

ভালভাষা উৎসব সংখ্যা ২০২৩|| দিবাকর পুরকায়স্থর কবিতা।

India’s First Bengali Daily Journal. বঙ্গদেশের নাটকের ইতিহাস বেশ পুরোনো। খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে বাংলা নাটকের প্রথম সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে নাট্যচর্চায় বাঙালি তৎকালীন প্রচলিত লোকনাট্য রীতি, যা মোটামুটি গীতিনির্ভর ছিল, তাই গ্রহণ করেছিল। এই প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে বাংলায় সেসময় বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার সম্পূর্ণ। তাই সে-সময়ের গীতিনাটকে বৌদ্ধ ধর্মীয় গীতবাদ্য ছিল লক্ষ্যণীয়। যদিও স্বয়ং বুদ্ধ নৃত্যগীত নিষিদ্ধ করেছিলেন, তবে মনে হয়, মহামতি অশোকের সময়কাল থেকে উত্তর ভারতের মগধ থেকে বাংলায় গীতিনাট্যের আগমন ঘটে। তবে এসব গীতিনাটকে গান এবং নৃত্যের বাইরে কোনও সংলাপ থাকত কিনা তা সঠিকভাবে জানা যায় না।

India’s First Bengali Daily Journal. তিরতির করে কাঁপছে জলের উপর আধখানা/ হলুদ চাঁদ/ কাঁপে ভৈরবের জল,/ আর কুলুকুলু করে বয়ে চলেছে/ নীচের দিকে মিলনের আকাঙ্ক্ষায়/ দূরে, বহুদূরে ঝলমল করছে ঈদের চাঁদ।

India’s First Bengali Daily Journal. জোরে বইছে উত্তুরে হাওয়া,/ কিছু কথা, কিছু শব্দ আজ হারিয়ে যাচ্ছে নাকি?/ বাজারের থলে আর মাছের আঁশের নীচে,/ ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝি নীরবে প্রাচীন কথামালা।// পাড়ার কুকুরগুলো কনকনে শীতের রাতে/ আজকাল আর ঘেউ ঘেউ করতে চায় না।/ বুড়ো কুকুরের মেরুদণ্ড বেঁকে গেছে আজ, আর/ ছানাপোনাগুলো কুঁই কুঁই করে বিজাতীয় সুরে।

India’s First Bengali Daily Journal. রহস্যময় পাখিগুলো গান করে/ শব্দহীন নির্বাক প্রেম করে/ প্রিয়া, তোমার দুচোখে/ আকাশের রং লেগে থাকে// কারণ, তোমার আশ্চর্য কণ্ঠস্বর/ তোমার পাগল করা দৃষ্টি/ আমার জগৎসংসার/ বিব্রত করার জন্য সৃষ্টি// কারণ তোমার বিরল মধুর গন্ধ/ তোমার রাজহাঁসের মত বিষণ্ণতা,/ আর তোমার নির্দোষ সরলতা/ এবং তোমার সুবাস।// ও! তোমার সম্পূর্ণ সত্ত্বার জন্য/ সুর এত তীব্র, এত তীক্ষ্ম/ যেন এক দেবদূতের স্বরধ্বনি/ এবং মেঘের হারানো সুগন্ধ

India’s First Bengali Daily Magazine. অবিভক্ত বাংলার যশোর জেলার এক বর্ধিষ্ণু গ্রাম। পাশে কুলুকুলু করে বয়ে চলেছে কপোতাক্ষ নদী। গ্রামের নাম সাগরদাঁড়ি। এই গ্রামের ধনী রাজনারায়ণ দত্ত এবং তাঁর স্ত্রী জাহ্নবী দেবীর ঘর আলো করে জন্মায় এক ছেলে। তারিখ ছিল ইংরেজি ২৫-এ জানুয়ারি। তখন কি কেউ ভেবেছিলেন যে, এই কপোতাক্ষ সাক্ষী হয়ে থাকবে এক প্রবাদপুরুষের? কপোতাক্ষের টলটলে জল প্রতিমুহূর্তে মধুকুঞ্জের সামনে দিয়ে চলে যাওয়া প্রতি পথচারীকে বলবে, ‘দাঁড়াও পথিকবর! জন্ম যদি তব বঙ্গে…’।

India’s First Bengali Daily Magazine. চিয়াপেলেট্টোর মহিলা আসক্তি ছিল চরম এবং কুকুর যেরকম বংশদণ্ড তারিয়ে তারিয়ে চিবিয়ে আনন্দ লাভ করে, মহিলাদের ওপর তিনি তদ্রূপ ব্যবহার করতে অভ্যস্ত ছিলেন। মামলা চলাকালে প্রতিপক্ষের তরফে যারা সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত হত, তাদেরকে নিশাকালে তিনি নিজে প্রচণ্ড প্রহার করতেন এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে এই প্রহারে দু-একজনের ভবলীলা সাঙ্গ হয়েছিল শোনা যায় কিন্তু প্রমাণাভাবে ওর বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়নি।

India’s First Bengali Daily Magazine. জনৈক মনোএল দা আসসুম্পসাঁউ নামের এক পর্তুগিজ প্রথম বাংলা ভাষার শব্দকোষ এবং ব্যাকরণ লিখতে প্রবৃত্ত হন। তাঁর সংকলিত পুস্তকে প্রধানত পর্তুগিজ থেকে বাংলা এবং বাংলা থেকে পর্তুগিজ শব্দসংগ্রহই ছিল। এই পুস্তকে তিনি পর্তুগিজ পাদ্রীদের নির্দেশ মেনে যেসব শব্দাবলি ধর্ম প্রচার এবং ব্যবসার সঙ্গে খাপ খায়, তাই লিখলেন। আবার বাংলা শব্দ লিখতে সুবিধার জন্য রোমান লিপি ব্যবহার করেন। এই বই ১৭৩৪ সালে লিখিত এবং প্রকাশ হয় ১৭৫০ সালে।

India’s First Bengali Daily Magazine. বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে মহিলাদের দানের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। প্রবন্ধ, ভ্রমণ-কাহিনি, কাব্য ও কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে তাঁদের কেউ কেউ বহু উঁচুতে অবস্থান করছেন। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে বর্তমান কাল অব্দি যাঁরা এই ইতিহাসের জের টানবেন, সাহিত্যক্ষেত্রে নারীদের অভিযানের একটা মোটামুটি তালিকা পেশ করলাম।

India’s First Bengali Daily Magazine. আগেকার দিনে অনেক নারী অসম্ভব দক্ষতায় এই রূপ ধারণ করতে পারঙ্গম ছিলেন। প্রাচীনকাল থেকে নবনারী কুঞ্জর, অষ্টনারী তুরঙ্গ (ঘোড়া) নির্মিতিতে মেয়েরা ওস্তাদ ছিলেন। আশ্চর্যের বিষয়, এদের ওপর চড়ে অনেক রাজা নাকি বিহার করতেন! বিশিষ্ট ফরাসি পর্যটক ট্যাভার্নিয়ার (Jean-Baptiste Tavernier, ১৬০৫-৮৯) তাঁর ভারত-ভ্রমণের অবকাশে তখনকার গোলকুন্ডা নগরীর সুলতান কুতুব শাহের (১৬২৬-৭২) কথা উল্লেখ করে লিখেছেন যে, সুলতান নবনারী কুঞ্জর-এর পিঠে হাওদা চাপিয়ে নগর পরিভ্রমণে বেরতেন।

India’s First Bengali Daily Magazine. স্বাধীনতা দিবসে অমৃত মহোৎসব ছিল।/ রাজধানী কলকাতা পর্ব শেষ,/ এখন বসিরহাট হয়ে বাগদা এসেই ওরা দেখল/ সামনে কাঁটাতার/ দূরে উড়ছে নিশান পতপত করে,/ বাজছে গানের সুর—/ ‘ঝান্ডা উঁচা রহে হমারা’।// পাশে পটলের খেতে ঝটাপটি, ঝাপটিয়ে ডানা/ মাটি আঁচড়ায় পাখি। পাশে কাঁদে ছানা।

India’s First Bengali Daily Magazine. বাণীকান্তের ঘরে আবার শুরু হল অশান্তি। বউয়ের শরীরের নেশা ধীরে ধীরে কেটে গেল কুশলের এবং ওর পুরোনো জীবনধারা ফের ওর ওপর ভর করল। ফের শুরু হল দেরি করে রাতে ফেরা, মাঝে মাঝে কোথাও দুই-তিনদিনের জন্য ডুব মারা ওর অভ্যাসে পরিণত হল। একদিন বাপ বাণীকান্ত জিজ্ঞেস করলে জবাব দিল, ‘জাতির কাজ করছি, নূতন অসমের সৃষ্টি করব আমরা।’ বাণীকান্তর বুক কেঁপে উঠল।

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’