Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

কচুরি

হুগলি তীরবর্তী ৭২৮ স্কোয়ার কিলোমিটারের এই কলকাতার এক অদ্ভুত জীব কচুরি। রাত বারোটায় সব আলো নিভে যাওয়ার পরও গলির কোণে কাচের বাক্সে দু-চার পিস দোমরানো কচুরি কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমোয়। ফরসা ঝকমকে দেওয়াল, বেগবান আলোক দ্যুতির ধারেকাছে কচুরির বসবাস নেই। ঠান্ডাঘরে অ্যাসিডখোর বেওয়ারিস বডির মত কে জানে কতদিন পড়ে থেকে, কোন এক বাসন্তী সন্ধ্যায় ফিনফিনে কাগুজে ওড়নায় সেজে গতি হওয়া মাল হল গরম কুকুর, প্যাটিস, পিজা।

জাতিধর্ম নির্বিশেষে কলকাতায় কচুরি চলে। দুমিনিটে অর্ডার সাপ্লাই তিন মিনিটে মাল উধাও। এ দেশে কচুরি-কর্মীর পায়ের কাছে ম্যাকডোনাল্ডস কোম্পানির বড়কর্তার শুয়ে থাকা উচিত।

উনুনের আঁচে ধোঁয়ায় ধোঁয়াময়, কুয়াশা ঘেরা ঝাপসা, দ্বীপের মত ভাসমান সব কচুরির দোকান। টানা রিকশার ঘণ্টি, বনেদি বাড়ির আঙুরলতা গ্রিলের বারান্দায় মোটা থামের পাশে অন্ধকার। কিছু থাকে না তার অঙ্গসজ্জায়। কিছুই না। বিবর্ণ ঘুপচি, স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার, পেরেকওলা কেঠো বেঞ্চ, সামান্য উঁচু তক্তায় ময়দার বস্তা, ঢাউস ডেকচি, মধ্যে একটি মোটা ঘোর কৃষ্ণবর্ণ লোক পুকুরে ছিপ ফেলার ভঙ্গিতে যমরাজের শাস্তিদানের কড়াইতে স্থিরনিষ্ঠ প্রজ্ঞাবান শিল্পীর মত রাশি কচুরি ভেজে তুলছেন। তার বিরাট ভুঁড়িটি জ্যালজেলে সুতির ফঙ্গবেনে গামছায় নির্ভর করে ঝুলছে। শুধু গিঁটমারা ওইটুকু বস্ত্র কী করে তার সব কিছু ধরে রেখেছে সে রহস্য কেউ ফাঁস করেনি। তাদের মাথার পেছনে তাম্র যুগের গভীর কালিমালিপ্ত দেওয়ালে তেলকিটকিটে গেঞ্জি, লুঙ্গি, জাঙিয়া, গামছা, হাফ প্যান্ট ঝুলছে। বিশাল ডেকচিতে পাহাড়প্রমাণ ময়দা মাখছে সাকরেদ নেচে নেচে। এ দৃশ্য পৃথিবীর কোনও খাবারের দোকানে দেখা যাবে না।

সেই দশ ফুট পরিসরের আশেপাশে টিকিধারী বিহারি ছাতুওলা, লম্বা জুলপি চোমরানো গোঁপ সিরাজদৌল্লা, ফেরতা দিয়ে আঁচড়ানো চুল সুরমা চোখে নাদির শা, ঝালর ঘাগরা ঘসেটি বেগম, ঝুল গোঁপ রুখু থুতনি চেঙ্গিস খাঁ-কেও দেখা যাবে, নালার ধারে হাবসে পড়ে শালপাতার কোণ চাটছে।

ন্যাংটো বাল্বের নিচে দেয়ালা করছে বালখিল্য কচুরি। ঝটকা গরম জিনিস, পাশেই cool বেবি, চিল বেবি হট ডগ লোফার-লাফাংগাদের গা বাঁচিয়ে আকাশ দেখছে। এদিকে দিল ধড়কাচ্ছে পাড়ার নন্টে। উলটো দিকে পিংকির বারান্দা, নান্টু চায়ে বিস্কুট ভেবে কচুরি চোবাচ্ছে। সমবেত সিটির মাঝে কারিগরদা চ্যাঙারি নাচিয়ে বহুকেলে গুন্ডি পান খাওয়া দাঁত মেলে বলল, ‘কালীবাড়িতে ডালার দোকান, বাপের বহুত পয়সা। প্যাঁড়া-কচুরি কম্বিনেশানেই তো রামকৃষ্ণের মহাতীর্থ চলছে।’ লাড্ডু-কচৌরি তো তীর্থক্ষেত্রের ট্রেডমার্ক।

পুলিশ শালবনির জঙ্গলে মাওবাদী পাকড়াতে গেছে, চোগা প্যান্ট, টাইট বেল্ট, ভারভরন্ত মাখন গালে ঘাম, নিজেকে উন্মোচন করে দেওয়ার অমানুষিক পরিশ্রমের ওপর নো কম্প্রমাইস ট্যাগ দেগে, সিরিয়াস মুখে ফিল্ডিং সাজাচ্ছে। মন্ত্রীদের ঘন ঘন ফোন, অ্যাকশন বলার জন্য হাঁ করেছেন এমন সময় হুমদো কনস্টেবল এসে বলল, ‘স্যার ওদিকে কচুরি ভাজছে।’

টেনশন তো ছিলই, টেনশন তো থাকেই, তা বলে কি ডিজায়ার নেই! আত্মঘাতী বোমাবাজ ধরতে কনফিডেন্স লাগে মিডিওকার পৃথিবী যতই তড়পাক। ভেতরে কি কম বিষ। সর্বপাপতাপহারী ইমেজ থাক পড়ে, ধরা যাক দু-একটা কচুরি এবার! ব্যাস, কলকলনাদে বড়বাবুর পেছনে বাহিনী ছুটল কচুরি খেতে। মাওবাদী কি ছেলের হাতের মোয়া, পরে ধরলেও হবে।

আর কালো নাদা পেট গভীর নাইকুণ্ডলী কচুরি ভাজিয়েদের কখনও নাম থাকে না। তারা হল কারিগরদা, কারিগর কাকা। বংশ পরম্পরায় তাদের গায়ে ছোলার ডালের গন্ধ। ডালের কোয়ালিটির ওপর তাদের পাত্রী ঠিক হয়। পাত্রীপক্ষ শুঁকে বলে, নাঃ হে মজফ্ফরপুরেরটা আরও ফাইন ছিল, পাক্কা নারকেলের গুণ। এ মাঝখানে নিশ্চয়ই পাইস হোটেলে ছিল, ডিমের ডালনার সেন্ট ছাড়ছে। সকাল থেকে তিন বান্ডিল লাল সুতোর বিড়ি টেনে, বিকেল বেলায় চাড্ডি আলো চালের ভাত খায়। যতই বলো, ও শরবতে বিষ নাই! তবু তারা প্রগৈতিহাসিক কড়া থেকে মাল ছেঁকে তুলে, তেল চোবরানো ঝুড়িতে ঢেলে মুচকি হেসে পাশ কাটিয়ে যান। কচুরি ভাজাইয়েরা কচুরি খায় না।

টিনের ত্যাড়াব্যাঁকা একচিলতে বোর্ডে রামকৃষ্ণ, নেতাজি, সাঁইবাবা সবাই বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন। রামকৃষ্ণ থেকে মান্না দে কে কচুরি খাননি এ ভূমে। তবে আটা বাঙালির ধাতে ছিল না। জেনুইন বাঙালিকে আটা ধরাতে গিয়ে ফেল মেরেছে মোগল, পাঠান, ওলন্দাজ, পর্তুগিজ।
আটাও আর্ট আছে। ময়দার সঙ্গে তেল মেশানোয় মিহি আঙুলের খেলা চাই, নইলে ফুলবে না। রাধাবল্লবীর কান ধরে টানলে ডালের পুর সরসর করে গড়িয়ে আসবে, কচুরির বেলায় উল্টো। হেডলাইট কাটা দুশো চৌত্রিশ বাসের মত গাঁ গাঁ করে ফুলবে, ফুলেই থাকবে স্পিড নেবে না। অর্থাৎ পুর ভেতরে ময়দার ছাদ ধরে থাকবে। তবেই না কচুরি।

রাত গড়ালে একচিলতে মেঝেতে তেলচিটে মশারি পড়বে, রাস্তায় ক্লান্ত বাতিদান। কারিগরদারা হাতপাখা নাড়বে। স্টারডম নেই, অ্যানিগমা নেই, ম্যাজিক প্রেজেন্স নেই, তো কী? কচুরি এক অনন্ত পারাবার বাঙালির।

চিত্র: গুগল

সাধু

Advertisement

কারখানা বিরিয়ানি

লিটল বুদ্ধ

বাংলা আওয়াজ

শেরপা

সবুজ মিডাসের ছোঁয়া

ঘুষ

জুতো

মাদারি কা খেল

সিঁড়ি

ইসবগুল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three + twelve =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »
সালমিন রহমান

বেলুচিস্তান সংকট মোকাবিলা কতটা সহজ

বেলুচিস্তানের সংকটকে কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদ কিংবা কেবল নিরাপত্তা সমস্যার দৃষ্টিতে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি বোঝা যায় না। এখানে ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, প্রাকৃতিক সম্পদ, উন্নয়ন বৈষম্য, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা— সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্বাধীন বেলুচিস্তান গঠিত হলে বহু মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে পারে। একই সঙ্গে একটি নতুন রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াবে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা। অন্যদিকে, পাকিস্তান, চীন, ভারত এবং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও দুই বিখ্যাত বাঙালি

কী অসাধারণ শিক্ষাই না আমরা পেতে পারি, উৎসাহিত হয়ে পারি খেলোয়াড়দের থেকে! একটি উদাহরণ: প্রথম বিশ্বকাপে সোনাজয়ী উরুগুয়ে দলে ছিলেন হেক্টর কাস্ত্রো। তেরো বছর বয়সে মেশিনে তাঁর ডানহাত কাটা পড়েছিল। অদম্য উৎসাহে তিনি ফুটবল খেলেছেন, জাতীয় দলে স্থান করে নিয়েছেন, আর ফাইনালে জয়সূচক গোলটিও তাঁর-ই করা! তাঁর স্বদেশবাসী তাঁকে ডাকতেন— ‘এল ডিভিনো মানকো’, অর্থাৎ একহাত-বিশিষ্ট ঈশ্বর।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আমেরিকার স্বাধীনতা: আড়াইশো বছর

১৬০৭ থেকে ১৭৮৩ পর্যন্ত সময়কাল আমেরিকায় ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক রাজত্ব। আজকের দিনে যে আমেরিকা, তা কিন্তু পুরোটা ব্রিটিশদের দখলে ছিল না। ছিল ভার্জিনিয়া, ম্যাসাচুসেটস, নিউ ইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া-সহ ১৩টি রাজ্য। আর কানাডার বেশ কিছু অঞ্চল। আমেরিকার অন্যান্য স্থানে ফরাসি, ডাচ, নরওয়েজিয়, সুইডিস উপনিবেশ-ও ছিল। তাছাড়া রাশিয়া আমেরিকার আলাস্কা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত দখল করে। পরে সে আলাস্কা আমেরিকার কাছে বিক্রিও করে দেয়।

Read More »