সত্যের অস্তিত্ব সম্পর্কে আমাদের স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা বা প্রমাণ করা যায় না। কিন্তু এটি এমন একটি বিশ্বাস যার অভাব কারও মধ্যেই নেই— আদিম মানুষের মধ্যেও নয়। আমরা সত্যকে এক অতিমানবীয় বস্তুনিষ্ঠতা প্রদান করি। সত্য আমাদের জন্য অপরিহার্য—এক বাস্তবতা, যা আমাদের অস্তিত্ব, অভিজ্ঞতা এবং মন নিরপেক্ষ— যদিও আমরা সঠিকভাবে বলতে পারি না এর অর্থ কী।
রবীন্দ্রনাথ: বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে কঠিন বস্তু হিসেবে টেবিলটি একটি প্রতীয়মান রূপ। তাই মানুষের যে মন “টেবিল” উপলব্ধি করে, সেই মন না থাকলে তা অস্তিত্বশীল হত না। একই সঙ্গে এটাও স্বীকার করতে হবে যে চূড়ান্ত ভৌত বাস্তবতা আসলে অসংখ্য পৃথক ঘূর্ণায়মান বৈদ্যুতিক শক্তিকেন্দ্রের সমষ্টি— এই ধারণাটিও মানবমনেরই সৃষ্টি।
সত্যকে উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে সর্বজনীন মানবমন এবং ব্যক্তিগত সীমানায় আবদ্ধ সেই একই মনের মধ্যে এক চিরন্তন সংঘর্ষ বিদ্যমান। এই দ্বন্দ্বের সমন্বয়ের এক অবিরাম প্রক্রিয়া আমাদের বিজ্ঞান, দর্শন ও নীতিশাস্ত্রে চলতে থাকে। যাই হোক, যদি এমন কোন সত্য থাকে যা সম্পূর্ণভাবে মানবতার সঙ্গে সম্পর্কহীন, তবে আমাদের কাছে তা সম্পূর্ণরূপে অস্তিত্বহীন।
তবে এমন একটি মন কল্পনা করা কঠিন নয়, যার কাছে ঘটনাবলির ধারাবাহিকতা স্থানের মধ্যে নয়, কেবল সময়ের মধ্যে ঘটে— যেমন সঙ্গীতের সুরের ধারাবাহিকতা। এমন একটি মনের কাছে বাস্তবতার ধারণা হবে সঙ্গীতের বাস্তবতার মতো, যেখানে পিথাগোরাসের জ্যামিতির কোনও অর্থই থাকবে না। কাগজের একটি বাস্তবতা আছে, যা সাহিত্যের বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে মথ কাগজ খায়, তার মনে সাহিত্যের কোনও অস্তিত্ব নেই; কিন্তু মানুষের মনের কাছে সাহিত্য কাগজের চেয়ে অনেক বেশি সত্য-মূল্য বহন করে। একইভাবে, যদি এমন কোনও সত্য থাকে যার সঙ্গে মানবমনের ইন্দ্রিয়গত বা যুক্তিগত কোনও সম্পর্ক নেই, তবে আমরা যতদিন মানুষ থাকব, ততদিন সেটি আমাদের কাছে শূন্যই থেকে যাবে।
আইনস্টাইন: তা হলে আমি আপনার চেয়ে বেশি ধার্মিক!
রবীন্দ্রনাথ: আমার ধর্ম নিহিত আছে অতিব্যক্তিগত মানুষ— সর্বজনীন মানবাত্মার সঙ্গে আমার নিজস্ব ব্যক্তিগত সত্তার মিলনে।
***
পাদটীকা— “সায়েন্স অ্যান্ড দ্য ইন্ডিয়ান ট্রাডিশন: হোয়েন আইনস্টাইন মেট টেগোর” গ্রন্থ পুরোটা পড়লে এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়। সঙ্গে পড়া যেতে পারে পদার্থবিজ্ঞানী লিজা রানডাল-এর লেখা বই, যেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন শিল্প, বিজ্ঞান ও ধর্ম— এই তিনটি কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে বিশ্বজগৎকে বোঝার চেষ্টা করে। তারপর ফিরে আসা যায় আলবার্ট আইনস্টাইন-এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ চিঠিপত্রে— সিগমুন্ড ফ্রয়েড-এর সঙ্গে সহিংসতা, শান্তি ও মানবস্বভাব নিয়ে তাঁর আলোচনা, ডব্লু ই বি দ্যু বোয়া-র সঙ্গে বর্ণবাদ ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে তাঁর স্বল্পপরিচিত পত্রালাপ, এবং দক্ষিণ আফ্রিকার এক ছোট্ট মেয়েকে লেখা চিঠি বিজ্ঞানীরা ঈশ্বরে প্রার্থনা করেন কি না।
এইসব লেখা একত্রে আমাদের সামনে তুলে ধরে— মানুষ, সত্য, এবং বিশ্বজগৎ সম্পর্কে ভাবনার নানা দিক ও গভীরতা।







