Search
Generic filters
Search
Generic filters

দ্য পিকচার অব ডোরিয়ান গ্রে: মন্দ সময়ের উপাখ্যান

ভিক্টোরিয়ান রীতিনীতি সব উচ্ছন্নে যাওয়ার যোগাড়। এতদিনকার মার্জিত ঔদ্ধত্য, লালিত অহংকার রাস্তায় গড়াগড়ি যায় আর কী! লোকটার কোনও এটিকেট নেই, মুখের আগল নেই। শ্লীল-অশ্লীল বোধটাও যেন কম। মাঝখানে যে সূক্ষ্ম পর্দাটা আছে তা তাঁর ভাষার তোড়ে উড়ে যেতে বসেছে। একেবারে দমকা বাতাস। কী অকপট, কী স্বাভাবিক তাঁর উচ্চারণ। মনের ভিতর ঘূর্ণি উঠলেই আগল খুলে দিতে হবে বৈকী— I like men who have a future and women who have a past.

জড়তাহীন এই ঘোষণা যাকে বলে একেবারে বজ্রনির্ঘোষ। এরকম একটা মানুষকে নিয়ে কানাকানি হবে, বিতর্ক হবে, ঝগড়া হবে খুব স্বাভাবিক কারণেই। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশক কেঁপে উঠল অস্কার ওয়াইল্ডের ‘দ্য পিকচার অব ডোরিয়ান গ্রে’ বইটির হাত ধরে। কোনও কোনও সমালোচকের মতে, এই বই ঘরে রাখা যায় না। মানে লুকিয়ে রাখা উচিত কিশোর-কিশোরীদের নাগাল থেকে। এ এক ‘poisoned book’, যার ছত্রে ছত্রে লুকিয়ে আছে বিষ। ছেলেমেয়েরা সব উচ্ছন্নে যাবে। নষ্ট হবার মত উপাদান কম নেই এখানে। লর্ড হেনরির মুখে এমন সব কথা বসিয়েছেন অস্কার ওয়াইল্ড (পুরো নাম অস্কার ফিঙ্গাল ও’ফ্লাহার্টি উইলস ওয়াইল্ড) নামের মানুষটা, তা এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও বিশুদ্ধবাদীদের ধাক্কা দেয়। মানব কী মানব না, পড়ব কী পড়ব না, এক দোদুল্যমানতায় দোল খাওয়ায়। দাম্পত্য সম্পর্কের যে পিউরিটি তার শিকড় ধরে নাড়া দেয়। কোথাও কোথাও উপড়েও ফেলে— The one charm of marriage is that it makes a life of deception absolutely necessary for both parties. I never know where my wife is, and my wife never knows what I am doing. কী সাংঘাতিক ও সাহসী বিস্ফোরণ। আমাদের সমাজে যেখানে অগ্নিসাক্ষী রেখে জন্ম-জন্মান্তরের বন্ধনে জড়িয়ে পড়ার শপথ নিই, সেখানে এ বই নিঃসন্দেহে বিপজ্জনক। সমাজ-সংসার রসাতলে যাবার উপক্রম।

মার্কিন সাময়িকী ‘‘লিপিনকট’স মান্থলি ম্যাগাজিন’’-এর ১৮৯০ জুলাই সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয় ‘দ্য পিকচার অব ডোরিয়ান গ্রে’।

ডোরিয়ান গ্রে যৌবনের প্রতীক, সৌন্দর্যের প্রতীক। বয়সের বলিরেখাও ভয় পায় তার শরীরে থাবা বসাতে। সে উন্নাসিক, উদ্ধত। ঠান্ডা মাথার খুনি। সমাজের উপরতলার প্রতিনিধি। ক্লাব আর পার্টি কালচারে অভ্যস্ত। একদিকে ভিক্টোরিয়ান রাখঢাক আর অন্যদিকে উপরতলার বাসিন্দাদের কেচ্ছার গল্প। ওয়াইল্ড আসলে তার সময়টাকেই ফালাফালা করতে চেয়েছেন। বলা যেতে পারে এ এক সামাজিক ব্যবচ্ছেদ। যেন অপারেশন টেবিলে রোগীকে শুইয়ে খুলে দেওয়া হয়েছে তার বুক। সবাইকে ডেকে দেখানো, এই যে শুয়ে আছ তুমি, তুমি, তুমি…

ডোরিয়ানের সৌন্দর্যে মজেছে চিত্রকর বাসিল। এতটাই যে অন্য কারও মুখে ডোরিয়ানের প্রশংসা বা সমালোচনা তার বুকে বড় বেশি বাজে। কারও কাছে সে প্রকাশ করতে চায় না তার উপস্থিতি, এমনকি তার বন্ধুদের কাছেও— when I like people immensely, I never tell names to any one. হ্যারিও কি মজেনি তার নতুন এই পুরুষবন্ধু ডোরিয়ানের সৌন্দর্যে? প্রথম যেদিন দেখল সে, তার অন্তরাত্মায় বেজে উঠল এক অনির্বচনীয় সুর, ফুটে উঠল হাহাকার— his finely carved scarlet lips, his frank blue eyes… all the candour of youth was there, as well as all youth’s passionate purity. অন্যরকম কোনও গন্ধ পাচ্ছেন পাঠক? হ্যাঁ, সমকামিতার অভিযোগ উঠেছে অস্কারের বিরুদ্ধে। আর সেই অভিযোগে অভিযুক্তও বটে। জেলে কেটেছে লম্বা দুটো বছর। সোয়াশো বছর আগে সমকামিতা আমাদের গ্রহে কোথাওই স্বীকৃত ছিল না। ধরে নেওয়া হত এ হচ্ছে প্রকৃতিবিরুদ্ধ, সৃষ্টিকর্তার খেয়ালি ইচ্ছের বিরুদ্ধে সোচ্চার বিদ্রোহ।

গ্রন্থাকারে প্রকাশিত ‘দ্য পিকচার অব ডোরিয়ান গ্রে’-র প্রথম দিককার প্রচ্ছদ।

ডোরিয়ান-এর পোট্রেটের মধ্যে অংশত ঢুকে গিয়েছিল চিত্রকর নিজেও। তার আত্মার অংশ হয়ে উঠেছিল সে প্রতিকৃতি— he is much more to me than a model or a sitter… Harry! if only you knew what Dorian is to me! দুই বন্ধুই অতঃপর মুগ্ধতার আড়ালে পরস্পর ঈর্ষার জাল বুনবে, ছিনিয়ে নিতে চাইবে ডোরিয়ানকে। আর অধিকারবোধের চূড়ান্ত মূর্খামির পরিচয় দিয়ে চিত্রকর হয়ে উঠবে ডোরিয়ানের শয়তানির শিকার। হ্যাঁ, ডোরিয়ান শয়তান। তার শয়তানি চোখে-মুখে ফুটে ওঠে না। সেখানে সে বিশুদ্ধ পবিত্র। কিন্তু তার প্রতিকৃতি ধীরে ধীরে বুড়ো হতে থাকে। প্রতিকৃতির চিবুকে জমা হয় ক্রুরতার হাসি, আঁকা হয় ছলনার ভ্রূকুটি। ডোরিয়ান বোঝে সে কথা। আর তাই সবার অলক্ষ্যে লুকিয়ে রাখে তার আত্মপ্রতিকৃতি। শুধু মাঝে মাঝে নিশুতি রাতে চোরের মত লুকিয়ে দেখে আসে কতটা গভীর হলো শয়তানের ক্ষত। বাসিলের কাছে সে মেলে ধরে নিজেকে— each of us has heaven and hell in him, Basil.

বাসিলের জন্য কষ্ট হয়। সে সত্যি সত্যিই তার বন্ধুকে সবসময় পিওর অ্যান্ড প্যাশনেট দেখতে চেয়েছে। শেক্সপিয়ার যেমন তাঁর বন্ধুকে অমরত্ব দিয়েছের তাঁর কবিতার শরীরে— ‘‘when in eternal lines to time thou grow’st’’, তেমনই বাসিলও তার সব মেধা মনন শিল্পীসত্তা ঢেলে দিয়েছে ডোরিয়ানের প্রতিকৃতিতে। জীবনের সেরা ছবি এঁকেছে সে— I have shown in it the secret of my own soul. কিন্তু এই ছবি ডেকে এনেছে তার নিয়তি। ছবির সঙ্গে চিরতরে হারিয়ে গেছে চিত্রকর ডোরিয়ানের অন্ধ কুঠুরিতে। অবশ্য শুধু চিত্রকর কেন, চিরযৌবন প্রত্যাশী ডোরিয়ানও শেষে মাথা কুটে মরেছে এই ছবির সামনে। ছবির ডোরিয়ান শ্লেষে ও বিদ্রূপে ভরিয়ে তুলেছে রক্তমাংসের ডোরিয়ানকে, বাধ্য করেছে আত্মাহুতিতে।

প্রথম প্রকাশিত ‘দ্য পিকচার অব ডোরিয়ান গ্রে’-র শিরোনাম পৃষ্ঠায় অলংকৃত লিপি।

ভাবতে অবাক লাগে একশো বত্রিশ বছর আগে প্রকাশিত একটি বই এখনও আলোচনার কেন্দ্রে থেকে যেতে পারে। নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দেওয়ার যে অভিযোগকে কেন্দ্র করে ঝড় উঠেছিল একসময় তা থামার লক্ষণ কোথায়! অথচ আশ্চর্য, আর একটিও উপন্যাস লেখেননি অস্কার ওয়াইল্ড। হয়তো অভিমানে, হয়তো প্রয়োজন বোধ করেননি। আসলে তাঁরই তো এই সোচ্চার ঘোষণা— all art is useless.

কভার: অস্কার ওয়াইল্ডের ‘দ্য পিকচার অব ডোরিয়ান গ্রে’-র পাণ্ডুলিপি।

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty − 18 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »