Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

লালন ও কাঙাল হরিনাথ মজুমদার: মরমি ও মানবদরদি

উনিশ শতকের মত এমন সুখকর সময় বোধহয় বাঙালি জীবনে কখনও আসেনি। এই শতকেই বেঙ্গল রেনেসাঁসের উতল হাওয়ার পরশে বসন্ত আসে কলকাতায়— এমনকী নিস্তরঙ্গ মফস্বলে। শিহরণ জাগে প্রত্যন্ত জনপদের অজপাড়াগাঁয়েও। সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজনীতি, শিক্ষা বিভাগ সকল ক্ষেত্রেই নতুন যুগের প্রবর্তন হয়। এই পটভূমিতে আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠে মহানগর কলকাতা, জেগে ওঠে মফস্বল শহর কুমারখালি। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে, ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় অনেকেই গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় পাড়ি জমান। রামমোহন, দ্বারকানাথ, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাতে হাত রেখে যখন কলকাতা ও তৎসন্নিকটবর্তী এলাকার হিন্দু সমাজের ঘুম ভাঙে, কুমারখালির মত গ্রামদেশে লেখক, সাহিত্যসেবী, সাহিত্যস্রষ্টা, সংবাদপত্রের সম্পাদক হিসেবে আবির্ভূত হন কাঙাল হরিনাথ মজুমদার (১৮৩৩-১৮৯৬)। তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষানুরাগী, সমাজ-সংস্কারক, রায়ত-কৃষকপ্রেমী। কাঙাল হরিনাথ মূলত উনিশ শতকের গ্রামীণ মনীষীদের মধ্যে প্রধান পুরুষ। তাঁর প্রধান পরিচয় ছিল সাহিত্যসেবী হিসেবে। তবে বিশুদ্ধ সাহিত্যিক বলতে যা বোঝায় তা তিনি ছিলেন না, মানুষের মধ্যে সুভাব, সুনীতি, ধর্মবোধ, মানবপ্রীতি জাগিয়ে তোলার জন্য কলম ধারণ করেন। তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকার প্রকাশনা। গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকার সম্পাদক ও লেখক হিসেবে হরিনাথের মূল্যায়ন করতে গিয়ে তাঁর সাহিত্য-শিষ্য দীনেন্দ্রকুমার রায় যে মন্তব্য করেছেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন:

‘…হরিনাথ উদরান্নের সংস্থানের আশায় সম্পাদকের বৃত্তি অবলম্বন করেন নাই, স্বত্বাধিকারীর মনোরঞ্জনের জন্য ভাড়াটে সম্পাদকের মত তাঁহাকে আত্মসম্মান বিক্রয় করিতে হয় নাই।… আর্তের পরিত্রাণের জন্য, উৎপীড়কের দমনের জন্য তিনি লেখনীর ব্যবহার করিয়াছিলেন।’

গ্রামবার্ত্তা-র মাধ্যমেই তিনি জমিদারতন্ত্র ও নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। গ্রামবার্ত্তা প্রকাশনা ও সম্পাদনার জন্য বহু বিশিষ্টজনের সান্নিধ্য লাভ করেন তিনি। সাহিত্যচর্চা ও পত্রিকা প্রকাশনার জন্যই কাঙাল হরিনাথকে কেন্দ্র করে নিভৃতপল্লি কুমারখালিতে গড়ে ওঠে একটি সাংস্কৃতিক বলয় ও সাহিত্যচক্র। এরই সাংস্কৃতিক বলয় হরিনাথকে পত্রিকা-প্রকাশনা ও ফিকিরচাঁদের বাউলদল গঠনে সক্রিয় সহায়তা প্রদান করেন। যারা তাঁকে সহায়তা প্রদান করেন তাঁদের মধ্যে অনেকেই উত্তরজীবনে খ্যাতিমান সাহিত্য-ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। ‘এঁদের মধ্যে মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১১), জলধর সেন, তন্ত্রাচার্য শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণব (১৮৬০-১৯১৩), ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় (১৮৬১-১৯৩৯), দীনেন্দ্রকুমার রায় (১৮৬৯-১৯৪৩), কবি-ঔপন্যাসিক চন্দ্রশেখর কর (১৮৬১-?) প্রমুখের নাম বাংলা সাহিত্যে সুপরিচিত। কাঙালের এই মধুচক্রে বাউল-শিরোমণি লালন সাঁই (১৭৭৪-১৮৯০) এরও আন্তরিক যোগ ছিল।’

গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা।

বিদ্যাসাগর, ঈশ্বর গুপ্ত, অক্ষয়কুমার দত্ত, রাজনারায়ণ বসু, কালীপ্রসন্ন ঘোষ প্রমুখের কাছে যদি আমাদের ভাষা ও সাহিত্য ঋণী থাকে, তাহলে কাঙালের মধুচক্রের ঋণও অস্বীকার করা যাবে না। প্রকৃতপক্ষে কাঙাল হরিনাথ নিজেই একটি ইনস্টিটিউট ছিলেন, তিনিও মফস্বলের মানুষকে জাগ্রত করতে বলিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। কাঙালের প্রেরণায় মীর মশাররফ হোসেন হয়ে ওঠেন লব্ধপ্রতিষ্ঠ গদ্যশিল্পী। লেখক ও সাংবাদিক দীনেন্দ্রকুমার রায় সুদূর মেহেরপুর থেকে কাঙালের প্রাণস্পর্শী টানে পায়ে হেঁটে কিংবা গোরুর গাড়ি যোগে কুমারখালি ছুটে যেতেন। তিনিও ছিলেন বড়মাপের গদ্যশিল্পী ও ডিটেক্টিভ কাহিনি রচয়িতা।

দুর্ভাগ্যের বিষয়ের হলেও সত্য যে, মফস্বলে জন্ম নেয়া বিদ্যাসাগর কিংবা রামতনু লাহিড়ী প্রমুখ ব্যক্তিত্বের বৈভবমণ্ডিত জীবন-কাহিনি নিয়ে যত কথা আমরা বড়-মুখ করে বলি, তার এক-দশমাংশও বলা হয় না লালন ফকির কিংবা কাঙাল হরিনাথকে নিয়ে। অথচ বিচিত্র অভিজ্ঞতায় গৌরবমণ্ডিত ছিল তাঁদের জীবন। তাঁরাও উদার ও মানবিক সমাজ গড়তে কাজ করেছেন। মাইকেলের প্রেম, রোম্যান্টিকতা, বিরহ, হাহাকার, উত্থান-পতন, খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ নিয়ে হুজুগে বাঙালি ও তাঁর যশ-প্রত্যাশী বুদ্ধিজীবীরা কত মাতামাতিই না করে চলেছেন! অন্যদিকে, সেই হুজুগের ধাক্কায় অখ্যাত ও অবজ্ঞাত থেকে যাচ্ছেন কুমারখালির কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের দুঃসাহসিক সাংবাদিকতার গৌরবগাথা, লাহিনীপাড়ার মীর মশাররফ হোসেনের গদ্যচর্চা, মেহেরপুরের দীনেন্দ্রকুমার রায়ের সাহিত্যনিষ্ঠা এবং ফকির লালনের দ্রোহ-প্রেম ও মানবিকতার ইতিবৃত্ত। অথচ এঁরা রামমোহন, দেবেন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর, দীনবন্ধু মিত্র, কেশবচন্দ্র সেন, রবীন্দ্রনাথের প্রায় সমসাময়িক ছিলেন। অজপাড়াগ্রামের শিক্ষাদীক্ষাহীন বাতাবরণে বসবাস করেও এঁরাও মানবিকতার কথা বলেছেন, উন্নত জীবনাদর্শের পথ দেখিয়েছেন। এঁরাও আলোর পথের যাত্রী হিসেবে পল্লি-উন্নয়নের মাধ্যমে জনজীবন থেকে অন্ধকার ঘুচিয়ে জ্ঞানের দীপশিখা জ্বালাতে চেয়েছেন। এঁরাও বিশ্বমানের সাহিত্যস্রষ্টা ছিলেন। কিন্তু আমাদের উন্নাসিক-নগরমনস্ক বিদ্যাজীবীরা সাহিত্য-সমাজ-সংস্কৃতি অঙ্গনের এই হৃদয়বান ও মেধাবী সন্তানদের অবদান তেমন আমলে নেননি, গুরুত্ব দেননি। গ্রাম্য বুদ্ধিজীবী, ইংরেজি কিতাবের সঙ্গে সংযোগহীন বলে কেবলই অবহেলা ও উপেক্ষা করা হয়েছে নানাভাবে। তবে লালন সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন এক সময়ের কুষ্টিয়ার মহকুমা প্রশাসক চিন্তানায়ক অন্নদাশঙ্কর রায়। তিনি বলেছেন: বাংলার নবজাগরণে রামমোহনের যে গুরুত্ব বাংলার লোকমানসের দেয়ালী উৎসবে লালনেরও সেই গুরুত্ব।

ইতিহাসবিদ অমলেন্দু দে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে বলেছেন:

‘উদার মানবতাবাদী ভাবধারা বিকাশে লালন শাহের ও রামমোহনের ভূমিকার এক তুলনামূলক আলোচনা করা যায়। আর তার ফলেই কলকাতা শহরের বুদ্ধিজীবীদের ও গ্রামের উপেক্ষিত জনসাধারণের চিন্তাধারায় ছবিটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমরা দেখতে পাই, পশ্চিমী হাওয়ার সংস্পর্শে না আসতে পারলেও গ্রামের সাধক ও মরমী কবিদের প্রভাবে এই উপেক্ষিত জনসাধারণের মনোজগৎ কলকাতার শিক্ষিতদের তুলনায় কম সমৃদ্ধ ছিল না।… দুর্ভাগ্যবশত রামমোহনের ভূমিকা আলোচনায় লোকসংস্কৃতির প্রবাহটির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয় না।’

অথচ লালনও তাঁর চারপাশের সমাজকে মানবিক করে তোলার জন্য গ্রামে গ্রামে গান গেয়ে বেড়িয়েছেন। সেই গানের শাণিত যুক্তি মানুষের মুখে মুখে ফিরত, সঞ্চারিত হত জনমনে।

লালন যখন গ্রাম-জনপদের আসরে আসরে গান গেয়ে বেড়াচ্ছেন, মোল্লা-মৌলভীদের সঙ্গে যুক্তি দিয়ে বাহাস করে বেড়াচ্ছেন, তখন লালনের জীবনসূর্য মধ্যগগন থেকে কিছুটা পশ্চিমে ঢলে পড়েছে, কিন্তু বয়সের ভার তাঁর শরীর-মনের তেজকে একটুও কমাতে পারেনি। সে সময় কাঙাল হরিনাথ নিতান্তই তরুণ। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন শিক্ষকতা। পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছেন সাংবাদিকতা। হরিশচন্দ্র মুখার্জির ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তিনি লক্ষ করেন, গরিব কৃষক-রায়ত শ্রেণির অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা। তিনি বেশ ভালভাবে বুঝতে পারেন যে, বাংলার কৃষকসমাজের ওপর কেবল নীলকর সাহেবরাই অত্যাচার করে না, দেশীয় জমিদাররাও তাদের নিষ্ঠুর নিপীড়নের স্টিমরোলার চালায়। শ্রেণিচরিত্রে এদের মধ্যে প্রভেদ ছিল না। উনিশ শতকে বঙ্গসমাজের একদিকে ছিল সমাজ সংস্কার ও সমাজ উন্নয়ন, জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা, স্বদেশচিন্তা, মুক্তবুদ্ধিচর্চা— অপরদিকে ছিল প্রজাপীড়ন, ধর্মান্ধতা এবং শাস্ত্র-কেতাব-লোকাচার নিয়ে মোল্লা-পুরোহিতদের বাড়াবাড়ি। তবে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি ছিল না লালন ও তাঁর ভক্তদের মধ্যে। লালনপন্থিরা বৈরাগ্যসাধন করলেও যাপন করতেন গার্হস্থ্য জীবন, আখড়াবাসী হয়েও ছিলেন দারুণ জীবনরসিক। সংসার ছেড়ে যাঁরা বনজঙ্গলে-পাহাড়ে আশ্রয় নেয়, লালন তাদের প্রতি তীব্র কশাঘাত হেনেছেন। তিনি কঠোর-বাস্তববাদী ছিলেন। তাই অস্বীকার করেননি নারী সংসর্গের আবশ্যকীয়তা, মানবিক প্রবৃত্তি ও যৌনতা। বিশ্বাস করেছেন বলিষ্ঠ জীবনপ্রত্যয়ে, বিশ্বাস করেছেন সহজ-সরল জীবনাচরণে। ফলে লালন ও তাঁর অনুসারীদের সরল-সহজ জীবনাচরণ, সততা ও মানবিক আচরণে মুগ্ধ হয়ে দলে দলে মানুষ লালনের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছে। তাঁর জীবনাচরণের মধ্যে ছিল না আচারসর্বস্বতার অহমিকা কিংবা সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি। তিনি বৈরাগ্য মানতেন, কিন্তু গৃহী ছিলেন। সংসার করেছেন মন দিয়ে। মানতেন জন্মনিয়ন্ত্রণের আবশ্যকীয়তা। অধিক সন্তান উৎপাদন করে জন্মচক্রের ফেরে কে পড়তে চায়! বন্ধনহীন, স্বাধীন-স্বনিয়ন্ত্রিত মুক্ত জীবনে বিশ্বাসী ছিলেন তাঁরা। এমন উদার স্বভাব, নির্লোভ দৃষ্টিভঙ্গি ও সরল-সহজ জীবনবোধ বহু মানুষকে টেনে আনত ফকিরি সাধনার পথে। তাঁর গানের মধ্যেও ছিল মনের মানুষের প্রতি দুর্মর টান, না-পাওয়ার বেদনা, অধরাকে ধরার প্রবল আকুতি। আখড়াবাসী হয়েও দারুণ জীবনরসিক ছিলেন বলেই খ্যাত-অখ্যাত বহু মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল, বহুজনের সঙ্গে তিনি ভাবের আদান-প্রদান করতেন। কুষ্টিয়া-পাবনা-যশোর-ঝিনাইদহ অঞ্চলের বহু গ্রামে তিনি গান গেয়েছেন, বাহাস করেছেন। বয়সের ব্যবধান সত্ত্বেও কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের সঙ্গে লালনের বেশ যোগাযোগ ছিল, এক পর্যায়ে কাঙাল হয়ে ওঠেন লালনের পরমবন্ধু। ফকির লালনের সাধনক্ষেত্র ছেঁউড়িয়া গ্রামটি হরিনাথের বসতবাড়ি কুমারখালি থেকে খুব দূরে নয়, হাঁটা পথে কয়েক মাইল।

কাঙাল হরিনাথ মজুমদার।

উনিশ শতকের গোড়া থেকেই কুমারখালিতে ব্যাপক নীলচাষ হত। কৃষকদের ওপর নীলকর কুঠিয়ালদের অবর্ণনীয় অত্যাচার ছিল। আবার নীলকরদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধও গড়ে উঠেছিল। কাঙাল হরিনাথ মজুমদার ও ফকির লালন প্রজাপীড়ক জমিদার ও বাংলার কৃষক সমাজের শত্রু নীলকর সাহেবদেরদের বিরুদ্ধে লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কাঙাল হরিনাথকে যখন নীলকরদের পাইক-বরকন্দাজ ও লাঠিয়ালরা নির্যাতন করতে চেয়েছে, ঠিক তখন লালন তাঁর আখড়া থেকে শিষ্য-ভক্তদের নিয়ে নীলকর সাহেব ও জমিদারদের লাঠিয়াল বাহিনীকে উচিত শিক্ষা দিয়েছেন।

হরিনাথ ছিলেন কৃষক-রায়তপ্রেমী একজন কলমযোদ্ধা তথা গ্রামীণ বুদ্ধিজীবী। তাঁর কৃষক-প্রেমের মধ্যে কোনও খাদ ছিল না। তিনি মনে করতেন যে, জমিদার-মহাজনদের শোষণ-পীড়ন থেকে প্রজা-রায়তকে রক্ষা করা একটি নৈতিক দায়িত্ব। জমিদার-ভূস্বামীদের নিপীড়ন-নির্যাতন ও কর্তব্যহীনতার বিরুদ্ধে হরিনাথের ‘গ্রামবার্ত্তা’ ছিল নদীয়া-যশোরের কৃষক-রায়ত শ্রেণির প্রধান মুখপত্র। জমিদাররা তাঁর ওপর অত্যাচার করেছে, মিথ্যা মামলা দায়ের করে হেনস্তা করেছে, তারপরও তিনি নিরস্ত হননি। ভয় পেয়ে দমে যাননি। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের মত পরাক্রমশালী জমিদারের বিরুদ্ধেও তাঁর শাণিত লেখনী ঝলসে উঠেছে। তাঁর মনে হয়েছে, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের চেয়েও তাঁর পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন অধিকতর নিষ্ঠুর। ‘ধর্ম্মমন্দিরে ধর্ম্মালোচনা আর বাহিরে আসিয়া মনুষ্যশরীরে পাদুকা প্রহার’ ছিল তাঁর নৈমিত্তিক কাজ। হরিনাথ আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর যে পর্যন্ত মহর্ষি নাম গ্রহণ করেন নাই, সে পর্যন্ত প্রজাগণ তাঁহাকে দুঃখ নিবেদন করিয়া কিছু কিছু ফল পাইয়াছে, কিন্তু তিনি মহর্ষি নাম পরিগ্রহ করিলে, প্রজার হাহাকার তাহার কর্ণে প্রবেশ করিতে অবসর পাই নাই।’ প্রজাদের কল্যাণে মহর্ষির কোনও আগ্রহ ছিল না। আবার তিনি যাদের ওপর শিলাইদহের জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেন তারাও ছিলেন ভয়ংকর প্রজাপীড়ক। কেবল ঠাকুর জমিদাররা নন, তৎকালীন বুদ্ধিজীবীরাও কৃষক-বিদ্রোহের বিরুদ্ধে বিপরীত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও পাবনার বিদ্রোহী কৃষকদের আচরণে ‘বিরক্ত ও বিষাদযুক্ত’ হয়েছিলেন এবং মীর মশাররফ হোসেনের ‘জমিদার দর্পণ’ নাটকটির প্রচার বন্ধের সুপারিশ করেন। কারণ তাঁর মনে আশঙ্কা জাগে যে, নাটকটি কৃষক-বিদ্রোহ উসকিয়ে দিতে পারে।

নির্দ্বিধায় বলা যায়, দেবেন্দ্রনাথ এবং তাঁর পুত্র-পৌত্রদের জমিদারি পরিচালনার বিষয়ে সবচেয়ে বড় সমালোচক ছিলেন কাঙাল হরিনাথ। তাঁদের অত্যাচারের কাহিনি কাঙাল নির্ভীকচিত্তে দু’হাতভরে ছেপেছেন গ্রামবার্ত্তা-র পাতায়। ঠাকুরপক্ষ তাঁকে টাকার প্রলোভন দেখিয়ে বশীভূত করতে চেয়েছে। কিন্তু সফল হয়নি। ক্ষিপ্ত হয়ে প্রাণনাশের হুমকি প্রদান করে, শায়েস্তা করতে লেঠেল পাঠানো হয়। কিন্ত লাঠিয়ালরা নির্ভীক তেজোদৃপ্ত কাঙালের কেশ পর্যন্ত স্পর্শ করতে সাহস দেখায় না। কারণ গরিব প্রজা-কৃষক-রায়ত শ্রেণি তাঁকে ভালবাসত, শ্রদ্ধা করত। সেই সঙ্গে, লালনের শিষ্যসামন্তরা কাঙালের অমূল্য জীবন রক্ষার জন্য প্রহরীর মত দায়িত্ব পালন করতেন। তবে সৌজন্যবশত হরিনাথ ঠাকুর-পরিবার সম্পর্কে অনেককিছুই প্রকাশ করতে পারেননি। কিন্তু তাঁর অন্তর্দাহ, বেদনা ও ক্ষোভ লিপিবদ্ধ ছিল অপ্রকাশিত ডায়েরিতে। সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে সেই ডায়েরি প্রকাশিত হয়নি। তিনি অনুরোধ করেছিলেন যে, তাঁর জীবৎকালে তাঁর বাবা মহাশয়ের এই কাহিনিগুলি যেন পত্রিকায় প্রকাশিত না হয়। গ্রামবার্তায় কাঙাল যে-সব কাহিনি প্রকাশ করতে পারেননি, সে সব কাহিনি তিনি তাঁর দিনলিপিতে লিখে গেছেন। কলকাতার চতুষ্কোণ পত্রিকা ১৩৭০ ও ১৩৭১ সংখ্যায় কাঙাল হরিনাথের ডায়েরির দুটি সংক্ষিপ্ত অংশ প্রকাশ করে। এ সব কাহিনি পাঠ করে জানা যায় যে, ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে কাঙালের সম্পর্ক তেমন মধুর ছিল না। নানা ঘটনায় ও জমিদারদের নিষ্ঠুর আচরণে কাঙালের জীবনে নেমে আসে হতাশা, অবসাদ ও অসহায়ত্ব। আর্থিক সংকটে বন্ধ হয়ে যায় গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা। যিনি একদিন পল্লিবাসীর দুঃখমোচনের ব্রত নিয়ে গ্রামবার্তা প্রকাশ করেছিলেন, ঋণভারে জর্জরিত হয়ে তিনিই আবার বাধ্য হন পত্রিকা বন্ধ করতে। নিঃস্ব, রিক্ত, কপর্দকশূন্য হয়ে বেছে নেন সমাজবিচ্ছিন্ন অধ্যাত্মজীবন। প্রতিবাদী, পরদুঃখকাতর, মানবদরদি, প্রজাহিতৈষী মানুষটি হয়ে ওঠেন গৈরিক বসনধারী সাধক-পুরুষ। কোনও রকম পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই ফিকিরচাঁদ ও কাঙাল ভণিতায় শুরু করেন বাউলগান রচনা। সাংবাদিকতা ও গণমুখিন অগ্রসরচিন্তার পথ পরিত্যাগ করে আবির্ভূত হন গীতরচয়িতা ফিকিরচাঁদ হিসেবে। মীর মশাররফ হোসেন, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, জলধর সেন, শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণব, প্রফুল্লচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের মত সাহিত্য-শিষ্যরাও কাঙালকে সঙ্গীত রচনায় অনুপ্রাণিত করেন। এঁদের সবার বাড়ি ছিল কুমারখালির নিকটবর্তী বিভিন্ন গ্রামে। এঁদের প্রেরণা-পৃষ্ঠপোষকতায় ফিকিরচাঁদ নামে বাউলদল গঠন করে নদীয়া-যশোরের গ্রামে গ্রামে গান পরিবেশন করে বেড়াতে থাকেন। ছেঁউড়িয়ার লালন-আখড়ায় কাঙালের যাতায়াত ছিল, লালনও মাঝে মাঝে কাঙাল-কুটিরে যেতেন। দুজনের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান চলত। কাঙাল মাঝে মাঝে লালন-আখড়ায় রাত কাটাতেন। ছেঁউড়িয়ার আখড়ায় রাত জেগে গান শুনতেন। গুরুতত্ত্বের গান, দৈন্য গান, গৌরতত্ত্বের গান, রাসলীলা, গোষ্ঠলীলা আরও কত কী! ১৮৮০ সালে ফকির লালন শিষ্যমণ্ডলীসহ একবার কাঙাল-কুটিরে গমন করেন। সেদিন কাঙাল কুটিরে গানের আসর বসে এবং লালন কয়েকটি গান করেছিলেন।

নানা সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা যায় যে, কাঙাল হরিনাথের জীবন নদীর বাঁকবদল ঘটে লালনের আখড়ায় গান শুনে। জীবনচেতনা মোচড় খায় লালনের নিবিড় সান্নিধ্য পেয়ে। কাঙালের জীবন যেন দুমড়ে মুচড়ে ওলটপালট হয়ে যায়! সেই মোচড়ে কাঙালের কলম আর অন্তরের গহন থেকে উৎসারিত হতে থাকে গানের ঝর্নাধারা। বেদনার গান, আত্মনিবেদনের গান, প্রেমভক্তিময়তার গান। এ গানের সুর ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, নগরে-প্রান্তরে। সেই গান সমকালে লাভ করে বিপুল চাহিদা ও দারুণ জনপ্রিয়তা। কাঙালের গানের জনাদর ছিল লালন গানের চেয়েও বেশি। লালনের গান কিন্তু তাঁর সমকালে নিজ আখড়া ব্যতীত অন্য কোনও গানের মজলিসে তেমন গীত হত না, তেমন জনাদরও পায়নি। কিন্তু হরিনাথের দল ছিল খুবই জনপ্রিয়। অবিভক্ত বঙ্গদেশের বিভিন্ন জেলার অনেক মানুষ তাঁর গান শুনে তাঁকে দেবতাজ্ঞানে পুজো করত। ‘হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল পার করো আমারে/ তুমি পারের কর্তা, শুনে বার্তা, ডাকছি হে তোমারে’ গানটি গ্রাম ও শহরে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল। লালনের গান ছিল একজন আত্মনিমগ্ন সাধকের আত্মভাবনার গান, নির্জন উপলব্ধি থেকে জেগে ওঠার গান। জীবিতকালে এ গান তেমন প্রসারতা পায়নি। আখড়ার বাইরে এ গান গাওয়ার রেওয়াজ ছিল না বললেই চলে। কিন্তু কাঙালের গান ছিল সখের গান, মজলিস-মেহফিলের গান। ভক্তহৃদয়ের গান। মুটে-মুজুর, মাঝিমাল্লা, চাষাভুসো, দোকানদারের গান। সমকালে ফিকিরচাঁদের গানের কাছে ফকির লালনের গান পাত্তাই পায়নি। লালনের গান হয়তো-বা কালের গর্ভে হারিয়ে যেত যদি না রবীন্দ্রনাথ এগুলি সংগ্রহ করে ছাপতেন। তবে লালন ও কাঙাল হরিনাথ ছিলেন পরস্পর অকৃত্রিম বন্ধু ও সুখ-দুঃখের সাথি। দুজনই ছিলেন পরাধীন দেশের মানুষের ব্যথায় ব্যথিতজন ও দুখি মানুষের দুঃখে ঝলসে-ওঠা অগ্নিপুরুষ— যাঁরা কালের অগ্নি ও উত্তাপকে মনের গহন গভীরে ধারণ করতে পেরেছিলেন। দুজনেই একাধারে মরমি ও মানবদরদি।

তথ্যসূত্র:
১. সাহিত্য: আষাঢ়, ১৩২০; পৃ. ১৯৮
২. আবুল আহসান চৌধুরী, কাঙাল হরিনাথ: গ্রামীণ মনীষা প্রতিকৃতি। ঢাকা, ফেব্রুয়ারি, ২০০৮। ‘ভূমিকা’
৩. অন্নদাশঙ্কর রায়: লালন ও তাঁর গান। কলকাতা, ১৩৫৮, পৃ. ২৪-২৫
৪. অমলেন্দু দে, বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও বিচ্ছিন্নতাবাদ। কলকাতা, মে ১৯৭৪। পৃ. ৪-৫
৫. কাঙ্গাল হরিনাথের ডায়েরী। চতুষ্কোণ: শারদীয়, ১৩৭০। পৃ. ৫৯৪

চিত্র: গুগল
3 3 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
J.Ghosh
J.Ghosh
1 year ago

বেশ ভাল লাগল। তথ্যসমৃদ্ধ লেখা। আমিন সাহেবকে অনেক ধন্যবাদ।

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »