Search
Generic filters
Search
Generic filters

ছবিবৃত্তান্ত

পুরো নাম ছায়াছবি, ছোট করে ছবি। সেই ছবিকে আজকের স্তরে তুলে ধরতে যুগ যুগ ধরে মানুষের যে নিষ্ঠা ও পরিশ্রম জড়িয়ে আছে, তা ভাবতে বসলে বিস্ময়ে হতবাক হতে হয়। এর পেছনে আছে কত সাফল্য, ব্যর্থতা, সুখদুঃখ ও নানান মজার কাহিনি। ছবির দুনিয়ার সেইসব অনবদ্য গল্পকাহিনি নিয়ে ধারাবাহিক ‘ছবিবৃত্তান্ত’।

প্রথম কিস্তি

এ-বাংলায় চলচ্চিত্র, ছায়াছবি অথবা ছবি। ইংলিশ, মার্কিন, জর্জিয়ান, আফ্রিকান, পর্তুগিজ ও বাংলাদেশিরা বলেন সিনেমা। কেউ কেউ মুভি বা পিকচারও বলে থাকেন। আরবিয়ানদের কাছে ‘দ্য সিনেমা’। চেক, জর্মন, বসনিয়া ও রাশিয়ানে ‘কিনো’। গ্রিকরা বলেন ‘কিনিমাতোগ্রাফোস’, সুইডিশরা ‘বিয়ো’, জাপানিরা ‘শিনেমা’, ইতালিয়ানরা ‘চিনেমা’, স্প্যানিশরা ‘সিনে’, ডেনিসরা ‘বিয়োগ্রাফ’ আলবেরিয়ানরা বলেন, ‘কিনেমা’, বাস্কের লোকেরা বলেন ‘জিনিয়া’, ডাচরা ‘বিয়োস্কুপ’, হাঙ্গেরিয়ানরা ‘মোজি’। আইসল্যান্ডে আমার নাম ‘ভিকমিনদাহুস’, ফিনল্যান্ডে ‘ইলোকুবাতিয়াডেরি’।
শুরু করা যাক একেবারে গোড়া থেকে। তখন সবেমাত্র বিভিন্ন পদার্থে আলোর সংবেদনশীলতা ও দৃশ্য স্থায়ী করার কথা ভাবা হচ্ছিল। সময়টা আজ থেকে পঁচিশ শতক আগে। চিন দেশের মোৎজু (Mo Tzu) নামে এক দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক, বিভিন্ন পদার্থের আলোক সংবেদনশীলতা ও দৃশ্যকে স্থায়ী করার কথা ভেবেছিলেন।
গ্রিক বিজ্ঞানী অ্যারিস্টোটল (৩৮৪-৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) প্রথম দৃষ্টিবিজ্ঞানের ভিত্তিতে আলোকপাত করেন ও আলোকবিদ্যার বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। অ্যারিস্টোটলের পর আলেকজান্দ্রীয় বিজ্ঞানের যুগে বৈজ্ঞানিক আর্কিমিদিস (২৮৭-২১২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) প্রথম লেন্স ও আয়নাকে বৈজ্ঞানিক কাজে ব্যবহার করেন। উত্তল লেন্সের অনুরূপ Burning mirror তাঁরই তৈরি।
গণিতশাস্ত্রের অধ্যাপক ইউক্লিড (৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), অ্যারিস্টোটল ও আর্কিমিদিসের আলোকবিদ্যা ও লেন্সের গবেষণায় অনুপ্রাণিত হয়ে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলে আবিষ্কার করলেন আলো সরলরেখায় গমন করে। পাওয়া গেল ক্যামেরার মাধ্যমে ছবি তোলার সন্ধান।
খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতে আরব দার্শনিক আল হাজেন পূর্বসূরিদের গবেষণার সূত্র ধরে আবিষ্কার করেন ‘অবিরত দৃষ্টিতত্ত্ব’ (Persistence of vision) অর্থাৎ চোখের দেখা শেষ হয়ে গেলেও, মস্তিষ্ক তা আরও কিছুক্ষণ ধরে রাখে। ভবিষ্যতে গতিশীল ছবির সূত্র মিলল এ থেকেই।

চিত্তবিনোদনের জন্য চিন, ভারত, জাপানে প্রথম ছায়ার খেলা দেখানো শুরু হয়। ছায়ার খেলার পাত্রপাত্রী প্রথমে তৈরি হত গাছের পাতা ও জন্তুজানোয়ারের চামড়া দিয়ে। এশিয়ার ছায়ার খেলা যখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রসার লাভ করে তখন তামা, দস্তা, পিতল আবিষ্কৃত হয়ে গেছে। শুরু হল আরও নিখুঁত ও যান্ত্রিকভাবে খেলা দেখানো।
ইতালির চিত্রশিল্পী, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি (১৪৫২-১৫১৯) ক্যামেরা অবসকিউরা (Camera obscura)-র জানান দিলেন। এর পেছনে গ্রিসের অ্যারিস্টোটল, আরবের ইবন আল হাইতাম (যিনি আল হাজেন নামেই বেশি পরিচিত, ৯৬৫-১০৪০), ইংল্যান্ডের রজার বেকন (১২১৯/২০-১২৯২), হিব্রু পণ্ডিত লেভি বেন গেরশন (১২৮৮-১৩৪৪)-দের গবেষণার যথেষ্ঠ প্রভাব ছিল।
ইতালির জিওভান্নি বাতিস্তা দেল্লা পোরতা (১৫৩৫-১৬১৫) ক্যামেরা অবসকিউরার উন্নতিসাধন করেন ও এর ফলে ১৫৫৩ খ্রিস্টাব্দে প্রথম ক্যামেরা বাস্তবে রূপ নেয়। ক্যামেরা অবসকিউরাতে প্রথম লেন্স ব্যবহৃত হয় ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দে এবং এই দ্বি-উত্তল লেন্সটি (Biconvex lens) ব্যবহার করেন গারদানো নামে এক বৈজ্ঞানিক।
১৫৬৮ সালে ড্যানিয়েল বারবারো নামে এক ইতালিবাসী বহু গবেষণার পর ক্যামেরার ভিতর প্রতিফলিত আলোকরশ্মির কমা-বাড়ার বিষয়টিকে আবিষ্কার করার ফলে তিনিই প্রথম ডায়াফ্রাম (Diaphragm)-এর প্রচলন করেন।
১৫৭৩ সালে দান্তি (১৫৩৬-১৫৮৬) অবতল আয়না (concave mirror) ব্যবহার করে দেখালেন যে, প্রতিফলিত বিষয়বস্তু সোজা দেখা যায়। অবসকিউরা নকল করার কাজে লাগল ও সুবিধামত তাকে পরিবর্তিত করে বহনযোগ্য করে তোলা হল। ইতালি থেকে জার্মানিতে এসে ক্যামেরা অবসকিউরা আরও উন্নত হল জ্যোতির্বিজ্ঞানী জোহানেস কেপলার (১৫৭১-১৬৩০)-এর হাতে পড়ে। প্রতিফলিত চিত্রকে আরও স্পষ্ট ও উজ্জ্বল করতে হলে ক্যামেরার ভিতরে অন্য কোনও আলো না ঢুকতে পারার জন্য কালো রং করা হল, সময়টা ১৬২০ সালের মাঝামাঝি।
১৬৪৫ সালে কারচার (১৬০২-১৬৮০) ক্যামেরা অবসকিউরাকে আরও উন্নত করেন। তিনি তাঁর ‘Ars Magna Lucis et Umbrae’ বইতে ম্যাজিক লন্ঠনের বর্ণনা দেন। আগামী দিনের চলচ্চিত্রের সম্ভাবনা লুকিয়ে ছিল এর মধ্যেই। কারচার কাচের ওপর ভুষোকালি দিয়ে হাতে এঁকে, ম্যাজিক লন্ঠনের মাধ্যমে খ্রিস্টের জীবনকহিনি দেখান। ম্যাজিক লন্ঠনের জনপ্রিয়তা ক্রমশ বাড়তে থাকায় প্রদীপ, মোমবাতি ও গ্যাসের আলোয় তা দেখানো শুরু হয়। উন্নত মানের ম্যাজিক লন্ঠন তৈরি করে হল্যান্ড যথেষ্ঠ মুন্সিয়ানার পরিচয় দেয় ও এর মাধ্যমে অর্থোপার্জনও শুরু হয়।
ফ্রান্স, ইতালি, হল্যান্ড, জার্মানি– এককথায় সারা ইউরোপ জুড়ে কিছু মানুষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, কীভাবে ছবি স্থায়ী করা যায়, চলমান ছবি দেখানো যায় কিনা– এসব বিষয়ে।
জার্মান প্রকৃতিবিজ্ঞানী ও রসায়নবিদ শুলজ (১৬৮৭-১৭৪৪) ১৭২৫ সালে সিলভার নাইট্রেট ও চকের মিশ্রণ আলোর সংস্পর্শে কালো হওয়ায়, এই পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে stencil থেকে contact কপি তৈরি করেন। যদিও ব্যাপারটা স্থায়ী ছিল না, তবু এটি আরও এক ধাপ এগোনোর পথ দেখাল।
১৭৭৭ সালে সুইডিশ রসায়নবিদ ও ওষুধ প্রস্তুতকারক কার্ল উইলিয়াম শিলে (১৭৪২-১৭৮৬) দেখালেন সিলভার ক্লোরাইড আলোর মাত্রার তারতম্যে কালো হয় আর এই কালো অংশটা কমে যাওয়া সিলভার। সিলভার ক্লোরাইড খুব তাড়াতাড়ি কালো হয় বেগুনি বর্ণচ্ছটায়, যা Ultra Violet ray নামে পরিচিতি পেল।
১৭৮৯-এ ফরাসি বিপ্লব শুরু হল ও দেশের গণ্ডি পার হয়ে ইউরোপে তা বিস্তার লাভ করল। ফলস্বরূপ সামাজিক সংস্কার ও পুরনো ধ্যানধারণা পাল্টাতে থাকে।
১৮০০ সালে ইংল্যান্ডবাসী জার্মান বৈজ্ঞানিক ফ্রেডরিখ ভিলহেলম হারশেল (১৭৩৮-১৮২২) সূর্যালোকের বর্ণচ্ছটা নিয়ে গবেষণাকালে অবলোহিত (Infrared) রশ্মি আবিষ্কার করেন। ওই বছরেই ইংল্যান্ডের থমাস ওয়েজউড (১৭৭১-১৮০৫) তাঁর বন্ধু হামফ্রে ডেভির (১৭৭৮-১৮২৯) সঙ্গে প্রতিচ্ছবি গ্রহণের বিষয়ে এগিয়ে গেলেন আরও একধাপ। তারা ছায়া (silhouette) প্রতিচ্ছবি গ্রহণে সক্ষম হলেন। তবে শুলজের মতো এবারও প্রতিচ্ছবি স্থায়ী করা গেল না। তাঁরা কিন্তু হাল ছাড়লেন না এবং ১৮১৩-য় স্যার ডেভিই বৈদ্যুতিক আর্ক ল্যাম্প আবিষ্কার করে প্রতিচ্ছবি প্রক্ষেপণের (Projection) ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন।
১৮০৭ সালে তৈরি হয় ‘ক্যামেরা লুসিডা’ (Camera Lucida)। ড. উইলিয়াম হাইড ওলাসটন (১৭৬৬-১৮২৮) পুরনো ক্যামেরার অর্থাৎ ১৬৬৮-তে আবিষ্কৃত ড. রবার্ট হুকের ক্যামেরার দ্বি-উত্তল লেন্ম বদলে একদিকে অবতল (concave) ও অপরদিকে উত্তল (convex) লেন্স ব্যবহার করেন, যার নাম মিনিসকাস লেন্স (Meniscus lens)। এর ফলে প্রতিফলিত চিত্র অনেক স্পষ্ট ও উজ্জ্বল হয়। উইলিয়াম হেনরি ফক্স ট্যালবট (১৮০০-১৮৭৭) এই ক্যামেরা লুসিডা দিয়ে ইতালির ‘কোমো’ (Como) লেকের ছবি তোলেন।
ফ্রান্সের নিয়েপ্স (১৭৬৫-১৮৩৩) মুদ্রণ বিশেষজ্ঞ (lithographist), ফটো তোলার ব্যাপারে আগ্রহী হন। ১৮১৬-তে ক্যামেরা অবসকিউরা দিয়ে বেশ কিছু ছবিও তুলে ফেলেন।
সিলভার ক্লোরাইড, ভেজানো কাগজ, কাচ, দস্তা-তামার পাত ইত্যাদি ব্যবহার করলেও ছবি কিন্তু স্থায়ী হল না।
১৮২২ সালে কাচের ওপর জুডিয়া বিটুমেনের প্রলেপ লাগানোর ফলে কিছুটা সুরাহা হল। এরপর কাচের ওপর asphalt varnish লাগিয়ে ছবি তোলা হল।
১৮২৪ সালে পিটার মার্ক রোজেট নামক চিকিৎসক তাঁর গবেষণার ফল ‘Persistence of Vision with Regard to Moving Objects’ রয়েল সোসাইটির কাছে প্রকাশ করায় সারা ইউরোপ জুড়ে এর প্রতিক্রিয়া দেখা দিল।
১৮২৬-এ টিন, সিসা ইত্যাদি মিশ্রিত ধাতুর পাত বিটুমেনে ভিজিয়ে তার ওপর প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি তোলেন নিয়েপ্স। তাঁর লক্ষ্য ছিল ক্যামেরায় তোলা ছবি ছাপার যোগ্য করা।
লুইস-জ্যাকস-ম্যান্ডি ডাগুয়েরে (১৭৮৭-১৮৫১) মুখ্যত একজন চিত্রশিল্পী। তবে তাঁর বন্ধু চার্লস শোভালিয়ের-এর সাহায্যে ক্যামেরা অবসকিউরাকে আরও উন্নত করে তোলেন। ১৮২৬-এর জানুয়ারিতে নিয়েপ্সকে চিঠি পাঠান সাক্ষাতের জন্য, তবে ১৮২৭-এর অগাস্ট মাসের আগে সাক্ষাৎ হল না।
১৮২৬ সালে প্যারিসে জন আয়ারটন প্যারিস নামক চিকিৎসক তৈরি করেন থাউমেট্রোপ (thaumatrope)। একটা শক্ত কাগজের চাকতির দু’পাশে দুটো আলাদা ছবি আঁকা– একদিকে খাঁচা ও অন্যদিকে পাখি। কাগজের দু’পাশে সুতো দিয়ে বাঁধা। অক্ষরেখা (axis)-র ওপর কাগজটা ঘুরতে শুরু করলেই অবিরাম দৃষ্টিতত্ত্বের নিয়মানুসারে একটা ছবিই দেখা যেত, অর্থাৎ মনে হত পাখিটা খাঁচার ভিতরে বসে আছে। সেসময় ইউরোপের বাজার ছেয়ে গিয়েছিল এই খেলনায়।
১৮২৯-এ নিয়েপ্স-ডাগুয়েরের দশ বছরের চুক্তি হয়। গোপন থাকবে ‘গবেষণা’র কাজ। লাভ ভাগাভাগি হবে সমানভাবে। ১৮৩৩-এ নিয়েপ্স হঠাৎই মারা যাওয়ায় দু’জনের আর সাক্ষাৎ হয়নি।
বেলজিয়ামের জোসেফ অ্যান্টনি ফার্দিনান্দ প্ল্যাটো (১৮০১-১৮৮৩) ও অস্ট্রিয়ার ড. সাইমন ভন স্ট্যাম্পফার নামক বৈজ্ঞানিকও ওই ‘খেলনা’ বিষয়ক গবেষণায় ব্যস্ত ছিলেন। প্ল্যাটো ও স্ট্যাম্পফার প্রায় একই সময়েই, দুজনে দুজনার ব্যাপারস্যাপার না জেনেই তৈরি করে ফেলেন পৃথিবীর প্রথম গতিশীল ছবি দেখার যন্ত্র। ১৮৩২-এ বেলজিয়াম ও অস্ট্রিয়ায় তৈরি হল এই যন্ত্র।
প্ল্যাটো তাঁর যন্ত্রের নাম দেন ফেনাকিস্টোস্কোপ (Phenakistoscope) ও স্ট্যাম্পফার নাম দেন স্ট্রোবোস্কোপিক ডিস্ক (Stroboscopic Disc)। প্ল্যাটো অবশ্য তাঁর যন্ত্রের নাম পাল্টে রাখেন ফ্যান্টোস্কোপ (Fantoscope)– এতে শয়তানের ক্রিয়াকলাপ নিয়ে দেখানো হয় নতুন ছবি ‘Le Diable Soufflant’।
১৮৩৯-এর ৭ জানুয়ারি ফটোগ্রাফির ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। পদার্থবিজ্ঞানী, জ্যোতির্বেত্তা ও রাজনীতিবিদ ফ্রাঁসোয়া আরাগো French Academy of Sciences-এর সামনে বন্ধু ডাগুয়েরের আবিষ্কার প্রকাশ করেন। ১৮৩৯-এর ১৪ অগাস্ট দগিউর ইংল্যান্ড থেকে পেটেন্ট নিয়ে নেওয়ায়, ১৯ অগাস্ট ফরাসি সরকারের তরফ থেকে তা আর বিশ্ববাসীকে উপহার দেওয়া হল না।

>>> ক্রমশ >>>

চিত্র : গুগল

ছবিবৃত্তান্ত  দ্বিতীয় কিস্তি

ছবিবৃত্তান্ত তৃতীয় কিস্তি

ছবিবৃত্তান্ত চতুর্থ কিস্তি

ছবিবৃত্তান্ত পঞ্চম কিস্তি

ছবিবৃত্তান্ত ষষ্ঠ কিস্তি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

13 + eight =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »