Search
Generic filters
Search
Generic filters

স্বামী বিবেকানন্দ : প্রয়াণদিনে স্মরণ

স্বামী বিবেকানন্দ (১২.০১.১৮৬৩-০৪.০৭.১৯০২) তাঁর মাত্র উনচল্লিশ বছর আয়ুষ্কালে একশো বছরের কাজ করে গেছেন। এই বিশাল কর্মবহুল মানুষটি আসমুদ্র হিমাচল পদব্রজে ঘুরেছেন। ১৮৮৬-তে তাঁর গুরু ও পথপ্রদর্শক শ্রীরামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর ১৮৮৮ থেকে ১৮৯২ পর্যন্ত ছিল তাঁর এই ভারত ভ্রমণপর্ব। মুসলিম, খ্রিস্টান, এমনকি অন্ত্যজ মানুষের আতিথ্য নিয়েছেন, খেয়েছেন তাদের পরিবেশিত খাবার। দু-দুবার আমেরিকায় গেছেন, ঘুরেছেন ইয়োরোপের বহু দেশ, ইংল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, ভিয়েনা, ইস্তাম্বুল, সুইৎজারল্যান্ড, গ্রীস সহ আরও কিছু দেশ। এইসব ভ্রমণ তাঁকে একদিকে ভারত ও পৃথিবীর নানা সভ্যতা সম্পর্কে অবহিত করেছে, আর এর পাশাপাশি তিনি দেশবিদেশে বক্তৃতাদানের মধ্যে দিয়ে অগণিত মানুষের চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

তাঁর জীবনের কেন্দ্রীয় স্থানে রয়েছে শিকাগো ধর্মসম্মেলনে প্রদত্ত তাঁর ঐতিহাসিক বক্তৃতা, যা নানা দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে তিনি প্রাচীন সনাতন ধর্মের গুরুত্ব ও সর্বাতিশায়িতা তুলে ধরলেন, ভারতে মিশনারিদের আগমন, ও নির্বিচারে ভারতীয়দের খ্রিস্টান বানানোর চেষ্টা বহু পরিমাণে রদ করলেন, ব্রাহ্মধর্মের চেয়ে সনাতন ধর্মের গ্রহিষ্ণুতা বৃদ্ধি করলেন, এবং নিজে একজন আন্তর্জাতিক মানুষরূপে পরিগণিত হলেন। মনে রাখতে হবে, বিবেকানন্দই সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক বাঙালি তথা ভারতীয়। রবীন্দ্রনাথ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পান ১৯১২-পর্বে ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় যাওয়ার পর, এবং তার পরের বছর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির মাধ্যমে। কিন্তু এর প্রায় কুড়ি বছর পূর্বেই বিবেকানন্দ শিকাগো-বক্তৃতা ও আমেরিকা-ইয়োরোপে এক নাগাড়ে প্রথম দফায় চার বছর থাকার সুবাদে আমেরিকার বিদ্বজ্জনমহলে যেমন, তেমনই জার্মানির মাক্সমুলার, ফ্রান্সের রোমাঁ রোলাঁ, রাশিয়ার টলস্টয় প্রমুখের শ্রদ্ধা এবং মনোযোগ আদায় করেন।

অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার, বিবেকানন্দ শিকাগোতে বক্তৃতা দেবার আমন্ত্রণ পর্যন্ত পাননি। তিনি গিয়েছিলেন স্বেচ্ছায়, রবাহূতের মতো। এটা ভাবতে আশ্চর্য লাগে, বিশ্বধর্মসম্মেলনে খ্রিস্টীয়, ইসলামী ও ভারতের বৌদ্ধ, জৈন ধর্মের প্রতিনিধিরা আমন্ত্রিত হলেও কর্মকর্তারা ভারতের সনাতন ধর্মের কোনও প্রতিনিধিকে একেবারেই আমন্ত্রণ জানাতে ভুলে গেলেন কী করে! না কি এর পেছনেও কারও গোপন ষড়যন্ত্র ছিল? আমরা কিছুটা ব্রাহ্মধর্মপন্থীদের সন্দেহ করতে পারি, কেননা স্বদেশে ব্রাহ্মরা বিবেকানন্দকে অহরহ শত্রুতা করে গেছেন। শিকাগোতে আমন্ত্রিত ব্রাহ্মনেতা প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের আমেরিকায় বসে লাগাতার বিবেকানন্দের বিরুদ্ধে বলা, এ-ও এক প্রমাণ! হিন্দুধর্মের কেউ আমন্ত্রিত না হওয়ায় একদিক দিয়ে বিচার করে দেখলে তো শাপে বর-ই হয়েছে। কেননা তাহলে বিবেকানন্দ ওই অছিলায় ধর্মসভা থেকে বাদ পড়ে যেতে পারতেন।

বিবেকানন্দের প্রয়াণের সোয়াশো বছর অতিক্রম করল এবছর। এখন সালতামামি নেওয়া যাক, কী তাঁর অবদান, কেন তিনি আজকের দিনেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

প্রথমত, তাঁর যে অসীম মনোবল, যেকোনও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তাকে জয় করা, এ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি মনেপ্রাণে ছিলেন অদ্বৈত বেদান্তবাদী। মানুষ যে অনন্ত শক্তির আধার, সেকথা তিনি সর্বান্তঃকরণে বিশ্বাস করতেন। এক্ষেত্রে তাঁর গুরুই তাঁর পথপ্রদর্শক। কালীসাধক শ্রীরামকৃষ্ণ তোতাপুরীর মাধ্যমে দীর্ঘদিন বেদান্তসাধনাও করেছিলেন। আর তাইতে তিনি বলতে পেরেছিলেন, ‘অদ্বৈতের চাবি আঁচলে বেঁধে যথা ইচ্ছা তথায় যা’। বিবেকানন্দ এই মতের প্রায়োগিক দিকটি তুলে ধরেছিলেন, যাকে তিনি বলতেন ‘Practical Vedanta’। এই উদ্দেশ্যে তিনি নিউ ইয়র্ক ও ক্যালিফোর্নিয়ায় বেদান্ত সোসাইটি গঠন করেন। ভারতের মায়াপুরে গড়ে তোলেন অদ্বৈত আশ্রম।

দ্বিতীয়ত, জনপ্রিয়তা ও খ্যাতিলাভ ঘটলেও যে ধীরস্থিরভাবে লাভালাভ সহজে ও নিরহংকারী হয়ে গ্রহণ করতে হয়, তিনি আমাদের তা দেখিয়ে গিয়েছেন।

তৃতীয়ত, তিনি বারংবার একটা কথা বলতেন। অসৎ ও মিথ্যাচারী না হতে। আর কদাপি নিরাশায় না ভুগতে। জীবনের এই ইতিবাচক দিকগুলো তাঁর জীবন ও বাণী থেকে আমাদের শিক্ষনীয়।

চতুর্থত, তিনি একজন গেরুয়া পোশাকধারী ধর্মপ্রবক্তা হয়েও সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, অর্থনীতি, রাজনীতি, তুলনামূলক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি কেবল যে আগ্রহী ছিলেন তা নয়, ছিলেন এসমস্ত বিষয়ে চিন্তাচেতনায় অগ্রণী। জামশেদজি টাটাকে তিনি উৎপাদনশীল ব্যবসায় উৎসাহী করে তোলেন। বিশ্বের সেরা ধনকুবের রকফেলারকে অর্থোপার্জনের সঙ্গে সঙ্গে দানের উপদেশ দেবার ক্ষমতা রাখেন। এবং তা বিবেকানন্দের কাছে বিনা প্রাক্-ঘোষণা না দিয়ে এসে রকফেলার মানবেন বলে যান! তাঁর শিল্পবোধের পরাকাষ্ঠা এমনকি লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির ‘The Last Supper’ ছবিটিতে যে ভুল আছে, তা নির্দেশ করায়। তিনি ছবিটির সমালেচনা করে বলেছিলেন, যিশু প্রাচ্যের লোক। তিনি কখনও টেবিলে বসে আহার করতে পারেন না।

পঞ্চমত, সনাতনপন্থী এই মানুষটি পৃথিবীর সমস্ত ধর্মের প্রতি সমান আনুগত্য দেখিয়ে গিয়েছেন। বুদ্ধদেবের প্রতি ছিল তাঁর অপরিসীম শ্রদ্ধা। যিশু যদি তাঁর সময়ে জন্মাতেন, তাহলে নিজ বুকের রক্ত দিয়ে তাঁর পা ধুয়ে দিতেন তিনি, বলেছেন। আর হজরত মুহাম্মদ (সা:) ও বিশেষ করে ভারতের ইতিহাসে ইসলামের অবদান নিয়ে তো তাঁর বহু মন্তব্য রয়েছে, যা ঐতিহাসিক সত্য। অবশ্য এসব পরমতসহিষ্ণুতা শ্রীরামকৃষ্ণ থেকেই পেয়েছেন তিনি, যিনি ‘যত মত তত পথ’ বলেই খালাস ছিলেন না, ইসলামী মতের সাধনা করতে গিয়ে মসজিদে গেছেন নামাজ পড়তে, নিজের ঘরে যিশুর ছবি রেখেছেন!

বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত, হিন্দি, ফরাসি ও আরও কয়েকটি ভাষায় পারঙ্গম স্বামীজি ‘উদ্বোধন’ নামে যে বাংলা পত্রিকাটির জন্ম দিয়েছেন, ১২৭ বছর অতিক্রম করে বাংলাভাষার দীর্ঘতম আয়ুর পত্রিকা এটি। চলিত বাংলা ভাষা তাঁর হাত দিয়েই বেরোয় ব্যাপকভাবে, প্রমথ চৌধুরীর ‘সবুজপত্র’ প্রকাশের একযুগের-ও বেশি আগে।

এসব কি তাঁকে স্মরণ রাখার, তাঁর পথে চলার যথেষ্ট কারণ নয়?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

17 − twelve =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »