Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

রাশিয়ার চিরকুট

পর্ব ৮

তোমার হল শুরু আমার হল সারা

রাত পোহালেই সূর্যের ডানায় ভর করে আসবে ১৪ এপ্রিল। রাশিয়ায় আর যে কোনওদিনের মতই একটা দিন। তবে এরই মধ্যে মঙ্গল শোভাযাত্রায় ছয়লাপ হবে সুদূর বাংলাদেশের রাস্তাঘাট। আমি বাড়িতে ফোন করব। দিদি ফোন তুললে যখন বলব:
—শুভ নববর্ষ দিদি।
—আজ তো চৈত্রসংক্রান্তি ভাই। পয়লা বৈশাখ তো আগামী কাল।

এ এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। মনে হবে ছোটবেলার কথা। তখন আমরা এটাকে বলতাম হালখাতা। চৈত্রের শেষের কয়েকদিন থেকেই পাশের জেলেপাড়ায় চলত চৈত্র পূজা। সারাদিন বিভিন্ন দল এসে ভূতপেত্নি সেজে নেচে যেত শিবের সঙ্গে আর রাতে নাচ চলত মণ্ডপে। কী ভৌতিক ছিল সে রাতগুলো! চারিদিকে ভূতপেত্নির আনাগোনা। ভয় আর উত্তেজনার মধ্য দিয়ে কাটত নববর্ষের আগের এ দিনগুলো।
এরপর চৈত্রসংক্রান্তি। ছাতু, মুড়িমুড়কি এসব ছিল এদিনের মূল উপাদান। সঙ্গে বিভিন্ন শাক। যতদূর মনে পড়ে এ সময় বাড়িঘর ধুয়েমুছে প্রস্তুত করা হত নতুন বছরকে বরণ করার জন্য।

পয়লা বৈশাখ সকাল থেকে আসতে শুরু করতেন গ্রামের লোকজন। আমরাও যেতাম পাড়ায় পাড়ায়। কোলাকুলি, মিষ্টিমুখ এসব ছিল পয়লা বৈশাখের সকালের দৃশ্য। অনেকটা ঈদ আর বিজয়াদশমীর পরে কোলাকুলির মত। তবে ওসব অনুষ্ঠান ছিল একেবারেই ধর্মীয়, পয়লা বৈশাখের কোলাকুলি— ধর্মনিরপেক্ষ, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এরপর আসতেন খদ্দেররা। এঁরা ছিল তাঁতি আর জোলা। আমাদের বাড়ি থেকে সুতা কিনে কাপড়, চাদর, লুঙ্গি, গামছা এসব তৈরি করতেন। খোলা হত নতুন খাতা। সবাই চেষ্টা করতেন পুরনো বছরের ঋণ শোধ করতে। সারাদিন আসতেন খদ্দেররা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে। দই, মুড়িমুড়কি আর বিভিন্ন মিষ্টি দিয়ে বাড়ির লোকেরা বরণ করত শতশত অতিথিকে, বরণ করত নতুন বছরকে।

সেটা ছিল সংবাদপত্রের যুগ। পরের দিন কাগজে রমনার বটমূলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের খবর পড়তাম। তবে সেটা ছিল অনেক দূরে, ঢাকায়। গ্রামের জীবনে এর বাহ্যিক প্রতিফলন তখন তেমন দেখিনি। তবে এটা ঠিক, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতায় সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভূমিকা ছিল অপরিহার্য। পাকিস্তানি শাসকেরা সেটা বুঝতে পেরেছিল বলেই বারবার চেষ্টা করেছে রবীন্দ্রসঙ্গীত, পয়লা বৈশাখ— এসব নিষিদ্ধ করতে। আর বাঙালি বারবার এদেরকেই আঁকড়ে ধরেছে, সংস্কৃতির মশাল হাতে নিয়ে সে বারবার খুঁজেছে সামনে চলার পথ। সংস্কৃতি আর মৌলবাদের চলার পথ সবসময়ই বিপরীতমুখী। তাই তো আজও মৌলবাদ প্রাণপণে চায় এসব বন্ধ করতে। দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রায় সব সরকারই ভোটের কথা ভেবে এদের দাবিদাওয়ার কাছে নতিস্বীকার করে। মানুষ বরাবরই ছিল শক্তের ভক্ত নরমের যম। সরকারের মানবিক রূপটা হয়তো এখানেই প্রকাশ পায়।

.

বাংলা পঞ্জিকা নিয়ে আমি বরাবরই দ্বিধাগ্রস্ত। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এর কোনও ব্যবহার নেই। যেটুকু ব্যবহার সেটা ধর্মীয় জীবনে। এমনকি ভাষা দিবস আমরা পালন করি একুশে ফেব্রুয়ারি, ৮ই ফাল্গুন নয়। আমাদের দেশের শিক্ষা থেকে শুরু করে অফিস-আদালত সবই চলে ইংরেজি (গ্রেগরিয়ান) পঞ্জিকায়। ঈদ, রোজাসহ ইসলাম ধর্মীয় সমস্ত উৎসব পালিত হয় হিজরি পঞ্জিকা অনুযায়ী আর হিন্দুদের পূজা-পার্বণ, বিয়ে সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয় বাংলা পঞ্জিকার অনুসরণে। বাংলার হিন্দু এসব করতে এখনও কলকাতা থেকে প্রকাশিত পঞ্জিকাই অনুসরণ করেন। সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্রের অবস্থানের ভিত্তিতে তৈরি এ পঞ্জিকা ইংরেজি বর্ষপঞ্জির তুলনায় বেশ ফ্লেক্সিবল। তাই সরকারিভাবে ১৪ এপ্রিলকে ১লা বৈশাখ ঘোষণা করায় একধরনের দ্বৈত ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বাংলা পঞ্জিকার ব্যবহারে।

বিগত কয়েক বছর হল দেশে অনেক উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে নববর্ষ পালন করা হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মেতে ওঠে বাঙালি। এটা যে শুধু সংস্কৃতির কারণেই হয়েছে তা নয়। বাজার অর্থনীতিও এখানে তার ভূমিকা রেখেছে। আগে সাধারণত ঈদ ও পূজা ছিল নতুন পোশাকে সাজার সময়। এখন ঈদ পূজার বাইরেও একুশে ফেব্রুয়ারি আর নববর্ষে নতুন পোশাক কেনার হিড়িক পড়ে দোকানে দোকানে। নতুন বছরকে নতুন আঙ্গিকে বরণ করে বাঙালি।

বাংলা পঞ্জিকাকে মৌলবাদীরা হিন্দুধর্মের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার চেষ্টা করেন। অথচ এই পঞ্জিকার প্রবর্তক হিসেবে আমরা দেখতে পাই আলাউদ্দীন হোসেন শাহ্‌ আর সম্রাট আকবরের নাম। ইদানীং অবশ্য সঙ্ঘ পরিবার রাজা শশাঙ্ক বাংলা পঞ্জিকার প্রবর্তক বলে দাবি করছে। সম্রাট আকবরের সম্পর্কে বলা হয় যে, উনি এই পঞ্জিকা এমনভাবে তৈরি করেন যাতে এর শুরু হয় হিজরি বছরের সঙ্গে। ১৫৫৬ সালে, মানে, আকবরের সিংহাসনে আরোহণের সময় পর্যন্ত তারা চলে হাতে হাত রেখে। আর এর পর থেকে হিজরি বরাবরের মত চান্দ্র নিয়মে চললেও আকবরের পঞ্জিকা চলে সৌর পথে। কারণ এটা স্থানীয় জনগণের কাছ থেকে কর আদায়ের জন্য অধিক সুবিধাজনক ছিল। আকবরের মৃত্যুর পর এই পঞ্জিকা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেলেও পরবর্তীতে সেটা নতুন জীবন পায় বাংলায়। তাই যারা বাংলা পঞ্জিকাকে হিন্দু পঞ্জিকা বলে বাধার সৃষ্টি করেন তারা মূলত বাংলা-বিরোধী, শত শত বছর ধরে চলে আসা বাংলার সংস্কৃতি-বিরোধী। তাদের সঙ্গে তাল দিয়ে যারা বাঙালির এই প্রাণের উৎসব পালনে বাধা দেন বা উৎসবকে সময়ের খাঁচায় ঢুকিয়ে দেয়, বাংলাদেশ, বাংলা সংস্কৃতির প্রতি তাদের কমিটমেন্ট সম্পর্কে সন্দেহ জাগাটাই স্বাভাবিক।

অবশ্য তাদের কথা বলেই লাভ কী? অদ্ভুত জাতি আমরা। খুব কম জাতিই ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। বাঙালি তাদের অন্যতম। যে ভাষার জন্য সে প্রাণ দিল, সেই ভাষায় ছেলেমেয়ের নাম রাখা তারা লজ্জার মনে করে। আমাদের ছোটবেলায় রহিম, করিম এসব নাম বাংলা না হলেও বাংলা থেকে খুব দূরে ছিল না। সেগুলো বাইরের বলে মনে হত না। আজকাল মানুষের নাম আরবি-ঘেঁষা। যার নামে যত বেশি আরবির প্রভাব— সে তত খাঁটি বাংলাদেশি, তত সাচ্চা মুসলমান। অথচ প্রচুর মুসলিম দেশ আছে, যেমন ইন্দোনেশিয়া, যেখানে স্থানীয় নামেই তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। জাতিগত বৈশিষ্ট্য মানুষের অস্থিমজ্জায়। এমনকি যারা যুগ যুগ ধরে বাইরে থাকেন, তারাও তাদের এই বৈশিষ্ট্য কাটিয়ে উঠতে পারেন না। আর আমরা চাই দেশে বসেই সেটা কাটিয়ে উঠতে। বাংলাদেশে বসে আরবের শেখ হতে। তারা ভুলে যান বাঙালি ভাল মুসলমান হতে পারে, কিন্তু ভাল আরব সে কোনও দিনই হতে পারবে না। আরব হওয়ার জন্য আরব হয়ে জন্মাতে হয়, বাঙালিয়ানা ত্যাগ করলেই আরব হওয়া যায় না।

.

দেশ থেকে দূরে থাকলেও বাঙালিরা সব সময়ই চেষ্টা করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেশের কাছে ফিরে যেতে। মস্কোতেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। বিভিন্ন সংগঠন প্রতি বছর এ সময় নববর্ষ পালন করে। ২০১০ সালে স্থাপনের পর থেকে প্রতি বছরই আমরা বাংলাদেশ প্রবাসী পরিষদ রাশিয়া মস্কোয় বসবাসকারী সব বাঙালিদের নিয়ে এ দিনটি পালন করতাম। কিন্তু ২০২০ সাল থেকে করোনার কারণে সেটা হয়ে উঠছে না। তারপরেও আমরা যে যেভাবে পারি এ দিনটি স্মরণ করি।

করোনা, সময়— এ সবই আমাদের জীবনে তার ছাপ রেখে যায়। এবার রোজার কারণে শুনলাম দেশে মঙ্গল শোভাযাত্রা নাকি আগের মত হবে না, দুপুর দুটোর মধ্যেই নাকি অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে। এই না হওয়াটা অবশ্য আমাদের শক্তি নয়, জাতি হিসেবে দুর্বলতার পরিচয়। ছোটবেলায় পড়েছি ‘উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে, তিনিই মধ্যম যিনি চলেন তফাতে।’ হ্যাঁ, মধ্য আয়ের দেশ আমরা, তাই উত্তম হতে পারব কীভাবে?

এবার অবশ্য দিদিকে ফোন করা হবে না। অপার থেকে ও এখনও ওর নম্বর পাঠায়নি। জানি না ওই জগতে নেট কাজ করে কিনা বা পরলোক বলে কিছু আছে কিনা?

যাই হোক, আশা করি একদিন আমরা অনুধাবন করব যে সবার উপরে আমরা মানুষ, তার পর বাঙালি, আর তারও পর হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ইত্যাদি ইত্যাদি। আর তখনই আমরা ফিরে যাব মাটির কাছে, আবহমান বাংলার সংস্কৃতির কাছে। সবাইকে চৈত্রসংক্রান্তি আর নববর্ষের অনেক অনেক শুভেচ্ছা আর ভালবাসা। ভাল থাকুন, সুখে থাকুন।

১৪ এপ্রিল ২০২২। দুই বাংলার দুই ১৪২৯ সীমান্তে কাঁটাতারের উঁচু দেওয়ালের দুই পাশে দাঁড়িয়ে। ওদের চার হাত দেয়ালের গায়ে যেন একে অপরকে স্পর্শ করতে চাইছে। ওরা গলা ছেড়ে গাইছে, ‘তোমার হল শুরু আমার হল সারা’।

কিন্তু বাংলাদেশের ১৪২৯-এর মন আজ ভারাক্রান্ত।
—কী ব্যাপার! আজ আনন্দের দিন, তোমার মনখারাপ কেন?
—কী করব বলো। এবার ওরা আমাকে বরণ করে নেবার জন্য বাচ্চাদের আসতে দেয়নি। রমনার বটমূল আর ঢাকা ইউনিভার্সিটির আশেপাশের রাস্তাঘাট সব বন্ধ করে দিয়েছে। মঙ্গল শোভাযাত্রা বেলা দুটোর মধ্যেই শেষ করতে হয়েছে। কোথাও উৎসবের আমেজ নেই। আছে শুধু ভয়, এই বুঝি কিছু একটা ঘটে যায়। পাকিস্তান আমলেও এত ভয়ে ভয়ে কখনও আসিনি, জানতাম বাঙালি শত বাধাবিপত্তির মধ্যেও আমাকে ঠিক বরণ করে নেবে। কিন্তু আজ আমার আর সেই বিশ্বাস নেই। জানি না আবার কখনও ওরা আমার জন্যে অপেক্ষা করবে কিনা, নাকি অন্য অনেক খাঁটি বাঙালি ঐতিহ্যের মতই আমাকেও বিদায় নিতে হবে হিন্দুয়ানীর ‘টিপ’ পরে ধর্মীয় অনুভূতির কাছে পরাজিত হয়ে। সব কিছুর পরেও আমি আসব, আমাকে যে আসতেই হবে। এই বাংলা আমার, এই বাংলার মাটি আমার। ওরা আমাকে বন্দি করেই রাখুক আর নির্বাসনই দিক, এই বাংলা কখনওই আরবের মরুভূমি হবে না। আর মনখারাপ নয়। চলো, আমরাও দুজনে মিলে সবাইকে বলি, শুভ নববর্ষ!

Advertisement
দুবনা, ১৩ এপ্রিল ২০২২

চিত্র: লেখক

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ১

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ২

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ৩

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ৪

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ৫

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ৬

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ৭

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ৯

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ১০

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ১১

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ১২

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ১৩

রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ১৪

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven + nineteen =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর চারটি কবিতা

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »
সালমিন রহমান

বেলুচিস্তান সংকট মোকাবিলা কতটা সহজ

বেলুচিস্তানের সংকটকে কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদ কিংবা কেবল নিরাপত্তা সমস্যার দৃষ্টিতে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি বোঝা যায় না। এখানে ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, প্রাকৃতিক সম্পদ, উন্নয়ন বৈষম্য, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা— সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্বাধীন বেলুচিস্তান গঠিত হলে বহু মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে পারে। একই সঙ্গে একটি নতুন রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াবে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা। অন্যদিকে, পাকিস্তান, চীন, ভারত এবং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

Read More »