
সিনিয়র সিটিজেন
কয়েক দিন আগে মস্কোয় রিলেটিভিটির ওপর এক কনফারেন্সে ইন্ডিয়া থেকে বেশ কয়েক জন বিজ্ঞানী এসেছিলেন। বিভুর সাথে আমার আলাপ দুই বছর আগে গত কনফারেন্সে। এবার

কয়েক দিন আগে মস্কোয় রিলেটিভিটির ওপর এক কনফারেন্সে ইন্ডিয়া থেকে বেশ কয়েক জন বিজ্ঞানী এসেছিলেন। বিভুর সাথে আমার আলাপ দুই বছর আগে গত কনফারেন্সে। এবার

ভালভাষা উৎসব সংখ্যা ২০২৩। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন অনেকগুলো দেশকে আপাত স্বাধীন করলেও তাদের আসলে পরাধীন করেছে, পরাধীন করেছে আরও বেশি ভয়ংকর শক্তির কাছে। প্রায় সবগুলো দেশের জনগণের অবস্থা আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। লিখেছেন বিজন সাহা।

India’s First Bengali Daily Journal. বিজ্ঞানী সত্যসন্ধানী। মিথ্যার ওপর ভিত্তি করে সত্যের সন্ধান পাওয়া যায় না। যেহেতু নতুন নতুন তথ্য আমাদের নতুন সত্যের মুখোমুখি করে, অনেক মিথ্যা তাই যতটা না আমাদের সত্য জানার অনীহা তার চেয়ে বেশি সঠিক তথ্যের অভাব। তবে একজন বিজ্ঞানী ভুল স্বীকার করতে দ্বিধা বোধ করেন না। এক পরিস্থিতিতে যেটা সঠিক বলে মনে হয় ভিন্ন পরিস্থিতিতে সেটা ভুল হতেই পারে। আসলে এই পরিস্থিতির ভিন্নতা সাধারণ সমস্যাকে বিশেষ সমস্যার রূপ দেয়। নতুন তথ্য বা জ্ঞান তাই শুধু সমস্যার সমাধানই দেয় না, নতুন সমস্যাও তৈরি করে।

India’s First Bengali Daily Journal. সুধীরদা সব সময়ই ছাত্রদের প্রিয় ছিল। ও নিজে যেমন ছাত্রদের ভালবাসত, ছাত্ররাও একইভাবে ওকে ভালবাসত, শ্রদ্ধা করত। ২০০২ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সারা দেশে হিন্দুদের ওপর আক্রমণ হয়। একদিন বিএনপি, জামাতের এরকম একটা দল মিছিল করে আসছিল তরা গ্রামের হিন্দুদের ওপর আক্রমণ করার জন্য। ওই মিছিল থেকে এক ছাত্র দৌড়ে আসে আমাদের বাড়ি তার সুধীর স্যারকে সতর্ক করে দিতে। আর সঙ্গে সঙ্গে মজনু ভাইরা এসে বাড়ির সবাইকে ওদের বাড়িতে নিয়ে যায়। এটা কি সাফল্য না ব্যর্থতা?

India’s First Bengali Daily Magazine. নেহরুর ‘An autobiography’ বা গান্ধীর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘An experiment with the truth’ বা মৌলানা আজাদের ‘India wins freedom’ বইয়ে নেতাজির তেমন উল্লেখ না দেখে অবাক হইনি। আসলে, বাংলার বাইরের লেখকেরা কখনওই নেতাজিকে নিয়ে তেমন কিছু লিখেছেন বলে মনে হয় না, তারা অতি যত্নে তাঁর প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছেন। হতে পারে আমি নিজে হয়তো সেসব লেখার সঙ্গে পরিচিত নই।

India’s First Bengali Daily Magazine. আমাদের বাড়িতে যদিও কয়েক পুরুষ কমবেশি শিক্ষিত, এক দাদু ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার, বড় জ্যাঠামহাশয় (ওঁকে আমি দেখিনি, আমার জন্মের আগেই মারা গেছেন) নীলরতন মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করা ডাক্তার, বাবাও নীলরতনে পড়ার সময় নিরুদ্দেশ হয়ে যান আর আমাদের জেনারেশনের সবাই উচ্চশিক্ষিত, কিন্তু মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে উদার ছিলেন না। আমার বড়দির বিয়ে হয় পড়াশুনা শেষ না করেই বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার ভাইপোর সঙ্গে। ছোটকাকার তিন মেয়ে সন্ধ্যাদি, আরতিদি আর চন্দনাও স্কুলের গণ্ডি পেরুনোর আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসে। কিন্তু মা বউদি আর দিদির শিক্ষার ব্যাপারে অনড়।

India’s First Bengali Daily Magazine. নাস্তিয়া সেই আগের মতই আছে। হাসিখুশি। গাঢ় নীল চোখ। কোঁকড়ানো সোনালি চুল। ওরা ছিল দুই বোন। যমজ। ওর বোন পড়ত ফিললজি ফ্যাকাল্টিতে। মাঝেমধ্যে অভি ওর বোনকে নাস্তিয়া মনে করে ডেকে বোকা বনে যেত। ছাত্রজীবনে ওদের তেমন বন্ধুত্ব ছিল না। কথা হত মূলত কাজ নিয়ে মানে থিসিসের কাজ কেমন চলছে এসব ব্যাপারে। ব্যক্তিগত বিষয়ে কথাবার্তা হত না কখনও। এখন অনায়াসে নিজেদের কথা বলে, ছেলেমেয়েদের কথা বলে। যদি ছাত্রজীবনে নাস্তিয়াকে ডিনারে ডাকতে অভি সংকোচ বোধ করত, এখন সেটা করে না।

India’s First Bengali Daily Magazine. আসলে ছবি— এটা অন্যের চোখে নিজেকে দেখা আর সেটা সব সময়ই নতুন অভিজ্ঞতা। আমরা তো ছবি তুলি শুধুমাত্র কোনও ব্যাকগ্রাউন্ডে মডেলকে ফিক্সড করার জন্য নয়, নিজের দেখাটা, মডেলের সঙ্গে সঙ্গে নিজের মুড ধরে রাখার জন্য। নিজের ভাল লাগাটা ধরে রাখার জন্য। কারণ যা তুলছি সেটা নিজের ভাল না লাগলে সেটা ভাল কিছু হবে না। তবে ভাল হয় যদি যার ছবি তুলছি তার সম্পর্কে আগে থেকেই কিছু জানা থাকে।

India’s First Bengali Daily Magazine. আসলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রায়োরিটি বদলায়, বদলায় দৃষ্টিভঙ্গি। একসময়ের কমরেডরা হয় চরম শত্রু। আসলে যখন পৃথিবীটা ছোট ছিল, পরিচিতের গণ্ডি ছোট ছিল আর সবাই কমবেশি একই দেশে বাস করত— তখন অনেক কিছুই সহজ ছিল। আজ আমরা যখন সারা বিশ্বে ছড়িয়েছিটিয়ে, দেশ আমাদের ভিন্ন, ফলে ভিন্ন ন্যায়-অন্যায়ের সংজ্ঞা, ভিন্ন দেশপ্রেম— তখন সেই অতীতকে ধরে রাখা, ফেলে আসা অতীতের জন্য নস্টালজিক হওয়া যুক্তিবাদী মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। তাছাড়া অধিকাংশ মানুষ এখন যুক্তি বা ভক্তির ঊর্ধ্বে— আজ সবাই প্র্যাগমেটিক।

India’s First Bengali Daily Magazine. এর আগে কখনও একতলায় থাকিনি মস্কোয়। দুবনায় লেস্নায়ার বাসা ছিল এক তলায়, আর বাসা ছিল বনের ভেতর। সেটার অন্য রকম আবেদন ছিল। কিন্তু সেদিন মস্কোয় ঘুম ভাঙল পাখির ডাকে, অনেকটা দেশে মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙার মত। মনে হল আমি যেন গ্রামের বাড়িয়ে শুয়ে আছি। আসলে স্বর্গ নরক তো মানুষের নিজের মধ্যেই। সে কীভাবে প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেবে, কীভাবে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবে তার ওপর নির্ভর করে কোন জায়গা তার জন্য স্বর্গ হবে নাকি নরক।

India’s First Bengali Story Portal. আমি তো সব সময় প্রেমে পড়েই থাকি। জীবনের সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে। কীসের প্রেমে না পড়ি। রাস্তায় একটা ফুল বা পাতা দেখে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি, ছবি তুলতে যেতে পারি। বই পড়ে কারও প্রেমে পড়ে যাই। মনে আছে দস্তইয়েফস্কির ‘সাদা রাত’ পড়ে লেনিনগ্রাদে সাদা রাতে নাস্তিয়ার অপেক্ষায় সারা রাত বসে ছিলাম, আসেনি। যখন মস্কোয় অত্রাদনায়া মেট্রো স্টেশন চালু হল ওখানে গিয়ে ঘুরেছিলাম নাতাশা রস্তোভার খোঁজে। যুদ্ধ ও শান্তির নায়িকা নাতাশার বাবার বাড়ি ছিল ওখানেই। দেখা পাইনি। এই আমি যদি প্রেমের জন্য দাড়ি রাখতাম তাহলে এত দিন তা আজানুলম্বিত হয়ে দুবনার রাস্তাঘাট ঝাড়ু দিত।

India’s First Bengali Story Portal. অনেক আগে মৃত্যুকে খুব ভয় পেতাম। এতই ভয় পেতাম যে মরে মরেই বেঁচে থাকতাম। তারপর এদেশে পড়তে এসে ভয়টা অনেকটাই কমে যায়। সেটা নতুন করে শুরু হয় বাচ্চাদের জন্মের পরে। ওদের নিজেদের পায়ে দাঁড় না করিয়ে কি মরা যায়। বিশেষ করে নব্বুইয়ের দশকের আর এই শতাব্দীর প্রথম দিকে, যখন উগ্রবাদীদের প্রবল প্রতাপ ছিল তখন ঘর থেকে বাইরে বেরুতেই ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে যেত। তবে কসমোলজির ভেতরে যতই ঢুকেছি নিজের ক্ষুদ্রতা ততই বিশাল হয়ে উঠেছে। আর এতে করে বেঁচে থাকার প্রতি অনীহা নয়, বেঁচে থাকার গুরুত্ব অনেক কমে গেছে।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, ছাত্রজীবন শেষ করে মস্কোর ঠিকানা বারবার বদলালেও আমি পারতপক্ষে সেখানে বাস করনি। হয় উইকএন্ড অথবা গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে শুরু করার পর মাঝেমধ্যে রাত কাটানো। সেই ১৯৯৪ সাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমার স্থায়ী নিবাস দুবনা, যদিও স্থায়ী ঠিকানা মস্কো। তবে ঘরবাড়ির চেয়ে ঠিকানা হিসেবে আমার সবচেয়ে ভাল লাগে ভোলগার তীর বা পাশের বন।

এটা ঠিক, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতায় সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভূমিকা ছিল অপরিহার্য। পাকিস্তানি শাসকেরা সেটা বুঝতে পেরেছিল বলেই বারবার চেষ্টা করেছে রবীন্দ্রসঙ্গীত, পয়লা বৈশাখ— এসব নিষিদ্ধ করতে। আর বাঙালি বারবার এদেরকেই আঁকড়ে ধরেছে, সংস্কৃতির মশাল হাতে নিয়ে সে বারবার খুঁজেছে সামনে চলার পথ। সংস্কৃতি আর মৌলবাদের চলার পথ সবসময়ই বিপরীতমুখী। তাই তো আজও মৌলবাদ প্রাণপণে চায় এসব বন্ধ করতে।

আমার ঠাকুরদা নিজে বাড়ির ব্যবসাপাতি দেখাশুনা করলেও তাঁর ছোটভাই কলকাতায় পড়াশুনা করেন। তিনি ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। একই ঘটনা ঘটে বাবা-কাকাদের সঙ্গে। বড় জ্যাঠামশাই নীলরতন মেডিক্যাল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাশ করেন। মেজ জ্যাঠামশাই আর ছোটকাকা এলাকায় ম্যাট্রিকুলেশন পর্যন্ত পড়াশুনা করে গ্রামেই থাকতেন। বাবা কলকাতায় বঙ্গবাসী কলেজ থেকে এন্ট্রান্স পাশ করে বড় জ্যাঠার মতই নীলরতন মেডিক্যালে ভর্তি হন। তবে পড়াশুনার এক পর্যায়ে বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পরে তাকে পাওয়া যায় আসামের জঙ্গলে এক সাধুর আশ্রমে।

আজ কথা বলব বীজগণিতের একটা সমস্যা নিয়ে, যেটা সবার কাছেই অত্যন্ত পরিচিত। এটা দ্বিঘাত সমীকরণ। এটা বলার আরও একটা কারণ আছে। কয়েক বছর আগে ফেসবুকে ফ্যাক্টর পদ্ধতিতে এই সমীকরণের সমাধান খুব হইচই ফেলে দেয়। আমেরিকার কোনও এক শিক্ষক এই পদ্ধতি আবিষ্কার করেন বলে দাবি করেন, অথচ ফ্রান্সুয়া ভিয়েট (francois viete) সেই ষোড়শ শতকেই এটা করেছিলেন।

মৃত্যুটা জীবনের আরেক প্রান্ত, ঠিক জন্মের মতই। এটা তো অস্বাভাবিক কোনও ব্যাপার নয়। সবাই মরছে কিন্তু জীবন থেমে নাই। তাই মৃত্যুকে ভয় পাবার কী আছে? আসল কথা কীভাবে মরা। আমাদের বাড়ির সবাই তো খুব রোগে ভুগে মারা যায়। এটাই আমাকে একটু বিচলিত করে। সম্মানের সাথে মৃত্যুকে বরণ করার নামই জীবন। ভালবাসা শুধু প্রিয় মানুষদের মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচানোই নয়, তাদের সম্মানের সাথে মরতে দেওয়ার নামও ভালবাসা।

একমাত্র পারস্পরিক মতবিনিময়ের মধ্য দিয়েই আমরা নিজেদের স্টেরিওটাইপ চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারি, অন্যের মত করে ভাবতে, দেখতে শিখি আর সেটা না হলেও কোন ব্যাপারে যে ভিন্ন মত আছে সেটা বুঝতে পারি। আলো শুধু পথ দেখায় না, চোখ ধাঁধানো আলো অন্ধও করে। আলো দিয়ে অন্ধকারকে ততক্ষণই জয় করা যায়, যতক্ষণ না আমরা অন্ধভাবে আলোর ক্ষমতায় আস্থা রাখি। প্রশ্নহীন বিশ্বাস— এটা অন্ধত্বের ভিন্ন রূপ। প্রশ্নহীন বিশ্বাস— এটা বিজ্ঞানবিরোধী, এটা পেছনে চলার পথ।

অস্কার ওয়াইল্ডের ‘দ্য পিকচার অফ ডোরিয়ান গ্রে’ পড়ো নাই? মনে আছে, সেখানে বাসিল নামে এক আর্টিস্ট ডোরিয়ানের একটা ফুল সাইজ ছবি এঁকে দিয়েছিল। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডোরিয়ান যখন বৃদ্ধ হল, অসুখবিসুখে ভুগতে শুরু করল, দেখা গেল ওর সব রোগ, সব বালাই সেই পোর্ট্রেট নিজে নিয়ে নিয়েছে। ফলে ডোরিয়ান সেই আগের মতই যৌবনদীপ্ত থেকে গেছে, যদিও ওর পোর্ট্রেট অসুখবিসুখে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে শুরু করেছে। আমারও সেই অবস্থা। কলেবর বাড়তে বাড়তে আমার রোগের ইতিহাস মহাভারতের আকার ধারণ করেছে আর আমি সেই আগের মতই রয়ে গেছি।

কিছু বলার আগেই এক প্লেট স্যুপ এগিয়ে দিলেন আমার সামনে। উখা হল মাছের স্যুপ। সেটা আমার জানা ছিল না। খেতে শুরু করে বুঝলাম এটা মাছের স্যুপ। আমি এমনিতেই মাছ তেমন খাই না, তার ওপর মাছের স্যুপ। আমার শরীর ঘামতে শুরু করেছে, কপালে একটু একটু ঘাম জমে গেছে। আসলে আমি না পারছি গিলতে, না পারছি ফেলতে। একটু করে খাই আর ভাবি এই বুঝি সব উগরে ফেলব।

গরমকালে ছুটির দিনে ছাদে পায়চারি করতে বেশ লাগে। ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়োয় শরীরটা। আকাশের একপাশে আবির। সন্ধে হবে হবে। অন্যদিকে কাঁচা হলুদ। চায়ের ট্রে নিয়ে জমিয়ে বসেছে রুমা। বিয়ের পর কি মানুষ প্রেম করতে ভুলে যায়? নিত্যদিন ভাত রুটি ডালের গল্পে প্রেম থাকে না কোথাও? অনেকদিন রুমার সঙ্গে শুধু শুধু ঘুরতে যায়নি ও।

মনু-পরাশর-বৃহস্পতি-কৌটিল্যদের অনুশাসন এসে নারী প্রগতির রাশ টেনে ধরল। নারীর শিক্ষালাভের ইতি ঘটল, অন্তঃপুরে বাস নির্দিষ্ট হল তাঁর জন্য। তাঁকে বাঁধা হল একের পর এক অনুশাসনে। বলা হল, স্বাধীনতা বলে কোনও পদার্থ থাকবে না তাঁর, ‘ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি’! কুমারী অবস্থায় পিতা-মাতার অধীন থাকবে সে, বিয়ের পর স্বামীর, বার্ধক্যে সন্তানের। ধাপে ধাপে তাঁর ওপর চাপানো হতে লাগল কঠিন, কঠিনতর, কঠিনতম শাস্তি।

এককালে পর্তুগিজ-মগরা আমাদের নিম্নবঙ্গ থেকে দাস সংগ্রহ করত মালয়-বার্মাতে শ্রমিকের কাজের জন্য, ইংরেজ সাহেবরাও কিনত গোলাম। আজ আবার মানুষ সস্তা হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসকের দরকার নেই। খোলাবাজারে নিজেরাই নিজেদের কিনছে দেশের মানুষ। মানুষ বিক্রির মেলা বসে এখন গ্রামগঞ্জের হাটে হাটে।

গ্রামশি-বর্ণিত ও পরবর্তীতে বহুলচর্চিত ‘সাব অলটার্ন’-এর আগেই মহাশ্বেতার লেখায় ব্রাত্যজনসংহিতা মূর্ত; ‘অরণ্যের অধিকার’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৭-এ। আর সাব অলটার্ন-তত্ত্ব প্রথম দানা বাঁধছে ১৯৮২-তে জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে, রণজিৎ গুহ, গৌতম ভদ্র, শাহেদ আমিন, পার্থ চট্টোপাধ্যায়দের সঙ্কলন প্রকাশের মাধ্যমে। অবশ্য তার বহু আগেই ইতিহাস রচনায় সাব অলটার্ন চেতনায় স্থিতধী দেখা গেছে রবীন্দ্রনাথকে। স্বামী বিবেকানন্দ মূর্খ, চণ্ডাল ও দরিদ্র ভারতবাসীর মাহাত্ম্য বুঝিয়ে গেছেন, আর বিভূতিভূষণকেও আমরা সামগ্রিক বিচারে প্রান্তিক মানুষের কথাকার রূপেই পাই। কিন্তু মহাশ্বেতা আরও ব্যাপক, গভীর, তন্ময়, নিবিড়, ও নিঃসন্দেহে দলিত জনতার কথাকার।

ব্রাহ্মণ ঘরের মেয়ে ও বধূ হয়ে তিনি কিনা মুসলমান ঘরামি আমজাদকে খেতে দিয়ে তার এঁটোকাটা নিজের হাতে পরিষ্কার করেন! বিধর্মী খ্রিস্টান নিবেদিতার সঙ্গে বসে আহার করেন! আর তাঁর চেয়েও বড় কথা, সে যুগের বিচারে বিপ্লবাত্মক ঘটনা, স্বামীর মৃত্যুর পর যে দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর বেঁচেছিলেন তিনি, বিধবাবিবাহের প্রবর্তক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর-ও যা কল্পনায় আনতে গেলে নির্ঘাত মূর্ছা যেতেন, লালপেড়ে শাড়ি আর সোনার বালায় ভূষিতা থাকতেন তিনি! আজকের উচ্চশিক্ষিত সমাজেও ক’জন পারবেন এ-কাজ করতে, বা নিদেন এ কাজকে সমর্থন করতে?

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।