Search
Generic filters
Search
Generic filters

বালি ও ফেনা: চতুর্থ কিস্তি

কাহলিল জিব্রান

ভাষান্তর: অনিন্দিতা মণ্ডল

৬৫

না, আমরা বৃথা এ জীবন বাঁচিনি। তারা তো আমাদেরই অস্থি দিয়ে প্রাসাদ বানিয়েছে।

৬৬

আমরা যেন বিভক্ত না হই। যেন বদ্ধ না হই। একই মাটি থেকে বিছের লেজ ও কবির খ্যাতি দুইই আপন মহিমায় উঠে আসে।

৬৭

প্রতিটি ড্রাগন একজন সেন্ট জর্জের জন্ম দেয় যিনি তাকে বধ করেন।

৬৮

বৃক্ষেরা হল কবিতা। পৃথিবী আকাশের গায়ে লেখে। আমরা তাদের কেটে কাগজ বানাই। যাতে সেই কাগজে নিজেদের শূন্যতাকে ধরে রাখতে পারি।

৬৯

(সন্তরাই জানেন কেন) যদি লিখতে চাও তবে তোমার জ্ঞান, যাদু ও শিল্পকে জানতে হবে। শব্দের মধ্যে নিহিত সুরের জ্ঞান, শিল্পহীন হওয়ার শিল্প এবং পাঠকদের ভালবাসবার যাদু।

৭০

তারা আমাদের হৃদয়ে কলম বিঁধেছে, আর তারা ভাবে তারা অনুপ্রাণিত।

৭১

একটি বৃক্ষ যদি আত্মকথা লেখে তবে তা একটি জাতির ইতিহাসের সমতুল্য।

৭২

যদি একটি কবিতা লেখার শক্তি ও একটি না-লেখা কবিতার আনন্দের মধ্যে বেছে নিতে বলা হয় তবে আমি ওই না লেখা কবিতার আনন্দকে বাছব। কবিতা হিসেবে সেটি বেশি ভাল। কিন্তু তুমি ও আমার প্রতিবেশীরা সবসময় আমার পছন্দকে মন্দ বলে থাকো।

৭৩

কবিতা কোনও মত প্রকাশ করে না। এটি রক্তাক্ত ক্ষত কিংবা একটি হাস্যময় মুখচ্ছবি থেকে উৎসারিত গীত।

৭৪

শব্দরা শাশ্বত। তাই লেখার সময় শব্দের এই চিরন্তন সত্ত্বাকে মনে রাখতে হয়।

৭৫

কবি একজন পরাজিত রাজা। তিনি নিজের পুড়ে যাওয়া প্রাসাদের ছাইয়ের ওপরে বসে কল্পনার চিত্র নির্মাণ করেন।

৭৬

কবিতা হল আনন্দ বেদনা ও বিস্ময়ের প্রকাশ। তাতে কিছুটা অভিধান মিশে থাকে।

৭৭

বৃথাই কবি তাঁর মনে হৃদয় হতে উৎসারিত গীতের দেবীকে খোঁজেন।

৭৮

একবার এক কবিকে বলেছিলাম,— তোমার মৃত্যুর আগে তোমার মূল্য জানব না। তিনি বললেন,— হ্যাঁ, মৃত্যু সবসময়ই প্রকাশক। আর যদি আমাকে জানতে পারো তবে দেখবে আমার জিভের চেয়ে হৃদয় বেশি ভরা। আমার হাটের চেয়ে আকাঙ্ক্ষা বেশি।

৭৯

মরুভূমির মাঝে বসেও যদি তুমি সুন্দরের গান করো তবে নিশ্চিত একজন শ্রোতা পাবে।

৮০

কবিতা হৃদয়ে জ্ঞানের আলো দেয়। জ্ঞান সেই কবিতা যা মনের মাঝে গান গায়। যদি কোনও মানুষের হৃদয়কে মুগ্ধ করি ও একই সঙ্গে মনে সুর দিই তবে সে ঈশ্বরের ছায়ায় বাঁচবে।

৮১

প্রেরণা সবসময় গান গাইবে। কখনওই তার ব্যাখ্যা দেবে না।

৮২

আমরা শিশুদের ঘুমপাড়ানি গান শোনাই, যাতে নিজেরা ঘুমোতে পারি।

৮৩

মনের আকাশ থেকে খসে পড়া একটি টুকরো হল শব্দ।

৮৪

ভাবনা সবসময় কবিতার প্রতিবন্ধক।

৮৫

শ্রেষ্ঠ গায়ক তিনিই যিনি আমাদের নৈঃশব্দ্যকে সুর দিতে পারেন।

৮৬

তোমার মুখ যদি খাবারে ভরা থাকে তবে তুমি কী করে গান গাইবে? তোমার হাত যদি সোনায় ভরা থাকে তবে তুমি হাত তুলে কী করে আশীর্বাদ করবে?

>>> ক্রমশ >>>
চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

***

লেখক পরিচিতি

কাহলিল জিব্রান (Kahlil Gibran) একজন লেবানিজ-আমেরিকান কবি, শিল্পী ও দার্শনিক। ১৮৮৩ সালে লেবাননে জন্ম। বাল্য কেটেছে জন্মভূমিতে। আমেরিকার বোস্টনে আসেন কৈশোরে। আবার লেবাননে শিক্ষালাভ করতে যান। তাঁর দর্শনে মধ্যপ্রাচ্যের সুফী ভাবধারার স্পষ্ট ছাপ। সুফী মরমিয়াদের মতই তাঁর দর্শনে বালির ধারা যেন প্রাণের ধারা। প্রাচ্য দর্শনের মধ্যে ইসলামের একেশ্বরবাদের সঙ্গে ঔপনিষদিক দর্শনের প্রভাবও দেখতে পাওয়া যায়। তিনি আরবি ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই লিখেছেন। তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘দ্য প্রফেট’ প্রকাশ হয় ১৯২৩ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে প্রকাশিত এই লেখাটির মধ্যে প্রচলিত পাশ্চাত্য দর্শনের বিপ্রতীপ একটি কণ্ঠস্বর শোনা গিয়েছিল। প্রফেটের সমগোত্রীয় লেখা ‘স্যান্ড অ্যান্ড ফোম’। দর্শনকাব্য বলা চলে। পুস্তকের অলংকরণ তাঁর নিজের করা। এটি ১৯২৬ সালে প্রকাশিত।

আরও পড়ুন…

বালি ও ফেনা প্রথম কিস্তি

বালি ও ফেনা: দ্বিতীয় কিস্তি

বালি ও ফেনা: তৃতীয় কিস্তি

বালি ও ফেনা: পঞ্চম কিস্তি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 − fifteen =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »