Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

রাশিয়ার চিরকুট

পর্ব ৫

একদিন-অনেক দিন

জানি না সবার এমনটা হয় কিনা, কিন্তু কোনও পরিচিত জায়গায় গেলে, বিশেষ করে যেখানে জীবনের বড় একটা সময় কেটেছে, সেখানে গেলে পুরোনো স্মৃতিগুলো বাঁধভাঙা জলের মত মনকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। মনে পড়ে ছোটবড় কত ঘটনা! কত মুখ যে উঁকি দিয়ে যায় মনের কোণে! আজ সে রকম একটা দিনের গল্প বলব। যদিও ঘটনা ঘটেছিল একটামাত্র দিনকে ঘিরে, আসলে এই একদিনের ভেতরে লুকিয়ে ছিল পুরো একটা জীবন।

চার বছর আগের সে কথা। মস্কো গেলাম। ২০১৮ সালে সেই প্রথম। গেলাম একটা কাজে। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটিতে কাজ করছি। এই ইউনিভার্সিটি আমার আলমা-ম্যাটার। এখানেই কেটেছে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়— যৌবন। কলেজ শেষ করে ১৯৮৩ সালে মস্কো এসেছি উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য। এখান থেকেই পেয়েছি মাস্টার্স ডিগ্রি। এখান থেকেই ১৯৯৩ সালে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে যোগ দিয়েছি দুবনায় জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ বা জেআইএনআর-এ। ১৯৯৪ থেকে ২০১৭— দীর্ঘ ২৩ বছর পর আবার ফিরছি নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে— শিক্ষক হিসেবে। যদিও কাজ শুরু করেছি চার মাস আগে, বিভিন্ন কারণে এখনও ডকুমেন্ট জমা দেওয়া হয়নি, মানে চাকরিটাকে এখনও অফিসিয়াল রূপ দেয়া হয়নি। গতকাল গেলাম কাগজপত্র জমা দিতে। আমাকে কে যেন বলেছিল— ক্যাডার নিয়ে যারা কাজ করে ওদের অফিস খোলা থাকে সপ্তাহে তিন দিন— সোমবার, বুধবার আর শুক্রবার। বেলা দুটোর পর থেকে। তাই দুবনা থেকে রওনা দিলাম ধীরেসুস্থে। স্থানীয় এক লোক মস্কো যাচ্ছেন, তার সঙ্গেই রওনা হলাম সকাল ৯টায়।

—তোমার শেষ গন্তব্য কোথায়?
জিজ্ঞেস করলাম ড্রাইভারকে।
—আমি যাব বারিকাদনায়া, চিড়িয়াখানার পাশে। তবে তোমাদের তিমিরিয়াজভস্কায়া মেট্রোতে নামিয়ে দিতে পারি।
—আমার একটু কাজ আছে ফরেন মিনিস্ট্রির পাশে। চিড়িয়াখানার পাশেই তো ক্রাস্নোপ্রেসনেনস্কায়ার স্কাইস্ক্রাপার, তার পাশে আমেরিকান দূতাবাস, একটু পরে নিউ আরবাত, বেলি দম, তার পরেই ফরেন মিনিস্ট্রি সব মিলে ১৫ মিনিটের পায়ে হাঁটা রাস্তা। দেখি, যদি জ্যাম না থাকে, আমি বরং তোমার সাথেই চলে যাব।
—ঠিক আছে।

রাস্তার অর্ধেকটা গেল বই পড়ে (আমি রাস্তায় বই পড়তে পছন্দ করি, কেন না এই সময়টাকে কাজে লাগানোর এটা হাতেগোনা কয়েকটা উপায়ের একটা)। বাকি পথ গেলাম ঘুমিয়ে। ইদানীং প্রায়ই ঘুম পায় দিনের বেলায়। আগে এটা হত না। বাড়িতে সবাই ঘুমুত (দেশে, এখানে) আর আমি বসে বসে কিছু একটা করতাম। এটা হয়তো হচ্ছে শরীরের বয়েস বাড়ছে বলে।

সাভিওলভস্কায়া থেকে ডান দিকে মোড় নিয়ে চলে গেলাম। অনেকদিন বেলারুস্কায়া আসিনি। আগে এখানে ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট ছিল। নতুন করে ঢেলে সাজানো সব। বেলারুস্কায়া ট্রেন স্টেশনের সামনে গোর্কির স্ট্যাচুটা নতুন করে বসিয়েছে। অনেক দিন সেটা রিপেয়ারিংয়ের জন্য অন্যত্র কোথাও ছিল। যেতে যেতে মনে হল ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলতে আসতে হবে এসব জায়গার। শেষ পর্যন্ত ১০.৪৫-এ এসে পৌঁছুলাম চিড়িয়াখানার পাশে। দূর থেকে স্কাইস্ক্রাপার দেখা গেলেও নামার পর সেটা হারিয়ে ফেললাম। তবে দূরে দেখা যাচ্ছিল বেলি দম, তাই সামনের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। বেলি দম মানে হোয়াইট হাউজ। ১৯৯১ সালের আগস্টে এখানেই রচিত হয়েছিল ইতিহাস— রাশিয়ার, সোভিয়েত ইউনিয়নের, বিশ্বের— নতুন ইতিহাস। সেদিন আমিও অনেকের সঙ্গেই বেলি দমের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম ইয়েলৎসিন কী বলেন সেটা শোনার জন্য। এর মাত্র দুবছর পরে, ১৯৯৩ সালের অক্টোবরে, ইয়েলৎসিন নিজে কামান দেগে সেই বিল্ডিংয়ে আশ্রয় নেওয়া তাঁর এক সময়ের বন্ধুদের প্রতিহত করেন। রাজনীতিতে বন্ধু নেই, আছে ক্ষমতা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আর স্বার্থ।

সেই বেলি দলের দিকে হাঁটতে শুরু করে একটু পরেই চোখে পড়ল চিড়িয়াখানা। মস্কোর চিড়িয়াখানা। কত বার এখানে এসেছি বন্ধুদের সঙ্গে, এসেছি নিজের ছেলেমেয়েদের নিয়ে। মাথার উপর দিয়ে চলে গেছে ছোট ব্রিজ যা চিড়িয়াখানার দুই অংশকে যোগ করেছে। বাঁদিকে তাকিয়ে দেখি পুকুরে হাঁসেরা নাইছে। একটু এগিয়ে হাতের ডান দিকে পড়ল ক্রাসনোপ্রেসনেনস্কায়া মেট্রো। ওখানে আগে আসতাম সিনেমা দেখতে। এখানে সিনেমা সেন্টারে কখনও কখনও ভাল বিদেশি মুভি দেখাত। শেষবার এখানে দেখেছিলাম সত্যজিৎ রায়ের বেশ কিছু ছবি। বাঁদিকে মেট্রো বারিকাদনায়া। চিরচেনা পথ দিয়ে এগুলাম সামনের দিকে। প্রেস্নের স্কাইস্ক্রাপার রোদে ভেসে যাচ্ছে। আমি সাদোভায়া কালৎসোর (গার্ডেন রিং) বাইরের দিকে। রাস্তা পার হলেই কচালভা স্ট্রিট যেখান ছাত্রজীবনে পুরানো বইয়ের দোকানে ইংরেজি বই কিনতাম। আমার ইংরেজি গল্পের কালেকশন ওখান থেকেই করা। দ্বিজেনকাকু (দ্বিজেন শর্মা— যিনি তখন প্রগতি প্রকাশনে অনুবাদকের কাজ করতেন) প্রায়ই আমায় সঙ্গ দিতেন।

আরেকটু এগিয়ে গেলে পড়ত মায়াকভস্কি থিয়েটার আর থিয়েটার উ নিকিতস্কিখ ভারোত। পরের থিয়েটারটা খুব প্রিয় ছিল আমার। মার্ক রজোভস্কি এর প্রধান। উনি সব সময় একটু অন্য রকম করে ইন্টারপ্রেট করতেন সব কিছু। আমি দস্তয়েভস্কির লেখা নিয়ে কিছু পেলেই চলে যেতাম মস্কোর বিভিন্ন থিয়েটারে— তা সে তাগানকা, এমখাত, লেনকম, মসসোভিয়েত যাই হোক, তবে রজোভস্কি ছিলেন একেবারে ভিন্ন ধরনের।

মনে মনে এসব ভাবতে ভাবতে আমি মোড় নিলাম হাতের ডান দিকে। বাঁদিকে গেলে পড়ত কাবুল নামে দোকানটা। যেখানে রুমা আর সুস্মির সঙ্গে যেতাম টুকিটাকি কেনাকাটি করতে। মস্কোয় বিভিন্ন স্যোসিয়ালিস্ট দেশের বিভিন্ন দোকান ছিল। সেসব দোকানে এসব দেশের বিভিন্ন জিনিসপত্র পাওয়া যেত। তারপর প্ল্যানেটোরিয়াম, পাকিস্তান দূতাবাস ইত্যাদি ইত্যাদি। শেষ এ এলাকায় এসেছি ২০১৩ সালে সেভা আর ক্রিস্তিনাকে নিয়ে চিড়িয়াখানা আর প্ল্যানেটোরিয়াম দেখতে। প্ল্যানেটোরিয়ামের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় কলকাতায়, ১৯৬৯ সালে। এরপর সেখানে গেছি ১৯৮০ সালে। মস্কো আসার পরে একাধিক বার স্থানীয় প্ল্যানেটোরিয়ামে গেছি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর অনেকদিন বন্ধ ছিল রিপেয়ারিংয়ের জন্য। এ নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে স্থানীয় পত্রপত্রিকায়। এখন এসব জায়গা অনেক বদলে গেছে। নতুন নতুন বাড়ি উঠেছে অনেক।

দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল আমেরিকান দূতাবাস। তার আগে একটা বাড়ি দেখে অবাক হলাম। ওর সামনে কয়েকটা বাচ্চা নিয়ে দুজন মধ্যবয়েসি মহিলা দাঁড়িয়ে। দূর থেকে ভাবলাম জিপসি, কাছে এসে বুঝলাম স্কুল থেকে এসেছে। কাছে গিয়ে দেখি এটা ফিওদর শালিয়াপিনের বাসা— ফ্রাঙ্ক সিনাত্রার মত নামকরা গায়ক। উনি রুশ সাম্রাজ্যে কেরিয়ার শুরু করলেও বিপ্লবের পরে প্যারিস চলে যান। শুনেছি উনি আর মাক্সিম গোর্কি একই সঙ্গে কাজানের কনসেরভাটরিতে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। গোর্কি সে পরীক্ষায় টিকে যান আর শালিয়াপিন ফেল করেন। সোভিয়েত আমলে বাড়িটা এত যত্নআত্তিতে ছিল না, তাই হয়তো মনে নেই।

তারপর আমেরিকান দূতাবাস। ঠিক পরের বাড়িটা ছোট্ট সুন্দর এক বিল্ডিং, দেখেই বোঝা যায় ইদানীংকালে চুনকাম করা হয়েছে। এটা বিখ্যাত রুশ লেখক ও কূটনীতিবিদ গ্রিবোয়েদভের বাড়ি। উনি পুশকিনের সমসাময়িক, পারস্যে রুশ রাষ্ট্রদূত ছিলেন। সেখানে জনরোষে নিহত হন। এই দুই বাড়ির মধ্যে আমেরিকান দূতাবাস খুব বেমানান লাগছিল। এটা শুধু দুটো ছোট বাড়ির মাঝে বিশাল বাড়ি বলেই নয়। এতক্ষণ পর্যন্ত এই পায়ে হাঁটা পথ ছিল প্রশস্ত, আলো ঝলমল। এখানে হঠাৎ দেখলাম দূতাবাসের ঠিক গা-ঘেঁষে অনেকগুলো বিশাল বিশাল সিমেন্টের ব্লক বসানো। ওরা যেন বলছে সাবধান, কাছে এসো না। গ্রীষ্মে ফুল লাগালে এগুলো টবের মত মনে হলেও এখন, এই শীতে ওগুলোকে অ্যান্টিডেমনস্ট্রেশন ব্লক বলেই মনে হচ্ছিল। আবার মনে হল অর্থ আর ক্ষমতার কথা। আমরা যত বেশি বিত্তশালী, যত বেশি ক্ষমতাবান হই, নিজেদের তত বেশি আইসোলেট করে রাখি। হয়ে যাই সোনার খাঁচায় বন্দি বিলিয়ন ডলারের পাখি। কিন্তু যতই সোনার হোক না কেন, যতই মণিমানিক্য লাগানো থাক না কেন, জেল জেলই। অর্থ-ক্ষমতা আমাদের অন্যের কাছ থেকে স্বাধীন করে বটে, কিন্তু দিনের শেষে আমরা এই অর্থ আর ক্ষমতার দাস বনে যাই।

একটু এগিয়ে চোখে পড়ল নিউ আরবাত। অক্টোবর সিনেমা হল আমার দিকে তাকিয়ে হাসল, আমিও হাত নেড়ে ওকে স্বাগত জানালাম। সেই বিখ্যাত গ্লোবটা দেখে মন ভরে গেল। একটু দূরে দেখা যাচ্ছে দম ক্নিগি— সোভিয়েত আমলে মস্কোর সবচেয়ে বড় বইয়ের দোকান। কত যে এসেছি এখানে। অনেক কিছুর মত দম ক্নিগি ছিল মস্কোর আকর্ষণীয় স্থানগুলোর একটা। সব সময় লোকে লোকারণ্য এই বইয়ের দোকান থেকে কিনেছি বিভিন্ন শিল্পীর অ্যালবাম। তার ঠিক উল্টো দিকেই জুপিটার নামে একটা ক্যামেরার দোকান ছিল। সেটাও আমার খুব প্রিয় জায়গা। ওখানেই কিনেছি ক্যামেরা, কয়েকটা লেন্স।

এতক্ষণ আমি হাঁটছিলাম সাদোভায়া কালৎসোর বাইরের দিক দিয়ে। এখানে হাতের ডানদিকে মোড় নিলে সামনে পড়বে কুতুজভস্কি প্রসপেক্ট। সেখানে মস্কো নদীর এপারে বেলি দম। তবে আমি সেদিকে না গিয়ে সাবওয়ে দিয়ে রাস্তা পার হয়ে চলে এলাম ভেতরের দিকে। সামনে স্মলেনস্কায়া মেট্রো। এর পর ফরেন মিনিস্ট্রি। রুশ ফরেন মিনিস্ট্রি মস্কোয় যে সাতটি স্তালিনস্কায়া ভিসোতকা আছে তার একটায় অবস্থিত। এই ভিসোতকা বা স্কাইস্ক্র্যাপারগুলো স্তালিনের আমলে তৈরি বলে জনমুখে এই নামে পরিচিত। রাস্তার উল্টো দিকে গোল্ডেন রিং হোটেলের দুই বিল্ডিং। আগে এর নাম ছিল হোটেল বেলগ্রাদ। ফরেন মিনিস্ট্রির দিকে পেছন ফিরে দাঁড়ালে চোখে পড়বে আরও একটা স্তালিনস্কায়া ভিসোতকা— হোটেল ইউক্রাইন।

ফরেন মিনিস্ট্রির পেছনে স্তারি বা পুরোনো আরবাত— মস্কোবাসীর আরও একটা প্রিয় জায়গা। আমারও প্রচণ্ড পছন্দের। কত গান, কত উপন্যাস যে লেখা হয়েছে এই আরবাতকে নিয়ে। ছাত্রজীবনে কতবার যে এসেছি। এটা পায়ে হাঁটার রাস্তা। সারাদিন এখানে থাকে রংবেরঙের মানুষের ভিড়। শিল্পী, গায়ক— কে নেই সেখানে। মোটামুটি গ্রহণযোগ্য দামে শিল্পীদের দিয়ে আঁকিয়ে নেওয়া যায় নিজের পোরট্রেট। সব সময় মেলা মেলা ভাব। আর বছরের সব সময় বিদেশি দিয়ে ভরা। ছাত্রজীবনে অনেক সময় রাতের গভীরে আসতাম এখানে ঘুরতে। তখন এখানে জমায়েত হতেন ভিন্ন মতাবলম্বীরা— হিপ্পি, রকার। গিটার বাজিয়ে গান করতেন। সাদা পোশাকের পুলিশ এসে ওদের নিয়ে যেত আর আমাদের হোস্টেলে ফিরে যেতে বলত। আজ ভাবলে অবাক লাগে এরা যদি হিপ্পি আর রকারদের বিরুদ্ধে লড়াই না করে পার্টির দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে লড়ত, সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে দেশটা হয়তো অকালে বেঘোরে মারা যেত না।

ফরেন মিনিস্ট্রি পেছনে রেখে চলে গেলাম একটা অফিসে যেখানে কিছু ডকুমেন্ট দেখানোর দরকার ছিল। কাজ শেষে দেখি ১২টা বাজে। ‘আচ্ছা, অনেকদিন তো ক্রিমস্কি ব্রিজে হাঁটা হয় না। কেমন হয় গেলে?’ মনে পড়ল ১৯৮৬ সালের কথা। আমরা তখন প্রায়ই আসতাম গোর্কি পার্কে। একদিন আমি আর আমার রুমমেট কুমার দাঁড়িয়ে ছিলাম ট্রলি বাসের জন্য। যাব আরবাত। হঠাৎ বেশ কিছু স্কুলের ছাত্র এসে চড়াও হল আমাদের ওপর। পরে ওদের নিজেদের মধ্যেই ঝগড়া আমাদের মারবে কী মারবে না এ নিয়ে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বুড়িরা ওদের একটু ধমকিয়ে আমাদের বললেন:
—তোমরা হেঁটে চলে যাও। ওরা অল্পবয়েসি। কথা শুনবে না।
আমরা হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম নদীর ওপার। শেষ যখন এই ব্রিজের ওপর দিয়ে হাঁটি মনে হয় ১৯৯১ সালের শীতের রাতে। প্লেখানভ থেকে আমি আর তমাল বাসায় ফিরছিলাম:
—চল হাঁটি পার্ক কুলতুরি পর্যন্ত।
—চল।
তখন যৌবন। রক্ত গরম। ভালবাসা আর স্বপ্নে হৃদয় মন সব ভরা। হঠাৎ তমাল আমার মাথা থেকে টুপি নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিল ব্রিজ থেকে। তাকিয়ে দেখি নদীতে পড়েনি। দৌড়ে নীচে নেমে নিয়ে এলাম টুপিটা। এসব কথা ভাবতে ভাবতে হাঁটতে লাগলাম মস্কো নদীর দিকে।
জুবভস্কি বুলভারডে এসে তাকালাম ডান দিকে। সেখানে রাশিয়ার চেম্বার অফ আকাউন্তস। ওই পথে হাঁটলে সামনে পড়বে বাংলাদেশ দূতাবাস। ১৯৯২ সালে যখন দূতাবাস স্কুলে কাজ করতাম, এ পথেই যেতাম। ফেরার সময় সঙ্গে থাকতেন কাকু, মানে দ্বিজেন শর্মা। কখনও চলে যেতাম তলস্তয়ের বাড়ি। পথে পড়ত তলস্তয়ের স্ট্যাচু। সামনের দিকে এখনও দাঁড়িয়ে প্রগতি প্রকাশন। প্রায়ই আসতাম— একা, কাকুর সঙ্গে বা বন্ধুদের নিয়ে। সোভিয়েত জীবনে প্রগতির বাংলা বই আমাদের কাছে ছিল বদ্ধ কামরার জানালার মত। তখনও রুশ ভাষায় বইপত্র তেমন পড়তে পারতাম না। বাংলা বলতে ছিল দেশ থেকে আসা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা ‘একতা’ আর প্রগতি প্রকাশনীর বই। আমরা যারা সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়তে এসেছিলাম তাদের অধিকাংশই ছিলাম বামঘেঁষা রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে। ফলে দেশে থাকতেই প্রগতির বইয়ের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম।

ইদানীং প্রায়ই এ এলাকায় আসছি, আর সব সময়ই আমাকে সঙ্গ দিচ্ছেন কাকু! কথা বলি মনে মনে— কত কথা, তার কী কোনও শেষ আছে? মৃত মানুষের সঙ্গে কথা বলার এই এক সুবিধা— কথোপকথন চলে নিজের ইচ্ছেমত, এমনকি প্রশ্ন-উত্তর সবই নিজের মত। তবে সে জন্যে যাঁর সঙ্গে কথা বলছি তাঁকে জানতে হয়, বুঝতে হয়, তাঁর মনের সঙ্গে, তাঁর চিন্তাচেতনার সঙ্গে নিজের মন আর চেতনাকে একই সুরে বাঁধতে হয়— অনেকটা গানের আগে হারমোনিয়াম আর ডুগি-তবলার গৎ বাঁধার মত। কাকুর সঙ্গে কথা বলতে বলতে চলে এলাম মস্কো নদীর মাঝামাঝি। হাঁটছি ক্রিমস্কি ব্রিজ ধরে। আকাশে রোদের হাসি। সে হাসিতে ঝলমল করছে ক্রাইস্ট দ্য সাভিওর চার্চের চূড়া, আরও দূরে ক্রেমলিনের আরখানগেলস্কি চার্চের চূড়া জানিয়ে দিচ্ছে তার উপস্থিতি।

সামনে পিটার দ্য গ্রেটের বিশাল স্ট্যাচু— স্কাল্পচার ৎসিরেতেলির তৈরি। এটা নব্বুইয়ের দশকে তৈরি। সে সময় এটা মস্কোবাসীদের ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিল। আমারও অসহ্য লাগত এই স্ট্যাচুটা। এখন গা সওয়া হয়ে গেছে। নদী পার হয়ে এলাম ক্রিমস্কি ভালের ত্রেতইয়াকভ গ্যালারির সামনে। এটা মূল গ্যালারি নয়। মূল গ্যালারি ত্রেতইয়াকভস্কি মেট্রোর ওখানে। এটা শাখামাত্র। তবে মাঝেমধ্যেই ভাল ভাল এক্সিবিশনের আয়োজন করে এখানে। অনেক আগে ১৯৯৪ সালে মনিকা জন্মের মাত্র কয়েকদিন আগে বন্ধু তপু এসেছিল মস্কো বেড়াতে। তখন সেখানে চলছিল সালভাদর দালির প্রদর্শনী। বিশাল লাইন। এখানে প্রেগন্যান্ট মহিলাদের সব জায়গায় অগ্রাধিকার, তাই গুলিয়াকে সাথে নিয়ে গেলাম সেই প্রদর্শনীতে। মনে হল যেন সেদিনের কথা।

পেছনে দেখা যাচ্ছে প্রেসিডেন্ট হোটেল। আগে নাম ছিল অক্টোবর হোটেল। বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টির উঁচু পর্যায়ের নেতারা এলে এখানেই থাকতেন। বাংলাদেশ থেকে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারাও এখানে উঠতেন। ১৯৮৭ সালের ৯ অক্টোবর এই হোটেলেই কমরেড ফরহাদ মারা যান। ছাত্রজীবনে প্রচুর গেছি সেখানে। শেষ গেছি ২০১৩ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাশিয়া সফরে এসে সেখানে ছিলেন, তাঁর সঙ্গে দেখা করতে।

ত্রেতইয়াকভস্কি গ্যালারি আর প্রেসিডেন্ট হোটেলের মধ্যে খোলা জায়গায় এখন শোভা পাচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর যেসব সোভিয়েত নেতাদের স্ট্যাচু ভেঙে ফেলা হয়েছিল সেসব। ওখানে দাঁড়িয়ে ভাবছি কী করব। সোজা চলে যাব অক্টোবরস্কায়া মেট্রোয় নাকি ঢুকব গোর্কি পার্কে? এটা আমাদের যৌবনের প্রিয় জায়গা। জালালের সঙ্গে যেতাম প্রায়ই। তাছাড়া বিভিন্ন উৎসবে, বিশেষ করে ৯ মে বিজয় দিবসে যেতাম সেখানে সবাই মিলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হাজার হাজার ভেটেরান আসতেন এখানে। ফুল দিতাম, ছবি তুলতাম।

সোভিয়েত ইউনিয়নে হাতেগোনা কয়েকটি উৎসব ছিল— মে ডে, ভিক্টরি ডে আর অক্টোবর বিপ্লব দিবস। ১ মে আর ৭ নভেম্বর যেতাম রেড স্কয়ারে। ৯ মে বিজয় দিবসে বলশয় থিয়েটারের ওখানে আর পার্ক কুলতুরিতে। এখানে শেষ আসি মনে হয় ১৯৯৬ সালে যখন আন্তন, মনিকা খুব ছোট। অনেক দিন পরে এখানে ঢুকে নস্টালজিক লাগল নিজেকে। হুড়হুড় করে একে একে স্মৃতিগুলো ভিড় করে আসতে লাগল মনের বায়োস্কোপে। এখন শীত, তাই পার্ক বলতে গেলে জনশূন্য, শুধু ঘেরা জায়গায় স্কেটিং করছেন লোকজন। আমি সারা পার্ক পেরিয়ে বেরুলাম লেনিনস্কি প্রসপেক্টে।

রাস্তা ক্রস করে যাচ্ছি সাবলভস্কায়ার দিকে, মনে পড়ল পাশেই প্রেমানন্দের অফিস। কল দিলাম।
—বিজনদা, চলে আসেন চা খেয়ে যান।
—ঠিক আছে। কিন্তু সময় একেবারেই নেই।
প্রেমের ওখানে বসে কথা বলছি।
—এখন এক মহিলা আসবেন আমার অফিস দেখতে। এখানে সব সময় নিরিবিলি, কোনও হৈচৈ নেই, অথচ এক মহিলা সব সময় আসে বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে। কী যে মুস্কিল।
—তোমার কথা শুনে মনে হয় শান্তিই অশান্তির মূল। তুমি যে শান্তিতে আছ, ওই ভদ্রমহিলা সেটা সহ্য করতে পারছেন না, তাই এত ঝামেলা।
মিনিট পনেরো প্রেমের ওখানে গল্পগুজব করে বেরিয়ে পড়লাম। ইউনিভার্সিটিতে এসে দেখি ইউরি গ্রিগরিভিচ বসে আছেন।
—শুভ নববর্ষ।
—শুভ নববর্ষ। ইউরি পেত্রোভিচ তোমার জন্য এই কাগজগুলো রেখে গেছেন। এগুলো নিয়ে তোমার মিকলুখো মাকলায়া যেতে হবে।
—হ্যাঁ, জানি। আমি খেয়ে আসছি। তারপরেই চলে যাব।

আচ্ছা ট্রামে গেলে কেমন হয়? লমনোসভস্কি প্রসপেক্ট থেকে ট্রলি বা বাসে করে ওখান থেকে যাব টুরিস্ট বিল্ডিংয়ে? এ পথেই তো আসতাম ছাত্রজীবনে। ভাবতে ভাবতে দাঁড়িয়ে রইলাম ট্রামের জন্য। কিন্তু ট্রামের পাত্তা নেই। হাঁটতে শুরু করলাম লেনিনস্কি প্রসপেক্ট মেট্রো স্টেশনে। ওখানে থাকত কঙ্কর আর তানিয়া। ভাল বইয়ের কালেকশন ছিল ওদের। প্রায়ই আসতাম ওদের ওখানে। আর ওদের হোস্টেলের নিচে ছিল বেশ ভাল একটা ক্যাফে।

ক্যাডার সেকশনে যখন এলাম, সাড়ে তিনটে বেজে গেছে। ভাবলাম খুব তাড়াতাড়ি সব করে চলে যাব। সেখানে আরও কিছু ডকুমেন্ট যোগাড় করতে হল। বিকেল ৫.৪৫-এ যখন অফিস বন্ধ করল, আমার তখনও কিছু ফর্ম পূরণ করতে বাকি। ভদ্রমহিলা বললেন শুক্রবার আসতে বা কারও হাতে ডকুমেন্ট পাঠাতে।

ওখান থেকে বেরিয়ে গেলাম ২ নম্বর ব্লকে। এই ব্লকের ৫১০ নম্বরে আমার কেটেছে দীর্ঘ ৯ বছর (২০ থেকে ২৯— ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫ থেকে মে ১৯৯৪ পর্যন্ত)। তবে এখন আর উপরের দিকে তাকাই না। ১৯৯৪ সালে দুবনা যাবার পর পর এদিকে এলে ওই রুমে ঢুঁ মারতাম, দেখতাম কারা থাকে। এখন আর হয়ে ওঠে না। বলার কীই বা আছে। এখন এখানে আসি ইন্ডিয়ান দোকানে আচার আর চানাচুর কিনতে।
ওখান থেকে বেরিয়ে ফোন করলাম সানুকে। আজ ১০ জানুয়ারি, পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন। বঙ্গবন্ধু পরিষদ রাশিয়ার উদ্যোগে দিনটা পালিত হয়, আজও হচ্ছে। যেহেতু মস্কো এসেছি, তাই ভাবলাম ঘুরে যাই যদি কেউ আমাকে ১০টার দিকে কোনও মেট্রোতে দিয়ে আসে। রাত ১১টার বাসে দুবনা ফিরতে হবে।

সুযোগ পেলেই বাংলাদেশিদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাই, মূলত মানুষের সঙ্গে দেখা করতে। ওটাই সামনাসামনি কথা বলার একমাত্র জায়গা। দেশ নিয়ে যতই ভাবি না কেন, শুধু ফেসবুক বা পেপার পড়ে দেশের সব খবর পাওয়া যায় না, দেশের, দেশের মানুষের নাড়িনক্ষত্র বোঝা যায় না। মনে আছে, এক সময় আমি শুধুই প্রকৃতির ছবি তুলতাম। কোথাও বেড়াতে গেলে অপেক্ষা করতাম কখন শেষ মানুষটি চলে যাবেন আর আমি ফাঁকা জায়গার ছবি নিতে পারব। পরে মনে হয়েছে মানুষবিহীন ছবি জীবনহীন, তাই এখন চেষ্টা করি ছবিতে মানুষও রাখতে। মানুষ আর প্রকৃতি একে অন্যের পরিপূরক।

একইভাবে ইন্টারনেট, কাগজপত্র আর মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় কোনও কিছু জানার জন্য একে অন্যের পরিপূরক। কেননা একমাত্র পারস্পরিক মতবিনিময়ের মধ্য দিয়েই আমরা নিজেদের স্টেরিওটাইপ চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারি, অন্যের মত করে ভাবতে, দেখতে শিখি আর সেটা না হলেও কোন ব্যাপারে যে ভিন্ন মত আছে সেটা বুঝতে পারি। আলো শুধু পথ দেখায় না, চোখ ধাঁধানো আলো অন্ধও করে। আলো দিয়ে অন্ধকারকে ততক্ষণই জয় করা যায়, যতক্ষণ না আমরা অন্ধভাবে আলোর ক্ষমতায় আস্থা রাখি। প্রশ্নহীন বিশ্বাস— এটা অন্ধত্বের ভিন্ন রূপ। প্রশ্নহীন বিশ্বাস— এটা বিজ্ঞানবিরোধী, এটা পেছনে চলার পথ।

কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখি? আমরা নিজ নিজ জীবনে একজন আইডল তৈরি করে নিই আর সর্বশক্তি দিয়ে তাকে পারফেক্ট বানানোর চেষ্টা করি। ভুলে যাই, ঠিক কাজ করার মত ভুল করাটাও মানুষের সহজাত। এই সাধারণ সত্য না মানাটাই অন্ধত্ব, অন্ধবিশ্বাস। আর এই অন্ধবিশ্বাসও মানুষের সহজাত। আস্তিক যেমন অন্ধভাবে ধর্মকে বিশ্বাস করে নাস্তিকের ওপর চড়াও হয়, নাস্তিকও তেমনি একই রকম অন্ধভাবে আস্তিকের মুণ্ডুপাত করে। বিজ্ঞানে বা যুক্তিতে বিশ্বাস করলেই যে আমি মুক্তমনা তা কিন্তু নয়। আদর্শ, মতবাদ, ধর্ম, রাজনীতি এ সবই কন্ডিশনাল, মানে শর্তসাপেক্ষ। এক পরিস্থিতিতে যেটা ভাল ভিন্ন পরিস্থিতিতে সেটা ভাল হবে তার মানে নেই। তাহলে তো সমাজবিজ্ঞানের নিয়মকানুন ফিজিক্সের ল হয়ে যেত।

কথাটা এ জন্যেই বলা যে, আমরা যারা কোনও না কোনও আদর্শে বিশ্বাস করি, কাউকে না কাউকে আদর্শ হিসেবে দেখে তাঁকে পথের দিশারী মনে করি, তাঁদের প্রতি অন্ধবিশ্বাস শুধু সেই বিশ্বাস বা সেই নেতৃত্বের জন্যই ক্ষতিকর নয়, শেষবিচারে দেশ ও জাতির জন্যও ক্ষতিকর। প্রশ্ন না করলে আমরা উত্তর খুঁজতে শিখব না, উত্তর খুঁজতে না শিখলে পারফেকশনের দিকে এগুবো না, শুধু এক চেনা বৃত্তের মধ্যেই আবর্তিত হব। তাই বঙ্গবন্ধুর জীবনের ওপর যেকোনও অনুষ্ঠান নিজেদেরকে প্রশ্ন করার দিন— আমরা কী এখনও তাঁর আদর্শেই আছি, যে বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে এই মানুষটি নয় মাস নিজের কবরের পাশে শুয়ে দিন কাটিয়েছেন, আমরা কী সেই স্বপ্ন নিজেদের বুকে ধারণ করি? কাউকে শ্রদ্ধা জানান, এটা শুধু তাঁর কৃতকাজের স্বীকৃতি দেওয়া নয়, এটা তাঁর স্বপ্নকে সামনে নিয়ে যাওয়ার লড়াইয়ে নিজেকে যুক্ত করা।

দুবনায় যখন ফিরলাম, রাত ১টা বেজে গেছে। শীতের রাত। লোকজন নেই কোথাও। সাদা বরফের পুরু কম্বল গায়ে শুয়ে আছে দুবনা। শেষ ট্রেনটা রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে সাঁই সাঁই করে চলে গেল। রেললাইনের ওপারে একটু দূরে ভোলগা ঘুমিয়ে আছে। জনশূন্য রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের কাছে তুষারকণা উড়ে বেড়াচ্ছে জোনাকির মত। আমারও ঘুমের সময় হয়ে এসেছে।

দুবনা, ২৫ জানুয়ারি ২০২২

কভার: শীতের মস্কো নদী— মস্কো নদীর শীত।/ চিত্র: লেখক

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ১

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ২

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ৩

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ৪

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ৬

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ৭

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ৮

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ৯

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ১০

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ১১

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ১২

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ১৩

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ১৪

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

সনজীদা খাতুন: শ্রদ্ধাঞ্জলি

সাতচল্লিশ-পরবর্তী পূর্ববঙ্গে বেশ কিছু সাংস্কৃতিক সংস্থা গড়ে ওঠে, যাদের মধ‍্যে ‘বুলবুল ললিতকলা একাডেমী’, ‘ক্রান্তি’, ‘উদীচী’ অন‍্যতম। রাজনৈতিক শোষণ ও পূর্ববঙ্গকে নিপীড়নের প্রতিবাদে কখনও পরোক্ষভাবে কখনও সরাসরি ভূমিকা রেখেছিল এইসব সংগঠন। ‘ছায়ানট’ এমনি আর এক আগ্নেয় প্রতিষ্ঠান, ১৯৬৭-তে জন্মে আজ পর্যন্ত যার ভূমিকা দেশের সুমহান ঐতিহ‍্যকে বাংলাদেশের গভীর থেকে গভীরতরতায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেশে সুস্থ ও সংস্কৃতিবান নাগরিক গড়ে তোলা। ওয়াহিদুল হক ও সনজীদা খাতুনের মানসসন্তান এই ছায়ানট। মূলত রবীন্দ্রনাথের আদর্শে গড়ে ওঠা সঙ্ঘ, কাজী নজরুলের প্রিয় নামটিকে জয়ধ্বজা করে এগিয়ে চলেছে বহু চড়াই-উৎরাই, উপলব‍্যথিত গতি নিয়ে।

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর গুচ্ছকবিতা

বিলাপ অভিসার জল আনতে চল রে সখী, জল আনতে চল নিভু নিভু আলোর সাজে সূর্য অস্তাচলে শেষবিকেলের রশ্মিমালায় বুকে ব্যথার ঢল লজ্জা আমার আবির হয়ে

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

যত মত তত পথ

বহুদিক দিয়েই একজন স্বতন্ত্র মননের ধর্মীয় সাধক। তাঁর অনুগামীর সংখ্যা ধারণাতীত, আর তা কেবল তাঁর স্বদেশ বা এই উপমহাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়, সারা বিশ্বব্যাপী। এবং দিনের পর দিন তাঁর অনুগামীর সংখ্যা বাড়ছে। শ্রীরামকৃষ্ণ এবং সারদামণি ও স্বামী বিবেকানন্দকে কেন্দ্র করে যে ভাব-আন্দোলন, তার ফলশ্রুতিতে তাঁদের নিয়ে নিয়ত চর্চা ও গবেষণা হয়ে চলেছে। পৃথিবীব্যাপী দুশোর ওপর রামকৃষ্ণ মিশনের কার্যাবলি প্রমাণ করে (প্রতিবছর এর সংখ্যা বাড়ছে), আজকের এই অশান্ত বিশ্বে তাঁরা মানুষের কতখানি আশ্রয়।

Read More »
ড. সোমা দত্ত

রবীন্দ্রনৃত্যভাবনা: প্রেক্ষিত ও চলন [পর্ব ছয়]

রবীন্দ্রভাবনায় যে নৃত্যধারা গড়ে উঠল তা দেশিবিদেশি নৃত্যের সমন্বয়ে এক মিশ্র নৃত্যধারা, তৎকালীন শিক্ষিত শহুরে বাঙালির সংস্কৃতিতে যা নতুন মাত্রা যোগ করল। নাচের প্রতি একরকম আগ্রহ তৈরি করল, কিছু প্রাচীন সংস্কার ভাঙল, মেয়েরা খানিক শরীরের ভাষা প্রকাশে সক্ষম হল। এ কম বড় পাওনা নয়। আরও একটি লক্ষ্যনীয় বিষয় হল, শিল্পক্ষেত্রে ভাবের সাথে ভাবনার মিল ঘটিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টির প্রচেষ্টা। গতে বাঁধা প্র্যাক্টিস নয়। নিজের গড়ে নেওয়া নাচ নিজের বোধ অনুযায়ী।

Read More »
ড. সোমা দত্ত

রবীন্দ্রনৃত্যভাবনা: প্রেক্ষিত ও চলন [পর্ব পাঁচ]

বাংলার মাটি থেকে একদা এই সুদূর দ্বীপপুঞ্জে ভেসে যেত আসত সপ্তডিঙা মধুকর। আর রবীন্দ্রনাথের পিতামহ, যাঁর কথা তিনি কোথাও প্রায় উল্লেখই করেন না, সেই দ্বারকানাথ-ও বাংলার তৎকালীন ব্যবসায়ীকুলের মধ্যে প্রধান ছিলেন। শুধু তাই-ই নয়, একদা তাঁর প্রিয় জ্যোতিদাদাও স্টিমারের ব্যবসা করতে গিয়ে ডুবিয়েছেন ঠাকুর পরিবারের সম্পদ। নিজে রবীন্দ্রনাথ বাণিজ্য সেভাবে না করলেও, জমির সম্পর্কে যুক্ত থাকলেও একদা বাংলার সাম্রাজ্য বিস্তার, বাণিজ্য-বিস্তার কী তাঁরও মাথার মধ্যে ছাপ ফেলে রেখেছিল? তাই ইউরোপ থেকে আনা বাল্মিকী প্রতিভার ধারাকে প্রতিস্থাপন করলেন জাভা বালির কৌমনৃত্য দিয়ে?

Read More »
ড. সোমা দত্ত

রবীন্দ্রনৃত্যভাবনা: প্রেক্ষিত ও চলন [পর্ব চার]

তৎকালীন দেশের বাস্তব সত্যের সঙ্গে মিলছে না বর্ণবাদ, উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদ, মিলছে না পিকেটিং ও বিদেশি দ্রব্য পোড়ানোর আন্দোলন। রবীন্দ্রনাথ দেখতে পাচ্ছেন গ্রামে গ্রামে গরিব মানুষের খাওয়া নেই, নেই বেশি দাম দিয়ে দেশি ছাপ মারা কাপড় কেনার ক্ষমতা। দেখছেন পিকেটিংয়ের নামে গরিব মুসলমানের কাপড়ের গাঁঠরি পুড়ে যাচ্ছে যা দিয়ে সে তার পরিবার প্রতিপালন করে। রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদ করছেন তাঁর লেখায়। ‘গোরা’ ও ‘ঘরে বাইরে’ এমনই দু’টি উপন্যাস। গোরা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় প্রবাসী পত্রিকায়। পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশ ১৯১০ সালে। ঘরে বাইরের প্রকাশকাল ১৯১৬।

Read More »