বৃষ্টির দেবতা হিসেবে ইন্দ্র পূজার ব্রত মালদা জেলার প্রাচীন বৈশিষ্ট্য। তবে আলাদাভাবে মন্দির তৈরি করে ইন্দ্রের উপাসনা বিরল। জেলার একমাত্র ইন্দ্র দেবতার মন্দির রয়েছে মানিকচকের মথুরাপুর সংলগ্ন ধনরাজ গ্রামে। প্রতি বছর বৈশাখ মাসের দ্বিতীয় তারিখে এই মন্দিরকে কেন্দ্র করেই বসে মেলা। তাতে সামিল হন আশপাশের প্রচুর মানুষজন। বাকি সারা বছর একেবারে লোকচক্ষুর অন্তরালে ঝুপসি আমবাগানে ছায়ায় ঢাকা পড়ে থাকে জেলার এই বিরল ও প্রাচীন দেবস্থানটি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসন বা পুরাতত্ত্ব বিভাগ কেউই কোনওরকম নজর দেয় না এই মন্দিরের দিকে।
মন্দিরের গায়ের লিপি সাক্ষ্য দেয় এই মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১২০০ বঙ্গাব্দের দোসরা বৈশাখ। সেই হিসাবে এই মন্দিরের বয়স দুশো ত্রিশ বছরের কাছাকাছি। তবে স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দাদের অভিমত– মূল জায়গাটি হল ইন্দ্র দেবতার থান। সেটি আরও অনেক বেশি প্রাচীন। মন্দিরটি তৈরি হয়েছে অনেক পরে। মূলত মেলাকেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনার জন্য মন্দিরটি তৈরি করে সংস্কার করা হয়েছিল।
এই থান সম্পর্কে বলতে গিয়ে নিকটবর্তী গ্রাম লালবাথানির অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক কালিসাধন মুখোপাধ্যায় বলেন, “ধনরাজ গ্রামটি মৎস্যজীবী অধ্যুষিত গ্রাম। এই অঞ্চলের প্রাচীন লোককথায় আছে, প্রায় ৩০০ বছর আগে গঙ্গার কোনও একটি খাঁড়িকে নির্ভর করে এই গ্রামের মৎস্যজীবীদের জীবিকা নির্বাহ হত। কিন্তু ওই সময় কোনও এক বছরের তীব্র চৈত্রের খরার ফলে খাঁড়িটি শুকিয়ে যায় এবং মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকার গুরুতর সমস্যা দেখা যায়। সেই সমস্যা থেকে মুক্তিলাভের আশায় তারা ইন্দ্র দেবতার পূজা আরম্ভ করেন এবং বৃষ্টি নামে। বাইরে প্রচুর ঘুরেছি আর কাজের সূত্রে জেলার নানা জায়গায় যাওয়ার সুযোগ ঘটেছে। কোথাও ইন্দ্র দেবতার মন্দির আছে বলে জানা নেই।”
বর্ষীয়ান কালিসাধনবাবুর এই মতকে সমর্থন করেন গৌড় কলেজের অধ্যাপিকা এবং মালদার লোকসংস্কৃতি গবেষক সুস্মিতা সোম। তিনি বলেন, “ইন্দ্রপূজার ব্রতের সঙ্গে গৌড়বঙ্গের একটি প্রাচীন যোগাযোগ আছে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মন্দির তৈরি করে ইন্দ্র দেবতার পূজা করার নিদর্শন আমার অন্তত চোখে পড়েনি। সাদুল্লাপুরের চারটি ঘাট-এর মধ্যে একটি ঘাটের নাম ইন্দ্রঘাট। তার একটি লোককথার অনুষঙ্গ রয়েছে। কিন্তু ইন্দ্র দেবতার মন্দির সেখানে কোনওভাবেই নেই। এই মন্দিরের অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ ও অভিনব।” তাঁর মতামতকে কার্যত সমর্থন করে এশিয়াটিক সোসাইটির গবেষক ড. অনিন্দ্যবন্ধু গুহ বলেন, “শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, ভারতবর্ষেও ইন্দ্র দেবতার মন্দির অত্যন্ত বিরল। এই মন্দিরটিকে ভারতবর্ষের একমাত্র বললেও হয়তো অত্যুক্তি করা হয় না।”
বাহন ঐরাবতের উপরে অধিষ্ঠিত ছত্রধারী দেবরাজ ইন্দ্র। তার দুই পাশে উত্তর ভারতীয় রীতিতে নির্মিত দুটি দ্বারপাল মূর্তি। এই মূর্তিভাবনা মন্দিরটির প্রাচীনতার সাক্ষ্য দেয়। মূল ইন্দ্র দেবতার থানটি সময়ের চাপে অবলুপ্ত হয়েছে। তবে মন্দিরের কয়েক হাত দূরে ইন্দ্রের থানসংলগ্ন শিবের থানটি এখনও স্বমহিমায় বিরাজমান।
ড. হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য তাঁর ঐতিহাসিক গবেষণাগ্রন্থ ‘হিন্দুদের দেব-দেবী: উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ’-এর প্রথম খণ্ডে অনাবৃষ্টির বৃত্রাসুরকে বধকারী ইন্দ্র দেবতার যে রূপকল্পনা করেছিলেন, তার সঙ্গে এই মূর্তিভাবনার সাদৃশ্য চোখ এড়ায় না– এমনই মত বিশেষজ্ঞ মহলের। বৈদিক মতকে ধরলে ইন্দ্র দেবতাদের মধ্যে প্রাচীনতম। সেখানে ইন্দ্র একটি পদের নাম– তিনি কোনও আলাদা দেবতা নন। শাস্ত্রমতে, তিনি স্বরাট অর্থাৎ একাই থাকেন। ধনরাজ গ্রামের নির্জন আমবাগানে এমন একা একাই পড়ে থাকে এই বিরল দেবস্থানটি।







One Response
অভিনব তথ্য!কীভাবে যাওয়া যায় মন্দিরটিতে?