Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

নুশান জান্নাত চৌধুরীর ছোটগল্প

রাত-জ্বলা পোকা

নু শা ন  জা ন্না ত  চৌ ধু রী

।। ১ ।।

দক্ষিণে, শিরাজের তখত নিয়ে জান্দ আমিরদের নিজেদের ভেতর কামড়াকামড়ি। উত্তর থেকে বারবার নেমে আসছে কাজার সর্দারের ফৌজ। ইস্পাহানের হাকিম কে, শহরের লোক তা বছর না ঘুরতেই ভুলে যেত। সৈন্যদল বাড়ি বাড়ি হানা দিচ্ছিল, আর শহরের শিক্ষিত মানুষেরা এদিক-ওদিক কোথায় সরে যাচ্ছিল। যে ঘরগুলো একসময় সন্ধ্যায় বাতি জ্বেলে কিতাব পড়ত, সেসব ঘরেই তখন হঠাৎ রাত নামলে ছেলেপুলেদের বুকে আতঙ্ক জমে উঠত। কার ছেলে কোথায় গেল, কার সিন্দুক বাজেয়াপ্ত হল, কার নাম নতুন শাসকের লোকেরা খাতায় তুলছে, কে জানে। বড়ভাই কামাল উল্লাহ আর ছোটভাই সাদ উল্লাহ দেশান্তরের কথা ভাবেনি নিজেরা নিজেরা। কিন্তু এক রাতে সৈন্যদল পাশের মহল্লার মির্জা হাসিমের বাড়িতে ঢুকল। তারা হাসিমকে পেল না, কিন্তু তার বড়ছেলেকে ধরে নিয়ে গেল। সিন্দুক ভাঙল, কাগজ ছিঁড়ল, পুরনো চিঠি উল্টেপাল্টে দেখল। ভোরের দিকে খবর এল, মির্জা হাসিমও ধরা পড়েছে।
সেদিন রাতেই খাবার খেতে বসে নাসরুল্লাহ ছেলেদের কাছে কথা পাড়লেন। কামাল উল্লাহ বলল, ‘আমরা একা পালাতে চাই না, আব্বা, আপনিও সঙ্গে চলেন।’
বৃদ্ধ নাসরুল্লাহ কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর বললেন, ‘আমি আর আগের মতো শক্ত নেই। তোমাদের মায়ের কবর এখানে। তোমাদের দাদা, বড় দাদা, অকালমৃত বোন, সবাই এইখানে। মানুষের সব পথ একদিন মাটির নীচে গিয়ে মেশে। আমার পথ এই মাটিতেই শেষ হবে, এটাই আমার চাওয়া।’
তারপর একটু দম নিয়ে বললেন, ‘তোমাদের দু’জনকে সরিয়ে না দিলে আমার বংশই শেষ হয়ে যেতে পারে।’
কামাল উল্লাহ বলল, ‘তা হলে আমাদের কী করতে বলেন?’
বৃদ্ধ বললেন, ‘তোমরা যাবে। দু’জন একসঙ্গে যাবে, মুলতান শহরে।’
কামাল উল্লাহ একটু অবাক হয়ে তাকাল। ‘মুলতান শহরে?’
নাসরুল্লাহ মুখ নামিয়ে থালার দিকে তাকিয়ে রইলেন। বললেন, ‘আমার যৌবনে খোরাসান থেকে এক তরুণ এসেছিল, মির্জা ইউসুফ বেগ মুলতানি। তার পৈতৃক ঘর ছিল মুলতান। কিন্তু মায়ের দিকের কিছু আত্মীয় ছিল খোরাসানে। তার পিতা একসময় খোরাসানের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কাপড়, কাগজ আর আতরের কারবার করতেন। সেই সূত্রে কিছু পাওনা আর কিছু দলিল বহুদিন ধরে খোরাসানে আটকে ছিল। ইউসুফ বেগ সেই হিসাব মিটাতে খোরাসানে এসেছিল। মুলতানে ফেরার সময় তখন খোরাসান থেকে সরাসরি বিপজ্জনক পথ না ধরে মির্জা ইউসুফ বেগ ইস্পাহানের পথ ধরেছিল বড় কাফেলার সঙ্গে জুড়তে, কিন্তু কথায় আছে না— বান্দা তদবির করে আর তকদির হাসে, তাদের পথিকদলটা ইস্পাহানে পৌঁছনোর আগেই লুট হয়। তার সঙ্গে যারা ছিল, কেউ মারা পড়ে, কেউ ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। ইউসুফ বেগ আহত অবস্থায় কয়দিন পথ চলতে চলতে শেষে ইস্পাহানের এক সরাইয়ের কাছে এসে উপস্থিত হয়। শরীরে ক্ষত, হাতে পয়সা নেই, সঙ্গে কোনও পরিচয় নেই, লোকজন অচেনা কপর্দকশূন্য আহত এক আগন্তুককে সরাইয়েও নেয়নি, ঘরেও নেয়নি। আমি নিয়েছিলাম, ছয় মাস সে আমাদের সঙ্গে ছিল, তোমাদের মা তখন তার অনেক যত্নআত্তি করেছিল, পিতৃগৃহের উদ্দেশে পাঠানো তার চিঠিগুলো কিছুদিন আমিই লিখে দিয়েছিলাম। পরে এখানে কিছুদিন কাজটাজ করে টাকা-পয়সা জমিয়ে সে মুলতানে ফিরে যায়, সেখান থেকে সে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগও রেখেছিল অনেকদিন। মুলতানে কাগজ-দলিলের কাজ করে শুনেছি; কেরানি, মোল্লা, মহাজন, অনেকের সঙ্গেই তার ওঠাবসা, তোমাদের কোনও না কোনও পৃষ্ঠপোষকতা তার মাধ্যমে হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।’
তারপর, খাওয়া শেষে, বৃদ্ধ ভেতরের ঘরে গিয়ে আলমারি থেকে কালো সুতো দিয়ে বাঁধা ছোট এক চামড়ার থলি বের করে আনলেন। ভেতরে ভাঁজ করা কিছু পুরনো চিঠি। জায়গায় জায়গায় ক্ষয়ে গেছে, কিন্তু সিলমোহরের দাগ এখনও আছে। নাসরুল্লাহ থলেটি কামাল উল্লাহর হাতে দিলেন—
‘এই চিঠিগুলো সঙ্গে নিয়ে যাবে। তারই লেখা চিঠি এসব, শেষবার সে লিখেছিল, ‘যদি কখনও আপনি মুলতানে আসেন, শুধু জানবেন, মির্জা ইউসুফ বেগের দরজা আপনার এবং আপনার বংশের জন্য সর্বদা খোলা।’ তোমাদের মায়ের মৃত্যুর পর চিঠিপত্র নিয়মিত লেখায় আমার ভাটা পড়ে যায়। অনেকদিন তাই আর আমার দিক থেকে লেখা হয়ে ওঠেনি, সেও হয়তো নিজের সংসার, দপ্তরের কাজ, রোগশোকে আর লিখে উঠতে পারেনি। অতীতের কথা, সে কতটুকু কী করতে পারবে জানি না, কিন্তু বিপদের সময় অনেক পুরনো কথা থেকেও নতুন পথের উপায় হয়, আর আমার মন বলছে মির্জা ইউসুফ বেগ তোমাদের জন্য একটা না একটা উপায় বের করতে পারবে।’

ইস্পাহান ছাড়ার আগের রাতে কামাল উল্লাহ পিতৃঘরের কাঠের সিন্দুক শেষবারের মতো খুলেছিল। লাল কাপড়ে মোড়া আশরফির পাঁচটা পুটলি হাতে তুলে নিয়েছিল। গুনে দেখেনি, গুনে রেখেছে সে আরও আগে। পরদিন সন্ধ্যায়, নাসরুল্লাহ দুই ছেলেকে খানিকক্ষণ বুকে ধরে রেখে বিদায় দিলেন। সাদ উল্লাহকে সঙ্গে করে কামাল উল্লাহ বেরিয়ে পড়ল হাজি মুসা কারভান-বাশির কাফেলার সঙ্গে মিলিত হতে।

।। ২ ।।

হাজি মুসা ঝানু কারবারি। তার কাফেলায় লোক বলতে কয়েকজন বণিক, দুইজন আলেম, বিশটির মতো পরিবার, আর পাহারার কয়েকজন ঘোড়সওয়ার; মালামাল বলতে শুকনো ফল, কাগজ, কাপড়ের বান্ডিল ও নানাবিধ পণ্যের গাঁটরি-সহ শ’খানেক পশু। ফটক পেরোনো সহজ কথা নয়, আর সে-কাজে হাজি মুসার জুড়ি নেই। শোনা গেল, ফটকের দারোগার সঙ্গে তার হিসাব আগেই চুকানো আছে। প্রহরীরা মশাল উঁচিয়ে মালের গাঁটে নামেমাত্র দু’একটা খোঁচা দিল, উটের সংখ্যা হাঁকল, মানুষ গুনল কী গুনল না। একজন কেবল কামাল উল্লাহর মুখের দিকে একপলক বেশি তাকিয়ে রইল— কী দেখল কে জানে, তারপর হাজি মুসার দিকে হাত নেড়ে এগিয়ে যেতে বলল। ফটক পেরিয়ে অনেকটা পথ অবধি দুই ভাইয়ের কেউ পেছনে ফিরে তাকায়নি।

ইস্পাহান থেকে ইয়াজদের দিকে রওনা হয়েছিল কাফেলা। চিনার গাছের সারি আর শহরের রং ফিকে হতে হতে একসময়, ধুলো-মাটি, পাথর আর দিগন্ত মেলতে শুরু করল সম্মুখে। দিনের বেলা সূর্য চোখের ওপর চেপে বসত, আর রাতে ঠান্ডা এমন নামত যে, মনে হত মানুষ নিজেই নিজের হাড় কাঁপার শব্দ শুনছে। রুখু মুলুকে কাফেলার দস্তুর ছিল রোদকে ফাঁকি দেওয়া। শেষরাতে, আকাশে তারা থাকতে থাকতেই পশুর পিঠে বোঝা চড়ত, সূর্য মাথায় চড়ার আগে যতটা পথ পারা যায়, তারপর দুপুরের আগুন-বেলাটা থামত কোনও কুয়োর ধারে, ভাঙা দেয়ালের ছায়ায়, ছায়া না মিললে পশুর গায়ের ছায়াতেই। ওদের পানি খাওয়ানো, জিরানো। বেলা পড়লে আবার চলা, যতক্ষণ না রাতের সরাই ধরা যায়। রাত্রিবেলায় আগুন জ্বলত সরাইয়ের উঠোনে, লোকেরা বসত গোল হয়ে, কেউ জুতো সেলাই করত, কেউ দিত দূরের খবর; বোলানের পথে নাকি বালুচদের মেজাজ খুব চড়া, মুলতানের বাজারে এবার খোরাসানি ঘোড়ার অনেক দাম উঠেছে।
ইয়াজদের পর পথ আরও কঠিন হল। কেরমানের দিকের সরাইপথ ধরে কাফেলা যখন দক্ষিণ-পূর্বের শুষ্ক ভূখণ্ড পেরোচ্ছিল, তখন একদিন প্রথমে দিগন্তে হলুদ রেখা দেখা গেল, তারপর সেই রেখা ফুলে উঠে আকাশ ঢেকে ফেলল। হাজি মুসা চিৎকার করে সবাইকে পশুর দড়ি ছোট করতে বলল। মুখ কাপড়ে ঢাকতে বলল। মালপত্রের গিঁট শক্ত করে বাঁধা হল। বাতাসে বালি এমন তীব্রভাবে এসে লাগছিল, যেন কেউ অদৃশ্য হাতে অগণিত ক্ষুদ্র ছুরি ছুড়ে দিয়েছে। এক খচ্চর ভয় পেয়ে ছুটতে গিয়ে পড়ে গেল। তার পিঠে বাঁধা ছিল কামাল উল্লাহর সিন্দুকের একটি। কামাল উল্লাহ ছুটে গেল সিন্দুক উদ্ধারে, সাদ উল্লাহ দৌড়ে গেল বড়ভাইকে সাহায্য করতে। তখনই সিন্দুকের মাল-সামান জড়িয়ে তুলে নেওয়ার সময় সাদ উল্লাহর নজরে পড়েছিল আশরফির থলেগুলো। ঝড়ের মধ্যে আর তেমন কথা হল না ওদের। কিন্তু সাদ উল্লাহর বুকের ভেতর প্রশ্নটা কাঁটার মতো আটকে রইল: এত আশরফি ভাই কোত্থেকে আনল? আব্বা তো দু’জনকে দুটো থলে দিয়েছিলেন।
ঝড় থামার পর দেখা গেল খচ্চরটি আর পা ফেলতে পারছে না। কাফেলার লোকেরা কেউ বলল, পা-ই ভেঙেছে বুঝি; ওটাকে ফেলে রওনা হতে হবে। সাদ উল্লাহ ওটার পায়ের সন্ধি ধরে কী যেন দেখল দীর্ঘক্ষণ বসে, গরম কাপড় চাপা দিল, বোচকা থেকে তেল বের করে মালিশ করল, বলল, ‘পা মচকে গেছে, দু’চারদিনের মধ্যে এটা ঠিক হয়ে যাবে, এটাকে এখানে ফেলে গেলে নির্ঘাত মারা পড়বে।’ নিকটে কোনও সরাইখানাও নেই যে খচ্চরটিকে সেখানে রেখে যাওয়া যায়। ঝড়ে আরও দু-একটা পশু জখম হয়েছিল, ছিটকে পড়া মালপত্র গোছাতে গোছাতেই বেলা শেষ। ঠিক হল, কাফেলা সেদিন আর এগোবে না। সাদ উল্লাহ শক্ত কাঠি আর কাপড় দিয়ে খচ্চরটার পায়ে বাঁধন দিল। ওটার পিঠের বোঝা ভাগ করে চাপানো হল অন্য পশুদের পিঠে। পরদিন অবশ্য খালি-পিঠ খচ্চরটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলল কাফেলার একেবারে পেছনে, সাদ উল্লাহ হাঁটল তার দড়ি ধরে। হাজি মুসা প্রথমে গজগজ করেছিল, ‘একটা খচ্চরের জন্যে গোটা কাফেলার পা বাঁধা!’ রাগের কারণও ছিল বুড়োর; খোঁড়া পশুর পায়ের মাপে চলা মানে পরের সরাই ধরতে দেরি, মশকের জলের হিসেবে টান, আর এই ডাকাতের মুলুকে পিছিয়েপড়া কাফেলাই সবচেয়ে সহজ শিকার। কিন্তু দিন চারেক পর সেই খচ্চর যখন আবার বোঝা নিয়ে সবার তালে পা মেলাল, বুড়ো আর কিছু বলল না, শুধু একবার সাদ উল্লাহর দিকে তাকিয়ে দাড়িতে হাত বুলাল।

হেরাতের কাছে প্রথমবার লম্বা বিরতি নিল কাফেলা। সেখানে বড়ভাই কামাল উল্লাহ কিছু বাজার সদাই করল। একটা তলোয়ার, কিছু পশমি আচকান, শুকনো আঙুর, ক’টি তামার পাত্র আর কিছু শুকনো মাংস। হেরাত থেকে কান্দাহারের পথ ধরেছিল কাফেলা। পাহাড় বদলে যেতে থাকল। রুক্ষ, কড়া, ছায়াহীন পাথুরে পথ। পাহাড়ে উঠে, চলার কায়দা-কানুনও গেল উল্টে। রাতের গিরিপথে হিম আর ডাকাত দুই-ই সমান খুনে, তাই এখানে কাফেলা চলল দিনের আলোয়, কখনও গিরিপথের মুখে পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসত পশতুন গোত্রের সশস্ত্র লোকজন। ওই গিরিপথেই তাদের পৈতৃক জমিদারি। হাজি মুসা তাদের সর্দারের সঙ্গে বসত, ফারসিতে-পশতুতে দর-কষাকষি করে, গুনে গুনে পথ পেরোনোর রাহদারি মিটিয়ে দিত। যদি কেবল অর্থে না মিটত, তখন দিতে হতো থান কাপড়, শুকনো ফল, কী এক বস্তা লবণ। বেশ হাসখোল্লা-ভাবে হাজি মুসাকে কথা-বার্তা বলতে শোনা যেত সর্দারদের সাথে। মাশুল মিটলে পশতুন সর্দার নিজের দু’চারজন লোক কাফেলার সঙ্গে জুড়ে দিত, গোত্রের সীমানা অবধি ওরাই জামিন, ওদের সঙ্গে দেখলে ও পাহাড়ে আর কেউ কাফেলার ওপর হামলা করত না। সাদ উল্লাহ একদিন জিজ্ঞেস করতে হাজি মুসা হেসে বলল, ‘ডাকাতের হাতে সব যাওয়ার চাইতে এদের সর্দারের হাতে আগেভাগে কিছু দিয়ে বনাবনি হওয়াই নিরাপদ। এই পাহাড়ের এ-ই দস্তুর।’
চল্লিশ বছর পথে পথে কাটানো মানুষ হাজি মুসা। ফারসি তার মায়ের ভাষা, তার ওপরে জমেছে আরও প্রায় আধ-ডজন ভাষার টুকরো— পশতু বুলি, তুর্কি হাঁকডাক, হিন্দবিতে কথা-বার্তা, আরও কী কী সে নিজেও তেমন জানে না। ফারসি বাদে কোনওটাই সে ভাল বলতে পারে না, অথচ কোথাও তার কথা আটকায় না। সাদ উল্লাহ একদিন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, এত ভাষা সে শিখল কোথায়, বুড়ো উটের দড়িটা হাতে পেঁচাতে পেঁচাতে বলল, ‘শিখিনি তো, বাবা। চলতে গেলে গায়ে যেমন পথের ধুলো লাগে, এসব তেমনি লেগে গেছে, মানুষ ভাবে ভাষা বুঝি মুখের জিনিস, ভাষা আসলে কানের জিনিস, আর তারও আগে নিয়তের জিনিস। যার সঙ্গে বনতে চাই, তার দু’চারটে বুলি আপনা-আপনি মুখে চলে আসে, যার সঙ্গে বনব না বলে নিয়ত করি, তার হাজার শব্দ কানে এলেও লাভ হয় না। পাহাড়ের সর্দাররা আমার পশতু শুনে হাসে, ভুল ধরে, কিন্তু গলা তো কাটে না। ওরা জানে, যে লোক তার ভাষায় ভুল করতে রাজি, সে লোক তার সঙ্গে লড়তে আসেনি।’ কথাটা সাদ উল্লাহ সেদিন যতটা বুঝেছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি বুঝেছিল বহু বছর পরে— যেদিন উত্তরের এক জংলা মুলুকে, ভাঙা বাংলায় জ্বরের ওষুধ বোঝাতে গিয়ে সে দেখেছিল, জালিয়ারা তার ভুল শুনে হাসছে, আর হাসতে হাসতেই ওভাবে তার আরও কাছে সরে আসছে।
কান্দাহারে কাফেলায় নতুন কিছু লোক যুক্ত হল, কেউ যাবে মুলতান, কেউ তারও পুবে। হিন্দুস্থানের দিকে যত সওদা যায়, তার আধখানা নাকি এই শহরের চুঙ্গিঘরে মাশুল দিয়ে তবে পথ পায়। হাজি মুসা হিসাব-নিকাশ করল, মাশুল মেটাল, পশু বদলাল, বণিকেরা কিছু মাল বিক্রি করে নতুন মাল তুলল। উত্তরের গিরিপথ তখন শিখ মিসলদের নিজেদের লড়াই আর আফগান-হানায় বেসামাল; অনেক কাফেলাই তাই ও-পথ এড়িয়ে নামবে দক্ষিণে, বোলানের গিরিপথ ধরে। ঠিক হল, কোয়েটার উপত্যকায় গিয়ে হাজি মুসার কাফেলা আবার একটা বড় বিরতি নেবে।
সেখানে পৌঁছে মনে হল, পৃথিবীটা বুঝি আবার বদলে গেছে। চারপাশে খাড়া বাদামি পাহাড়, চূড়ায় বরফ; এমন ঠান্ডা যে, সকালে মশকের মুখে বরফ জমে থাকত। সাদ উল্লাহ দুটো কম্বল মুড়ি দিয়েও কাঁপত, এমন হাড়-কামড়ানো শীত সে চেনে না। হাটের এক কোণে বসে সে দেখত বালুচ-ব্রাহুই রাখালদের; মুখ ওদের রোদে আর শুষ্ক হাওয়ায় শুকনো চামড়ার মতো কষা। পাহাড়ি ভেড়ার পাল মাঠে চরতে দিয়ে, পিঠে মোটা উলের কম্বলের ঝুড়ি আর হাতে শুকনো ফলের থলে নিয়ে ওরা হাটে আসত। ওরা ফারসি বোঝে না, সাদ উল্লাহ ওদের ভাষা বোঝে না, তবু শুকনো ফল কেনার সময়, দরদাম নিয়ে হাত নেড়ে চোখ নাচিয়ে দিব্যি বোঝাপড়া হয়ে যেত। রাতে সরাইয়ের ভেতরে আগুন জ্বেলে গোল হয়ে বসত সবাই। ক’দিন পাহাড়ি হাওয়া বইল ছুরির মতো। বোলানে ঢোকার আগের শেষ বড় থামা, তাই কেউ তাড়া দিল না; ওখানে কয়েক দিন জিরিয়ে নিল হাজি মুসার কাফেলা দলটা।
কোয়েটার সেই সরাইতে এক রাতে আগুনের পাশে বসে সাদ উল্লাহ বুঝে-শুনে একটু অস্বস্তি নিয়ে আশরফির থলের কথাটা তুলল। নিচুস্বরে বলল, ‘ভাই, এত আশরফির থলে দেখলাম। এই আশরফিগুলো আব্বা আপনাকে দিয়েছেন?’
কামাল উল্লাহ দুই ঠোঁট এক করে ভ্রুকুটি করল। এক মুহূর্তের জন্য কাঠপোড়ার শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা গেল না। সরাইয়ের দেয়ালের ওপর আগুনের শিখার ছায়া উলুক-ভুলুক করছিল। কামাল উল্লাহ বলল, ‘সব কথা ছোটদের জানার দরকার নেই।’
সাদ উল্লাহ শান্তস্বরে বলল, ‘আমি ছোট নই। আপনার সঙ্গে আমিও তো দেশ ছেড়েছি।’
সে রাতে কামাল উল্লাহ ও সাদ উল্লাহর মধ্যে কিছুটা বাগবিতণ্ডা হল। তারপর একসময় সাদ উল্লাহ চুপ মেরে গেল। বাইরে পাহাড়ি বাতাসে পশুর গন্ধ, আগুনের ধোঁয়া, আর বরফ-লাগা চূড়ার হিম। সেই রাতেই সাদ উল্লাহ প্রথম বুঝল, তারা দুই ভাই একই কাফেলায় থাকলেও হয়তো তাদের পথ এক নয়।

।। ৩ ।।

বোলানের গিরিপথ থেকে সমতলে নেমে, সিন্ধু নদের পশ্চিম তীরে ডেরা গাজি খানের সরাইয়ে এসে, এতদিনের রুখু পাহাড়, পাথর আর পশমি কাপড়ের গন্ধের ভেতর হঠাৎ যেন মানুষী ভিড়ের গরম শরীর এসে পড়ল। রুটির ধোঁয়া, তামাক, খেজুর, বণিকের দর-কষাকষি, বেলুচ-সিন্ধি ঘোড়সওয়ার, আর এ-সবের ভেতর হঠাৎ হঠাৎ ভেসে আসা হিন্দুস্থানি মশলা কি আখের গুড়ের মিঠে ঝাঁঝ— সব মিলিয়ে পৃথিবী যেন শুকনো পাহাড় থেকে নেমে মানুষের ঘামে ভিজে উঠল। এখানে ফারসি চলত, সিন্ধি চলত, সেরাইকি চলত, বেচাকেনার দরকারে সবাই সবার ভাষা খানিক করে বুঝেও নিত।
ডেরা গাজি খানের ঘাটে এসে উট থেকে মালামাল খালাস করে নিয়ে, মালের গাঁট, মানুষ সব তোলা হল বিশাল বিশাল কাঠের নৌকায়। শীতের শেষ দিকে সিন্ধুর বুক তখন শান্ত, জল নেমে গেছে অনেকটাই। কিছু উটের হাঁটু মুড়ে শক্ত দড়িতে নৌকাগুলোর তক্তার সাথে বেঁধে ফেলা হল। আর বলবান উটগুলোকে সার বেঁধে নামিয়ে দেওয়া হল নদীর জলে, ওদের লাগাম শক্ত করে ধরে রাখা হল নৌকা ক’টির গলুই থেকে। ঘাটের পাওনা চুকিয়ে দিতেই সর্দারের ইশারায় মাঝিরা সমস্বরে জোরসে হাঁক ছেড়ে বিশাল দাঁড়গুলো পানিতে ফেলল। নৌকাগুলো ধীরলয়ে এগোতে, উটেরা লম্বা গলা জলের ওপর ভাসিয়ে নৌকা ক’টির পেছন পেছন সাঁতরে চলল। ওপারকার চরে যখন কাফেলা পৌঁছল, ততক্ষণে পড়ন্ত দুপুরের রোদ বালিতে চিকমিক করছে। উটেদের পা মালিশ করা হয়ে গেলে, পিঠে আবার মালামাল চাপিয়ে, নতুন করে বেঁধে নেওয়া হল দীর্ঘ সারি। মোটে আর দিন কয়েকের পথ। দিগন্তজোড়া গমের খেত, খেজুরের সারি, দূরে ধুলোর ভেতর মিলিয়ে যাওয়া মাটির গ্রাম, আর মাঝে আরেকটা নদী পেরিয়ে, শেষ বেলাটা ধুলো উড়িয়ে, একদিন ধূসর দিগন্ত ফুঁড়ে তাদের সামনে ভেসে উঠল মুলতানের ধুলোমাখা ফটক, ফটকের মাথায় নীল গম্বুজের ঝিলিক।
মুলতানে ঢুকে কাফেলা ভেঙে গেল, যেমন ভাঙে। এতদিনের একসঙ্গে চলা মানুষেরা যে-যার ঠিকানার খোঁজে ছড়িয়ে পড়ল। হাজি মুসার এখানেই শেষ। মাল বুঝিয়ে দেওয়া, হিসাব চোকানো, নতুন কাফেলার খোঁজখবর— ফটকে ঢুকেই বুড়ো ডুবে গেল তার হাজারটা কাজে। যাওয়ার আগে দুই ভাই তাকে সালাম জানাতে গেল। বুড়ো তখন এক গাড়োয়ানের সঙ্গে দর কষছে— ঘাড় ফিরিয়ে দেখল, মাথা নাড়ল, বলল, ‘আচ্ছা আচ্ছা, যা।’ তারপর আবার দর কষায় ফিরে গেল। পথের মানুষ বলেই হয়তো বিদায়ে তার বাড়তি কথা খরচের অভ্যেস নেই।
নির্ধারিত ঠিকানা খুঁজে বার করে জানা গেল, মির্জা ইউসুফ বেগ বেঁচে নেই। বছর তিনেক আগে এক শীতে, শ্বাসের ব্যামোয় তিনি চলে গেছেন। দপ্তর চালায় তাঁর ছেলে, মির্জা করিম বেগ। কামাল উল্লাহ যখন থলি খুলে চিঠিগুলো তাঁর সামনে রাখল, করিম বেগ অনেকক্ষণ চুপ করে সেগুলোর ওপর হাত বুলাল। নাসরুল্লাহর পাঠানো চিঠিটা পড়ল, তারপর মুখ তুলে বলল, ‘আব্বার মুখে শুনেছি, ইস্পাহানের নাসরুল্লাহ সাহেব সেদিন ঘরে না তুললে আজ হয়তো আমরা কেউ পৃথিবীতে আসতাম না। তাঁর ছেলেরা আজ আমার দরজায়! এ আমার পরম সৌভাগ্য।’
দুই ভাইয়ের জায়গা হয়ে গেল করিম বেগের দপ্তরে। হিসেবের খাতা, দলিল-দস্তাবেজ, কাপড় আর আতরের কারবার। এ-জগৎ যেন কামাল উল্লাহর জন্যেই তৈরি ছিল। মাস না ঘুরতেই দেখা গেল সে ফারসিতে চিঠি লিখছে, দর কষছে, মহাজনদের সঙ্গে এক আসনে বসছে। কিন্তু সাদ উল্লাহর মন কোথাও বসে না। চন্দ্রভাগার তীরের ভোর, গলিঘুঁজির কোলাহল, এসবের ভেতর দিয়ে যুবক সাদ উল্লাহ হেঁটে হেঁটে বেড়াত, দেখত, তবু কী যেন দেখা হত না তার। কোয়েটার সেই রাতের আশরফির ব্যাপারটাও কাঁটার মতো তার বুকে বিঁধে ছিল। হিসেবের খাতা, দাপ্তরিক কাজকারবার এইসব কিছু তার মনে ধরে না। কীসের এক টানে কোনও এক অজানা সম্মোহনে তার কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে হয়, কোথায়, সে জানে না।
দুই বছর এমনই গেল। শীত এল, বসন্ত এল, খরতাপে উড়ল চন্দ্রভাগা তীরের ধুলো। এদিকে করিম বেগের দপ্তরে কামাল উল্লাহর হাত পাকতে লাগল। সাদ উল্লাহও কখনও-সখনও দপ্তরের কাজে বসে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে কী একটা শূন্যতা রয়ে যায়। মাঝেমধ্যেই বাহাউদ্দিনের দরগার বাইরে মুরিদদের ভিড় দূর দাঁড়িয়ে দেখে সাদ উল্লাহ। এমনই একদিন, সাওয়ানের আগে, মুলতানের এক সরাইয়ের মুখে ছোট এক বণিকদলের সঙ্গে সাদ উল্লাহর আলাপ হল। তিনজনের একটা দল— আগ্রার এক মশলা-বিক্রেতা; কাশী থেকে আসা এক লোক, মহাজনি গদির হুন্ডি আর তাগাদার কাজে তাকে দেশ-বিদেশ ঘুরতে হয়; আর আজিমাবাদের এক ঘোড়ার কারবারি, কাপড় আর চিনি বেচে খোরাসানি ঘোড়া কিনে দেশে ফিরছে। তারা দেহলির দিকে ফিরবে।
সে-রাতে সাদ উল্লাহ ভাইকে কথাটা বলল। শুনে কামাল উল্লাহর গলার শিরা ফুলে উঠল যেন। ‘তোর মাথাটা গেছে নাকি? আব্বা আমাদের মুলতানে করে খেতে পাঠিয়েছেন, গায়ে এমন হাওয়া লাগিয়ে উড়ে বেড়াতে নয়, আর তুই সারাদিন উদাসের মতো এদিক-ওদিক ঘুরিস! এইসব আর কতদিন?’ সে থামল না। ‘ঘর থেকে বেরোনোর দিন আব্বা কী বলেছিলেন, মনে আছে? বলেছিলেন, ‘দুই ভাই একসঙ্গে থেকো।’ সেই কথা এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলি?’ ঘরে নীরবতা নেমে এলে সাদ উল্লাহ নতমুখে বলল, ‘আব্বার কথা ভুলিনি, ভাই। এখানে দিন কাটছে, অথচ আমি না কোনও কাজ শিখছি, না নিজের রুজির পথ খুঁজে পাচ্ছি, এসব কাজ আমার একদম ভাল লাগে না। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই করতে গেলে আমার মনের মধ্যে কী যেন হয়, মনে হয় আমি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, দপ্তরের এই হিসাব-নিকাশ আর বাঁধাধরা কাজ আমার মন টানে না, অন্যপথে বেরিয়ে দেখি যদি মনের মতো কিছু খুঁজে পাই।’
‘তোর কি মনে হয় এই দুনিয়া তোর জন্য পাটি বিছিয়ে বসে আছে? এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াবি, আর সবাই তোকে মাথায় তুলে রাখবে? এটা তোর কাজ-কারবার শেখার বয়স, উপার্জনের বয়স, বসে বসে খেলে আর এমন পথে পথে ঘুরে বেড়ালে, তোর ওই রাজার ধনও শেষ হবে একদিন।’ কামাল উল্লাহ হাঁপাতে হাঁপাতে কিছুক্ষণ ছোটভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
দু’দিন পর, বিদায়ের সময় কামাল উল্লাহ কী যেন বলতে গিয়ে আর বলল না। দুই ভাই বুকে বুক মেলাল। তারপর বণিকদলটা রওনা দিল— আগে আগে খোরাসানি ঘোড়ার পাল, পেছনে মালবোঝাই খচ্চরের সারি, আর করিম বেগের দপ্তরের ফটকে দাঁড়ানো কামাল উল্লাহ ছোট হতে হতে একসময় ধুলোয় মিলিয়ে গেল।
বড়ভাইয়ের কথা গল্পে এইখানেই শেষ। শোনা যায়, মুলতানে তার কারবার জমেছিল, ঘরসংসার হয়েছিল; কেউ বলে, বুড়ো বয়সে নাকি সে ছোটভাইয়ের খোঁজে পুবের দেশে লোকও পাঠিয়েছিল।

।। ৪ ।।

পথে বৃষ্টি-বাদল। নদী ফুলে উঠল, শতদ্রুর ঘাট নাকি বন্ধ, রাস্তা কাদায় ডুবে গেছে; জল না নামা পর্যন্ত বণিকদলটাকে এক সরাইয়ে বসে থাকতে হল সপ্তাহের পর সপ্তাহ। শেষে, আশ্বিনের এক বিকেলে, আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ উড়ছে, এমন এক দিনে, সাদ উল্লাহ দেহলিতে ঢুকল। ১৭৯০ সাল। সরাইয়ের আগুনের পাশে বসে যে শহরের গল্প সে শুনেছিল, বাদশাহদের শহর, দুনিয়ার মধ্যমণি শাহজাহানাবাদ, সেই দেহলি। কেল্লার ভেতরে তখন অন্ধ বাদশা, এক রোহিলা সর্দার তাঁর চোখ নষ্ট করে দিয়েছে। রাস্তায় মারাঠা সওয়ারদের ঘোড়া, ভাঙা হাভেলির খিলান ফুঁড়ে বেরিয়েছে বটের চারা, চাঁদনি চকের মাঝখান দিয়ে যে নহরের জল একদিন বয়ে যেত, তাতে এখন শুকনো পাতা আর ধুলো। দোকান বসে, কেনাবেচাও চলে, তবু পুরনো লোকেরা মাথা নাড়ে, বলে, এ জৌলুস সে জৌলুসের ছায়ামাত্র। সাদ উল্লাহ দেহলির আগের জৌলুস দেখেনি। যা সে দেখেনি, তার জন্য তার শোকও হয় না। তাই পুরনো লোকেরা যেখানে দেখে শ্মশান, সেখানে সে-যুবক দেখে জ্যান্ত এক শহর। সন্ধ্যাবেলায় জামা মসজিদের সিঁড়িতে বসে তার মনে হয়, এ-শহরের লোকগুলোও বুঝি এর বাদশারই মতো, প্রাণটা আছে, কিন্তু চোখের আলো গেছে। কাবাবের ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করে, মগরেবের আজানের সঙ্গে সঙ্গে একযোগে উড়াল দেয় কবুতরের ঝাঁক, পয়সা ফেললে বিহিশতি তার চামড়ার মশক কাত করে ঠান্ডা জল ঢেলে দেয়, আর সিঁড়ির নীচে বসা এক অন্ধ ভিখারি রোজ সুর করে গায়— ছাপ তিলক সব ছীনি রে মোসে ন্যায়না মিলাইকে। যুবক অবাক হয়ে শোনে। কী এক টানে সে সেখানেই থেকে গেল।
জামা মসজিদের পিছনের এক গলিতে বুড়ো হেকিম ফজল আলির দাওয়াখানায় সে একটা কাজ পেল। শেকড়বাকড় গুঁড়ো করা, শরবত ছেঁকে রাখা, রোগীদের লাইন সামলানো, এইসব কাজ। ফারসি লিখতে পারা, লেখাপড়া-জানা ছেলে পেয়ে বুড়ো খুশিই হলেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে তিনি আর একটা জিনিস লক্ষ করলেন। যে মানুষ যন্ত্রণায় ছটফট করে, এই ছেলেটা পাশে বসে হাতখানা ধরলে সে কেমন শান্ত হয়ে যায়। একদিন নাড়ি দেখা শেখাতে শেখাতে তিনি থেমে গিয়ে বললেন, ‘তোর হাতে কী আছে রে ব্যাটা? এ জিনিস তো কিতাবে মেলে না।’
সেই দাওয়াখানাতেই এক শীতের রাতে ঘটল ঘটনাটা। বুকের ব্যামোয় ধরা এক বুড়ো মুসাফির। ওষুধে আর কাজ হচ্ছে না, হেকিম ফজল আলি জবাব দিয়ে দিয়েছেন। রাতটা কাটে কী কাটে না সন্দেহ, তবু কাকে যেন তিনি ডাকতে পাঠালেন। শেষরাতের দিকে তিনি এলেন। আলখাল্লা পরা, ধবধবে দাড়িভর্তি মুখ, প্রদীপ হাতে তিনি প্রবেশ করলেন। এসে মুসাফিরের শিয়রে বসলেন, রাতভর খেদমত করলেন, মাঝে মাঝে ঝুঁকে কানের কাছে মুখ নিয়ে কী যেন বললেন। মরতে বসা মানুষটার মুখে তখন সাদ উল্লাহ যা দেখল, তার নাম যন্ত্রণা নয়। পরদিন মুসাফির ঘুমন্ত মানুষের মতো শান্ত মুখে, সুস্থ হয়ে চলে গেল। আর সাদ উল্লাহ, সেদিন নিজেও জানে না কেন, আলখাল্লা পরা বুড়োর পিছুপিছু হাঁটা দিয়েছিল।

শহরের দক্ষিণে, পুরনো এক দরগার গা-ঘেঁষে কয়েকটা হুজরা আর একটা উঠোন, এই ছিল তাঁর আস্তানা। পুরো নাম কেউ জানত না। লোকে ডাকত শুধু হজরত বলে। তাঁর পিছু পিছু এসে উঠোনে পা দিয়ে সাদ উল্লাহ থমকে দাঁড়াতেই বুড়ো মানুষটি না ফিরেই বললেন, ‘কী রে?’ তারপর ফিরে তাকিয়ে বললেন, ‘ঝোলায় কী নিয়ে ঘুরিস, বাবা?’ সাদ উল্লাহ থতমত খেয়ে ঝোলা খুলে দেখাল দুটো জামা, হেকিমের দেওয়া একটা কিতাব, আর আব্বার দেওয়া কয়টা জিনিস।
তার পরের বছরগুলোর কথা খুব বেশি জানা নেই। এইটুকু জানা যায়, সে উঠোন ঝাঁট দিত, বাওলি থেকে জল টেনে আনত, রাতভর জিকিরের মজলিসে প্রদীপে তেল দিত, আর হজরতের পায়ের কাছে বসে শিখত কোনও গূঢ় বিদ্যা। সেই উঠোনেই, এক জুম্মাবারের সকালে, হজরতের হাতের ওপর হাত রেখে সাদ উল্লাহ বায়াত নিল। হজরত বলতেন, ‘ওষুধে সারে শরীর। কিন্তু মানুষ কি শুধু শরীর, বল?’ আগের হেকিমের দাওয়াখানাতেও সাদ উল্লাহর যাওয়া-আসা রইল। শোনা যায়, এক হাতে সে শিখছিল ও-দেশি গাছগাছড়ার গুণ, আর এক হাতে নাকি শিখছিল, যা সচরাচর শেখানো যায় না, তেমন কিছু।
এমনি করে কেটে গেল কয়েকটা বছর। হজরতের শরীর ভাঙছিল। এক ফাল্গুনের সন্ধ্যায়, মগরেবের নামাজের পর, তিনি সাদ উল্লাহকে কাছে ডাকলেন। অনেকক্ষণ কিছু বললেন না; দরগার পেছনের নিমগাছে তখন সন্ধ্যার শেষ পাখিরা ফিরছে, তিনি সেই দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘তোর পথ এখানে শেষ না, যেতে থাক, থামিস না। যেতে যেতে একদিন দেখবি, বুকের ভেতরের টানটা চুপ হয়ে গেছে।’ সাদ উল্লাহ তাঁর পায়ের কাছে মাথা রাখল। হজরত তার মাথায় হাত রাখলেন। সে হাতের ভার আর কতটুকুই বা, অথচ পরে বহুদিন, মাথার ওপর সেই ভারটুকু টের পেয়েছে সাদ উল্লাহ।
কয়দিন পর এক ভোরে, শহর তখনও ঘুমিয়ে, হজরতের হুজরার দরজা খোলা। প্রদীপ জ্বলছে, মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, যেন রাতের জিকির শেষ করে একটু চোখ বুজেছেন মাত্র। সাদ উল্লাহ তাঁর পাদুটো কতক্ষণ নিজের কপালে ছুঁইয়ে রাখল। দুপুরের আগেই জানাজা হল, মাটি দেওয়া হল দরগার পেছনের নিমগাছ তলায়। সন্ধ্যার পর সাদ উল্লাহ শেষবারের মতো সে-উঠোন ঝাঁট দিয়ে প্রদীপে তেল দিল। ভোরের অন্ধকার ফিকে হতে না হতেই সে পথ ধরল। একবার শুধু ফিরে তাকিয়েছিল। সকালের প্রথম আলোয় জামা মসজিদের মিনারদুটো তখন সোনার মতো জ্বলছিল।

।। ৫ ।।

তারপর সে এক দীর্ঘ পথ। প্রথমে যমুনার, তারপর গঙ্গার ধার ধরে ধরে কত সরাই, কত ঘাট, কত মানুষের মুখ আর কত মেলা। কাশী, আজিমাবাদ পেরিয়ে পথ যত পুবে গড়াল, পৃথিবী ততই বদলাতে লাগল। কোথাও সে দাওয়াখানায় রাত কাটিয়েছে, কোথাও মসজিদের বারান্দায়। কখনও বৈষ্ণব আখড়ার পাশে আগুন পোহানো পথিকদের সঙ্গে কাটিয়েছে কয়টি রাত। পথে, লোকেরা তার ভাঙা হিন্দুস্থানি শুনে হাসত, কিন্তু কাছেও আসত।
পশ্চিমের রং ফিকে হতে হতে একসময় জমিন ভারী, ভেজা, মাটি-মাটি গন্ধে ভরে উঠল। পুকুরে পুকুরে ছেয়ে আছে দেশ, বাঁশঝাড়ের ফাঁকে খড়ের চালা। এক নদী পেরোলে আর এক নদী, তার পেটের ভেতর আরও নদী। একবার যেদিন আষাঢ়ের মেঘ ভেঙে বৃষ্টি নামল, পারস্যের যুবক অমন বৃষ্টি জন্মে দেখেনি। আকাশ যেন উপুড় হয়ে পড়েছে মাটির ওপর। সে গৃহস্থের আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ভিজল। তার দেশে জল ছিল ঘরের পোষা জিনিস— নালায় বাঁধা, হাউজে তোলা, বাগানে মেপে মেপে ঢালা। বাপের উঠোনের আটকোনা হাউজটুকু ভরতে সারা সকাল লাগত। পাড়ার নালায় জল আসার দিন ঘরে ঘরে সাড়া পড়ে যেত, হাউজ ভরা হত, গাছে জল দেওয়া হত, মায়েরা ছেলেপুলেদের চান করিয়ে নিত। আর এ-দেশে আকাশ একবেলায় এমন ঢেলে দিচ্ছে, যা তার গোটা শহর যেন বছরে পেত না।
মুখের ফারসি-হিন্দুস্থানির ফাঁকে ফাঁকে ততদিনে বাংলা শব্দ ঢুকতে শুরু করেছে— জল, ভাত, নাও, মাঝি, যাই, আসো ইত্যাদি। মুর্শিদাবাদে সে কয়েকমাস ছিল। রুটি মিলত, আশ্রয়ও মিলত, কিন্তু মন টিকত না কোথাও। আরও দক্ষিণে, আরও পুবে, কখনও নদীপথে, কখনও পায়ে, কখনও গরুর গাড়ির পেছনে। এই করে কিছুকাল পরে, সে এসে পড়ল কবতক্ষের ধারে, যশোর মুলুকে। নদের ধারের এক গাঁয়ে তার দিন কাটতে লাগল। প্রথম প্রথম লোকে দূর থেকে দেখত: পশ্চিমা ফকির, লম্বা গড়ন, টিকালো নাক, ভাঙা বাংলায় কথা বলা মানুষ। জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে সে পাতা, শেকড় তুলত।
সেভাবেই একদিন দেখা হল বুড়ো কবরেজ দীনবন্ধু সেনের সঙ্গে। গাছগাছড়ার বিদ্যেয় ও-তল্লাটে তাঁর জুড়ি ছিল না। সময় পেলেই একসাথে বসত তারা। কথায় কাজে বেলা গড়িয়ে যেত। দু’জনের ভাষা আলাদা, কিন্তু রোগীর কপাল, পেটের মোচড়, বুকের কাশি, শিশুদের জ্বরজারি— এসব তো একই।
তারপর কত ভোর দু’জনে একসঙ্গে বেরিয়েছেন মাঠে, জঙ্গলে, নদীর ধারে; শিশিরে পা ভিজিয়ে হেঁটেছেন দু’জনে। দীনবন্ধু চিনিয়ে দিতেন এদেশের লতা-গুল্ম। বলতেন, ‘গাছের নাম জানলেই শুধু হবে না, কোন মাটিতে জন্মায়, কোন মাসে ফুল ধরে, শিকড় তুলবা কখন, এসব না জানলে ওষুধ হয় না, ঘাস হয়। আর মনে রাখবা, গাছ কেপ্পন না, কিন্তু অধৈর্য লোককে সে কিছুই দেয় না। ভরা বর্ষায় গাছের সব রস উপরের দিকে ছোটে, নতুন পাতায়, নতুন ডগায়; শিকড় তখন জলে ফোলা, কিন্তু ভেতরে কিছু নাই, ও-শিকড় খুঁড়ে এনে শুকাতেও পারবা না, পইচে যাবে। শিকড় খুঁড়তে হয় ওই পৌষ-মাঘের দিকে, যখন পাতা ঝইরে গেছে আর গাছ তার সব সঞ্চয় পাঠিয়ে রাইখ্ছে শিকড়ে। মাঘের শিকড়ে যে গুণ, আষাঢ়ে তার আধাও নাই। আর পাতা নেবা ঠিক তার উল্টো সময়ে, গাছ যখন গায়ে-গতরে বাইড়ছে, পাতা টসটসে হইয়েছে কিন্তু ফুল তখনও ধরেনি, ওই সময়ে পাতা নেবা। ফুল ধল্যেই গাছের সব জোর ফুলের দিকে গেল, পাতা তখন খোসা। তা কোন গাছে কখন ফুল ধইরবে, সে তো এক-এক গাছের এক-এক ধরন; ওইটা মুখস্থ কইরে হবে না বাবা, গাছটারে চিনতে হবে। বছরের পর বছর একই গাছের সামনে গিয়ে খাড়াতে হবে, হুরুমহারুম করা যাবেনানে, কথায় আছে, তাড়াহুড়ায় তোলা শিকড়, আর তাড়াহুড়ায় শেখা বিদ্যে, দুটোরই এক দশা। আর যেটুকুন দরকার ওইটুকুনই নেবা; গাছ মেরে ফেললে বিদ্যেও মরে।’ কখনও কাজ থামিয়ে, দূরের মাঠের দিকে তাকিয়ে দীনবন্ধু বলতেন, ‘ওষুধ আমরা দেই, তা বটে। সারান তো ওই মাটি-জল-হাওয়ায় যিনি মিশে আছেন, তিনিই।’ সাদ উল্লাহ শিখত।
কত জিনিসের নাম যে সে জানত না। ওই যে সন্ধ্যাবেলা বাঁশঝাড়ের অন্ধকারে ঝাঁকে ঝাঁকে জ্বলে-নেভে, ওর কী নাম? ছেলেবেলায় সে কোথায় যেন শব-তাবের কথা পড়েছিল, রাত-জ্বলা পোকা; এটাই কি সেই পোকা? আর ওই যে জলের গায়ে ভোরবেলা সাদা-গোলাপি ফুল ফুটে থাকে, দুপুর গড়ালে মুখ বোজে? দীনবন্ধু হেসে নাম বলে দিতেন— ‘ওইটা জোনাকি… ওইটা শাপলা…।’ সাদ উল্লাহ মনে মনে আওড়াত। আবার কোনও কোনও নামে সে চমকে উঠত। আমগাছের ডালে বসা ঝুঁটিওয়ালা পাখিটাকে যেদিন দীনবন্ধু বললেন, বুলবুলি— সাদ উল্লাহ চমকে মুখ তুলল; বলবল! যার গানে নাকি কবিদের রাত কাটে! সাগ্রহে সে পাখিটার দিকে তাকিয়ে রইল— কই, এ তো সে-পাখি নয়, মাথায় কালো ঝুঁটি, ফুর্তিবাজি কিচিরমিচির ওর গলায়, তার দেশের বলবলের সঙ্গে কী চেহারায় কী গানে কোনও মিলই নেই। সাদ উল্লাহ খানিক তাকিয়ে থেকে হেসে ফেলল; নামটা তবে একা একাই এত পথ হেঁটে এসেছে, আর এদেশে পৌঁছে নিজের জন্য নতুন একটা পাখি বেছে নিয়েছে! মন্দ কী— ভাবে সে।
কখনও-সখনও পড়ন্ত বেলায়, শিশুর মতো হাঁটুসমান জলে নেমে শাপলা ডাঁটা তুলতে তুলতে, বৃষ্টির পর ভেজা মাটির গন্ধ শুঁকে পারস্যের যুবক ঠায় দাঁড়িয়ে ভাবত, এই দেশ এত ভেজা! তাই দেখে দীনবন্ধু মিটিমিটি হাসতেন। বলতেন, ‘দ্যাখো কাণ্ড, জলে নাইম্লা ক্যান এখন আবার, ঠান্ডা বইস্বে যে গায়ে!’ বকতেন, আবার নিজেই বসে বসে দেখতেন।
নিঃসন্তান মানুষ দীনবন্ধু। ঘরে এক বিধবা বোন ছাড়া কেউ নেই। সন্ধ্যায় রোগীপত্র চুকলে দাওয়ায় বসে তামাক টানতেন, পুরনো মড়কের গল্প করতেন। কথায় কথায় রাত হয়ে যেত। বোন ভেতর থেকে হাঁক দিতেন, ‘কই, এসো তোমরা, ভাত জুড়িয়ে গেল যে।’ একদিন কথার মাঝখানে হঠাৎ বললেন, ‘আমার তো কেউ নেই রে, এ বিদ্যে কাকে দিয়ে যাব তাই ভাবতাম।’
এমনি করে গেল আরও দু’চার বছর। গাঁয়ের লোক তাকে আপন করে নিয়েছে, ভিটে বেঁধে দিতে চেয়েছে, কেউ কেউ মেয়ের সম্বন্ধও এনেছে। কিন্তু রাত হলে, কবতক্ষের জলে যখন চাঁদ ভেঙে ভেঙে যায়, সাদ উল্লাহ চুপ করে বসে কী যেন ভাবে।
এক কার্তিকের সন্ধ্যায়, দাওয়ায় বসে সে দীনবন্ধুর কাছে কথাটা পাড়ল। বুড়ো শুনে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। বললেন, ‘কাইল যাবা?’ তারপর বললেন, ‘তা কোথায় যাবা, কেন যাবা, কবে ফিরবা, এমন কিছু ঠিক করেছ, নাকি…’
সাদ উল্লাহ খানিকক্ষণ মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। বলল, ‘কিছু ঠিক করি নাই…’
দীনবন্ধু তামাক টানতে লাগলেন। খানিক পরে সাদ উল্লাহ আবার বলল, যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছে, এমন করে, ‘মনের ভেতর কী একটা হয়, জানি না, কবরেজ মশাই, থির হইতে দেয় না।’ আরও কী যেন বলতে গিয়ে সে থেমে গেল; বোধহয় তার বাংলায় কুলাল না, কিংবা কোনও ভাষাতেই কুলায় না। দীনবন্ধু আর ঘাঁটালেন না। খানিক বাদে ভেতরে গিয়ে মাচা থেকে নিজের একটা খন্তি এনে সাদ উল্লাহর হাতে দিলেন। পুরনো জিনিস, বাঁটের কাঠ ক্ষয়ে ক্ষয়ে চকচকে হয়ে গেছে। বললেন, ‘এইটা ন্যাও, রাখো তোমার কাছে।’ কথায় কথায় বেলা গড়িয়েছিল, ছেদ পড়ল পিসিমার ডাকে ‘কই, এসো তোমরা, ভাত জুড়িয়ে গেল যে।’

।। ৬ ।।

পদ্মা পেরিয়ে সে চলল আর এক অজানা দিগন্তের সন্ধানে। অত বড় জলের বিস্তার সে জীবনেও কল্পনা করেনি, যেন এক প্রমত্তা জলধি, যার ওপার দৃষ্টিকে গ্রাস করে নেয়। খেয়ানৌকাখানি সেই অতল জলরাশির বুকে অনন্ত সমুদ্রের কোনও মায়াবী তরণীর মতো ভাসছিল। গলুইয়ে বসে মাঝি উদাসীন চোখে তাকিয়ে বুক চিরে টানা সুরে গান ধরে, ‘ও কি ও বন্দু রে, বুকের মাঝে গুণের দড়ি, ওইপারেতে তোমার হাত, টাইনা টাইনা জনম গেল, ফুরাইল না আমার রাত, গওহর দেওয়ানায় কয়— এই দড়ি তো কাটাই যায়, কাটবার গেলে বুকও কাটে, তাই কাটি না ভাই… আমার বন্দুর এক ঘাট আছে, নাম জানি না তার, সেই ঘাটে কার নাও ভিড়ে, খেয়া চলে কার…।’
মরুভূমি পাড়ি দিতে দিতে সে একদিন ভেবেছিল, মানুষ কত ক্ষুদ্র। এই জল দেখে তার মনে হল, মানুষ তারও চেয়ে ক্ষুদ্র। তারপর উত্তরের পথ। দিনের পর দিন, হাট থেকে হাটে, গাঁ থেকে গাঁয়ে। দেশ যত উত্তরে গেল, ততই আরও বুনো হতে থাকল। পথে সে টের পেল, তার এত কষ্টে শেখা ভাষা এই পথে আবার ভাঙতে শুরু করেছে। এদের মুখের টান আলাদা, শব্দ আলাদা, মানুষের মুখের বুলি যেন ক্রোশে ক্রোশে বদলে যায়। এমনি চলতে চলতে পথেই শীত গেল, ফাগুন-চৈত্রের ধুলো উড়ল। একসময় পথে পড়ল তিস্তা, বেয়াড়া তিস্তা। স্রোতের এমন টান যে খেয়ানৌকার গলুই থরথর করে কাঁপে, জোয়ান মাঝি ছইয়ের বাঁশ ধরে বলে, ‘শক্ত হয়া বইসেন, বাহে।’ মাঝনদীতে ঢেউ এসে নৌকার পাঁজর ধাক্কে দেয়, ছলাৎ ছলাৎ করে জল ওঠে পাটাতনে, একবার নৌকা এমন কাত হল যে সাদ উল্লাহ নিজের অজান্তেই কলমা পড়া শুরু করেছিল। মাঝির মুখে শুনেছিল সে, তিস্তার মহাবানের কথা।
তারপর আবার পথ, নলখাগড়ার বন, যতদূর চোখ যায় বিন্নার ঝাড়। মাঝে মাঝে মোষের পাল নিয়ে চলা বাথানিয়াদের সঙ্গে দেখা হত, তারা থুতনি উঁচিয়ে ইশারায় বাতলে দিত পথ। কোথাও নতুন বসতি, জঙ্গল কেটে দশ-বারো ঘর উঠেছে। পুরুষেরা দা দিয়ে বেত কাটছে, নারীরা উঠোনে ধান শুকোচ্ছে, উলঙ্গ শিশুরা কাঁকড়া ধরে বেড়াচ্ছে।

জঙ্গল-গাঁয়ের লোক ইস্পাহান-খোরাসান চিনত না। তাদের ভূগোলে পদ্মার ওপারেই পশ্চিম শুরু। রাত হলে গেরস্তের দাওয়ায় সাদ উল্লাহর আশ্রয় মেলে। ফর্সা রং, টিকালো নাক, লম্বা গড়ন দেখে কেউ কেউ সাদ উল্লাহকে মোগল ফকিরও বলত। কেউ বলত, ‘পচিমা ফকির এ্যাকনা আসি জুটচে, কিবা কিবা কয়।’ কেউ বলত, ‘আগোত এ মুলুক দিয়া যে ফকিরের দল যাইত, ওমারে মতোন কায়ো কিনা ফির?’
দু’একজনের মনে অন্য খটকাও যে ছিল না তা নয়, ‘কায় জানে কোনটেকার মানুষ, কথার ঠিক নাই, ঘোরে জঙ্গলে-বিলে, ঠগ-বাটপাড়ের চর হইলে? গিরস্তের গোয়ালের দিকে, ধানের গোলার দিকে নজর করি ঘোরে না তো ফির?’ সন্ধ্যার পর কোনও কোনও বাড়ির বউ-ঝিরা ঘরের দুয়ার একটু আগেভাগেই টেনে দিত। কেউ কেউ আবার নিজের গেরস্তকে সাবধান করত, ‘অচিনা মাইনষোক অত ঘরোত ঢুকপার দেন ক্যানে? দিনকাল ভাল নোয়ায় বাহে।’ তবে এ-সব কথা মুখের ওপর কেউ বলত না। সাদ উল্লাহ কি টের পেত না? পেত। পথে পথে এত বছর, মানুষের চোখের ভাষা তার মুখস্থ। সে কিছু মনে করত না। অচেনা মানুষকে মেপে মেপে বোঝা তো সংসারী মানুষেরই ধর্ম, তাই মাপার জিনিসটুকু সময়ে সময়ে সেই জুগিয়ে দিত— কারও জ্বরে শেকড় বেটে, কারও অম্বলে পাচন ধরিয়ে। উপকার এমন জিনিস, ভয় তার কাছে বেশিদিন টেকে না।

গেরস্ত নইমুদ্দি দরিদ্র, কিন্তু আতিথ্যে টান নেই। দাওয়ায় চাটাই পেতে দেয়, কাঁথা এগিয়ে দেয়, ভাত না থাকলে ছাতু, তাও না থাকলে অন্তত এক ছিলিম তামাক। রাতে খেতে বসলে আশপাশের ঘরের লোক ঘিরে বসে দেখে, ভিনদেশি লোকটা কেমন করে খায়। কথায় কথায় কত প্রশ্ন। কেউ জিজ্ঞেস করে, ‘মক্কা শরিফ দেখছেন, বাহে?’ সাদ উল্লাহ মাথা নাড়ে, দেখেনি। লোকটা কেমন দমে যায়, এত পশ্চিমের মানুষ, মক্কা শরিফ দেখেনি, তবে আর কী দেখল। আরেকজনের জিজ্ঞাসা, ‘তোমার দ্যাশত ধান হয় না বুঝিল্? তা মাইন্ষে খায় কী?’ গমের রুটির কথা শুনে সে মাথা নাড়ে, রুটি খেয়ে মানুষ বাঁচে, একথা তার ঠিক বিশ্বাস হয় না। জালিয়া পাড়ার এক বুড়ি অনেকক্ষণ চুপ করে তার খাওয়া দেখে শেষে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার মাও নাই, বাহে? অ্যাদ্দুর আচ্চেন, মাও কান্দ্পে না?’ সাদ উল্লাহ ভাতের থালার দিকে তাকিয়ে বলল, মা নেই, কবে থেকে নেই, তাও অনেক কাল, মায়ের কথা মনে পড়ে না। যে মানুষকে সে চেনেইনি আজ সন্ধ্যার আগে, তার মায়ের জন্য বুড়ি আঁচলে চোখ মোছে। এই মুলুকে মানুষের পেটে ভাত কম, কিন্তু কথা অফুরান, ভাবত সাদ উল্লাহ। এদের এত কথা দিয়েই বুঝি এরা শীত তাড়ায়, ভয় তাড়ায়, পেটের খিদে ভুলে থাকে। সাদ উল্লাহর চোখে আগুনের আলোয় সব মুখ একরকম দেখায়।
জাড়ের রাতগুলো এখানে লম্বা। খাওয়াদাওয়া চুকলে কোনও কোনও রাতে উঠোনে খড়ের আগুন জ্বেলে আসর বসে। কুয়াশা নামে, আগুনের ধোঁয়া আর কুয়াশা মিলে একাকার, গায়ে গা লাগিয়ে, গোল হয়ে, আগুনে হাত মেলে বসে হালিয়া-জালিয়ারা। কেউ পুঁথি ধরে, সুর করে পড়ে, বাকিরা ঝুঁকে শোনে, জঙ্গনামার লড়াই, বেহুলা-লখিন্দর, সত্যপিরের কাহিনি। যে পড়ে সেও সব কথার মানে জানে না, যারা শোনে তারাও না, ওরই মধ্যে কেউ কেউ চোখ মোছে। এক সময় পুঁথি বন্ধ হয়, তবু কেউ উঠতে চায় না। কেউ শোনায় বাঘের গল্প, কার শ্বশুরকে বাঘে নিয়েছিল ধানখেত থেকে। তারপর গলা নামিয়ে কেউ কেউ বলে মাশানের কথা, ‘জলার ধারোত্, চরের কুয়াশাত্ মাশান ঘোরে মাশান, একলা মানুষ পাইলে ঘাড় মটকি ধরে, সাঁইঝের পর ওটেগ সউগ কেউ যায় না, তোমরা কিন্তুক যান না বাহে ওদিক।’ সাদ উল্লাহ অর্ধেক বোঝে, অর্ধেক তার বোঝে না। গল্পগুজব চলে। সাহেবের খাজনা নাকি বছর বছর কড়া হচ্ছে। বুড়োরা এখনও ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের গল্প করে, অনাবৃষ্টির বছরের গল্প। সে-বছর নাকি মাঠে ধান ছিল না কোনও, ঘরে চাল ছিল না, মানুষ শাপলার ডাঁটা, বুনো কচু, গাছের ডাল, কলাগাছের ভেতরের শাঁস সেদ্ধ করে খেয়েছে। গাঁয়ের পর গাঁ উজাড় হয়েছিল, মরা সরানোর লোক মিলত না। নঈমুদ্দির পালিত পুত্র, আল্লারাখা তার নাম, যেন কোন অতীত থেকে স্মৃতি হাতড়ে বলে, ‘তকন মোর বয়স কত মুই জানোয় না, বাপের নাম ভুলি গেছং, খালি মনে আচে— মাও মোক বুলাই কয়া ডাকত, মাটি ফাটি ফাটি গেইছিল বাপো…’, সে হাতের চওড়া তালু দেখিয়ে বলে, ‘এই অ্যাদন হাঁ-করা ফাটল, সেই ফাটলোত্ মুই পাও থুইলে মোর মনে হইত, তলোত্ বুঝিল্ কায়ো শুতি আছে, এ্যালায় মোর পাও টানি ধরিবে’, বলে পিচিৎ করে পিক ফেলে হেসে ওঠে আল্লারাখা। ‘মোর মাও থাল বেচ্যে, রূপার মল বেচ্যে, ছাওনির চাল বেচ্যে, শেষত বেচপার কিছুই নাই, আর থাকলেও বা কায় কেনে, খরিদদারও নাই, মুই দেখছং, মোর বাপোক মোর মিচ্চ্যা অ্যাকনা মনে আচে, নাম্বা চওড়া মানুষ, শ্যাষে পাতার মতোন হাল্কা হয়া গেইছলো, শেষত একদিন উঠানোত্ বসি থাকি থাকি হেলি পড়ল, দেখছং মুই।’ কেউ একজন জিভে চুকচুক করে আফসোস করে, সবাই খানিক চুপ করে থাকে, কিন্তু আল্লারাখাকে যেন কথা পেয়ে বসেছে, সে বলে যায়, ‘মাও মচ্চে শাউনের এক রাইতোত, বিষ্টি অবশ্য নামিল্, বিষ্টি আগোত নামিল্, না মাও আগোত মরিল্, মুই জানোয় না, বিয়াংকা উঠি দেখং মাও মচ্চে, মুই জানোং না কোনটে যাইম, খালি জানোং, অ্যাটে থাকলে মুইও ওই ফাটলের তলাত শুতি থাকা মাইন্ষিটা হয়া যাইম। মুই হাঁটনু, জঙ্গলের ভিতিক হাইটপারে নাগনু, জঙ্গলোত মুই পাতা খাইসোং, কন্দ খাইসোং, ডেওয়াও পাইছ্নু। ভুক মাইনষোক পণ্ডিত বানায় বাহে, কোনটা খাইলে বাঁচা যায় আর কোনটা খাইলে মুখ দিয়া ফেনা বেরায়, সেই বিদ্যা মুই জঙ্গলোত ওই সাত দিনোতে শিখছোং, আর দেখং, কাদা মোর পাওয়ের তলুয়া গিলি খাইছে’, বলে, আবার পিচিৎ করে পিক ফেলে হেসে ওঠে আল্লারাখা, তারপর বলে, ‘মুই হেন্দুর ছইল আছনু না মুসলমানের ছইল আছনু তা মুই জানোয় না’, নইমুদ্দির দিকে ইঙ্গিত করে বলে, ‘উয়ায় মোক কুড়ি পাইসে, ওমায়ে মোর মাও, ওমায়ে মোর বাপ।’
তবু নাকি সে-বছরও খাজনা মাফ হয়নি, এখনও হয় না। অঘ্রানে ধান উঠলে আগে আসে তহশিলের পাইক, তার পেছনে মহাজনের লোক। গোলায় যা থাকে, তাতে ফাল্গুনও পেরোয় না। চোত-বোশেখে হাঁড়ি ভর্তি জলে সামান্য চাল দিয়ে পাতলা জাউ করে খায় লোকে, গেরস্তের ছেলেপুলে বিলে-জঙ্গলে গুগলি, শামুক, বুনো কচু খুঁজে বেড়ায়। সাদ উল্লাহ খাজনা-মহাজনি বোঝে না, কিন্তু মানুষের চোখে ভয় আর ক্ষুধার যন্ত্রণা চিনতে পারে। শুধু একেক সময় তার আশ্চর্য লাগে— এই যে এত নদী, এত জল, এমন অঢেল সবুজ দেশ, অথচ মানুষের পাতে খাবার থাকে না। মাপা জলের দেশ থেকে আসা যুবকের কাছে এর উত্তর মেলে না।

।। ৭ ।।

এক হাটবারে, সাদ উল্লাহ জ্বরে ধরা এক জালিয়াকে দাওয়াই খাইয়েছিল। তারপর যা ঘটল, তা অতি সামান্য একটি ঘটনা; অথচ ওইটুকুর ওপরে এই গল্প অনেকটাই দাঁড়িয়ে আছে। লোকটার নাম গদাধর। বাড়ি আরও উত্তরের এক জংলা গাঁয়ে। সেখানে নতুন আবাদ বসছে, জঙ্গল কেটে খুপরি তুলছে হালিয়া আর জালিয়ারা, অথচ ধারেকাছে কবরেজ দূরে থাক, ওঝাও মেলে না। জ্বর ছাড়লে লোকটা তার হাত চেপে ধরল, ‘হামারে দ্যাশোত চলেন ক্যানে, বাহে, আইসো ক্যানে হামার বাড়ি। মানুষগুলা অটেকোনা মরে বিনে চিকিৎসায়, খালি মরে আর মরে।’
জানা যায়, পরের এমনই কোনও এক হাটবারে, নইমুদ্দি আর আল্লারাখার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সাদ উল্লাহ গদাধরের সঙ্গে হাঁটা ধরেছিল। এমনই করে সে গিয়ে পৌঁছেছিল স্বর্ণামতি-ভাটেশ্বরী নদীর উপকণ্ঠে, ওই জংলা গাঁয়ে। স্থান নিয়েছিল গদাধরের কুটিরে। বাঁশঝাড় আর বেতবন এমন ঘন যে ভরদুপুরেও আঁধার হয়ে থাকে। বটপাকুড়ের ঝুরি নেমে পথকে রুদ্ধ করে রাখে। গেরস্ত বলতে দুই-চার ঘর। বাকিরা হালিয়া-জালিয়া। শিয়ালের হাঁক তো লেগেই আছে, একেক রাতে দূরের জঙ্গল থেকে ভেসে আসত গম্ভীর এক ডাক, আর আগুনের পাশে বসে ওরা বলত, ‘বাঘ। জঙ্গলের দিকোত কোনওমতে একা যাইমেন না কিন্তুক।’ আর কুয়াশা! সে অঞ্চলে কুয়াশা নামে না, যেন হেঁটে হেঁটে আসে। রাতে মাঠের ওপার থেকে সাদা হয়ে এগিয়ে আসে, গাছপালা ঘরদোর মানুষ সব গিলে নেয়, পাঁচ হাত দূরের জিনিসও যেন দেখা যায় না, আবার বেলা উঠলে যেমন এসেছিল তেমনি চলে যায়।
একবার সারাদিন হেঁটে সাদ উল্লাহ পার হল একটা ঘন জঙ্গল। বেত আর হিজল-করচের জঙ্গল, ভেতরটা ভিজে-ভিজে, ছায়া-ছায়া। হঠাৎ গাছপালা পাতলা হয়ে এল, তারপর জলের পর জল, তারও পরে আরও জল। ছোট-বড় সাত-আটটা বিল গায়ে গায়ে লেগে শুয়ে আছে। মাঝে মাঝে সরু ডাঙার আল, ধারে ধারে হিজল গাছ জলে পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে। কালো জল এত স্থির যে, আকাশের মেঘ নিজের ছায়া দেখে থমকে যায় যেন। পচা পাতার মিঠে গন্ধ, কাদার ভেতরে বুদবুদ, নলখাগড়ার ফাঁকে অদৃশ্য পাখির ডানা ঝটপটানির আওয়াজ। ডুবন্ত সূর্যের রং লেগে পুরো জলটা তখন কতকটা গলানো তামার মতো জ্বলছে। এমন দৃশ্য সে কোনওদিনও দেখেনি। পড়ন্ত বেলায় শাপলা ফুলের মুখ বুজে এসেছে, বকের সার সাদা টান হয়ে ফিরছে ঘরে, পানকৌড়ি ডুব দিচ্ছে আর ভাসছে বিলের জলে, কোথায় যেন একবার ডাহুক ডেকে উঠল, তারপর সব এত চুপ যে নিজের বুকের শব্দও শোনা যায়। সামনে শুধু জল, ডানার শব্দ, আর এমনিতর এক পড়ন্ত বেলা। সাদ উল্লাহ দাঁড়িয়ে রইল। যে টান তাকে ইস্পাহানের গলি থেকে টেনে এনেছে এতটা পৃথিবী— মরুভূমি, পাহাড়, বাজার, নদী— এই কি সেই টান? এই জলের ধারে দাঁড়িয়ে প্রথমবার তার মনে হল— দু’খানা পা যদি মানুষকে এত দূর বয়ে আনতে পারে, তবে মানুষ কি ক্ষুদ্র? সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। সে তখনও দাঁড়িয়ে।
হিজলতলায় প্রথমে উঠল পাতার ছাউনি। কয়টি রাত সাদ উল্লাহ কাটিয়েছিল হিজল গাছের গুঁড়ির কাছে, গায়ে চাদর টেনে। গদাধর খুঁজতে খুঁজতে হয়রান, পেল তাকে ওখানে। তারপর জঙ্গল-কাটা চাষিদের মধ্যে কথা ছড়াল। ওরা বলল, ‘অবুধ নাকি পচিমা ফকির?’ গদাধর ভাত আর মাছের সালুন রেখে যায়, বলে, ‘খায়া নেন, বাহে। না খায়া থাকলে শরীল টিক্পে ক্যাং করি?’ তারপর গদাধররা বাঁশ আনল, কেউ দিল খড়, দড়ি-দড়া। সাদ উল্লাহ নিজে বেত কেটে খুঁটি পুঁতল, হিজলের পাতা আর খড় দিয়ে মাথার ওপর ছাউনি বাঁধল। গদাধর রোজ এসে এসে হাত লাগাত। এভাবেই পাতার ছাউনি থেকে মাটির দেয়াল, মাটির দেয়াল থেকে ছোট কুঁড়ে উঠেছিল হিজলতলায়।
ধারেকাছে মানুষ বলতে বিলের মেছুয়া আর জঙ্গল-কাটা কয়েক ঘর চাষি। তারা দূর থেকে দেখত পচিমা ফকিরের কাজ কারবার। সারাদিন লোকটা জঙ্গলে ঘোরে, খন্তি দিয়ে শিকড় তোলে, রাতে তার কুঁড়েয় প্রদীপ জ্বলে। গদাধর ছাড়া তাকে তেমন কেউ ঘাঁটাত না। কেউ কেউ গদাধরকে শুধাত, ‘কী রে ফকির সারাদিন জঙ্গলোত ঘোরে? খায় কী?’ গদাধর বলত, ‘কোম্ব্যালা খায় কোম্ব্যালা খায় না, অদোন মানুষ মুই জন্মে দেখং নাই।’

একদিন সকাল সকাল জঙ্গলের দিকে থেকে হইচই। যদু প্রামাণিকের ছেলেকে কেউটেয় কেটেছে। জনাকয়েক লোক ছেলেটিকে চাদরের দোলায় ঝুলিয়ে কাঁধে করে বয়ে আনছে। কে একজন বলেছে, ‘ওই পচিমা ফকিরের কাছোত একবার ধরি গেইলে হয় বুঝি?’ যখন আনা হল, ছেলেটা তখন বেহুঁশ। যদু প্রামাণিককে বলতে শোনা গেল, ‘মোর ছাওয়াক বাঁচাও রে তোমরা!’ সাদ উল্লাহ ছেলেটার পা কোলে টেনে নিয়ে বসল। দংশনের ওপরে গিঁঠে গিঁঠে, কাপড় পাকিয়ে শক্ত বাঁধন দিল, ক্ষতমুখ চিরে কালচে রক্ত বার করে দিল খানিক; তারপর কুঁড়ে থেকে আনল কী এক লতার শুকনো শিকড়, শিলে ঘষে প্রলেপ দিল ক্ষতে, বাকিটা জলে গুলিয়ে অল্প অল্প করে ধরে রাখল ছেলেটার জিভে। মাঝেমধ্যে উঠে গিয়ে দাওয়াই বানানোর সময় লোকজনকে বারণ করে গেল, ওকে যেন কোনওভাবেই ঘুমাতে না দেয়। সারাদিন সারারাত যদু প্রামাণিক ছেলে আগলে বসে রইলেন। পরদিন ভোরবেলায় ছেলের ঠোঁট নড়ল, অস্ফুটে কী যেন বলল। দুপুরের দিকে চোখ মেলে ভাত চাইল।
ব্যস। সেই থেকে হিজলতলার কুঁড়ের পথে জ্বর, সাপে-কাটা, ভেদবমি, হাড়ভাঙা, ভূতে-পাওয়া মানুষদের বয়ে আনত মানুষ জঙ্গল পেরিয়ে। কেউ দিত এক পুঁটলি চাল, কেউ বিলের মাছ, কেউ কিছুই না, শুধু দু’হাত তুলে আশীর্বাদ। আর এই সময় থেকেই তাঁকে ঘিরে সেই কথাগুলোর শুরু। কথিত আছে, ঝড়ের রাতে তাঁর কুঁড়ের প্রদীপ নিভত না, তেল ফুরিয়ে গেলেও নাকি নিভত না। কেউ বলত, রোগী রওনা হওয়ার আগেই তিনি নাকি টের পেতেন। লোকে জঙ্গল পেরিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে পৌঁছে দেখত, পচিমা ফকির দাওয়াই নিয়ে বসে আছেন। গদাধর কিরে কেটে বলেছে, সে নাকি নিজের চোখে দেখেছিল একবার, ভরা শ্রাবণের জলে ভেসে আসা এক সাপ উঠে এসেছে ফকিরের দাওয়ায়, ফকির হাতের ইশারায় সরিয়ে দিয়েছেন সে সাপ। মেছুয়াদের বলতে শোনা যেত, চোতের যে-খরায় বিল শুকিয়ে কাঠ, গাঁয়ের সব ইঁদারা তলানিতে, সেবারও তাঁর ইঁদারায় নাকি জল শুকোয়নি। এসব কথার কতটা কী, তা এতকাল পরে ভেবে দেখা বৃথা। গল্প আমি যেভাবে জেনেছি, সেভাবেই লিখে যাচ্ছি।
এমনি করে ক’বছর কাটল। তারপর এল সেই বছর, যার কথা না বললে এ গল্পই হয় না। কাকিনিয়ার জমিদারবাড়িতে কান্নার রোল উঠল একবার। জমিদার রামরুদ্র রায়চৌধুরীর গিন্নিমা মৃত্যুশয্যায়। কী অসুখ হয়েছিল তাঁর, আজ আর জানবার উপায় নেই। জানা যায় শুধু, রাজবদ্যি জবাব দিয়েছেন, দূর-দূরান্ত থেকে আসা কবিরাজ-হেকিম একে একে বিদায় নিয়েছেন, এমনকী রঙ্গপুর শহর থেকে সাহেব ডাক্তারও নাকি এসেছিলেন চশমা-চোখে, চামড়ার ব্যাগ হাতে। তিনিও নাড়ি ধরে অনেকক্ষণ থেকে মাথা নেড়েছেন। জমিদার প্রায় অন্নজল ছেড়েছেন।
তখন কে একজন, জমিদারবাড়ির খাজনাতোলা গোমস্তার এক সঙ্গী, হিজলতলার ওই পশ্চিমা ফকিরের কথা জমিদারের কানে তুলল। সে নাকি সাপে-কাটার জান ফিরিয়েছে, জ্বরে-বেহুঁশ শিশু উঠিয়েছে, ভেদবমির রোগীকে জল ধরিয়েছে। ডুবন্ত মানুষ খড়কুটোও ছাড়ে না। জমিদার বললেন, ‘আনো তবে, শিগগিরই আনো।’ লোকলস্কর গেল, পালকি গেল। সাদ উল্লাহ পালকিতে উঠলেন না। বললেন, ‘চলো, আমি তোমাদের পায়ে পায়েই আসছি।’

।। ৮ ।।

জমিদারবাড়ির উঁচু ফটক পেরিয়ে সাদ উল্লাহ প্রবেশ করল। অন্দরমহলের দিক থেকে নারীকণ্ঠের অস্ফুট কথাবার্তা আর ধূপ-চন্দনের ঘ্রাণ ভেসে আসছিল। গিন্নিমা শুয়ে আছেন অন্তঃপুরের অন্ধকার ঘরে। কপালে জ্বরের আগুন, ঠোঁট শুকনো, চোখদু’টি বন্ধ। পাশে বসে দুই দাসী পাখা করছে, এক বৃদ্ধা রুদ্রাক্ষের মালা গুনছেন, আর দরজার বাইরে জমিদার রামরুদ্র রায়চৌধুরী হাঁটছেন এদিক-ওদিক, যেন মাটির ওপর পা রাখার জায়গাটি পাচ্ছেন না।
কয় দিন কয় রাত সাদ উল্লাহ জমিদারবাড়িতেই রইল। সঙ্গে রইল দুই দাসী, এক বিশ্বস্ত খাসনবিশ, আর দরজার বাইরে অপেক্ষারত দু’জন পাইক। দাসীরা কখনও গিন্নিমার কপালের ভেজা কাপড় বদলাল, কখনও সাদ উল্লাহ শেকড় বেটে অল্প রস করে দিল, দাসীরা গিন্নিমাকে তাই খাওয়াল। সাদ উল্লাহ দুধে সিদ্ধ ওষুধ বানিয়ে ছেঁকে ছেঁকে দিল। দাসীরা সময়ে সময়ে তাই নিয়ে গিন্নিমার মুখে তুলে দিল। মাঝে মাঝে সাদ উল্লাহ চুপ করে বসে কী একটা শুনত, যেন মৃত্যুশয্যায় শায়িতার নিশ্বাসের ভেতর দিয়ে দূরের কোনও শব্দ শুনছে। দাসী, খাসনবিশ আর পাইক-পেয়াদার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল, কী কী করেছিল ফকির সেই তিনদিন। মুখে মুখে চলে আসা সেসব কথা অনেকেই আজ বলতে পারে না। যাঁরা কতকটা বলতে পারতেন, তাঁরা আজ আর এই ধরাধামে নেই।
শুধু জানা যায়, চতুর্থ দিন ভোরে, ফজরের ওয়াক্তে, সাদ উল্লাহ অজু সেরে, কাচারির এক কোণে বসে নামাজ ধরেছিল। এমন সময় অন্তঃপুর থেকে এক দাসী ছুটে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে জমিদারকে জানাল, ‘গিন্নিমা চোখ মেলেছেন, উঠে বসে জল খেতে চেয়েছেন।’ অন্দরমহলে শাঁখ বেজে উঠল। জমিদার ছুটে এসে সকলকে অবাক করে দিয়ে ফকিরের দুই হাত নিজের হাতে তুলে নিলেন, কপালে ঠেকালেন। এমন কাণ্ড কেউ দেখেনি। সাদ উল্লাহ শশব্যস্ত হয়ে বলল, ‘আহা, কর্তাবাবু, আহা। যিনি সারালেন, তিনি তো আমি নই।’
তারপর সে কী কাণ্ড, যার জন্য নানার প্রপিতামহর সেই গাঁয়ের নাম হল আটবিল! জমিদার থালায় সাজিয়ে মোহর আনালেন। মোটা রুপোর থালা, তার ওপর লাল কাপড়, কাপড়ের ওপর থরে থরে সোনার মোহর। সাদ উল্লাহ মোহর নেড়েচেড়ে বলল, ‘কর্তামশাই, এসব আমি নিলে আমার ঝুলি… এ আমায় সাজে না, কর্তামশাই।’ জমিদার জমি দিতে চাইলেন, হাতি দিতে চাইলেন, সাদ উল্লাহ মাথা নাড়ে। শেষে জমিদার জেদ ধরে বসলেন— ফকিরকে খালিহাতে ফেরালে তাঁর ঘোর অকল্যাণ হবে। তিনি তাকে ছাড়েন না, কিছু না নিয়ে খালিহাতে তিনি তাকে যেতেই দেন না। সাদ উল্লাহ আরও ক’দিন জমিদারগৃহে কালাতিপাত করে একদিন বলল, ‘তবে এক কাজ করুন, কর্তামশাই। স্বর্ণামতি-ভাটেশ্বরীর ওপারে, জলা আছে যে, ও জলের মাছই গাঁয়ের মেছুয়া আর চাষিদের জান-পরান, ওটাই ওদের ভাত-কাপড়, একটি বিল না হয় লিখে দিন তবে আমাদের। ও-জলের মাছ যেন গরিব মেছুয়া-চাষিদের পাতে ওঠে বরাবরই, ও জলে যেন কারও মানা না চলে।’
জমিদার তা-ই লিখে দিলেন সনদ করে, তবে একটি নয়, আট-আটটি বিল, ফকিরের নামে।
শোনা যায়, নায়েব-গোমস্তারা ব্যাপারটা ভাল চোখে নেয়নি। আটটা বিলের জলকর তো কম কথা নয়, অতখানি আয় এক কলমে হাতছাড়া হওয়া দপ্তরের হিসেবের লোকদের সয় না। কিন্তু কর্তার হুকুম। সেরেস্তাদারের খাতায় নাকি তোলা হয়েছিল মোটে এক লাইন— পিরোত্তর দান, জলকর আটটি। কার অসুখ, কে সারাল, কীসের দান, খাতায় ওসব নয়, খাতার ধর্ম হিসেব রাখা। অবশ্য সে খাতাই বা আজ কোথায়। যা রইল, তা শুধু মানুষের মুখে মুখে। সাদ উল্লাহ সে বিলে কোনওদিন বেড়া দেয়নি, ইজারা তোলেনি। সে জলের মাছ পেয়েছে গাঁসুদ্ধ লোকে।

দিন গেল। মন বড় আশ্চর্য জিনিস, কাকিনিয়ার জমিদার রামরুদ্র রায়চৌধুরীর মন যে ভরে না। পরের শুকনো মরসুমে দেখা গেল, স্বর্ণামতির জল কেটে, দল বেঁধে মৈষালদের গাড়ি বোঝাই হয়ে আসছে ইট, চুন, সুরকি, সঙ্গে জমিদারবাড়ির মিস্ত্রি। হিজলতলার ভিটে উঁচু করে সেখানে উঠল ফকিরের এক গম্বুজ, তিন খিলানের ছোট্ট এক মসজিদ। সে বন-জলার দেশে ওই প্রথম পাকা ইমারত।
যে সন্ধ্যায় সেখানে আজান পড়ল প্রথম, সে সন্ধ্যার আওয়াজটা জলের ওপর দিয়ে গড়িয়ে গেল এক বিল থেকে আরেক বিলে। বকের সার উড়াল দিল, বেতবনে কী একটা জন্তু ডেকে উঠে থেমে গেল, জালিয়ারা জাল টানতে টানতে থমকে গিয়ে কতক্ষণ কান পেতে কী একটা শুনল। এ জঙ্গল অমন শব্দ আগে শোনেনি কখনও।
সেই মসজিদই হল সাদ উল্লাহর ঘরদোর। সেখানেই নামাজ, ব্যামো ধরা লোকের ধরনা, বারান্দায় গদাধরের পুঁচকে ভাইপো পুটু আর অন্য মেছুয়া-চাষার ছেলেপুলেদের নিয়ে পাঠশালার আসর, সেখানেই দিনানিপাত।
আশ্বিন এলে বাতাসটাই বদলে যেত। ভোরে শিউলির গন্ধ, বিলপাড় সাদা করে কাশফুল। দুর্গাপূজার সময় কাকিনিয়ার জমিদারবাড়ি তখন আলোয় আলো। ঢাক বাজত, বলি হত, দূর-দূরান্তের অতিথি আসত, ব্রাহ্মণভোজন চলত, সন্ধ্যারতির ধুনোর ধোঁয়ায় ঠাকুরদালান আচ্ছন্ন হয়ে থাকত। পুজোর আগের দিন, জমিদার লোক পাঠিয়ে সাদ উল্লাহকে আনিয়ে নিতেন নিমন্ত্রণে। উঠোনের এক পাশে তার জন্যে আসন পাতা হত, সামনে রেকাবিতে ফলমূল, নাড়ু, মোয়া। ঢাকের তাল চড়লে ধুনুচি হাতে নাচে কেউ, নতুন কাপড়-পরা ছেলেপুলেরা ছোটাছুটি করে।
ফেরার সময় ভেতরবাড়ি থেকে গিন্নিমা পাঠিয়ে দিতেন নাড়ু-মোয়ার পুঁটলি, পাঠশালার ছেলেপুলেদের জন্যে।

।। ৯ ।।

এদিকে বছর গড়াল। গাঁয়ের মানুষের ভেতরে ভেতরে একটা কথা পাকতে থাকে। মানুষটা একা। ভাত রাঁধে নিজে, কাপড় কাচে নিজে। অসুখ করলে দেখবার কেউ নেই। যদু প্রামাণিক আকারে-ইঙ্গিতে কথা পাড়েন, সাদ উল্লাহ হেসে উড়িয়ে দেয়। এমনি করে গেল কতকটা মাস দিন। শেষে এক সন্ধ্যায়, যদু প্রামাণিক জনাকয়েক লোক সঙ্গে নিয়ে মসজিদের বারান্দায় এসে বসলেন। এ-কথা সে-কথার পর গলা নামিয়ে বললেন, ‘ক্যা বাহে, মাইনষে তো চিরকাল থাকপে না। তা, তোমার পরে এই মসজিদোত বাতি জ্বালবে কে?’
বেতঝোপের গায়ে জোনাকি জ্বলছিল। দূরে কোথাও একটা রাত-পাখি ডাকল। সাদ উল্লাহ কিছু বলল না। যদু প্রামাণিক সাদ উল্লাহর নীরবতাকে হ্যাঁ ধরে নিলেন। সে অঞ্চলে তেমন মুসলমান বসতি ছিল না। পাশের গাঁয়ে কয়টা মুসলমান ঘর আছে। একটা মেয়ে পাওয়া গেল, অতি গরিব, বাপ-মা-মরা মেয়ে, মামার সংসারে মানুষ। আটপৌরে তামাটে শ্যামলা রং, মাঝারি গড়ন, শান্ত ডাগর দু’টি চোখ। ভোরের শিশিরলাগা দূর্বাঘাসের যেমন শ্রী, তেমন এক নিরাভরণ শ্রী ছিল তার। এক অঘ্রানের বিকেলে, নতুন ধানের মরসুমে, মেছুয়া আর চাষিরা, বিলের মাছ আর গুড়ের পায়েস রেঁধে সারা গাঁ মিলে সে বিয়ে দিল। পচিমা ফকিরের বিয়ে বলে কথা, হাসাহাসিও কম হল না।
এইখানে এসে আমাকে একবার থামতে হয়।
মেয়েটির নাম কী ছিল?
জানি না। আমরা কেউ জানি না। ছেলেবেলায় বড়দের মুখে এ গল্প যতবার শুনেছি, কথাটা জিজ্ঞেস করা হয়নি; যখন জিজ্ঞেস করার মতো বড় হলাম, বলার মানুষগুলোই একে একে চলে গেছেন। মুখে মুখে আসা ছয়-সাত পুরুষের ইতিহাসে কিছু কিছু নাম বুঝি এমনি করেই হারিয়ে যায়। তবু গল্প বলতে গেলে একটা নাম তো লাগে। ধরা যাক, তার নাম ছিল সোনাভান।
মসজিদের পাশে ছোট একটা ঘর উঠল। সোনাভান সে ঘর নিকিয়ে রাখত, উঠোনে লাউয়ের মাচা তুলত, সকাল সকাল ধোঁয়াওঠা ভাতের হাঁড়ি নামাত, আর রোগীর ভিড় সামলাত। দাওয়াই নিতে এসে কার ঘরের লোক না খেয়ে ফিরছে, কার গরু মরলে আগামী বীজধান জুটবে না, সেসব খবর রাখত সোনাভান। অনেক সময় সাদ উল্লাহ ওষুধ দিত, আর সোনাভান চালের মুঠো বেঁধে দিত।
দু’জনের ভাষাও তো এক ছিল না। সাদ উল্লাহর মুখের বুলি শুনে সোনাভান কোনও কোনও দিন হেসেই বাঁচে না। শুধরে দিলেও, সে আবার ভুল করত, আবার সেই হাসি। সংসার চলে যেত। ফজরের আগে উঠে সাদ উল্লাহ দেখত, অজুর জল গরম করা আছে। সেই ঘরে একে একে ছেলেমেয়ে এল। সাদ উল্লাহ হাটবার থেকে ফেরার পথে আনত কোনওদিন দুই ছড়া কলা, কোনওদিন নতুন গুড়ের পাটালি, ছেলেমেয়ের জন্য মাটির পুতুল আর কাঠের ঘোড়া। আর বছরে একবার কাকিনিয়ার চড়কের মেলা থেকে, সোনাভানের জন্য আলতা কী এক গাছি সিঁদুর-রঙা চুড়ি আর বাতাসা। সোনাভান বকত, ‘পয়সা উড়াইলেন ক্যানে?’ চুড়ি অবশ্য হাতেই উঠত। ঘরের চালে লাউ, উঠোনে মরিচের গাছ, হাঁস ক’টা চরে বিলের ধারে, বছর ঘোরে, খোঁয়াড়ে ছাগল ডাকে, গোয়ালে বকনা বাছুর। সন্ধ্যায় ছেলেমেয়ে ঘুমোলে দু’জনে দাওয়ায় বসত। সাদ উল্লাহ তামাক টানত, আর কুপির আলোয় দিনের রোগ-বালাইয়ের কথা টুকে রাখত। সোনাভান পাশে বসে জাঁতিতে সুপারি কাটত।
কখনও গভীর রাতে সোনাভান দেখত, সাদ উল্লাহ বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। এক মনে কী ভাবছে।
তারপরের বছরগুলোর গল্প জানা নেই। এইটুকু জানি, ওলাওঠা যে-বছর গাঁকে গাঁ উজাড় করছিল, রোগীর ঘর থেকে সবাই পালায়, সাদ উল্লাহ সে-সব ঘরে গিয়ে সেবা শুশ্রূষা করত।
কোন সনে সে চলে গেল, আমরা তা জানি না। তবে শুধু জানি, একবার ফজরের ওয়াক্ত পার হয়ে গেছে, মসজিদ থেকে সেদিন আর আজান শোনা গেল না। সোনাভান সকালে উঠে দেখল, তার চাদর নেই, লাঠি নেই। মসজিদের বারান্দায় প্রদীপের সলতে নিভে গেছে। কেউ বলল, হয়তো বিলের ওপারে গেছেন। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল, সন্ধ্যা হল, সন্ধ্যায় মসজিদের বারান্দার প্রদীপটা সেদিন সোনাভান নিজেই জ্বালল, অপেক্ষা করল। সে ফিরল না।
বহু বছর পরে, কাকিনিয়ার হাটে একবার ছাগল বিক্রি করতে গিয়েছিল গদাধরের ভাইপো পুটু। সে-ই খবর এনেছিল, কার মুখে শুনে এসেছে, দক্ষিণমুখে, ঘাঘট নদীর ওইপারে, ঘন অরণ্যঘেরা দুর্গম এক অঞ্চলে নাকি সাইদুল্লাহ নামে এক সাধকের কথা বহুদিন ধরে শোনা যায়। অনেক কথাই মানুষের মুখে-মুখে ফিরত তাঁকে নিয়ে। তার মধ্যে একটা কথা সবচেয়ে বেশি চালু। ইয়াসিন মুন্সি নামক এক লোক, এক শীতের রাতে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ফিরছিল বহুদূরের এক কুটুমবাড়ির দাওয়াত সেরে, পথে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছিল। ঘুরপথ এড়াতে তারা ধরেছিল বনের ভেতরের পথ। কিন্তু বন যত গভীর হয়, পথ তত সরু হয়ে শেষে মিলিয়ে যায়। রাত বাড়ল, শিয়ালের হাঁক কাছে সরে এল, শিশিরে কাপড় ভিজে সপসপ করতে লাগল। ইয়াসিন মুন্সি বহুবার আসমানের তারা দেখে দিক ঠাহর করার চেষ্টা করল, গাছের ফাঁকে তারাও দেখা যায় না। খিদেয় ছেলের নাড়ি জ্বলছে, আর চারদিকে সেই ঘন কালো বন, যার কোনও শেষ নেই। ছেলেটা শীতে, ভয়ে-ক্লান্তিতে কাঁদতে শুরু করল। ইয়াসিন মুন্সি যখন প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছে, তখন দূরে ঝোপ-জঙ্গলের আড়ালে তার চোখে পড়ল ফিকে-ফিকে আলো। আলো লক্ষ্য করে কাঁটা-লতা ঠেলে সে ছেলে নিয়ে এগোল। কিন্তু যতই এগোল ততই ইয়াসিন মুন্সির মনে হতে লাগল— এ যেন তারই চোখের ভিমরি, এত জোনাকি পোকা পৌষ মাসে সে জনমে দেখেনি, হতাশায় বুঝি সে চোখে ভুলই দেখছে এবার। তবু মন্ত্রচালিতের মতো ছেলের হাতটি ধরে সে সেদিকে এগোতে থাকল। তারপর হঠাৎ নজরে আসল, সামনে একফালি ফাঁকা জায়গায় একটা প্রদীপ জ্বলছে, আর সেই প্রদীপের পাশে, চোখ বুজে, পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে বসে আছেন এক বৃদ্ধ, সাদা দাড়ি বুক অবধি নেমেছে, গায়ে ছেঁড়া কম্বল। পায়ের শব্দে বৃদ্ধ চোখ মেললেন, তারপর ধীরে, তাঁর একটা হাত বাড়িয়ে দিলেন, মুঠোয় কী যেন ধরা। বললেন, ‘খা।’
ইয়াসিন মুন্সি বৃদ্ধের মেলে ধরা হাতের দিকে তাকিয়ে শিউরে ওঠে। তাঁর খোলা তালুতে কিলবিল করছে একদলা জ্যান্ত পোকা। বাপ-বেটা ভয়ে জড়সড় হয়ে পিছু হটতে যাবে, এমন সময় বৃদ্ধ গমগম করে উঠলেন, ‘খা…।’
সে-গলায় এমন কিছু ছিল যেটাকে অমান্য করার সাধ্য ইয়াসিন মুন্সির ছিল না। কী এক অন্ধ আতঙ্কে, কী এক সম্মোহনে, বাপ-বেটা, সেই কিলবিলানো দলা তুলে নিয়ে, চোখ বুজে নাক বন্ধ করে মুখে পুরে দিল। তারপর যা ঘটল, তা তারা মরণকাল অবধি কাউকে বুঝিয়ে বলতে পারেনি। জিভে ঠেকানোমাত্র নাকি তা মিঠাই হয়ে গিয়েছিল, এমন স্বাদ, যা এ-জগতের কোনও মিষ্টান্নে নেই— মধুর চেয়ে গভীর, যেন বুকের ভেতর অবধি জুড়িয়ে যায়। বাপ-বেটা অতঃপর, চোখ খুলে দেখে, সেই আলোও নেই, বৃদ্ধও নেই; শুধু ঝাঁক-ঝাঁক জোনাকিভরা অন্ধকার বন, আর তার ফাঁক গলে দূরে নিজের গাঁয়ের চেনা মাঠ।
ইয়াসিন মুন্সির এই কেচ্ছা, আরও কী কী সব কেচ্ছা শুনে আসত পুটুরা, কাকিনিয়ার হাট থেকে। আমাদের কয় পুরুষের মুখে মুখে চলে আসা সেসব কাহিনির মধ্যে এইটাই বেশি শুনেছিলাম আমার ছেলেবেলায়। তবে, পুটুদের গাঁয়ের সাদ উল্লাহ এবং ঘাঘট নদীর ওইপারের, ঘন অরণ্যঘেরা দুর্গম অঞ্চলে, ইয়াসিন মুন্সি ও তার ছেলেকে পোকাম্মৃত খাওয়ানো সাধক সাইদুল্লাহ, একই ব্যক্তি ছিলেন কি না, তার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গ্রামের আটবিল নামটি আজও আছে। বিলগুলো বুজে ধানখেত হয়েছে, বাঘ-শিয়ালের জঙ্গল কবেই সাফ, মসজিদটিও নতুন করে গড়া হয়েছে ক’বার। বাঘের ভয়ে, মাশানের ভয়ে, হাড় কাঁপানো জাড়ে, এক উঠোনে আগুন ঘিরে বসত যে-মানুষগুলো, সে-ভয়ও নেই, সে-আগুনও আর জ্বলে না। তবে মাঘের কুয়াশাটা আজও তেমনি আছে, ও-মুলুকে কুয়াশা নামে না, হেঁটে হেঁটে আসে, গাছপালা ঘরদোর মানুষ সব গিলে নেয়, তারপর বেলা চড়লে যেমন এসেছিল তেমনি চলে যায়।

°°°

চিত্রণ: রাজ রায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen − eight =

Recent Posts

নুশান জান্নাত চৌধুরী

নুশান জান্নাত চৌধুরীর ছোটগল্প

রাত-জ্বলা পোকা নু শা ন  জা ন্না ত  চৌ ধু রী ।। ১ ।। দক্ষিণে, শিরাজের তখত নিয়ে জান্দ আমিরদের নিজেদের ভেতর কামড়াকামড়ি। উত্তর থেকে

Read More »
শুভদীপ রায়চৌধুরী

শুভদীপ রায়চৌধুরীর কবিতাগুচ্ছ

কবিতাগুচ্ছ শু ভ দী প  রা য় চৌ ধু রী দৃষ্টি অন্ধের যষ্টির মতো ধরতে চেয়েছি অন্ধ আসলে কী ধরে? প্রতিবিম্ব? ছায়া? নাকি শান্ত অন্ধকারে

Read More »
দত্তাত্রেয় দত্ত

দত্তাত্রেয় দত্তর প্রবন্ধ

অজস্র ত্রুটি ও অপব্যাখ্যায় পরিকীর্ণ ব্রুকের এই ফাঁপা মহাভারত-নাট্য সম্বন্ধে সংক্ষেপে কিছু বলতে গেলে বলতে হয়, ওটা হলো মহাভারতের মলাট অবলম্বনে ব্রুকের বানানো একটা গপ্পো মাত্র: মহাভারতের নাম-না-শোনা পশ্চিমা দর্শকমণ্ডলীকে ঘেবড়ে দেবার জন্য তৈরি। তাই আমাদের দেশেও চট্ করে পশ্চিমা হয়ে যাবার লোভে অনেকেই ব্রুকের মহাভারতের স্তুতি গেয়ে থাকেন— বিশেষত তাঁরাই, যাঁরা মহাভারত পড়েননি।

Read More »
রথীন চক্রবর্তী

ইউক্রেন ভ্রমণ: রথীন চক্রবর্তী

ইউক্রেনে প্রথম দু’টি রাত র থী ন  চ ক্র ব র্তী যাক, শেষপর্যন্ত ইউক্রেনের মাটিতে পা রাখা সম্ভব হল! ভিসা পাওয়ার জন্য কলকাতায় নিজের অফিস

Read More »
মানব সাধন বিশ্বাস

ব্রিটিশ গল্প ।। অনুবাদ: মানব সাধন বিশ্বাস

পরিচয় ডরিস লেসিং মা ন ব সা ধ ন  বি শ্বা স ক্যাথারিনকে বলেছিলাম ওকে আমার আরেক কিশোর-বন্ধু ফিলিপের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব। ফিলিপ লন্ডন

Read More »
অরিজিৎ চক্রবর্তী

অরিজিৎ চক্রবর্তীর ছোটগল্প

ট্রমা-চিহ্নিত সেলফিগুলি অ রি জি ৎ  চ ক্র ব র্তী অজ্ঞাত পাণ্ডুলিপি থেকে উদ্ধারকৃত দু’টি টীকা (লেখকের নাম অনুপস্থিত। পাণ্ডুলিপির শেষ কয়েকটি পৃষ্ঠা বহু আগেই

Read More »