Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

রাশিয়া ভ্রমণ: বিজন সাহা

ভ্রমণবিহীন ভ্রমণকাহিনি

বি জ ন  সা হা

উত্তর গোলার্ধে বিশেষ করে রাশিয়ায় গ্রীষ্ম মানেই কোথাও বেরিয়ে পড়া। লোকজন সাধারণত দক্ষিণমুখী হয়। আমি নিজে পছন্দ করি পুরনো রুশ শহর ভ্রমণ করতে যেসব জায়গা থেকে শুরু হয়েছে আজকের রাশিয়া। বহুল আলোচিত গোল্ডেন রিংয়ের শহরগুলো ভ্রমণ করা হলেও উত্তরের শহরগুলোয় এখনও যাওয়া হয়নি। গুলিয়া পছন্দ করে দক্ষিণে গরম এলাকায় যেতে। তাই আমার আর হয়ে ওঠে না উত্তরের শহরগুলোয় যাওয়া। এবার সেদিকেই যাচ্ছি। তবে প্রাথমিক পরিকল্পনা সেরকম ছিল না। আজ আমরা কোনও শহরের ইতিহাস নিয়ে কথা না বলে আমাদের ভ্রমণকে ঘিরে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনাবলি নিয়ে কথা বলব। আর শহরগুলো নিয়ে বিস্তারিত বলব পরে কোনও এক সময়ে।

২০১৯ সালের পর এই প্রথম সাঙ্কত-পিতেরসবুরগ বা সংক্ষেপে পিটার যাচ্ছি। সেবার গেছিলাম কসমোলজির ওপর একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করতে। ২০২১ সালে ক্রিস্তিনা পিটারে মিউজিক ইনস্টিটিউটে ভর্তি হলে ভেবেছিলাম এখন থেকে এদিকটায় প্রায়ই আসা হবে। মনিকা তো সুযোগ পেলেই চলে যায় পিটারে বোনের সাথে সময় কাটাতে। প্রথম দিকে আন্তন আর সেভাও যেত। তবে এসব ঘটত ক্রিস্তিনা যখন বাসা ভাড়া করে থাকত। সেকেন্ড ইয়ারে ও হোস্টেলে চলে গেলে সেই যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। শুধু মনিকা যায় আর থাকে হোটেল বা বাসা ভাড়া করে। ইনস্টিটিউট শেষ করে ক্রিস্তিনা হোস্টেল ছেড়ে আবার বাসায় উঠলে গুলিয়া গেছিল ২০২৫-এর হেমন্তে। আমি সিরিয়ালে সবার শেষে। আসলে, আমার কোথাও যাওয়া মানে হয় কনফারেন্সে যাওয়া, নয়তো কোথাও গবেষণাপত্র উপস্থাপন করতে না হয় কারও ডিফেন্সের পরীক্ষক হয়ে। ক্রিস্তিনা অনেক দিন থেকেই বলছে যেতে। অনেক সুন্দর সুন্দর স্পট ওর জানা আছে ছবি তোলার জন্য। তাই ভাবলাম পিটারে কোনও ইনস্টিটিউটের বন্ধুদের সাথে গবেষণার ব্যাপারে যোগাযোগ না করে এমনিতেই চলে যাই। কারণ কোনও ইনস্টিটিউটের আমন্ত্রণে যাওয়া মানে আমার ইনস্টিটিউট থেকে অফিসিয়ালি যাওয়া। সেক্ষেত্রে ঘোরাফেরায় রেস্ট্রিকশন থাকে, মানে সেটা করতে হয় কাজের বাইরে। প্ল্যান ছিল ঘুরে বেড়ানো আর বাংলাদেশি বন্ধুদের সাথে দেখা করা। পার্থ বলেছে দেখা করতে ও সময় দিতে পারবে। পল্লব ছিল উদমুরতি। ও শুক্রবার ফিরেই দেশে চলে যাবে। দিয়ানা চেষ্টা করবে দেখা করতে। মানব দিল্লিতে, আমেরিকার পথে।

গুলিয়াকে বলতেই বায়না ধরল আমার সাথে যাবে। সেভা এল কুকুরদের রাখাল বালক হয়ে। গুলিয়া যাওয়ার সুবিধা-অসুবিধা দুই আছে। অসুবিধা হল, ওকে সেভা বা আন্তনের সাথে কথা বলতে হয় যেন কুকুরদের দেখভাল করে। কেবলমাত্র ওরা রাজি হলেই গুলিয়া যেতে পারে। এমনকী আমি বাসায় থাকলেও বাইরে যাওয়ার জন্য ওকে ছেলেদের সাথে কথা বলতে হয়। আমি কুকুরদের দেখাশোনার জন্য যোগ্য ব্যক্তি নই। আর ওর সাথে যাবার পজিটিভ দিক হল, গুলিয়া কোথাও যাওয়া মানেই বিভিন্ন এক্সারশন। দুবনা থেকেই আমরা সেসব ঠিক করে টিকেট কিনে নিলাম। তবে এখানেও ক্রিস্তিনা যাবে কি যাবে না, গেলে কবে পারবে সেটা জেনেই টিকেট কাটতে হল।
সোমবার সারাদিন ক্রিস্তিনা আমাদের সময় দেবে, ঘুরবে আমাদের নিয়ে পিটারে। মঙ্গলবার তিনজনে যাব প্রাচীন শহর পস্কোভ, পেচোরা আর ইজবোরস্ক। বুধবার ভেলিকি নভগোরাদ। এখান থেকেই রিউরিক বংশের শুরু। কিয়েভেরও আগে। ক্রিস্তিনা ওখানে দু’বার গেছে অভিনয় করতে। ও একটা থিয়েটারের সাথে মাঝে মাঝে কাজ করে। তাই যাব আমরা দু’জন। বৃহস্পতিবার যাব ভালাআম বা ভালাম। এটা লাদোগা হ্রদে একটি দ্বীপপুঞ্জ। সবচেয়ে বড় দ্বীপে আছে এক মনাস্তেরি। যাব স্পিড বোটে, বিভিন্ন দ্বীপ ঘুরে ঘুরে। আমি আসলে এরকম একদিনের ট্রিপ খুব পছন্দ করি, বিশেষ করে প্রাচীন রুশ শহরগুলোতে। ছবি তুলব। এজন্যই তো যাওয়া।

ইজবোরস্ক দুর্গের ধ্বংসাবশেষের সামনে।

২৩ আগস্ট ২০২৬ রবিবার রাতের ট্রেনে আমরা পিটার রওনা দিলাম। ট্রেন চলছে ঝিক ঝিক শব্দে। গুলিয়া নীচের সিটে, আমি উপরে। উপরের সিটের ভাড়া কম। কেন জানি না। মনে হয় উপরের স্লিপিং বার্থ থেকে পড়ে গিয়ে কেউ যদি হাড়গোড় ভেঙে ফেলে সেটা ভেবে রেল কোম্পানি আগে থেকেই চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা যাত্রীর হাতে ধরিয়ে দেয়। আমার ঘুমের সমস্যা ছোটবেলা থেকেই। তবে ট্রেনে আর প্লেনে আমি খুব ভাল ঘুমাই।
ল্যাবে বসে আছি। বিভিন্ন যন্ত্রপাতি এদিকে-সেদিকে। নাতাশা কী যেন করছে। ও আমার কলিগ। মনে হয় এটা ভার্সিটির প্র্যাক্টিক্যাল করার ল্যাব। পাশে যে ছেলেটি বসে আছে, ও মনে হয় দুবনায় হাসপাতালে কাজ করে। তেষ্টা পেয়েছে প্রচণ্ড। কীভাবে যেন জল আটকে গেছে গলায়। না পারছি গিলতে, না উগরে ফেলতে। অথচ সবার ঘরে ফেরার পালা। এমন সময় ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম ভাঙতেই বুঝলাম তেষ্টা পেয়েছে। কোনও রকমে রুকস্যাক থেকে জলের বোতলটা বের করে কয়েক ঢোঁক জল গিললাম। চারিদিকে নিঃশব্দ। হঠাৎ মনে হল শবেরা ছড়িয়েছিটিয়ে আছে এদিক-সেদিক। নীচে মেয়েদের শব, উপরে ছেলেদের। কখনও নিশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ, নাকের কনসার্ট। না ঠান্ডা, না গরম। এয়ার কন্ডিশনার কাজ করছে। যাতে গুমোট পরিবেশের সৃষ্টি না হয় তাই মাঝেমধ্যে এয়ার কন্ডিশনার একটু বেশি শব্দ করছে। আমার শরীরটাও অনেকের শরীরের সাথে পড়ে আছে। আমি উপর থেকে সব দেখছি। বিশাল এক অজগর নিথর দাঁড়িয়ে আছে। পৃথিবী দুই হাত দিয়ে তাকে জাপটে ধরেছে যেন ও যেতে না পারে। চাকার গড়িয়ে যাবার শব্দ। অজগর-রূপী ট্রেনটা চলতে শুরু করল। এতগুলো মানুষকে পেটের মধ্যে পুরে ও যাচ্ছে সেন্ট পিটার্সবার্গে, পিটারে। একটা ঘোরের মধ্যে বেশ কিছু সময় কাটল। যখন ঘুমটা একেবারেই ছেড়ে গেল, শরীরটাকে নীচে নামিয়ে চললাম বাথরুমের দিকে। সারি সারি মানুষের দেহ। ওদের আত্মারা মনে হয় এখন তারার দেশে বা স্বপ্ন রাজ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাথরুম থেকে ফিরে সন্তর্পণে উপরে উঠে গেলাম। আরও চার ঘণ্টা মরে থাকব বলে।

২৪ আগস্ট সকালে এসে পিটার পৌঁছলাম। সাড়ে সাতটায় আসার কথা। সাড়ে ছয়টার দিকে কন্ডাক্টর বলে গেলেন সবাই যেন প্রস্তুতি নেই। দেখলাম বাথরুমের সামনে লাইন। তাই বসে বসে লিখেছিলাম। কিছুক্ষণ পরে গ্রিন লাইট জ্বলে উঠল। গেলাম টুথ ব্রাশ করতে। হাতে তখনও বেশ সময়। হঠাৎ ট্রেন থামল। ভাবলাম পিটারের আগে কোন স্টেশন। আমি নিশ্চিন্ত মনে দাঁত ঘষে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ পরে বেরিয়ে দেখি যাত্রীরা নেমে যাচ্ছে। গুলিয়া একটু রাগ রাগ ভাব নিয়ে আমার অপেক্ষায়। কোনও কিছু গোছানো হয়নি। কিন্তু ট্রেন ব্যাটা যদি আগে চলে আসে আমি কী করব? অবশ্য ট্রেন যে আগে এসেছে সেটাই বা বলি কী করে, আমি নিজেই লিখতে গিয়ে যে সময় ভুলে যাইনি, সেটাই বা কে জানে?

এর আগে অবশ্য মস্কো থেকে আসার সময় আরেক ঝামেলা। স্টেশনে এসে দেখি আমাদের ট্রেন ছাড়বে চার নম্বর পথ থেকে। বেলগোরাদ-পিটার এই ট্রেনে আমরা উঠব মস্কো থেকে। টাইম টেবিলে লেখা ২১.১৩ ও ২১.২৮। আমাদের ট্রেন ২১.২৮-এ। আমার কেন যেন মনে হল, ২১.১৩-তে আরও একটা ট্রেন যাবে। আমরা পরেরটায় যাব। মনেই হল না যে, দূরপাল্লার ট্রেন এটা, মেট্রো নয় যে প্রতি দুই-তিন মিনিট পর পর যাবে। লোকজন ট্রেনে উঠছে। আমি ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। ২১.২৮-এর ট্রেনের জন্য। গুলিয়া বারবার বলছে ট্রেনে উঠতে। আমি বলছি, এটা আমাদের ট্রেন না। গুলিয়া বলেই যাচ্ছে। বিরক্ত হয়ে লাইনে দাঁড়ানো লোকদের জিজ্ঞেস করলাম এটা পিটার যাচ্ছে কি না, গেলে কখন। বলল এটা ২১.২৮-এ পিটার যাবে। লাগেজ নিয়ে গেলাম আমাদের বগিতে। তবে কিছুতেই বুঝতে পারলাম না ঝামেলা কোথায়।

নভগোরাদ ক্রেমলিনের সফিস্কি সাবর।

আমরা এসে নামলাম লাদোঝস্কায়া স্টেশনে। এখান থেকে মেট্রোতে যেতে হবে উদেলনায়া। সেখানেই ক্রিস্তিনা থাকে। মেট্রো থেকে বেরিয়ে ক্যাপুচিনো খেলাম। ক্রিস্তিনা থাকে ৫১ নম্বর বাড়িতে। কফি খেলাম ২১ নম্বরে। আমার জানা মতে রাস্তায় দাঁড়ালে হাতের ডান দিকে যদি জোড় নম্বর থাকে তা হলে সামনের দিকটা হবে ভাটি, মানে সেদিকে বাড়ির নম্বর বাড়তে থাকবে। আর বিজোড় সংখ্যা থাকলে উল্টো, মানে সামনে উজান, নম্বর কমবে। আমি সেভাবেই হাঁটতে শুরু করলাম। কিন্তু তারপরেও একটু সন্দেহ হচ্ছিল ঠিকমতো যাচ্ছি কি না। কিছু দূর গিয়ে দেখলাম এক লোক কুকুর নিয়ে ঘুরছে। কুকুর দেখেই বুঝলাম স্থানীয়। তাকে জিজ্ঞেস করলে বললেন উল্টো দিকে যেতে হবে। মহা মুস্কিল। গুলিয়ার রাগ এখন জ্বরের আকার ধারণ করেছে। ও ইতিমধ্যে ক্রিস্তিনাকে ফোন করেছে। ওকে ছাড়া আর এক পাও এগুবে না। ক্রিস্তিনা এলে ওকে প্রথমে মস্কোয় ট্রেনে ওঠা আর পিটারে সবার শেষে ট্রেন থেকে নামার গল্প শোনাল। এতক্ষণে আমি অবশ্য শুভঙ্করের ফাঁকি ধরতে পারলাম। টাইম টেবিলে দুটো সময়ের প্রথমটা ছিল ট্রেন লাইনে দেবার বা বেলগোরাদ থেকে মস্কো এসে পৌঁছুনোর সময়, দ্বিতীয়টা ছাড়ার।

ক্রিস্তিনা একটা বৌদ্ধমন্দির ঘুরিয়ে আমাদের নিয়ে গেল পার্কে। ওখানে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে সেন্টারে ফিরে ক্যাথলিক চার্চ ঘুরে দুপুরের খাবার সেরে নিলাম। সারাদিন হাঁটতে হাঁটতে শেষে যখন ফান্তানকা আর নেভস্কি প্রসপেক্ট ধরে যাচ্ছি, তখন খেয়াল করলাম পিটারে মস্কোর ঠিক উল্টোটা, মানে সামনের দিকে তাকালে ডান হাতে যদি বিজোড় নম্বর থাকে তা হলে সামনে হবে ভাটি। যত এগিয়ে যাবে বাড়ির নম্বর তত বাড়বে। হতেই পারে। এটা তো আর ফিজিক্সের থিওরি নয় যে, সব দেশে সব শহরে এক রকম হবে। কত অজানারে। আসলে, জীবনে শিখতে হলে ভুল করতে হয়। হোঁচট না খেলে উঠে দাঁড়ানো যায় না। এরপর ক্রিস্তিনা আমাদের রেখে চলে গেল রিহার্সালে। এই সময়টা আমরা দু’জনে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘুরে বেড়ালাম পিটারের রাস্তায়। তবে পিটার মানেই বিশাল মিউজিয়াম। বিশেষ করে সেন্টারে। যেদিকেই তাকাও শুধু ঐতিহাসিক বাড়িঘর। অনেক আগে হয়তো এখানে বিভিন্ন বিপ্লবীদের পায়ের শব্দ শুনতে পেতাম। এখন আর বিপ্লব স্পন্দিত বুকে নিজেকে লেনিন মনে হয় না। ঘণ্টা দুয়েক পরে ক্রিস্তিনা ফিরে এল। আরও একটু ঘুরে, বাজারঘাট সেরে আমরা বাসায় ফিরে গেলাম।

২৫ আগস্ট ছিল ট্রিপের দ্বিতীয় দিন। সারা দিন পিটারের বাইরে। সকাল ৬.০০ প্লোসাদ ভস্তানিয়ায় (অভ্যুত্থান চত্বর) বাস অপেক্ষা করবে। এত সকালে মেট্রো কাজ করে না তাই ট্যাক্সি ডাকা। ড্রাইভার মধ্য এশিয়ার। কথা বলতে বেশ পছন্দ করে। সকালের ফাঁকা রাস্তা। তারপরেও আধ ঘণ্টা লাগল। বড় শহরের এই সমস্যা। হাঁটুর কাছ থেকে বুকে আসতেই দম বেরিয়ে যায়। ট্যাক্সি থেকে নেমে আমাদের বাসের খোঁজে যাচ্ছি। হঠাৎ খেয়াল হল রুকস্যাক ফেলে এসেছি। ট্যাক্সি বুকিং দিয়েছিল ক্রিস্তিনা। বললাম ফোন করতে।
—কোথায় ফোন করব? আমার কাছে তো নম্বর নেই।
এক কথায় মা-মেয়ে বুঝিয়ে দিল দোষটা আমার। কিন্তু ব্যাগ হারালে আমার দোষ কেন? কেন ব্যাগ দায়ী নয়। তবে সবচেয়ে বড় কথা ক্যামেরার ব্যাগ আমার সাথে। ওখানে ই-বুক, পাওয়ার ব্যাংক আর কিছু খাবার। তাই ফ্যাটাল কিছু নয়। কী মনে করে যেখানে ট্যাক্সি থেকে নেমেছি সেখানে গেলাম, যদি এখনও দাঁড়িয়ে থাকে! ওই রকম এক ট্যাক্সি দেখে আশ্বস্ত হলাম, যদিও এটাই যে আমাদের গাড়ি সে ব্যাপারে নিশ্চিত নই। আমাকে দেখে ড্রাইভার দরজা খুলে বলল,
—আমি গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ ব্যাগটা দেখে ফিরে এলাম। চেষ্টা করছিলাম ফোন করতে।
অনেক ধন্যবাদ দিয়ে ব্যাগ নিয়ে চলে এলাম। এমন কাজ আমার নতুন নয়। আগে প্রায়ই মস্কো বা দুবনাগামী কোনও প্রাইভেট কারের চালকের সাথে দুবনা-মস্কো করেছি। একবার ই-বুক রেখে চলে গেছি। বিভিন্ন ব্যস্ততায় মনেই ছিল না ই-বুকের কথা। কয়েক দিন পরে সেই লোক ফোন করে বলল,
—আপনার ই-বুক আমার গাড়িতে ফেলে গেছেন। কবে, কোথায় পৌঁছে দিতে পারি?
আসলে, বেশিরভাগ মানুষ এরকম না হলে আমার টেকাই কষ্ট হত।

পেচোরা ছেলেদের মনাস্তেরি।

বাসে উঠে নতুন ঝামেলা। এক্সকার্শনে বেশ কিছু আইটেম নিজেদের আলাদা করে কিনতে হবে। সেজন্য ভদ্রমহিলা টাকা তুলছেন। এমনকী খাবারের জন্যেও। তারা খাবারের কী এক আইটেম ঠিক করেছে। সেটা খেতে হবে। দাম ৮০০ রুবল করে। আমার তো মেজাজ খারাপ। সাধারণত বলে দেয় এই এই ক্যাফে বা রেস্টুরেন্ট আছে। আমরা যেন নিজেরাই ঠিক করে নেই।
—আচ্ছা, এই ভ্রমণে আপনাদের দায়িত্বটা কী? তাছাড়া আমার গাইডের কথা শোনার কোনও ইচ্ছা নেই। এসেছি ছবি তুলতে। আমি কী করব?
এদেশে খুব কম মানুষই প্রতিবাদ করে। তাই ভদ্রমহিলা খুশি হয়নি।
—আপনি আপনার মতো করে ঘুরতে পারেন।
ক্রিস্তিনা আর গুলিয়া আমার ওপর নাখোশ। ওদের বললাম,
—তোমরা যেতে চাও যাও। আমি আমার মতো করে দেখব।
তারপর গাইডকে বললাম,
—ঠিক আছে আমি যাব না। ওরা যাবে। কত লাগবে?
—এগারোশো রুবল।
আমার কাছে নগদ টাকা নেই। ট্রান্সফার করতে পারি।
—না, আমার নগদ টাকা দরকার। তাছাড়া আপনি বিদেশি। আপনার বিদেশি ফ্যামিলি নেইম। পরে আমার ঝামেলা হবে।
—প্রথমত আমার রুশ পাসপোর্ট। আমি এদেশে ট্যাক্স পে করি।
—না, নগদ ছাড়া আমি নেব না।

আসলে, যুদ্ধ শুরু হবার পর থেকে এদেশে বেশ কড়াকড়ি। বিদেশ থেকে টাকাপয়সা পাঠালে বা বিদেশি কেউ টাকাপয়সা পাঠালে ব্যাঙ্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। কী আর করা। যদিও গায়ের রং আমার সাথে বিট্রে করেছে, কিন্তু গুলিয়া আর ক্রিস্তিনার ফ্যামিলি নেইমও সাহা। একবার রেগে বলতে চাইছিলাম যে, তোমাদের দেশের সবচেয়ে বড় প্রদেশ ইয়াকুতিয়ার স্থানীয় নাম সাহা, আর তুমি বলছ আমার বিদেশি ফ্যামিলি নেইম। যাহোক ব্যাপারটা অমীমাংসিত রয়ে গেল।

পস্কোভ এলে ভদ্রমহিলা দুঃখ প্রকাশ করলেন। বললেন কোথায় খাওয়া যাবে ইত্যাদি। পরে ক্রিস্টিনা কোত্থেকে যেন টাকা উঠিয়ে এনেছিল। ওটা দরকার ছিল পেচোরায়। ওরা এক ফাদারের বকবকানি শুনে সময় কাবার করল। আমি মনাস্তেরি চষে বেড়ালাম ছবি তুলে। ক্রিস্তিনার মনখারাপ কিছু দেখা হল না বলে। আর আমি এমনকী যে-সব জায়গায় মেরামতের কাজ চলছিল সেখানে ঢুকেও ছবি তুলে এলাম। শ্রমিকরা মধ্য এশিয়ার লোকজন, ওদের চোখে আমি রাজ কাপুর। তাই ওকে বলতেই যেতে দিল।
পেচোরা থেকে আমরা গেলাম ইজবোরস্ক। এই জায়গা সম্পর্কে সিমিয়ন আমাকে অনেক বার বলেছিল। প্রাচীন দুর্গের ধ্বংসাবশেষ। অদূরে ঝর্না আর হ্রদ। হ্রদের ঘুরে বেড়াচ্ছে রাজহাঁস— শ্বেতশুভ্র আর ধূসর, তাদের ঘিরে আছে অসংখ্য পাতিহাঁস। পস্কোভ, পেচোরা আর ইজবোরস্ক ঘুরে আমরা যখন বাসায় ফিরলাম তখন প্রায় বারোটা বেজে গেছে। আগামীকাল ক্রিস্তিনা আমাদের সাথে যাবে না। ও যাবে কাজে। তবে আমাদের খুব ভোরে উঠতে হবে।

সাঙ্কত-পিতেরবুরগ স্মলনি সাবর।

মঙ্গলবার মানে ২৬ আগস্ট আমাদের প্রোগ্রাম ভেলিকি নভগোরাদ, আধুনিক রুশ দেশের জন্মস্থান। এখানেই রিউরিক রাজবংশের গোড়াপত্তন করেন স্থানীয় রুশদের আহ্বানে। পরে কিয়েভ থেকে ভ্লাদিমির, সুজদাল হয়ে মস্কোয় স্থিত হয়ে বসেন তাঁর বংশধররা। তাই ফর্মালি কিয়েভকে রুশ দেশের মা বলা হলেও শুরুটা এই নভগোরাদ থেকেই। পরে ভোলগা তীরে যখন নভগোরাদ নামে আরও একটি শহর স্থাপিত হয় তখন ওটা নিঝনি বা ভাটির নভগোরাদ আর এটা ভেলিকি বা গ্রেট নভগোরাদ হিসেবে পরিচিতি পায়।

গতকাল বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত ১২টা পেরিয়ে গেছে। তাই সাড়ে পাঁচটায় এলার্ম যখন বাজল তখন কিছুতেই উঠতে ইচ্ছা হচ্ছিল না। কিন্তু….
ভেবেছিলাম যে ৭.১৫-তে কাজানস্কি সাবোরের ওখান থেকে বাসে উঠব, তবে মেট্রো নেভস্কি প্রসপেক্টে আসতে আসতে ৭.১০, তাই চলে গেলাম মেট্রো মস্কোভস্কায়া। হাতে মিনিট দশ বারো সময় আছে। এদিকে বাথরুম চেপেছে। এই ভোরে পাবলিক টয়লেট খোলা নেই, ভ্কুসনা ই তোচকা মানে ম্যাকডোনাল্ড দূরে। মুস্কিল। ওখানে যে রেস্টুরেন্টটা তাও বন্ধ। একটা দরজা খোলা, মনে হয় কাজের লোকদের। নক করে বললাম, বাথরুম না করলেই নয়।
—সামনে এগিয়ে গিয়ে বাঁদিকের দরজা।
কাজ শেষে ওকে ধন্যবাদ দিয়ে স্পটে ফিরে এলাম। বাস চলে এল। গুলিয়া আর আমি বাসে উঠলাম। সকাল মনে হল সুপ্রসন্ন! মাঝখানে যাত্রা বিরতি। আমার প্রিয় আইটেম। ধীরেসুস্থে ক্যাপুচিনো খেয়ে যখন বাসে ফিরলাম লোকজন খাপ্পা। যদিও তিন মিনিট মাত্র লেট। গুলিয়া গতকালের পর বলে দিয়েছে,
—আবার যদি তর্ক করো তা হলে আমি বাস থেকে নেমে হাঁটা দেব।
খুব ভাল এক সুযোগ ছিল ওকে বনবাসে পাঠাবার। তবে আজকাল চারিদিকে ভালুকের উৎপাত। ভূরিভোজন করবে ভালুক আর ফল ভোগ করব আমি। এটা তো হতে দেয়া যায় না। তাই কথাগুলো গিলে ফেললাম।
গাইড মেয়েটি বলেই দিল কেউ একজন দেরি করলে সমস্ত গ্রুপকে পস্তাতে হয়। সেটা যেন মাথায় রাখি। এসব দেখে বুঝলাম সকালের সূর্য যে সবসময় সারাদিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয় না। তবে প্রতিবার আমি সবার শেষে বাসে ফিরি সেজন্য সবাই তো ধন্যবাদ দিতে পারে যে, ওদের লাস্ট ম্যান হতে হচ্ছে না। কাঠের তৈরি বাড়িঘর দেখে যখন ফিরলাম, বাস নেই। আসলে, গাইড নাকি বলেছিল গাড়িটা অন্য জায়গায় থাকবে। আমি কখনওই কারও কথা শুনি না। ও ভাবে আমি রুশ বুঝি না। আসলে, আমি যে নিয়ম মেনে চলতে পারি না সেটা ওকে বলি কীভাবে? অবশ্য যদি ওর কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনতাম নিজে নিজে ঘুরে আরও অনেক কিছু দেখতে পারতাম। এমনকী সবশেষ স্পট থেকে যখন পিটার ফিরব, শেষ মুহূর্তে আমার মনে হল কিছু একটা খাওয়া দরকার আর শেষে নোংরাগুলো ডাস্টবিনে ফেলে আসা দরকার। তাই বাসের সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও আমি সবাইকে ধরে রাখলাম ঠিক যেমন চুল্লির পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খাবার পুড়াই। এমনি এমনি কী বলে
কয়লা ধুলে ময়লা যায় না! ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি যে ভেলিকি নভগোরাদের ক্রেমলিনের সামনে যখন এলাম তখন মনে হল যেন দিল্লির লালকেল্লার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।

Advertisement

২৭ আগস্ট আমরা গেলাম ভালাম দ্বীপপুঞ্জে। তবে প্রস্তুতি অন্যান্য দিনের মতো ছিল না। ছিল মানসিক যুদ্ধ। আসলে, গতকাল নভগোরাদ থেকে আমরা পিটার ফিরি নয়টার একটু পর পর। ক্রিস্তিনা কাজে। ফিরবে বারোটার দিকে। একথা শুনে গুলিয়া বলল এই সময়টা সেন্টারে ঘুরাফেরা করে কাটিয়ে দিতে। আমি নিজেও রাতের শহর পছন্দ করি। তবে আমার ক্যামেরার দুটো ব্যাটারির চার্জ শেষ। আগামীকাল মানে ২৭ আগস্ট সকালে আবার ভালাম যেতে হবে। তাই ব্যাটারি চার্জ করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ক্রিস্তিনা জানাল যে, ওর বান্ধবী নাস্তিয়া বাসায় আছে, ও ঘর খুলে দেবে। তাই আমি বাসায় ফেরার পক্ষে রায় দিলাম। তখনই বুঝলাম ঈশান কোণে মেঘ করেছে। বাসায় ফিরে যখন দেখল আমি বসে বসে নেট করছি তখন রাগের কিছুটা বহিঃপ্রকাশ ঘটল। যাত্রার আগে ক্যামেরার ব্যাটারি চার্জ করা যে খাওয়া বা টয়লেট-বাথরুম করার চেয়েও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটা কে কাকে বোঝায়! তবে গুলিয়া শুধু পাসপোর্ট চেয়ে নিল আর শুক্রবার বিকেল ছয়টার টিকেট কিনে ফেলল মস্কো যাবে বলে।

পস্কোভ ক্রেমলিন।

ভালাম যেতে গাড়িতে উঠলাম বাসা থেকে দুই স্টেশন পরে। তাই ধীরেসুস্থে প্রস্তুতি নিয়ে ওখানে হাজির। সকালে উঠেই আমার বেশ কিছু ওষুধ খেতে হয়। যার ফলে ঘনঘন বাথরুম। প্রসপেক্ট প্রস্ভেশেনিয়া গিয়ে দেখি পাবলিক টয়লেট তখনও বন্ধ। ৬০ রুবল বেঁচে গেলেও আমার নিজের বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভবের পর্যায়ে চলে গেল। ফার্স্ট স্টপেজ আড়াই ঘণ্টা পরে। শেষের দিকে অবস্থা এমন দাঁড়াল যে, গুলিয়া আমার হাতে দুটো প্যাকেট ধরিয়ে দিল। যদি বেগতিক দেখি সিট ভেজানোর চেয়ে প্যাকেট ব্যবহার অনেক প্র্যাগমাটিক। আসলে, হাইওয়েগুলো এমন যে, চাইলেই গাড়ি থামানো যায় না।

আমাদের দ্বিতীয় স্টপেজ ছিল ছিল কারেলিয়ার বিভিন্ন জ্যাম, হাল্কা অ্যালকোহল ইত্যাদি টেস্ট করার ও কেনার দোকানে। আসলে, স্টপেজগুলো হয় হয় কোনও পেট্রোল পাম্পে অথবা ক্যাফেতে। সেখান থেকে আমাদের যেতে হবে সারতাভালা। অনেক দিন পরে নতুন করে পুরনো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম। হঠাৎ গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়লে পাশে বসা ক্রিস্তিনাকে জিজ্ঞেস করলাম,
—কী ব্যাপার?
—কাস্টমস। এখান দিয়ে এশিয়া, আফ্রিকা, আরবের অনেক ছেলেমেয়ে ফিনল্যান্ড ও স্ক্যান্ভিনাভিয়া যায়। ওদের জন্য এই চেকপোস্ট।
আমি সবে বলতে যাচ্ছিলাম যে, আমাকেও ডাকবে, ঠিক তখনই আমাদের গাইড কিরিল বলল,
—বিজন, আপনার ও ফ্যামিলির অন্যদের পাসপোর্ট নিয়ে বাইরে আসুন।
আমি পাসপোর্ট অফিসারকে দিলাম।
—আপনি কোত্থেকে আসছেন?
—মস্কো থেকে।
পাসপোর্টে আমার ঠিকানা চেক করে জিজ্ঞেস করলেন,
—আপনি কার সাথে যাচ্ছেন।
—আমি কারও সাথে যাচ্ছি না।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কিরিল বলল,
—ওর সাথে স্ত্রী ও মেয়ে যাচ্ছে।
অফিসার আমার পাসপোর্ট ফেরত দিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেলেন।
কিরিল হয়তো ভেবেছিল আমি অফিসারের প্রশ্ন ঠিকমতো বুঝতে পারিনি। পরে আমি নিজেও ভেবে দেখলাম, ও ঠিক। আসলে, রুশ ভাষায় তুমি কার সাথে যাচ্ছ আর কে তোমার সাথে যাচ্ছে প্রায় একই অর্থ বহন করে, মানে তোমরা কে কে যাচ্ছ। অফিসারের কথা শুনে আমার মনে যে ছবিটি উঁকি মেরেছে তা হল— আমি ওদের নিয়ে আসিনি, ওদের ঘাড়ে চড়ে যাচ্ছি। এটা বাংলার উত্তরাধিকার।

সারতাভালা এসে অনেক দিন পরে কয়লার ট্রেন দেখলাম। সেই নস্টালজিক ইঞ্জিন, সেই চুরুট টেনে ধোঁয়া ছাড়া, সেই হুইসেল। এটা মনে হয় ট্যুরিস্টদের জন্য স্পেশালি করা। সারতাভালা থেকে স্পিডবোটে গেলাম ভালাম। আমার ধারণা ছিল বোট জার্নি বাস জার্নির চেয়ে স্মুথ হয়। কিন্তু ক্যাপ্টেন মাঝে মাঝে এমন ঝাঁকুনি দিল যে, আমি বলেই ফেললাম— তোমার নৌকার নীচে মনে হয় পাথর পড়েছে। সবাই হেসে উঠল।

লাদোগা হ্রদের ক্ষুদ্র দ্বীপপুঞ্জ।

ভালাম বলা চলে রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র। একসময় ফিনল্যান্ড রুশ সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। ভালাম-সহ কারেলিয়া ছিল ফিনল্যান্ডের অন্তর্ভুক্ত। অক্টোবর বিপ্লবের পর ফিনল্যান্ড স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৩৯-১৯৪০ সালে ফিনল্যান্ড সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলে রেড আর্মি কারেলিয়া দখল করে। সোভিয়েত সরকার ধর্মপালনে বাধা দেবে ভেবে ভালামের সাধুদের অনেকেই হেলসিঙ্কি পালিয়ে যায় ও সেখানে নির্বাসনে ভালামের শাখা গঠন করে। সেটা এখনও কর্মরত।

সোভিয়েত আমলে এখানে লোকজন মানবেতর জীবন যাপন করত। পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে সোভিয়েত সরকার এখানে এক মিউজিক ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করে। ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া থেকে নামকরা শিল্পীরা এতে অংশগ্রহণ করেন। উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমা বিশ্বকে দেখানো যে, সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সংস্কৃতি পাশাপাশি হাঁটে। এরপর ভালামে তেমন কোনও পরিবর্তন হয়নি, শুধু কিছু সাধুর ব্যক্তিগত চেষ্টায় কিছু কাজকর্ম চলতে থাকে। সে-সময় অনেক যুদ্ধাহত সেনাদের এখানে পাঠানো হয়। লোকচক্ষুর আড়ালে, সভ্যতা থেকে দূরে। ঈশ্বর ছিল তাদের শেষ আশ্রয়। তাঁদের পরিচয় ছিল সামোভার হিসেবে। সামোভারের যেমন হাত-পা নেই, এসব যুদ্ধাহত লোকজনদেরও তেমনি বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছিল না।

সোভিয়েত ইউনিয়নে পতনের পর, এমনকী পেরেস্ত্রোইকা শুরুর পর সমাজের সাথে সাথে ভালামেও পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে পায়। নব্বইয়ের দশকে সাঙ্কত পিতেরবুর্গ বা পিটারে মেয়র অফিসে কাজের করার সময় থেকেই ভ্লাদিমির পুতিন ভালামের দিকে নজর দেন। প্রেসিডেন্ট হবার পর ভালামে যারা ছোট ছোট খুপরি ঘরে গাদাগাদি করে থাকত, তাদের নতুন ফ্ল্যাট দিয়ে সারতাভালায় নিয়ে যান। এমনকী কেউ কেউ দরকষাকষি করে পিটারে ফ্ল্যাট আদায় করে নেয়। পাশাপাশি, তিনি ভালামকে ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেন। রুশ অলিগারখ রোমান আব্রামোভিচ তাঁকে যে ইয়ট উপহার দেন, সেটি ভালাম মনাস্তেরিকে দান করেন যেটা এখনও ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে। ২০১২ সালে এখানকার সাধুরা ইতালি থেকে ভাল পনির তৈরির কৌশল শিখে আসে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ইউরোপ থেকে বিভিন্ন জিনিসপত্র রপ্তানি বন্ধ হলে দেশের বিভিন্ন ফার্মের পাশাপাশি ভালামও এগিয়ে আসে। এখন এটা শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়, একটি সফল ও উন্নত মানের খামার। আশপাশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামের লোকের কর্মসংস্থানের প্রধান কেন্দ্র। ভালাম সম্পর্কে আমার এত কিছু জানা মাক্সিমের কাছ থেকে। ও ১০ হাজার রুবলের বিনিময়ে দুই ঘণ্টা আমাদের দ্বীপ ঘুরে দেখিয়েছে গাড়িতে করে। নিজে গ্রুজিয়া বা জর্জিয়ার রাজধানী ৎবিলিসি থেকে, তবে কথা শুনে জর্জিয়ান বা গ্রুজিন মনে হয় না। ওর কথায় জর্জিয়ান অ্যাকসেন্ট নেই। বলল ওর মা রুশ, তাই ওর কথা এমন। ও এখানে গাইড হিসেবে কাজ করে। মনাস্তেরির নিজস্ব অটোমোবাইল পার্ক, অনেকগুলো লঞ্চ, পশুপাখির ফার্ম ও জমিজমা আছে, সেই আয়েই এরা চলে। আর ট্যুরিস্ট তো আছেই। মাক্সিম আমাদের দিয়ে গেল জর্জিয়ান চার্চে। ওটা বন্ধ ছিল। আমার হাতে চাবি দিয়ে চার্চ খুলতে বলল। কাঠের গির্জা। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। সবচেয়ে অবাক করা এর অ্যাকোস্টিক সিস্টেম। একবার ভেবেছিলাম ক্রিস্তিনাকে বলি কিছু একটা গাইতে। তবে কী মনে করে যেন আর বলা হল না।

ভালামের স্পাসো-প্রিয়োব্রাঝেনস্কি সাবর।

স্পিডবোটে আমাদের ক্যাপ্টেন ছিল ইগর। সারতাভালা ভালাম সারতাভালা আর মাঝে শ্খেরস্কি রায়ন, মূল ভূখণ্ডের পাশে ছোট ছোট দ্বীপ। ওর একটায় নেমে হেঁটে বেড়ালাম। আর সবার শেষে ছিল ক্রেপস্ত কারেলা বা কারেলা দুর্গ। আমার ফটোগ্রাফার বন্ধুরা অনেকেই ভালাম এসেছে। আলেগ তো এখানে বছরে কয়েক মাস থাকে। আমি এসে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলাম, পাইনি। আগে ছবিতে দেখতাম ভালাম আর লাদোগার সৌন্দর্য। বাস্তবে ও আরও বেশি সুন্দর। ইগর পিঙ্ক ফ্লয়েডের ‘উইশ ইউ অয়ার হিয়ার’ বাজাল। এই মিউজিক আমার জানা দেখে ক্রিস্তিনা অবাক হল। বলল যে, ও ভাবেনি আমি পিঙ্ক ফ্লয়েড শুনতাম। অথচ ছাত্রজীবনে এটা আমার সবচেয়ে প্রিয় গ্রুপ ছিল। আমিও ধারণা করিনি যে, ক্রিস্তিনা পিঙ্ক ফ্লয়েড শোনে। ও তো ক্ল্যাসিকাল মিউজিক নিয়ে থাকে। যদিও শুরু করেছিল পিয়ানো আর ভায়োলিন দিয়ে, তবে এখন ভোকাল শিখে ও শেখায়। আর অপেরা গায়।

আমাদের পিটারের বাইরের এক্সকারশন এভাবেই শেষ হল। প্রথম দিন আমাদের গাইড ছিল ইউলিয়া, যার সাথে আমার কথা কাটাকাটি হয়েছিল। দ্বিতীয় দিন তাতিয়ানা। আর তৃতীয় দিন কিরিল। খেয়াল করলাম, মেয়েরা একদিকে যেমন বেশি দায়িত্বশীল হয়, তেমনই হয় নার্ভাস। কেউ একটু দেরি করলেই ওরা অস্থির হয়ে যায় আর এ থেকেই সব সমস্যা। কিরিল ঠিক উল্টো। শুরুতেই বলল, আপনারা দেখতে এসেছেন, মন ভরে দেখে যান। যদি কিছু জানতে চান জিজ্ঞেস করবেন। আর আমি যখন বাস চলে তখন এসব জায়গা সম্পর্কে আপনাদের ধারণা দেব। ওর সেন্স অফ হিউমার দারুণ। পথে আমাদের কারেলিয়া ভাষার কিছু শব্দ শেখাল, গান শোনাল। লখিকেট নামে ট্রাউট মাছ ও দুধের এক ডিসের বিজ্ঞাপন দিল। আমরা সবাই সেটা টেস্ট করলাম। ১৯৯৭ সালে ভুবনেশ্বর থেকে পুরী যাওয়ার পথে দুধ ও কাঁচা মরিচের একটি পানীয়ের পর দুধ-মাছ ছিল আরেক এক্সোটিক খাবার। আমি এমনিতেই মাছ পছন্দ করি না। ভয়ে ছিলাম, বাসে বমি করে না দেই। না, সেরকম কিছু ঘটেনি।
শুক্রবার সকালে উঠেই গুলিয়া চলে গেল। স্টেশনে লাগেজ রেখে সারাদিন ঘুরে বেড়াবে। মনে হয় কোনও সিটি ট্যুর নেবে। এছাড়া ওর পছন্দ নৌকাভ্রমণ। সাঁতার কাটতে পারে না, কিন্তু নৌকা দেখলেই চড়তে হবে। বৌরা রাগ করলে একটা সুবিধা আছে। তা হলে তুমি স্বাধীন। ইচ্ছেমতো ঘুরতে পারো। কেউ তোমাকে বাধা দেবে না, তোমার প্ল্যান প্রোগ্রামে বাগড়া দেবে না। আমি চলে গেলাম পিটার ঘুরতে। কাজানস্কি সাবর, খ্রাম স্পাস না ক্রোভি, মিখাইলোভস্কি পার্ক, ইসাকিয়েভস্কি সাবর, আদমিরাল তেস্ত হয়ে দ্ভরৎসোভই প্লসাদ, ঠিক হেরমিতাঝ বা শীত প্রাসাদের সামনে। মাঝে এক মেয়ে আমাকে উল্টো রাস্তা দেখাল। হয়তো সে নিজেও আমার মতো আগন্তুক। তবে তাতে ভালই হয়েছে। ও না হলে জানা হত না কোথায় ইয়েলৎসিন লাইব্রেরি, কোথায় কনস্টিটিউশন কোর্ট। পিটার আমার মতে খুব অতিথিপরায়ণ শহর। গতকাল টয়লেট-সমস্যার কথা বলেছিলাম। এখানে যে পরিমাণ ট্যুরিস্ট আসে সে তুলনায় পাবলিক টয়লেট একেবারেই নগণ্য। তাও আবার বেশ দামি। ৬০, ৭০, ৮০ বিভিন্ন দাম। মার্কেট ইকনমি যাকে বলে। মস্কোতেও কম নয়। তবে আগে যখন বাসে মস্কো আসতাম, ৬০ রুবল দিয়ে বাথরুমে না গিয়ে যেতাম ম্যাকডোনাল্ডে। ৫০ রুবল দিয়ে আইসক্রিম বা কফি নিয়ে বাকি কাজটাও সারতাম। সেই অর্থে আমার উল্টো কিছু রুবল লাভ হত। সেটা ভেবে এখানেও আমি একটা ক্যাফেতে ঢুকে ক্যাপুচিনো নিলাম। এখানে অবশ্য আমার লাভ হয়নি, ৬০ রুবল সাশ্রয় করতে গিয়ে ৩০০ রুবল খরচ করেছি। আর আমাকে যেহেতু বেশ কয়েকবার এই কাজটি সারতে হয়, তাই প্রতিবার ক্যাফেতে খেলে কয়েকদিনের মধ্যেই আমি ওভার ওয়েটে ভুগব। ভাগ্যিস ইসাকিয়েভস্কি সাবরের পাশেই আমি একটা পাবলিক টয়লেটের সন্ধান পেয়েছিলাম। ফলে কিছুটা হলেও সাশ্রয় করতে পেরেছিলাম।

দুপুরের পরে আমার পিটারে আসার রুটিন কাজগুলো করলাম। যুগলের মেয়ে দিয়ানার সাথে দেখা করে একসাথে লাঞ্চ করলাম। দিয়ানা ভেজিটেরিয়ান। তাই ওকেই বললাম খাবার দোকান বেছে নিতে। ও নিয়ে গেল এক এশিয়ান ফুড কর্নারে। বেশ ভালই লাগল। খাবারের মান ও পরিমাণ দুটোই বেশ। ২০১৯ সালে আমি যখন পিটার আসি, ও ছিল কাজানে। তখন কাজানেই আমার সাথে ওর দেখা হয়েছিল। দিয়ানা আর ক্রিস্তিনার কথা থেকে বুঝলাম তরুণ সমাজের একাংশ কী ভাবছে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে। জীবনের অভিজ্ঞতা কম হওয়ায় তারা যত তাড়াতাড়ি কোন পক্ষ নিতে পারে বড়রা সেটা পারে না। এটা অনেকটা পূর্ববর্তী কোনও রায় উদাহরণস্বরূপ নিয়ে অনুরূপ ঘটনার বিচার করার মতো। যার জীবনের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারে উদাহরণ যত কম তার বেছে নেবার ও বিচার করার অপশন তত কম। দিয়ানাকে বিদায় দিয়ে গেলাম স্মলনি গির্জায়। এটা ছিল আমার মাস্ট আইটেমের একটি। অপূর্ব সুন্দর এই গির্জাটি। সেখানে পার্থ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। ও ১৯৮৪ সালে মানে আমার এক বছর পরে সোভিয়েত ইউনিয়নে এসেছে, শুরু থেকেই পিটারে। আমাদের কথা মানেই পুরনো স্মৃতি, পুরনো বন্ধুদের গল্প। না, হাড্ডি কচলাইনি কারও। হয় ভাল না হলে কিছুই না। মৃত লোকদের সম্পর্কে একথা বলে। আমরা জীবিতদের ওপর প্রয়োগ করে দেখি কী দাঁড়ায়। খুব ভাল লাগল ওদের সাথে দেখা করে। আসলে, পৃথিবীর লোক বেড়ে ৮ বিলিয়ন হয়েছে, কিন্তু প্রাণ খুলে কথা বলার মানুষের খুবই অভাব।

২০১৯ সালে যখন পিটার আসি পল্লব আমাকে স্টেশনে পৌঁছে দেয়। গল্প করতে করতে প্রায় ট্রেন ফেল করার অবস্থা। তবে এবার পার্থ সেটা হতে দিল না। বলল, ও দাচায় যায়নি আমাকে রাতের পিটার আর সেতু খোলা দেখাবে বলে। আসলে, আমি যখন ওদের রেখে ছবি তুলতে গেছি গির্জার ভেতরে, ও আর ক্রিস্তিনা মিলে ঠিক করেছে যেভাবেই হোক আমাকে রেখে দেবে। তাই টিকেট ফেরত দিতে হল। ক্রিস্তিনা আমাদের নিয়ে গেল তরুণদের আড্ডায় সেভক্যাবলে। ফিন সাগরের তীরে আগে এখানে ছিল ক্যাবল তৈরির বিশাল কারখানা। সমস্ত সোভিয়েত ইউনিয়নে এরা ক্যাবল সরবরাহ করত। শুক্রবার রাতের ডিসকোটেকা। শত শত তরুণ তরুণী নাচছে মিউজিকের তালে তালে। মাইকেল জ্যাকসনের ‘ব্যাড’ আর অন্যান্য কিছু পপুলার গানের কম্বিনেশন। মনে পড়ে গেল নিজের ছাত্রজীবনের কথা। প্রতি শনিবার নাচতে যেতাম। তবে সেই সময় মিউজিক ছিল অন্যরকম। পার্থ গাড়িতে সেই সময়ের মিউজিক অন করল। আমরা যেন সেই আশির দশকে ফিরে গেলাম।
পার্থ আমাদের প্লভ সেন্টারে খাবারের ব্যবস্থা করল। এরপর অরোরা ওদিকটায় ঘুরে গেলাম কুনৎস কামেরার ওখানে সেতু উত্তোলন দেখব বলে। ২০১৯ সালে সেতু উত্তোলন দেখেছিলাম নদীর উল্টো দিক থেকে, মেদনি ভসাদনিক নামে পিটার দ্য গ্রেটের স্ট্যাচুর ওখানে দাঁড়িয়ে। সাথে আরও ছিল পল্লব আর মানব। সেবার ওটা ছিল আইডিয়াল জায়গা। কেননা সেটা ছিল জুন মাস, শ্বেত রাত্রি। তাই সূর্য অস্ত যায় না, আর ব্রিজ খোলার কিছুক্ষণ পরে সূর্য ওঠে পেত্রো-পাভলভস্কি ক্রেপস্তের ওখানে যা এখন আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি নদীর সেদিকটায়। সেতু উত্তোলন সামারে পিটারের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। রাত ১টা ১০ মিনিট থেকে একে একে ৭টি ব্রিজ তুলে দেয় লাদোগা হ্রদ থেকে ফিন সাগরে ও উল্টোপথে কার্গো জাহাজ চলাচলের জন্য। সোভিয়েত আমলে সকাল ৬টা পর্যন্ত ব্রিজগুলো খোলা থাকত, তাই কেউ অন্য দ্বীপের বাসিন্দা হলে তাকে অপেক্ষা করতে হত ভোর পর্যন্ত। এখন রাত দুটোর দিকে কিছু সময়ের জন্য ব্রিজ নামিয়ে দেয় মানুষের যাতায়াতের জন্য। নেভার দুই তীরে হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমায় এই দৃশ্য দেখতে। তবে জুনে শ্বেত রাত্রির দিনগুলোয় এর আকর্ষণ একেবারেই ভিন্ন। পিটার বেশ কিছু দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। ক্রিস্তিনা ও পার্থ থাকে দুই ভিন্ন দ্বীপে। তাই যাতে সকাল পর্যন্ত আটকে থাকতে না হয় পার্থ আমাদের বাসায় পৌঁছে দিয়ে চলে গেল নিজের ডেরায়। প্রথমে ভেবেছিলাম শনিবার রাতের ট্রেনে মস্কো ফিরব আর দিনের বেলায় গাতচিনা যাব। ক্রিস্তিনা বলল ও নিজেও গাতচিনা যেতে চায়, তবে আজ ওর কাজ। তাই ভেবে দেখলাম, ক্রিস্তিনা কাজে থাকবে, চাবি নিয়ে সমস্যা। আমি বরং সকালের ট্রেনেই ফিরে যাই। এতে একটা সুবিধা হল। পিটার থেকে মস্কো পর্যন্ত রাস্তার দুই ধার দেখতে দেখতে চলে এলাম। মনিকা এসেছিল স্টেশনে। পিটার থেকে ওর জন্য একটি ঘড়ি কিনেছি। আসলে, মনিকাই কিনেছে মিশার জন্য। আমি শুধু ক্যারি করেছি। ওকে ঘড়িটা দিয়ে চললাম দুবনার পথে। পেছনে রয়ে গেল অনেক স্মৃতি। সাথে হাজার দুয়েক ছবি। এখন বসে বসে সে-সব এডিট করতে হবে। আর ছবি এডিট করতে গিয়ে আবার মনে পড়বে পিটার, পস্কোভ, পেচোরা, ইজবোরস্ক, ভেলিকি নভগোরাদ আর ভালামের অবিস্মরণীয় স্মৃতি। মনে পড়বে দিয়ানা আর বিশেষ করে পার্থের কথা।

সকালে তাড়াহুড়ো করে খেতে পারিনি, ভেবেছিলাম স্টেশনে এসে কিছু কিনব। কিন্তু আবার সেই একই সমস্যা, কোনও মতে ট্রেন ধরা। প্রায় আট ঘণ্টার জার্নি। ওখানে নুডলস জাতীয় কী একটা পাওয়া যাচ্ছিল। আমার ইচ্ছে ছিল সাথে আখরোট নিয়ে যাওয়া, গুলিয়া বলেছিল দরকার নেই। এখন ওটা খুব মিস করছিলাম। দুবনা ফিরে ব্যাগ থেকে সব নামাতে নামাতে যখন ভাবছিলাম গুলিয়াকে বলব আখরোটের কথা, তখনই ব্যাগের পকেটে আখরোট, চা, বিভিন্ন চকলেটের সন্ধান পেলাম। হ্যাঁ, ভুলে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমার জুড়ি নেই।

[লেখক গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ। শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো]

°°°

চিত্র: লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seven + thirteen =

Recent Posts

রথীন চক্রবর্তী

ইউক্রেন ভ্রমণ: রথীন চক্রবর্তী

ইউক্রেনে প্রথম দু’টি রাত র থী ন  চ ক্র ব র্তী যাক, শেষপর্যন্ত ইউক্রেনের মাটিতে পা রাখা সম্ভব হল! ভিসা পাওয়ার জন্য কলকাতায় নিজের অফিস

Read More »
তরুণ সিংহ মহাপাত্র

তরুণ সিংহ মহাপাত্রের বিশেষ রচনা

‘দ্বিতীয় শ্রীক্ষেত্র’ বারিপদায় সুভদ্রার রথ টানেন মহিলারা ত রু ণ  সিং হ  ম হা পা ত্র বারিপদা ‘দ্বিতীয় শ্রীক্ষেত্র।’ বারিপদার রথযাত্রা ওড়িশার দ্বিতীয় বৃহত্তম। প্রাচীনত্ব,

Read More »
বিজন সাহা

রাশিয়া ভ্রমণ: বিজন সাহা

ভ্রমণবিহীন ভ্রমণকাহিনি বি জ ন  সা হা উত্তর গোলার্ধে বিশেষ করে রাশিয়ায় গ্রীষ্ম মানেই কোথাও বেরিয়ে পড়া। লোকজন সাধারণত দক্ষিণমুখী হয়। আমি নিজে পছন্দ করি

Read More »
ফৌজিয়া সিরাজ

ফৌজিয়া সিরাজের বিশেষ রচনা

‘আমি যখন পথনাটক করেছি তখন কিন্তু পথনাটককে ঘিরে উৎসাহ যেমন দেখেছি, তেমন জনপ্রিয়তাও দেখেছি। এখন যদি পথনাটক দেখতে মানুষের উৎসাহের অভাব দেখা যায়, তা হলে আমার ধারণা, নাটকের বিষয় নির্বাচন বা উপস্থাপনায় কোনও গন্ডগোল হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যে আঙ্গিকগত পরিবর্তনটা থাকা দরকার সেটা থাকছে না। পথনাটক নাটক নয় বা লোকে আকর্ষণ বোধ করে না— এ-সব যুক্তি মানতে আমি একেবারেই রাজি নই।’

Read More »
হাঁসুলী মিত্র

হাঁসুলী মিত্রের কবিতা

হাঁ সু লী  মি ত্র ইংরাজ কবিদের স্মরণে কবি, কবে তুমি লিখেছিলে— যে কবিতা আমি আজ পড়ি! যে কবিতা তোমার আমার পরিচয়। আমি তোমার জীবনকালের

Read More »
আবু রাইহান

আবু রাইহানের বিশেষ নিবন্ধ

জীবনানন্দ থেকে বিনয় আ বু  রা ই হা ন বিশ্বের সব দেশের সাহিত্যকর্মে অগ্রজদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। সাহিত্যের অন্যান্য শাখার তুলনায় সূক্ষ্মতম মাধ্যম কবিতায়

Read More »