
অনিন্দিতা মণ্ডলের ছোটগল্প
ভূষণকে নিয়ে আমার শেষ লেখাটা ভূষণকে নিয়ে অনেক লিখেছি। ভূষণ বুক্কার অসমবয়সী বন্ধু। বয়স বলতে পারব না। আমার থেকে অনেক বড় তা জানি। ওর একমাথা

ভূষণকে নিয়ে আমার শেষ লেখাটা ভূষণকে নিয়ে অনেক লিখেছি। ভূষণ বুক্কার অসমবয়সী বন্ধু। বয়স বলতে পারব না। আমার থেকে অনেক বড় তা জানি। ওর একমাথা

India’s First Bengali Daily Journal. ওরা বলে পাখিটি বুকে কাঁটা নিয়ে প্রেমের গান গেয়েছিল। আমরাও তো তাই গাই। এছাড়া আর কীভাবেই বা প্রেমের গান গাইব।

India’s First Bengali Daily Journal. যদি একটি কবিতা লেখার শক্তি ও একটি না-লেখা কবিতার আনন্দের মধ্যে বেছে নিতে বলা হয় তবে আমি ওই না লেখা কবিতার আনন্দকে বাছব। কবিতা হিসেবে সেটি বেশি ভাল। কিন্তু তুমি ও আমার প্রতিবেশীরা সবসময় আমার পছন্দকে মন্দ বলে থাকো।

India’s First Bengali Daily Journal. এসো লুকোচুরি খেলি। তুমি আমার অন্তরে লুকোলে খুঁজে পাওয়া শক্ত হবে না। কিন্তু যদি তুমি নিজেকে নিজের খোলসের মধ্যে লুকিয়ে রাখো তবে কেউই তোমাকে খুঁজে পাবে না।

India’s First Bengali Daily Journal. ঘর বলল— আমাকে ছেড়ে যেয়ো না। এখানেই তোমার অতীত। পথ বলল— আমাকে অনুসরণ করো, আমি তোমার ভবিষ্যৎ। আমি ঘর ও পথকে বললাম, আমার কোনও অতীত নেই, ভবিষ্যৎও নেই। যদি ঘরে থেকে যাই তবে তার মধ্যে একটা যাত্রা থাকবে। আর যদি পথে নামি তবে তার মধ্যে একটা বসত থাকবে। শুধু ভালবাসা ও মৃত্যুতেই সব রূপান্তর।

India’s First Bengali Daily Journal. একবার কুয়াশা ভরে নিয়েছিলাম মুঠোয়। হাত খুলে দেখি, ওমা! কুয়াশা তো একটি কীট! মুঠো বন্ধ করে আবার খুললাম, এবার খোলা মুঠোয় একটা পাখি। আবারও মুঠো করা হাত খুললাম, দেখলাম বিষণ্ন এক মানুষ ঊর্ধ্বপানে চেয়ে। বন্ধ করলাম মুঠো, আর এবারে খোলা মুঠোয় কুয়াশা ছাড়া কিছু ছিল না। কিন্তু তার মধ্যে থেকে এক অপূর্ব মধুর সঙ্গীত শুনতে পেলাম।

India’s First Bengali Daily Journal. মধুসূদনকে যে জন্য আমরা প্রণাম জানাব তা হল ভারতবর্ষের প্রথম মহাকাব্যের বিনির্মাণ তাঁর হাত ধরেই হয়। ভাষা ও সাহিত্যের পণ্ডিত তাঁর অবদান ছন্দ ও বিষয়, রচনারীতি ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করতেই পারেন কারণ এখনও সেই প্রাসঙ্গিকতা আছে, কিন্তু রামায়ণকে বিষয় করে বেছে নেওয়ার মধ্যে তাঁর যে সাহসী ও বৈপ্লবিক চেতনার প্রকাশ ঘটেছে তা অনস্বীকার্য। এর আগে নানা ভাষায় নানা ভঙ্গিতে রামায়ণ লেখা হয়েছে। কিন্তু মূল ভাব ও চরিত্রগুলি পরিবর্তিত হয়নি। মধুসূদন দত্ত প্রথম রামায়ণের বিনির্মাণ করেন।

India’s First Bengali Daily Magazine. এভাবে আমি কখনওই বাড়িতে পৌঁছতে পারব না। আমার দুরন্ত পসার শেষ হয়ে গেল। আমার উত্তরাধিকারী আমাকে লুঠ করেছে। কিন্তু তা ব্যর্থ, কারণ সে আমার জায়গা নিতে পারবে না। আমার বাড়িতে সেই শয়তান সহিস দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। রোজ অত্যাচারিত। এর বেশি আমি আর ভাবতে পারছি না। নগ্ন, জীবনের সমস্ত অসুখী বছরের তুষার আমার গায়ে, একটি পার্থিব শকট নিয়ে, অপার্থিব ঘোড়াসহ, আমার মত বৃদ্ধ, এখন এখানে, যার সব নষ্ট।

India’s First Bengali Daily Magazine. সাধন কলকাতার শহরতলিতে ফ্ল্যাটবাড়ির একচিলতে বাগান দেখাশুনো করে। ওর অনেকগুলো ঘর বাঁধা। ঠিকে মালি বলা চলে। তমালদেরও পূর্ব শহরতলির ফ্ল্যাটবাড়িতে গোটা সাতেক টব ও দেখাশুনো করে। তমালের মায়ের স্কুলের চাকরি। সময় নেই, কিন্তু এখন পরিবেশবান্ধব হওয়ার যে বিপুল চাপ! স্কুলের বান্ধবীদের দেখে দেখে তিনিও কিছু টবের গাছ কিনেছেন। যে নার্সারি থেকে কিনেছেন তারাই সাধনকে পাঠিয়েছে। এক-দুঘর হতে হতে এই চত্বরে সাধন এখন কম করে পঞ্চাশ ঘর টবের বাগান দেখাশুনো করে। সপ্তাহে একদিন আসে।

India’s First Bengali Daily Magazine. একজন বিপত্নীকের এর চেয়ে বেশি আর কী উল্লাস থাকতে পারে? বলো— তোমার বিবেক যেন জেগে থাকে— বলো আমার জন্য ওই পেছনের ঘরে কী পড়ে আছে? অবিশ্বাসী কর্মচারী দ্বারা প্রতারিত এই অধমের জন্য, কী পড়ে আছে এই বুড়ো হাড়ের জন্য? আর আমার ছেলে সর্বত্র চলে যাচ্ছে। আমার তৈরি করা যোগাযোগ থেকে ব্যবসা করে সে জয়ের গৌরবে জ্বলজ্বল করছে। সব কিছু লুকোতে একটা রাশভারি, ভারি ব্যস্ত মুখোশ পরে সে আমায় প্রতারিত করছে। কী মনে করো তুমি? আমি তোমায় ভালবাসি না? যে তুমি এই আমার থেকেই জন্মেছ?

India’s First Bengali Story Portal. অ্যামরড যতক্ষণ কার্ড ছাপাচ্ছিল ততক্ষণ আমি অপেক্ষা করলাম। মাঝে মাঝে আমি তাকে কোথাও একটুকরো পাতা, বা নামের তলায় একটা লাইন দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছিলাম যাতে কার্ডগুলো দেখতে সুন্দর লাগে। কিন্তু অ্যামরড রাজি হল না। সে মনে করেছে এগুলো নিতান্তই বাহুল্য, আর এর জন্য খরচও বেশি পড়বে। তাছাড়া তার কাছে প্রয়োজনীয় স্টকও নেই। মেনে নিলাম। কার্ডগুলো ভালই দেখতে হল। ছিমছাম পরিষ্কার (শুধু কয়েকটার কালি তখনও শুকোয়নি)। নিজের সম্মানরক্ষার জন্য যথেষ্ট মনে হল।

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।