Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

বিশেষ নিবন্ধ: মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

এশিয়ার বুকে বাংলার গর্ব: বৃহত্তম পেয়ারা বাগান ও ভাসমান বাজারের জীবন্ত মহাকাব্য

বাংলার হৃদয়ে লুকিয়ে আছে এমন এক জলজ জনপদ, যার নাম উচ্চারণমাত্রই জাগে নদীর কলতান, পেয়ারার সুবাস আর ভাসমান জীবনের রূপকথা। ভিমরুলী, আটঘর, কুরিয়ানা— বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও বরিশালের সীমান্তে অবস্থিত এই ত্রিকোণীয় জলাভূমিই এশিয়ার বৃহত্তম পেয়ারা বাগানের লীলাভূমি। প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত এই বাগান কেবল কৃষি উৎপাদনের মাঠ নয়, এটি একটি সমগ্র সভ্যতার প্রতীক, যেখানে প্রকৃতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি মিলেমিশে একাকার।

প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে এই জনপদের জীবনযাত্রায় শুরু হয় এক মহাযজ্ঞ। প্রায় ত্রিশ হাজার কৃষক তাদের ডিঙি নৌকা বেয়ে পৌঁছে যান বাগানে, যেখানে লক্ষাধিক পেয়ারা গাছের শাখা ফলভারে নুয়ে পড়েছে। জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে এই অঞ্চল পরিণত হয় এক স্ফটিকসবুজ সাম্রাজ্যে। কিন্তু এখানকার প্রকৃত বিস্ময় লুকিয়ে আছে বিকেলের আড়ালে— ভিমরুলী ভাসমান বাজারে, যা দক্ষিণ এশিয়ার একক ও অনন্য দৃষ্টান্ত। সকাল আটটা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত খালের বুকে জমে ওঠে শতাধিক নৌকার সমারোহ। প্রতিটি নৌকাই এক চলন্ত বাজার— কৃষক নিজেই বিক্রেতা, কোনও দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর অনুপ্রবেশ নেই এখানে। চোখের সামনেই দর-কষাকষি, হাসিমুখে লেনদেন, আর নৌকার তলদেশে সাজানো থাকে পেয়ারার পাহাড়। শুধু পেয়ারা নয়, মৌসুম-ভেদে চালতা, আমড়া, কাঁঠাল, এমনকি শাকসবজিও ভেসে ওঠে এই জলের বাজারে।

এই ভাসমান ব্যবস্থার অর্থনৈতিক শক্তি অপরিমেয়। প্রতিদিন এখানে কেনাবেচা হয় প্রায় একশত টন পেয়ারা, যা ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা-সহ দেশের দূরতম জেলায় পৌঁছে যায় পরিবহণ শ্রমিকদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। প্রথাগত পদ্ধতির এই চাষাবাদে এখন যোগ হচ্ছে আধুনিকতার ছোঁয়া। বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় জৈব চাষ পদ্ধতি সম্প্রসারিত হচ্ছে, পাশাপাশি নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে ফল সংগ্রহ, বাছাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণে। স্থানীয় কৃষি সমবায় সমিতির তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে নারী অংশগ্রহণ বেড়েছে ৪০%, যা কেবল উৎপাদনই বাড়ায়নি, নারীর আর্থ-সামাজিক মর্যাদাও রূপান্তরিত করেছে।

ভাসমান এই বাজার আজ পর্যটনের ম্যাগনেট। প্রতি বছর হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক আসেন এই প্রাকৃতিক অলৌকিকতা দেখতে। থাইল্যান্ডের দ্যামনোয়েন সাদুয়াক বাজারের সঙ্গে তুলনা হলেও ভিমরুলীর স্বকীয়তা অন্য মাত্রায়। এখানে বাণিজ্যিক চাকচিক্য নয়, গ্রামীণ জীবনের অকৃত্রিম সৌন্দর্য প্রধান আকর্ষণ। বাংলাদেশ পর্যটন উন্নয়ন কর্পোরেশন ইতিমধ্যে ‘ভিমরুলী ভাসমান বাজার’ ব্র্যান্ডিং করে এটিকে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে স্থান দিয়েছে। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও কম নয়— পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো, পরিবেশবান্ধব ট্রলার সার্ভিস এবং স্থানীয় পণ্যের বাজারজাতকরণ এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।

Advertisement

এই জনপদের গভীরতর তাৎপর্য লুকিয়ে আছে তার পরিবেশ-সহিষ্ণু দর্শনে। এখানকার মানুষ নদীকে শত্রু ভাবেন না, বরং তাকে সঙ্গী করে বেঁচে থাকার কৌশল রপ্ত করেছেন। পেয়ারা গাছের শেকড় মাটির ক্ষয় রোধ করে, ভাসমান বাজার প্লাস্টিকবর্জ্য সৃষ্টি করে না, এবং সমগ্র উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কার্বন ফুটপ্রিন্ট নগণ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে ভিমরুলীর মডেল বিশ্ববাসীকে শেখায়, কীভাবে প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় করে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।

ভিমরুলী কেবল পেয়ারার দেশ নয়, এটি বাংলার সংস্কৃতির এক জীবন্ত আর্কাইভ। যখন কোনও কৃষক নৌকায় ভরে পেয়ারা নিয়ে খাল পাড়ি দেন, যখন পাইকারের ডাকে মুখরিত হয় নদীর জল, অথবা যখন কোনও পর্যটক নৌকায় বসে পেয়ারার মিষ্টি ঘ্রাণে বিমোহিত হন— সেই মুহূর্তগুলোই রচনা করে বাংলার এক নতুন লোককাহিনি। এই জনপদ প্রমাণ করে, একটি সাধারণ ফলও পারে এক সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক ভিত্তি হয়ে উঠতে, সংস্কৃতিকে উজ্জীবিত করতে, বিশ্বদরবারে একটি জাতির গর্বের পরিচয় বহন করতে। ভাসমান এই জীবনকাব্য আমাদের শেখায় প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের মন্ত্র— যেখানে জল বাধা নয়, বরং সম্ভাবনার অবারিত পথ।

চিত্র: এমদাদুল ইসলাম বিটু/গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen − six =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর চারটি কবিতা

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »
সালমিন রহমান

বেলুচিস্তান সংকট মোকাবিলা কতটা সহজ

বেলুচিস্তানের সংকটকে কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদ কিংবা কেবল নিরাপত্তা সমস্যার দৃষ্টিতে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি বোঝা যায় না। এখানে ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, প্রাকৃতিক সম্পদ, উন্নয়ন বৈষম্য, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা— সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্বাধীন বেলুচিস্তান গঠিত হলে বহু মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে পারে। একই সঙ্গে একটি নতুন রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াবে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা। অন্যদিকে, পাকিস্তান, চীন, ভারত এবং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

Read More »