Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ঘুষ

ঠিক ঘাড়ের ওপরেই ওলকপির মত মাথা। দুটো খাটো হাত, ঝুলছে দুপাশে যেন ওলকপি থেকে গ্যাঁজ বেরিয়েছে। বুকের পর থেকে ঢাউস জালা। নিজস্ব অফিস ঘরে জোরালো আলোর তলায় ইনি খেতের কপির মতই তাজা জলঝরানো পাতার মাঝে ঘাপটি মেরে বসে আছেন।

স্যার পটলা এয়েচে।

এনেছে?

দুটো রুপোর বালা, একটা রুপোর ঝিনুক বাটি, একটা ভাঙা সাইকেল এনেছে।

রুপো?

বাষট্টি হাজার ছয়শো পঞ্চাশ করে যাচ্ছে।

ভরি?

না না কেজি।

দুস! হাটাও। বলাই তো আছে ক্যাশ, নয় গোল্ড।

গত মাসে দশ দিয়েছে। স্যার একটা চেন এনেছে। তবে সিটি গোন্ড কিনা কে জানে। কীরম কালচে মারা। গ্লেজিং নেই।

ওটা কেষ্টকে পাঠাও, ঘষে দেখুক আগে। হ্যাঁ সাইকেলটা ‘সবুজ সাথী’-র কিনা দেখে নিয়ো। পেছনে গুদামে রেখে দাও, বিশুকে দিয়ে দিও পট্টিতে ঝেড়ে দেব। যা আসে।

দাদার চেলা স্যাঁকরা দোকানে দৌড়োয়। আর দাদা ছোটে কানেকশন ঝালাতে। তিনজন রোগা, সুদূর গ্রাম থেকে ম্যাটাডর ভাড়া করে আসা চাকরিপ্রার্থী চোখে ভয়, সমীহ, লোভ নিয়ে জুলজুল করে তাকিয়ে দেখে কিছু বাড়তি পেশি, ক’খানা বেশি হাত, দাপট আর বিকারওলা অশ্বমেধের ঘোড়াকে।

ঝকঝকে অফিস। দামি টাইলস, উডেন ওয়াল পেপার। ফ্রিজ, ছাপ্পান্ন ইঞ্চি টিভি, জলকল, মৌজমস্তি, লাইটিং-ফাইটিং সব আছে। এখানে প্রাইমারি এবং এসএসসি-তে পরীক্ষা না বসে চাকরি পাওয়া যায়। ক্যাশ, ইনস্টলমেন্ট, গোল্ড, ব্যাঙ্ক সার্টিফিকেট, সব চলে। কেউ জানে না কীসের অফিস। কেবল বিভিন্ন মাপের, ওজনের, তরুণ-তরুণীরা আসাযাওয়া করে।

এরা সব এক একটা ক্ষিদ্দা। অফিস খুলে বসেন। লাইভ সেভিংয়ের কাজ করেন। উত্তাল বিক্ষুদ্ধ সমুদ্রে ফেলমারা ফুটো নৌকো নিয়ে, হাবসি কাটছ? পরীক্ষা দেবার দম নেই, পরিশ্রমে আতঙ্ক, তাপ্পিমারা রেজাল্ট? লাইফ বোট এগিয়ে যাবে। লাইফ বোট, লাইফ সেভিংয়ের ব্যবসা।

প্রশিক্ষণ লাগে ভাই! এমনি এমনি হয় না। মন্ত্রীর তলায় টানা ১ ঘণ্টা নাক টিপে থাকা, মন্ত্রীর কাটা তেলে ২৫ মিটার সাঁতরানোর ক্ষমতা। ২২ সেকেন্ডের মধ্যে জামা জুতো খুলে মন্ত্রীর ভুঁড়ির ওপর ঝাঁপানো, এসএসকেএম-এ চিকেন স্টু পাঠানো, আর ভোটের সময় নব্বই পার্সেন্ট করে আসা।

অসভ্য লোকেরা একে বলে ঘুষ, তেল। ছোটবেলায় এক নেড়ি পুষেছিলাম। নর্দমার ধারে বসে গায়ে পোকা নিয়ে কাঁদছিল। খাইয়ে নাইয়ে তাকে তাগড়াই করলাম, সে পাড়ার মোড়ল হয়ে উঠল। আমার সঙ্গে তার গভীর ভালবাসার সম্পর্ক। সে হ্যাংলা, খাদ্যবস্তুর প্রতি অসীম মোহ, কিন্তু বারণ করলে শোনে। পাশের বাড়ির এ সখ্যতা সহ্য হল না। রোজই ঢ্যাঁড়শের তরকারি, কুমড়ো ছক্কা নিয়ে ডাকাডাকি। ভুলো ফিরেও তাকায় না। আমি সংযম শিক্ষা দিয়েছি। একদিন তারা পাঁঠার মাংস নিয়ে ডাকল। ভুলো ল্যাং ল্যাং করে চলে গেল। আমি গলা ফাটিয়ে ডাকলেও ফিরে এল না। খানিক পরে হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরল বটে। ওদের বাড়ি ঘন ঘন তাকানো, গেটে গিয়ে দাঁড়ানো, ওদের দেখে ল্যাজ নাড়া, এরপর সবই হতে লাগল। ভুলো সেদিন ঘুষ খেয়েছিল। সে তো আর মহাপ্রস্থানপথের ভগবানরূপী সারমেয় নয়। নিতান্তই নেড়ি, ক্ষুদ্রাত্মা। তাহলে যে কুমড়োয় সৎ, সে মাংসে নয়। বড় জটিল। পাঁচ টাকা নিই না। পাঁচ লাখ নি। অবশ্যই আমি সৎ। কুমড়োর ঘ্যাঁটের সৎ।

আইনকানুন শাসনকে টান টান করে রাখলে, তার ওপর যা পড়বে, তা টাং করে সটান লাফিয়ে উঠবে। কিছুটা চলকে পড়বে। সুতরাং পর্দাটা একটু শিথিল করো। ঠাসবুনোট একটু ফাঁক করো। মাঝখান দিয়ে বেঁচে বেরিয়ে যাই। ঘুষ হল ঘুষঘুষে জ্বরের মত। প্রবল প্রতাপ, কিন্তু ঢাকা, নাড়িতে ধুক ধুক করে, উত্তাপ টের পাবে না। তেলের অনেক নাম, দালালি, তোলা, নজরানা, চমকানো, দান, পাবলিকের তেল চাই। লাগাও সাইকেল শ্রী, লাগাও মাটির ভাণ্ডশ্রী, লাগাও লঙ্গরখানা! ঠুসে তিনদিন খিচুড়ি খাইয়ে দাও। বিদ্যা, বুদ্ধি, অর্থ, কৌশল, শক্তি সব আছে তেল নাই!?

কিস্যু হবে না। বসকে তেল না দিয়ে শুকনো কৌশল করুন দেখি, হাড় গরম হয়ে যাবে। ঘুষ আর তেল একই মুদ্রার দু’পিঠ। সংস্কৃত কবিরা ঠিকই বুঝেছিলেন, তেলের ওপর নাম স্নেহ। আমি তোমায় স্নেহ করি তুমি আমায় স্নেহ করো, অর্থাৎ আমরা পরস্পরকে তেল দি। তেলের মত ঠান্ডা আর কীসে করতে পারে।

নাইজেরিয়ার এক গল্প। এক পুলিশের খুব খিদে পেয়েছিল। রাস্তায় টহল মারতে মারতে যাচ্ছিল। এক জায়গায় একটা লোক মুরগির ছাল ছাড়িয়ে রোস্ট করার বন্দোবস্ত করছিল। পুলিশের গন্ধে জিভে জল এসে গেল। লোকটা সহজভাবে জিগেস করল, ‘স্যার খিদে পেয়েছে?’

‘না তো। মুরগিটা প্রকাশ্যে ন্যাংটো হয়েছে তাই বাজেয়াপ্ত করলাম। তুমি কেটে পড়ো।’

কোন লজ্জায় স্বীকার করা যায় খিদে পেয়েছে। তাই এই চালবাজিটা করে পেটও ভরল, আইন কপচানোও গেল। সামনে একটা সততার মুখ রেখে দেওয়া গেছে। ব্যক্তিগত লাভের কারণে তো কেউ ঘুষ নেয়নি। খিদে তো পায়নি, মুরগি ন্যাংটো হয়েছে তাই খেতে হচ্ছে। ফেরেব্বাজিটা শিখতে হবে। এটাই প্রশিক্ষণ। এতেই বাজার চলছে। আকণ্ঠ খেতে শিখতে হবে। পেট ভরে যাবার পর, খাদ্যের প্রয়োজন ফুরনোর পরও লিভার, ফুসফুস, হৃদপিণ্ড, কণ্ঠনালী, অতিক্রম করে মস্তিষ্ক পর্যন্ত ঠাসাঠাসি খাবার। মস্তিষ্কের পরও কোন অলীক শূন্য পর্যন্ত ঠুসে দিতে পারলে ভাল হয়। চালবিক্রেতা, চাঅলা, পঞ্চায়েত অফিসের কেরানির তেমহলা বাড়ি। ও কিছু না, একটু একটু করে শ্রমঘাম পায়ে ফেলে করা। সত্যি শ্রমঘাম অনন্ত স্তদ্ধ খররৌদ্র আকাশের তলায়, ময়দানে, বাসে, খেলার মাঠে ঘুগনির হাঁড়িতে, লেবুজলের টিনের কৌটোয়, টিউশন-ফেরত ক্লান্ত মেয়ের চোখে, কারখানা-ফেরত বাবার ঝোলা ব্যাগে মেয়ের জন্য আনা রুল টানা খাতায় বয়ে যায়।

মাতা পুত্রের সম্পর্ক নাকি খাঁটি? বিনা ঘুষে দিব্য চলে যায়।

কিন্তু মহাভারত তো তা বলে না। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে বিদুরের সঙ্গে কুন্তির কথা হচ্ছিল। কুন্তী কৌরব পক্ষের কর্ণের প্রতি আশ্বস্ত থাকতে পারছিলেন না। দ্রোণ আর ভীষ্মের সম্পর্কে তিনি চিন্তিত নন। দ্রোণ শিষ্যদের সঙ্গে যুদ্ধকামনা করবেন না। ভীষ্ম হয়তো স্নেহশীল হবেন, পাণ্ডবদের প্রতি পিতামহ হিসাবে। তার ভয় কর্ণকে নিয়ে। বীর কর্ণকে ঘেঁটে দিতে তিনি জন্মপরিচয় ঘুষ দিতে গেলেন গঙ্গাতীরে সন্ধেবেলা। সন্ধ্যা সবিতার বন্দনায় রত সে লোক তখন। দুর্বল করে মনোবল ভাঙলেন। সঠিক সময়ে হাতের তাস ফেললেন।

মার্ক্সের কথা অনুযায়ী ধর্ম যদি দরিদ্রের আফিম হয়ে থাকে, তবে রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গবাসীর আফিম। তাসা পার্টির সঙ্গে ভোট প্রচারে পাড়ার পটলা নাচতে নাচতে যায়, জিতলে আবীর ওড়ায়। সে যে দলই হোক ক্ষমতার পাত্র থেকে ছিটকে যেটুকু আসে তাতেই গা সেঁকে নেওয়া যায়। অল্পসল্প দরদাম করে সরকারি টিচারের চাকরিটা হয়ে যায়। পকেটমারেরও তার পেশার সততা, মূল্যবোধ আছে, শিক্ষকের নাই। ধীরে ধীরে স্কুল কলেজগুলো ভরে যাবে, অসাধু পান চিবোনো তাঁবেদারে, সবচেয়ে ডেলিকেট কাজ যাদের, মানুষ গড়ার কাজ। ও কিছু না। মিড ডে মিল আছে তো। পিলপিল করে বাচ্চা আসবে, সোয়াবিন-ভাত খেয়ে চলে যাবে। কিন্তু তাঁতের শাড়ির মত বুনোট তার, ওপরে রং ডিজাইন দেখা গেলেও সুতোর চলন বোঝা যায় না। বিশাল সময়ঘড়ি কালছন্দে অতলান্ত গভীরে বয়ে যায় ঠিকই। ভেতরে পচে যায়, খোকলা হয়ে ধস নামে একদিন।

যারা বাইক নিয়ে দাপাচ্ছে, হুমকি দিচ্ছে, যত্ন করে বোমা বাঁধছে, পিস্তল লাঠিসোঁটা যোগাড় করছে মন দিয়ে। তারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। কিন্তু যারা টুকলি পারে না, চমকাতে পারে না, প্রফেসরকে তেল দিতে পারে না, মেধা, বুদ্ধি, সততা সম্বল। তারা তবে কারা বঙ্গে? তাদের কাজ কি পচা ইঁদুর খুঁজে বের করা? আকাশ ভরা তারার নিচে বিস্ময় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি আমরা পাগলাশ্রী, ক্যাবলাশ্রী, ক্ষ্যাপাশ্রী। পাগলা দাশু, না পাগলা ভোলা, নাকি পাগলা জগাই, কারা আমরা?

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

কচুরি

সাধু

কারখানা বিরিয়ানি

লিটল বুদ্ধ

বাংলা আওয়াজ

শেরপা

সবুজ মিডাসের ছোঁয়া

জুতো

মাদারি কা খেল

সিঁড়ি

ইসবগুল

One Response

  1. দারুণ। সমাজ টার দশা অনেকটা যক্ষা রোগীর মতই
    “খুসখুসে কাশি, ঘুষঘুষে জ্বর
    ফুসফুসে ছ্যাঁদা, বুড়ো তুই মর”।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

six + fifteen =

Recent Posts

মণিশংকর বিশ্বাস

মণিশংকর বিশ্বাসের কবিতাগুচ্ছ

কবিতাগুচ্ছ ম ণি শং ক র  বি শ্বা স কুদৃষ্টি রাস্তার চোখগুলি মনে পড়ে স্নানঘরেও মেয়েটি ভয় পাচ্ছে নগ্ন হতে °°° ক্ল্যাইম্যাক্স মুনমুনকে খুঁজছি সকাল

Read More »
নুশান জান্নাত চৌধুরী

নুশান জান্নাত চৌধুরীর ছোটগল্প

রাত-জ্বলা পোকা নু শা ন  জা ন্না ত  চৌ ধু রী ।। ১ ।। দক্ষিণে, শিরাজের তখত নিয়ে জান্দ আমিরদের নিজেদের ভেতর কামড়াকামড়ি। উত্তর থেকে

Read More »
শুভদীপ রায়চৌধুরী

শুভদীপ রায়চৌধুরীর কবিতাগুচ্ছ

কবিতাগুচ্ছ শু ভ দী প  রা য় চৌ ধু রী দৃষ্টি অন্ধের যষ্টির মতো ধরতে চেয়েছি অন্ধ আসলে কী ধরে? প্রতিবিম্ব? ছায়া? নাকি শান্ত অন্ধকারে

Read More »
দত্তাত্রেয় দত্ত

দত্তাত্রেয় দত্তর প্রবন্ধ

অজস্র ত্রুটি ও অপব্যাখ্যায় পরিকীর্ণ ব্রুকের এই ফাঁপা মহাভারত-নাট্য সম্বন্ধে সংক্ষেপে কিছু বলতে গেলে বলতে হয়, ওটা হলো মহাভারতের মলাট অবলম্বনে ব্রুকের বানানো একটা গপ্পো মাত্র: মহাভারতের নাম-না-শোনা পশ্চিমা দর্শকমণ্ডলীকে ঘেবড়ে দেবার জন্য তৈরি। তাই আমাদের দেশেও চট্ করে পশ্চিমা হয়ে যাবার লোভে অনেকেই ব্রুকের মহাভারতের স্তুতি গেয়ে থাকেন— বিশেষত তাঁরাই, যাঁরা মহাভারত পড়েননি।

Read More »
রথীন চক্রবর্তী

ইউক্রেন ভ্রমণ: রথীন চক্রবর্তী

ইউক্রেনে প্রথম দু’টি রাত র থী ন  চ ক্র ব র্তী যাক, শেষপর্যন্ত ইউক্রেনের মাটিতে পা রাখা সম্ভব হল! ভিসা পাওয়ার জন্য কলকাতায় নিজের অফিস

Read More »
মানব সাধন বিশ্বাস

ব্রিটিশ গল্প ।। অনুবাদ: মানব সাধন বিশ্বাস

পরিচয় ডরিস লেসিং মা ন ব সা ধ ন  বি শ্বা স ক্যাথারিনকে বলেছিলাম ওকে আমার আরেক কিশোর-বন্ধু ফিলিপের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব। ফিলিপ লন্ডন

Read More »