‘চার্বাক/ লোকায়ত’ পর্ব
সাধারণভাবে প্রাচীন ভারতের বস্তুবাদী চর্চায় এবং বিশেষ করে চার্বাক দর্শনের গবেষণায় রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য একজন অথরিটি। তাঁর ‘Studies on the Carvaka/Lokayata’, ‘More Studies on the Carvaka/Lokayata’ এবং ‘চার্বাকচর্চা’ প্রাচীন ভারতের বস্তুবাদী চর্চার আকরগ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত। রামকৃষ্ণবাবুর ‘নির্বাচিত নিবন্ধ’-য় চার্বাক সম্বন্ধে দুটি অত্যন্ত মূল্যবান প্রবন্ধ রয়েছে, ‘প্রাচীন ভারতে দর্শন ও বিজ্ঞান’ এবং ‘নাস্তিক আর চার্বাক’।
আধ্যাত্মিকতার প্রভাব কোনও সমাজের জনমানসে থাকলে নিরীশ্বরবাদী, বস্তুবাদী চিন্তাও জগতের সাধারণ দ্বান্দ্বিক নিয়মেই থাকবে। তাই প্রাচীন ভারতেও যেমন ঈশ্বর, ব্রহ্ম ইত্যাদির চর্চা ছিল, তেমনি নাস্তিকতার চর্চাও ছিল। ‘ঋগ্বেদ’-এ তাই দেখা যায় বিপুল এই সৃষ্টি কোথা থেকে এল? সেই প্রশ্নর জবাবে শ্লোককর্তা বলছেন, ‘সৃষ্ট দেবতা কেমনে জানিবে, সৃষ্ট দেবতা অর্বাচীন (প্রাচীনের উল্টো, মানে নতুন, অর্থাৎ দেবতারা মানুষেরই সৃষ্টি। তাদের পক্ষে জগৎসৃষ্টির কারণ জানা সম্ভব নয়)। আবার ‘কঠোপনিষদ’-এ যম আর নচিকেতার পরলোক আর পরকাল নিয়ে ঘ্যাম আলোচনায় বিচিকিৎসকদের কথা আসে। যাঁরা পরলোক বা পরকাল মানেন না, সংশয় প্রকাশ করেন। ‘ছান্দোগ্য উপনিষদ’-এর উদ্দালক আরুণিকে অনেক গবেষক ভারতের প্রথম বস্তুবাদী এবং প্রথম বৈজ্ঞানিক চিন্তাবিদ হিসেবে চিহ্নিত করতে চান। বুদ্ধর অগ্রজ সমসাময়িক অজিত কেসকম্বল পরকাল আর পরলোক, কর্মফল ইত্যাদিকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছিলেন। এমনকি ভারতের প্রাচীন ভাববাদী দর্শনগুলোর অনেকক’টিই, যেমন আদি সাংখ্য, ন্যায়, বৈশেষিক, মীমাংসা ইত্যাদিরা নিরীশ্বর দর্শন। এঁদের দর্শনে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই, তবে তাঁরা বেদ মানতেন। আবার জৈন আর আদি বৌদ্ধরাও নিরীশ্বরবাদী, ঈশ্বরের ধারণা নেই, তবে তাঁরা পুনর্জন্ম মানতেন।
প্রাচীন ভারতের বস্তুবাদীরা ঈশ্বর, বেদ, পরলোক, পরকাল, শ্রাদ্ধশান্তির সারবত্তা ইত্যাদি কিছুই মানতেন না। এই বস্তুবাদী ধারাকে চার্বাক-পূর্ব বস্তুবাদী দর্শন (ভূতবাদী ইত্যাদি) এবং চার্বাক দর্শন এই দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এঁরা দেহ ছাড়া আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন না, পঞ্চ অথবা চতুর্ভূতকেই, মানে আগুন, জল, মাটি, বাতাস এবং আকাশ (চতুর্ভূতবাদী মানে চার্বাকরা আকাশকে মানতেন না) জগৎকারণ হিসেবে দেখতেন। প্রত্যক্ষ এবং প্রত্যক্ষ-ভিত্তিক অনুমান ছাড়া কিছু মানতেন না ফলে স্বর্গ-নরক-আপ্তবাক্য (বেদের বাণী ইত্যাদি)-কে অস্বীকার করতেন।
প্রাচীন ভারতে বস্তুবাদ বেশ গুরুত্বপূর্ণ দর্শনতন্ত্র ছিল। ভারতের দর্শনচর্চা ছিল তর্কমূলক। কোনও মতের দার্শনিক, বিরুদ্ধ দর্শনের মতগুলোকে প্রথমে পূর্বপক্ষর মত হিসেবে রেখে, সেগুলো খণ্ডন করে নিজের মতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতেন। ভারতের প্রায় প্রতিটি বিখ্যাত ভাববাদী দর্শনের গ্রন্থেই কিন্তু পূর্বপক্ষ হিসেবে চার্বাক বা বস্তুবাদীদের মত, অর্থাৎ নাস্তিকমত খণ্ডন করার চেষ্টা করা হয়। দুর্বল প্রতিপক্ষকে পাত্তা দেওয়ার কোনও ঐতিহ্য কিন্ত ভারতের দার্শনিক মহলে ছিল না।
আসলে যাঁরা নাস্তিকতাকে বা বস্তুবাদী চিন্তাকে বিলিতি ভাব বা নতুন কিছু হিসেবে ভাবেন তাঁরা আসলে ভারতের ঐতিহ্য সম্বন্ধে ঠিকমত ওয়াফিকহাল নন।
রামকৃষ্ণবাবু প্রথম প্রবন্ধে ভারতের ঐতিহ্য নিয়ে দুটি চরম মতের বিষয়ে কিছু কথা বলেছেন। কেউ যা কিছু প্রাচীন ভারতীয় তার প্রতিই নির্বিচারে শ্রদ্ধাশীল কেউ বা পুরো কালাপাহাড়। আমাদের সংস্কৃতিই এ জন্য খানিক দায়ী। রামকৃষ্ণবাবু লিখছেন, ‘বাল্যে-কৈশোরে আমাদের সব কিছুকে নির্বিচারে শ্রদ্ধা করতে শেখানো হয়। প্রায় অনিবার্যভাবেই, কারও কারও ক্ষেত্রে পরে এমন একটা ঔদ্ধত্য আসে যে দেশের সব জিনিসই ছিঁড়ে ফালাফালা করা পর্যন্ত স্বস্তি হয় না। অজ্ঞের শ্রদ্ধার পরিণতি হয় অজ্ঞের অশ্রদ্ধা।’
মানুষের সভ্যতায় জ্ঞান বিজ্ঞান দর্শন সাহিত্যে প্রাচীন ভারতের অবদান বিশাল, সে-কথা অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই। তার মানে এই নয় তার সব কিছুই সমানভাবে গ্রহণীয়। গ্রহণ-বর্জনের নীতি অনুসরণ করেই সেই ঐতিহ্যর বিচার করা উচিত। এছাড়া এই বিচারের জন্য ইতিহাসবোধও অত্যন্ত জরুরি। সমসময়ে প্রাচীন ভারতের চিকিৎসাশাস্ত্র অত্যন্ত উন্নত ছিল (‘সুশ্রুত সংহিতা’-য় এমনকি বাঁশের তৈরি নানান যন্ত্রপাতি দিয়ে কীভাবে শব-ব্যবচ্ছেদ করে অ্যানাটমি শিখতে হয় তারও বিশদ বর্ণনা আছে), কিন্তু তা বলে এখন যদি কেউ তাকে আধুনিক অ্যালোপ্যাথের সমকক্ষ বলে চালাতে চান তবে ব্যথা আছে।
প্রথম প্রবন্ধটি আসলে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ‘বস্তুবাদ প্রসঙ্গে’ বইটির প্রথম সংস্করণের সমালোচনা হলেও একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রবন্ধ। চার্বাকদের সম্বন্ধে নানান প্রাথমিক কথাবার্তা বইটিতে আছে। রয়েছে বইটিকে আরও কী কী উপায়ে পাঠকদের কাছে হাজির করলে বইটি পড়তে আগ্রহ জন্মাতে পারে সে নিয়ে অনেকক’টি প্রস্তাব। দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় এবং রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য দুই প্রজন্মের বস্তুবাদী দর্শনচর্চার দুই দিকপাল। বাংলায় লেখা পূর্বসূরির এক অসামান্য কাজের আলোচনা করছেন তাঁর অন্যতম যোগ্য উত্তরসূরি। সেই দিক থেকে দেখলে বাংলা ভাষার দর্শনচর্চার ইতিহাসে এই প্রবন্ধ এক ঐতিহাসিক প্রবন্ধও বটে।
‘বিজ্ঞানের যেখানে শেষ দর্শনের সেখানে শুরু’— একটি আদ্যন্ত ফাউ কথা। শ্রুতিমধুর, কিন্তু কোনও মানে নেই। ভাববাদী দর্শন আর বিজ্ঞানের সম্পর্ক জল-অচলের আবার বস্তুবাদী দর্শন হল বিজ্ঞানভাবনার অন্যতম ভিত্তি। এই নিয়ে কিছু আলোচনা আছে এই প্রবন্ধে। হালে শুধুই রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িকতার কারণে যেসমস্ত বাঙালি নব্যধার্মিক হয়েছেন তাঁরা একবার এই প্রবন্ধটিতে চোখ বুলোতে পারেন। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ‘ভারতে বিজ্ঞানচর্চার অধোগতির জন্যে আমরণ মনু আর আর শঙ্করাচার্যকে দায়ী’ করতেন। আর বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু বলেছিলেন, ‘অবশ্য আমরা ধর্মের নামে খুব বেশি মেতে উঠি। তাই আমি ধার্মিকদের ভয় করি— বিশেষ করে ধর্মের কথা [যখন] বেশি করে বলেন, সে সময় তাঁদের কাছে না ঘেঁষাই শ্রেয়।’
দ্বিতীয় প্রবন্ধটিতে আলোচনা রয়েছে চার্বাক আর নাস্তিক শব্দদুটো নিয়ে। আলোচনাটি পারিভাষিক হলেও সুখপাঠ্য। খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ শতকের পানিণির ‘অষ্টাধ্যায়ী’-তেও নাস্তিক শব্দটি ছিল। তবে ভারতে নাস্তিক শব্দের নানান অর্থ ছিল। রামকৃষ্ণবাবু বিভিন্ন সূত্র থেকে নাস্তিক শব্দটির ছ’টি অর্থ সাজিয়ে দিয়েছেন—
১. পরলোকে অবিশ্বাসী, ২. বেদ-এর প্রামাণ্যে অবিশ্বাসী, ৩. অদৃষ্ট বা কর্মফলে অবিশ্বাসী, ৪. পাপ-পুণ্যে অবিশ্বাসী, ৫. ঈশ্বরে অবিশ্বাসী, ৬. দানে [ব্রাহ্মণদের] অবিশ্বাসী। এর মধ্যে চার্বাক এবং অন্যান্য বস্তুবাদীরা সবক’টিতেই অবিশ্বাস করতেন তাই নাস্তিক। আবার বৌদ্ধরা বেদে অবিশ্বাসী বলে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের কাছে নাস্তিক। লেখক দেখিয়েছেন ‘মহাভারত’-এর চার্বাক রাক্ষসের সঙ্গে চার্বাক দর্শনের কোনও মিল নেই।
প্রসঙ্গত বলে রাখা ভাল, প্রাচীন ভারতের নানান সূত্র ঘেঁটে রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য প্রমাণ করেছেন যে চার্বাকদের নামে চলা একটি শ্লোক ‘ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ’ আদতে একটি বিকৃতি, চার্বাকদের অপদস্থ করার জন্যে। কাণ্ডটি ঘটিয়েছিলেন সায়ণ-মাধব তাঁর ‘সর্বদর্শন সংগ্রহ’ বইতে।
মূল চার্বাক শ্লোকটি ছিল:
যাবজ্জীবং সুখং জীবেন্ নাস্তি মৃত্যোর অগোচরঃ
ভস্মীভূতস্য শান্তস্য পুনরাগমন কুতঃ।।
যতদিন জীবন আছে, সুখে বাঁচবেন, মৃত্যুর অগোচর কিছুই নেই। ছাই হয়ে-যাওয়া মৃত লোক কোথায় (বা কোথা থেকে) আবার ফিরে আসে?
চার্বাকদের হেয় করতে, নিতান্ত ইহসুখবাদী তকমা দিতে সায়ণ-মাধব শ্লোকটিতে ‘নাস্তি মৃত্যোর অগোচরঃ’-এর জায়গায় ‘ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ’ লেখেন। এই নিয়ে রামকৃষ্ণবাবুর আলোচনা ‘চার্বাকচর্চা’ বইটিতে বিশদে আছে।
রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যর ‘নির্বাচিত নিবন্ধ’ বইটিতে ‘চার্বাক/লোকায়ত’ পর্ব ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে বেশ ক’টি পর্ব ভাগ করে আরও ২৯টি প্রবন্ধ আছে। সেগুলো স্ব-স্বক্ষেত্রে অত্যন্ত মূল্যবান। সেগুলি নিয়ে পরে আলোচনা করা যাবে। তবু শুধু ‘চার্বাক/লোকায়ত’ পর্বটির জন্যেও বইটি সংগ্রহযোগ্য।
নির্বাচিত নিবন্ধ ।। রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য ।। অনুষ্টুপ ।। ৩০০ টাকা
সুকুমার অনুরাগীরা প্রবন্ধগুলি পড়লে উপকৃতই হবেন
মার্কসীয় নন্দনতত্ত্ব কোন মাপকাঠিতে শিল্পসাহিত্যকে বিচার করে
শুধুই প্রকৃতিপ্রেমী নন, বাস্তববাদেরও নিখুঁত শিল্পী বিভূতিভূষণ
ধর্ম কেন নিজেকে ‘বিজ্ঞান’ প্রমাণে মরিয়া
‘গালিলেও-র জীবন’-কে যেভাবে দেখাতে চেয়েছেন বের্টল্ট ব্রেশট্