Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

কেন লালন ও গান্ধীজি আজও প্রাসঙ্গিক

‘আমি বিশ্বের সকল মহান ধর্মে বিশ্বাসী। যতক্ষণ না আমরা পরধর্মকে শুধু সহ্য করতেই নয়, বরং নিজের ধর্মের মতো সম্মান করতে শিখব, পৃথিবীতে ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো শান্তি আসবে না। মানবজাতির বিভিন্ন শিক্ষক ও পথপ্রদর্শকের বাণীসমূহ শ্রদ্ধার সঙ্গে অধ্যয়ন করা হবে এ রকম পারস্পরিক সম্মানের পথে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।’
–মহাত্মা গান্ধী, ২৪ মার্চ ১৯৩৮

মহাত্মা গান্ধী ও লালন ফকিরের অসংখ্য সমালোচক ছিল, এখনও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। যাদের নিয়ে তাঁরা সাধনার পথে অগ্রসর হয়েছিলেন বা হতে চেয়েছিলেন, তারাও তাঁদের সমালোচনা করেছে, ভুল বুঝেছে। কিন্তু সমালোচকদের সমালোচনাকে পাত্তা না দিয়ে নিজেদের জীবনকে এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে রেখে গেছেন সারা বিশ্বের সর্বমানবের জন্য। হ্যাঁ, প্রতিতুলনা না করেও বলা যায়, লালন ফকির ও মহাত্মা গান্ধী– দুজনেই ছিলেন উদার মানবিকতায় বিশ্বাসী সর্বজন মঙ্গলে সমর্পিত অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব। দলীয় পদ-পদবি গ্রহণ না করেও গান্ধীজি ছিলেন রাজনীতিক, যাঁর মূলব্রত ছিল দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করা। অন্যদিকে লালন ছিলেন এক নিঃস্ব ফকির যিনি রাগে-অভিমানে তথাকথিত কুলীন সমাজ পরিত্যাগ করে অবতীর্ণ হয়েছিলেন একটি নতুন সমাজ বিনির্মাণের সংগ্রামে। মত-পথের ভিন্নতা সত্ত্বেও দুজনেই একটি ভক্তি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অসীম শক্তিধর কর্তৃত্ববাদী শাসককুল ও প্রতাপশালী সমাজপতিদের পরাস্ত করতে চেয়েছিলেন। ঈশ্বরবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে দুজনেই বৈষ্ণব ভাব, শঙ্করের মতাদর্শকে মেনে নিয়ে, বৌদ্ধ ও ইসলামের ভাবাদর্শে আস্থা রেখে সর্বধর্মের প্রতি সমভাব প্রদর্শন করে পরাধীন ও সংস্কারগ্রস্ত সমাজ ও রাষ্ট্রকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। দুই মহামানব-ই সকল হিংসাশ্রয়ী মতাদর্শ ও শাসনকে রুখতে চেযেছিলেন অহিংস পথে, সম্প্রীতির মন্ত্র শুনিয়ে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, লালন-গান্ধীর সেই সম্প্রীতিময় ভাবনার ধারাটি ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। সব জায়গায় এখন হিংসা-বিভেদ আর ভাঙনের বেসুরো বাজনা বেজে চলেছে। ‘মহামানবের মিলনতীর্থে’ বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের সন্ধান করেন এমন মানুষের সংখ্যা কেবল কমেই যাচ্ছে না, বরং বৈচিত্র্য ও বহুত্ববাদিতা ধ্বংস করার জন্য ধড়াচুড়ো পরে উঠেপড়ে লেগে গেছে একদল স্বার্থান্ধ মানুষ। সবকিছুর ওপর ধর্মবিদ্বেষ, ঘৃণা আর সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ঢেলে দেওয়া হচ্ছে। হার্দিক আলাপ-আলোচনা, প্রাণখোলা আড্ডা, মুক্তচিন্তা চর্চার পরিবেশ আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। কর্তৃত্ববাদী চিন্তার দৌরাত্ম্যে মতপ্রকাশের পরিসরটাও ক্রমশ ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে যাচ্ছে। উপমহাদেশের সবখানে এক ধরনের জরুরি অবস্থা জারি রয়েছে। চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা সংবিধানের পাতায় কালো হরফে লেখা আছে বটে, কিন্তু এর চর্চা ও প্রয়োগের সুযোগ নেই বলেলেই চলে। হর-হামেশা লাঞ্ছিত হচ্ছে ভিন্নমতাবলম্বী মানুষ। কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীরাও হিংসাশ্রয়ী মতাদর্শ ও গরিষ্ঠতাবাদী রাজনীতির প্রতাপ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। কোনও কোনও ক্ষেত্রে প্রতিবাদী লেখকদের জেলে পুরে অত্যাচারের স্টিম রোলার চালানো হচ্ছে, কাউকে কাউকে মেরেও ফেলা হচ্ছে।

উপমহাদেশ জুড়েই মুক্তচিন্তার বিদ্রোহী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দিতে সংখ্যাগরিষ্ঠদের সমর্থনপুষ্ট নেতা ও নিয়ন্ত্রকরা এক ধরনের ক্রুসেড ঘোষণা করে দিয়েছেন। অথচ ব্রিটিশ শাসনামলে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, ইয়ং বেঙ্গলের তরুণ তুর্কিরা এমন চাপ ও নিগ্রহের মুখোমুখি হননি। আজকের জামানায় বেঁচে থাকলে খুব সম্ভবত চণ্ডীদাস, লালন, নজরুলদেরও নিগ্রহ ও অবমাননার শিকার হতে হত। রাষ্ট্র তাঁদের ভিন্নমত সহ্য করতে পারত না। ভারতীয় উপমহাদেশের কোথাও আর ভিন্ন ও বিরুদ্ধমত সহ্য করা হয় না। প্রবল প্রতাপের কাছে পরাস্ত হয়ে মানুষ মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভাবতে শুরু করে দিয়েছে যে, মুক্তচিন্তা, ভিন্নমতের চর্চা না-করাই ভাল! কী হবে তর্ক করে– ভিন্নমত প্রকাশ করে কী লাভ? বরং মুখ বন্ধ রাখাই শ্রেয়। অথচ আমাদের সমাজটা তো এমন ছিল না! ভারতীয় তথা বাঙালি সমাজ সর্বকালে, সর্বযুগে নানা বিষয় নিয়েই তর্ক করেছে, তর্ক করেছে বস্তুবাদ ও ভাববাদী মতাদর্শ নিয়ে। ধর্মীয় মৌলবাদ, উগ্রবাদী কমিউনিস্টসহ বিভিন্ন হিংসাশ্রয়ী মতবাদের সঙ্গে যেমন তর্ক হয়েছে, তেমনই ধর্মনিরপেক্ষতা ও বিজ্ঞানমনস্কতার সঙ্গে তর্ক করতে কসুর করা হয়নি। তর্কের মাধ্যমেই আমরা ধর্ম-সাহিত্য, রাজনীতি, দর্শন-বিজ্ঞানের সত্য আবিষ্কার করেছি। তার্কিক প্রবণতা ভারতীয় সমাজকে যুক্তিবাদী ও সহনশীল করেছে। সহনশীল ভাবপ্রবণতার কারণে ভারতবর্ষের মানুষ বিশ্বের সকল মহৎ ভাবনাকে আপন করে নিতে পেরেছে বলে মনে করা হয়। বুদ্ধদেব, সম্রাট অশোক, কবি কালিদাস, গাণিতিক আর্যভট্ট, সম্রাট আকবর, গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ– এঁদের মধ্যে মিলের যে সূত্র সেটা হল চিত্তের ঔদার্য, যুক্তিবাদিতা ও পরমতসহিষ্ণুতা। সাংস্কৃতিক ভিন্নতা তথা বহুবাদিতাকে খুব সহজেই এঁরা মেনে নিতে পেরেছিলেন। কিন্তু হায়, ইতিহাসের চাকা এখন উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করেছে! একদল ক্ষমতাধর মূঢ়মতি চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগেও প্রগতির রথকে থামিয়ে দিতে চাইছে। কোনও যুক্তিতর্কই তারা মানতে চাইছেন না। প্রশ্ন জাগে, হিন্দু সমাজের সংস্কারের জন্য রামমোহন, বিদ্যাসাগর মহাশয়রা যেসব অকাট্য যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন, তা কি আজকের জামানায় সম্ভব হত? ব্রিটিশশাসিত, ব্রাহ্মণ্যবাদ নিয়ন্ত্রিত সমাজে দাঁড়িয়ে লালন যে-সাহস নিয়ে মুক্তচিন্তার চর্চা করে গেছেন, তা কি আজকের তথাকথিত সভ্যভব্য যুগে সম্ভব হত?

মহাত্মা গান্ধী নিজেকে হিন্দু বলে পরিচয় দিতে দ্বিধা করেননি, আবার হিন্দুধর্মের সবকিছুকে যুক্তিহীনভাবে মেনেও নেননি। যুক্তির কষ্ঠিপাথরে যাচাই করেই গ্রহণ করেছেন। ‘গান্ধী বিশ্বাস করতেন গীতা আকাশ থেকে পড়েনি। তা মানুষেরই সৃষ্টি। মানুষের মনের নিবিড় পর্যবেক্ষণ গীতা। মহাভারতকে গান্ধী তুলনা করতেন ঈশপের গল্প বা পঞ্চতন্ত্রের সঙ্গে। গান্ধীর কাছে গীতা ‘‘ধর্মশাস্ত্র’’, ইতিহাস নয়।’ (সায়ম বন্দোপাধ্যায়, ‘রাজনৈতিক ধর্ম্ম: একটি তদন্ত, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭, দেশ।) অদ্বৈত বেদান্ত মতকে মেনে নিয়েও তিনি হিন্দুধর্মের নানা বিষয় নিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। হিন্দুধর্মকে একটি বিকাশশীল জীবনব্যবস্থার সহগামী করতেই তিনি নিজ ধর্ম নিয়ে তর্ক করেছেন। লালনও ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন, কিন্তু তর্ক করতে কসুর করেননি, ধর্মের নানা কৃত্যাচার নিয়ে প্রশ্ন করেছেন, তাঁর বক্তব্যের সপক্ষে ক্ষুরধার যুক্তিও উপস্থাপন করেছেন। তিনি উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না বটে, কিন্তু উচ্চস্তরের ভাবুক ছিলেন। চিন্তা করার প্রবল শক্তি তাঁর ছিল। কেতাবি শিক্ষায় শিক্ষিত পণ্ডিতরা যা-ই বলুন না কেন, লালনের মধ্যে যে জ্ঞানমনস্কতা ও সমাজমনস্কতা উভয়ই ছিল, সেটা এখন আর কেউই অস্বীকার করতে পারছেন না। মধ্যযুগের মানুষ হয়েও তিনি ছিলেন দারুণ সেনসিটিভ ও প্রোঅ্যাক্টিভ। ইসলাম সম্পর্কেও তিনি বেশ স্বচ্ছ ধারণা পোষণ করতেন, তবে তা আলাদা রকমের ধারণা। মক্তব-মাদ্রাসায় পড়াশোনা না-করেও ইসলাম ধর্মের নানাদিক সম্পর্কে একটি উচ্চস্তরের অথচ ভিন্নমাত্রিক ধারণা রপ্ত করেছিলেন সহজাত সক্ষমতা দিয়ে। এই সক্ষমতা অর্জন করেছিলেন মুসলমান সমাজের নানা কায়কর্ম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। তবে তিনি গড়পড়তা ইসলামের কথা বলতে চাননি। গড়পড়তা ইসলামি কনসেপ্টটি ভেঙেচুরে নিজস্ব কনসেপ্টে ইসলামের ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিলেন। কিন্তু প্রচার-সর্বস্ব শরিয়তপন্থীরা সেটা বুঝতে পারেননি। এ কারণেই সম্ভবত শরিয়তপন্থীদের উদ্দেশ করে লালন বলেছেন, ‘বে-এলেম বে-মুরিদ জনা/ শরিয়তের আঁক চেনে না/ কেবল মুখে তোড় ধরে।’ এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আজকের দিনে বেঁচে থাকলে তিনি কি মরমিয়া পথে হাঁটতে পারতেন? পৃথিবীর তাবৎ ধর্ম সম্পর্কে এমন মুক্তভাবে নিজ দৃষ্টিভঙ্গি কি উপস্থাপন করতে পারতেন? তিনি কি সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদীদের আক্রমণের শিকার হতেন না? অনেক ক্ষেত্রেই তো তিনি ইসলামের ভিন্নমাত্রিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন:
‘এমন দিন কি হবে রে আর/ খোদা সেই করে গেল/ রসুলরূপে অবতার।’
কিংবা,
‘আদমেতে পয়দা করে/ খোদছুরাতে পরওয়ার/ছুরাত বিনে পয়দা কিসে হইল/ সে কি হঠাৎকার।’

উল্লিখিত গানের প্রথম পদে নবি করিম (সা.)-কে তিনি আল্লাহর অবতার হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এটা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। দ্বিতীয় পদে, আল্লাহর সাকাররূপের বর্ণনা করা হয়েছে, কিন্তু ইসলামি বিশ্বাসে নিরাকার আল্লাহর কথাই বলা হয়েছে বারবার। কিন্তু লালন ছিলেন সাকারবাদী, তবে পৌত্তলিক নন। তিনি ছিলেন মানুষতত্ত্বে বিশ্বাসী একজন যুক্তিবাদী, তার্কিক ব্যক্তিত্ব। নদীয়াতে এক সময় নব্য ন্যায়ের চর্চা ছিল। শ্রাদ্ধে, উপনয়নে ও ধর্মসভায় নানা বিষয় নিয়ে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা তর্ক-বিতর্ক করতেন। মুসলমান মওলানারাও তর্কযুদ্ধ বা বাহাসে অবতীর্ণ হতেন। এই তর্কযুদ্ধ মানুষ প্রাণভরে উপভোগ করত এবং তা থেকে অনুপ্রাণিত হত। তর্কযুদ্ধের ভাব-তরঙ্গ গ্রামবাংলাতে ছড়িয়ে পড়েছিল। লালনের মধ্যে যে-তর্ক করার প্রবণতা ছিল, সেটা তিনি নদীয়ার ন্যায়ের চর্চা থেকে আহরণ করেছিলেন। তিনি ধর্মহীন কিংবা নিরীশ্বরবাদী ছিলেন না বটে, কিন্তু ধর্মের যা কিছু গ্রহণ করেছেন তা জেনেবুঝেই করেছেন, অন্ধভাবে গ্রহণ করেননি। মনুষ্যসৃষ্ট জাতধর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই তিনি মানবতাবাদী ফকিরি ধর্ম বেছে নিয়েছিলেন। লালনের অনেক আগে, মধ্যযুগের ভারতীয় সন্ত-সাধক কবির, রামদাস, তুলসীদাস, দাদু প্রমুখও ভক্তিমান সন্ত ছিলেন, তাঁরাও মানবধর্মের উপাসক ছিলেন। মেনে নেননি জাতধর্মের বাড়াবাড়ি। প্রচলিত ধর্মের গণ্ডির বাইরে দাঁড়িয়ে তাঁরা এক নিরঞ্জনের উপাসনা করেছেন। কয়েকশো বছর পর লালনও বলেছেন, ‘রাম-রহিম-করিম-কালা এক আত্মা জগৎময়।’ এক ধর্মের সঙ্গে অন্য ধর্মের কোনও পার্থক্য খুঁজে পাননি। পূজা, নামাজ, হজ্ব কিংবা তীর্থদর্শনের মাধ্যমে সাঁই নিরঞ্জনের সন্ধান না-করে, খোঁজ করেছেন ভক্তি ও প্রেম দিয়ে। মনে করতেন আলেক সাঁইয়ের কাছে হিন্দু কিংবা যবন বলে কিছু নেই, তাঁর কাছে সবাই সমান। তাঁকে পাওয়া যায় কেবল ভক্তির মাধ্যমে। লালনের মতো মহাত্মা গান্ধীও ছিলেন যুক্তিবাদী মরমিয়া, যুক্তি দিয়ে হিন্দুধর্মের সত্যকে গ্রহণ করতে চেয়েছেন। দুজনেই ছিলেন এক বিস্ময়কর ও বিতর্কিত মানুষ, অথচ অমর। তবে গান্ধীর মতো লালনের বিশ্বজোড়া পরিচিতি-খ্যাতি ছিল না। পশ্চিমা দুনিয়ায় ছেলে-বুড়ো সবাই গান্ধীজিকে চেনেন-জানেন। বিংশ শতাব্দীর যে কয়েকজনের নাম সর্বজনবিদিত তাঁদের একজন তিনি। পশ্চিমা দুনিয়ায় উচ্চস্তরের একাডেমিক পরিমণ্ডল ছাড়া লালনের এখনও তেমন পরিচিতি নেই বললেই চলে। লালন প্রথাগত পদ্ধতিতে ধর্ম পালন করতেন না, প্রচণ্ড যুক্তিবাদী ছিলেন তিনি। গান্ধীও যুক্তিবাদী ছিলেন, কিন্তু নিরীশ্বরবাদী ছিলেন না। তিনি ছিলেন বৈদিক দর্শনে আস্থাশীল নিষ্ঠাবান হিন্দু, তারপরও বলেছেন, এই ধর্মের ‘ক্ষয় ও বৃদ্ধি, ঋতুর পরিবর্তন তাকে প্রভাবিত করেছে।’ তিনি মনে করতেন, এই ধর্মের ‘শরৎ, গ্রীষ্ম, শীত ও বসন্ত আছে। বৃষ্টি তাকে পুষ্টি যোগায়, তাকে ফলন্ত করে। ধর্মগ্রন্থেও এর ভিত্তি আছে, আবার নেইও।’ তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, ‘হিন্দুধর্মের কোন সুনির্দিষ্ট মতবাদ নেই।’ বলেছেন, সত্য আর অহিংসাই আমার ধর্মমত।– কোন মানুষ ঈশ্বরে বিশ্বাস না করেও নিজেকে হিন্দু বলতে পারে। অক্লান্ত সত্যেন্বষাই হিন্দুধর্ম। সকল ধর্মের চেয়ে হিন্দুধর্ম সহিষ্ণু এ তো বিনিশ্চিত। হিন্দু ধর্মমত সকলকে আপন করে নেয়। (ইয়ং ইন্ডিয়া, ২৪ এপ্রিল ১৯২৪) হিন্দুধর্মের আচার-আচরণ পালনের চেয়ে প্রেম ও মানবিকতাকে তিনি অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন।

Advertisement

লালনের মতো গান্ধীর মন ও ভাব ছিল মরমি ছাঁচে ঢালা। দুজনেই ছিলেন জিজ্ঞাসু, দুজনেই মরমিয়া। লালন বলেছেন, ‘কি কালাম পাঠাইলেন আমার সাঁই দয়াময়/ এক এক দেশে এক এক বাণী কোন খোদা পাঠায়?’ লালনের প্রশ্ন সব বাণী যদি খোদার হয়, তা হলে তিনি বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকমের বাণী পাঠিয়েছেন কেন? এক খোদা একেক দেশে একেক রকমের বাণী পাঠাতে পারেন না। এসব যুক্তি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, লালন হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও হিন্দুধর্মের সবকিছু অন্ধভাবে মেনে নেননি। আবার মুসলমান পরিবারে জন্মালে বা ধর্মান্তরিত মুসলমান হলেও তিনি ইসলামি শরা-শরিয়ত মানতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন লোকায়ত-মানবিক ধারার স্বনির্মিত ইসলাম ধর্মে। নির্জন পথের পথিক হয়েও এক সাহসী ও লড়াকু যোদ্ধা। অন্যদিকে, বিশ্বজোড়া খ্যাতি থাকা সত্ত্বেও মহাত্মা গান্ধী ধর্ম বিষয়ে লালনের মতো অত সাহসী ছিলেন না। চিন্তা-চেতনায় খানিকটা ব্যতিক্রমী হলেও গান্ধীজি ছিলেন নিষ্ঠাবান ধার্মিক। গাঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন বেদ, উপনিষদ, পুরাণে। অবতার, পুনর্জন্ম, বর্ণাশ্রমপ্রথা ও মূর্তিপূজাকেও তিনি অবিশ্বাস করতেন না। তবে হিন্দুধর্মের জাতপাত ও অস্পৃশ্যতা মেনে নিতে পারেননি। লড়াই করেছেন বর্ণবিদ্বেষ উচ্ছেদে। বর্ণবিদ্বেষ, জাতপাত ও অস্পৃশ্যতার অসারতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, অস্পৃশ্যতা কেবল অপ্রয়োজনীয় নয়, অসঙ্গতও বটে। অস্পৃশ্যতার প্রতি ঘৃণা জানিয়ে বলেছেন, ‘যে-ধর্ম গরুকে পূজা করতে বলে, তা মানুষকে অমন নিষ্ঠুর ও অমানবিকভাবে বর্জন করতে পারে না। দলিত শ্রেণির মানুষদের আপনজন বলে স্বীকার করবো না? তাহলে আমাকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলা হোক।’ তিনি বলেছেন, অস্পৃশ্যতা পাপ, ওটা শয়তানের চাল। শয়তান সর্বদা শাস্ত্রের দোহাই দেয়। কিন্তু শাস্ত্র তো বিবেকের চেয়ে বড় নয়। বিবেকের সত্যকে উদ্ভাসিত করার জন্য শাস্ত্র রচিত হয়েছে। তিনি নিয়মিত ভাগবতগীতা ও তুলসীদাসের রামায়ণ পাঠ করতেন। এগুলো থেকেই তিনি সান্ত্বনা, শান্তি ও আধ্যাত্মিক পুষ্টি সংগ্রহ করতেন। কিন্তু রামায়ণের প্রতিটি শব্দ অন্ধভাবে মেনে নিতে পারেননি, গ্রন্থটির ভেতর যে-আধ্যাত্মিকতা রয়েছে সেটা তাঁকে মুগ্ধ করেছে। ‘শূদ্রদের বেদাধ্যয়নের অধিকার নেই’, কথাটি তিনি আক্ষরিক অর্থে সমর্থন করতে পারেননি। তিনি মনে করতেন, ‘সংস্কারাচ্ছন্ন, মূর্খ ও অজ্ঞানই শূদ্র। এমন লোকেরা বেদাধ্যয়নের অনর্থ ঘটাবে।’ অর্থাৎ শাস্ত্র অধ্যয়নকারী ও বিশ্লেষণকারীকে অবশ্যই জ্ঞানী ও ভক্তিমান হতে হয়। যার ভক্তি নেই তিনি শূদ্র। ‘যতদিন আমরা ক্রীতদাস, ততদিন আমরা সবাই মূলত শূদ্র। জ্ঞান কোন শ্রেণির বা সমাজের একচেটিয়া নয়।’

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এখনও আমরা ভেদবুদ্ধির অচলায়তন ভেঙে উপমহাদেশের কোথাও সমতাভিত্তিক মুক্ত সমাজ গড়তে পারিনি। লালন-গান্ধী অন্ধযুগের অচলায়তন ভাঙতে চেয়েছিলেন, তবে প্রবল-পরাক্রান্তের সঙ্গে লড়াই করে কুলিয়ে উঠতে পারেননি। দুজনকেই অবিশ্বাস আর সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছে। অথচ তাঁরা দুজনেই জগতের সব মানুষকে ভালবেসে গেছেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরও গান্ধীজি মুসলমান-সমাজকে দূরে ঠেলে দিতে চাননি। তাঁর প্রার্থনাসভায় নিয়মিত কোরান পাঠ করা হত। এজন্য তিনি ‘মুসলমান-তোষক’ হিসেবে চিহ্নিত হন। দেশভাগের পর ৩১ অক্টোবর প্রার্থনাসভার প্রাক্কালে দুজন ক্ষোভ প্রকাশ করেন যে, কোনওভাবেই প্রার্থনাসভায় কোরানপাঠ করা চলবে না। গান্ধীকে তাঁরা চিঠি লিখেও জানান। কিন্তু গান্ধীজি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, প্রার্থনাসভায় কোরান পাঠ হবে, যাদের পছন্দ হবে না তারা যেন প্রার্থনাসভা থেকে নিজেদের বিযুক্ত করে নেন। গোটা উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমান মেরুকরণ তীব্রতর হওয়ার পরও তিনি প্রার্থনাসভা থেকে কোরান পাঠ প্রত্যাহার করতে রাজি হননি। তিনি বলেছেন, আমি হিন্দু, আমি মুসলমান, আমি খ্রিস্টান, আমি জরথ্রুস্টবাদী, কিন্তু আমি নাস্তিক নই। গান্ধীজিকে এক নাস্তিক ভক্ত বলছেন, ‘ধর্ম না থাকলে রাজনীতি হিংসামুক্ত হতে পারে। কী হবে ধর্ম?’ গান্ধীজি তাকে বলছেন, ‘ঈশ্বরকে বাইরে খুঁজছ, তাই তুমি নাস্তিক। ঈশ্বরকে খোঁজা নিজের থেকে মানে আত্মা থেকে শুরু করো, তাহলেই আর হানাহানি থাকে না।’ কী অসাধারণ মুক্তচিন্তার পরিসর, কী উদার দৃষ্টিভঙ্গি! লালনও এমন প্রসারিত দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ ছিলেন, তিনিও সর্বধর্মের সারকথা গ্রহণ করেছিলেন। তাই ‘এক জেতের বোঝা লয়ে’ মরতে চাননি। গান্ধীজির মতো বৃহৎ পরিসরে তিনি ধর্মমত প্রচারের সুযোগ পাননি। এক ক্ষুদ্র পরিসরে গানকে হাতিয়ার করে তিনি তাঁর মতাদর্শ প্রচার করে গেছেন। লালনের আবির্ভাবকালে অবিভক্ত বাংলাজুড়ে ব্রাহ্মণ্যবাদের চোখরাঙানি ছিল, বৈষ্ণবদের মধ্যেও অবক্ষয় দেখা দেয়। খ্রিস্টান পাদরিরা কারণে-অকারণে যিশুর মহিমা আর খ্রিস্টধর্মের গৌরবগাথা প্রচারের নামে বাড়াবাড়ি করতে থাকে। নিম্নবর্গীয় প্রান্তিক মানুষ ধোঁয়াশায় পড়ে খ্রিস্টধর্মের বিশাল পাখনার নিচে জড়ো হতে থাকেন। হাজি শরিয়তুল্লাহ, কেরামত আলি, দুদ্দু মিয়া, মুনসি মেহেরউল্লাহর মতো মৌলভী গ্রাম-জনপদে সহজ-সরল মুসলমান সমাজকে উগ্রপন্থার দিকে চালিত করার জোর প্রচার চালিয়ে যেতে থাকেন। ধর্মের নামে হিন্দু ও মুসলমান সমাজ অসহিষ্ণু ও পরধর্মবিদ্বেষী হয়ে ওঠে। সমাজে হিংসা-হানাহানি বাড়তে থাকে, সৃষ্টি হয় বিভেদের উঁচু পাচিল। এসব ঘটনা প্রতিহত করার সাংগাঠনিক ক্ষমতা বা লোকবল লালন ও তাঁর অনুসারীদের ছিল না। তাই বোধ হয় গানকেই বেছে নিয়েছিলেন প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার হাতিয়ার হিসেবে। তিনি একটি গানে বলছেন: ‘ব্রহ্মজ্ঞানী আর খ্রিস্টানেরা,/ নাম-ব্রহ্মসার বলেন তারা/ দরবেশ কয় বস্তু কোথায়/ দেখ নারে।’ তিনি প্রশ্ন তুলছেন: ‘নয়নে রূপ না দেখতে পায়/ নামমন্ত্র জপিলে কী হয়?’

লালন বাস্তববাদী ছিলেন, তাই আচারসর্বস্ব ব্রাহ্ম ও খ্রিস্টান ভক্তদের প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করতে পেরেছিলেন। কোন সম্প্রদায় বা জাতধর্মে তাঁর জন্ম তা জানা যায় না, তবে তাঁর ধর্মভাবনা ও চিন্তাধারা ইসলামের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল, এটা খুব ভালভাবেই বোঝা যায়। কিন্তু ইসলামের নামাজ, রোজা, হজ প্রভৃতি বিষয়গুলি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। লালন ইসলাম বা কোনও ধর্মের-ই বিরোধী ছিলেন না, যারা তাঁকে ধর্মবিরোধী অপ-অভিধায় ভূষিত করতে চান, তারা মূলত ধান্দাবাজ। তিনি যে-ইসলামের কথা বলেছেন তা আসলে মানবিক-ইসলাম। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ তাই স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছেন, মানবগুরুর কৃপা ছাড়া এবাদত-বন্দেগি হবে না। গুরু পথপ্রদর্শক, আলোর পথের দিশারী। গুরুর জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে জগৎ-জীবনের ভেদরহস্য জেনে নিতে হয়, তার কৃপা-অনুকম্পা বিনা ধর্মবোধ সম্পন্ন হওয়া যায় না। তিনি বারবার বলেছেন: ‘মুর্শিদ জ্ঞানের দাতা, জ্ঞান ছাড়া ভজন কথা বৃথা/ আছে প্রেম যথাতথা গুরুর ভজন চাই।’ অথচ লালনের এই মানবিক ভাবনা অহংকারী ‘পণ্ডিত কানা’-র দল আজও বুঝে উঠতে পারেননি। ওহাবি-ফরায়েজিদের অনুদার-প্রতিক্রিয়াশীলরা তাঁকে ‘মুতখেকো, ন্যাড়ার ফকির’ প্রভৃতি অপ-অভিধায় ভূষিত করেছে। কেউ আবার বলেছেন, ‘জন্ম পরিচয়হীন জারজ সন্তান’। মওলানা আকরাম খাঁন ‘মুসলিম সমাজের চারিত্রিক ও নৈতিক অধঃপতনে’ লালন ও তাঁর অনুসারী ন্যাড়ার ফকিরদের দায়ী করেছেন। মৌলবি আবদুল ওয়ালির সমালোচনা থেকেও লালন ও বাউলরা রক্ষা পাননি। জীবৎকালে তাঁকে পাষণ্ড, ব্রাত্য, ন্যাড়া, জারজ– এইসব গালমন্দ সইতে হয়েছে। লালনের মতো গান্ধীজিও নানাভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছেন। বি আর আম্বেদকর বলেছেন, ‘আমিই প্রকৃত গান্ধীকে চিনি, কারণ আমি তাঁকে শত্রু হিসেবে চিনেছি। আমাকেই তিনি বিষদাঁত দেখিয়েছিলেন। আরও বলেছিলেন, গান্ধী স্মরণীয় কেউ নন। ভারত সরকার তাঁর স্মৃতি জিইয়ে রাখার জন্য অনেক পয়সা খরচ না করলে গান্ধীকে কেউ মনে রাখত না। (তর্কে-প্রতর্কে গান্ধীজি, দেশ, ২ অক্টোবর ২০২০) মার্কিন ইতিহাসবিদ লেনার্ড গর্ড তাঁর বইয়ে লিখেছেন, গত শতাব্দীর ত্রিশ-চল্লিশ দশকে হিন্দু বাঙালিরা অনেকে তাঁকে ‘গেঁধে শালা’ বলতেন। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে মাওবাদীরা গান্ধীর চেয়ে মাও জে দং-কে বড় করে দেখতেন। তরুণীদের নিয়ে তাঁর আত্মসংযমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে গান্ধীভক্ত এরিক এইচ. এরিকসন তাঁর ‘Gandhi′s Truth – On the Origins of Militant Nonviolence Reissue’ (১৯৬৯) গ্রন্থে সমালোচনা করেছেন। জাতপাত ও অস্পৃশ্যতাবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা নিয়েও ইদানীং প্রশ্ন উঠছে। ইতিহাসবিদ অজয় স্কারিয়া অস্ট্রেলিয় একটি গণমাধ্যমে গান্ধীজি বর্ণবিদ্বেষী কথার ব্যবহার করতেন কি না, সে বিষয়ে একটি হিসাব দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘গান্ধী কি কালো মানুষদের প্রতি বর্ণবিদ্বেষী ছিলেন?’ অথচ বিশ্ববরেণ্য নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার কিং গান্ধীজিকে তাঁদের অনুপ্রেরণা বলে বর্ণনা করেছেন।

হালফিলে দেশে দেশে গান্ধীজির ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় লালনের ভাস্কর্যও ভাঙা হচ্ছে। বিগত শতাব্দীর সত্তরের বিদ্যাসাগরের ভাস্কর্যও ভাঙা হয়েছিল। যারা বিদ্যাসাগরের ভাস্কর্য ভেঙেছিল তাদের ক’জনকে আমরা মনে রেখেছি? বরং বিদ্যাসাগর মহাশয় স্বমহিমায় ভাস্বর। তবে হ্যাঁ, লালন-গান্ধী কোনও ত্রুটিহীন অ-বিতর্কিত মানুষ ছিলেন না। তাঁদের চিন্তা-দর্শন ও জীবনাচরণের মধ্যে ফাঁকফোকর কিংবা বিচ্যুতি থাকতে পারে। তাঁদের ভাবনাচিন্তা সেকেলে-অবাস্তব, কোনও কোনও ক্ষেত্রে প্রগতিবিরোধীও মনে হতে পারে, কিন্তু তাঁদের উপেক্ষা করা যায় না, যাবেও না। বিশ্বের মানুষ এই দুই মানবতাবাদীকে মূল্যায়ন করতে বাধ্য হচ্ছে। অভিযোগ মেনে নিয়েও বলতে হয়, আসলে তাঁরা দুজনেই ছিলেন ভয়ংকর ও অসাধারণত্বের সংমিশ্রণে গড়া অনন্য মানুষ। শেষ নিশ্বাস ত্যাগের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত সত্য-দর্শন থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হননি। তাঁরা দুজনেই মানবসমাজের সামগ্রিক মুক্তির জন্য কাজ করে গেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen − 10 =

Recent Posts

মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধদেব বসু: কালে কালান্তরে

বুদ্ধদেব বসুর অন্যতম অবদান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য (Comparative Literature) বিষয়টির প্রবর্তন। সারা ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়-মানে এ বিষয়ে পড়ানোর সূচনা তাঁর মাধ্যমেই হয়েছিল। এর ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। এর ফলে তিনি যে বেশ কয়েকজন সার্থক আন্তর্জাতিক সাহিত্যবোধসম্পন্ন সাহিত্যিক তৈরি করেছিলেন তা-ই নয়, বিশ্বসাহিত্যের বহু ধ্রুপদী রচনা বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে তাঁরা বাংলা অনুবাদসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। অনুবাদকদের মধ্যে কয়েকজন হলেন নবনীতা দেবসেন, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবীর রায়চৌধুরী প্রমুখ। এবং স্বয়ং বুদ্ধদেব।

Read More »
দেবময় ঘোষ

দেবময় ঘোষের ছোটগল্প

দরজায় আটকানো কাগজটার থেকে চোখ সরিয়ে নিল বিজয়া। ওসব আইনের বুলি তার মুখস্থ। নতুন করে আর শেখার কিছু নেই। এরপর, লিফটের দিকে না গিয়ে সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে উঠে বসল গাড়িতে। চোখের সামনে পরপর ভেসে উঠছে স্মৃতির জলছবি। নিজের সুখের ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ‘ডিফল্ট ইএমআই’-এর নোটিস পড়তে মনের জোর চাই। অনেক কষ্ট করে সে দৃশ্য দেখে নিচে নেমে আসতে হল বিজয়াকে।

Read More »
সব্যসাচী সরকার

তালিবানি কবিতাগুচ্ছ

তালিবান। জঙ্গিগোষ্ঠী বলেই দুনিয়াজোড়া ডাক। আফগানিস্তানের ঊষর মরুভূমি, সশস্ত্র যোদ্ধা চলেছে হননের উদ্দেশ্যে। মানে, স্বাধীন হতে… দিনান্তে তাঁদের কেউ কেউ কবিতা লিখতেন। ২০১২ সালে লন্ডনের প্রকাশনা C. Hurst & Co Publishers Ltd প্রথম সংকলন প্রকাশ করে ‘Poetry of the Taliban’। সেই সম্ভার থেকে নির্বাচিত তিনটি কবিতার অনুবাদ।

Read More »
নিখিল চিত্রকর

নিখিল চিত্রকরের কবিতাগুচ্ছ

দূর পাহাড়ের গায়ে ডানা মেলে/ বসে আছে একটুকরো মেঘ। বৈরাগী প্রজাপতি।/ সন্ন্যাস-মৌনতা ভেঙে যে পাহাড় একদিন/ অশ্রাব্য-মুখর হবে, ছল-কোলাহলে ভেসে যাবে তার/ ভার্জিন-ফুলগোছা, হয়তো বা কোনও খরস্রোতা/ শুকিয়ে শুকিয়ে হবে কাঠ,/ অনভিপ্রেত প্রত্যয়-অসদ্গতি!

Read More »
শুভ্র মুখোপাধ্যায়

নগর জীবন ছবির মতন হয়তো

আরও উপযুক্ত, আরও আরও সাশ্রয়ী, এসবের টানে প্রযুক্তি গবেষণা এগিয়ে চলে। সময়ের উদ্বর্তনে পুরনো সে-সব আলোর অনেকেই আজ আর নেই। নিয়ন আলো কিন্তু যাই যাই করে আজও পুরোপুরি যেতে পারেনি। এই এলইডি আলোর দাপটের সময়কালেও।

Read More »