Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

যেখানে বছরে একবার পুজো পান বৃষ্টির দেবতা!

বৃষ্টির দেবতা হিসেবে ইন্দ্র পূজার ব্রত মালদা জেলার প্রাচীন বৈশিষ্ট্য। তবে আলাদাভাবে মন্দির তৈরি করে ইন্দ্রের উপাসনা বিরল। জেলার একমাত্র ইন্দ্র দেবতার মন্দির রয়েছে মানিকচকের মথুরাপুর সংলগ্ন ধনরাজ গ্রামে। প্রতি বছর বৈশাখ মাসের দ্বিতীয় তারিখে এই মন্দিরকে কেন্দ্র করেই বসে মেলা। তাতে সামিল হন আশপাশের প্রচুর মানুষজন। বাকি সারা বছর একেবারে লোকচক্ষুর অন্তরালে ঝুপসি আমবাগানে ছায়ায় ঢাকা পড়ে থাকে জেলার এই বিরল ও প্রাচীন দেবস্থানটি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসন বা পুরাতত্ত্ব বিভাগ কেউই কোনওরকম নজর দেয় না এই মন্দিরের দিকে।

মন্দিরের গায়ের লিপি সাক্ষ্য দেয় এই মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১২০০ বঙ্গাব্দের দোসরা বৈশাখ। সেই হিসাবে এই মন্দিরের বয়স দুশো ত্রিশ বছরের কাছাকাছি। তবে স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দাদের অভিমত– মূল জায়গাটি হল ইন্দ্র দেবতার থান। সেটি আরও অনেক বেশি প্রাচীন। মন্দিরটি তৈরি হয়েছে অনেক পরে। মূলত মেলাকেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনার জন্য মন্দিরটি তৈরি করে সংস্কার করা হয়েছিল।

এই থান সম্পর্কে বলতে গিয়ে নিকটবর্তী গ্রাম লালবাথানির অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক কালিসাধন মুখোপাধ্যায় বলেন, “ধনরাজ গ্রামটি মৎস্যজীবী অধ্যুষিত গ্রাম। এই অঞ্চলের প্রাচীন লোককথায় আছে, প্রায় ৩০০ বছর আগে গঙ্গার কোনও একটি খাঁড়িকে নির্ভর করে এই গ্রামের মৎস্যজীবীদের জীবিকা নির্বাহ হত। কিন্তু ওই সময় কোনও এক বছরের তীব্র চৈত্রের খরার ফলে খাঁড়িটি শুকিয়ে যায় এবং মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকার গুরুতর সমস্যা দেখা যায়। সেই সমস্যা থেকে মুক্তিলাভের আশায় তারা ইন্দ্র দেবতার পূজা আরম্ভ করেন এবং বৃষ্টি নামে। বাইরে প্রচুর ঘুরেছি আর কাজের সূত্রে জেলার নানা জায়গায় যাওয়ার সুযোগ ঘটেছে। কোথাও ইন্দ্র দেবতার মন্দির আছে বলে জানা নেই।”

বর্ষীয়ান কালিসাধনবাবুর এই মতকে সমর্থন করেন গৌড় কলেজের অধ্যাপিকা এবং মালদার লোকসংস্কৃতি গবেষক সুস্মিতা সোম। তিনি বলেন, “ইন্দ্রপূজার ব্রতের সঙ্গে গৌড়বঙ্গের একটি প্রাচীন যোগাযোগ আছে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মন্দির তৈরি করে ইন্দ্র দেবতার পূজা করার নিদর্শন আমার অন্তত চোখে পড়েনি। সাদুল্লাপুরের চারটি ঘাট-এর মধ্যে একটি ঘাটের নাম ইন্দ্রঘাট। তার একটি লোককথার অনুষঙ্গ রয়েছে। কিন্তু ইন্দ্র দেবতার মন্দির সেখানে কোনওভাবেই নেই। এই মন্দিরের অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ ও অভিনব।” তাঁর মতামতকে কার্যত সমর্থন করে এশিয়াটিক সোসাইটির গবেষক ড. অনিন্দ্যবন্ধু গুহ বলেন, “শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, ভারতবর্ষেও ইন্দ্র দেবতার মন্দির অত্যন্ত বিরল। এই মন্দিরটিকে ভারতবর্ষের একমাত্র বললেও হয়তো অত্যুক্তি করা হয় না।”

বাহন ঐরাবতের উপরে অধিষ্ঠিত ছত্রধারী দেবরাজ ইন্দ্র। তার দুই পাশে উত্তর ভারতীয় রীতিতে নির্মিত দুটি দ্বারপাল মূর্তি। এই মূর্তিভাবনা মন্দিরটির প্রাচীনতার সাক্ষ্য দেয়। মূল ইন্দ্র দেবতার থানটি সময়ের চাপে অবলুপ্ত হয়েছে। তবে মন্দিরের কয়েক হাত দূরে ইন্দ্রের থানসংলগ্ন শিবের থানটি এখনও স্বমহিমায় বিরাজমান।

ড. হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য তাঁর ঐতিহাসিক গবেষণাগ্রন্থ ‘হিন্দুদের দেব-দেবী: উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ’-এর প্রথম খণ্ডে অনাবৃষ্টির বৃত্রাসুরকে বধকারী ইন্দ্র দেবতার যে রূপকল্পনা করেছিলেন, তার সঙ্গে এই মূর্তিভাবনার সাদৃশ্য চোখ এড়ায় না– এমনই মত বিশেষজ্ঞ মহলের। বৈদিক মতকে ধরলে ইন্দ্র দেবতাদের মধ্যে প্রাচীনতম। সেখানে ইন্দ্র একটি পদের নাম– তিনি কোনও আলাদা দেবতা নন। শাস্ত্রমতে, তিনি স্বরাট অর্থাৎ একাই থাকেন। ধনরাজ গ্রামের নির্জন আমবাগানে এমন একা একাই পড়ে থাকে এই বিরল দেবস্থানটি।

One Response

  1. অভিনব তথ্য!কীভাবে যাওয়া যায় মন্দিরটিতে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fourteen + 20 =

Recent Posts

কাজী তানভীর হোসেন

কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের বিস্ফোরণ: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক নীরব পূর্বাভাস

পণ্যের এই ভয়াবহ সঞ্চালন সংকটে পড়ে পুঁজিপতিরা এখন আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তাই অবিক্রীত পণ্য গছিয়ে দেওয়ার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞাপনের প্রচার চালানো হচ্ছে। এই সুযোগেই বিশ্বজুড়ে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েশন’ বা আধেয় নির্মাণের এক নজিরবিহীন বিস্ফোরণ ঘটেছে। যখন বিশ্বের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ দু’বেলা অন্নসংস্থানে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ইন্টারনেটে ছোটখাটো ভিডিও প্রচার করে ক্রিয়েটররা বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন। এটি আসলে জমে যাওয়া শ্রম ও পণ্যের এক অস্বাভাবিক বণ্টন প্রক্রিয়া। যে পণ্যের রিভিউ করে একজন ক্রিয়েটর লাখ লাখ টাকা আয় করছেন, সেই পণ্যের প্রকৃত উৎপাদনকারী শ্রমিক হয়তো আজ কর্মহীন কিংবা নিম্নতম মজুরিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চন্দ্রাবতী: বঙ্গের প্রথম পদকর্ত্রী

চন্দ্রাবতীর জীবনের যেটি শ্রদ্ধেয় দিক, তা হল গরলকে অমৃতে পরিণত করা। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোককে কাটিয়ে উঠে একাগ্রতা নিয়ে পঠনপাঠন‌ ও সৃষ্টিকর্মে মন দেন। পিতাকে সহায়তা করেন কাব্যরচনায়। ১৫৭৫ নাগাদ, যখন চন্দ্রাবতীর বয়স মাত্র পঁচিশ, সেসময় তিনি পিতার লেখা মনসার ভাসান-এ সহযোগিতা করেছিলেন। তারপর একের পর এক নিজস্ব রচনায় ভাস্বর হয়ে থাকে তাঁর কারুবাসনা।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইসলাম

হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি ‌বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের‌ সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়‌ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।

Read More »
তপোমন ঘোষ

কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে…

হঠাৎ চোখ পড়ে বুথের এক্সিট দরজাটার দিকে… একটা ছোট্ট ছায়া ঘোরাফেরা করছে! চমকে উঠে সে দেখে, সেই বাচ্চাটা না! মায়ের কোলে চড়ে এসেছিল… মজা করে পোলিং অফিসার তার ছোট্ট আঙুলে লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভোটের কালি। হুড়োহুড়িতে মা ছিটকে গেছে কোথাও— নাকি আরও খারাপ কিছু! বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে তার। শুনশান বুথে পোলিং আর সেক্টর অফিসার গলা যথাসম্ভব নিচুতে রেখে ডাকতে থাকেন বাচ্চাটাকে। একটা মৃদু ফোঁপানি… একটা হালকা ‘মা মা’ ডাক— বাচ্চাটা এইসব অচেনা ডাকে ভ্রূক্ষেপও করে না, এলোমেলো পায়ে ঘুরতে থাকে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধ: অন্ধকারে আলোর দিশারী

তিনি বলেন গেছেন, হিংসা দিয়ে হিংসাকে জয় করা যায় না, তাকে জয় করতে প্রেম ও ভালবাসা দিয়ে। মৈত্রী ও করুণা— এই দুটি ছিল তাঁর আয়ুধ, মানুষের প্রতি ভালবাসার, সহযোগিতার, বিশ্বপ্রেমের। তাই তো তাঁর অহিংসার আহ্বান ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে,— চীন, জাপান, মায়ানমার, তিব্বত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটানে। এই বাংলায় যে পালযুগ, তা চিহ্নিত হয়ে আছে বৌদ্ধযুগ-রূপে। সুদীর্ঘ পাঁচ শতাব্দী ধরে সমগ্র বাংলা বুদ্ধ-অনুশাসিত ছিল। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ বৌদ্ধ কবিদের দ্বারাই রচিত হয়েছে।

Read More »