পর্ব ১৩
মিলনে বিরহে
ফেসবুকের কল্যাণে মনে পড়ে গেল যে, তিন বছর এমন এক দিনে আরও সঠিক করে বললে ২০১৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর আমি কাজান থেকে মস্কো ফিরছিলাম। কাজান গেছিলাম একটা সম্মেলনে যোগ দিতে। সেটাই ছিল আমার এখন পর্যন্ত অফলাইনে শেষ সম্মেলন। এর কয়েক মাস পরেই বিশ্ববাসী শুনতে পায় নতুন শব্দ করোনা ভাইরাস বা কোভিড–১৯। সব কাজকর্ম চলে যায় অনলাইনে। এমনকি কনফারেন্সও। স্ট্যাটাসটা দেখেই মনের কোণে ভেসে উঠল বিভিন্ন ছবি। স্বপ্নের ঘোরে ফিরে গেলাম বিভিন্ন সম্মেলনে।
আমার ছোটবেলায় গ্রামে খেলাঘর বা কচিকাঁচার আসর ছিল না, তখন সম্মেলন যে কী সেটা জানতাম না। সে অর্থে সম্মেলনের সঙ্গে প্রথম পরিচয় কলেজজীবনে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য হিসেবে। তখন জেলা সম্মেলন হয়, আমিও জেলা কমিটিতে নির্বাচিত হই। এরপর নিজের গ্রামে খেলাঘর আসর গড়ে তুলি। সেখানেও সম্মেলন করি একজন অর্গানাইজার হিসেবে। খেলাঘর মানিকগঞ্জ জেলা সম্মেলন হয় সে সময়ই। এসব ছিল আনন্দঘন মুহূর্ত, অনেক স্বপ্নের বীজ সেখানেই বপন করা হয়েছিল। এরপর মস্কো চলে এলে প্রতি শীতে আমরা যেতাম ছাত্র সংগঠনের সম্মেলনে— সেও ছিল আনন্দ মেলা। আসলে এসব সম্মেলন ছিল বন্ধুদের দেখা পাবার অন্যতম প্রধান উপায়, বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নে। আমাদের বন্ধুরা সারা সোভিয়েত ইউনিয়নে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। মাঝেমধ্যে চিঠিপত্রে যোগাযোগ হলেও দেখা হত কালেভদ্রে। তাই সবাই সম্মেলনের অপেক্ষা করতাম, এখানে সাংগঠনিক কাজকর্মের বাইরেও সবাই ঝালিয়ে নিত নিজেদের বন্ধুত্ব।
এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্মেলনগুলো কনফারেন্সে রূপ নেয়, যেতে শুরু করি পদার্থবিজ্ঞানের ওপর নানা কনফারেন্সে। ছাত্রজীবনে অবশ্য এসব ছিল আমাদের ইউনিভার্সিটির কনফারেন্সের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কেন বাইরে কোথাও যেতাম না জানি না। হয়তো সেই সময় বাইরে কোথাও যেতে হলে ভিসা লাগত, অথবা আমাদের ডিপার্টমেন্টে প্রতি সোমবার নিজেদের আর শুক্রবার মস্কোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে আসা বিজ্ঞানীদের নিয়ে সেমিনারের আয়োজন করা হত— তাই আমাদের শিক্ষকগণ মনে করতেন না আরও কোথাও নিয়ে যাবার কথা। ১৯৯৪ সালে যখন যখন দুবনা চলে আসি সেখানেই বিভিন্ন কনফারেন্সের আয়োজন হত সারা বছর ব্যাপী। তখনও আমি কোয়ান্টাম মেকানিক্স, রিলেটিভিটি, কসমোলজি, ইলেক্ট্রডাইনামিক্স— বিভিন্ন বিষয়ে নিজেকে খুঁজছি, তাই ছিলাম অজ্ঞাতকুলশীল। এরমধ্যে ১৯৯৭ সালে পুনায় রিলেটিভিটির ওপর আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশ নিয়ে অনেকের সঙ্গে পরিচিত হই। এঁদের অনেকের কাজ আমার জানা ছিল। মনে হয় সেই প্রথম মনে হল এসব কনফারেন্স শুধু গবেষণাই নয় বন্ধুদের সঙ্গে মিলনের কেন্দ্রও। তবে এর আগে সেটা দুবনায় দেখেছি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এদেশ থেকে অনেক বিজ্ঞানী বিভিন্ন দেশে চলে যান। দুবনায় প্রায় সমস্ত কনফারেন্সেই দেখা যেত প্রচুর রুশ ভাষাভাষী বিজ্ঞানী ইউরোপ, আমেরিকা, ইসরাইল ও অন্যান্য দেশ থেকে যোগ দিয়েছেন। ফলে এঁদের জন্য এটা শুধু নিজেদের গবেষণার ফলাফল তুলে ধরাই ছিল না, অনেকের জন্য এটা ছিল দেশে ফেরা, পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা। ফলে এঁরা সবাই অপেক্ষা করতেন এসব কনফারেন্সের জন্য।
এর আগে বিভিন্ন কনফারেন্সে অংশ নিলেও সেসব হত হয় দুবনায়, নয় তো মস্কোয়। তাই এসব ছিল অনেকটা ঘরোয়া ব্যাপার, বাড়ি থেকেই যাতায়াত। সেদিক থেকে দেখলে পুনার কথা বাদ দিলে আমার এ ধরনের প্রথম কনফারেন্স ২০০৭ সালে কাজানের পাশে ইয়ালচিকে। এটা ছিল রাশান গ্র্যাভিটেশনাল সোসাইটি আয়োজিত। এখানে অনেকেই পূর্বপরিচিত। তবে ইয়ালচিকে গিয়ে যেটা ঘটল তা হল জায়গাটা ছিল কাজান থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে এক লেকের ধারে বনের মধ্যে। থাকতাম পাইওনিয়ার ক্যাম্পে। ফলে পাঁচদিন সবাই একসঙ্গে, খাওয়াদাওয়া, বিভিন্ন গবেষণা পেপারের ওপর আলোচনা, রাতে সবাই মিলে আড্ডা। এককথায় পরিবেশ ছিল খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ। ছাত্র, আমাদের মত অপেক্ষাকৃত তরুণ বিশেষজ্ঞ, বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী— সবাই ছিলেন যাত্রী একই তরণীর। সেখানে বিশেষ করে রাতের আড্ডায় বিভিন্ন গল্প হত। আমি বিভিন্ন সময়ে তোলা আমার ছবি দেখাতাম। পুরনো যারা তাঁরা সোভিয়েত আমলে তাঁদের জীবনের গল্প বলতেন। বলতেন বিভিন্ন বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীদের সঙ্গে তাঁদের সময় কাটানোর কথা। ফলে এসব ছিল বিজ্ঞানের ইতিহাস। এককথায় এরপর থেকে অনেকের সঙ্গে এমন একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে যে, সারা বছর অপেক্ষা করতাম সেখানে যেতে। যদিও পরবর্তীতে ইয়ালচিক থেকে কনফারেন্স কাজানে চলে আসে, আগের সেই পরিবেশ আর থাকে না, তারপরেও অনেকের মত আমিও হই রাশান গ্র্যাভিটেশনাল সোসাইটির বিভিন্ন কনফারেন্সের নিয়মিত অংশগ্রহণকারী। সেখানে আমার অবশ্য আরও একটা কারণে বেশ কদর ছিল, আর তা হল ফটোগ্রাফি। সবাই জানত ফটোগ্রাফি আমার হবি, তাই আগেই বলে দিত ওদের জন্য ছবি তুলতে, অনেকেই বিভিন্ন এক্সারশনে গিয়ে আমি কী তুলছি সেটা অনুসরণ করত নিজেদের ছবি তোলার ক্ষেত্রে। তাই সেদিন যখন ফেসবুক কাজান কনফারেন্সের কথা মনে করিয়ে দিল— এসব ঘটনা যেন নতুন করে চোখের সামনে ভেসে উঠল। আশা করি অচিরেই আবার নতুন করে আমরা মিলতে শুরু করব।
আগেই বলেছি প্রথম দিকে এসব ছিল খুব সিরিয়াস ব্যাপারস্যাপার। নামীদামি বিজ্ঞানীদের বক্তৃতা শোনা, নিজের কাজের কথা তাঁদের জানানো। অনেকবার যেতে যেতে এটা একসময় রুটিনে পরিণত হল। কাজের বাইরেও এটা হল বন্ধুদের সঙ্গে, কলিগদের সঙ্গে দেখা করার উপলক্ষ্য। কনফারেন্স হলে যাঁদের সঙ্গে কোন বিষয়ে প্রচণ্ড দ্বিমত, তর্কবিতর্ক— সন্ধ্যায় তাঁদের সঙ্গেই একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে যাওয়া, হৈচৈ করে খাওয়াদাওয়া। অনেক সময় এসব জায়গায় মজার মজার ঘটনা ঘটে। যারা কনফারেন্সে আসেন তাদের অনেকেই আমাদের যাকে বলে দূর থেকে পরিচিত, মানে তাদের কাজকর্মের কথা আমরা জানি। এমন একজন ছিলেন আলেক্সান্দর কামেনশিক। কামেনশিক অর্থ সেই লোক যিনি পাথর ভাঙেন। যাহোক, ২০১৯ সালের সাঙ্কত পিতেরবুরগ সম্মেলনে তাঁকে প্রথম দেখি। ব্যাজ দেখে বুঝতে পারি তিনি কে। খুব ছোটখাটো একজন মানুষ, আমার চেয়েও ছোট। তাই এগিয়ে গিয়ে বললাম, ‘আমার তো ধারণা ছিল তুমি হবে দৈত্যাকায়।’ তিনি তো হেসেই খুন। আবার সেখানেই দেখা দক্ষিণ আফ্রিকার অরুণ বেসামের সঙ্গে। আসলে আমি ভাবিইনি যে তিনি ভারতীয়, এতদিন পড়তাম আরন বেসাম— উনি বললেন অরুণ ভীষ্ম। যাহোক উনি নিরামিষাশী, ডিনারে এসে ভেজ খুঁজছিলেন। তবে রাশিয়ায় এটা পাওয়া বেশ দুষ্কর, বিশেষ করে এসব পাবলিক পার্টিতে। কী করা, ওকে নিয়ে গেলাম ওয়াইনের টেবিলে। বললাম, হান্ড্রেড পারসেন্ট গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি সব ওয়াইন ভেজ।
২০১৯ সালের কাজান কনফারেন্স ছিল একটু অন্য রকমের। শেষ দিন ছিল ভোলগা নদীপথে বুলগার নামে এক অতি প্রাচীন শহর ভ্রমণ। ওখান থেকে ফিরতে ফিরতে বিকেল ছয়টা, দুঘণ্টা পরে আমার ট্রেন। রোম থেকে আসা সালভাতর নদীবন্দর থেকে পায়ে হেঁটে হোটেলে ফেরার প্রস্তাব দিল। রাজি হয়ে গেলাম। তারপর হোটেলের কাছে এসে ও গেল ঘুরতে। ওর প্লেন পরের দিন ৩ সেপ্টেম্বর। আমি হোটেলে ফিরলাম লাগেজ নিতে। দেখি আলিওশা বসে আছে।
—চল খেতে যাই।
—পারছি না রে, একটু পরে আমার ট্রেন।
ওর কাছ থেকে বিদায় নিলাম, ইগর ট্যাক্সি ডেকে দিল। থাকে মস্কো। দেখা হবে বললেও জানি দেখা হবে আবার কোন কনফারেন্সে, সম্মেলনে। এর মাঝে দেখা হবে কোনও পত্রিকার পাতায় যখন আমি নিজে বা ওদের কেউ কোনও পেপার পাবলিশ করবে।
ট্রেনে উঠে দেখি আমার কামরায় এক মেয়ে বসে চেষ্টা করছে বিশাল একটা ব্যাগ সিটের নীচে ঢোকাতে। আমাকে দেখে অবাক হয়ে বলল
—আমি ভেবেছিলাম এটা মহিলাদের কামরা।
—কী আর করা। যাকগে, তোমার ভয়ের কোনও কারণ নেই।
—আচ্ছা।
ওকে সাহায্য করলাম ব্যাগটা রাখতে। দরকারি জিনিসপত্র বের করে নিজের ব্যাগ দুটো সিটের নীচে ঢুকিয়ে সেটা নামিয়ে দিলাম। ট্রেন ছাড়তে আরও মিনিট দশেক, দুটো সিট এখনও ফাঁকা। কে জানে আসবে কি না? প্রায় ১১ ঘণ্টার জার্নি। এসব জার্নিতে কামরার লোকদের সঙ্গে একদিকে যেমন বলার মত কথা তেমন থাকে না, অন্য দিকে কথা না বলাটাও কেমন যেন অস্বস্তিকর মনে হয় কখনও কখনও। সোভিয়েত আমলে লোকজন ট্রেনে উঠেই খাবারের আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়ত, আমন্ত্রণ জানাত খেতে। নিজে যখন অজুহাত খুঁজছি কথা শুরু করার, ও নিজেই জিজ্ঞেস করল:
—কী নাম তোমার?
—বিজন। তোমার?
—জুলফিয়া।
—আমাদের দেশেও এরকম নাম আছে।
—তোমার নামের অর্থ কী?
—জনহীন। (আমি সব সময়ই একটু অস্বস্তি বোধ করি এর উত্তর দিতে। কেননা এটা নাম হলেও বিশেষণ। অনেক সময় কারণ বলতে হয়, কেন এই নাম)
এরপর ও উপরে উঠে গেল। আমাদের দুজনের সিট ছিল উপরে।
—তুমি যদি মাইন্ড না করো, আমি কাপড়টা চেঞ্জ করে নিচ্ছি।
—ঠিক আছে।
আমি জামাকাপড় চেঞ্জ করে নিলে ও নিজেও চেঞ্জ করতে চাইল। আমি বাইরে গিয়ে দাঁড়ালাম। ট্রেন অলরেডি চলতে শুরু করেছে, নীচের দুটো সিটে কেউ যাচ্ছে না। একবার ভাবলাম নীচের সিটে চলে আসি। আবার মনে হল যদি ঝামেলা করে, নীচের সিটের ভাড়া বেশি। নিরাপত্তা ভাড়া (আমার তাই মনে হয়, ওখান থেকে পড়ে বড়জোর একটু আঁচড় লাগবে)। আমি অবশ্য উপরের সিটের ভাড়া বেশি নিতাম বাড়তি ভয় আর উত্তেজনার জন্য। তবে রেল কোম্পানি আমাকে জিজ্ঞেস করে না বলে আইডিয়াটা পাস করা হয়নি।
—আমি চা আনতে যাচ্ছি। তোমার জন্য আনব? আমার কাছে বিস্কুট আর চকোলেট আছে।
—না না। আমি কিছুক্ষণ আগেই খেয়েছি।
—ওকে। তবে সবকিছু এখানে রইল। তুমি চাইলেই নিয়ে খেতে পারো।
আমি গেলাম গরমজল এনে নিজের জন্য চা করলাম। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম:
—তুমি মস্কো যাচ্ছ?
—হ্যাঁ।
—কাজান থেকে?
—না, আমার বাড়ি ছোট এক শহরে। এখান থেকে চার ঘণ্টার পথ। বাসকিরিয়ার পাশে।
—আচ্ছা। আমি আজ দুপুরে বুলগার গেছিলাম এস্কারশনে। ওখান থেকে তোমার শহর নিশ্চয়ই কাছে?
—হ্যাঁ। বুলগার একসময় বিশাল রাজ্য ছিল। পরে রাশানদের হাতে ধ্বংস হয়ে যায়।
—তুমি মনে হয় ঠিক বলছ না। রাশানরা এ দিকে আসে ষোড়শ শতাব্দীতে ইভান দ্য টেরিবলের সময়। বুলগার যখন শক্তিশালী রাজ্য ছিল তখন খাজার, মোঙ্গল এরা ছিল ওদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। রাশানরা তখন ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত ছিল।
—সেটা ঠিক, তবে রাশিয়ার শুরুও কিন্তু ইভান দ্য টেরিবল দিয়ে হয়নি।
—হ্যাঁ। ৯৮৮ সালে ভ্লাদিমির খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। রিউরিক এর আগে এদেশে আসেন।
—আসলে মোঙ্গলরা যখন আসে রাশিয়ান রাজন্যবর্গ তাঁদের সঙ্গে সন্ধি করে, বুলগাররা সেটা করেনি। তাই মোঙ্গলরা ওদের রাজ্য ধ্বংস করে। যারা বেঁচে ছিল তারা কাজান চলে যায়, অন্যেরা বুলগেরিয়া।
—আজকে গাইড সেটাই বলল।
—তুমি এদেশে পড়াশুনা করেছ?
—হ্যাঁ, রুদেএনে মানে গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে।
—আমিও সেখানেই ভর্তি হয়েছিলাম, পরে মস্কো স্টেটে চলে গেছি।
—আচ্ছা। আমি রুদেএনে ফিজিক্সে পড়েছি, এখন পড়াই। তবে কাজ করি দুবনায়। তোমার সাবজেক্ট কী?
—জার্নালিজম। আচ্ছা, আমি একটা লেকচার শুনব এখন ইউটিউবে। শুভ রাত্রি!
—শুভ রাত্রি!
আমার অনেক দেরিতে ঘুমানোর অভ্যেস। মাঝরাতে ঘুম ভাঙল। উঠে বই পড়তে পড়তে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। এক সময় জানানো হল এক ঘণ্টা পরে আমরা মস্কো পৌঁছব। আমি উঠে হাতমুখ ধুয়ে চা খেলাম, বাসায় জানালাম আমার মস্কো ফেরার কথা। জামাকাপড় বদলিয়ে জুলফিয়াকে ডাকলাম:
—সুপ্রভাত। আমরা পৌঁছে গেছি প্রায়।
—সুপ্রভাত। তুমি অন্য সিটটাতে বসবে? আমি পোশাক বদলে নিই।
—অবশ্যই। চা খাবে?
—না।
—তুমি এখন হোস্টেলে যাবে?
—হ্যাঁ!
—দাস? (এটা মস্কো স্টেটের একটা হোস্টেলের নাম)
—তুমি জানলে কোত্থেকে?
—আমার দেশিদের অনেকে সেখানে থাকত। (এ সময় আমার মনীন্দ্র বর্মণের কথা মনে পড়ল। আমি ছাত্রজীবনে ওর ওখানে যেতাম কখনও কখনও)। তাছাড়া কিছুদিন আগেও আমাদের বাসা ছিল ও এলাকায়। আমি রেগুলার বাজার করতাম রিও আর আশানে।
—তাই বলো।
এর মধ্যে ট্রেন থামল।
—তোমাকে হেল্প করতে হবে?
—যদি একটু ব্যাগটা বের করতে সাহায্য করো।
—ঠিক আছে। তুমি আমার ব্যাগটা নাও। আমি ওটা নিচ্ছি।
বিশাল ব্যাগ। যেমন সাইজ তেমন ওজন। কিছুই করার নেই। কোনও মতে টেনে বের করলাম। বুঝলাম মেট্রো পর্যন্ত নিতে হবে।
—আমি ট্যাক্সি ডেকেছি। অনেক ধন্যবাদ। অনেক শুভকামনা।
—তোমার জন্যও শুভকামনা!
আমি চলে গেলাম বাসায়। সেভা মেট্রো স্টেশনে এল আমাকে নিতে। বাসায় জিনিসপত্র রেখে স্নান করে চা খেয়ে চলে গেলাম ইউনিভার্সিটি। ক্লাস নিতে। সারাদিন কাজের ব্যস্ততা। ছাত্ররা এল। দীর্ঘ ছুটি শেষে আবার নতুন করে জীবনের শুরু। দীর্ঘ শীতের পরে বসন্তে যেমন গাছপালা জেগে ওঠে, গ্রীষ্মের ছুটির পর সেপ্টেম্বরে ক্লাসরুমগুলোও তেমনি প্রাণ ফিরে পায়। আজ ক্লাস তেমন ছিল না, তবুও প্রায় ছয়টা পর্যন্ত কাটালাম ছাত্রদের আর ইউরি পেত্রভিচের সঙ্গে গল্প করে। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে রান্না করলাম। মনিকা, ক্রিস্টিনা, সেভা— সবাই বাসায়। ওদের খাইয়ে, নিজে খেলাম। ক্রিস্টিনা চলে গেল বান্ধবীর কাছে। সে সন্তানসম্ভবা। ওর বন্ধু নিজের শহরে গেছে দিদিমার মৃত্যুর খবর পেয়ে। ক্রিস্টিনা যাচ্ছে বান্ধবীর মনে সাহস যোগাতে।
—কোনও সমস্যা হলে লিখিস বা ফোন করিস।
দুবনার বাস রাত ১১টা। সেভা আর মনিকার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চললাম দুবনার পথে। বাসে বসে ফেসবুকে আবার কিছু লেখা, কিছু স্ট্যাটাস পড়লাম। মনে হল জুলফিয়ার কথা। দুদিন আগে ওকে চিনতাম না, আর কোনও দিন হয়তো দেখা হবে না। কিন্তু কী অবলীলায় আমরা গল্প করে সময় কাটালাম। আবার অনেক দিনের চেনা বন্ধুর মত বিদায় নিলাম। ফেসবুকে অনেকের সঙ্গে আলাপ। অনেককে ব্যক্তিগতভাবে চিনি। কারও কারও সঙ্গে দিনের পর দিন গল্প করে কাটিয়েছি। এমন হয়েছে কেউ আমাকে প্রশ্ন করলে ওরা আমার আগেই উত্তর দিয়ে দিয়েছে। এতটাই ছিল আমাদের বন্ধুত্ব, মনের যোগাযোগ। নিজেকে প্রশ্ন করলাম যদি এখন এমন হত যে হঠাৎ আমাদের একই কামরায় একসঙ্গে কোথাও যেতে হচ্ছে যেমনটা জুলফিয়ার সঙ্গে, আমি কি এত সরল মনে যেতে পারতাম? আমি সিওর নই। কারণ এখন আমি জানি না ঠিক কীভাবে এদের সঙ্গে চলব, বলব। আগে যাদের একবেলা না দেখলে পেটের ভাত হজম হত না আজ তাদের অনেকেরই খবর জানি না। অনেক আগে, যখন ‘নাই টেলিফোন, নাইরে পিওন, নাইরে টেলিগ্রাম/ বন্ধুর কাছে মনের খবর কেমনে পাঠাইতাম’-এর যুগ ছিল, তখন যোগাযোগ না হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এখন যখন ইন্টারনেট, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের যুগ— তখন যোগাযোগ না থাকা বা না রাখাটাই অস্বাভাবিক মনে হয়। তারপরেও কত লোকের সঙ্গে কত যুগ যে দেখা হয় না, কথা হয় না, চিরকুট লেখা হয় না। আসলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রায়োরিটি বদলায়, বদলায় দৃষ্টিভঙ্গি। একসময়ের কমরেডরা হয় চরম শত্রু। আসলে যখন পৃথিবীটা ছোট ছিল, পরিচিতের গণ্ডি ছোট ছিল আর সবাই কমবেশি একই দেশে বাস করত— তখন অনেক কিছুই সহজ ছিল। আজ আমরা যখন সারা বিশ্বে ছড়িয়েছিটিয়ে, দেশ আমাদের ভিন্ন, ফলে ভিন্ন ন্যায়-অন্যায়ের সংজ্ঞা, ভিন্ন দেশপ্রেম— তখন সেই অতীতকে ধরে রাখা, ফেলে আসা অতীতের জন্য নস্টালজিক হওয়া যুক্তিবাদী মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। তাছাড়া অধিকাংশ মানুষ এখন যুক্তি বা ভক্তির ঊর্ধ্বে— আজ সবাই প্র্যাগমেটিক। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরানো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলে ঠিক কীভাবে যে তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে সেটাই বুঝে ওঠা যায় না। যদি আগের মত আবেগ আর উচ্ছ্বাস নিয়ে কথা বলি, হয়তো এটাকে এরা হ্যারাসমেন্ট বলে অভিযোগ করবে আবার কিছু না বললে বা দায়সারা গোছের কিছু বললে বলবে তাদের আমি অবজ্ঞা করলাম। মনে পড়ল আলুর কথা। আলু আইভরি কোস্টের ছেলে। আমার কয়েক বছরের জুনিয়র। একই হোস্টেলে থাকতাম। একই ফ্লোরে। বিকেলে কিচেনে দেখা হত কখনও কখনও। একবার আমার প্রচণ্ড সর্দি। রান্নার ফাঁকে ফাঁকে নাক ঝাড়তে ওয়াশরুমে যাচ্ছি। হঠাৎ ও বলে উঠল:
—আমি কালো বলে তুমি আমাকে অবজ্ঞা করছ, নাক ঝাড়ছ, থু থু ফেলছ।
আমি যত বলি আমার শরীর খারাপ, ও তত বেশি অবিশ্বাস করে।
মা বলতেন ব্রাহ্মণের আগে হাঁটলেও দোষ, পিছে হাঁটলেও দোষ। ব্রাহ্মণে ভরে যাচ্ছে পৃথিবী।
আজ এতদিন পরে যখন তিন বছর আগের সেই সব দিনের কথা মনে হল অবাক হয়ে খেয়াল করলাম জুলফিয়ার মুখটা একেবারেই হারিয়ে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারলাম না। যদি হঠাৎ কোথাও দেখা হয়েও যায় তবুও ওকে চিনতে পারব না। তারপরেও আমাদের সেই ক্ষণিকের পরিচয় এই লেখার, যার জুলফিয়া অংশটা সেই তিন বছর আগে লিখে রেখেছিলাম; মধ্য দিয়ে থেকে যাবে জীবনের এক অংশ হয়ে। আসলে আমাদের জীবন নিরবচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি যার কিছু কথা আমাদের স্মৃতিতে জাগ্রত থাকে আর অনেক কিছুই হারিয়ে যায় যদিও উপযুক্ত পরিবেশে ঠিক উঁকি দিতে পারে মনের কোণে।
দুবনা, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২২
কভার: ইয়ালচিকে সূর্যোদয়/ চিত্র: লেখক
রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ১
রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ২
রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ৩
রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ৪
রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ৫
রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ৬
রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ৭
রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ৮
রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ৯
রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ১০
রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ১১
রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ১২
রাশিয়ার চিরকুট পর্ব ১৪