Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

স্বামী বিবেকানন্দ : প্রয়াণদিনে স্মরণ

স্বামী বিবেকানন্দ (১২.০১.১৮৬৩-০৪.০৭.১৯০২) তাঁর মাত্র উনচল্লিশ বছর আয়ুষ্কালে একশো বছরের কাজ করে গেছেন। এই বিশাল কর্মবহুল মানুষটি আসমুদ্র হিমাচল পদব্রজে ঘুরেছেন। ১৮৮৬-তে তাঁর গুরু ও পথপ্রদর্শক শ্রীরামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর ১৮৮৮ থেকে ১৮৯২ পর্যন্ত ছিল তাঁর এই ভারত ভ্রমণপর্ব। মুসলিম, খ্রিস্টান, এমনকি অন্ত্যজ মানুষের আতিথ্য নিয়েছেন, খেয়েছেন তাদের পরিবেশিত খাবার। দু-দুবার আমেরিকায় গেছেন, ঘুরেছেন ইয়োরোপের বহু দেশ, ইংল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, ভিয়েনা, ইস্তাম্বুল, সুইৎজারল্যান্ড, গ্রীস সহ আরও কিছু দেশ। এইসব ভ্রমণ তাঁকে একদিকে ভারত ও পৃথিবীর নানা সভ্যতা সম্পর্কে অবহিত করেছে, আর এর পাশাপাশি তিনি দেশবিদেশে বক্তৃতাদানের মধ্যে দিয়ে অগণিত মানুষের চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

তাঁর জীবনের কেন্দ্রীয় স্থানে রয়েছে শিকাগো ধর্মসম্মেলনে প্রদত্ত তাঁর ঐতিহাসিক বক্তৃতা, যা নানা দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে তিনি প্রাচীন সনাতন ধর্মের গুরুত্ব ও সর্বাতিশায়িতা তুলে ধরলেন, ভারতে মিশনারিদের আগমন, ও নির্বিচারে ভারতীয়দের খ্রিস্টান বানানোর চেষ্টা বহু পরিমাণে রদ করলেন, ব্রাহ্মধর্মের চেয়ে সনাতন ধর্মের গ্রহিষ্ণুতা বৃদ্ধি করলেন, এবং নিজে একজন আন্তর্জাতিক মানুষরূপে পরিগণিত হলেন। মনে রাখতে হবে, বিবেকানন্দই সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক বাঙালি তথা ভারতীয়। রবীন্দ্রনাথ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পান ১৯১২-পর্বে ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় যাওয়ার পর, এবং তার পরের বছর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির মাধ্যমে। কিন্তু এর প্রায় কুড়ি বছর পূর্বেই বিবেকানন্দ শিকাগো-বক্তৃতা ও আমেরিকা-ইয়োরোপে এক নাগাড়ে প্রথম দফায় চার বছর থাকার সুবাদে আমেরিকার বিদ্বজ্জনমহলে যেমন, তেমনই জার্মানির মাক্সমুলার, ফ্রান্সের রোমাঁ রোলাঁ, রাশিয়ার টলস্টয় প্রমুখের শ্রদ্ধা এবং মনোযোগ আদায় করেন।

অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার, বিবেকানন্দ শিকাগোতে বক্তৃতা দেবার আমন্ত্রণ পর্যন্ত পাননি। তিনি গিয়েছিলেন স্বেচ্ছায়, রবাহূতের মতো। এটা ভাবতে আশ্চর্য লাগে, বিশ্বধর্মসম্মেলনে খ্রিস্টীয়, ইসলামী ও ভারতের বৌদ্ধ, জৈন ধর্মের প্রতিনিধিরা আমন্ত্রিত হলেও কর্মকর্তারা ভারতের সনাতন ধর্মের কোনও প্রতিনিধিকে একেবারেই আমন্ত্রণ জানাতে ভুলে গেলেন কী করে! না কি এর পেছনেও কারও গোপন ষড়যন্ত্র ছিল? আমরা কিছুটা ব্রাহ্মধর্মপন্থীদের সন্দেহ করতে পারি, কেননা স্বদেশে ব্রাহ্মরা বিবেকানন্দকে অহরহ শত্রুতা করে গেছেন। শিকাগোতে আমন্ত্রিত ব্রাহ্মনেতা প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের আমেরিকায় বসে লাগাতার বিবেকানন্দের বিরুদ্ধে বলা, এ-ও এক প্রমাণ! হিন্দুধর্মের কেউ আমন্ত্রিত না হওয়ায় একদিক দিয়ে বিচার করে দেখলে তো শাপে বর-ই হয়েছে। কেননা তাহলে বিবেকানন্দ ওই অছিলায় ধর্মসভা থেকে বাদ পড়ে যেতে পারতেন।

বিবেকানন্দের প্রয়াণের সোয়াশো বছর অতিক্রম করল এবছর। এখন সালতামামি নেওয়া যাক, কী তাঁর অবদান, কেন তিনি আজকের দিনেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

প্রথমত, তাঁর যে অসীম মনোবল, যেকোনও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তাকে জয় করা, এ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি মনেপ্রাণে ছিলেন অদ্বৈত বেদান্তবাদী। মানুষ যে অনন্ত শক্তির আধার, সেকথা তিনি সর্বান্তঃকরণে বিশ্বাস করতেন। এক্ষেত্রে তাঁর গুরুই তাঁর পথপ্রদর্শক। কালীসাধক শ্রীরামকৃষ্ণ তোতাপুরীর মাধ্যমে দীর্ঘদিন বেদান্তসাধনাও করেছিলেন। আর তাইতে তিনি বলতে পেরেছিলেন, ‘অদ্বৈতের চাবি আঁচলে বেঁধে যথা ইচ্ছা তথায় যা’। বিবেকানন্দ এই মতের প্রায়োগিক দিকটি তুলে ধরেছিলেন, যাকে তিনি বলতেন ‘Practical Vedanta’। এই উদ্দেশ্যে তিনি নিউ ইয়র্ক ও ক্যালিফোর্নিয়ায় বেদান্ত সোসাইটি গঠন করেন। ভারতের মায়াপুরে গড়ে তোলেন অদ্বৈত আশ্রম।

দ্বিতীয়ত, জনপ্রিয়তা ও খ্যাতিলাভ ঘটলেও যে ধীরস্থিরভাবে লাভালাভ সহজে ও নিরহংকারী হয়ে গ্রহণ করতে হয়, তিনি আমাদের তা দেখিয়ে গিয়েছেন।

তৃতীয়ত, তিনি বারংবার একটা কথা বলতেন। অসৎ ও মিথ্যাচারী না হতে। আর কদাপি নিরাশায় না ভুগতে। জীবনের এই ইতিবাচক দিকগুলো তাঁর জীবন ও বাণী থেকে আমাদের শিক্ষনীয়।

চতুর্থত, তিনি একজন গেরুয়া পোশাকধারী ধর্মপ্রবক্তা হয়েও সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, অর্থনীতি, রাজনীতি, তুলনামূলক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি কেবল যে আগ্রহী ছিলেন তা নয়, ছিলেন এসমস্ত বিষয়ে চিন্তাচেতনায় অগ্রণী। জামশেদজি টাটাকে তিনি উৎপাদনশীল ব্যবসায় উৎসাহী করে তোলেন। বিশ্বের সেরা ধনকুবের রকফেলারকে অর্থোপার্জনের সঙ্গে সঙ্গে দানের উপদেশ দেবার ক্ষমতা রাখেন। এবং তা বিবেকানন্দের কাছে বিনা প্রাক্-ঘোষণা না দিয়ে এসে রকফেলার মানবেন বলে যান! তাঁর শিল্পবোধের পরাকাষ্ঠা এমনকি লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির ‘The Last Supper’ ছবিটিতে যে ভুল আছে, তা নির্দেশ করায়। তিনি ছবিটির সমালেচনা করে বলেছিলেন, যিশু প্রাচ্যের লোক। তিনি কখনও টেবিলে বসে আহার করতে পারেন না।

পঞ্চমত, সনাতনপন্থী এই মানুষটি পৃথিবীর সমস্ত ধর্মের প্রতি সমান আনুগত্য দেখিয়ে গিয়েছেন। বুদ্ধদেবের প্রতি ছিল তাঁর অপরিসীম শ্রদ্ধা। যিশু যদি তাঁর সময়ে জন্মাতেন, তাহলে নিজ বুকের রক্ত দিয়ে তাঁর পা ধুয়ে দিতেন তিনি, বলেছেন। আর হজরত মুহাম্মদ (সা:) ও বিশেষ করে ভারতের ইতিহাসে ইসলামের অবদান নিয়ে তো তাঁর বহু মন্তব্য রয়েছে, যা ঐতিহাসিক সত্য। অবশ্য এসব পরমতসহিষ্ণুতা শ্রীরামকৃষ্ণ থেকেই পেয়েছেন তিনি, যিনি ‘যত মত তত পথ’ বলেই খালাস ছিলেন না, ইসলামী মতের সাধনা করতে গিয়ে মসজিদে গেছেন নামাজ পড়তে, নিজের ঘরে যিশুর ছবি রেখেছেন!

বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত, হিন্দি, ফরাসি ও আরও কয়েকটি ভাষায় পারঙ্গম স্বামীজি ‘উদ্বোধন’ নামে যে বাংলা পত্রিকাটির জন্ম দিয়েছেন, ১২৭ বছর অতিক্রম করে বাংলাভাষার দীর্ঘতম আয়ুর পত্রিকা এটি। চলিত বাংলা ভাষা তাঁর হাত দিয়েই বেরোয় ব্যাপকভাবে, প্রমথ চৌধুরীর ‘সবুজপত্র’ প্রকাশের একযুগের-ও বেশি আগে।

এসব কি তাঁকে স্মরণ রাখার, তাঁর পথে চলার যথেষ্ট কারণ নয়?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × 4 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর চারটি কবিতা

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »
সালমিন রহমান

বেলুচিস্তান সংকট মোকাবিলা কতটা সহজ

বেলুচিস্তানের সংকটকে কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদ কিংবা কেবল নিরাপত্তা সমস্যার দৃষ্টিতে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি বোঝা যায় না। এখানে ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, প্রাকৃতিক সম্পদ, উন্নয়ন বৈষম্য, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা— সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্বাধীন বেলুচিস্তান গঠিত হলে বহু মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে পারে। একই সঙ্গে একটি নতুন রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াবে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা। অন্যদিকে, পাকিস্তান, চীন, ভারত এবং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

Read More »