জানালার ধারের ল্যাম্পপোস্টটার দিকে তাকালেই মায়ের কথা মনে পড়ে। সম্ভবত তাই সচরাচর জানালাটা বন্ধই থাকে। আসলে, জানালাটা খোলার ফুরসৎই পাই না। আর জানালাটা খুললেই আবীর-রঙা একটা আলোর কুণ্ডলী পাক খেতে খেতে ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতর। শুরু হয় ম্যাজিক। দেওয়ালের মায়ের ছবি থেকে নেমে আসে একটা সোনালি রাজহাঁস। সম্ভবত আমার মা। গায়ে লেবুপাতার গন্ধ। লেবুপাতার গন্ধ যে আমার প্রিয়, একমাত্র মা-ই জানত। প্রথম প্রথম আমার ভয় করত। প্রাণপণে জানালাটা বন্ধ করতে চাইতাম। কে যেন বাধা দিত। অসহায় নতজানু হয়ে মাকে প্রণাম করতাম। সঙ্গে সঙ্গে বাইরের ল্যাম্পপোস্টটায় নীল ভেপার জ্বলে উঠত। মা ফেলে যেত একটা করে মরসুমি ফল। এভাবেই গত দু’বছর প্রতি রবিবার মায়ের সঙ্গে সময় কাটাই।
আজ রবিবার। মায়ের কথা মনে পড়ল। জানালাটা খুলতে যেতেই আমার হাত চেপে ধরল ঝিমলি। অবিকল মায়ের মতো। অদ্ভুত শান্ত নিষ্পলক। হঠাৎই একটা বিদেশি ছবির কথা মনে পড়ল। প্রচণ্ড তুষারঝড়। নায়িকা পথ হারিয়ে ঠকঠক ঠকঠক কাঁপতে কাঁপতে ঢুকে পড়ে এক তরুণ চিত্রশিল্পীর স্টুডিওতে। শিল্পী তখন বিশাল ক্যানভাসে একজন শীতার্ত নারীর পোট্রেট আঁকছিল। তুলির আঁচড় দেখে মনে হচ্ছিল বহুদিনের অনভ্যাস বারবার বাধা দিচ্ছে শিল্পীকে। হঠাৎ নায়িকার দিকে চোখ পড়ায় সমস্ত ক্যানভাস সে সাদা করে দিল। তারপর প্রচণ্ড তুষারঝড়। এলোপাথাড়ি হাওয়া। লং শটে স্টুডিওটা আস্তে আস্তে দুমড়ে যাচ্ছে। ক্লোজ শটে একজন আর-একজনকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা। ‘এ টেল অব স্যাক্রিফাইস’। আমি আঁতকে উঠলাম। ঝিমলিকে প্রাণপণে জড়িয়ে ধরলাম। ঝিমলি পর্দাটা নামিয়ে দিল। নিস্তব্ধতা ভেঙে আমিই প্রশ্ন করলাম ঝিমলিকে— ‘গোল্লা কোথায়?’
‘উপরের ঘরে, প্রচণ্ড ব্যস্ত’। ইচ্ছাকৃত অনিচ্ছায় বলল ঝিমলি। এ মুহূর্তে ব্যস্ততা জানার ইচ্ছা আমার নেই। সপ্তাহ জুড়ে ব্যস্ততার মধ্যে আমি ক্ষণিকের জন্য চিন্তাহীন, ভাবনাহীন। গোল্লার কথা মনে পড়ে না। গ্যাস-ইলেকট্রিক বিলের কথা মনে পড়ে না। টেলিফোন রিং হতে হতে একা একাই থেমে যায়। ঘরের বাইরে ‘মদ্যপান নিষেধ’ ঝিমলির এই নোটিশের কথাও মনে পড়ে না। ঝিমলি এখন এলিফ্যান্টা কেভের সেই প্রাচীন নর্তকী। অসাধারণ ভঙ্গি প্রয়োগ। অদ্ভুত পরিতৃপ্তি। ঝিমলি এবার যুদ্ধ তোমার আর আমার জন্য। ওর চোখ বন্ধ। কপালের গাঢ় লাল সিঁদুর টিপ কপোল বেয়ে আমার লোমশ বুকে মিলিয়ে যেতে থাকে ক্রমশ। সূর্য যেন অস্তগামী। আচমকা একটা চড়াই এসে বসে আমাদের জানালায়। আমাদের ঘুম ভেঙে যায়।
‘ড্রয়িং রুমে আয়রনটা অন করে এসেছি।’ তড়িঘড়ি উঠে যায় ঝিমলি। আমিও বাথরুম থেকে সোফায় এসে বসলাম। রিমোটটা ক্লিক করতে করতে শেষপর্যন্ত টিভিটা বন্ধ করে কাগজের ওপর চোখ রাখতেই ঝিমলি ওষুধ আর জল নিয়ে হাজির। স্নেহের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে। অবশ্য বরাবরই ও আমার দিকে স্নেহের দৃষ্টিতেই তাকাত।
‘ক্যান আই এগেইন হিয়ার বাবা ফ্রম আ নিউ কিড ম্যাডাম?’ বলেই হেসে ফেললাম। লজ্জায় মৃদু ধাক্কা দিয়ে ঝিমলি বলল— ‘আই থিঙ্ক সো।’
আমি আনন্দে ঝিমলিকে জড়িয়ে ধরলাম। হঠাৎই মায়ের কথা মনে পড়ল। কী অসম্ভব ভালবাসত ঝিমলিকে। ঝিমলি আমায় কিছু একটা বলতে চায় এখন। কী বা বলবে? গত চোদ্দো বছর যাবৎ অর্থাৎ গতকাল ডিনারে আমায় যা বলেছিল তাইই বলবে— ‘তুমি আবার লিখতে শুরু করো প্লিজ।’ অবশ্য এটা ওর দোষ না। আমাদের বিয়ের আগে থেকেই ওর একটা দৃঢ় ধারণা ছিল, আমি বড় মাপের লেখক। আমি আমার প্রতিভার অপব্যবহার করেছি, এখনও করছি… ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি এ ব্যাপারে কোনও দিনই বিশেষ মাথা ঘামানোর প্রয়োজন বোধ করিনি বা এখনও করি না। হ্যাঁ, যৌবনে আবেগের বশে প্রেম করার মতোই কিছু লেখালেখি করেছি, একটু-আধটু পিঠ-চাপড়ানিও পেয়েছি। অ্যাওয়ার্ড উইনার হবার স্বপ্ন যে দেখিনি তা নয়। এখন ওসব আমার কাছে ক্লিশে। আর্নিং মানি, গো ফর মানি— এ চিন্তায় অনেক শান্তি। কবিতা পড়ার চেয়ে মিস্টার দত্তের ছেলের বিয়ের পার্টি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তারপর ঝিমলির কাছে গোল্লার স্কুল, ক্রিকেট, সুইমিংয়ের খোঁজ নিতে নিতেই সন্ধে।
ঝিমলি এখন ঠাকুরঘরে। আজ রবিবার। সন্ধে সাতটা পনেরো মিনিট। একটু অবাক লাগল। সনিতে ডিজনির কার্টুন স্ট্রিপ— ‘আ জঙ্গল বুক’। গোল্লা তো ওটা মিস করে না। অথচ এখনও ও নিচে নামেনি। অসতর্কভাবেই পা বাড়ালাম সিঁড়ির দিকে। লাইব্রেরির আলো জ্বলছে। লাইব্রেরিতে ঢুকতেই চোখে পড়ল টেবিলের ওপর ছড়ানো-ছিটানো গাদাগুচ্ছের পুরনো ম্যাগাজিন। তার মধ্যে মাথা গুঁজে গোল্লা। টেবিলের কোণে ‘অতঃপর’-এর একটা পুরনো কপি। সম্ভবত আমার একটা কবিতা ছিল। পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে হঠাৎ চোখে পড়ল, একজন কবির নামের তলায় গাঢ় লাল পেন্সিলের দাগ। স্বয়ং আমার নামের তলায়। কবিতাটা আবার একবার পড়ে ফেললাম। মনে পড়ে গেল, কেন, কার উদ্দেশে এই কবিতাটা লিখেছিলাম। হোয়াট আ টিক্স ফর মেকিং আ লভ। আসলে, আমাদের সব সৃষ্টিই আরোপিত, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমার মনে হয়, ভগবানও আমাদের সৃষ্টি করেন নিজের এনজয়মেন্টের জন্য। গোল্লার চোখ তখন একটা কোলাজ গল্পের ওপর। খুব সম্ভবত ‘রঞ্জক’-এর পুজো সংখ্যায় বের হয়েছিল। আমি একবার দেখেই চিনতে পেরে গেছি। এই হল মানুষ, নস্টালজিয়া তাকে অ্যাটাক করবেই। এই মুহূর্তে আমার বয়সও একধাক্কায় নেমে গেল তেইশে। আমি গল্পটাকে লেখার চেষ্টা করেছিলাম। সেই সময় আমার সততা ছিল, রাগ ছিল, ক্রোধ ছিল বলেই পারিনি। আমি দায়বদ্ধ ছিলাম গল্পটাকে শেষ করতে। পারিনি। ঝিমলি ইনসিস্টও করেছিল। পারিনি। এখন তো প্রশ্নই ওঠে না। মিস্টার দাস এখন নেগোসিয়েশনে বিশ্বাসী। স্বার্থপর। বউ-বাচ্চা ছাড়া কিছুই ভাবতে পারে না। ভাববেও না। আজ রবিবার। এই প্রথম চল্লিশের মিস্টার দাস নিজের তেইশের কাজে কীরকম লজ্জিত, মুহ্যমান, অপরাধী। মায়ের কথা মনে পড়ল। আমি নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলাম।
‘গোল্লা পড়াশুনা বাদ দিয়ে পুরনো যতসব পত্রিকা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছে, আর লাল পেন্সিল দিয়ে আমার নামের তলায় দাগ বোলাচ্ছে!’ অভিযোগের সুরে ঝিমলিকে বললাম। ঝিমলি কোনও উত্তর না দিয়েই গুনগুন করে গান ভাঁজতে ভাঁজতে কিচেনে ঢুকে গেল। সম্ভবত ও পুরো ঘটনা ওয়াকিবহাল।
আমার মাথায় একটা চিন্তা তখন ক্রমশ গ্রাস করছে, ওসব লেখা পড়ে ছেলেটা করবেটা কী? তার পর ওসব বোঝার বয়সও হয়নি। রিমোটটা ক্লিক করে টিভির সাউন্ডটা একটু বাড়িয়ে দিলাম। টিভিতেও ওয়েদার ফোরকাস্ট চলছে, ‘পশ্চিমবঙ্গ ও উড়িষ্যার উপকূলবর্তী বঙ্গোপসাগরে ঘন নিম্নচাপ জমা হচ্ছে, আগামী কয়েকদিন গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ বিশেষ করে কলকাতা, হাওড়া, হুগলী, নদীয়া জেলার উপর দিয়ে তীব্র বজ্র-বিদ্যুৎ সহ বৃষ্টি এবং ঘণ্টায় প্রায় একশো পঞ্চাশ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়ার সম্ভাবনা আছে। যারা গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান তাদের বিপদ সংকেত দেওয়া হয়েছে।’ তার পর— ‘দ্যাখো আমি বাড়ছি মামি— আই অ্যাম আ কমপ্লান বয়।’ একটু পরেই শুরু হবে ‘ঘরসংসার’। টিভি রেটিংয়ে একনম্বর বাংলা সিরিয়াল। একদিন দেখেছিলাম। সেন্টিমেন্টাল সুড়সুড়ি। আজ দেখব। সময়টা যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে ঘাড়ের কাছে। ‘গোল্লা ওসব লেখা পড়ে করবেই বা কী?’ নিত্য রুটিনমাফিক গ্যাস-সংসার নিভিয়ে ঝিমলি টিভির সামনে। সুজাতা নাম্নী এক যুবতীর খুনের ইনভেস্টিগেশন করছে পুলিশ অফিসার দেবদাস দত্ত। অনিমেষ খুন করেনি। দেবদাসবাবুও সেটা জানে। আমাদের দেশের যা আইন, অনিমেষ লকআপে। ওদিকে তখন হরিপদ মুখার্জির বউ দুলাল রায়ের সঙ্গে উত্তুঙ্গ প্রেমে মত্ত। অথচ শান্তিদেবী সত্যিই ভাল মহিলা। ছেলেমেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সবই সহ্য করে যাচ্ছে। যার জন্য এতসব, সেই দুলাল রায়কে কিন্তু অনিমেষ ছাড়াবে না। ও সুজাতাকে ভালবাসত। অসহ্য। টেবিলের ওপর থেকে রিমোটটা নিয়ে বিবিসি-তে ক্লিক করতেই খ্যাঁক করে উঠল ঝিমলি। আবার ডিডি সেভেন। একটা সিগারেট ধরালাম। বাইরে বেরিয়ে এলাম। ‘গোল্লা ওইসব লেখা পড়ে করবেই বা কী?’ বাইরেও সেই একই আওয়াজ— ‘মাননীয় জজ সাহেব, সুজাতাকে মেরে ফেলেছে ওর মা ওর বাবা। ওর মা ওর বাবা নিজেদের অপকর্ম ঢাকতেই সুজাতাকে হত্যা করিয়েছে দুলাল রায়কে দিয়ে।’ ‘দ্য কোর্ট অ্যাডজয়েন্ট ফর দিস ডে।’ কোর্টের মধ্যে কোলাহল, বেজে উঠল সেই থিম সং, ‘হারিয়ে যাব বলে আসিনি…’।
রাত দশটা পনেরো।
‘গোল্লাকে ডাকো তো।’ বলল ঝিমলি। ‘বলো, খেতে দিয়েছি।’
‘গোল্লা, গোল্লা…’।
পাঁচ-ছ’বার ডাকা সত্ত্বেও কোনও উত্তর না পেয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালাম। কী রকম একটা সংকোচ হচ্ছে। আবার সেই পুরনো লেখালেখি। বুকটা হঠাৎ ছ্যাঁক করে উঠল। উপরের ঘরে সব আলো নেভা। রাস্তার ভেপার ল্যাম্পের আলোয় ঠাওর করলাম গোল্লা অন্ধকারে ওর ঘরে শুয়ে।
‘নিচে চলো, মা খেতে দিয়েছে—’।
ওর স্কুল-ক্রিকেটের কথা জিজ্ঞাসা করলাম। কোনও উত্তর দিল না। আমার পাশ কাটিয়ে তরতর করে নেমে গেল। মা না-পেরে এবার ছেলেকে নিয়ে সেন্টিমেন্টাল অ্যাটাক শুরু করেছে। আমাকে দিয়ে লিখিয়েই ছাড়বে। নিজের প্রতি কী রকম একটু করুণা হল। ওরে বাবা! যৌবনে লিখেছি তোর মায়ের জন্য আর এই বুড়ো বয়সে লিখতে হবে তোর জন্য! নিজের জন্য সারা জীবনে একটা লেখাও হল না। মনে হয়, কোনও সৃষ্টিকর্তাই নিজের জন্য কিছুই সৃষ্টি করে না।
ডাইনিং টেবিলের আবহাওয়া আজ বেশ থমথমে। ঝড়ের পূর্বাভাস। চোরের মতো মাথা নিচু করে তিনটি প্রাণী খেয়ে যাচ্ছি। ‘সবাই কি সবার নিজের অস্তিত্বের কথা চিন্তা করছে?’ ‘গোল্লা ওসব লেখা পড়ে করবেই বা কী?’
‘গোল্লা, আমি যে লেখালেখি করতাম তুমি জানলে কী করে? দেখো বাবা, ছোট বয়সে সবাই একটু-আধটু লেখালেখি করে, তুমিও করবে। আমি তো আর সাহিত্যিক নই যে, সারা জীবন লেখালেখি করব। তোমার মা নিশ্চয়ই…’।
ঝিমলি খ্যাঁক করে উঠল, ‘মায়ের কথা আসছে কেন?’
আমি হাসতে হাসতে পরিবেশটাকে লঘু করার চেষ্টা করলাম। ‘তোমাকে রেগে গেলে আজকাল দারুণ সুন্দর লাগে—’।
আমার কথায় ঝিমলি আরও গম্ভীর হয়ে গেল। গোল্লাই নীরবতা ভাঙল— ‘মা বাবার শরীরে কি একটা কুকুর ছিল?’
আমার বুঝতে অসুবিধা হল নয়। ঝিমলির তো নাই-ই। আমার লেখা ও আমার থেকে বেশিবার পড়েছে।
‘হঠাৎ এটা মাথায় এল কেন তোমার?’ ঝিমলি বলল।
‘‘ওই যে, বাবা ‘একটা উপন্যাসের খসড়া’-য় লিখেছে, ‘আমি আমার ভেতরের কুকুরটাকে আটকে রাখার চেষ্টা করি। তীব্রভাবে চেষ্টা করি।’’’
‘ওই লেখা বোঝার বয়স তোমার হয়নি, তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও।’
‘বলো না মা, সত্যি ছিল?’
‘বলছি তো বুঝবে না। আমাদের প্রত্যেকের ভিতর একটা কুকুর থাকে। যে ওটাকে বেঁধে রাখতে পারে সে ভাল লোক, যে ছেড়ে দেয় সে খুব দুষ্টু। নাও খেয়ে নাও।’
গোল্লা উদাসীন হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, ‘মা, আমার ভিতরেও কুকুর আছে?’
‘বাবা, এখন তুমি বুঝবে না। একটু বড় হও। আরও পড়াশুনো করো। তোমার ভিতরেও একটা কুকুর আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। তোমার ভাতগুলো মেখে দেব?’
‘আচ্ছা বাবার কুকুরটা কি এখনও বেঁচে আছে?’
ঝিমলি এবার আমার দিকে তাকায়। আমি মাথা নিচু করে ভাতের ভিতর আঙুল দিয়ে বিলি কাটতে থাকি। হঠাৎ মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। ঝিমলি অস্বস্তিতে পড়ে গেছে।
‘বলো না মা, বেঁচে আছে?’ আবার প্রশ্ন করে গোল্লা।
ইচ্ছাকৃত রাগের ভান করে ঝিমলি। ‘তোমাকে বার বার বলছি, বুঝবে না, একটু পড়াশুনা করো, বড় হও।’
‘বলো না মা, বেঁচে আছে?’
পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে। ঝিমলি রাগত স্বরে বলে ওঠে— ‘না বেঁচে নেই, মরে গেছে।’
‘কী করে মরল মা? কে মারল?’
ঝিমলি সম্ভবত এতবড় সমস্যায় কখনও পড়েনি। আমি এখন শ্রোতা মাত্র।
‘কী করে মরল মা?’ আবার প্রশ্ন করে গোল্লা।
‘আমি মেরেছি— নাও খেয়ে নাও।’
‘তুমি! মা তুমি কুকুর-শিকারী!’
ঝিমলির মধ্যেকার তীব্র সংকট ওর চোখেমুখে প্রকাশ পাচ্ছে। আমি মাছের বাটি থেকে একটা চিংড়ি গোল্লার থালায় তুলে দিলাম। চিংড়ি গোল্লার খুবই প্রিয়। হঠাৎই গোল্লা খাওয়া ফেলে উঠে চলে গেল। আমি ডাকলাম। উত্তর দিল না।
গত রাত থেকেই শুরু হয়েছে প্রবল ঝড়বৃষ্টি। সারাদিন একটু ধরছে তো পরক্ষণেই আবার ঝমঝমিয়ে আসছে। গোল্লা অসম্ভব গম্ভীর হয়ে গেছে। কারও সাথে বিশেষ কথা বলে না। একসাথে খবরের কাগজ পড়তাম, তাও বন্ধ। আমার ওপর প্রবল ঘৃণা, বিদ্বেষ, রাগ। আমি অফিসে যাই-আসি। ঝিমলি-গোল্লার সাথে কী রকম একটা কমিউনিকেশন গ্যাপ তৈরি হচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার। স্কুল থেকে এসেই গোল্লার ধুম জ্বর। এখন সন্ধে। সোফায় আমি চায়ের কাপ হাতে, ঝিমলি বিছানায়, মাঝে নীরবতা।
হঠাৎ ঝিমলি বলল, ‘আজ কি হয়েছে জানো?’
আমি ওর দিকে তাকালাম।
‘‘স্কুল থেকে এসে গোল্লা আমায় বলল, ‘মা তুমি বাবার সাথে শুয়ো না। তোমার জলাতঙ্ক হতে পারে। আচ্ছা মা, বাবা তো আমায় অনেকবার চুমু খেয়েছে, আমার কিছু হবে না তো?’’’
কোনও কথা না বলেই আমি সোফা ছেড়ে, সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালাম। আস্তে আস্তে গোল্লার মাথার কাছে এসে দাঁড়ালাম। পাথরের মতো শুয়ে। আমার হাতটা ওর মাথায় রাখলাম। পাপড়ি খোলার মতো ওর চোখদুটো একবার খুলল। আমাকে দেখেই এক ঝটকায় আমার হাতটা সরিয়ে দিল। এই বুঝি বাপের কুত্তাটা ওর ভিতর ঢুকে গেল। হঠাৎ মায়ের কথা মনে পড়ল। আমি আবার সোফায় এসে বসলাম।
‘মা, আমার না জল দেখলে কী রকম ভয় করছে।’
‘বাবা, ওসব বলতে নেই, তোমার বাবা কত কষ্ট পেয়েছে জানো?’
‘সায়ন্তন, রাহুল ওদের বাবাদের ভিতর তো কোনও কুকুর-টুকুর বাঁধা ছিল না। আমি ওদের জিজ্ঞাসা করেছি। বাবার ভিতর কী করে কুকুর হল? কেনই বা বোকার মতো সেটাকে বেঁধে রাখতে গেল?’
‘ওসব ছাইভস্ম চিন্তা করে না বাবা, তুমি বড় হলে বুঝবে, তোমার বাবা কত ভাল লোক। এখন চোখ বুজে বিশ্রাম করো।’
‘ভাল লোক না তো ছাই! তুমি না থাকলে কুকুরটাই তো বাবাকে খেয়ে ফেলত— তখন মজা বুঝত, কুকুর বেঁধে রাখার মজা।’
‘গোল্লা, কী সব বলছ?’
আমি চোখ বন্ধ করলাম।
রাতে গোল্লার জ্বর আরও বাড়ল। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে গোল্লা প্রলাপ বকছে— ‘মা, আমার ভিতর একটা কুকুর জন্মাচ্ছে। কুকুরটা কীরকম আমার নাড়িভুড়ি ছিঁড়ে খাচ্ছে।’
‘কী বকবক করছ? তোমার কী হয়েছে বলো?’
মায়ের দিকে তাকিয়ে গোল্লা উদাসীন ভঙ্গিতে বলে উঠল— ‘মা, আমার ভিতর কুকুর জন্মালে তুমি মেরে দিয়ো।’








4 Responses
উড়ানকথা আবার পড়তে চাই।
বাচ্চা ও মা বাবার পারস্পরিক বিরোধী মনস্তত্ত্ব দারুণ চিত্রিত হয়েছে Https, এটা একটা সামাজিক সমস্যা ও
জাদু বাস্তবতার কথনরীতি এক নিজস্ব ভঙ্গিমায় প্রকাশিত হয়েছে…যা বিরল এবং কৌতূহলোদ্দীপক।পড়তে পড়তে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের”কুকুর বিষয়ক ২টো ১টা কথা যা আমি জানি” বা নবারুণ ভট্টাচার্যের “লুব্ধক” মনে পড়ে যায়🙏
গল্পের বিষয় অনবদ্য আর প্রকাশশৈলী খুব স্বতস্ফূর্ত ভাবে আকর্ষণীয়।