Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

গোদার পরিচয়: প্রথম অধ্যায়

যদি গোদার কীভাবে কলকাতায় এলেন তা জানতে হয়, তবে অনেকেই বলবেন যে, সেই সোসাইটি সিনেমার সারারাতব্যাপী লাইন তাঁর রেট্রো দেখার জন্য। তা ১৯৮২ সাল। কিন্তু গোদার আমাদের কাছে সত্তর দশকেই এসেছিলেন রাজাধিরাজের মত। বস্তুত, বাঙালি যুবসমাজের কাছে তখন দুজনই ঈশ্বর, একজন পুবে ক্রুদ্ধ ঋত্বিক ঘটক, আর একজন পশ্চিমে আর্ত জঁ-লুক গোদার। কিন্তু এবার বলতে হবে, পঞ্চাশ বছর আগে এমন প্রেম আমাদের আচ্ছন্ন করেছিল কেন? আসলে যুগটা ছিল আগুনের, বারুদের, প্রতিবাদের। আর আমরা এ-দুজন মানুষের মধ্যে দিয়ে পেয়েছিলাম সেইসব দেবদূতেদের যাঁরা অন্তর্ঘাতের বীজ ফিসফিস করে ছড়িয়ে দিচ্ছেন কান থেকে কানে অথচ দুজনেই কাজ করছেন সিনেমার মত পিচ্ছিল গণমাধ্যমে। এই মাধ্যম তো কবিতা নয়, নাটক নয়, এমনকি চিত্রকলাও নয়। এখানে সবাই সস্তা রমণীর মত ব্যবহার্য গল্প খোঁজে। আর প্রত্যেকেরই ধারণা, তারা নিঃসংকোচে বিনোদনের এই পল্লিতে হুল্লোড়বাজি করে যেতে পারেন। এই পরিস্থিতিতে আমরা দেখেছিলাম গোদার ফরাসি দেশে সম্পূর্ণ একা, যদিও আপাতভাবে দলবদ্ধ, এক প্রতিরোধের জন্ম দিচ্ছেন। ঋত্বিকের কথাও বলা যেতে পারত। কিন্তু আজকের আলোচনা তাঁকে নিয়ে নয়।

বুঝতে পারছি, পাঠকরা বিব্রত হচ্ছেন। সুতরাং তুমুল আড্ডার মধ্যে হাত থেকে হাতে যেমন চায়ের ভাঁড় ঘুরতে থাকে তেমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই কথা বলা ভাল। আমরা মধ্য-পঞ্চাশের প্যারিসের কথা বলছি। এ সময় শতাব্দীর বৃক্ষসকল ম্লান। গাঢ় কুয়াশার মধ্যে আমরা ঈশ্বরের সমাধির কাছে চলে এসেছি। তারপর দেখছি শহরের সেইন নদীর ওপরে সেতুগুলি নিম্নগামী হয়েছে। স্থির পায়ে কতিপয় যুবাদলের সঙ্গে রাত হেঁটে যাচ্ছে নরকের দিকে। সেই প্যারিসের কোনও প্রতিকৃতি বিখ্যাত ল্যুভর চিত্রশালায় পাওয়া যাবে না। সুতরাং একদল তরুণ বিদ্রোহ করলেন। এবং তাঁদের আজকের খবরের কাগজের ভাষায় ‘নবতরঙ্গ’ বলে আখ্যায়িত করা হয়।

ছোট করে গল্পটা বলি। আসলে হয়েছিল কী, একটা সিনেমার কাগজ— ‘লে কাইয়ে দু সিনেমা’ উঠে যাচ্ছিল। তার মালিকরা তখন একজন কৃশকায় ফিল্ম বুদ্ধিজীবীকে অনুরোধ করেন যদি কাগজটা চালানো যায়। সেই সূত্রেই পরবর্তীকালে যিনি আবিশ্বনন্দিত বাস্তববাদী হবেন সেই আঁদ্রে বাজাঁ, কাগজটির দায়িত্ব নিলেন। তিনি প্রতিষ্ঠিত লেখকদের খোঁজ না করে বরং একদল আলুথালু এলোমেলো তরুণকে সিনেমা বিষয়ে লেখার অধিকার দিলেন। তাঁদের লেখা ও চলচ্চিত্রকর্ম প্রচলিত খবরের কাগজগুলোতে হঠাৎ একটা তকমা পেল— নবতরঙ্গ বা ন্যুভেল ভাগ। ফরাসি নবতরঙ্গ অর্থাৎ সেই ক’টি মানুষ যাঁদের হৃদয় সিনেমা-হলের মত শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ছিল না— অর্থাৎ ক্লোদ শ্যাব্রল, ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো, জাক রিভেত, এরিক রোমার, জাক দোনিওল, ভালক্রো ও আমাদের আলোচ্য জঁ-লুক গোদার। কী আশ্চর্য, মাত্র কুড়ি বছরের মধ্যেই সমালোচনা ও সিনেমায়, যখন তাঁর পঁয়তল্লিশ বছর বয়স, তখনই তিনি কিংবদন্তি। খ্যাতির তুঙ্গে থেকেও, চলচ্চিত্র ভাষার ব্যাকরণ বদলে দেওয়ার পরেও সংস্কৃতির ভ্যাটিকান ওই প্যারিসে তিনি সর্বাধিকভাবে আক্রান্ত আবার সর্বাধিকভাবে আলোচিতও। গোদার বিরক্তিকর কিন্তু অনিবার্য। আর ব্যক্তিগতভাবে কলকাতা সম্পর্কে বলতে পারি, আমরা গোদার বিষয়ে যত উচ্ছ্বসিত হয়েছি তার তুলনায় ভদ্রলোকের শেষের দিকের ছবিগুলো আরও বেশি দেখবার সুযোগ পেলে আমাদের মুখরতা অন্তত স্থিতধী হত। বলতে চাইছি, গোদার ঈর্ষা পেয়েছেন, বেশ কিছুটা শ্রদ্ধাও। কিন্তু আমৃত্যু নির্ভেজাল প্রশংসা খুব কমই। সম্ভবত ১৯৬৫-তেই বিখ্যাত চলচ্চিত্রস্রষ্টা লুই বুনুয়েল বলেছিলেন, তাচ্ছিল্যভরে যে, গোদারের চলচ্চিত্র জীবনের আয়ু আর বড়জোর দুবছর। ফরাসি সাম্যবাদীদের কাগজ ‘লুমানিতে’ গোদারকে বিদ্রূপ করেছে— একজন ধোপদুরস্ত নাস্তিক্যবাদী বলে। ১৯৬৬ সালে ধর্মীয় সংস্থা তাঁর ছবি ‘ম্যাস্কুলাঁ ফেমিনাঁ’-কে দণ্ডিত করে। একজন বিখ্যাত সমালোচক তাঁর ‘লে কারাবিনিয়ার’ সম্বন্ধে লিখেছেন, ‘এটা এত নোংরা, এত তাৎপর্যপূর্ণ অপদার্থ একটা ছবি যে আলোচনা করলেও স্নানের প্রয়োজন হয় শুচিবোধ ফিরিয়ে আনার জন্য।’ এবং তারপরও গোদার আর কেউ নন, গোদারই। এবং আবারও বলি, সর্বাধিকভাবে অনুকৃত, তিনি আন্তর্জাতিক সিনেমায় সবচেয়ে জোরালো পাল্টা প্রস্তাব। এমনকি সত্যজিৎ রায়ও স্বীকার করেন, কাহিনি সিনেমার ক্ষেত্রে গ্রিফিথের যা অবদান, ‘অপর’ সিনেমার ক্ষেত্রে গোদারেরও তাই। তার প্রভাব ইউরোপ ছাড়িয়ে আফ্রিকা এশিয়া ল্যাটিন আমেরিকায় পড়েছে। হলিউডের বিরুদ্ধে তাঁর প্রবল প্রতিরোধ সত্ত্বেও তাঁকে অস্কার দেওয়া হয়েছে। এবং অবশেষে এক বিপুল সফলতা-অন্তে তিনি রহস্যজনকভাবে বেছে নিয়েছেন সহায়তাপ্রাপ্ত আত্মহনন। তাঁর বিশৃঙ্খলা, তাঁর স্বনির্বাচিত মাওপন্থা, ৬৮-র যুব বিদ্রোহে যোগদান, তাঁর ভাষাতত্ত্ব ও দর্শনপ্রীতি, অসংলগ্ন ও স্ববিরোধী কথাবার্তা হারিয়ে গেলে আমি দেখতে পাই স্নায়ুযন্ত্রণায় পরাভূত এক নিঃসঙ্গ বন্দিকে, যাঁকে আত্মহননের আগে অপেক্ষা করে যেতে হল প্রায় নব্বই বছর। আমাদের কি মনে পড়বে বিশ শতকের বিরাট গদ্যশিল্পী ফ্রানজ কাফকার কথা? অথবা উনিশ শতকের একেবারে শেষে চিত্রকর ভ্যান গখের কথা? ফ্রাঙ্ক কারমোদের রোমান্টিক শিল্পীকে কি আমাদের মনে পড়বে?: ‘লোনলি, হন্টেড, ভিক্টিমাইজড, ডিভোটেড টু সাফারিং, রাদার দ্যান অ্যাকশন’। এই গোদারই খুঁজে চলেন রাষ্ট্র বা ফ্রানজ কাফকার ঠিকানা।

গোদারের শিল্পকর্মে সামান্য তদন্ত চালালেই বোঝা যায়, তাঁর মার্কসবাদ অনেকটাই আরোপিত। সঙ্গে সঙ্গে একথাও ভুলে যাওয়ার নয়, তিনি যেহেতু প্রকৃত শিল্পী সেহেতু দলদ্রোহী। অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ হয় না— এই জেনে পুঁজিবাদের শেষবিকেলে বধ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে নিজস্ব স্বীকারোক্তি রেখে যেতে চান। আজ যখন তিনি চলে গেছেন তখন বলা যায়, যুবরাজ হ্যামলেটের মতই সিনেমার মত একটি অনভিজাত মাধ্যমকে তিনি প্রশ্নের পর পর প্রশ্নে পরিণত করেছিলেন ভীষ্মের শরশয্যায়।

ইতিহাসে উদ্যত নখর নীরবতা। তেসরা ডিসেম্বর ১৯৩০। জন্ম নিলেন জঁ-লুক গোদার, এমন এক পরিবারে, যার বিত্তস্ফীতি রীতিমত চোখে ধাঁধা লাগায়। অথচ বাড়ির ভেতরে দাম্পত্য রক্তপাত। জঁ-লুকের বাবা ছিলেন চিকিৎসক, মা অভিজাত পরিবারের যথার্থ পরিশীলিত মহিলা। অশান্তির পরিণামে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হল। কিন্তু গোদার পরিবারের দ্বিতীয় সন্তানের প্রকৃত মনোবিপর্যয় শুরু হল যেদিন জননী স্কুটার দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন। জঁ-লুকের বয়স তখন ২৪ এবং তিনি স্কুলজীবনের শেষে আবার সুইৎজারল্যান্ড থেকে ফ্রান্সে ফিরে এসেছেন।

জঁ-লুক গোদার মায়ের প্রতি অত্যন্ত বেশি অনুরক্তি দেখিয়েছেন শৈশবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, অন্যান্য প্রায় সব বিষয়েই প্রয়োজনাতিরিক্তভাবে মুখর হয়েও, গোদার মায়ের সম্পর্কে একটি রহস্যজনক মৌনতার আড়ালে চলে যান। আমাদের মনে রাখা জরুরি যে, শৈশবের ঘটনা তাঁর কাছে স্থায়ী ক্ষতদেশ। আধুনিক পরিভাষায় ফাউন্ডিং ট্রমা। তাঁর ছবিতেও নারী-পুরুষের অন্তর্গত সম্পর্কে একটি না-বলা যামিনী রয়েই গেছে। দ্বিতীয়ত আমাদের খেয়াল করতে হবে, জন বার্জার পিকাসো প্রসঙ্গে যা ভেবেছিলেন, সেই ভার্টিকাল ইনভেডরের ভূমিকা। জীবনের প্রথম দিনগুলো বিদেশে কেটে যাওয়ায় প্যারিসে তাঁর নিজেকে আগন্তুক মনে হত। একজন বিদেশির প্রতি সাধারণ ফরাসির যা প্রতিক্রিয়া গোদার তা অনুভব করতেন শহরের পথে নিতান্ত অসতর্ক মুহূর্তে কোনও পথচারীর সঙ্গে সংঘর্ষে। ‘আমার পারিপার্শ্বিক স্বাক্ষর রেখে গেছে আমার ব্যক্তিসত্ত্বায়। পঞ্চদশ লুইয়ের ভার্সাই উদ্যানে একদা গুহাবাসী মানুষদের হঠাৎ ঢুকে পড়ার মত আমরাও সিনেমা জগতে জবরদস্তি ঢুকে পড়েছিলাম। সমস্তটাই একটা ক্লান্তিকর ব্যাপার ছিল।’— তাঁর আদি যৌবনের একটি সাক্ষাৎকার থেকে উদ্ধৃতি করলাম।

এরপর আমরা লক্ষ্য করব, ফরাসি বুদ্ধিজীবীদের যা সহজাত, সেই অবিন্যস্ততা পেয়ে বসেছে গোদারকে। সরবোনে এথনোগ্রাফি পড়ার চাইতে তিনি লাতিন কোয়ার্টারে সিনে ক্লাবে সময় কাটাতে বেশি ভালবাসেন। এখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা হবে এরিক রোমার ও জাক রিভেতের। তাঁরা একটি একটি ছোট চলচ্চিত্র পত্রিকা প্রকাশও শুরু করবেন। মাত্র পাঁচটি সংখ্যার পরেই সেটি বন্ধ হয়ে যাবে। এইসময় গোদারের মানসিক অস্থিরতা সীমাহীন আর তারই একটি চমৎকার স্মৃতিচারণা করেছেন ত্রুফো: গোদার বিষয়ে যা আমাকে সবচেয়ে চমৎকৃত করত তা হচ্ছে তাঁর বই পড়ার তৎপরতা। যখন আমরা বন্ধুদের সঙ্গে থাকতাম সারা সন্ধ্যাবেলা ও অন্তত চল্লিশটা বই নাড়াচাড়া করত আর সবসময়ই প্রথম পাতা আর শেষ পাতাটা দেখত। তবু মনে রাখতে হবে গোদারের মেদ ও মজ্জায় নিহিত সমালোচনা প্রবৃত্তি। বস্তুত তার সূচনা এই গ্রন্থ পরিক্রমা সূত্রেই। আমার অকারণেই মনে পড়ে যাচ্ছে পলোনিয়াসের জিজ্ঞাসা: ‘কী পড়ছেন প্রভু?’ এবং হ্যামলেটের উত্তর: ‘শব্দ, শব্দ, শব্দ।’ গোদার নিজেও জানিয়েছেন, প্রথম জীবনে সিনেমাকে তিনি পৃথিবী বা জীবন বা ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে দেখেননি। শুধু সিনেমাই ছিল প্রেক্ষাপট। ইতিমধ্যে পড়াশোনায় অমনোযোগের জন্য বিরক্ত অভিভাবক আর্থিক সাহায্য বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে অর্থসংকটে প্রতিভাবান যুবকটিকে জনপ্রিয় ফিল্মি কাহিনি লিখতে হচ্ছে। এমনকি একবার চুরিও করলেন। একমাত্র স্বস্তির বিষয়, গোদার সর্বক্ষণ চলচ্চিত্র নিয়েই ভাবছেন এবং আর কিছু নিয়ে ভাবছেন না। তিনি জানাচ্ছেন— ‘All of us at the cahiers considerd ourselves to be future directors. Writing was already a way of participating in film making because between writing and shooting there is a quantitative, not a qualitative difference.’ সমালোচনার পাশাপাশি প্রায় ছ’বছর ব্যস্ত থাকলেন স্বল্পদৈর্ঘ্যের চিত্র নির্মাণে। ১৯৫৯: আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সসম্ভ্রম প্রণতি জানাল ফ্রান্সকে। ত্রুফো কান থেকে গ্রাঁ-প্রি জয় করলেন। আল্যাঁরেনে ও জঁ-লুক গোদার দুই বিপরীতমুখী প্রতিভা সম্ভব করলেন হিরোশিমা মন আমুর ও আবুদ সুফল (ব্রেথলেস)-এর মত স্থায়ী শিল্পের সৃজন নবতরঙ্গের অশ্বমেধের ঘোড়া পৃথিবী-জয়ে বেরিয়ে গেল।

আমরা ষাটের দশকের শেষের দিকে বা সত্তর দশকে গোদারকে এত কেন গুরুত্বপূর্ণ ভাবলাম। তার একটা কারণ নিশ্চয়ই এই, যে তিনি ধ্রুপদী সিনেমার নির্মাণ পারিপাট্য ভেঙে দিলেন। এই যে বহমানতার বদলে জাম্প কাট— আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত বিচ্ছেদ, এই যে শট-রিভার্স শট রীতি অস্বীকার করা, এই যে অন্তিমে ট্রাকিং শটটিকে দোলাচলে রাখা— এসমস্তই গোদারের দুর্জয় সাহস। কিন্তু গোদারের প্রথম দশটি ছবি থেকেই প্রমাণিত হয়ে যায় যে, তিনি আসলে বিশ শতকের ফরাসি আধুনিকতাবাদীদের মত চলচ্চিত্রকেও সন্দর্ভ করতে চেয়েছিলেন। পিকাসোর চিত্রমালা যেমন একটি প্রবন্ধের রেখাচিত্র, তেমনভাবেই গোদার যা কিছু দর্শনীয় ও শ্রাব্য তাকে চিন্তনীয় করে তুলেছেন। আজ যে তাঁর বিহনে সারা পৃথিবী বৈধব্যে আক্রান্ত তার মূল কারণ তিনি প্রমাণ করতে পেরেছিলেন সমস্ত বয়ানই শেষ পর্যন্ত প্রেমপত্র। দণ্ডিত বন্দির মত সিনেমার রুপোলি সাম্রাজ্যে আর কে এত জিজ্ঞাসাচিহ্ন থরে থরে জমা রাখবেন? আর কে অ্যাফ্লুয়েঞ্জা রুগণ প্রণয়িণীকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেবেন নশ্বরতার ওপারে আছে অমরতা? আর কে র‌্যাঁবো, ভ্যান গখের পথ অনুসরণ করে বিপন্ন সময়রেখা আঁকবেন যে এই বন্ধ্যা প্রতিরূপ নির্মাণ বস্তুত আত্মনাশের সামিল। সুতরাং চলে যাওয়াই ভাল। এই মৃত্যু সুতরাং জীবনাধিক। জঁ-লুক গোদার নিতান্ত চলচ্চিত্রস্রষ্টা নন, তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণের ছলনায় একজন দার্শনিক ও ইতিহাসকার। এমনকি তিনি শুধুমাত্র মার্কস-কোকাকোলা প্রজন্মের ধারাভাষ্যকারও নন। তিনি সিনেমার নিয়তি-নির্ধারিত পরিত্রাতা।

চিত্র: গুগল

2 Responses

  1. পড়তে দেরি হলো। কিন্তু দাগ দিয়ে রেখেছিলাম। আশ্চর্য হলাম যে একটিও মন্তব্য নেই। কত যে জানা হলো! আরো জানার ইচ্ছে জানিয়ে দিল এই লেখা। আশা রাখছি ভবিষ্যতে লেখকের কাছ থেকে এবিষয়ে আরো জানতে পারব। তিনি সে ক্ষমতা রাখেন। 🙏

  2. খুব ভালো লাগলো। পড়তে পড়তে ভাবছিলাম কতকিছুই জানিনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × one =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর চারটি কবিতা

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »