Search
Generic filters
Search
Generic filters

প্রকৃতিপাঠ: বসন্তের শ্বেত শিমুল

শ্বেত শিমুল বা সাদা শিমুল বৃহৎ বৃক্ষ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Ceiba pentandra, সমনাম Bombax pentadru, এটি Malvaceae পরিবারের এবং Bombacoideae উপ-পরিবারের উদ্ভিদ। ইংরেজিতে java cotton, Java kapok, White silk cotton tree, silk-cotton, Kapok, Samauma, Ceiba, Kutashalmali ইত্যাদি নামে পরিচিত। সাদা শিমুলের তুলো এবং বীজের উপযোগিতা রয়েছে। সেইসঙ্গে পরম্পরাগত চিকিৎসায় এই শ্বেত শিমুল গাছের ছালের ক্বাথ মূত্রবর্ধক ও কামোদ্দীপক হিসাবে, মাথাব্যথা এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসার জন্যও ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

সাধারণত আমরা যে লাল শিমুল দেখি, তার সঙ্গে এই শ্বেত শিমুলের পার্থক্য অনেক। এই গাছের গায়ের রং সবুজ বা সবুজাভ। ফুল সাদা ও অপেক্ষাকৃত ছোট। উদ্ভিদটির আদি নিবাস মেক্সিকো, মধ্য-আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান অঞ্চল, দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাংশ থেকে পশ্চিম আফ্রিকার উষ্ণপ্রধান অঞ্চল। আফ্রিকা ও এশিয়ার নানা অংশেও এর দেখা মেলে। বড় শ্বেত শিমুল গাছের ঠেকনামূল নজরে আসে। গাছটি প্রায় ২৩০ ফুট লম্বা হতে পারে এবং মাটিতে ঠেস দেয়া কাণ্ডের ব্যাস প্রায় ১০ ফুট পর্যন্ত হতে পারে।

চিত্র: লেখক

প্রাকৃতিকভাবে বাংলাদেশে সাদা শিমুল খুবই কম দেখা যায়। বিভিন্ন পার্ক বা উদ্যানে শ্বেত শিমুল গাছের দেখা মেলে। সঙ্গের ছবি গত ২২ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহ শহরের ব্রহ্মপুত্র তীরের শিল্পাচার্য জয়নুল উদ্যান থেকে তোলা। বসন্তে শ্বেত শিমুল গাছে ফুল ফোটে। ফুলগুলি বেশ ছোট আকারের, শ্বেতশুভ্র ফুল গাছের পাতার সঙ্গে এমনভাবে মিশে থাকে যে দূর থেকে ফুল চেনার কোনও উপায় থাকে না। সাদা শিমুলের ফুল ২.৫ সেমি পর্যন্ত চওড়া হয়। গাছের নিচে গেলে দেখতে পাবেন ঝরা ফুলের মেলা। শ্বেত শিমুল গাছে ৫ থেকে ৯টি পত্রিকা নিয়ে করতলাকারভাবে বিন্যস্ত পাতা থাকে, যা ৮ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।

শ্বেত শিমুল বাণিজ্যিকভাবে এশিয়ার বৃষ্টিঅরণ্যে, বিশেষ করে জাভাতে, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া এবং চিনের হাইনান দ্বীপ, পাশাপাশি দক্ষিণ আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি চাষ হয়। মৌমাছি এবং বাদুড়ের কাছে এই ফুলের মধু অমৃতসমান এবং এরা পরাগমিলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বাদুড়রাই রাতে প্রস্ফুটিত ফুলের প্রাথমিক পরাগায়নকারী। এর তন্তু বা তুলে খুব হালকা, স্থিতিস্থাপক, জলপ্রতিরোধী, কিন্তু অত্যন্ত দাহ্য। অনেক জায়গায় এর তুলো গদি, বালিশ, গৃহসজ্জার সামগ্রী, টেডি বিয়ারের মত খেলনায় সিন্থেটিক ফাইবারের বিকল্প হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এমনকি অতীতে এর তুলো লাইফ জ্যাকেট এবং অনুরূপ জিনিসে ব্যবহৃত হত। বীজগুলি থেকে তৈরি তেল যা স্থানীয়ভাবে সাবানে ব্যবহৃত হয় এবং সার হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

চিত্র্: লেখক

শ্বেত শিমুল বা সাদা শিমুলের ফল ৭ থেকে ১২ সেমি পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। ফলের ভেতর বীজ সাদা তুলায় জড়ানো থাকে। এর মূল্যবান তুলোর জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে বাণিজ্যিকভাবে শ্বেত শিমুল গাছ লাগানো হয়। এর বীজও অত্যন্ত দামি ও কার্যকরী। বীজের তেলের আয়োডিন ভ্যালু ৮৫-১০০। ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ায় বাণিজ্যিকভাবে বীজের তেল উৎপাদন করা হয়। বায়োফুয়েল আর রং প্রক্রিয়াজাতকরণে এই তেল কাজে লাগে। শ্বেত শিমুলের গাছের বাকল ভেষজ ঔষধে কাজে লাগে। আর মায়ানমারের মিথ অনুযায়ী, শ্বেত শিমুল পবিত্র বৃক্ষ। গুয়াতেমালা ও পুয়ের্তো রিকোর জাতীয় বৃক্ষও শ্বেত শিমুল।

চিত্র : গুগল

প্রকৃতিপাঠ : বিলুপ্তপ্রায় কর্পূর গাছ

প্রকৃতিপাঠ: স্নিগ্ধ ছায়ার তমাল গাছ

প্রকৃতিপাঠ: দৃষ্টিনন্দন ও সুগন্ধী নাগলিঙ্গম

প্রকৃতিপাঠ: খইয়ে বাবলা ফলের গাছ

প্রকৃতিপাঠ: চিনেবাদাম চিনে নিন

প্রকৃতিপাঠ: রসময়ী খেজুর গাছ

প্রকৃতিপাঠ: তাহার নামটি রঞ্জনা

প্রকৃতিপাঠ: উপকারী সোনাপাতা

প্রকৃতিপাঠ: পশ্চিমবঙ্গের জাতীয় বৃক্ষ ছাতিম

প্রকৃতিপাঠ: এখন অশোক ফোটার দিন

প্রকৃতিপাঠ: ফলসার বহুবিধ গুণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen − 18 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »