Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

দাঁড়াও পথিকবর

‘পর্বত গৃহ ছাড়ি
বাহিরায় নদী যবে সিন্ধুর উদ্দেশ্যে
কাল হেন সাধ্য রোধে তার গতি?
দানব নন্দিনী আমি রক্ষকুলবধূ
রাবণ শ্বশুর মম মেঘনাদ স্বামী
আমি কি ডরাই সখী ভিখারী রাঘবে?’

সেই কোন শতাব্দীপ্রাচীন যুগে পরমপুরুষ রামকে ‘ভিখারী’ বলে সম্বোধন তিনিই করতে পারেন। আজকের যুগে হলে তাঁকে হয়তো মরতে হত। রামলালাকে ভিখারী বলা, এতবড় সাহস?

আসুন, আমরা পিছিয়ে যাই উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে। কলকাতা তখন মহানগরীরূপে সম্পূর্ণ বিস্তৃত এবং দেশের রাজধানী। সেই কলকাতায় আমরা দেখি তৎকালীন খিদিরপুর এলাকায় এক বিশাল দোতলা বাড়ি। বাড়ির মালিক প্রখ্যাত ব্যবহারজীবী রাজনারায়ণ দত্ত। তাঁর বিলাসী জীবনের আর্থিক কৌলীন্য, প্রশস্ত বাসগৃহ, প্রচুর ভৃত্যকুল। এমন সময় তাঁর ছেলে মধু কলেজ থেকে দলবেঁধে বন্ধুবান্ধব নিয়ে বাড়ি এসেছেন। হৈহৈ করে চাকরদের বলছেন, মাংস রান্না করতে বন্ধুদের জন্যে। ঘরের ভেতর বোতলের ছিপি খুলে মদ গেলাসে ঢেলে বন্ধুদের অনুরোধ করছেন চাখতে। বন্ধু ভূদেব ভয়ে তটস্থ। জিজ্ঞেস করেন যে, বাড়িতে ওঁর মা নেই নাকি। মধু মদিরায় চুমুক দিয়ে বলেন যে, ওঁর মা ওঁর‌ ঘরের দিকে আসবেন না।

মাংস রান্না হয়ে এলে বন্ধুদের বলেন, কচি গোমাংস খেয়ে দেখতে। বন্ধুরা শিউরে উঠলে‌ আশ্বস্ত করেন এই বলে যে, এটা পাঁঠার মাংস, গোমাংস নয়। কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে মিল্টন আওড়াচ্ছেন, প্যারাডাইস লস্ট।

এই দৃশ্যের অনেক বছর পেছিয়ে আমরা এখন‌ চলে যাব ১৮২৪ সালে। অবিভক্ত বাংলার যশোর জেলার এক বর্ধিষ্ণু গ্রাম। পাশে কুলুকুলু করে বয়ে চলেছে কপোতাক্ষ নদী। গ্রামের নাম সাগরদাঁড়ি। এই গ্রামের ধনী রাজনারায়ণ দত্ত এবং তাঁর স্ত্রী জাহ্নবী দেবীর ঘর আলো করে জন্মায় এক ছেলে। তারিখ ছিল ইংরেজি ২৫-এ জানুয়ারি। তখন কি কেউ ভেবেছিলেন যে, এই কপোতাক্ষ সাক্ষী হয়ে থাকবে এক প্রবাদপুরুষের? কপোতাক্ষের টলটলে জল‌ প্রতিমুহূর্তে মধুকুঞ্জের সামনে দিয়ে চলে যাওয়া প্রতি পথচারীকে বলবে, ‘দাঁড়াও পথিকবর! জন্ম যদি তব বঙ্গে…’।

এই বর্ণময় ব্যক্তি হলেন মধুসূদন দত্ত। আমি এখনও মধুসূদন দত্তই বলব, কারণ তখনও নামের আগে মাইকেল লাগেনি। তখন‌ এক যুগসন্ধিক্ষণ। মধু তখন খিদিরপুর বাড়িতে। পড়েন হিন্দু কলেজে। মদ খেয়ে রোজ কলেজে আসেন। বাংলায় নিয়ম ভাঙার খেলা শুরু হয়েছে। রামধনু লাহিড়ী এবং দলবল বাঙালি বামুনের ওপর বিদ্রোহী হয়েছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের যত নিয়মকানুন, তার ওপর এঁরা খড়্গহস্ত। এই নৌকার পালে হাওয়া লাগালেন‌ মধুসূদন। বাঙালিদের আচার-আচরণ, খাওয়াদাওয়া, বেশভূষা, মায় ভাষা অব্দি, কিছুই তাঁর পছন্দ নয়। তিনি দিনরাত ইউরোপীয়দের অনুকরণ করেন‌, অশনে-ভূষণে স্যুট হ্যাট কোট, ছুরি-কাঁটা ছাড়া তাঁর একমুহূর্ত চলে না। বাংলা ভাষা নিয়ে অপরিসীম ব্যঙ্গ। এটা তখনও ওঁর মতে‌ চাষাভুষোর ভাষা। মধুসূদন ইচ্ছে করে ‘পৃথিবী’ বানান ‘প্রীথিবী’ করে লেখেন‌ এবং বিদ্রূপ করে আনন্দ পান। বাংলা ভাষায় আবার সাহিত্য রচনা হয় নাকি?

মহাকাল তাঁর ঔদ্ধত্য দেখে হাসেন‌। যাঁর হাত দিয়ে বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য‌ রচিত হবে পরে, তিনি বাংলা জানেন না? বাংলা ভাষার যত দুরূহ, অপ্রচলিত শব্দসম্ভার তাঁর রচনায় যে তিনি ব্যবহার করবেন। কিন্তু সেসব অনেক পরে।

মধু ততদিনে বায়রনের জীবনী শেষ করেছেন, শেক্সপিয়র, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, ভার্জিল পড়ে শেষ করেছেন। মিল্টন ঠোঁটের আগায়। হবেন বহু ভাষাবিদ। ল্যাটিন, গ্রিক, হিব্রু, ইংরেজি ছাড়াও শিখবেন তামিল ও তেলুগু।

ইউরোপীয় আদবকায়দা রপ্ত মধু করেছেন নিখুঁতভাবে। তিনি তাঁর একটা কবিতায় তাঁর সেই সময়ের মনোভাব ব্যক্ত করেছেন এভাবে:

Where man in all his truest glory lives,
And nature’s face is exquisitely sweet;
For those fair climes I heave impatient sigh
There let me live and there ll et me die.

কিন্তু মহাকাল যে তাঁর জন্য অন্য জীবন বেছে রেখেছেন। তাঁর হাত দিয়ে বাংলা ভাষা ঋদ্ধ হবে। বাংলায় তাঁর হাত দিয়ে অনেক শব্দের ব্যবহার হবে যেগুলো আর কেউ ব্যবহার করেননি কাব্যে। তাঁর হাত ধরে বাংলা পাবে অমিত্রাক্ষর ছন্দ, পাবে সনেট। কিন্তু এসব আরও পরে।

ইতিমধ্যে তাঁর জীবনের পরের দৃশ্যে আমরা দেখি লাখোটিয়ার এক ব্যক্তির মেয়ের সঙ্গে তাঁর বাবা বিয়ে ঠিক করেছেন‌ এবং মধু স্বাভাবিকভাবেই বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলেন।

তৎকালীন মহামান্য পোপ একবার বলেছিলেন ‘টু বিকাম এ পোয়েট, ওয়ান‌ হ্যাজ টু লিভ ফাদার অ্যান্ড মাদার’। মধুর মনে এই কথা ধরেছিল, তাই বোধকরি পালিয়ে গিয়ে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলেন। সেসময় ওঁর মানসিক অবস্থা উনি এভাবে ব্যক্ত করেন:

Long sunk in superstition’s night,
By sin and Satan driven,
I saw not, and cared not for the light
That leads the blind to Heaven
But now, at length thy grace, oh lord !
Birds all around me shine
I drink thy sweet, thy precious word,
I kneel before thy shrine.

সারা কলকাতায় হুলস্থূল পড়ে গেল, মধুকে বাড়িতে‌ ফিরিয়ে আনার সব চেষ্টা ব্যর্থ হল। হিন্দু রাজনারায়ণ দত্তের একমাত্র ছেলে হয়ে গেলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

এর ফলে তাঁকে স্বাভাবিকভাবেই হিন্দু কলেজ থেকে তাড়িয়ে দেয়া হল। এই সময়ে রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে বড় ভাইয়ের মত পাশে থেকে সব রকম সাহায্য করেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিশপস কলেজে আবাসিকভাবে ভর্তি হয়ে বিশ্বসাহিত্যে মন দিলেন‌। ফাদার ডেলয়ট্রের আশ্রয় থেকে বিশপস কলেজের আবাসিক মধুর উগ্র ব্যবহারের পরিবর্তন না হলেও তাঁর অভাবনীয় মেধার পরিচয় প্রকাশ পেতে দেরি হল না। কিন্তু পিতা রাজনারায়ণ কর্তৃক ত্যাজ্য হয়ে প্রায় কদর্পকহীন অবস্থায় মাদ্রাজ চলে গেলেন ১৮৪৭ সনে এবং শুরু হল তাঁর জীবনের আর-এক অধ্যায়।

মাদ্রাজ থাকাকালীন মধুসূদন এক অনাথ আশ্রমে কাজ করতে থাকেন। প্রথম থেকেই মধু হিন্দু সমাজের গোঁড়ামি প্রত্যক্ষভাবে দেখেছিলেন ওঁর বন্ধু ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের মাকে দেখে। ওঁর ওপরেই মাইকেল তাঁর ইংরেজি উপন্যাস লিখলেন ‘ক্যাপটিভ লেডি’, ১৮৪৯ সালে। এই উপন্যাস ইংরেজ মহলে উচ্চপ্রসংশিত হল। এটি ডিরোজিও সাহেবের লেখা ‘The Fakeer of Jungheera’-র মত দীর্ঘ পদ্যের ছন্দে লেখা। তারপর লিখলেন ‘The Anglo-Saxon and the Hindu’, ১৮৫৪ সালে। এই সময় হেনরি বিটন, যাঁকে আমবাঙালি বেথুন সাহেব বলে চেনে, তিনি মধুসূদনকে বললেন‌, ‘তুমি অপূর্ব ইংরেজি লিখেছ। মানলাম তুমি ইংরেজি খুব ভাল জানো। অনেক ইংরেজও খুব ভাল ফরাসি জানেন। তাই বলে তারা কি ফরাসি ভাষায় সাহিত্য রচনা করবেন?’

হেনরি বিটনের এই কথা তাঁর মনে গভীরভাবে গেঁথে যায়। মাইকেলের আবাল্য সুহৃদ গৌরদাস বসাকও বাংলায় লিখতে উৎসাহ দিতেন। ইতিমধ্যে ১৮৪৮ সালে তিনি বিয়ে করলেন। এই সময় মধূসুদন যা করতেন তাই খবর হয়ে যেত। তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি ইউরোপীয় রমণীকে বিয়ে করেন। স্ত্রীর নাম ছিল রেবেকা থমসন ম্যাকটভিস। তিনি স্কটিশ এবং ইংরেজ সংকর রমণী ছিলেন। ওঁদের চার সন্তান জন্মায়।

এসব‌ ব্যক্তিগত কথা একেবারে বাদ দেয়া সম্ভব নয়, কারণ মাইকেল মধূসুদন দত্তকে জানতে হলে তার পুরোটা জানা প্রয়োজন। ১৮৫৬ সাল‌ অব্দি রেবেকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল ওঁর। পরে যখন রেবেকা এবং সন্তানদের ছেড়ে কলকাতায় ফিরে আসেন ১৮৫৮ সনে, (তাঁদের মধ্যে প্রথাগত বিবাহ বিচ্ছেদ হয়নি কখনও) তখন তাঁর নর্মসঙ্গিনী এক ফরাসি যুবতী। অরিয়েত্তাঁ (পুরো নাম এমিলিয়া অরিয়েত্তাঁ সোফি হোয়াইট), তাঁকে অনেকে হেনরিয়েটা বলে ভুল করতেন‌, কারণ বন্ধু গৌরদাস একদিন হেনরিয়েটা বলাতে মধুসূদন খেপে গিয়ে নাম শুদ্ধ করে দিয়ে বলেন‌ যে, ও ফরাসি মেয়ে, ইংরেজ নয়। অরিয়েত্তাঁ আমৃত্যু ওঁর নর্মসঙ্গিনী ছিলেন, ওঁদের‌ প্রথাগতভাবে বিয়ে হয়নি।

যাক, এদিকে ১৮৫৮ সালে মধু যখন মাদ্রাজ থেকে জাহাজে কলকাতা এসে নামলেন‌, তখন বিটন সাহেবের কথা ওঁর মনে খোঁচা দিচ্ছিল। ভাগ্যিস দিচ্ছিল, না হলে এই বঙ্গ তার ভাণ্ডার থেকে বিবিধ রতন কোনওদিন পেত না। বাংলা ভাষার ওপর কতটুকু দখল থাকলে একজন লিখতে পারেন:

যথা যবে পরন্তপ পার্থ মহারথী
যজ্ঞের তুরঙ্গ সঙ্গে আসি
উতরিলা নারীদেশে, দেবদত্ত শঙ্খনাদে রুষি…

আর তিনি বাংলা ভাষার চর্চা তথা লেখার ডঙ্কা বাজিয়ে দিলেন। তিনি যে এতকাল বাংলাকে অবহেলা করেছেন, তাঁর অনুতাপের প্রথম প্রকাশ:

হে বঙ্গ! ভাণ্ডারে তবে বিবিধ রতন
তাসবে অবোধ আমি অবহেলা করি
পরধন লোভে মত্ত করিনু ভ্রমণ
পরদেশ ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচারি
কাটাইনু বহুদিন সুখ পরিহরি…

তারপর আর কী? একের পর এক বাংলা নাটক বেরুতে লাগল‌ তাঁর হাত দিয়ে। এই ১৮৫৮ থেকে ১৮৬২ সালের মধ্যে তাঁর কলম থেকে বাঙালি তথা বাংলা পেল ‘শর্মিষ্ঠা’ (১৮৫৯), ‘পদ্মাবতী’ (১৮৫৯), ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ (১৮৬০), ‘কৃষ্ণকুমারী’ (১৮৬০) এবং ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ (১৮৬০) এই পাঁচখানা নাটক। তাছাড়া ছন্দোবদ্ধ কাব্যে রচনা করলেন ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’, ‘মেঘনাদবধ কাব্য’, ‘ব্রজাঙ্গনা কাব্য’, ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’। সব ১৮৬১ সালের রচনা। শুধু ‘হেক্টর বধ কাব্য’ ছিল অসম্পূর্ণ। এর মধ্যে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ বোধকরি তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। অনেক বিদগ্ধ পণ্ডিত এই গ্রন্থকে মহাকাব্যের তকমা দিয়েছেন। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, মহাকাব্যের শুরু থেকে শেষ একই রসে লিখতে হয় এবং মেঘনাদবধ সম্পূর্ণ বীররসে রচিত।

‘মেঘনাদবধ কাব্য’ সম্পূর্ণ অমিত্রাক্ষর ছন্দে লিখিত। মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রথম বাংলায় অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক। ওঁর ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকে কবি প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দের শুরু করেন আর মেঘনাদবধ তো অসাধারণ। এই কাব্য পাঠ করে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বলেছেন‌:

‘‘As long as the Bengali race and Bengali literature would exist, the sweet lyre of Madhusudan would never cease playing.’’ তাঁর সংযোজন: ‘‘Ordinarily, reading of poetry causes a soporific effect, but the intoxicating vigour of Madhusudan’s poems makes even a sick man sit up on his bed.’’

এর পরের অধ্যায় শুরু হয় ইংল্যান্ডে। মধুসূদন ১৮৬২ সালে ঠিক করলেন ব্যারিস্টার হবেন। লন্ডন গিয়ে ভর্তি হলেন গ্ৰে ইন-এ। যাবার আগে মাতৃভূমির উদ্দেশে লিখলেন:

Forget me not, O Mother,
Should I fail to return
To thy hollowed bosom
Make not the lotus of thy memory
Void of its nectar honey

অরিয়েত্তাঁ ও তিন পুত্র-কন্যাকে ডেকে নিলেন ১৮৬৩ সালে। কিন্তু অর্থাভাবে পড়া সম্পূর্ণ হল না। ১৮৬৫ সালে এমন এক কদর্পকহীন অবস্থা হল যে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ৬০০০ টাকা পাঠিয়ে তাঁকে রক্ষা করেন‌। মাইকেলের পড়া সম্পূর্ণ হলেও তিনি বিদ্যাসাগরের মহানুভবতা কখনও ভোলেননি এবং তাঁকে ‘দয়ার সাগর’ বলে উল্লেখ করেছেন। বিদ্যাসাগরকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তখন তিনি একটা অন্যতম বিখ্যাত সনেট রচনা করেন:

বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে
করুণার সিন্ধু তুমি সেই জানে মনে
দীন যে দীনের বন্ধু উজ্জ্বল জগতে
হিমাদ্রির হেমকান্তি অম্লান কিরণে…

মধুসূদন ১৮৬৭ সালে ফিরে আসেন বিদেশ‌ থেকে এবং কলকাতা হাইকোর্টে জয়েন করেন। পরিবার ফেরে আরও দুবছর পর ১৮৬৯ সালে। যদিও কবি লর্ড বায়রন আর ওয়ার্ডসওয়ার্থের বিশেষ অনুরাগী ভক্ত ছিলেন, তবুও বিদেশে বসবাসের কালে ইউরোপীয় সমাজের ওপর ক্রমশ বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন কবি। ফ্রান্স থেকে বন্ধু গৌরদাস বসাককে লেখেন:

If there be any one among us anxious to leave a name behind him, and not pass away into oblivion like a brute, let him devote himself to his mother-tongue. That is his legitimate sphere his proper element.

কবির শেষ কাজ ‘মায়াকানন’ রচিত হয় ১৮৭২ সালে। এই সময় তাঁর আবার অর্থকষ্ট শুরু। তার পর এল সেই ভয়ংকর দিন। ১৮৭৩ সনের ২৬ জুন, যেদিন তাঁর চিরসঙ্গী অরিয়েত্তাঁ তাঁকে ছেড়ে চলে যান না-ফেরার দেশে। চরম মানসিক যন্ত্রণার উপলব্ধি নিয়ে কবি আবৃত্তি করেন শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথ থেকে:

…out, out, brief candle!
Life’s but a walking shadow; a poor player,
That struts and frets his hour upon the stage,
And then is heard no more; it is a tale Told by an idiot,
full of sound and fury, Signifying nothing.

এরপর কবি আর মাত্র তিনদিন বেঁচেছিলেন। ২৯ জুন ১৮৭৩, কলকাতা জেনেরাল হাসপাতালে চিরতরে চোখ বুজে নীরব হয়ে গেলেন। বাংলার ‘পঙ্কজ-রবি গেলা অস্তাচলে।’

চিত্র: গুগল
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »