Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

কবি-কিশোর সুকান্ত: মৃত্যুদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য

এবছর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের (শ্রাবণ ৩০, ১৩৩৩/১৫.০৮.১৯২৬ – বৈশাখ ২৯, ১৩৫৪/ ১৩.০৫.১৯৪৭) জন্মশতবর্ষ পূর্তি এবং মৃত্যুর আশিবছর পূর্ণ হবে। আমরা তাঁকে মূলত কবি বলে জানলেও সাহিত্যের নানা শাখায় অতি অল্প বয়স থেকেই ছিল তাঁর সাহসী ও সার্থক বিচরণ। মাত্র ছ’বছরের সাহিত্যিক জীবন, তার মধ্যে আবার রাজনৈতিক কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে তাঁকে, পরিচালনা করতে হয়েছে ‘স্বাধীনতা’ নামীয় দৈনিক পত্রিকার ‘কিশোর বাহিনী’-র। তবু এর-ই মধ্যে তিনি কবিতা ছাড়াও ছড়া লিখেছেন, গল্প, নাটক, গান, প্রবন্ধ, এমনকি রবীন্দ্র-পরবর্তীতে যে দিকটিতে বিশেষ কেউই হাত-ই দেননি, সেই নৃত্যনাট্য-ও লেখেন দুটি, ‘অভিযান’ এবং ‘সূর্য-প্রণাম’। তাঁর কৈশোরে তিনি যেমন কবিতা পড়েছেন আকাশবাণী কলকাতার ‘গল্পদাদুর আসর’-এ, তেমনই বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী পঙ্কজকুমার মল্লিক তাঁর লেখা গানে সুর দিয়ে বেতারে পরিবেশন করেছেন। পরবর্তীতে তাঁর গানে সুর দিয়েছিলেন সলিল চৌধুরী, গেয়েছেন দেবব্রত বিশ্বাস ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মত শিল্পীরা। ঋত্বিক ঘটক সুকান্তর কবিতার গীতিরূপ তাঁর পরিচালিত ছবি ‘কোমলগান্ধার’-এ ব্যবহার করেছেন। জীবিতকালেই তাঁর কবিতা রুশ, ইংরেজি সহ নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। একটি বারোয়ারি উপন্যাসেও হাত দিয়েছিলেন ‘চতুর্ভুজ’ নাম দিয়ে, বন্ধু অরুণাচল বসু ও অন্যদের সঙ্গে। অসমাপ্ত উপন্যাসটির পাণ্ডুলিপি হারিয়ে গেছে চিরতরে। সংখ্যায় কম, তবু বন্ধু ও অন্যান্যদের যেসব চিঠি লিখেছেন তিনি, সেখানেও রয়েছে তাঁর মনীষা আর সাহিত্যবোধের নিদর্শন। করেছেন অভিনয়। অনুবাদেও যে হাত দিয়েছিলেন, তার প্রমাণ সোভিয়েত শিশুসাহিত্যিক ভি. বিয়াঙ্কি-র (Vitaly Bianki) ‘টেইলস’-এর অনুবাদ। সম্পাদনা করেছেন পঞ্চাশের মন্বন্তর নিয়ে কবিতার। যথার্থ আয়ু পেলে সুকান্ত কোথায় পৌঁছাতে পারতেন!

সুকান্তর যখন বারো বছর বয়স, মা সুনীতিদেবী ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হলেন। বউদির স্নেহচ্ছায়ায় মানুষ। যে একমাত্র ছবি আমরা দেখি সুকান্তের, বউদি টাকা দিয়েছিলেন স্টুডিওতে গিয়ে সেটি তুলে আনতে। বন্ধু অরুণাচল বসুর মা কবি সরলা বসু তাঁকে পুত্রবৎ স্নেহ করতেন। শৈশবেই জন্মস্থান কালীঘাট থেকে বেলেঘাটায় চলে আসেন। ওখানকার দেশবন্ধু বিদ্যালয়ে পড়াকালীন হাতেলেখা ‘সপ্তমিকা’ বের করতেন। বরাবর ভাল ফল করতেন বার্ষিক পরীক্ষায়। তবে ম্যাট্রিক পাশ করতে পারেননি, সম্ভবত অঙ্কে কাঁচা ছিলেন বলে। বাংলার তিন বরেণ্য কবি-ই দশম মান উৎরোননি। আর আজ ম্যাট্রিকে এঁদের তিনজনের লেখা-ই পাঠ্যতালিকায় অপরিহার্য! একটি কৌতূহলী তথ্য হল, রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণে তাঁকে নিয়ে বেতারে স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন কাজী নজরুল এবং সুকান্ত। তাঁদের পরস্পরের সঙ্গে কি আলাপ হয়েছিল?

নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান, মা-বাবার সাত ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয়। দারিদ্র্যের মাত্রাটা কেমন ছিল, তার স্পষ্ট প্রমাণ অরুণাচল বসুকে লেখা তাঁর একটি চিঠিতে, ‘একখানাও জামা নেই… অর্থের অভাবে কেবলই নিরর্থক মনে হচ্ছে জীবনটা।’ বাবা নিবারণচন্দ্র বইয়ের প্রকাশনা চালাতেন, ‘সারস্বত লাইব্রেরি’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তেভাগা, মন্বন্তর, দাঙ্গা আর ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের সময়ের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে তাঁর শৈশব-কৈশোর। অল্প বয়সেই রাজনীতিতে হাতেখড়ি। ১৯৪৪-এ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থী রাজনৈতিক কাজে অহরহ ব্যস্ত হয়ে পড়েন, সেইসঙ্গে চলে লেখালেখি। এগারো বছর বয়সে ‘রাখাল ছেলে’ লেখেন, গীতিনাট্য। দুর্ভিক্ষ নিয়ে সংকলন বের করেছেন যেমন, আবার ‘একসূত্রে’ নামক কবিতা সংকলনে স্থান পাচ্ছেন তিনি। কবিতা বেরোচ্ছে সেকালের প্রতিনিধিস্থানীয় সব কাগজে,– কবিতা, প্রবাসী, পরিচয়, বসুমতী ও অন্যান্য। তাঁকে নিয়ে তাঁর বন্ধু শিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায় পরবর্তীকালে তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার চালু করে তাঁর নামে পুরস্কার। বাংলাদেশেও অনুরূপ পুরস্কার দেওয়া হয়।

এটা বিস্ময়কর অথচ সত্য যে, মাত্র একুশ বছর বয়সের মধ্যে বেশ কিছু স্মরণীয় পঙক্তি বাংলাসাহিত্যে সংযোজন করে গিয়েছেন সুকান্ত। তাই বাংলা কবিতার পাঠকমাত্রই এসব কবিতাংশ কণ্ঠস্থ করে রেখেছে,– ‘পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’, বা ‘দস্যুর ভয়, তারো চেয়ে ভয় কখন সূর্য ওঠে’, অথবা ‘চলে যাব– তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ,/ প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল’। কী নাজুক তাঁর বাংলাদেশ-প্রীতি, যা ধরা পড়েছে তাঁর অবিনাশী চরণে, ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ!’ কী দরদী ভাষায় তিনি লেখেন, ‘এ আকাশ, এ দিগন্ত, স্বপ্নের সবুজ ছোঁয়া মাটি,/ সহস্র বছর ধরে একে আমি জানি পরিপাটি,/ জানি এ আমার দেশ অজস্র ঐতিহ্য দিয়ে ঘেরা,/ এখানে আমার রক্তে বেঁচে আছে পূর্বপুরুষেরা’। তাঁর লেখাতে পাই বাঙালির চিরায়ত বিপ্লবী কণ্ঠস্বর, ‘–বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি, জেনে নিক দুর্বৃত্ত’। তাঁর লেখা ‘রানার’, ‘বোধন’, ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’, ‘একটি মোরগের কাহিনী’, ঠিকানা’, ‘আঠারো বছর বয়স’ (কবিতাটি তিনি ষোলোবছর বয়সে লেখেন) আবহমান কাল ধরে বাঙালির মুখে মুখে ফেরে। অতুলনীয় ছিল তাঁর ছড়ার হাত, ‘বড়োলোকের ঢাক তৈরি গরীব লোকের চামড়ায়’, আর ‘’নাগ যদি ‘নাগা’ হয়, ‘সেন’ হয় ‘সেনা’/ বড়ই কঠিন হবে মেয়েদের চেনা’’,– অনবদ্য! রবীন্দ্রনাথের ‘কণিকা’-ধাঁচের কবিতাও আছে তাঁর, ‘আঁধিয়ারে কেঁদে কয় সলতে,/ ‘চাই নে চাইনে আমি জ্বলতে’।

Advertisement

বাঙালি প্রতিভার অকালপ্রয়াণের তালিকা আরও আছে। ডিরোজিও (০৮.০৪.১৯০৯ – ২৬.১০.১৯৩১, বাইশ বছর), তরু দত্ত (০৪.০৩.১৯৫৬ – ৩৯.০৮.১৯৭৭, একুশ বছর), সোমেন চন্দ (২০.০৫.১৯২০ – ০৮.০৩.১৯৪২, বাইশ বছর), হুমায়ুন কবীর (২৫.১২.১৯৪৮ – ০৬.০৬.১৯৭২, চব্বিশ বছর)। সুকুমার রায় তুলনায় বেশিদিন বেঁচেছেন, ৩৭ বছর। সুকুমার তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আবোলতাবোল’ দেখে যেতেও পারেননি। সুকান্ত-ও পারেননি ‘ছাড়পত্র’ দেখে যেতে। ‘কুসুমিত ইস্পাত’, হুমায়ুনের প্রথম কবিতার বই, ওঁদের-ই মত প্রেসে ছিল। মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন পর তাঁদের বইগুলি বেরোয়। এটা তাঁদের স্বল্পায়ু জীবনের অন্য এক ট্র্যাজেডি। আরও মর্মান্তিক, সোমেন ও হুমায়ুন নিহত হয়েছিলেন, যথাক্রমে ছুরিকাঘাতে ও গুলিবিদ্ধ হয়ে! সোমেনের মৃত্যুতে সুকান্ত কবিতাও লেখেন, ‘ছুরি’।

কীটস, চেস্টারটন, সিলভিয়া প্লাথ, আপলেনিয়ারের মতই স্বল্পায়ু ও চিরজীবী কবিকিশোর সুকান্ত।

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × five =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর চারটি কবিতা

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »