পথনাটকের দিশারী পানু পাল
ফৌ জি য়া সি রা জ
‘এতদিন পরে ‘ওদের’ আমার কথা মনে পড়ল?’ ক্ষোভে, দুঃখে, অভিমানে যেন ফেটে পড়লেন তিনি। আমি নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম ওঁর দিকে তাকিয়ে। অপার বিস্ময় আমার চোখেমুখে। ইনিই কি সেই পানু পাল? যাঁকে দেখব বলে, যাঁর নিজের কথা শুনব বলে আবেগতাড়িত হয়ে আমি ছুটে এসেছি এই বোশেখ মাসের ভরদুপুরে? মুমূর্ষু এক মানুষ। শীর্ণকায়। তবু দারিদ্র্য তাঁর ব্যক্তিত্বকে ক্ষুণ্ণ করেনি এতটুকুও। কোনও রকমে ধুঁকতে ধুঁকতে কথাগুলি বলে চুপ করে গেলেন। আমি শুধু বললাম, ‘স্যর, সেই কথাই তো শুনব বলে এসেছি। আপনি শান্ত হোন। বিশ্রাম নিন। পরে সব বলছি।’ আয়া মহিলাটি বেডের নীচ থেকে একটি টুল বার করে আমায় বসতে দিল।
সময়টা ছিল ১৯৯৩ সালের মে মাস। ভারতীয় গণনাট্য সংঘের পঞ্চাশতম বর্ষপূর্তি। কলকাতা-সহ পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন জেলায় যখন নানা পরিকল্পনা চলছে উদযাপনের, ঠিক তখনই হঠাৎ একদিন ‘আজকাল’ পত্রিকার একটি পাতায় আমার দৃষ্টি চরম উৎসুক্যে থমকে দাঁড়াল। সংবাদটি ছিল, কলকাতার আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ফ্রি বেডে চরম উপেক্ষিত পানু পাল। কোনও বেড নম্বর পর্যন্ত ছিল না।
ওই বছরেই আমি রবীন্দ্রভারতীর নাট্য বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে ড. বিষ্ণু বসুর তত্ত্বাবধানে গবেষণার কাজ শুরু করি। আমার গবেষণার বিষয় ছিল, ভারতীয় গণনাট্য আন্দোলন নবপর্যায় (১৯৫২-১৯৯২)। একটা বড়সড় কাজ। বছর খানেক পরে আমি আর সম্পূর্ণ করতে পারিনি নানা কারণে। এবং নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে উৎসর্গ করেছি থিয়েটারে।
আজকাল-এর খবরটি পড়ে ড. বিষ্ণু বসু আমায় ডেকে পাঠালেন। ডাক পেয়ে গেলাম ঠিকই, কিন্তু তখনও পর্যন্ত বুঝতে পারিনি কেন এমন জরুরি তলব। আমি বাসায় যেতেই স্যর বললেন, ‘ফৌজিয়া, আজ সকালে মৃণালদা (মানে মৃণাল সেন) ফোন করে একটা খবর দিলেন যে, পানুদা নাকি আর জি কর হাসপাতালে urinary tract infection নিয়ে ফ্রি বেডে ভর্তি আছেন। কোনও বেড নম্বর পর্যন্ত দেওয়া নেই। হঠাৎ মনে হল তোমার কথা। ডা. সিরাজ তো ওই হাসপাতালেই কর্মরত তাই না? সঙ্গে সঙ্গে তোমায় ফোন করলাম। দ্যাখো যদি পানুদাকে খুঁজে বার করে একটা কথোপকথন করে নিতে পারো, তা হলে পরবর্তী কালে তোমার গবেষণার কাজে লাগবে।’ একটানা এতগুলো কথা বলে স্যর থামলেন। আমি কথা দিলাম আপ্রাণ চেষ্টা করব বলে। কারণ এ-কাজে তো আমার নিজের স্বার্থও জড়িত।
গণনাট্যের আঙিনায় আমি বেড়ে উঠেছি। তাই পানু পাল নামটির সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছিল শৈশবে। বাবার নাট্যদল ‘উত্তর সারথি’র জন্ম আসানসোলে। সেখানে পানু পালের ‘বিচার’ নাটকটি বেশ কয়েকবার মঞ্চস্থ হয়েছিল মনে আছে। আমি তখন খুব ছোট। নাটকটির বিষয়বস্তু সেভাবে মনে নেই। তবে নাট্যকারের নামটি শুনেছি বহুবার। অর্থাৎ গণনাট্য সংঘ, পানু পাল ও পথনাটক— এই ত্রিমুখী বিষয় সম্পর্কে আমার মোটামুটি একটা পরিচয় ছিল।
মনের মধ্যে একটা উত্তেজনা কাজ করছে। কীভাবে মানুষটির সন্ধান পাওয়া যায়। অতবড় একটা হাসপাতাল— ওয়ার্ড নম্বর, বেড নম্বর কিছুই জানা নেই। শুধু রোগের নামটুকু ভরসা।
ওই সময় আর জি কর মেডিক্যাল কলেজে ডেপুটি সুপারিন্টেন্ডেন্ট পদে নিযুক্ত ছিলেন আমার স্বামী ডা. সৈয়দ আহাসান সিরাজ। তাঁর সহায়তা ছাড়া কীভাবে যে মানুষটিকে খুঁজে পেতাম জানি না। আসল কথা, পানু পালের যে পোশাকি একটা নাম ছিল, সেটা একেবারে অশ্রুত। আর সেই কারণেই তাঁকে খুঁজে পেতে সময় লাগল। উনি যে পূর্ণেন্দুশেখর পালচৌধুরি নামে ভর্তি হয়েছেন, সেটা আমরা কেউই জানতাম না। ঠিক তিনদিন লেগেছিল তাঁকে খুঁজে বার করতে। হাসপাতালের মেট্রন, সিস্টার, ওয়ার্ড-বয়— সবাইকে বলে ডা. সিরাজ খোঁজ লাগালেন। প্রতিটি বিল্ডিংয়ে প্রতিটি ওয়ার্ড ঘুরে ঘুরে অবশেষে তৃতীয় দিনে Male Surgical ward-এ তাঁর সন্ধান পাওয়া গেল। Urinary Tract infection রোগে আক্রান্ত ছিয়াত্তর বছরের বৃদ্ধের হদিশ মিলল। তৃতীয় দিনে ডা. সিরাজ ওই ওয়ার্ডে ‘পানু পাল কে আছেন’, এইভাবে ডাকাডাকি করতে দেখেন অতবড় ওয়ার্ডটির ভেতরের দিকে একটা কর্নারে বেডের ওপর একজন শীর্ণকায় মানুষ তাঁর ডান হাতটি তুলে বসে আছেন। উনি ছুটে গিয়ে তাঁর হাতটা চেপে ধরেন। রোগক্লিষ্ট মানুষটিতে তখন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছেন। মাথার কাছে যে বেড হেড টিকিট রয়েছে, সেখানে লেখা আছে— ‘শ্রী পূর্ণেন্দুশেখর পালচৌধুরি’।

ডা. সিরাজ তাঁর সঙ্গীদের যখন পানু পালের পরিচয় দিচ্ছেন, তখন আর সেই মানুষটির চোখের জল বাঁধ মানেনি। উনি অনেক সান্ত্বনা দিয়ে তাঁকে আশ্বস্ত করলেন। এও বললেন, ‘আগামী কাল আমার মিসেস আসবে স্যর আপনার কাছে।’
আমি যে ক’দিন তাঁর কাছে গেছি, সে সময় কোনও visiting hours ছিল না। দুপুরে ওঁর খাওয়াদাওয়ার পর যখন একটু বিশ্রাম নিতেন, সেই সময় আমি তাঁর কাছে হাজির হতাম।
পানু পালের সামনে দাঁড়িয়ে যখন নাটক, রাজনীতি, নির্বাচন, পথনাটক এ-সব নিয়ে কথা শুরু করি, তখন লক্ষ্য করি, নিছক টিকে থাকার দৈনন্দিন জীবনযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত জরাজীর্ণ বৃদ্ধের স্মৃতি এতটুকুও মলিন হয়নি। চোখেমুখে এক উজ্জ্বলতা আমাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করেছিল। গণনাট্য সংঘ, বিশ্বযুদ্ধ ও তারপরের রাজনৈতিক অবস্থা, নিজের নাটক লেখা, অভিনয়, নাচ— সবই মনে আছে। সেই সময় এরকম একজন অশক্ত অসুস্থ মানুষকে নানা প্রশ্নে উত্তেজিত করা অনুচিত জেনেও আমি তাঁকে বেশ কয়েকদিন ধরে বিরক্ত করেছি। তবে আমার মনে হচ্ছিল, ওঁর মধ্যে এতটুকু বিরক্তির লেশমাত্র ছিল না। তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তাঁর জীবনের কথাগুলি বলেছিলেন। শুধু তাই নয়, আমি যখন যেতাম উনি বেশ আগ্রহ নিয়েই আমার সব কথা শুনতেন ও উত্তর দিতেন। ক্যাথেটার লাগানো অবস্থায় বসতেও কষ্ট হত, তবু ওই অবস্থায় সিস্টার পিঠে একটা বালিশ দিয়ে বসিয়ে দিতেন। আমি বারবার বলতাম, ‘স্যর, আপনার কোনওরকম অসুবিধে হলে আমায় বলবেন, আমি থেমে যাব।’ শেষের দিকে ওঁর আগ্রহই আমাকে বেশি উৎসাহিত করেছিল। ওঁর নিশ্বাস-প্রশ্বাসের দীর্ঘ ওঠানামায় একরাশ কথা কাগজে-কলমে ধরে রাখার চেষ্টা করেছি মাত্র। খাপছাড়া এলোমেলো সেই সমস্ত টুকরো লেখাগুলোকে জুড়ে বাংলা থিয়েটার ও থিয়েটারের এক অসম্ভব দায়বদ্ধ ধ্রুপদী মানুষের কথা ওঁর নিজের জবানিতে বলার চেষ্টা করেছি।
এ লেখা কোনও পূর্ণ সাক্ষাৎকার বা প্রবন্ধ নয়। এমনকী কোনও বড়সড় তাত্ত্বিক প্রবন্ধের খসড়াও নয়। বরং এ লেখাকে বলতে পারি টুকরো কথায় ধরে রাখা একটা ভীষণ সময়ে একজন বিপন্ন শিল্পীর নিজস্ব উপলব্ধি আর সৃষ্টির কোলাজ। ওঁর জীবদ্দশায় লেখাটি প্রকাশ করতে পারলে খুশি হতাম। সত্যি কথা বলতে কী, কোনও সুযোগ হয়নি। কোনও যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। আমি অনুতপ্ত। তবে দেরিতে হলেও যে মূল্যবান সম্পদ আমার কাছে গচ্ছিত ছিল, সামান্য হলেও অন্তত কয়েকজন মরমী মানুষের সঙ্গে সেই সম্পদ ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ এসেছে এটুকুই আমার সান্ত্বনা। আমি কৃতজ্ঞ।
সাবেক পূর্ববঙ্গ, অধুনা বাংলাদেশের রংপুর জেলার গাইবান্ধা শহরে ১৯১৯ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। মা প্রিয়বালা দেবী আর বাবা হেমন্তকুমার পাল। নাটকের প্রতি তাঁর আগ্রহ বংশগত। বাবা শখের অভিনয় করতেন। ছেলেবেলায় বাবাকে ‘কর্ণার্জ্জুন’ নাটকে কর্ণের ভূমিকায় অভিনয় করতে দেখে খুব উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত হন।
নিজেই বলতে শুরু করলেন, ‘অল্প বয়সে ‘তরুণ নাটকের দল’ নামে একটা সংগঠন তৈরি করে নিয়মিত নাট্যচর্চা শুরু করি। নাচ শিখেছিলাম। আসলে, ওটা আমার জন্মগত। তাই নাটকের মধ্যে নাচও ব্যবহার করতাম।’
এরই মধ্যে একজন সিস্টার এসে একটা injection দিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ চুপ হয়ে থাকলাম দু’জনেই। বললাম, ‘স্যর, এখন না হয় থাক।’ উনি বললেন, ‘না, না, আমার কোনও অসুবিধে হচ্ছে না।’ তারপর আবার আগের কথার রেশ ধরে বলতে থাকলেন, ‘নাটক তো চলছিলই। তার সঙ্গে সঙ্গে রংপুর কিষাণসভায় কাজ করতাম। নিজেকে মনে হত ‘A Person of Agriculture to Culture’। সন্ধেবেলা একটা গোয়ালঘরে বসে নানা ধরনের গানবাজনা চলত। আমি অনেক কিছু ওখানেই সংগ্রহ করি। একটা গানের প্যারোডি করেছিলাম। যৎসামান্যই মনে আছে— ‘ডাঙ্গর বধুয়া তুই ঘোরাবার বালুচর/ সেই কয়তর আনিয়া দিল আন্ধার নিশাকালে রে…’ ইত্যাদি। ওঁর জড়ানো উচ্চারণে আমি ঠিকমতো বুঝতে পারলাম না। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করতে সাহস হল না। কী জানি যদি বিরক্ত হন।
‘আগেই বলেছি নাচ জানতাম। নাট্যচর্চা নৃত্যচর্চা একসঙ্গেই চলছিল। বুলবুল চৌধুরীর সঙ্গে তখন নানা জায়গায় নাচ, গান, নাটক এ-সব করে বেড়াতাম। কিষাণসভার সূত্রেই রাজনীতির আঙিনায় আসা। নাটকের মধ্যে দিয়ে কমিউনিস্ট মতাদর্শ প্রচার করার একটা উদ্দেশ্য তখন থেকেই আমার নাটকগুলোতে থাকত। নাটক শুধুমাত্র নাটক হবে, একটা বিনোদনের উপকরণ হবে, তাতে একেবারেই Political Content থাকবে না, এ-রকম নাটক আমার একেবারেই পছন্দ ছিল না। সেরকম নাটক আমি কোনওদিনই করিনি।
এই নিয়ে বাবার সঙ্গেও আমার অনেক মনোমালিন্য ছিল। বাবা আমার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে তখন রঙপুরের চার্জে ছিলেন সরোজ মুখোপাধ্যায়। একবার কিষাণ সম্মেলনে উনি আমার একটা নাচের অনুষ্ঠান দেখেন। ওই প্রযোজনা দেখে উনি আমাকে কলকাতার শ্রদ্ধানন্দ পার্কে ফ্যাসিবিরোধী লেখক শিল্পী সংঘের যে সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল, সেই সম্মেলনে আমায় আসতে বলেন। এই ঘটনার পরই আমি কলকাতার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মহলে ক্রমশ পরিচিত হতে থাকি ও গণনাট্য সংঘ তৈরি হলে তাতে যোগ দিই। বুঝতে পারলাম গণনাট্য সংঘের সঙ্গে আমি সম্পূর্ণভাবে জড়িয়ে পড়েছি।’
একটু থামলেন। একজন attendent এসে একটু ঘুরিয়েফিরিয়ে বসিয়ে দিল। আমিও ব্যাগ থেকে জলের বোতলটা বার করে একটু জল খেয়ে নিলাম। বাইরে প্রচণ্ড গরম। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, সাড়ে তিনটে প্রায় বাজে। চারটের মধ্যে উঠে পড়তে হবে। কারণ visiting hours শুরু হবে। এইভাবে টানা কয়েকটা দিন আমি হাসপাতালে আসা-যাওয়া করতাম। মিনিট দশেক চুপ করে থাকার পর বলতে শুরু করলেন, ‘চল্লিশের শুরুতেই সারা ভারতের পরিস্থিতি একেবারে অগ্নিগর্ভ। সর্বস্তরের মানুষ তখন জনসংগ্রামে সামিল হয়েছে। বাঁচতে হবে লড়াই করে। আপস করে বাঁচা যাবে না, এটা মানুষ তখন বুঝতে শিখেছে। কাল ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও ভাবনাচিন্তায় ওলটপালট হচ্ছে।
শ্রদ্ধানন্দ পার্কে যে অনুষ্ঠানের কথা বললাম, সেই অনুষ্ঠানেই মঞ্চস্থ হল বিজন ভট্টাচার্যের ‘জবানবন্দি’ নাটক। রঙপুরে ‘মহাবুভুক্ষা’ নামে যে নৃত্যনাট্যটা সরোজবাবু দেখেছিলেন, সেইটাই এই অনুষ্ঠানে করলাম। খবরটা জনযুদ্ধে বেরোতে আমার কথা অনেকে জানতে পারলেন। রঙপুরে ফেরার আট-দশদিন পরেই কমিউনিস্ট নেতা ভবানী সেনের টেলিগ্রাম এল ‘Send Panu Pal immediately। বিজয়ওয়াড়া যেতে হয়েছিল। টিকিট ছিল মাদ্রাজ পর্যন্ত। ১৯৪১ সাল থেকেই আমি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। পুরো সময়টাই দিচ্ছি সাংস্কৃতিক সংগঠনের কাছে।
১৯৪৪ সাল। বোম্বাইতে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সম্মেলন। এই সম্মেলনে জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, বিজন ভট্টাচার্য, চিম্মোহন সেহানবীশের মতো বিদগ্ধজনদের সঙ্গে আমিও গেলাম বেঙ্গল স্কোয়াডের হয়ে অনুষ্ঠান করতে। ‘হাঙ্গার ডেথ’, ‘জবানবন্দি’ নাটকের হিন্দি রূপান্তর আর একটা নাচের ট্যাবলো খুব সাড়া জাগিয়েছিল। ‘হাঙ্গার ডেথ’ প্রসঙ্গে বম্বে ক্রনিকলস লিখেছিল, ‘For a few moments Panu Pant took the whole andience into the land of death.’ এই মহামারি নৃত্য তারপরও অনেক জায়গায় দেখানো হয়েছে।’
সেদিন এই পর্যন্ত শোনার পর ফিরে এলাম। পরের দিন ওই একইভাবে গিয়ে হাজির হই তাঁর কাছে। উনি যথারীতি প্রতিদিনের মতো বলতে শুরু করলেন—
‘এরপরই নবান্ন। পুরনোকে ভেঙে একদম নতুন একটা পরিবেশ। কিন্তু সেই জিনিসটা পরবর্তীকালে আর গড়ে উঠল না। IPTA-কে প্ল্যাটফর্ম করে অনেকেই নিজেদের অনেক কিছু করার চেষ্টা করতে লাগল।’
নাটক লেখা ও অভিনয় প্রসঙ্গে তাঁর নিজস্ব কিছু কথা— ‘১৯৪৮ সালে আমার প্রথম নাটক ‘দখল’ মঞ্চস্থ হয়েছিল। নাটকটি লেখা হয়েছিল রংপুরি ভাষায়। এই নাটকে এক অন্ধ মানুষের চরিত্রে আমি অভিনয় করেছিলাম। এরপর দিগিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পূর্ণগ্রাস’-এ অভিনয় করি। তারপর হঠাৎ করে আমি বুলবুল চৌধুরীর অনুরোধে ওঁর সঙ্গে করাচিতে চলে যাই। ফিরে আসি ১৯৫১-তে। গণনাট্য সংঘতে তখন টালমাটাল অবস্থা। একদিন সংঘে যাঁরা আমার বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন তাঁরাই আবার আমাকে দলে যোগ দিয়ে ভাঙা IPTA-র হাল ধরতে বলেন। আমি আত্মসমালোচনা করার কথা বলেছিলাম। দলের সম্পাদক বলেছিলেন, হবে। আমি আবার গণনাট্য সংঘতে যোগ দিয়েছিলাম।
১৯৫১-তেই আমি লিখলাম ‘ভাঙাবন্দর’। এই নাটকেই আমি উৎপল দত্তকে নিয়ে আসি। তবে মাত্র কয়েক মাসই তিনি নিজেকে গণনাট্য সংঘের সঙ্গে যুক্ত রেখেছিলেন। নাটকটিতে এক চোরাকারবারির ভূমিকায় উৎপল অভিনয় করতেন। আমি অভিনয় করতাম বাবার ভূমিকায়। কালী ব্যানার্জি, ঋত্বিক ঘটকও ছিলেন আমার এই নাটকে। এরপরই আমি লিখি ‘বিচার’।
নিজের লেখা নাটকের বাইরে অভিনয় করেছি ‘পূর্ণগ্রাস’, ‘জবানবন্দী’, ‘নবান্ন’ নাটকে। অভিনয় করেছি ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, রাজেন তরফদারের ছবিতে। ‘নবান্ন’ নাটকে অভিনয় প্রসঙ্গে বলে নিই যে, বিজনদার সঙ্গে ‘নবান্ন’ নাটকে অভিনয় করার করবার সৌভাগ্য আমার হয়নি। আমি ‘নবান্ন’ করেছি আলাদা করে যখন গ্রামেগঞ্জে ‘নবান্ন’র অভিনয় হত। দিগিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পূর্ণগ্রাস’-এ অভিনয় করেছি। এইসব নাটকগুলোর ঘটনাভিত্তিক আলোচনা করা আমার পক্ষে মুশকিল। এখন আমি একেবারেই অশক্ত দুর্বল। তবে একটা কথা বলব, যদি এইসব নাটককে এখন অভিনয় করাতে হয়, তা হলে সেগুলোকে আবার নতুন করে লিখতে হবে। সব নাটককেই নতুন করে সাজাতে হবে।
বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটল। বললাম, ‘স্যর, আজ অনেকক্ষণ আপনাকে কথা বলিয়েছি। আর না। আজ থাক। তাছাড়া visiting hour-এর সময় হয়ে এল। কথা বলা যাবে না। আজ বরং উঠি। কাল আবার ওই একই সময়ে আসব।’ এই বলে বেরিয়ে পড়লাম ওয়ার্ড থেকে।
পরের দিন একটু তাড়াতাড়ি পৌঁছে গেলাম। বললাম, ‘স্যর, আজ আপনার কাছে শুনব পথনাটকের প্রথম পদক্ষেপের কথা। আমার দিকে তাকিয়ে একটু ম্লান হাসলেন। তারপর শুরু হল সেই কাহিনি।
‘১৯৫২-র নির্বাচন। আমি একটা পথ খুঁজছিলাম, কীভাবে নাটক দিয়ে সাধারণের সামনে বাস্তব অবস্থার হতাশা বঞ্চনা শোষণের কথা বলব। সাধারণ বলতে আমি বোঝাতে চাইছি সেইসব অতিসাধারণ মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত মানুষ, যাঁদের সঙ্গে হয়তো নাটক বা অন্য কোনও বিনোদন মাধ্যমের তেমন কোনও প্রত্যক্ষ সংযোগই নেই। আবার দর্শকের দলে চিন্তাশীল, সচেতন মানুষত্ব থাকতে পারেন। এ-রকম পথ খুঁজতে খুঁজতেই আমার মধ্যে একদিন পথনাটকের idea-টা আসে। সাধারণ নির্বাচন নিয়ে আমি লিখলাম ‘ভোটের ভেট’। নাটকটি লেখার সময় একটু ভয়ডর নিয়েই লিখেছিলাম। পরে উৎপল দত্ত নাটকটি পড়ে খুব উৎসাহিত হলেন। ঋত্বিক ঘটকেরও ভাল লেগেছিল। নাটকটি করবার জন্য তখনকার কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক নিরঞ্জন সেনের অনুমতি পাওয়া গেল। ‘ভোটের ভেট’ মঞ্চস্থ করা নিয়ে একটা মজার গল্প বলি, শোনো। মনুমেন্ট ময়দানে নির্বাচনকে ঘিরে প্রথম বড় জমায়েতটা হবে। সভাপতি মুজফফর আহমেদ। উনি আমায় খুব স্নেহ করতেন। ওই সভায় সময় পাওয়াই মুশকিল। অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে মাত্র পঁচিশ মিনিট সময় পাওয়া গেল। নাটক শেষে যখন মঞ্চ থেকে নামছি, তখন দেখি নির্বাচন প্রার্থীদের লাইন পড়ে গেছে। কবে কাকে কতটা সময় দিতে পারব।
পথনাটকের শুরুতেই এ-রকম চাহিদা দেখে আমরা খুবই উৎসাহিত হই। একের পর এক পথনাটক করতে থাকি। ক্রমে ক্রমে এই নাটক অর্থাৎ কোনও একটা সমস্যা বা কোনও রাজনৈতিক মেসেজ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে পথের মোড়ে মোড়ে নাটক অভিনয়ের এই ধারাটা ক্রমশ লোকপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। আমিও একের পর এক নাটক লিখতে থাকি। ঋত্বিক ঘটক তখন সরস মন্তব্য করতেন যে, ‘বিমল ঘোষের কাছে কবিতা আর পানু পালের কাছে নাটক চাইতে গিয়ে কেউ নিরাশ হয়নি।’
পথনাটককে পোস্টার ড্রামা বলতে তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানালেন। বললেন, ‘পথনাটককে আমি পোস্টার ড্রামা বলতে রাজি নই। পথনাটক হচ্ছে একধরনের একাঙ্ক নাটিকা। এটা সোচ্চার অভিনয়। এই অভিনয়ের জন্যও বারবার দিনের পর দিন রিহার্সাল দিতে হয়। মঞ্চনাটকের সঙ্গে তফাত খুঁজতে চাইলে বলা যায় যে, তফাতটা কেবলমাত্র আঙ্গিকগত। আমি যখন পথনাটক করেছি তখন কিন্তু পথনাটককে ঘিরে উৎসাহ যেমন দেখেছি, তেমন জনপ্রিয়তাও দেখেছি। এখন যদি পথনাটক দেখতে মানুষের উৎসাহের অভাব দেখা যায়, তা হলে আমার ধারণা, নাটকের বিষয় নির্বাচন বা উপস্থাপনায় কোনও গন্ডগোল হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যে আঙ্গিকগত পরিবর্তনটা থাকা দরকার সেটা থাকছে না। পথনাটক নাটক নয় বা লোকে আকর্ষণ বোধ করে না— এ-সব যুক্তি মানতে আমি একেবারেই রাজি নই।’
‘একজন নাট্যকর্মীর আদর্শ কী হওয়া উচিত, এ বিষয়ে আপনার কী মতামত।’
বললেন, ‘আমি যেমন একদিকে নাট্যকর্মী, তেমনই রাজনৈতিক দলেরও কর্মী। এভাবেই আমার নাট্যচর্চাটা শুরু হয়েছিল। নাটকের মধ্যে দিয়ে আমরা পার্টির অর্থাৎ কমিউনিস্ট আদর্শের কথাই বলতে চেয়েছিলাম। পার্টির আদর্শের কথা ভাবতে গিয়ে আমরা নিজেদের কথা, সাংসারিক সুখস্বাচ্ছন্দ্যের কথা কখনও ভাবিনি। নিজেকে সবসময়েই একজন দায়বদ্ধ রাজনীতি-সচেতন শিল্পকর্মী বলেই মনে করেছি। চরম দুঃখ কষ্ট অবহেলার মধ্যে দিয়ে জীবনটা কেটেছে। পার্টি কখনও ভাবেনি যে আমাদের মতো শিল্পকর্মীদের, অভিনেতাদেরও একটা সংসার আছে। আদর্শের কথায় আমার যা বলবার তার প্রায় সবটাই গণনাট্য সংঘকে ঘিরে। অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করেছেন যে, গণনাট্যর আদর্শ সার্থক না ব্যর্থ। আমার বক্তব্য ব্যর্থ তো নয়ই, হয়তো বলা যায় নেগেটিভলি সার্থক। আজ পাড়ায় পাড়ায় যে নাটক সম্পর্কে উৎসাহ, গ্রুপ থিয়েটারের এত দল গড়ে উঠেছে এর ভিত্তি তো গণনাট্য সংঘই।
গণনাট্য-উত্তর পর্বে গ্রুপ থিয়েটারের অনেক দল তৈরি হয়েছে এটাও যেমন ঠিক, তেমন এটাও ঠিক যে, গণনাট্য সংঘের আদর্শের ভিত্তিকে ব্যাপকভাবে বাংলার জনসাধারণের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়নি। একথাটা বলছি এই জন্যে যে, প্রকৃতপক্ষে কলকাতার চৌহদ্দির মধ্যেই তাদের ক্রিয়াকলাপ সীমাবদ্ধ। শহরের সীমানাকে ভেঙে অনেকদূর পর্যন্ত আদর্শটাকে ছড়ানো হয়নি, সে-রকম করে দর্শকসমাজ তৈরি করা যায়নি। কিন্তু যাত্রার জগৎ এই বিরাট দর্শকসমাজের কাছে পৌঁছতে পেরেছে। যাত্রা মধ্যযুগীয় ভাবধারাকে মানুষের সামনে তুলে ধরে একটা অদ্ভুত মনোভাবের সৃষ্টি করেছে। গণনাট্যর আদর্শ এই শ্রোতৃবর্গের কাছে পৌঁছে তাঁদের ভাবনাকে বদল করতে পারেনি। অর্থাৎ, আদর্শে প্রচারের সীমানাটা আমরা বাড়াতে পারিনি।’ শেষ করলেন তাঁর বক্তব্য। শেষ হল আমাদের এই ক’দিনের কথোপকথন। অনেক কিছু জানলাম, শিখলাম। চরম দারিদ্র্য তাঁর ব্যক্তিত্বকে এতটুকু ক্ষুণ্ণ করতে পারেনি। হাসপাতালের ফ্রি বেডে যে রোগক্লিষ্ট অশক্ত মানুষটিকে আমি দেখেছি, তাঁকে জীবনের শেষলগ্নে পৌঁছেও আমার আশাবাদী বলেই মনে হয়েছে। এই ঘটনার পর উনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাবার পরেও প্রায় বছর দুয়েক বেঁচে অর্থাৎ টিকে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে এই সামান্য ক’টা দিনের সংযোগে এক যেটা আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে, সেটা হল তাঁর আদর্শবাদিতা। একটা মানুষ জীবনের শেষ মুহূর্তে এই কপর্দকহীন জীবনটার দিকে তাকিয়েও কখনও আদর্শভ্রষ্ট হননি। নিজের মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে জীবনের সুখের উপকরণগুলোকে কিনতে চাননি। জানি না জীবনের কাছে এই ত্যাগ, এই আদর্শের মূল্য কতটা।
আদর্শের প্রশ্নে ইউরোপের সমাজতন্ত্রে বিপর্যয়ের প্রেক্ষিতে বলা ওঁর নিজের বিশ্বাসকে তুলে ধরা সব থেকে প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়েছে। পানু পালের বিন্যাস ‘সভ্যতার পরিণতি’ অবশ্যই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত হবে। গণনাট্য সংঘ এই শ্রেণির সচেতনতা বিস্তারে কাজ করতে চেয়েছিল। ভাঙা গলায় বলা ক্ষীণ কণ্ঠের প্রতিটি কথার মধ্য দিয়ে পানু পালের এই ভাবনাটাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে বারবার।
আমাদের দুর্ভাগ্য ওঁর মতো মানুষকে সঠিক মূল্যায়ন করতে পারিনি। তাঁর আশাকে পূর্ণ করতে পারিনি। তাই বারবার আমাদের ঔদ্ধত্য নত হয় তাঁর আদর্শের কাছে। সেদিন হাসপাতালের বেডে শায়িত মানুষটিকে প্রণাম করতে পারিনি। তাই আজ তাঁর উদ্দেশ্যে নতজানু হয়ে বলি— ‘কমরেড, সেদিন পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে পারিনি আপনাকে। তাই আজ অন্তরের গভীর শ্রদ্ধাসহকারে সেলাম জানাই— লাল সেলাম কমরেড আপনাকে।
চিত্রঋণ: ছৌ নৃত্যশিল্পী মধুমিতা পাল। তিনি সম্পর্কে পানু পালের নাতনি। এবং নাট্যকারের কনিষ্ঠ পুত্র পলাশ পাল।





